১৬. দুর্গের ওপর দিককার ছোট একটা কামরা

দুর্গের ওপর দিককার ছোট একটা কামরায় রাখা হয়েছে আহত আইভানহোকে। বুড়ি উলরিকার ওপর দেয়া হয়েছিলো তার সেবা যত্নের ভার। অরটা যখন রেবেকা নিজের কাঁধে তুলে নিতে চেয়েছে তখন আপত্তি করা দূরে থাক রীতিমতো খুশি হয়েছে বুড়ি। রেবেকাকে আইভানহোর ঘরে পৌঁছে দিয়ে নিজের কাজে লেগে গেছে সে। সে কাজ যে কি, সে ছাড়া আর কেউ তা জানে না।

আইভানহোর সেবা করার সুযোগ পেয়ে দারুণ খুশি রেবেকা। ওর বাবাকে বাঁচিয়েছিলো বলেই হোক, বা অন্য কোনো কারণেই হোক, আইভনহো রোয়েনাকে ভালোবাসে জানা সত্ত্বেও রেবেকা ভালোবেসেছে আইভানহোকে। মা যেমন করে অসুস্থ সন্তানের সেবা করে তেমন যত্নে ও শুশ্রুষা করছে আইভানহোর।

আইভানহোই ওকে পাঠিয়েছিলো পাদ্রীকে ডেকে আনার জন্যে। কিন্তু উলরিকার তাড়া খেয়ে ফিরে এসেছে ব্যর্থ হয়ে। এর খানিক বাদেই নিচে উঠানে শুরু হলো ভয়ানক কোলাহল। সশস্ত্র মানুষের ভারি পায়ের শব্দ শোনা যেতে লাগলো অলিপথগুলোয়। দেয়ালের ওপর থেকে ভেসে আসতে লাগলো নাইটদের উচ্চকণ্ঠের নিশ। শুনছে আইভানহো। আর অস্থির হয়ে উঠছে ভেতরে ভেতরে। যুদ্ধের ঘোড়া রণদামামা শুনে যেমন করে তেমন ছটফট করছে সে। ইচ্ছে করছে ছুটে গিয়ে যোগ দেয় যুদ্ধে। কিন্তু ওর শরীরের যা অবস্থা তাতে তা অসম্ভব এক কথায়।

অবশেষে সে বলেই ফেললো, কোনো রকমে যদি ঐ জানালার ধারে গিয়েও বসতে পারতাম! যুদ্ধে যোগ দিতে না পারলেও দেখতে পারতাম অন্তত।

হঠাৎ সব শব্দ থেমে গেল যেন কারো ইঙ্গিতে। গভীর নিস্তব্ধতা দুর্গ জুড়ে।

খামোকাই আপনি দুঃখ পাচ্ছেন, মাননীয় নাইট, রেবেকা বললো। দেখুন সব গোলমাল থেমে গেছে। যুদ্ধ হয়তো হবেই না।

তুমি কিছু জানো না, অস্থির কণ্ঠে বললো আইভানহো। গোলমাল থেমে গেছে মানে এপক্ষের সবাই যার যার জায়গায় দাঁড়িয়ে গেছে তৈরি হয়ে। আক্রমণের জন্যে অপেক্ষা করছে। দেখবে একটু পরেই যুদ্ধ শুরু হবে। আহ, আমি যদি জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়াতে পারতাম! বলতে বলতে বিছানা থেকে ওঠার চেষ্টা করলো আইভানহো। কিন্তু পারলো না। শুয়ে পড়লো আবার।

তাড়াতাড়ি রেবেকা বললো, আপনি উঠবেন না। আমি জানালার ধারে দাঁড়াচ্ছি। যা দেখবো, আপাকে বলবো।

না, না, ভুলেও তা কোরো না, শঙ্কিত কণ্ঠে বললো আইভানহো। এই দুর্গের প্রতিটি জানালা, প্রতিটি ফোকর এখন আক্রমণকারীদের লক্ষ্য। আচমকা একটা তীর এসে হয়তো লাগবে তোমার গায়ে।

যদি লাগে তো লাগুক না। বেঁচে যাই তাহলে, বলতে বলতে জানালার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো রেবেকা।

আইভানহো জানে ইচ্ছে করলেও ও বাধা দিতে পারবে না। তাই শেষ পর্যন্ত মিনতিভরা কণ্ঠে বললো, ঠিক আছে, যদি দাঁড়াতেই চাও, এমনভাবে দাঁড়াও যেন বাইরে থেকে তোমাকে না দেখা যায়।

আইভানহোর অনুরোধ রাখলো রেবেকা। এক পাশে সরে এলো।

আরে, কয়েকশো লোক এগিয়ে আসছে! হঠাৎ চিৎকার করে উঠলো সে। সবার গায়ে সবুজ পোশাক, হাতে তীর ধনুক।

কোন পতাকার অধীনে আছে ওরা?

কোনো পতাকাই তো দেখতে পাচ্ছি না।

আশ্চর্য! দলের নেতৃত্ব দিচ্ছে কে কে? দেখতে পাচ্ছো?

একজনকেই দেখে মনে হচ্ছে নেতা। তার গায়ে কালো বর্ম।

ঢালের ওপর কি চিহ্ন দেখ তো।

উহুঁ, দেখতে পাচ্ছি না। ঢালটার রঙও কালো, আর কিছু বোঝা যাচ্ছে। সূর্যের আলো পড়ে ঝলকে উঠছে ওটা। এক মুহূর্ত থেমে রেবেকা আবার বললো, প্রায় এসে গেছে। সামনের লোকগুলো কাঠের ঢাল দিয়ে মাথা ঢেকে ফেলেছে। পেছনের ওরা ধনুকে তীর পরাচ্ছে। ওহ, ঈশ্বর, এবার কি হবে?

তীক্ষ্ণস্বরে শিঙা বেজে উঠলো একবার। আক্রমণের সংকেত! দুর্গ প্রাচীরের ওপর থেকে ভেসে এলো ঢাকের আওয়াজ।

শুরু হয়ে গেল যুদ্ধ।

একটু পরপরই চিৎকার শোনা যাচ্ছে, ফ্রত দ্য বোয়েফ! বোয়াগিলবার্ট! দ্য ব্রেসি!

শয়ে শয়ে তীর এসে লাগছে দুর্গের দেয়ালে। শয়ে শয়ে উড়ে গিয়ে পড়ছে আক্রমণকারীদের ওপর।

কি দেখতে পাচ্ছো, রেবেকা? জিজ্ঞেস করলো আইভানহো।

বৃষ্টির মতো তীর ছুটছে, আর কিছু না।

ও বেশিক্ষণ চলবে না। শুধু তীর ছুঁড়ে এ দুর্গের একটা পাথরও খসানো যাবে না। দেয়ালের ওপর হামলা চালাতে হবে। সেই ব্ল্যাক নাইটকে দেখতে পাচ্ছো? কি করছে এখন?

কই, দেখছি না তো তাকে।

ব্যাটা কাপুরুষ! চিৎকার করলো আইভানহো। তীরের ভয়েই পেছনে চলে গেছে!

না, না, আবার তাকে দেখতে পাচ্ছি। কয়েক জনকে সাথে নিয়ে দেয়ালের ওপর হামলা চালিয়েছে, তার হাতে কুঠার। অন্যদের হাতে গাছের গুঁড়ি। দমাদম চালাচ্ছে দেয়ালের গায়ে। দেয়ালের গায়ে গর্ত করে ফেলেছে ওরা! কয়েকজন ঢুকতে যাচ্ছে সেই ফোকর গলে! নাহ্! পিছিয়ে গেল! হতাশ শোনালো রেবেকার কণ্ঠস্বর। ফ্ৰঁত দ্য বোয়েফ ওদের পেছনে তাড়া করছে। হাতাহাতি যুদ্ধ হচ্ছে এখন! ওহ, কি ভয়ঙ্কর! জানালা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে দিয়েছে রেবেকা। দেয়ালের কোল ঘেঁষে যে লড়াই হচ্ছে তার কিছু সে দেখতে পাচ্ছে না।

: তারপর রেবেকা? প্রশ্ন করলো আইভানহো। এখন কি হচ্ছে?

ফ্ৰঁত দ্য বোয়েফ আর সেই ব্ল্যাক নাইট মুখখামুখি লড়ছে। ওহ্ ঈশ্বর, বাঁচাও ওকে! পড়ে গেছে।

কে পড়ে গেছে, রেবেকা? তাড়াতাড়ি বলো!

ব্ল্যাক নাইট, মিইয়ে যাওয়া গলায় বললো রেবেকা। পর মুহূর্তে আবার সতেজ হয়ে উঠলো সে। না আবার উঠে দাঁড়িয়েছে, তলোয়ার ভেঙে গেছে ওর। একজনের হাত থেকে কুঠার কেড়ে নিয়েছে। ওহ, মা গো! পড়ে গেছে।

কে, রেবেকা? কে?

ফ্ৰঁত দ্য বোয়েফ! ওর লোকজন দৌড়ে যাচ্ছে ওকে উদ্ধার করার জন্যে। বোয়া-গিলবার্ট ওদের সামনে। টানতে টানতে ওরা নিয়ে আসছে ফ্ৰঁত দ্য বোয়েফকে। দেয়ালের ভেতর চলে এসেছে। দম নেয়ার জন্যে থমলো রেবেকা।

তারপর, রেবেকা? তারপর?

বাইরের ওরা মই লাগাচ্ছে দেয়ালের গায়ে! উঠে আসছে! নরম গুলো তেল ছুঁড়ে মারছে, পাথর ছুঁড়ে মারছে। কয়েকজন একটা গছের গুঁড়ি নিয়ে এসেছে এই ছুঁড়ে দিলো। ঔড়ির তলে পড়ে চিড়ে চ্যাপ্টা হয়ে গেল কয়েকজন ডাকাত। আরো কয়েকজন এগিয়ে আসছে ওদের জায়গা নেয়ার জন্যে। কিন্তু…কিন্তু, পারছে না ওর। মইগুলো সব ফেলে দিয়েছে নরম্যানরা।

আমাদের লোকরা পিছু হটে যাচ্ছে? উদ্বিগ্ন কণ্ঠে প্রশ্ন করলো আইতানহো।

না! না! ব্ল্যাক নাইট সমানে ঘা মেরে চলেছে বাইরের মিনারের দরজার ওপর। ওহ্ কি একেকটা ঘা! ওপর থেকে বড় বড় পাথর ছুঁড়ে মারছে তার ওপর। কিন্তু তবু এখনো সে টিকে আছে। দরজার পাল্লাগুলা কাঁপছে। এই ভেঙে পড়লো। আমাদের লোকরা ছুটে আসছে খোলা দরজার দিকে!

ওরা কি পরিখা পার হচ্ছে?

না, বুলসেতুটা ভেঙে দিয়েছে বোয়া-গিলবার্ট। ওরা বাইরের মিনার দখল করে নিয়েছে। ঢুকে পড়েছে ভেতরে। আরে, লড়াই দেখি থেমে গেল!

আবার আক্রমণ করার জন্যে তৈরি হচ্ছে ওরা, বললো আইভানহো। বিশ্রাম নিচ্ছে সৈনিকরা। ওহ, আমি যদি ব্ল্যাক নাইটের পাশে দাঁড়িয়ে লড়তে পারতাম! আমার দশ বছরের আয়ু ছেড়ে দিতে রাজি সেজন্যে।

হায়, নাইট! দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো রেবেকা। যার জন্যে আপনি দশ বছরের পরমায়ু ছেড়ে দিতে চাইছেন তা থেকে পাবেন কী? গৌরব? কিন্তু কী এই গৌরব? এ তো কবরের মাথায় পাথরে খোদাই করা কথা; কয়েকদিন পরেই যা আর কারো মনে থাকে না।

আইভানহোর দিকে তাকালো রেবেকা। যন্ত্রণা আর উত্তেজনায় ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে গেছে সে।

ঘুমাচ্ছে, ফিস ফিস করে বললো রেবেকা। ওহ, বাবা! কী অকৃতজ্ঞ মেয়ে আমি! এই যুবকের সোনালি চুল দেখে ভুলে গেছি তোমার ধূসর চুলের কথা। কিন্তু আর নয়, আমার অন্তর থেকে এই বোকামির শিকড় আমি উপড়ে ফেলবো। মাথার ওপর ঘোমটা টেনে দিয়ে জানালার কাছে গিয়ে বসলো সে।

.

মৃত্যুশয্যায় শুয়ে আছেন্টরকুইলস্টোন। প্রাসাদের মহা প্রতাপশালী অধিপতি রেজিনাল্ড ফ্রঁত দ্য বোয়েফ। মৃত্যু একেবারে ঘাড়ের ওপর এসে গেছে বুঝতে পেরে আতঙ্কিত বোধ করছে সে। শূন্য একটি কক্ষে তাকে ফেলে রেখে গেছে তার বন্ধু ও ভৃত্যরা। নিয়তির কি নির্মম লিখন, মৃত্যু যখন ঘরের দুয়ারে পৌঁছে গেছে তখন কারও এক মুহূর্তের ফুরসত নেই তার পাশে এসে বসার। একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেললো রেজিনাল্ড। কেন যেন একটা কথাই ওর মনে হচ্ছে, জীবনটা অপব্যয় হলো। কত কিছু করার ছিলো, করতে পারতো, কিন্তু কিছুই করা হলো না।

হঠাং ঘরের এক কোনা থেকে খনখনে গলায় কে যেন অট্টহাসি হেসে উঠলো।

কে? চমকে প্রশ্ন করলো রেজিনাল্ড। কে ওখানে?

তোমার যম, জবাব দিলো উলরিকা।

ভাগগা এখান থেকে ডাইনী বুড়ি। আমাকে শান্তিতে মরতে দাও।

বললেই হলো। সারা জীবনে যত অপকর্ম করেছে সব তোমাকে স্মরণ করিয়ে দেয়ার জন্যে এসেছি। আমার কাজ শেষ করি আগে তারপর যাবো।

নরকের কীট, দূর হ এখান থেকে!

না! শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আমি তোমাকে জ্বালাবো। দুর্গাধিপতি, হাহ, দুর্গাধিপতি! পরের জিনিস ডাকাতি করে নিয়ে উনি অধিপতি হয়েছেন! শ্রুত দ্য বোয়েফ, মনে পড়ে, কত লোক তোমার হাতে মরেছে এই দুর্গে? কত অভাগার আর্তনাদে ভারি হয়ে আছে এখানকার বাতাস? মনে পড়ে উলফগ্যাঞ্জারের মুখ? আমার ভাইদের মুখ?

ওহ, থাম রাক্ষুসী! থাম!

পারলে উঠে এসে থামাও না, মহামান্য রেজিনাল্ড ট্রুত দ্য বোয়েফ ওরফে দুর্গাধিপতি। ঐ যে শুনছো, তোমার দুর্গের দেয়াল ভেঙে পড়ছে।

মিথ্যে কথা! অত্যন্ত মজবুত আমার দেয়াল। ঐ গুণ্ডাগুলোর ঘায়ে ভাংতেই পারে না। আমার লোকরা সাহসের সাথে লড়ছে! লড়ছে বোয়াগিলবার্ট, দ্য ব্রেসি। ওরা কিছুতেই হার স্বীকার করবে না!

হা-হা করে পাগলের মতো হেসে উঠলো উলরিকা। কোনো গন্ধ পাচ্ছো, রেজিনাল্ড? ধোঁয়ার গন্ধ? এর নিচের ঘরটায় জ্বালানী কাঠ রাখা হয় মনে আছে?

কি করেছিস তুই, ডাইনী বুড়ি?

কাঠের স্তূপে তেল ঢেলে আগুন লাগিয়ে দিয়েছি। হ্যাঁ, রেজিনান্ড, আমার এই দুর্বল হাত দুটো তোমার দুর্ভেদ্য দুর্গে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে। ঐ দেখ, জানালা দিয়ে দেখা যাচ্ছে আগুনের লকলকে শিখা।

উঠে বসার চেষ্টা করলোত দ্য বোয়েফ। পারলো না।

রাক্ষুসী! পিশাচী! দুর্বল কণ্ঠে উচ্চারণ করলো সে। উহ, এক মুহূর্তের জন্যে যদি আবার আগের সেই শক্তি ফিরে পেতাম! তাহলে হয়তো বীরের মতো মরতে পারতাম!

বীরের মৃত্যু! আর আঁশা পেলে না। তোমার মৃত্যু হবে পথের কুকুরের মতো। বুঝলে, পথের কুকুরের মতো। প্রাই যুদ্ধে ব্যস্ত। আগুনের দিকে মন দেয়ার সুযোগই কেউ পাবে না। তুমি পুড়ে মরবে, রেজিনাল্ড! পুড়ে মরবে! হা! হা! হা!

দ্রুত পায়ে বেরিয়ে গিয়ে দরজায় তালা লাগিয়ে দিলো উলরিকা।

বাঁচাও! বাঁচাও! চিৎকার করতে লাগলো ফ্ৰঁত দ্য বোয়েফ। কিন্তু কেউ শুনতে পেলো না তার চিৎকার।

ধোঁয়ার কুণ্ডলী ঘন হয়ে ঘরে ঢুকতে শুরু করেছে। আগুনের লেলিহান শিখাও এগিয়ে আসছে ক্রমশ।

.

সংক্ষিপ্ত বিশ্রাম শেষে আবার আক্রমণ করলো ডাকাতবাহিনী। নষ্ট করার মতো সময় তাদের হাতে নেই। নরম্যানদের নিশ্বাস ফেলার সুযোগটুকুও দেয়া চলবে না। যত যা-ই হোক ওরা আছে দুর্গের ভেত্বর, উন্নত অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে। সময় পেলেই ওর নতুন করে প্রস্তুতি নেয়ার সুযোগ পাবে। তাছাড়া ওদের জন্যে যেকোনো মুহূর্তে সাহায্যও এসে যেতে পারে যেকোনো দিক থেকে।

সংক্ষিপ্ত বিশ্রামের ফাঁকে একটা ভাসমান সেতু তৈরি করে ফেলেছে ওরা। পরিখার জলৈ সেতুটা ভাসিয়ে দেয়ার নির্দেশ দিয়ে লক্মলির দিকে তাকালো ব্ল্যাক নাইট।

লক্সলি, কিছু লোক নিয়ে তুমি দুর্গের পেছন দিকে চলে যাও। নরম্যানরা যেন ভাবে ওদিক দিয়েও আমরা আক্রমণ কররো। ওদের অন্তত অর্ধেক লোক তাহলে পেছন দিকটা সামলাতে ব্যস্ত হয়ে পড়বে। এই ফাঁকে আমরা প্রধান ফটকটা ভেঙে ফেলতে পারবো।

বিনাবাক্যব্যয়ে চলে গেল লক্সলি শখানেক লোক নিয়ে। ইতোমধ্যে প্রধান ফটক বরাবর পরিখার জলে ভাসানো হয়ে গেছে সেতু। কিন্তু ব্যাপারটা দেখে ফেলেছে দুর্গের লোকরা। সব কাজ ফেলে সেতুটাকে ধ্বংস করার চেষ্টা করতে লাগলো তারা। বড় বড় পাথর, গাছের গুঁড়ি ফেলতে লাগলো ওপর থেকে। কিন্তু দুর্ভাগ্য তাদের, সেতুটার বিশেষ কোনো ক্ষতি করার আগেই দুর্গের পেছন দিক থেকে চিকার ভেসে এলো: এদিক দিয়েও হামলা করছে ওরা!

মুহূর্তে স্তব্ধ হয়ে গেল নরম্যানরা। বোয়া-গিন্সবার্ট ঠোঁট কামড়ে দাঁড়িয়ে রইলো কয়েক মুহূর্ত। জিজ্ঞেস করলো, এবার, দ্য ব্রেসি?

কিছু লোককে পেছনে পাঠিয়ে দেয়া ছাড়া আর তো কোনো উপায় দেখছি না।

হঠাৎ ব্ল্যাক নাইট খেয়াল করলো দেয়ালের ওপর শত্রু-সংখ্যা অর্ধেকে নেমে এসেছে। কৌশলটা তাহলে কাজে লেগেছে, মুচকি হেসে মনে মনে ভাবলো সে।

সেড্রিক আর কয়েকজন ডাকাতকে নিয়ে সেতুর ওপর দিয়ে এগোলো ব্ল্যাক নাইট। গাছের গুঁড়ি এখন আর পড়ছে না ওপর থেকে, পড়ছে কেবল পাথর, তারও সংখ্যা কমে গেছে অনেক। ঢালটা মাথার ওপর তুলে ধরে এগোচ্ছে সে, পাথর থেকে মাথা বাঁচানোর জন্যে কয়েক সেকেন্ডের ভেতর সেতু পার হয়ে দরজার কাছে পৌঁছে গেল নাইট।

এদিকে উলরিকা তার কাজ করে যাচ্ছে নিষ্ঠার সাথে। ফ্ৰঁত দ্য বোয়েফের ঘরে তালা লাগিয়ে দিয়ে এসে একে একে দুর্গের অন্য ঘরগুলোতে আগুন লাগাচ্ছে সে। এক তলার পর দোতলা, দোতলার পর তিনতলা। তারপর আরো ওপরে।

প্রধান ফটকের ভারি কপাট ভেঙে ফেলার চেষ্টা করছেন ব্ল্যাক নাইট ও সেড্রিক। দুজনের হাতে দুটো কুঠার। সর্বশক্তিতে তারা ঘা মেরে চলেছেন কাঠের কপাটে। এদিকে এক দল লোককে দুর্গের পেছন দিকে পাঠিয়ে দিয়ে সবে মাত্র আবার দেয়ালের ওপর উঠেছে দ্য ব্রেসি। ব্ল্যাক নাইট ও সেড্রিকের প্রচেষ্টা দেখতে পেলো সে। অমনি নিজের লোকদের দিকে তাকিয়ে খেঁকিয়ে উঠলো, লজ্জা করে না তোমাদের, মাত্র এই কজন লোককে ঠেকাতে পারোনি! সৈনিক বলে আবার গর্বে মাটিতে পা পড়ে না। হাঁ করে দেখছে কি? তাড়াতাড়ি ফটকের ওপরের দেয়ালটা ভেঙে ফেল। ইট পাথরের নিচে চাপা পড়ে মরবে বদমাশগুলো! বলতে বলতে নিজেই একজনের হাত থেকে একটা কুঠার কেড়ে নিয়ে দেয়াল আলগা করতে লাগলো।

ইতোমধ্যে যাদের নিয়ে গিয়েছিলো তাদের দুর্গের পেছন দিকে রেখে আবার সামনে চলে এসেছে ললি। সে খেয়াল করলো বিপদটা। ঝটপট কাঁধ থেকে ধনুক খুলে দ্য ব্রেসিকে লক্ষ্য করে বেশ কয়েকটা তীর ছুঁড়লো সে। কি দ্য ব্রেসির গায়ে ইস্পাতের বর্ম থাকায় বিধলো না একটাও।

পিছিয়ে আসুন, সেড্রিক। পিছিয়ে আসুন, নাইট, চিৎকার করে উঠলো নিরুপায় লক্সলি।

 কিন্তু দুজনের কেউই সে চিৎকার শুনতে পেলেন না। এত জোরে তারা কুঠার চালাচ্ছেন যে সে শব্দের নিচে চাপা পড়ে যাচ্ছে অন্য সব আওয়াজ। তাদের মাথার ওপর পাথরের গাঁথুনি তখন কাঁপতে শুরু করেছে। যে কোনো মুহূর্তে খসে পড়বে।

এই সময় বোয়া-গিলবার্টের চিৎকার শুনে থেমে গেল দ্য ব্রেসি।

আগুন! আগুন! দুর্গে আগুন লেগেছে!

কুঠারটা নামিয়ে রেখে বোয়া-গিলবার্টের কাছে ছুটে গেল দ্য ব্রেসি।

এবার, ব্রায়ান? হাঁপাতে হাঁপাতে বললে সে। এবার আমরা কি করবো?

ফটক খুলে ওদের ঐ সেতুর ওপর দিয়ে পালাতে হবে। এছাড়া আর কোনো পথ নেই।

নির্দেশ পাওয়া মাত্র পড়িমরি করে নেমে আসতে লাগলো নরম্যানরা দেয়ালের ওপর থেকে। তারপর সবাই একজোট হয়ে ছুটলো ফটকের দিকে।

ব্ল্যাক নাইটের সামনাসামনি পড়ে গেল দ্য ব্রেসি। শুরু হলো ভয়ঙ্কর লড়াই। প্রথম কিছুক্ষণ সমানে সমানে লড়লো দুজন। তারপর ধীরে ধীরে পিছাতে শুরু করলো দ্য ব্রেসি। হঠাৎ মাথায় ব্ল্যাক নাইটের কুঠারের প্রচণ্ড এক আঘাতে পড়ে গেল সে।

হার স্বীকার করো, দ্য ব্রেসি! চিৎকার করে উঠলো নাইট।

কক্ষনো না! মরি তা-ও ভাললা! পাল্টা চিৎকার করলো দ্য ব্রেসি।

ব্ল্যাক নাইট ঝুঁকে দ্য ব্রেসির কানে কানে কি যেন বললো। অমনি নরম হয়ে এলো দ্য ব্রেসির গলা।

জি, আমি হার স্বীকার করছি? বললো সে।

যাও দেয়ালের ওপাশে গিয়ে অপেক্ষা করো, ব্ল্যাক নাইট বললো। আমার নির্দেশ না পাওয়া পর্যন্ত নড়বে না।

জি, যাচ্ছি। উঠে দাঁড়ালো দ্য বেসি। বললো, আইভানহে বন্দী হয়ে আছে এ দুর্গে। ওকে বাঁচাতে হলে উপরে উঠে যান। উপরের একটা ঘরে ওকে আটকে রাখা হয়েছে।

.

আইভানহোর ঘরেও ধোঁয়া ঢুকতে শুরু করেছে। কুণ্ডলী পাকানো ঘন কালো ধোঁয়া। রেবেকা আর সে–কাশছে দুজনেই।

আমার কথা ভেবো না, রেবেকা, মিনতি করলো আইভানহো, তুমি চলে যাও। প্রাণ বাঁচাও।

না, দৃঢ় কণ্ঠে জবাব দিলো রেবেকা। বাচি মরি, দুজন এক সাথেই থাকবো।

না, রেবেকা, আমার কথা শোনো। আগুন সারা দুর্গে ছড়িয়ে পড়ার আগেই…

শেষ করতে পারলো না আইভানহো, দড়াম করে খুলে গেল দরজা। বোয়া-গিলবার্ট ঢুকলো। তার বর্ম ভেঙে গেছে। জায়গায় জায়গায় লেগে আছে ছোপ ছোপ রক্ত।

সারা দুর্গে ছড়িয়ে পড়েছে আগুন, হাঁপাতে হাঁপাতে বললো সে। তার ভেতর দিয়ে আমি এসেছি, রেবেকা, শুধুমাত্র তোমাকে বাঁচাতে। চলো আমার সাথে।

তার চেয়ে মরবো আমি।

সময় নষ্ট করলো না টেম্পলার। সোজা এগিয়ে এসে কাঁধে তুলে নিলো ওকে। প্রাণপণে চিৎকার করতে করতে ব্রায়ানের পিঠে কিল ঘুসি মেরে চললে রেবেকা। ক্ৰক্ষেপ করলো না বোয়া-গিলবার্ট। বেরিয়ে গেল ঘর ছেড়ে। এদিকে অসহায় আইভানহোও চিৎকার করছে। তার চিৎকার শুনে ঘরের দরজায় এসে দাঁড়ালো ব্ল্যাক নাইট।

তোমার চিৎকার শুনতে না পেলে কোনোদিনই তোমাকে খুঁজে বের করতে পারতাম না, বললো সে।

তুমি যদি সত্যিকারের নাইট হও, অস্থির কণ্ঠে বললো আইভানহো, আমার কথা ভেবে সময় নষ্ট কোরো না। ঐ টেম্পলারের পেছন পেছন যাও। রেবেকাকে উদ্ধার করো। রোয়েনা আর ওর বাপকে বাঁচাও!

হ্যাঁ, যাবো, কিন্তু আগে তুমি এসো, বলতে বলতে আইভানহোকে কাঁধে তুলে নিলো ব্ল্যাক নাইট।-নিরাপদে বেরিয়ে এলো দুর্গ থেকে। আইভানহোকে মোটামুটি নিরিবিলি একটা জায়গায় নামিয়ে রেখে আবার সে ছুটলো দুর্গের ভেতর অন্য বন্দীদের উদ্ধার করতে।

ইতোমধ্যে পশ্চিম পাশের মিনারে আগুন ছড়িয়ে পড়েছে। দুর্গের অন্যান্য অংশেও আগুন ধরেছে তবে অত মারাত্মকভাবে নয়। ঐ সব এলাকায় এখনো লড়াই চলছে। চিৎকার, হুঙ্কার আর আর্তনাদে ভারি হয়ে আছে বাতাস। মাটি পিচ্ছিল হয়ে গেছে রক্তে।

সেড্রিক আর গাৰ্থ ছুটতে ছুটতে দুর্গের প্রাসাদ অংশে ঢুকলেন। আগুনের অসহ্য উত্তাপ সয়েও একটা একটা করে বন্ধ ঘরের দরজা খুলে দেখতে লাগলেন তারা। অবশেষে পেলেন রোয়েনার খোঁজ। যে মুহূর্তে রোয়েনা বাঁচার আশা সম্পূর্ণ ছাড়তে বসেছে ঠিক সেই মুহূর্তে দরজা খুলে ঘরে ঢুকলেন সেড্রিক। পেছনে গাৰ্থ। ছুটে এসে সেড্রিককে জড়িয়ে ধরলো রোয়েনা। সেড্রিকও বুকে টেনে নিলেন মেয়েকে। এক মুহূর্ত,পরেই ওকে ছেড়ে দিয়ে গার্থের দিকে ফিরলেন তিনি। বললেন, জলদি, গার্থ, এক্ষুনি রোয়েনাকে নিয়ে বেরিয়ে যাও প্রাসাদ ছেড়ে। আমি আসছি।

অ্যাথেলস্টেন আর ওয়াম্বার খোঁজে ছুটলেন তিনি।

কিন্তু তার আগেই বুদ্ধি খাটিয়ে নিজের আর অ্যাথেলস্টেনের মুক্তির ব্যবস্থা করেছে ওয়াম্বা।

প্রাসাদ থেকে বেরিয়ে সবেমাত্র উঠানে এসে দাঁড়িয়েছে ওরা, এই সময় অ্যাথেলস্টেন দেখলো, একপাশে দাঁড়িয়ে আছে বোয়া-গিলবার্টের ঘোড়া। পাশে দাঁড়িয়ে কয়েকজন সবুজ পোশাক পরা সৈনিকের সাথে লড়ছে টেম্পলার। ঘোড়াটার পিঠে অচেতন হয়ে ঝুলছে এক তরুণী। নিশ্চয়ই রোয়েনা, ভেবে ছুটে গেল অ্যাথেলস্টেন। এক জনের হাত থেকে একটা কুঠার কেড়ে নিয়ে মুখোমুখি হলো ব্রায়ানের।

ভণ্ড নাইট! চিৎকার করে উঠলো অ্যাথেলস্টেন। ছেড়ে দাও মেয়েটাকে!

কুকুর! একই তেজে চিৎকার করলো টেম্পলার। তারপর আচমকা তলোয়ার তুলেই আঘাত করলো অ্যাথেলস্টেনের শিরোম্রাণহীন শিরে। কাটা গাছের মতো মাটিতে আছড়ে পড়লো স্যাক্সন রাজপুত্রের দেহ।

এসো আমার সাথে, সঙ্গীদের দিকে তাকিয়ে নির্দেশ দিলো টেম্পলার। লাফ দিয়ে ঘোড়ায় চাপলো। ছুটলো ফটক পেরিয়ে, শত্রুর ভাসানো সেতু পেরিয়ে বনের ভেতর দিয়ে।

এবার শুরু হলো দুর্গ লুটের পালা। লক্সলি তার দলবল নিয়ে প্রতিটা ঘরে ঢুকছে। মূল্যবান যা কিছু পাচ্ছে কাউকে দিয়ে পাঠিয়ে দিচ্ছে নিচের উঠানে। অবশ্য খুব ভালো করে লুট করার সুযোগ ওরা পেলো না। তার আগেই অসহ্য হয়ে উঠলো আগুনের উত্তাপ। একতলা আর দোতলার মালপত্র হাতিয়েই নেমে আসতে বাধ্য হলো সবাই।

পুরো দুর্গ এখন আগুনের রাজত্ব হয়ে উঠেছে। সবগুলো চূড়া থেকে বেরিয়ে আসছে লকলকে শিখা, কালো ধোঁয়া আর অসংখ্য ফুলকি। যুদ্ধ থেমে গেছে। বিজয়ী পক্ষ নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে দেখছে আগুনের খেলা।

শেষ; নরম্যান কুত্তাগুলোর ধুর্গ! মলে উঠলো এক দস্যু। অমনি তার সাথে গলা মিলিয়ে চিৎকার করলো আরো অনেকে: শেষ! নরম্যান কুত্তাগুলোর দুর্গ!

হঠাৎ দুর্গের সর্বোচ্চ চূড়ায় দেখা গেল শীর্ণ এক নারী মূর্তি। বুড়ি উলরিকা! তার ধূসর এলো চুল, পোশাকের প্রান্ত উড়ছে বাতাসে। তার সেই বনখনে গলায় সে গেয়ে চলেছে উদ্দীপনাময় এক যুদ্ধের গান। গান এক সময় থেমে গেল। উদ্ভ্রান্ত দৃষ্টিতে আকাশের দিকে তাকালো উলরিকা। হেসে উঠলো হো-হো করে। আগুন পৌঁছে গেছে চূড়াটায়। কিন্তু ক্ষেপ নেই বৃদ্ধার। হেসেই চলেছে সে। তার পোশাকের প্রান্ত ছুঁলো আগুন। হাসি থামলো না। সারা গায়ে আগুন ধরে গেল উলরিকার। হাসি থামলো না। উড়ন্ত চুলগুলো পুড়ে গেল। কিন্তু হাসি চলছে। নিচে দাঁড়িয়ে বিস্মিত মানুষগুলো ভাবছে, এ কি করে সম্ভব! তারপর আচমকা থেমে গেল হাসি। উলরিকার দেহটা ধীরে ধীরে পড়ে গেল ভাজ হয়ে। অগ্নিস্নানে শান্ত হলো তার এতদিনের অন্তর্জালা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *