ধড়াস করে উঠল কিশোরের বুক। স্থির হয়ে গেল ও। লুক এখন চিলেকোঠায় উঁকি দিলেই সর্বনাশ। ওদের পরিকল্পনা বরবাদ। তা ছাড়া একজন খেপা লোকের মুখোমুখি হতে হবে, যার হাতে আছে গুলিভর্তি রাইফেল। সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল কিশোর। লুককে ওপরে উঠতে দেয়া যাবে না। মইয়ের ধাপে পা রাখা মাত্র তাঁকে ফেলে দিতে হবে। গুলি করার আগেই তাকে কাবু করে ফেলতে হবে।

কী করছেন? তীক্ষ্ণ হয়ে উঠল বিগসের কণ্ঠ। নামান ওটা। নামিয়ে রাখুন। রাইফেল-বন্দুক দেখলে আমার ভয় লাগে।

কিন্তু শব্দ যে শুনেছি তাতে কোন সন্দেহ নেই, লুক বলল। ওপর থেকে এসেছে।

শুনতেই পারেন, বিগস বলল। কেবিন ভর্তি হঁদুর। ইদুরের জ্বালায় মরলাম। ভাবছি, বাড়িওলাকে বলব। ইঁদুর না তাড়ালে ভাড়া দেব না।

রাইফেলের সেফটি ক্যাচ অন করার শব্দ শোনা গেল। মেঝেতে বাটের শব্দ শুনে বোঝা গেল চেয়ারের কিনারে রাইফেলটা ঠেস দিয়ে রেখেছেন। চেপে রাখা দমটা আস্তে আস্তে ছাড়ল কিশোর। নীরবে চলছে টেপরেকর্ডার। যন্ত্রটা পাটাতনে নামিয়ে রাখল ও। অসময়ে টেপটা শেষ না হলেই হয়।

কী করতে চান? লুক জিজ্ঞেস করলেন। চিঠিতে কোন কিছুই স্পষ্ট করে লেখেননি।

ভূমিকার কোন প্রয়োজন দেখছি না, বিগৃস্ বলল। সোজাসাপ্টা কথাই আমার পছন্দ। আপনি কী করে বেড়াচ্ছেন, সব আমি বুঝে ফেলেছি। আমার সুবিধে করে দিয়েছেন। লোকে হা-ভোট দিতে বাধ্য হবে। সেজন্যই ভাবলাম আপনাকে দলে নেয়া যায় কি না আলোচনা করে দেখি।

শুনে খুশি হলাম, কণ্ঠস্বরে কোন পরিবর্তন নেই লুকের।

আশঙ্কা মাথা চাড়া দিচ্ছে কিশোরের মনে। লুককে সন্দেহ করে ভুল করল না তো? হয়তো তিনি অপরাধী নন।

থিম পার্কের পক্ষ থেকে আপনাকে নতুন কোনও কাজ দেয়া যায় কি না ভাবছি। যা আপনি ইতিমধ্যেই করে ফেলেছেন তার জন্য অবশ্যই খরচাপাতি আর মোটা অঙ্কের বোনাস পাবেন।

কবে?

বোনাস পাবেন আমরা ভোটে জেতার পর, বিগ বলল। তবে খরচাপাতির টাকা এখনই দিয়ে দিতে পারি।

আমি রাজি, জবাব দিতে এক মুহূর্ত দ্বিধা করলেন না লুক।

আশঙ্কা দূর হলো কিশোরের। মুসার দিকে তাকাল। হাসি দেখতে পেল। টোপ গিলেছে অতি ধূর্ত রাঘব বোয়াল। বিগস্ এখন ওটাকে খেলিয়ে তীরে তুলতে পারলেই হয়।

আপনি তো রাজি হলেন, বিগ বলছে, কিন্তু আপনিই দুর্ঘটনাগুলো ঘটিয়েছেন, এ ব্যাপারে আমি শিওর হব কীভাবে?

তাহলে আমাকে ডাকলেন কেন?

কানদিন একজ। পুরানো গুড়ে, সেজন্য

ডেকে নিশ্চয় ভুল করিনি? অনেক ভেবেছি। দুর্ঘটনাগুলোর পিছনে আর কারও হাত আছে বলে মনে হয়নি।

নেইই তো। আমিই করেছি সব! একা।

শুধু একটা কথা বুঝতে পারছি না, নিজের ঘরে আগুন দিলেন কেন?

হাসি শোনা গেল লুকের। এই সহজ কথাটা বুঝলেন না? লোকের সন্দেহ যাতে আমার ওপর না পড়ে, সেজন্য। সবাই ভাববে, আমি নই, অন্য কারও কাজ। পুরানো ওই ছাউনিটা এমনিতেই ভেঙে পড়ত যে কোনদিন। একটা ভাল কাজে লাগালাম।

আর জেফরি টিনুকের কেবিন? ওটাতে আগুন লাগালেন কীভাবে?

কিশোর দেখল, কঠিন হয়ে গেছে জেফরির চেহারা। হাত মুঠোবদ্ধ। ইশারায় তাঁকে শান্ত থাকতে অনুরোধ করল ও।

এটা কোন কাজ হলো? পিছনের জানালা দিয়ে স্টোভের কাছে একটা পেট্রলের ক্যান ফেলে, একটা জ্বলন্ত ম্যাচের কাঠি ছুঁড়ে দিলাম, ব্যস, লুক বলল। জোসির বাবার কেবিনে লাকড়ি ছুঁড়লাম ওদের ভয় দেখানোর জন্য। ওই জেফরিটা থিম পার্কের বিপক্ষে বহুত গলাবাজি করে। লোকে মানেও ওকে। ভাবলাম, ওকে অন্য কাজে ব্যস্ত রাখতে পারলে সুবিধে।

মুজের মাংসটাও আপনিই চুরি করেছিলেন? বিগ জানতে চাইল।

তো আর কে? গর্ব করে বললেন লুক। জো সারটনের নৌকাটাও আমিই নষ্ট করেছি, বুঝতেই পারছেন। রাতের বেলা ইলেকট্রিক করাত চালু করে রেখে হাতুড়ি আর গজাল নিয়ে চলে গেলাম। তারপর নৌকার তলায় গজাল বসিয়ে ধ্যাচাং-ধ্যাচাং! ব্যস, গেল বাতিল হয়ে নৌকাটা।

বিগ বলল, কিন্তু আমি বুঝতে পারছি না, টেডের কুকুরগুলোর পিছনে লাগলেন কেন আপনি? ওর বাবা তো আমাদের বিপক্ষে নয়।

অট্টহাসি হাসলেন লুক। মুসার মনে হলো, উন্মাদের হাসি। গায়ে কাঁটা দিল ওর।

ওটাই তো আসল চালাকি, লুক বলছেন। জোসির ক্ষতি করে ওর চাচার মনোবল ভাঙতে চেয়েছি। কুকুরের দড়ি কেটেছি টেডের ওপর জোসির সন্দেহ বাড়ানোর জন্য। টেডকে ওর ওপর খেপিয়ে তুলেছিলাম আরও আগেই। কুকুরের ঘরে বিষ মাখানো মাংস ফেলে রেখে, স্লেজের লাগাম কেটে দিয়ে, রানার ওয়্যাক্সে বালি ফেলে। পরম বন্ধুকে চরম শত্রু বানিয়ে দিয়েছিলাম। বুঝতে পেরেছিলাম, আমি অঘটন ঘটানো শুরু করলে লোকের সন্দেহ ওদের ওপর গিয়ে পড়বে। ঘোলাজলে মাছ শিকার করতে সুবিধে হবে আমার। কেউ আমাকে সন্দেহ করবে না।

আর সহ্য করতে পারল না টেড। কিশোর বা মুসা বাধা দেয়ার আগেই লাফ দিয়ে নীচে পড়ল। চিৎকার করে উঠল, শয়তান! ছুঁচো! আমার কুকুরকে বিষ খাইয়ে মেরেছিস! আজ আমি তোকে খুনই করে ফেলব!

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। আর চুপ করে থেকে লাভ নেই। নীচে উঁকি দিল কিশোর। টেডের দিকে রাইফেল তাক করেছেন লুক। খবরদার! ঝাঝরা করে ফেলব বলে দিলাম! আর বিগস, তুমি আমার জন্য ফাঁদ পেতেছিলে! তোমাকেও ছাড়ব না

আমি!

রক্ত সরে গেল বিগসের মুখ থেকে। দেয়ালের দিকে পিছিয়ে গেল। আমাকে মেরে আপনিও বাঁচতে পারবেন না।

পারব। খুব পারব। একবার টেডের দিকে, একবার বিগৃসের দিকে নলের মুখ সরাচ্ছেন লুক। গুলি করে মারব আমি তোমাদের। তারপর এমন করে সাজাব, মনে হবে একে অন্যকে খুন করেছ তোমরা। সবাই তখন জানবে, টেডের কুকুরকে বিষ দিয়েছিলে তুমি, রাগে পাগল হয়ে গিয়ে প্রতিশোধ নিতে ছুটে এসেছিল ও।

লুকের কথা শুনে চোখ বড় হয়ে গেল কিশোরের। লোকটা আসলেই উন্মাদ। লুক এখনও ভাবছেন ঘরে বিগস্ ও টেড ছাড়া আর কেউ নেই। মুসা, জেফরি ও জোসির দিকে তাকাল কিশোর। ইশারা করল।

এখন বলল, মজা পাচ্ছেন যেন লুক, কে আগে মরতে চাও? বিগস, তোমারই আগে মরা উচিত। আমার সঙ্গে বেইমানি করার শাস্তি। বিগসের দিকে নিশানা করলেন তিনি।

চিলেকোঠার কিনার থেকে ঝাঁপ দিল কিশোর। মার্শাল আর্ট এক্সপার্টদের মত ইয়া-হু! বলে তীক্ষ্ণ চিৎকার দিয়ে মুসাও লাফিয়ে পড়ল নীচে।

চমকে গেলেন লুক। রাইফেলের নলের মুখ ঘুরে যেতে শুরু করল কিশোর-মুসার দিকে।

বাঘের মত লুকের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল মুসা। মেঝেতে ফেলে দিল লোকটাকে।

গুলি ফোটার প্রচণ্ড শব্দ। মুসার কানের পাশ দিয়ে বেরিয়ে গেল বুলেট। সময় নষ্ট করল না ও। লুকের কলার ধরে টেনে তুলে দশ মনি একটা ঘুসি বসিয়ে দিল চোয়ালে। আবার মেঝেতে পড়ে গেলেন লুক।

রাইফেলটা কেড়ে নিল কিশোর। লুকের বুকের দিকে ধরে রেখে মুসাকে জিজ্ঞেস করল, গুলি লেগেছে?

না, জবাব দিল মুসা।

মই বেয়ে দ্রুত নেমে এল জোসি ও জেফরি।

জেফরির দিকে তাকাল কিশোর। লুকের কথা সবই তো শুনলেন?

শুনেছি, মনেও রেখেছি। মেঝেতে পড়ে থাকা লুকের কাছে গিয়ে দাঁড়ালেন জেফরি। প্রতিটি শব্দ আদালতকে জানাতে পারব আমি।

কেউ বিশ্বাস করবে না… বিড়বিড় করলেন লুক।

টেপরেকর্ডারটা তুলে দেখাল মুসা। এটার কথা তো বিশ্বাস করবে? আপনি হেরে গেছেন, লুক।

হাসল জোসি। এভাবে কারও পরাজয়কে লস অ্যাঞ্জেলেসে বলে, ইয়োর গৃজ ইজ কুকড। আর আমরা অ্যাথাবাস্কানরা বলি, ইয়োর মুজ ইজ কুকড।

হেসে উঠল মুসা।

 

পরদিন সকালে প্লেনে করে ফেয়ারব্যাংকস থেকে উড়ে এল আলাস্কান পুলিশ। নদীর জমাট বরফের ওপর নামল প্লেন। দুজন পার হাতকড়া পরিয়ে দিল লুকের হাতে। সাক্ষীদের বক্তব্য শুনল। কিশোরের রেকর্ড করা টেপটা পকেটে ভরল।

কিশোর ও মুসাকে ধন্যবাদ দিলেন অফিসার। ওদের গোয়েন্দাগিরির প্রশংসা করলেন।

আসামীকে নিয়ে চলে গেল পুলিশ।

সেদিন অ্যাসেম্বলি হলে একটা মিটিং ডাকল বিগস। গত কয়েক মাসে অনেক কিছু জেনেছি আমি, অনেক অভিজ্ঞতা হয়েছে। আপনাদের অহঙ্কার, আপনাদের ঐতিহ্য আমাকে মুগ্ধ করেছে। সেসব নষ্ট করার কোন অধিকার আমার নেই তারপরেও আমি বলব, আমার কোম্পানিকে কাজ করার একটা সুযোগ দিয়ে দেখুন। আমি কথা দিচ্ছি, আপনাদের জীবনযাত্রায় কোনরকম বাদ সাধা হবে না। বরং, আপনাদের এই সংস্কৃতি আর ঐতিহ্যই আমাদের পুঁজি। এগুলো দেখতেই তো টুরিস্ট আসবে। আমাদের নিজেদের স্বার্থেই এ সব ধ্বংস হতে দেব না আমরা।

জেফরি, এরিনা, জোসি ও মুনের দিকে তাকাল ও। পাশাপাশি বসেছে গোটা পরিবার। আজ সকালে থিম পার্কের হোম অফিসের সঙ্গে কথা বলেছি আমি। গত কয়েক দিনে এখানে যার যা ক্ষতি হয়েছে, যদিও সেগুলোর জন্য কোনভাবেই দায়ী নয় আমাদের কোম্পানি, তবুও ক্ষতি পূরণ দেবার অঙ্গীকার করেছে কর্তৃপক্ষ। টিনুকদের কেবিন নতুন করে তৈরি করে দেবে, জো সারটনকে একটা নৌকা কিনে দেবে।

ঘরের মধ্যে জোর গুঞ্জন। হাততালি। থামতে সময় লাগল।

বিগস বলল, ফেয়ারব্যাংকসের সবচেয়ে বড় ফলের দোকানটায় অর্ডার পাঠিয়েছি আমি। বাক্স ভর্তি করে তাজা ফল আনাব। এলে, সবার আগে আমি নিজে খেয়ে দেখব, বিষ মেশানো আছে কি না।

বিগ্‌সের রসিকতায় আরেক দফা হাসাহাসি, হুল্লোড়।

উঠে দাঁড়ালেন জেফরি। অনেক ধন্যবাদ আপনাকে, বিগস্। আপনি অনেক করেছেন আমাদের জন্য। লুককে ধরার জন্য মস্ত ঝুঁকি নিয়েছেন। অনেক বড় ক্ষতি হয়ে যেতে পারত আপনার। আমাদের ধারণায় চিড় ধরিয়ে দিয়েছেন। আমরা বুঝেছি, গ্লিটারের ক্ষতি নয়, মঙ্গলই চাইছেন আপনি। সত্যিই গ্লিটারের উন্নতি দরকার। টাকা ছাড়া কিছু হয় না। পূর্বপুরুষের ঠুনকো আভিজাত্য আর অহঙ্কার আঁকড়ে থেকে না খেয়ে মরারও কোন মানে হয় না। তাদের যুগ চলে গেছে। এখন আমাদের যুগ। বর্তমানকে বুঝে সে-মত চলতে না পারলে অস্তিত্বই টিকিয়ে রাখতে পারব না আমরা।

জোরাল গুঞ্জন। জনতাকে চুপ করাতে হাত তুললেন জেফরি। এত উত্তেজিত হওয়ার কিছু নেই। এখনই ভোট দিচ্ছি না আমরা। নিজেদের মধ্যে আলোচনা করব। ভাবনা-চিন্তা করব। নিজেদের কোনরকম ক্ষতির আশঙ্কা দেখলে থিম পার্কের পক্ষে ভোট দেব না।

যা বললেন, তাতেই আমি খুশি, বিগৃস্ বলল। পরে আরও মিটিং দরকার হবে আমাদের।

হ্যাঁ, হবে। এতবড় একটা সিদ্ধান্ত, এক মিটিঙেই নেয়া যায় না, জেফরি বললেন। তবে এখন আমি সমস্ত গ্লিটারবাসীকে অন্য একটা অনুরোধ জানাব। কিশোর ও মুসাকে আপনাদের থ্যাংকস-ভোট দিতে অনুরোধ করব, কারণ ওদের সহযোগিতা না পেলে লুক-দানবের হাত থেকে রক্ষা পেতাম না আমরা। শহরটাকে ধ্বংস করে দিত ও। ওর কাছ থেকেও একটা শিক্ষা গ্রহণ করা উচিত আমাদের। অতিরিক্ত লোভ করা ভাল না। আমরাও করব না। অতি লোভ একটা জাতিকে। ধ্বংস করে দিতে পারে। হাত তুলে বললেন তিনি, এখন, কিশোর ও মুসাকে থ্যাংকস-ভোট।

মুহূর্তে ঘরের সমস্ত চোখ ঘুরে গেল দুই গোয়েন্দার দিকে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে কোনদিন পড়েনি ওরা। অস্বস্তি বোধ করতে লাগল দুজনে।

সবাই উঠে এসে ঘিরে ফেলল ওদেরকে। পিঠ চাপড়ানো, হাত মেলানো আর ধন্যবাদ জানানোর পালা চলল। মুসা নিশ্চিত, এত আন্তরিক আর গর্বিত একটা জাতির উন্নতি হতে বাধ্য।

 

শুক্রবার সকাল। কুকুরের দল, স্লেজ আর রসদ গোছাতে জোসিকে সাহায্য করল কিশোর ও মুসা। জোসির সঙ্গে ওর স্লেজে করে নদীর ওপর গিয়ে উঠল। মুনও রয়েছে ওদের সঙ্গে। দলবল নিয়ে ওখানে অপেক্ষা করছে টেড।

ডায়মণ্ডহার্টকে দেখে দাঁত বের করে গজরানো শুরু করল টেডের নেতা-কুকুরটা। তবে ডায়মণ্ডহার্টের মেজাজ শান্ত। প্রতিপক্ষের গজরানোতে কান দিল না। পুরোপুরি উপেক্ষা করল। হেসে ফেলল জোসি। আদর করতে লাগল কুকুরটাকে। মুনও ওটার মাথা চাপড়ে আদর করে দিল।

হই-চই শুনে ফিরে তাকাল মুসা। দলে দলে লোক আসছে।

জোসি! মুসা বলল, এত লোক!

ভয় নেই, বরফের স্তর ভাঙবে না। অনেক পুরু।

বরফের কথা বলছি না। আমি ভাবছি, প্লেনে এত লোকের জায়গা হবে?

হেসে ফেলল জোসি। এত লোক তো যাচ্ছে না। আমাদের বিদায় জানাতে এসেছে। তোমাদের জানানো হয়নি, থিম কোম্পানি আমাদের স্পন্সর করছে। বড় দুটো প্লেন পাঠাচ্ছে ওরা। আমার আর টেডের দুটো কুকুরবাহিনী, দুটো স্লেজ আর ওগুলোর সমস্ত মালপত্র যাতে বহন করতে পারে।

দূর থেকে ইঞ্জিনের শব্দ ভেসে এল। আকাশের দিকে তাকাল মুসা। বহুদূরে একটা কালো বিন্দু দেখে বলল, প্রথম প্লেনটা আসছে।

জনতার সঙ্গে জেফরি আর এরিনা রয়েছেন। নদীর বরফের ওপর উঠে এলেন দুজনে।

টেডের দিকে তাকাল জোসি। বলল, ইডিটারোড রেসে যাদের সঙ্গে আমরা প্রতিযোগিতা করছি, তারা সবাই অভিজ্ঞ, বড় বড় রেসার।

হ্যাঁ, মাথা ঝাঁকাল টেড। তাদেরকে হারিয়ে প্রথম হওয়ার চেষ্টা করতে হবে আমাদের।

খুব কঠিন কাজ, তবে হাল ছাড়ব না আমি। প্রথম হওয়ার চেষ্টা করব।

আমিও করব।

ঠিক, পিছন থেকে বলল বিগস্। গ্লিটারবাসীর মুখ উজ্জ্বল করতে হবে তোমাদের। জনতার দিকে ফিরল ও। শুনুন, জোসি আর টেডের জন্য দোয়া করবেন আপনারা। ওরা যেন প্রথম ও দ্বিতীয় হতে পারে।

সবাই হাততালি আর উৎসাহ দিল দুই রেসারকে। নিজেদের শহরের গর্ব জোসি ও টেডকে।

দুই রেসারের কাঁধে হাত রাখলেন এরিনা। আমার ছেলেরা ফার্স্ট হবেই।

দুজনেই ফাস্ট হতে না পারলে তো আবার একজনের মন খারাপ হবে, হাসল বিস্। যা-ই হোক খেলা খেলাই। ব্যাপারটাকে সেভাবেই দেখতে হবে ওদের। এবার কিশোর-মুসাকে থ্রি চিয়ার্স দিন।

ঘনঘন আনন্দধ্বনি, থ্রি চিয়ার্স আর করতালিতে মুখরিত হলো নদীতীর। আবেগে চোখে পানি এসে গেল মুসার। হাত তুলে নাটকীয় ভঙ্গিতে বলল, প্রিয় গ্লিটারবাসী, আমার ও কিশোরের পক্ষ থেকে আন্তরিক ধন্যবাদ গ্রহণ করুন। যে আদর আর অভ্যর্থনা আপনারা আমাদের দিয়েছেন, কোনদিন ভুলব না। আরেকটা কথা, ইডিটারোড রেসে অবশ্যই আমাদের সমর্থন থাকবে গ্লিটারের পক্ষে। মুনের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল। মুন, তোমাকেও ভুলব না আমরা।

অনেক আনন্দ, অনেক কিছু, কিন্তু একটা কাঁটা রয়েই গেল কিশোরের মনের কোণে–এই আনন্দের মুহূর্তে রবিন নেই ওদের মাঝে। নিজের অগোচরেই দীর্ঘশ্বাস পড়ল ওর।

***

Share This