১৫. হেসে খেলে কেটে গেল সারাটা দিন

হেসে খেলে কেটে গেল সারাটা দিন।

পশ্চিম দিগন্তে নেমে যাচ্ছে সূর্য। ডুবে গেল এক সময়। আকাশের লালিমা ঢেকে দিল এক টুকরো কালো মেঘ। শঙ্কা ফুটল জিনার চেহারায়।

ও কিছু না, সরে যাবে, আশ্বস্ত করল কিশোর।

ভেলা লুকিয়ে রেখে পাড়ে নামল ওরা। আস্তানায় ফেরার পথে চট করে একবার বোটহাউসে ঢুকে এক বাণ্ডিল দড়ি বের করে আনল মুসা।

ঠিকই অনুমান করেছে কিশোর, বৃষ্টি এল না। ঘণ্টাখানেক বাদেই পাতলা হয়ে গেল মেঘ, তারা দেখা দিল। পরিষ্কার আকাশ।

সিঁড়িমুখের কাছে রাফিয়ানকে পাহারায় রেখে অন্ধকার ভাঁড়ারে নামল ওরা। গোটা দুই মোম জ্বালল কিশোর।

না, কেউ ঢোকেনি ঘরে।

খাবার বের করে তাড়াতাড়ি খেয়ে নিল ওরা।

শুয়ে পড়ো সবাই, বলল কিশোর। দশটা এগারোটার দিকে বেরোতে হবে।

একটা অ্যালার্ম-কুক থাকলে ভাল হত, বলল মুসা। রবিন ঠিকই বলেছিল।

আমার ঘুম আসবে না, রবিন বলল। ঠিক আছে, জেগে থাকি, সময়মত তুলে দেব তোমাদের।

ঘুম না আসুক, শুয়ে থাকো, বলল কিশোর। বিশ্রাম হবে।

শোয়ার সঙ্গে সঙ্গে ঘুমিয়ে পড়ল কিশোর আর মুসা।.জিনার দেরি হলো।

চিত হয়ে শুয়ে আকাশ-পাতাল ভাবছে রবিন। পাতালকক্ষে বাতাস ঢুকতে পারছে না ঠিকমত, তবু যা আসছে সিঁড়িমুখ দিয়ে, তাতেই কাঁপছে মোমের শিখা, ঘরের দেয়ালে ছায়ার নাচন। সত্যি, তাদের এই অভিযানের তুলনা হয় না। আর সে দেখেছে, যতবারই জিনা সঙ্গে থাকে, অ্যাডভেঞ্চার যেন মাত্রা ছাড়িয়ে যায়। তার মনে পড়ল সেই প্রেতসাধকের কথা, সাগর সৈকতে গুপ্তধন উদ্ধারের রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতার কথা, মৃত্যুখনির সেই বুক-কাঁপানো মৃত্যুহা…আর এবারকার অভিযানটাই বা কম কি? এক কাজ করবে-ভাবল সে, রকি বীচে ফিরেই কিশোরকে পটিয়ে-পাটিয়ে জিনাকেও গোয়েন্দাদের একজন করে নেবার কথা বলবে। জানে, সহজে রাজি হবে না কিশোর। আদৌ রাজি হবে কিনা, তাতেও যথেষ্ট সন্দেহ আছে রবিনের, তবু বলে দেখবে। এখন আর অসুবিধে নেই। রকি বীচেই স্কুলে ভরতি হয়েছে জিনা, ইচ্ছে করলে চার গোয়েন্দা করা যায়…

এগোরোটা বাজার দশ মিনিট আগে সবাইকে তুলে দিল রবিন।

সারাদিন পরিশ্রমের পর এত আরামে ঘুমিয়েছিল, উঠতে কষ্ট হলো তিনজনেরই।

তৈরি হয়ে নিল।

বেরিয়ে এল বাইরে।

যেমন রেখে গিয়েছিল, তেমনি শুয়ে আছে রাফিয়ান, কিন্তু সতর্ক। সাড়া পেয়ে উঠে বসল।

আকাশে অনেকখানি উঠে এসেছে চাঁদ। উজ্জল জ্যোৎস্না। সারা আকাশ জুড়ে সাঁতার কাটছে ছোট-বড় মেঘের ভেলা। কখনও চাঁদ ঢেকে দিচ্ছে, আবছা অন্ধকারে ডুবে যাচ্ছে বনভূমি, চাঁদ বেরিয়ে এলেই হেসে উঠছে আবার হলুদ আলোয়।

তঁাবুর কাছে কাউকে দেখা যাচ্ছে না, উঁকিঝুঁকি দিয়ে দেখে বলল মুসা।

না যাক, কিশোর বলল। তবু সাবধানের মার নেই। কোন রকম শব্দ করবে। এসো যাই।

গাছপালা আর ঝোপের ছায়ার পাঁচ মিনিট হাঁটল ওরা হ্রদের পাড় ধরে। চাঁদের আলোয় চকচকে বিশাল এক আয়নার মত দেখাচ্ছে হ্রদটাকে। গুনগুন করে গান ধরল মুসা, জিনাও তার সঙ্গে গলা মেলাতে যাচ্ছিল, বেরসিকের মত বাধা দিয়ে বসল কিশোর। এই চুপ চুপ, গান গাওয়ার সময় নয় এটা। ব্যাটারা শুনলে…

ভেলায় চড়ল ওরা।

সবাই উত্তেজিত, রোমাঞ্চিত। সেটা সংক্রামিত হয়েছে রাফিয়ানের মাঝেও। চঞ্চল। কি করবে যেন বুঝে উঠতে পারছে না। রাতের এই অভিযান দারুণ লাগছে তার কাছে। আর কিছু করতে না পেরে এক এক করে গাল, হাত, চেটে দিতে লাগল সবার।

এক রত্তি বাতাস নেই। বড় বেশি নীরব। দাঁড়ের মৃদু ছপছপ শব্দও বেশি হয়ে কানে বাজছে। পানির ছোট ছোট ঢেউ আর বুদবুদ উঠে সরে যাচ্ছে ভেলার গা ঘেঁষে, রূপালি খুদে ফানুসের মত ফাটছে বুদবুদ্রগুলো।

এত সুন্দর রা খুব কমই দেখেছি, তীরের নীরব গাছপালার দিকে চেয়ে আছে রবিন। এত শান্তি। এত নীরব।

তাকে ব্যঙ্গ করার জন্যেই যেন কর্কশ চিৎকার করে উঠল একটা পেঁচা। চমকে গেল রবিন।

যাও, গেল তোমার নীরবতা, হাসতে হাসতে বলল মুসা।

রবিন ঠিকই বলেছে, কিশোর বলল, এত সুন্দর রাত আমিও কম দেখেছি। ইয়ার্ডে কাজ না থাকলে, এমনি জ্যোৎস্না রাতে ছাতে উঠে বসে থাকে রাশেদচাচা, অনেকদিন দেখেছি। আকাশের দিকে, চাদের দিকে চেয়ে চেয়ে কি যেন ভাবে। জিজ্ঞেস করেছিলাম একদিন। বিশ্বাস করবে? কেঁদে ফেলেছিল চাচা, দেশের কথা, তার ছেলেবেলার কথা বলতে বলতে। বাংলাদেশে নাকি এর চেয়েও সুন্দর চাঁদ ওঠে। ফসল কাটা শেষ হলে ধু-ধু করে নাকি ফসলের মাঠ, ধবধবে সাদা। শিশির ঝরে। চাঁদনি রাতে শেয়ালের মেলা বসে সেই মাঠে, বৈঠক বসে, চাচা নাকি দেখেছে। চাচা প্রায়ই বলে, কোনমতে ইয়ার্ডের ভারটা আমার কাধে গছাতে পারলেই চাচীকে নিয়ে দেশে চলে যাবে…

আরে, এই রাফি, আমার কান খেয়ে ফেলবি নাবি? বেরসিকের মত মুসার গান তখন থামিয়ে দিয়েছিল কিশোর, সেই শোধটা নিল যেন এখন।

ওই যে, বাক্সটা না? হাত তুলে বলল জিনা।

হ্যাঁ, বাক্সটাই মারকার। চাদের আলো চিকচিক করছে ওটার ভেজা পিঠে।

কাছে এসে ভেলা থামাল।

কাপড় খুলতে শুরু করল মুসা। জিনা সাঁতারের পোশাক পরে এসেছে।

রিঙের মত করে পেঁচানো দড়ির বাণ্ডিলের ভেতরে হাত ঢুকিয়ে দিল মুসা। ডাইভ দিয়ে পড়ল পানিতে। জিনা নামল তার পর পরই।

দম কেউ কারও চেয়ে কম রাখতে পারে না।

প্রথমে ভাসল জিনার মাথা।

তার কিছুক্ষণ পর মুসার। দম নিয়ে বলল, বাঁধন কেটে দিয়েছি পোটলাটার। আবার যেতে হবে, দড়ি বাঁধব।

জিনাকে নিয়ে আবার ডুব দিল মুসা।

দুজনে মিলে শক্ত করে ব্যাগের মুখে পেঁচিয়ে বাঁধল দড়ি। হ্যাঁচকা টান দিয়ে দেখল মুসা, খোলে কিনা। খুলল না। ওপর থেকে টেনে তোলা যাবে, বাঁধন খুলে পড়ে যাবে না ব্যাগে।

দড়ির আরেক মাথা হাতে নিয়ে ওপরে উঠতে শুরু করল মুসা। পাশে জিনা।

হয়েছে? জিজ্ঞেস করল কিশোর।

হাঁপাতে হাঁপাতে মাথা ঝাঁকাল দুজনে।

দম নিয়ে ভেলায় উঠে এল জিনা আর মুসা।

তোয়ালেটা কোথায়? কাঁপতে কাঁপতে বলল জিনা। ইস, পানি তো না, বরফ।

তাদের দিকে নজর নেই এখন রবিন আর কিশোরের। দড়ি ধরে টেনে ব্যাগটা তুলতে শুরু করেছে। ভারের জন্যে একপাশে কাত হয়ে গেছে ভেলা। আরেকটু টান পড়লেই পানি উঠবে।

উল্টোধারে সরে গেল জিনা আর মুসা, রাফিয়ানকেও টেনে সরাল নিজেদের দিকে। সোজা হলো আবার ভেলা।

তীরের দিকে চেয়ে হঠাৎ ঘাউ ঘাউ করে উঠল রাফিয়ান।

তাড়াতাড়ি তার মুখে হাত চাপা দিয়ে ধমক দিল জিনা, চুপ! চুপ! শঙ্কিত চোখে তাকাল কুকুরটা যেদিকে চেয়ে আছে সেদিকে। টিকসিরা আসছে না তো?

কাউকে দেখা গেল না। বোধহয় শেয়াল-টেয়াল দেখেছে রাফিয়ান।

ব্যাগটা তুলে আনা হয়েছে।

আর এখানে থাকার কোন মানে নেই। তীরের দিকে রওনা হলো ওরা।

ভালয় ভালয় আস্তানায় ফিরে যেতে পারলেই বাঁচে এখন।

ভেলা আগের মতই লুকিয়ে রাখা হলো। বোটহাউসে রাখলে আর ডারটি দেখে ফেললে সন্দেহ করবে। কি ঘটেছে বুঝেও যেতে পারে।

খাড়া পাড়, শেকড় বেয়ে উঠতেই কষ্ট হয়। ভারি একটা বোঝা নিয়ে ওঠা যাবে না। ব্যাগটা নিচে রেখে, দড়িটা দাঁতে কামড়ে ধরে আগে উঠে গেল মুসা। তার পেছনে রবিন আর জিনা। কিশোর নিচে রয়েছে। দড়ি ধরে ব্যাগটা টেনে তুলতে বলল ওদেরকে।

ব্যাগটা উঠে যেতেই সে-ও উঠে এল ওপরে।

চুপ করে আছে রাফিয়ান। তারমানে ঝোপের ভেতর ঘাপটি মেরে নেই কেউ, আচমকা ঘাড়ে এসে লাফিয়ে পড়বে না।

গাছের ছায়ায় ছায়ায় আস্তানায় ফিরে এল ওরা। রাফিয়ানকে সিঁড়িমুখের কাছে পাহারায় বসিয়ে অন্যেরা নেমে এল ভাড়ারে।

মোম জালল কিশোর।

আগে কিছু খেয়ে নিলে কেমন হয়? প্রস্তাব দিল মুসা।

ভালই হয়, জিনাও রাজি।

স্যাণ্ডউইচ বের করে খেতে শুরু করল তিনজনে, কিশোর বাদে। সে ব্যাগ। খোলায় ব্যস্ত।

যা বাঁধা বেঁধেছ, ভেজা গিট কিছুঁতেই খুলতে পারল না গোয়েন্দাপ্রধান, কাটতে হবে। ছুরি বের করল সে।

বাঁধন কাটার পরেও ব্যাগের মুখ দিয়ে ভেতরের বাক্সমত জিনিসটা বের করা গেল না। দীর্ঘ পানিতে থেকে থেকে বাক্সের গায়ে আঠা হয়ে লেগে গেছে প্লাসটিকের চাদর। কেটে, ছিড়ে তারপর বের করতে হবে।

দাও তো, আমাকেও একটা দাও, হাত বাড়াল কিশোর।

একটা স্যাণ্ডউইচ দিল জিনা।

খেয়ে নিয়ে আবার চাদর কাটায় মন দিল কিশোর। ভেতরে কি আছে দেখার জন্যে অস্থির হয়ে উঠেছে সবাই।

স্টীলের একটা ট্রাংক বেরোল, ফাঁকগুলো রবারের লাইনিং দিয়ে এমন ভাবে বন্ধ, পানি ঢোকার পথ নেই।

তালা লাগানো নেই, নইলে আরেক ফ্যাকড়া বাধত।

ডালা তুলতে শুরু করল কিশোর। দুরুদুরু করছে সবার বুক। ঝুঁকে এসেছে ট্রাংকের চারপাশ থেকে।

ডালা তোলা হলো। ভেতরে সুন্দর করে সাজিয়ে রাখা হয়েছে প্লাসটিকের অসংখ্য ছোট বাক্স। সব এক সাইজের।

গহনার বাক্স! হাত বাড়িয়ে একটা বাক্স তুলে নিল জিনা। ঢাকনা খুলে স্থির হয়ে গেল।

সবার চোখেই বিস্ময়।

কালো মখমলের শয্যায় শুয়ে আছে একটা অপূর্ব সুন্দর নেকলেস। মোমের আলোয় জ্বলছে যেন পাথরগুলো। নিশ্চয় কোন রানী-মহারানীর।

এটার ছবি দেখেছি আমি, বিড়বিড় করল জিনা। ফেলোনিয়ার রানীর গলায়।। তিনি পরে তার এক ভাস্তিকে জন্মদিনে প্রেজেন্ট করে দেন। ভাস্তির বর হলিউডের

নামকরা অভিনেতা, বিরাট বড়লোক।

হীরা, না? মুসা বলল। দাম কত হবে? একশো পাউণ্ড?

মাঝে মাঝে এত বোকার মত কথা বলো না তুমি। একশো হাজার পাউণ্ডেও দেবে না।

থাকগে তাহলে, আমার ওসব কোনদিনই লাগবে না, হাত নাড়ল মুসা।

তুমি হার দিয়ে কি করবে? ব্যাটাচ্ছেলে হার পরে? জিনা বলল।

কে বলল পরে না? হিপ্পি মার্কা গায়কগুলোর গলায় তো প্রায়ই দেখি।

আরও কয়েকটা বাক্স খুলে দেখল ওরা। প্রতিটা গহনা দামী। হীরা-পান্না-চুনিমুক্তা, সবই রয়েছে। হার, কানের দুল, চুরি, আঙটি, প্রায় সব ধরনের অলঙ্কার আছে। রাজার সম্পদ।

একসঙ্গে এত গহনা কোন মিউজিয়ামেও দেখিনি, বলল রবিন।

যাক, ভালই হলো, ফোঁস করে চেপে রাখা নিঃশ্বাস ছেড়ে বলল কিশোর, চোরের হাতে পড়ল না। ভাগ্যিস আমরা এসে পড়েছিলাম। নইলে পুলিশ জানতই না, অখ্যাত এক হ্রদের তলায় লুকানো ছিল এগুলো।

নেব কি করে? মুসার প্রশ্ন।

সেটাই ভাবছি। ট্রাংক নিয়ে ডারটি আর টিকসির সামনে দিয়ে যাওয়া যাবে। এক কাজ করো, যার যার ব্যাগে ভরে ফেল, যতটা পারা যায়। বাকিগুলোর বাক্স ফেলে দিয়ে রুমালে পোটলা বাঁধব।

ভাগাভাগি করে ব্যাগে ভরার পরও অনেক জিনিস রয়ে গেল। বাক্স থেকে খুলে ওগুলো রুমালে বাঁধতে হলো, তাতেও লাগল চারটে রুমাল। চারজনের কাছ থাকবে চারটে, ঠিক হলো।

সকালে উঠে প্রথমে কোথায় যাব? রবিন জিজ্ঞেস করল। পুলিশ?

এখানকার পুলিশের যা সুরত দেখে এলাম, মুখ বকাল কিশোর। হবে না। পোস্ট অফিস থেকে মিস্টার নরিসকে ফোন করব। তিনি কিছু একটা ব্যবস্থা করবেন। তাঁকে বিশ্বাস করা যায়।

আমার ঘুম পাচ্ছে, বড় করে হাই তুলল মুসা, মুখের কাছে হাত নিয়ে গিয়ে আঙুলগুলো কলার মোচার মত বানিয়ে নাড়ল বিচিত্র ভঙ্গিতে, ঢুকিয়ে দেবে যেন মুখের ভেতর।

শুয়ে পড়ল সবাই। কিন্তু ঘুম কি আর আসে? বিপদ কাটেনি এখনও।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *