১৬. ঘরের ভেতর খাবারের চমৎকার গন্ধ

ঘরের ভেতর খাবারের চমৎকার গন্ধ, বিশেষ করে পনির আর টোম্যাটো সস। অন্য সময় হলে অবশ্যই ভাল লাগত কিশোরের, এখন লাগছে না। লিভিং রুমে বসে মিসেস নিকারোর স্বপ্ন বিবরণ শুনছে।

একঘেয়ে কণ্ঠে বলেই চলেছে মহিলা।

ভুরু কোঁচকাল কিলোর। বাধা দিয়ে বলল, আপনার স্বপ্ন কি সব সময়ই সত্যি হয়?

না, বেশির ভাগই সাধারণ স্বপ্ন, পুরানো স্মৃতি। তবে কিছু আছে ভিন্ন। হয়ত এমন কাউকে দেখলাম, যাকে জীবনেও দেখিনি। জেগে উঠে কোথাও না কোথাও দেখা হয়ে যায় তার সঙ্গে। দুঃস্বপ্ন…।

বেশি দেখেন?

না না, হাসল মিসেস নিকারো। ভাল স্বপ্নও দেখি। একদিন দেখলাম সুন্দর লাল চুলওয়ালা একটা মেয়ে। পরে তাকেই বিয়ে করে আনল আমার ছেলে। এলসির কথা বলছি…।

পারিবারিক ইতিহাসে ঢুকে যাচ্ছে মহিলা, বুঝতে পেরে তাড়াতাড়ি আগের প্রসঙ্গে ফিরে এল কিশোর, বিলের কথা বললেন। আপনার আত্মীয়?

না। তবে ছেলেটা ভালই। ওই যে, রাস্তার ধারের পুরানো, কটেজটায় থাকে। ওর দুই বন্ধুও থাকে, ওরা দক্ষিণ আমেরিকার লোক। ওর বেশিরভাগ বন্ধুই ওই দেশের। আসে, বেকার থাকে যতদিন ওর সঙ্গেই থাকে, চাকরি-টাকরি পেলে চলে যায়। আমার মনে হয় বিলের বাবা ছিল সাউথ আমেরিকান। সেই সূত্র ধরেই চলে আসে দেশের লোক। আর উদ্দেশ্য ছাড়া কেউ আসে না, ভ্রূকুটি করল মহিলা। এই যেমন তুমি। মানিব্যাগ খুঁজতে আসনি তখন, তাই না? তোমার বন্ধু ও মাছধরা দেখতে আসেনি, নজর রাখতে এসেছিল। সোজা কথা, স্পাইগিরি, ঠিক না? আর বিল? কিছু একটা করতে যাচ্ছে সে, যা আমরা জানি না। কিছু একটা গোপন করছে, আমার আর এলসির কাছে।

কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে, সেটা আমিও বুঝতে পারছি, বলল কিশোর। কিন্তু কি ঘটবে, জানি না। আচ্ছা, মিসেস নিকারো, একটা অন্ধ লোককে স্বপ্ন দেখেছেন বলেছেন। তারপর কি বাস্তবেও দেখেছেন ওকে?

না।

কিন্তু রবিন দেখেছে। আমিও।

পকেট থেকে তিন গোয়েন্দার একটা কার্ড বের করে দিল কিশোর। ওকে দেখলে দয়া করে এই নাম্বারে একটা ফোন করবেন? আমি না থাকলেও যে-ই থাকুক, শুধু মেসেজটা দিয়ে দেবেন।

দেব।

আপনার ফোনটা ব্যবহার করতে পারি?

হলরুমের দিকে ইঙ্গিত করল মহিলা। উঠে গিয়ে হেডকোয়ার্টারে ফোন করল কিশোর। রিসিভার তুলেই মুসা বলল, কিশোর, রবিন ফোন করেছিল। তুমি বেরোনোর পর পরই। অক্সনার্ডে গেছে। নতুন আরেকটা নাম বলল, মাইস। রবিনের বিশ্বাস, ওই লোকটাও এই রহস্যের সঙ্গে জড়িত। বিকেলেই আবার ফোন করবে বলেছে।

সাইকেল ফেলে গেছে। আমি তো ভয় পাচ্ছিলাম, কোন বিপদে না পড়ল।

না। ভালই আছে। তুমি কোত্থেকে?

মিসেস নিকারোর ঘর থেকে। কিছুক্ষণ পরে আসব। লাইন কেটে দিল কিশোর। পাশে এসে দাঁড়িয়েছে মহিলা। বলল, তোমার বন্ধু তাহলে ভালই আছে?

কিশোর হাসল। হ্যাঁ। অক্সনার্ড থেকে ফোন করেছিল। একটা কাজে গেছে ওখানে।

ভাল। যাক, শুনে স্বস্তি পেলাম। নিশ্চিন্তে এখন মেহমানদারি করতে যেতে পারি। তোমারও নিশ্চয় কাজ আছে। সাবধানে থাকবে।

থাকবে, কথা দিয়ে বেরিয়ে এল কিশোর। চলল বিলের কটেজের দিকে।

বসে অপেক্ষা করার উপযাগী ভাল একটা জায়গা পছন্দ করল সে। আরাম করে বসল, হাতে ক্যামেরা। এক ঘন্টা পেরিয়ে যাওয়ার পর এল পুরানেট্রাকটা। রাস্তার পাশে নামিয়ে দিল বিলের এক বন্ধুকে।

ক্যামেরা তুলল কিশোর। ক্লিক করে উঠল শাটার। লোকটা কটেজে ঢুকতে ঢুকতে তার মোট ছয়টা ছবি তুলে ফেলল সে।। আবার অপেক্ষার পালা। সাগরের দিকে চেয়ে টিনাকে আসতে দেখে হাসি ফুটল মুখে। ডকে পৌঁছল বোট। বাঁধা হল ওটাকে। দুজন নামল। বিল আর এলসি। বিলের জন্যে ভাবনা নেই, এক সময় না একসময় সামনে দিয়ে যেতেই হবে তাকে, কটেজে ঢুকতে হলে। তার দ্বিতীয় বন্ধুর ছবি তোলাটা এখন জরুরি।

কাটছে অপেক্ষার দীর্ঘ মুহূর্তগুলো। সৈকত আর সাগরের ওপর উড়ছে সীগাল, মাঝেমাঝে ডাইভ দিয়ে পড়ছে পানিতে, ঠোঁটে মাছ চেপে ধরে উড়াল দিচ্ছে, উড়তে উড়তেই গিলে নিচ্ছে মাছটা। বাঁ দিকে নিকারোদের ড্রাইভওয়ে, একআধটা গাড়ি এসে ঢুকছে, কিছুক্ষণ থাকছে, আবার চলে যাচ্ছে। বাড়িটার জন্যে অফিস চোখে পড়ছে না কিশোরের, তবে এলসি ভেতরেই রয়েছে তাতে কোন সন্দেহ নেই। বিলও নিশ্চয় অফিসেই।

ডানে সৈকতের দিকে চোখ ফেরাল কিশোর। পানির কিনারে ছিপ হাতে ব্যস্ত সৌখিন মাছশিকারিরা। হাতে একটা মেটাল ডিটেক্টর নিয়ে সৈকত ধরে হাঁটছে একজন লোক। সাফাররা বসে আছে ভাল ঢেউয়ের আশায়। দিগন্তে দানা বাঁধছে মেঘ, ইতিমধ্যেই ঠাণ্ডা হয়ে পড়েছে বাতাস। সকালটা ছিল সুন্দর, দিনটাও ভালই গেছে, শেষ হবে ঝড়বাদলের মধ্যে দিয়ে বোঝা যায়।

কটেজ থেকে বেরিয়ে, রাস্তা পেরিয়ে জেটির দিকে এগোল বিলের বন্ধু।

ঘড়ি দেখল কিশোর। প্রায় তিনটে। সকালেই রবিন দেখেছে তৃতীয় লোকটাকে। গেল কোথায়?

নিকারোদের বাড়ির দিকে তাকাল কিশোর। হঠাৎ মনে পড়ল, একটা স্টেশন ওয়াগন দেখেছিল ওখানে। এখন নেই। গেল কখন? পাখি, মেঘ, ঢেউ আর বাতাস যেন সম্মােহিত করে রেখেছিল তাকে, গাড়িটাকে যেতেও দেখেনি, ইঞ্জিনের শব্দও শোনেনি।

উঠল সে। হাঁটতে শুরু করল রাস্তা ধরে। ড্রাইভওয়ের উল্টো দিকে এসেই দেখতে পেল অফিসে নেই এলসি। মিসেস নিকারোর চেয়ারে বসে ডেস্কে পা তুলে দিয়ে আয়েশ করছে বিল। সিগারেট টানছে, ধোঁয়া ছাড়ছে ছাতের দিকে। ডেস্কের ওপর আসন-পিড়ি হয়ে বসেছে তার বন্ধু। ভাবসাব দেখে মনে হয় গল্প শোনাচ্ছে বিলকে। মাঝে মাঝে হাত নেড়ে কিছু বোঝানোর চেষ্টা করছে।

কিন্তু এলসি গেল কোথায়? বাড়িতে, শাশুড়ির সঙ্গে রয়েছে? বিল আর তার বন্ধুকে এখন ওই অবস্থায় দেখলে কি করবে মেয়েটা, ভেবে হাসি পেল কিশোরের।

ভালমত খেয়াল করতে বাড়িটাও শূন্য মনে হল। জানালার পাল্লাগুলো বন্ধ, পর্দা টানা। এই সময় ড্রাইভওয়েতে ঢুকল একটা গাড়ি, বাড়ির সামনে গিয়ে থামল। গাড়ি থেকে নামল সাদা-চুল এক বৃদ্ধা, বোধহয় মিসেস নিকারোর মেহমান, হাতে একটা প্যাকেট। দরজায় গিয়ে বেল বাজাল। কেউ বেরোল না। মিনিটখানেক দাঁড়িয়ে থেকে আবার বেল বাজাল বৃদ্ধা। সাড়া না পেয়ে চলল অফিসের দিকে।

দেখতে পেয়েছে বিল। উঠে দাঁড়াল। তার বন্ধু আগের মতই বসে রয়েছে।

বিলের সঙ্গে কি কথা হল বৃদ্ধার। তারপর একটুকরো কাগজে কিছু লিখে ভঁজ করে দিল বিলের হাতে। ফিরে এল গাড়ির কাছে। রেগেছে খুব।

গাড়িটা চলে গেলে আবার চেয়ারে বসল বিল। ভাঁজ করা কাগজটা দলেমুচড়ে ফেলে দিল ময়লা ফেলার ঝুড়িতে।

হেসে উঠল তার বন্ধু।

এবার সতর্ক হল কিশোর। ঘুরে হাঁটতে শুরু করল উল্টো দিকে। চলে এল এমন একটা জায়গায়, যেখান থেকে বাড়িটার জন্যে অফিস দেখা যায় না। তারমানে অফিস থেকে এখন কেউ দেখতে পাবে না তাকে। রাস্তা পেরিয়ে দ্রুত বাড়িটার দিকে এগোল সে।

রান্নাঘরের দরজার পাশে একটা জানালা, ছিটকানি খোলা। টান দিতেই পাল্লা খুলে গেল। ভেতরে হাত ঢুকিয়ে দরজার নব নাগাল পাওয়া গেল, মোচড় দিতেই কট করে খুলে গেল তালা। ঘরে ঢুকে আস্তে লাগিয়ে দিল পাল্লাটা, তালা খোলাই রাখল। তাড়াহুড়ো করে বেরোনোর দরকার হতে পারে।

রান্নাঘরের ভেতরটা প্রমোট। খাবারের গন্ধে বাতাস ভারি। স্টোভে বসানো পাত্রে সুপ তৈরি হচ্ছে। গরম রোস্ট ঠাণ্ডা হয়নি এখনও। সালাদের সজি কেটে রাখা হয়েছে।

নিঃশব্দে ডাইনিং রুমে চলে এল কিশোর। টেবিলে বাসনপেয়ালা সাজানো, তিনজনের জন্যে। পর্দা টেনে দেয়ায় ঘরের ভেতর আবছা অন্ধকার। লিভিং রুমেও একই অবস্থা। বাতাসে খাবারের গন্ধের পাশাপাশি ঝাঁঝালো আরেকটা গন্ধ। কিছুক্ষণ আগে এই গন্ধ ছিল না, সে যখন কথা বলছিল মিসেস নিকারোর সঙ্গে। একটা সিগারেটের পোড়া টুকরো চোখে পড়ল, পা দিয়ে পিষে নেভানো হয়েছে।

সিঁড়ির গোড়ায় এসে দাঁড়াল কিশোর। আস্তে ডাকল। জবাব নেই। গলা আরেকটু চড়িয়ে ডাকল, মিসেস নিকারো? আছেন? আমি, কিশোর।

সাড়া নেই। সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠে এল কিশোর।

বেডরুমের জানালার খড়খড়ি ভোলা। আলো আসছে। বড় বড় কাঠের আসবাব এঘরে। একটা দেরাজ বোঝাই ছবি। হলরুমে ঢুকল সে। এঘরের আসবাবগুলো সাদা দেয়ালে টাঙানো রঙিন ফটোগ্রাফ। ঘরটায় খোঁজাখুজি করছে কিশোর, এই সময় বাজল টেলিফোন। রীতিমত চমকে উঠল সে। ফোনটা একটা টেবিলে রাখা। জানালা দিয়ে উঁকি দিল অফিসের দিকে।

অফিসের সেটটার দিকে তাকিয়ে আছে বিল। দ্বিধা করছে মনে হয়।

আবার রিঙ হল।

রিসিভার তুলল বিল। সঙ্গে সঙ্গে থেমে গেল বেডরুমের ফোনের রিঙ। হাসল কিশোর। এটা অফিসের ফোনের এক্সটেনশন। আস্তে রিসিভার তুলে কানে ঠেকাল সে।

সি, বলল বিল।

স্প্যানিশ ভাষা। কিছু কিছু বোঝে কিশোর। রিসিভার জোরে কানে চেপে ধরে যতটা সম্ভব বোঝার চেষ্টা করছে।

ওপাশের লোকটা নিজের নাম বলল জিনো। বলল, মাইসের সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছে। টাকার কথা কি যেন বলল। নিকারোর নাম বলল, তারপর বলল কিশোরের নাম! মনে করিয়ে দিল, রোজারের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিল কিশোর পাশা, সেখানে মিসেস নিকারো আর অন্ধ লোকটার কথা আলোচনা করেছে। বিলকে হুঁশিয়ার থাকতে বলল। বিল জবাব দিল, থাকবে। জানাল, সে আর পেক সব নিয়ন্ত্রণে নিয়ে এসেছে। পেক বোধহয় অফিসে বসা লোকটার নাম, আন্দাজ করল কিশোর। আরও কয়েকটা কথা বলে লাইন কেটে দিল জিনো।

রিসিভার রেখে আবার জানালা দিয়ে উঁকি দিল কিশোর। অফিসের বাইরে। বেরোল বিল। সৈকতে চোখ বোলাল একবার। তারপর ফিরে চেয়ে ডাকল বন্ধুকে।

সে বেরোল, ইশারায় কটেজটা দেখাল।

কটেজের দিকে হাঁটতে শুরু করল পেক।

নিকারোদের বাড়ির দিকে ফিরল বিল। কৌতূহলী হয়ে উঠেছে যেন হঠাৎ করেই। পায়ে পায়ে রওনা হল এদিকে।.

চট করে সরে এল কিশোর। নিশ্চয় রিসিভার রাখার শব্দ পেয়েছে বিল। নইলে সন্দেহ হল কেন?

সিঁড়িতে উঠে থামল পায়ের শব্দ। তালায় চাবি ঢোকানো হল। পৌঁছে গেছে বিল। যে-কোন মুহূর্তে উঠে আসবে ওপরে। নিচে নামার আর সময় নেই। ধরা পড়ে যাবে কিশোর, তারপর…।

তারপর-কি?

বেডরুমের লাগোয়া বাথরুম আছে। টিপ টিপ করে পানি পড়ার শব্দ আসছে ভেতর থেকে।

সামনের দরজা খোলার মৃদু আওয়াজ হল।

তিন লাফে ঘর পেরিয়ে আরেক ঘরে চলে এল কিশোর। বাথরুমে ঢুকে শাওয়ার ছেড়ে দিল। ফিরে এল বেডরুমে। খাটের নিচে ক্যামেরাটা লুকিয়ে রেখে নিজে এসে লুকাল দরজার আড়ালে।

দুপদাপ করে সিঁড়ি বেয়ে উঠল বিল। হ্যাঁচকা টান দিয়ে খুলল বেডরুমের দরজা। দাঁড়িয়ে রইল এক মুহূর্ত, বাথরুমের দিকে চেয়ে। তারপর এগিয়ে গেল সেদিকে।

মুহূর্ত সময় নষ্ট করল না কিশোর। দরজার আড়াল থেকে বেরিয়েই দিল দৌড়। সিঁড়ি বেয়ে নামার সময় শুনল বিলের চিৎকার। ফিরেও তাকাল না। নিচে নেমে, রান্নাঘরের দরজা খুলেই একলাফে একেবারে বাইরে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *