১৬. ঝলসাচ্ছে সকালের সূর্য

ঝলসাচ্ছে সকালের সূর্য…চোখ টাটিয়ে দেওয়ার মত উজ্জ্বল রোদ; চোখের জন্য ক্লান্তিকর এই ঔজ্জ্বল্যের যেন শেষ হবে না। কিন্তু বাতাসের টানে অনেক উঁচুতে উঠে গেছে বালি, এমনকী পাহাড়ের কাঠামোও ঢাকা পড়ে গেছে এখন। অচিরেই সূর্যকে ঢেকে ফেলল, কিন্তু স্বাভাবিক উত্তাপ রয়ে গেছে। ভারী চাদরের মত ঘিরে থাকল জায়গাটাকে, উপরে হলদেটে আভা জুড়ে আছে সমগ্র আকাশ। চারপাশে নিঃসীম নীরবতা।

একটা পাখিও উড়ছে না…মাটিতে আনাগোনা নেই কোন গিরগিটির…দূরের আড়ালে নিশ্ৰুপ হয়ে গেছে কোয়েলগুলো। কেবল একটা জিনিসই আছে এখন-নিস্তব্ধতা। অটুট নীরবতা।

মরুভূমিতে চলন্ত মানুষের জন্য বালিঝড় সবচেয়ে বিপজ্জনক শত্রু…উড়ন্ত বালি ঢেকে ফেলে আকাশ আর মাটি, দিগন্ত হারিয়ে যায় দৃষ্টিসীমা থেকে, ট্রেইল নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়; ছোট্ট, আবদ্ধ এক পৃথিবীতে আটকা পড়ে হতভাগ্য মানুষ-বড়জোর কয়েক বর্গফুট এলাকা চোখে পড়ে। বিপদ বা আতঙ্ক কী জিনিস, বালিঝড়ে পড়ার অভিজ্ঞতা না থাকলে অনুমান করা মুশকিল; উত্তাপ তো রয়েছেই, দুর্ভোগের যোলোকলা পূর্ণ হয় উড়ন্ত বালির আঘাতে, বেশিরভাগ সময় যা সহ্যের অতীত হয়ে পড়ে। এমন পরিস্থিতিতে স্রেফ অসহায় বোধ করবে অনভিজ্ঞ যে-কোন লোক।

ছোট ছোট প্রাণী, এমনকী ক্ষুদ্র পোকারাও চলে যায় নিরাপদ আশ্রয়ে। আতঙ্কিত হয়ে পড়ে ঘোড়া। উড়ন্ত শ্বাসরোধী বালির আঘাত থেকে নিজেদের বাঁচানোর জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়ে মানুষ। কিন্তু আসলে উত্তাপ, বাতাস বা বালি নয়, বরং আতঙ্কই ভয়ঙ্কর হয়ে দাঁড়ায়। শ্বাসকষ্ট, লাগাতার কাশি, অতিরিক্ত নিঃশ্বাস…সেই সঙ্গে রয়েছে। সীমাহীন উদ্বেগ, স্থান-কাল-পাত্র সম্পর্কে হিতাহিত জ্ঞান হারানোর আশঙ্কা।

মানুষের অনুভূতি আসলে বড় ভঙ্গুর, স্পর্শকাতর জিনিস; কখনও কখনও বিশ্বাসভাজন হতে পারে, কিন্তু বরাবরই পারিপার্শ্বিকতার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। ইন্দ্রিয়ের সঙ্গে রয়েছে দিগন্ত, সীমানা, পরিমাপ আর নিয়ম কানুনের সম্পর্ক। এগুলোর হিসাব-নিকাশ থেকে পরিবেশ সম্পর্কে ধারণা নেয় ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়। বালিঝড়ের সময় দিগন্ত হারিয়ে যায়, তাই নিয়ম-কানুনের প্রশ্ন এখানে অবান্তর। কাছে বা দূরের কোন ব্যাপার থাকে না, উঁচু-নিচু কিংবা ঠাণ্ডা-গরম সম্পর্কেও ধারণা করা যায় না, বাতাসের গর্জন আর তীব্র ধাক্কা-শুধু এই অনুভব করা যায়, সঙ্গে লক্ষ লক্ষ টন উড়ন্ত বালির হুল ফোঁটানো যন্ত্রণা। কেউ কেউ বালির সাগরের নীচে চাপা পড়ে যায়, আক্ষরিক অর্থে সাগর বলা যায়-কারণ চলমান বালির এই সাগরের উপরিভাগ থাকে কয়েক মাইল উপরে; কেউ বা গলায় বালি আটকে কাশতে কাশতে মারা পড়ে, কিংবা চার হাত-পায়ে মাটিতে ক্রল করার সময় বালি গিলে ফেলে। বালি, বাতাস বা শ্বাস নিতে লাগাতার চেষ্টাও বিপজ্জনক হয়ে ওঠে।

এমন একটা ঝড়ই আসছে এখন।

এ-সম্পর্কে বিন্দুমাত্র সন্দেহও নেই এরিক ক্রেবেটের মনে। জানে কী ঘটতে পারে। উড়তে শুরু করেছে ধুলো, আয়নিত বাতাসের স্পর্শে বিদ্যুৎ তৈরি হলো ওর চুলে, মুহূর্তের জন্য খাড়া হয়ে গেল কয়েকটা চুল, স্পষ্ট টের পেল এরিক। আকাশের অস্বাভাবিক ঔজ্জ্বল্য দৃষ্টি এড়ায়নি ওর, বুঝে নিয়েছে কিছুক্ষণের মধ্যে এসে পড়বে ভয়ঙ্কর বালিঝড়। টেনে-হিচড়ে ঘোড়াগুলোকে নিয়ে এল ওরা, জান বাঁচাতে ছুটতে চাইছে ওগুলো, সামলে রাখতে গলঘর্ম হতে হলো ওদের। অবলা প্রাণীগুলো জানে না পালিয়ে যাওয়ার জায়গা নেই কোথাও।

বিস্ফারিত, শঙ্কিত দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকাল মেলানি। কী এটা, এরিক? কী ঘটছে, বলো তো? আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না।

বালিঝড় আসছে, দ্রুত বলল এরিক। ডান, ডেভিস…সব ক্যান্টিন জলদি ভরে ফেলল। ঝটপট! চিডল, ঘোড়াগুলোকে নীচে নিয়ে যাও। একসঙ্গে রেখো সবগুলোকে।

ইন্ডিয়ানরা যদি আক্রমণ করে? মনে করিয়ে দিল মিমি। ওদের নিয়ে না ভাবলেও চলবে। প্রাণ বাঁচাতে আমাদের মতই ব্যস্ত থাকবে ওরা। জলদি!

দ্রুত কাজ শুরু করল ওরা, আতঙ্ক প্রেরণা যোগাচ্ছে। মরুভূমির এই অদ্ভুত, সুবিশাল শূন্যতা টের পাচ্ছে, বিশাল একটা বাটির তলায় আটকা পড়া ক্ষুদ্র পোকার মত মনে হচ্ছে নিজেদের। শুধু এরিক আর টনি চিডলের অভিজ্ঞতা রয়েছে বালিঝড় সম্পর্কে, অন্যরা হয়তো শোনেওনি কখনও। আলগা বালির মরুভূমিতে বালিঝড় যে কতটা ভয়ঙ্কর হয়ে উঠতে পারে, জানে ওরা।

চারপাশে বালিয়াড়ি। ঝড়ের হাওয়ায় উড়াল দেওয়ার অপেক্ষায় পড়ে রয়েছে টনকে টন উত্তপ্ত বালি। ঘোড়াগুলোকে নিয়ে অ্যারোয়োর তলায় চলে এল এরিক, চিডল সাহায্য করছে ওকে। ঘোর লাগা মানুষের মত কাজ করছে অন্যরা, ক্যান্টিন ভরছে একটা একটা করে। ব্যতিক্রম শুধু জুলিয়া, ঠায় বসে আছে সে…দুনিয়ার কোন কিছুতে যেন কিছু যায়-আসে না ওর। একেবারে শেষ মুহূর্তে, যখন অন্যরা সবাই নীচে চলে গেছে, বিগ জুলিয়ার কাছে চলে গেল এরিক। চলো, জুলিয়া, নীচে আশ্রয় নেব আমরা।

চোখ তুলে ওর দিকে তাকাল জুলিয়া, চাহনিতে শূন্য দৃষ্টি। না, এখন নয়।

ইতস্তত করল এরিক, শেষে ঘুরে দাঁড়িয়ে শেষ ক্যান্টিনটা নিয়ে কূপের কাছে চলে এল। পানি ভরার পর, পাথুরে চাতালে এল। আগুন নিভে গেছে। আধ-পোড়া কয়েক টুকরো কাঠ পড়ে আছে, ওগুলো তুলে নিয়ে অ্যারোয়োয় নেমে এল ও।

পাথরসারির আড়াল থেকে বেরিয়ে এল বেন ডেভিস, চকিত দৃষ্টি চালাল চারপাশে। বিগ জুলিয়া ছাড়া আশপাশে আর কেউ নেই, স্থির দৃষ্টিতে হলদেটে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে মহিলা; দুনিয়ার কোন কিছুতে আগ্রহ বা মনোযোগ আছে বলে মনে হয় না। হাঁটু গেড়ে বসে দ্রুত কাজ শুরু করল ডেভিস, পরনের শার্টের নীচের অংশ থলের মত বানিয়ে দ্রুত হাতে আঁজলা ভরে সোনা ঢোকাতে শুরু করল, তারপর ওগুলো এনে রাখল স্যাডল ব্যাগে। মাত্র কয়েক মিনিটের কাজ, নির্বিঘ্নে সেরে ফেলল সে। জুলিয়া ফিরেও তাকায়নি কিংবা দেখেও মনে হয়নি ওর তৎপরতা সম্পর্কে সচেতন। স্যাডল ব্যাগ দুটো নিয়ে দ্রুত নীচে নেমে এল ও। পাথরসারির কাছে ছোট্ট একটা গুহা আছে, এ কদিন এটাকে আশ্রয় হিসাবে ব্যবহার করেছে ওরা, ওটার খোলা মুখের কাছে ব্যাগ দুটো নামিয়ে রাখল ডেভিস।

একেবারে সঙ্কীর্ণ গুহাটা, কয়েক ফুট হবে বড়জোর, একপাশে কোন দেয়াল নেই, মেস্কিট ঝোঁপ আড়াল তৈরি করেছে খোলা মুখে। ঝোঁপের পিছনে ঘোড়াগুলোকে শক্ত করে বেঁধে রেখেছে ওরা, যাতে চাইলেও লাফালাফি করতে না পারে ওগুলো।

হঠাৎ চোখ তুলে তাকাল এরিক, পায়ের উপর খাড়া হলো, কান খাড়া। দূরে, ক্ষীণ একটা শব্দ, ক্রমে জোরাল হচ্ছে; যেন বহু দূরে প্রচণ্ড গর্জন করছে বিশাল কোন ম্যামথ। আসছে ওটা, দ্রুত বলল ও। পাথরের কাছে চলে যাও সবাই।

উপরে অ্যারোয়োর পথের দিকে এগোল ও। পিছন থেকে ছুটে আসছে মেলানি। এরিক, যেয়ো না!

গায়ের জোরে চেঁচাল এরিক, বাতাসের গর্জনে প্রায় চাপা পড়ে গেল ওর কণ্ঠ। জুলিয়া!

কোন উত্তর এল না।

দৌড়ে উপরে উঠে এল এরিক, পিছু পিছু মেলানিও এসেছে। উপরে উঠে চারপাশে তাকাল, কেউ নেই। জুলিয়ার পাত্তাও নেই!

দ্রুত পাথুরে চাতালের দিকে এগোল এরিক, উঠে এল চ্যাপ্টা পাথরের উপর। চারপাশে তাকাতে দেখতে পেল জুলিয়াকে, হাত তুলে দেখাল মেলানিকে।

নিখাদ আতঙ্ক নিয়ে তাকাল মেলানি। অন্তত দু’শো গজ দূরে, নাক বরাবর দক্ষিণে এগোচ্ছে জুলিয়া, এক মনে হেঁটে যাচ্ছে। ভারী শরীর আর চওড়া কাঁধ কিছুটা ঝুঁকে পড়েছে, কিন্তু ভঙ্গিটায় নিজস্ব মর্যাদাবোধ রয়েছে; মন্থর গতিতে, অথচ টানা হেঁটে চলেছে, সামান্য দ্বিধাও নেই। সামনে ধুলো ঝড়, আরও সামনে পিনাকেট আর উপসাগরের বিস্তীর্ণ নিঃসঙ্গতা।

গলা ফাটিয়ে চেঁচাল এরিক, কিন্তু নিজেও জানে শুনতে পারে না। জুলিয়া; হয়তো শুনতে পেলেও ফিরে তাকাত না। বাতাসের জোর আরও বেড়ে গেছে, কানের কাছে যেন গর্জাচ্ছে কোন হিংস্র পশু।

এরিক! মিনতি ঝরে পড়ল মেলানির কণ্ঠে। যেভাবেই হোক ফিরিয়ে আনতে হবে ওকে! বেচারী নির্ঘাত মারা পড়বে। এভাবে ওকে চলে যেতে দিতে পারি না আমরা।

সম্ভব নয়! মেলানি যাতে শুনতে পায়, চিৎকার করতে হলো এরিককে। দেরি হয়ে গেছে। আঙুল তুলে ভোলা মরুভূমির দিকে নির্দেশ করল ও। মাইল খানেক কিংবা বড়জোর দুই মাইল দূরে, উন্মত্ত আক্রোশ নিয়ে ছুটে আসছে বালিঝড়, প্রায় হাজার ফুট উঁচু; আগে আগে আসছে লতা-পাতা-গড়ান খাচ্ছে, ঘুরপাক খাচ্ছে কিংবা আছাড় খাচ্ছে বাতাসে-অদ্ভুত একটা দৃশ্য! সঙ্গে রয়েছে, হাড় কাঁপানো ঠাণ্ডা বাতাস।

মেলানির কজি চেপে ধরে পাথরসারির দিকে ছুটতে শুরু করল এরিক। বড়সড় একটা পাথরের কাছে এসে ক্ষণিকের জন্য থামল ও, বুক ভরে নিঃশ্বাস নিল, খোলা জায়গায় নিঃশ্বাসের সঙ্গে ফুসফুসে বালি, ঢুকে যাবে বলে এতক্ষণ শ্বাস নেয়নি। দুঃখ করো না! আসলে এ ছাড়া কিছুই করার ছিল না ওর। বেঁচে থাকার জন্য একটা অবলম্বন লাগে, কী বাকি ছিল ওর জন্য? মেলানির কানের পাশে চিৎকার করল এরিক। খুনের জন্য না হলেও অন্তত লুটের অভিযোগে গ্রেফতার হত ও, এরচেয়ে কি এটাই কি ভাল হয়নি?

মেলানিকে নিয়ে আশ্রয়ের দিকে এগোল ও।

অ্যারোয়োর ঢালের নীচে পরস্পরকে আঁকড়ে ধরে বসে পড়ল ওরা, তখনই আঘাত করল তীব্র বাতাস আর বালিঝড়।

*

ড্যান কোয়ানের বাহুবন্ধনে রয়েছে মিমি। কোটটা গায়ে ওর, মাথা আর মুখ ঢেকে রেখেছে কম্বলে। নির্বিকার মুখে দু’জনকে দেখল বেন ডেভিস, সামান্য বিকারও দেখা গেল না মুখে। হ্যাটটা প্রায় মুখের উপর নামিয়ে আনল সে, ফ্রক কোটের কলার তুলে দিল, তারপর একটা কম্বল টেনে নিয়ে গায়ে জড়াল। ঘোড়ার কাছাকাছি কম্বল জড়িয়ে গুটিসুটি মেরে শুয়ে আছে টনি চিডল, শুধু চোখ দুটো দেখা যাচ্ছে। একই কম্বলের নীচে এরিকের সঙ্গে মেলানিকে জড়াজড়ি করে বসতে দেখে টনি বা অন্য কাউকে বিস্মিত মনে হলো না। নিবিড় আলিঙ্গনে মেলানিকে আবদ্ধ করল এরিক, মেয়েটির শরীরের উষ্ণতা আর কোমলতা অনুভব করছে। হঠাৎ ওর মনে হলো ওদের জন্য যেন এটাই স্বাভাবিক, এবং শুধু এখনই নয়-আজীবনই পরস্পরের নির্ভরতা খুঁজবে দু’জন।

ঝড় চলছে। উদ্দাম, মাতাল বাতাসের সঙ্গে বইছে লক্ষ লক্ষ টন বালি। শুধু বাতাসের তীব্র ধাক্কা, শোঁ শোঁ গর্জন শোনা যাচ্ছে; কানে তালা লেগে যাওয়ার দশা হলো কিছুক্ষণের মধ্যে। এমনকী নিজেদের কথাবার্তাও শুনতে পাচ্ছে না ওরা। মাতাল বাতাসে শুধু বালিই নয়, বড়সড় নুড়িপাথরও গড়াচ্ছে, ছুটে এসে আছড়ে পড়ছে, পাথরে পাথরে সংঘর্ষের, শব্দ ভীতিকর শোনাচ্ছে কানে। চোখে আর কানে জমে গেল বালির পুরু স্তর, গলার গভীরে ঢুকে শ্বাসরোধ করছে। বাতাস ক্রমে ঠাণ্ডা হয়ে আসছে, শীতে ঠকঠক করে কাঁপছে সবাই; তুষারপাতের সময়ও এত তীব্র ঠাণ্ডা পড়ে না। প্রতিবার নিঃশ্বাসের সময় খাবি খাচ্ছে ওরা, একইসঙ্গে গলায় বালি যাতে ঢুকতে না পারে সেই চেষ্টা করছে। বেঁচে থাকার জন্য প্রতি মুহূর্তে সগ্রাম করতে হচ্ছে

সময়জ্ঞান হারিয়ে ফেলল ওরা। ডুবন্ত মানুষের মত পরস্পরকে আঁকড়ে ধরে থাকল। শঙ্কিত, সন্ত্রস্ত এবং অসহায়। ঝড়ের তীব্রতা এত বেড়ে গেছে যে, পায়ের নীচে রীতিমত কাঁপছে মাটি, কিন্তু তারপরও কেউ কাউকে ছাড়ল না ওরা। অনেক, অনেকক্ষণ পরে, ঠিক কখন কেউ নিশ্চিত বলতে পারবে না, যখন মন, স্নায়ু এবং শরীর ক্লান্ত হয়ে পড়েছে, আর কোন ধকূল সামাল দেওয়ার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে, নিজেদের অজান্তে ঘুমিয়ে পড়ল ওরা।

*

হঠাৎ সজাগ হলো এরিক ক্ৰেবেট, ঠাণ্ডায় হাড় পর্যন্ত শীতল হয়ে গেছে, কাছাকাছি ক্ষীণ নড়াচড়ার শব্দ কানে এল ওর। কম্বল সরিয়ে তাকাল ও, আবিষ্কার করল বালির পুরু স্তরের ভিতর প্রায় অর্ধেকটা চাপা পড়ে গেছে ওরা। বালির পাহাড় সরিয়ে আড়ষ্ট দেহে উঠে দাঁড়াল। প্রথমেই হাত-পা ঝেড়ে আড়মোড়া ভাঙল, দেখল একটু দূরে ঘোড়ার পিঠে স্যাডল পরাচ্ছে টনি চিড়ল।

আধ-পোড়া কাঠ যেখানে রেখেছিল, জায়গাটায় এসে হাত চালিয়ে বালি খুঁড়তে শুরু করল এরিক। কোথাও যাচ্ছ? পিমা ইন্ডিয়ানের উদ্দেশে জানতে চাইল।

চলে যাওয়াই উচিত মনে করছি, মৃদু স্বরে বলল সে। সাদা মানুষদের আসতে দেরি নেই। ঘোড়ার লাগামটা পেঁচিয়ে হাতে নিল পিমা ইন্ডিয়ান। এরা হয়তো ইয়োমা থেকে আসছে।

বেশ, টনি, পকেট থেকে এক মুঠো ঘাস বের করল এরিক; গতরাতে এক ফাঁকে তুলে নিয়ে রেখে দিয়েছিল নিজের পকেটে। কাঠের নীচে ঘাস রেখে দেয়াশলাইয়ের কাঠি জ্বালানোর চেষ্টা করল, আড়ষ্ট হাতে অসুবিধা হচ্ছে, তবে শেষপর্যন্ত সফল হলো। প্রথমে ঘাসে আগুন জ্বলল, তারপর কাঠে ছড়িয়ে পড়ল।  

সহসা টনি চিডলের কথার তাৎপর্য উপলব্ধি করতে সক্ষম হলো ও। সাদা মানুষ আসছে?

নড করল সে। অনেক দূরে আছে অবশ্য, এখানে পৌঁছতে বিশ ত্রিশ মিনিট লাগবে। পাথরের উপর থেকে দেখেছি ওদের।

থেমে গেল পিমা ইন্ডিয়ান, দেখে মনে হলো মনে মনে জুৎসই শব্দ হাতড়াচ্ছে; শেষে অর্থপূর্ণ দৃষ্টিতে তাকাল জড়সড় হয়ে পড়ে থাকা বেন ডেভিসের কাঠামোর দিকে। সোনাগুলো উধাও হয়ে গেছে, মৃদু স্বরে জানাল সে।

সম্ভবত বালির নীচে চাপা পড়েছে।

উহুঁ।

তথ্যটা মনে মনে বিবেচনা করল এরিক। একেবারে নিথর পড়ে আছে ডেভিস। পড়ে থাকলেও শুনতে পাচ্ছে নিশ্চই? কিছু যায়-আসে না আমার, শেষে বলল ও। তুমি চাও নাকি ওগুলো?

বরাবরের মতই নির্বিকার দেখাল ইন্ডিয়ানকে। উঁহু। একটা ঘোড়া, বন্দুক এবং প্রায় বারো ডলার আছে আমার। চাইলেই মদ খেয়ে মাতাল হতে পারব। সোনার মালিক হলে কেবলই ছোটার মধ্যে থাকতে হয়। কিন্তু সারাক্ষণ কি ছোটা যায়? একসময় অন্য কেউ তাকে ঠিকই ধরে ফেলবে। স্যাডলে চাপল সে, ক্ষণিকের দ্বিধার পর বলল: তুমি খুব ভালমানুষ, ক্ৰেবেট।

অ্যারোয়োর ঢাল ধরে উঠে গেল সে, একটু পর হারিয়ে গেল অবয়বটা। কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থাকল এরিক, শেষে হাঁটু গেড়ে বসে আগুন নেড়েচেড়ে দিল। ফের যখন চারপাশে তাকাল, দেখল অন্যরা নড়েচড়ে উঠেছে। কম্বল ছেড়ে উঠছে বালির বিছানা থেকে। চুল ঝেড়ে ওঅটর হোলের কাছে চলে গেল মেলানি, একটা একটা করে তিনটা কূপই দেখল। শেষে দৌড়ে ফিরে এল।

এরিক! কূপে এক ফোঁটা পানিও নেই! বালি সব পানি শুষে নিয়েছে, প্রতিটা কূপই বালিতে ভরা!

জানতাম এটাই হবে। সেজন্যই ক্যান্টিনগুলো ভরে রেখেছি। ঝড়ে বাতাস আর বালি এত শুকনো ছিল যে সমস্ত পানি শুষে নিয়েছে।

কম্বল ভাঁজ করে স্যাডল তুলে নিল বেন ডেভিস। তার দিকে তাকাল মেলানি, শেষে এরিকের দিকে ফিরল। কিন্তু কিছুই বলল না এরিক।

একটা ঘোড়ায় স্যাডল চাপাল ডেভিস।

নিজেদের মামুলি জিনিসপত্র গোছাচ্ছে মিমি আর ড্যান।

আগুনের পাশে দাঁড়িয়ে থাকল মেলানি, উষ্ণতা ভাল লাগছে। কিছুটা দূরে অপেক্ষায় আছে এরিক, আগুনের শিখার উপর দু’হাত ছড়িয়ে দিয়েছে।

স্যাডল বাধা শেষ করে ওদের দিকে ফিরল ডেভিস।

কিছু বলছ না যে, ক্ৰেবেট? তুমি জানো যে সব সোনা আমার কাছে আছে। একটা কিছু বলো!

চোখ তুলে তাকাল, এরিক। নিকট ভবিষ্যৎ স্পষ্ট আঁচ করতে পারছে, অনিবার্য শোডাউন এড়ানো যাবে না আর। তবে একটা ব্যাপারে সন্তুষ্ট ও, লাইন অভ ফায়ারের বাইরে আছে মেলানি, কিন্তু আরও দূরে থাকলেই ভাল হত। পাথুরে দেয়ালের কাছাকাছি রয়েছে। ড্যান আর মিমি, ওদের ব্যাপারে দুশ্চিন্তা না করলেও চলবে।

কিছুই বলার নেই, ডেভিস, মৃদু, শান্ত স্বরে বলল ও। কারণ ওগুলো কার হাতে পড়ল, তাতে পরোয়া করি না আমি।

পরোয়া করো না তুমি?

কেন করব? ওগুলো কি আমার সম্পত্তি? এমনকী চাইও না। কী জানো, তোমারও কাজে আসবে না ওগুলো। একটু ঠাণ্ডা মাথায় ভাবলে তুমিও কারণটা বুঝতে পারবে।

কী বলতে চাও?

হয়তো ওগুলোকে কাজে লাগিয়ে মুনাফা করার বুদ্ধি এঁটেছ, তবে আসলে কোন কাজে আসবে না। জুয়া খেলেই শেষ করে ফেলবে সব। কিছু জিতবে, কিছু হারবে, কিন্তু শেষপর্যন্ত একেবারে ফতুর হয়ে যাবে।

বেন ডেভিসের সমস্ত উৎসাহে ভাটা পড়ল। হঠাৎ উপলব্ধি করল। একটুও ভুল বলেনি এরিক ক্ৰেবেট। জুয়া খেলেই সব সোনা, হারাবে সে, মেলানিকে বিয়ে করতে পারুক বা না-পারুক, কিন্তু জুয়াই শেষ করে দেবে একে-সব সোনা হারিয়ে বসবে পোকার খেলতে গিয়ে। তিক্ত উপলব্ধিটা বিষিয়ে তুলল ওর মন, ক্রেবেটের প্রতি তীব্র ঘৃণা অনুভব করল। এই লোকটা, উদ্ধত এই লোকটা ওর মুখোশ খুলে দিয়েছে।

অনুমানে ভুল করেছ, ক্ৰেবেট, চেষ্টাকৃত অনুত্তেজিত কণ্ঠে বলল সে, কণ্ঠটা অদ্ভুত শোনাল। আসলে প্রায় সবকিছুতেই ভুল অনুমান করেছ তুমি। ভেবেছ মেলানির সঙ্গে এখান থেকে বেরিয়ে যাবে। ভুল! মিথ্যে স্বপ্ন দেখেছ! এখান থেকে কেউ যদি জীবিত বেরিয়ে যেতে পারে, তো সেই লোক হচ্ছে আমি!

ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়িয়েছে ড্যান কোয়ান, ক্ষীণ শব্দ শুনতে পেয়ে বুঝতে পারল এরিক। আশা করল ওদের ব্যাপারে নাক গলাবে না ছেলেটা।

পিস্তল, খোঁজাখুঁজি করে লাভ হবে না, কিড, ড্যান কোয়ানের উদ্দেশে বলল বেন। কাল রাতে ঝড়ের সময় তুমি যখন ঘুমিয়ে ছিলে, ওটা নিয়ে নিয়েছি আমি। তোমারটাও নিতাম, ক্ৰেবেট, কিন্তু একটা, কারণে নিইনি-শুধু তোমাকেই খুন করতে চাই আমি।

বেন! এসব কী বলছ তুমি? মেলানির কণ্ঠে তীক্ষ্ণ বিদ্রূপ। শুধু এরিককে খুন করতে চাও, এর মানে কী? সোনা চাও তুমি, বেশ, নিয়ে যাও। ওগুলো কেউই চাই না আমরা।

কিন্তু ওগুলো নিয়ে নিরাপদে কত দূর যেতে পারব আমি? ঠাণ্ডা মাথায় সবকিছু ভেবে দেখেছি। এ-ব্যাপারে মুখ বুজে থাকবে ইন্ডিয়ানটা, কারণ বরাবরই তাই করে ওরা। তোমাদের নিয়ে যত দুশ্চিন্তা। সেক্ষেত্রে, তোমরা যাতে মুখ খুলতে না পারো, নিশ্চিত করতে চাই আমি।

এরিকের দিকে তাকাল বেন। অনেক অপেক্ষার পর সময়টা এল। এবার আর আমাদের মধ্যে বাগড়া দিতে পারবে না কেউ। লেনদেন চুকিয়ে ফেলব আমরা, একেবারে সুদাসলে। অন্য কারও কাছেই পিস্তল বা রাইফেল নেই এখন, শুধু তুমি আর আমি।

বুক টানটান করে স্থির দাঁড়িয়ে আছে এরিক ক্ৰেবেট। পা জোড়া একটু ফাঁক হয়ে আছে, নির্বিকার মুখে অপেক্ষা করছে। সামান্য দুশ্চিন্তা বা উদ্বেগও দেখা গেল না ওর চোখের গভীরে। একটা কথা না বলে পারছি না, ডেভিস, যা করতে চাইছ, আর সবকিছুর মত এখানেও তুমি একজন টিনহর্ন। নেহাত আনাড়ি।

কিন্তু আত্মবিশ্বাসে, টগবগ করছে ডেভিস, নিজের বিজয় সম্পর্কে নিশ্চিত। আমি পিস্তল ড্র করলে কী করবে, ক্ৰেবেট?

তখনই দূরাগত খুরের শব্দ কানে এল ওদের। পরপরই চড়া একটা কণ্ঠ শুনতে পেল, দূর থেকে ডাকছে কাউকে।

বিদ্যুৎ খেলে গেল বেন ডেভিসের হাতে, পিস্তলের দিকে হাত বাড়াল সে। কিন্তু ঠায় দাঁড়িয়ে থাকল এরিক, সামান্যও নড়ল না, শুধু ডান হাতটাই নড়ল। একটা পিস্তল হোলস্টার ছাড়িয়ে নিশানা করার পর গুলি খেল ডেভিস।

চোখের পলকে গুলি করেছে এরিক। এত দ্রুত উঠে এসেছে পিস্তল, দৃষ্টি দিয়ে কেউই অনুসরণ করতে পারল না; ক্ষণিক আগেও হোলস্টারে ছিল পিস্তলটা, ওর হাত ছিল হোলস্টার থেকে অন্তত কয়েক ইঞ্চি দূরে। আগে ডেভিসই পিস্তলে হাত বাড়িয়েছে, কিন্তু তারপরও খুবই শ্লথ মনে হলো তাকে। এরিকের গুলিতে আধ-পাক ঘুরে গেল জুয়াড়ীর দেহ, দ্বিতীয় গুলিতে ফুটো হয়ে গেল ফুসফুস, ওপাশ দিয়ে বেরিয়ে গেল। শিথিল মুঠি থেকে পিস্তলটা ছেড়ে দিল ডেভিস, বালিতে খসে পড়ল, তারপর সে নিজেও মুখ থুবড়ে পড়ল বালির উপর। উঠে দাঁড়ানোর প্রয়াস পেল সে, মনে হলো যেন খিঁচুনি উঠেছে, শেষে পড়ে গিয়ে চিৎ হয়ে গেল দেহটা।

তুমি…তুমি আমাকে হারিয়ে দিয়েছ, ক্ৰেবেট! হারিয়ে দিয়েছ আমাকে?

দৃষ্টি নামিয়ে তার দিকে তাকাল এরিক। দুঃখিত, ডেভিস। নিজের মুরোদ বোঝা উচিত ছিল তোমার। ষোলো বছর থেকে এই কাজটা করছি আমি।

আরও কিছু বলার চেষ্টা করল বেন ডেভিস, কিন্তু শক্তি নিঃশেষ হয়ে গেছে, শেষবারের মত বার দুয়েক কেঁপে উঠল তার দেহ, তারপর একেবারে নিথর হয়ে গেল।

ট্রেইল ধরে ছুটে এল বেশ কয়েকজন রাইডার, ধুলো উড়িয়ে ওদের চারপাশে থামল তারা। মুখ তুলে তাকাল এরিক ক্ৰেবেট, সামনে তেজী একটা গেল্ডিং-এর স্যাডলে আসীন বিশালদেহী ধূসর চুলের মানুষটাকে দেখেই বুঝে ফেলল এই লোক জিম রিওস না হয়েই যায় না।

কে তুমি? কর্কশ, নির্দেশের সুরে জানতে চাইল সে।

আমি এরিক ক্ৰেবেট, সংক্ষেপে জানাল ও। তোমার মেয়ের হবু জামাই।

কঠিন চাহনিতে ওকে মাপল রিওস। বেশ, এবার ঘোড়ায় চড়ো। এখান থেকে চলে যাচ্ছি আমরা। ঘাড় ফিরিয়ে মেলানির দিকে তাকাল জিম রিওস। তুমি ঠিক আছ?

হ্যাঁ। বাবা, বাড়ি ফিরে যেতে চাই আমি।

মাথা নেড়ে এরিকের দিকে ইশারা করল রিওস। একেই তোমার পছন্দ?

হ্যাঁ।

বেশ চালাক হয়েছ দেখছি, গম্ভীর মুখে বলল জিম রিওস। এবার ভ্যান কোয়েনের দিকে ফিরল সে। গরু দাবড়াতে জানো তুমি?

নিশ্চই।

একটা কাজ পেয়ে গেছ।

সব ঘোড়া যখন চলে গেল, ঝিরঝিরে বাতাস বয়ে গেল জায়গাটায়, খোলা জায়গা থেকে বালি খেদিয়ে নিয়ে গেল। বালি সরে যাওয়ায় নীচে চাপা পড়ে যাওয়া তীরের একটা মাথা উন্মুক্ত হলো। হয়তো হাজার বছর পুরানো ওটা। আবার বাতাস বইল, বালি সরে যাচ্ছে দূরে। ব্যস, আর কোন নড়াচড়া নেই।

বৃষ্টি হলে আবারও পরিপূর্ণ হয়ে উঠবে পাপাগো ওয়েলসের কূপগুলো। বহু মানুষ আসবে এখানে, কেউ বেঁচে থাকতে সক্ষম হবে, কেউ কেউ হয়তো মারা পড়বে। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় একই থেকে যাবে-কূপগুলো, পরিবর্তনের ছোঁয়া ওগুলোকে স্পর্শ করবে না কখনও।

আবারও বাতাস বইল, কাছাকাছি মেস্কিট ঝোপের আড়ালে ডেকে উঠল নিঃসঙ্গ একটা কোয়েল।

***

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *