১৫. দুপুরের দিকে একটা বড় জাহাজ এল

দুপুরের দিকে একটা বড় জাহাজ এল। আমরা হাত দেখাতেই থামল ওটা। একটা বোট পাঠিয়ে দিল তীরে। ওই বোটে চেপে সম্রাট, ডিউক আর আমি জাহাজে উঠলাম। জিম ভেলাতেই রয়ে গেল। সিনসিন্যাটি থেকে আসছে জাহাজটা। আমরা মাত্র চার-পাঁচ মাইল যাব শুনে জাহাজের ক্যাপ্টেন রেগে কাই হয়ে গেল। বলল, নামিয়ে দেবে না আমাদের। শেষে সম্রাট যখন জানাল আমরা মাইল প্রতি এক ডলার ভাড়া দিতে রাজি, তখন সুর নরম করল সে।

গ্রামের কাছে এসে আমরা জালি বোটে চেপে ডাঙায় গেলাম। বোট আসছে দেখে বেশ কিছু লোক জমা হয়েছিল পাড়ে।

আপনাদের কেউ বলতে পারেন, পিটার উইলকস্ কোথায় থাকেন? লোকগুলোকে জিজ্ঞেস করল সম্রাট।

দুঃখিত, স্যার, বলল একজন। আমরা বড়জোর বলতে পারি গত রাত পর্যন্ত কোথায় থাকত সে।

চোখের পলকে শয়তান বুড়ো যেন ভেঙে পড়ল একথা শুনে। কাঁদতে লাগল অঝোরে। দুর্বোধ্য ইশারায় কিছু বোঝাল ডিউককে। সে-ও কাঁদতে লাগল হাপুস নয়নে।

ব্যাপার দেখতে প্রচুর লোক জড় হয়ে গেল সেখানে। ভাঙা-ভাঙা গলায় সম্রাট বলল, পিটার উইলকস তাদের ভাই। পিটারের অসুস্থতার খবর পেয়েই ছুটে এসেছে তারা। গ্রামের লোকেরা নানাভাবে প্রবোধ দিতে চেষ্টা করল ওদের। পিটারের শেষমুহূর্তের সব কথা সম্রাটকে খুলে বলল। সে আবার ইশারায় বুঝিয়ে দিল ডিউককে। ওরা তারপর পিটার উইলকসের বাসায় নিয়ে গেল আমাদের। ইতিমধ্যে খবর রটে গেছে গাঁয়ে। পিটারের বাসায় সবাই ভিড় জমিয়েছে। তিনটে ফুটফুটে মেয়ে দাঁড়িয়ে ছিল দোরগোড়ায়। ওরাই জর্জের মেয়ে। মেরি জেন-এর মাথার চুল লালচে। দুই কাকাকে দেখে তার দুচোখে খুশির বান ডাকল। ঝাঁপিয়ে পড়ল সম্রাটের বুকে। এই মর্মস্পর্শী দৃশ্য দেখে উপস্থিত মহিলারা সুর করে কাঁদতে লাগল।

সম্রাট এরপর ধরা গলায় বর্ণনা দিল কীভাবে চার হাজার মাইল পাড়ি দিয়ে সে আর উইলিয়ম ছুটে এসেছে ভাইকে একনজর দেখার জন্যে। অথচ সেই ভাই-ই কিনা…! পিটারের বন্ধুদের ওইদিন রাতে খেতে বলে কথা শেষ করল সে। বলল, দাওয়াত কবুল করলে সে আর তার ভাইঝিরা খুশি হবে কারণ বন্ধুদের কথা প্রত্যেক চিঠিতেই উল্লেখ করত পিটার। মিস্টার হবসন, লট হভে, বেন রাকনার, অ্যাবনার শ্যাফোর্ড, লেভি বেল, ডাক্তার রবিনসন-এদের নাম করল সম্রাট। ওদের স্ত্রী এবং বিধবা মিসেস বার্টলের কথাও বাদ দিল না।

পাদ্রি হবসন আর ডাক্তার রবিনসন ছিল না, দরকারি কাজে গাঁয়ের আরেক প্রান্তে গেছে। ব্যবসার কাজে লেভি বেলও বাইরে, তবে আর সবাই ছিল। এগিয়ে এসে সম্রাট আর ডিউকের সাথে করমর্দন করল তারা।

সম্প্রতি গায়ে যা-যা ঘটেছে সেসব ব্যাপারে ওদের সাথে আলাপ করল সম্রাট। বলল পিটারের চিঠিতে এসব কথা থাকত। বেমালুম একের পর এক গুল মেরে গেল সে; কোথাও ঠেকল না। জাহাজঘাটার সেই লোকটার কাছ থেকে সব কথাই জেনে নিয়েছিল শয়তানটা।

মেরি জেন তার পিটার কাকার উইল নিয়ে এল। উইলটা পড়ার সময় কাঁদতে লাগল সম্রাট। তিন হাজার ডলার পরিমাণ স্বর্ণমুদ্রা আর তার বাড়িটা তিন ভাইঝিকে দিয়ে গেছে পিটার। ট্যানারি, এবং অন্যান্য স্থাবর সম্পত্তি, যার দাম প্রায় সাত হাজার ডলার, পাবে হার্ভে ও উইলিয়ম। এছাড়াও দুই ভাইকে তিন হাজার স্বর্ণমুদ্রা দিয়ে গেছে পিটার। ভাড়ার ঘরে লুকোন আছে মোহরগুলো।

টাকাপয়সা এখনই ভাগ করব আমরা, বলল সম্রাট। হাকলবেরি, একটা মোম নিয়ে আমাদের সাথে এস।

ভাঁড়ারে গিয়ে মোহরভর্তি ব্যাগ পেলাম আমরা। দুই ঠগ মোহরগুলো ঢেলে দিল মেঝেতে। এক সঙ্গে এত সোনা দেখে ওদের চোখ চকচক করে উঠল। ঝটপট মোহর গুনতে বসল ওরা। পুরো ছহাজার হল না, চারশো পনের ডলার কম।

ডিউক, এখন উপায়? জিজ্ঞেস করল সম্রাট। প্রত্যেকেই সন্দেহ করবে, টাকাটা মেরে দিয়েছি আমরা।

আমাদের ঘাটতি পুরিয়ে দিতে হবে, বলল ভিউক। পকেট ঝেড়ে নিজের সব কটা ডলার বের করল সে। সম্রাটও তার সব টাকা দিল।

ওপরে গেলাম আমরা। মোহরভর্তি ব্যাগটা টেবিলে রাখল ওরা। সম্রাট টাকা গোনার সময় সবাই হুঁমড়ি খেয়ে পড়ল। গোনা শেষ করে আরেকদফা ভাষণ দিল ঝাটা গোঁফ।

বন্ধুগণ, শুরু করল সে, আমার মরহুঁম ভাই এই এতিম মেয়েগুলোকে নিজের সন্তানের মতই ভালবাসত। আমার বিশ্বাস, পাছে আমরা, মানে উইলিয়ম আর আমি, দুঃখ পাই তাই সব টাকা এদের দিয়ে যায়নি সে। নইলে তা-ই করত। আমরাও ভাইয়ের বিদেহী আত্মাকে কষ্ট দিতে চাই না। মেরি জেন, সুসান, জোয়ানা, তোমরা এদিকে এস। এই টাকা তোমাদের প্রাপ্য, তোমরাই নাও। পিটারের আত্মা শান্তি পাবে এতে।

আনন্দে কেঁদে ফেলল তিন বোন। সম্রাট আর ডিউককে জড়িয়ে ধরে চুমু খেল গালে। কাকা, তোমরা সত্যিই মহান! বলল ওরা।

মেয়েগুলোর কথা শুনে ভিড়ের ভেতর থেকে এক লোক হো-হো করে হেসে উঠল। খানিক আগেই এসেছে সে। দীর্ঘদেহী, বলিষ্ঠ। তার এই আচরণে মর্মাহত হল সবাই।

রবিনসন, তুমি শোননি কিছু? বলল অ্যাবনার শ্যাফোর্ড। ও হার্ভে উইল।

স্মিত হেসে হাত বাড়িয়ে দিল সম্রাট। তুমি নিশ্চয়ই ডাক্তার, পিটারের বন্ধু, বলল।

তোমার সাথে হাত মেলাব না আমি, গম্ভীর গলায় বলল ডাক্তার। তুমি একটা ভণ্ড।

মুহূর্তে হতভম্ব হয়ে গেল সকলে। অনেক করে বোঝাতে চেষ্টা করল ডাক্তারকে, এই লোকই যে হার্ভে তাতে সন্দেহ নেই কারও। নানাভাবে সে প্রমাণ করেছে তা। এমনকি গায়ের কুকুরগুলোর নাম পর্যন্ত ঠিক ঠিক বলেছে।

কিন্তু ডাক্তার নাছোড়বান্দা। সম্রাটের কথা বলার ঢং নাকি একজন ইংরেজের মত নয়, খুবই নিচুস্তরের নকলমাত্র। তোদের বাবার বন্ধু আমি, মেয়েগুলোর দিকে ঘুরে বলল সে। অতএব তোদেরও বন্ধু। আমার কথা শোন, নিজেদের ভাল চাস তো এখুনি বের করে দে এই জোচ্চরগুলোকে। নইলে পস্তাতে হবে পরে।

এই নিন আমার জবাব, মোহরের থলেটা সম্রাটের হাতে দিয়ে বলল মেরি জেন। কাকা, তুমি যেটা ভাল মনে কর, তাতেই এই ছ হাজার ডলার খাটাও।

করতালির ধুম পড়ে গেল ঘরে, মনে হল যেন ঝড় উঠেছে। গর্বিত ভঙ্গিতে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে রইল সম্রাট, ঠোঁটের কোণে বিদ্রুপের হাসি। রোমান সম্রাটের মত।

বেশ, যা ভাল বোঝ কর তোমরা, বলল ডাক্তার। আমার আর কোন দায়দায়িত্ব রইল না। পরে বলতে পারবে না যে সাবধান করিনি। খুব শিগগিরই নিজেদের বোকামি বুঝতে পারবে তোমরা। ধীর গতিতে প্রস্থান করল ডাক্তার রবিনসন।

সবাই চলে যাবার পর সম্রাট মেরি জেনকে শুধাল তাদের বাড়তি কোন কামরা আছে কি-না। মেরি জানাল, আছে। সে-ঘরে উইলিয়ম কাকা থাকবে। নিজের ঘরটা সে হার্ভে কাকার জন্যে ছেড়ে দিচ্ছে, এ কামরা আগেরটার চাইতে একটু বড়। আর সে নিজে বোনেদের ঘরে শোবে। সেখানে একটা ক্যাম্পখাট আছে। এছাড়া আরও একটা ঘর আছে, চিলেকোঠা। খড়ের গদি বিছান আছে সেখানে।

ওখানে আমার চাকর থাকবে, বলল সম্রাট। চাকর বলতে আমাকে বোঝাল ব্যাটা ঝাটা গোঁফ।

রাতে বিরাট ভোজের আয়োজন করা হল। ও বাড়ির বন্ধু-বান্ধবরা সবাই এল। তিন বোনই মধুর ব্যবহার করল আমার সাথে, চাকর বলে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করল না।

মেহমানরা চলে যাবার পর বিছানায় শুয়ে ছটফট করতে লাগলাম আমি, কিছুতেই ঘুম আসছিল না। একটা কথাই মনে হচ্ছিল বারবার, নেমকহারামি করছি। ফুলের মত নিস্পাপ তিনটে মেয়ের সর্বনাশ করা উচিত হচ্ছে না। যে করেই হোক। রক্ষা করব ওদের, প্রতিজ্ঞা করলাম, সব ফাঁস করে দেব। পরক্ষণে বুঝলাম, বলে দিলে লাভ হবে না কোন। ঝেড়ে অস্বীকার করবে সম্রাট, আমাকে নাকাল করবে। অনেক মাথা খাটিয়ে উপায় ঠাউরালাম একটা: টাকাগুলো অন্য কোথাও সরিয়ে রেখে চুপিসারে সটকে পড়ব এখান থেকে। পরে চিঠিতে সব জানাব মেরি জেনকে। টাকাগুলো কোথায় পাওয়া যাবে তাও লিখব।

চিলেকোঠা থেকে নেমে পা টিপে টিপে সম্রাটের ঘরে গেলাম। অন্ধকার কামরা। কিন্তু বাতি জ্বালাতে সাহস হল না। হাতড়ে ফিরতে লাগলাম। হঠাৎ দুজোড়া পায়ের শব্দ পেলাম। বুঝলাম, আসছে ওরা। ঝট করে একটা পর্দার আড়ালে লুকিয়ে পড়লাম। বাটপার দুটো ঘরে ঢুকে বিছানায় বসল।

ব্যাপার কী, এই অসময়ে? ডিউককে প্রশ্ন করল সম্রাট।

ভয় করছে, ডিউকের জবাব। বিশেষ করে ওই ডাক্তার লোকটাকে সুবিধের মনে হচ্ছে না। সূর্য ওঠার আগেই সোনা নিয়ে এখান থেকে আমাদের কেটে পড়া উচিত।

ভূতে পেয়েছে। বাকি সম্পত্তি বিক্রি না-করেই! না বাপু!

এক থলে মোহরই তো যথেষ্ট, মিনমিন করল ডিউক। তাছাড়া ওই মেয়েগুলোর মাথায় বাড়ি দিতে চাই না আমি। আমাদের খুব যত্ন-আত্তি করছে ওরা।

বোকার মত কথা বলো না, খেঁকিয়ে উঠল সম্রাট। পরে সবাই যখন টের পাবে আমরা আসল লোক নই, তখন আমাদের কবলা খারিজ হয়ে যাবে। ফলে ওদের বাড়িঘরদোর ওদেরই থাকবে। মাঝখানে থেকে ফাঁকতালে বাজি মারব আমরা।

ঠিক আছে, হাল ছেড়ে দিল ডিউক। তবে টাকাগুলো ভাল করে লুকিয়ে রাখা দরকার।

ঠিক, সায় দিল সম্রাট। আমি যে পর্দার আড়ালে রয়েছি সেদিকে এগিয়ে এল সে। আমার পেছনেই মেরি জেনের অালনা। আলনাটার পেছনে আশ্রয় নিলাম। পর্দা সরিয়ে ভেতরে এল সম্রাট, ভয়ে আমার বুক ঢিপঢিপ করে উঠল। তবে একটুর জন্যে আমাকে দেখতে পেল না ঝাঁটা গোঁফ। যা খুঁজছিল, সেই ব্যাগটা নিয়ে চলে গেল।

কার্পেটের নিচে লুকিয়ে রাখ, পরামর্শ দিল ডিউক। ওর কথা মেনে তা-ই করল সম্রাট। তারপর দুজনাই বেরিয়ে গেল।

ওরা সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামার আগেই থলেটা বাগিয়ে নিলাম আমি, অন্ধকারে পথ হাতড়ে চিলেকোঠায় ফিরে এলাম। জানি, থলে বাসায় রাখা ঠিক হবে না। সারা বাড়ি তন্নতন্ন করে খুঁজবে ওরা। ধরাচুড়া নিয়েই শুয়ে পড়লাম। ঘুম আসবে না জানি, কাজ না-সারা অবধি শান্তি নেই। একটু বাদে পায়ের শব্দ পেলাম দোতলার সিঁড়িতে। আমার দোরগোড়া থেকে কাঠের মই নেমে গেছে দোতালায়। সেটার ধাপিতে থুতনি রেখে নিচে তাকিয়ে রইলাম, কিছু ঘটে কি-না দেখব।

ঠায় উপুড় হয়ে আছি সে-ই তখন থেকে, পেটের পেশিতে লাগছে চিনচিন করে। মাঝরাতের পর সব কোলাহল থেমে গেল। মওকা বুঝে সুড়ুৎ করে নিচে নামলাম আমি।

নিঃসাড়ে এগিয়ে গিয়ে সম্রাটের দরজায় কান পাতলাম। তারপর ডিউকের দরজায়। দুজনেই যেন নাকে সরষের তেল দিয়ে ঘুমুচ্ছে। এবার পায়ের আঙুলে ভর দিয়ে নিচতলায় নেমে গেলাম। কোথাও কোন শব্দ নেই। মুর্দাফরাশেরা ঘুমে অচেতন। হঠাৎ পেছনে শব্দ, মনে হল কেউ আসছে। দৌড়ে বসার ঘরে ঢুকলাম। চারপাশে চোখ বুলিয়ে দেখে নিলাম একবার, কোথায় লুকোন যায় থলেটা। কফিনের ওপর আমার চোখ স্থির হল। ডালা সরে যাওয়ায় ফাঁক হয়ে আছে কফিন। পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে কাফনে মোড়া লাশের মুখ। চটপট পিটারের একটা কনুইয়ের নিচে মোহরের থলে চালান করে দিলাম আমি। জিনিসটা রাখার সময় গা শিরশির করে উঠল। লাশের হাত দুটো বরফের মত ঠাণ্ডা। তারপর একছুটে কবাটের আড়ালে গিয়ে লুকিয়ে পড়লাম।

মেরি জেন ঘরে ঢুকল। সোজা কফিনের কাছে গিয়ে হাঁটু মুড়ে বসল। উঁকি দিল ভেতরে। তারপর রুমালে মুখ ঢাকল। আওয়াজ না পেলেও বুঝলাম কাঁদছে।

চুপিসারে আবার ফিরে গেলাম ঘরে। মনটা দমে গেছে, বোধহয় মাঠে মারা গেল এত খাটনি!

সকালে যখন নিচে নামলাম তখন বৈঠকখানা বন্ধ। পাহারাদারেরা চলে গেছে।

ধারেকাছে ওই তিন বোন, বিধবা মিসেস বার্টলি এবং আমরা ছাড়া কেউ নেই। শয়তান দুটোর মুখ দেখে বোঝার চেষ্টা করলাম রাতের ঘটনার কথা ওরা জানে কি-না। মনে হল জানে না, নির্লিপ্ত চেহারায় বসে আছে উভয়ই।

দুপুরের পর কবরে নামান হল লাশ। শেষবারের মত পিটারের মুখ দেখিয়ে কফিনের ঢাকনা পেরেক মেরে বন্ধ করে দিল মুর্দাফরাশেরা। বুড়ো পিটার উইলসের সাথে মোহরের থলিও কবরবাসী হল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *