১৫. পুরোদমে কাজ শুরু হয়েছে মেডিক্যাল রুমে

পুরোদমে কাজ শুরু হয়েছে মেডিক্যাল রুমে। শ্যালন অপারেশন করছে। তাকে সাহায্য করতে টেবিল ঘিরে দাঁহিয়ে আছে কয়েকজন মেডিক্যাল ওয়ার্কার। শ্যালনের কাছাকাছি দাঁড়িয়ে দেখছে অস্টিন। দরজার কাছে দাঁড়িয়ে আছে সাসকোয়াচ।

একটা ছোট্ট শিশির ভেতরে ইনজেকশনের ছুঁচ ঢুকিয়ে দিল শ্যালন। নীল ওষুধ দিয়ে সিরিঞ্জ ভরে নিয়ে শিশিটা একজন সহকারীর হাতে তুলে দিল।

অপারেশন টেবিলে এপ্লয়কে চিৎ করে শুইয়ে রাখা হয়েছে। সেদিকে নির্দেশ করে আস্তে জিজ্ঞেস করল অস্টিন, কেমন মনে হচ্ছে?

বেঁচে যাবে, জবাব দিল শ্যালন। কয়েক মিনিটের মধ্যেই হাড়গুলো জোড়া লেগে যাবে। ছুঁচ ওপরের দিকে তুলে সিরিঞ্জের পেছনটা ঠেলল শ্যালন। তির তির করে কয়েক বিন্দু নীল ওষুধ ছিটকে বেরোল। যে কোন ধরনের রোগ ইনফেকশন সারাতে আমাদের নিউট্রাক্সিন অতুলনীয়। সারায়ও খুবই দ্রুত।

অথচ যেভাবে জখম হয়েছে এপ্লয়, বলল অস্টিন, মরে যাওয়াটাই স্বাভাবিক।

তোমারও তো মরে যাওয়াটাই স্বাভাবিক ছিল, ছুঁচটা এপ্লয়ের মাংসে ঢোকাতে ঢোকাতে বলল শ্যালন। অথচ বেঁচে আছ। সব বিজ্ঞানের দান।

হাসল অস্টিন। এপ্লয়ের দেহে নিউট্রাক্সিন পুশ করছে শ্যালন।

ম্যাজিক ম্যাডিসিন, না! বলল অস্টিন।

মাথা ঝকাল শ্যালন। ছুঁচটা এপ্লয়ের মাংসের ভেতর থেকে টান মেরে বের করে এনে একজন সহকারীর হাতে তুলে দিল। বলল, ভেনট্রিকুলারের ওপর চোখ রাখবে।

ঘাড় কাত করে সম্মতি জানাল সহকারী। অস্টিনের দিকে ফিরল শ্যালন। এক্ষুণি ফিরবে?

হ্যাঁ, ফিরতে তো হবেই।

কিন্তু যাবার আগে তোমার স্মৃতি থেকে আমাদের কথা তো মুছে দিতে হবে, বলল ফলার।

ওহ হো, ভুলেই গিয়েছিলাম। তা, কি করে মুছবে?

রেডিয়েশনের সাহায্যে। এক্স-রে-এর মতই এক ধরনের রশ্মি ব্রেনে ঢুকিয়ে। কোন ক্ষতি হবে না শরীরের। সাসকোয়াচের সঙ্গে প্রথম সাক্ষাৎ থেকে শুরু করে, এখান থেকে বেরোন পর্যন্ত কোন কথা মনে থাকবে না তোমার।

ভারি মজার ব্যাপার, হাসল অস্টিন।

একজন সহকারীকে ইঙ্গিত করল ফলার।

এগিয়ে এসে অস্টিনের হাত ধরল লোকটা। টানল। বলল, কিছু মনে করবেন না, কর্নেল।

আমার তরফ থেকেও তোমাকে ধন্যবাদ দেয়া উচিত, অস্টিন, বলল ফলার।

বাড়ি যাবে না? রহস্যময় হাসি হাসল অস্টিন।

তা তো যাবই। এখানে চিরদিন থাকব নাকি?

কবে যাবে?

আমি আগেই চলে যাব। তিন বছর অনেক লম্বা সময়। একটু থামল ফলার। তারপর বলল, দুতিন দিনের মধ্যেই একটা শিপ আসছে।

তোমরা সবাই যাবে তো?

না, উত্তরটা দিল ফলার। আমি অধৈর্য্য হয়ে পড়েছি। আমি যাব। ওরা মিশন শেষ করে যাবে। এখনও তিন বছর।

তোমাদের দুবছর যেতেই আমাদের আড়াইশ বছর পার হয়ে গেল।

তার মানে আরও কয়েকশ বছর পৃথিবীতে আছ তোমরা?

থাকতে হচ্ছে।

সাসকোয়াচকে দিয়ে লোক ধরে এনে টেস্ট টিউবে ভরবে তো আরও?

উপায় নেই। পরীক্ষা শেষ হয়নি এখনও।

শ্রাগ করল অস্টিন। আর কিছু না বলে টেকনিশিয়ানের সঙ্গে এগিয়ে গিয়ে ওর নির্দেশিত একটা রিক্লিনিং চেয়ারে বসল। একটা চ্যাপ্টা ইলেকট্রোড অস্টিনের মাথায় বসিয়ে দিল টেকনিশিয়ান। যন্ত্রটা থেকে এক গোছা তার বেরিয়ে গিয়ে ঢুকেছে একটা কম্পিউটারে। নিঃশব্দে হেঁটে অস্টিনের কাছে এসে দাঁড়াল শ্যালন। গা ঘেঁষে দাঁড়াল। ঝুঁকে চুমু খেল। ইচ্ছে করেই একটু বেশি সময় নিয়ে। তার একটা হাত অস্টিনের হাতের তালুতে নেমে এল। একটা ছোট্ট নীল শিশি গুঁজে দিল। পকেটে ঢুকিয়ে রাখল অস্টিন শিশিটা। ঘরের অন্য সবার অলক্ষ্যে ঘটল ব্যাপারটা।

গুড বাই, স্টিভ, অস্টিনের কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল শ্যালন। পিছিয়ে দাঁড়াল। মুখটা ঘুরিয়ে নিল একপাশে। সুইচ অন করল টেকনিশিয়ান। মৃদু গুঞ্জন উঠল ইলেকট্রোডের ভেতরে। চোখ মুদল অস্টিন। মিনিট খানেক পরেই থেমে গেল শব্দ। যন্ত্রটা অস্টিনের চাঁদি থেকে সরিয়ে নিল টেকনিশিয়ান। কাজ শেষ।

চোখ খুলল না অস্টিন। যেন ঘুমিয়ে পড়েছে সে।

সাসকোয়াচ, ডাকল শ্যালন। এর বেশি কিছু বলতে হল না। এগিয়ে এসে পাঁজাকোলা করে অস্টিনকে চেয়ার থেকে তুলে নিল রোবটটা। বেরিয়ে গেল ঘর থেকে।

বনসীমার কাছে এসে অস্টিনকে আস্তে করে মাটিতে শুইয়ে দিল, সাসকোয়াচ। এক মুহূর্ত দেখল তাকে। তারপর ঘুরে দাঁড়িয়ে আস্তানায় রওনা দিল।

সাসকোয়াচকে আন্ডারগ্রাউন্ড কমপ্লেক্সে ফিরে যাবার সময় দিল অস্টিন। তারপরই তড়াক করে লাফিয়ে উঠে দাঁড়াল। হাসিতে উদ্ভাসিত মুখ।

টেলিভিশনের সামনে দাঁড়িয়ে দৃশ্যটা দেখছে শ্যালন আর ফলার। অস্টিনকে এভাবে লাফিয়ে উঠতে দেখে বিস্ময়ে বোবা হয়ে গেল যেন দুজনেই।

এমন তো হবার কথা না। ভুরু কুঁচকে টি.ভির পর্দার দিকে তাকিয়ে বলল ফলার, আগামী পনের মিনিটের মধ্যে জ্ঞানই ফেরার কথা না ওর।

আমি জানি, আমাকে দেখছ তুমি। নিশ্চয়ই আমার কথাও শুনছ। আন্ডারগ্রাউন্ড কমপ্লেক্সটা যেদিকে, সেদিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে বলল অস্টিন।

আমাদেরকেই বলছে ও, বলল ফলার।

হ্যাঁ, শুকনো শ্যালনের কণ্ঠ। কিন্তু কি করে এটা সম্ভব! আমাদের যন্ত্র কাজ করেনি?

এত দূর থেকে ফলারের কথা শুনতে পাচ্ছে না অস্টিন। কিন্তু তবু যেন তার কথার জবাব দিয়েই চলল সে, খুব অবাক হয়েছ, না ফলার? ঘটনাটা কি জান? আমার খুলিটা এক ধরনের মেটাল অ্যালয়ে তৈরি। এক্স-রে কিংবা অন্য কোন রশ্মিই একে ভেদ করতে পারে না।

হাঁ করে টেলিভিশনের পর্দার দিকে তাকিয়ে আছে ফলার।

সুতরাং বুঝতেই পারছ, বলে চলেছে অস্টিন, তোমাদের মেমোরি ইরেজার আমার ওপর কাজ করেনি। ইচ্ছে করেই তখন চুপ করে ছিলাম। সাসকোয়াচের সঙ্গে মারামারি আর কত করব। পকেট থেকে ধীরে ধীরে বের করে আনল হাতটা। নীল শিশিটা ছুঁড়ে দিল ওপর দিকে। পরক্ষণেই লুফে নিল আবার। হাসল সে। দুআঙুলে তুলে ধরল নীল শিশিটা, আর হ্যাঁ…

নিউট্রাক্সিনের একটা শিশিও চুরি করেছে ও, ফিসফিস করে বলল ফলার। জোরে কথা বলতে ভয় পাচ্ছে যেন। চুপ করে রইল শ্যালন।

শোন ফলার, গত আড়াইশ বছর মানুষকে গিনিপিগ বানানোর জন্য কঠোর শাস্তি পাওনা হয়ে আছে তোমাদের। তবে এই শিশিটা পেয়ে যাওয়াতে, ওষুধটুকুতে মানুষের যে উপকার হবে তার বিনিময়ে তোমাদের অপরাধ ক্ষমা করা যায়। আশা করছি এই অতুলনীয় ওষুধ আমাদের চিকিৎসা জগতের প্রচুর উন্নতি ঘটাবে। শিশিটা পকেটে রেখে দিল আবার অস্টিন। এবার আসল কথা শোন। আমি এখন যাচ্ছি। কিন্তু ঠিক চারদিন পরে ফিরে আসব আবার। একা নয়, পুরো এক ব্রিগেড সৈন্য সাথে নিয়ে। আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র থাকবে ওদের কাছে। যদি দেখি তখনও আছ, গত আড়াইশো বছরে তোমাদের বর্বরতার কথা আবার মনে পড়ে যাবে আমার। বিশ্বাস কর, প্রয়োজনে আমাদের সেনাবাহিনী খুবই নিষ্ঠুর। তোমাদের ছিড়ে টুকরো টুকরো করতে দারুণ মজা পাবে ওরা।

শ্যালনের দিকে তাকাল ফলার। চোখে হতাশা। জিজ্ঞেস করল, শিপটা তিনদিনের মধ্যে আসবে তো?

মাথা ঝাঁকাল শ্যালন।

শেষ আরেকটা ফল, মিষ্টি হাসিতে উদ্ভাসিত হয়ে উঠল অস্টিনের মুখ। শ্যালন, চিরকাল মনে রাখব আমি তোমাকে। বিদায়।

হাত বাড়িয়ে টি.ভির সুইচটা অফ করে দিল ফলার। লম্বা লম্বা পা ফেলে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে। লাল হয়ে উঠেছে তার মুখ। একজন পৃথিবীবাসীর কাছে পরাজিত হবার অপমানে বোধ হয়।

যা বলার বলে ঘুরে দাঁড়াল অস্টিন। ছুটতে শুরু করল। বায়োনিক গতিবেগ। লক্ষ্য বেস ক্যাম্প।

***

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *