১৫. চাতালে উঠে এল এরিক

চাতালে উঠে এল এরিক। একই জায়গায় ভিড় করেছে সবাই, কেবল বিগ জুলিয়া বাদে, দৃষ্টি উত্তর-পুবের মরুভূমির দিকে।

শেষ বিকেলের আলোয় গাঢ় নীল রঙ পেয়েছে পাহাড়সারি, তবে নরকে মরুভূমির লাগোয়া এলাকায় ছায়ার কারণে খানিকটা কালচে দেখাচ্ছে। বিস্তীর্ণ মরুভূমি, শেষ বিকেলের ফ্যাকাসে আকাশ, নিঃসঙ্গ গুটিকয়েক তারা, অর্ধচন্দ্রাকৃতির সেগুয়েরো ঝোঁপ…শুধু এসবই চোখে পড়ল। শোলা ক্যাকটাসের যেন নিজস্ব ঔজ্জ্বল্য রয়েছে, অপেক্ষাকৃত জ্বলজ্বলে দেখাচ্ছে ওগুলোকে।

কোথাও প্রাণের কোন চিহ্ন নেই।

কিছুক্ষণ পর দেখতে পেল, আগুনটা। কয়েক মাইল দূরে, পাহাড়ের এক পাশে। আগুন যে, তাতে কোন সন্দেহ নেই।

এত বড় করে আগুন জ্বালাল কে? স্বগতোক্তির সুরে জানতে চাইল ড্যান কোয়ান।

যত বড় ভাবছ, তত বড় নয়, বলল এরিক। নির্মেঘ রাতে উঁচু জায়গা থেকে কয়েক মাইল দূরের আলোও দেখা যায়। আগুনটার দূরত্ব হয়তো দশ মাইল, কিংবা পনেরো মাইলও হতে পারে। সাদা মানুষের জ্বালানো আগুন, মন্তব্য করল চিড়ল। এত বড় আগুন জ্বালায় না ইন্ডিয়ানরা।

তাতে আমাদের কী যায়-আসে? ত্যক্ত স্বরে বলল ডুগান।

কয়েক মাইল দূর থেকে চোখে পড়ে, এমন আগুন যদি ওরা তৈরি করতে পারে, তা হলে আমরাও এমন একটা তৈরি করতে পারব, যাতে চোখে পড়ে ওদের। সমস্যার কথা হচ্ছে আগুনটা জ্বালাতে হবে পাথরের উপর, নইলে দেখতে পাবে না ওরা

পাথরের কাছাকাছি যাওয়া মানে ইন্ডিয়ানদের গুলিতে ফুটো হওয়ায় তীব্র স্বরে প্রতিবাদ করল ডুগান।

চাইলে দেখা না দিয়েও, নীচ থেকে আগুন জ্বালিয়ে রাখতে পারব আমরা, বাতলে দিল এরিক। দৃষ্টিসীমার বাইরে থেকেই আগুনে কাঠি ঠেলে দেওয়া যাবে। চ্যাপ্টা ওই পাথরটার উপর আগুন ধরাব। সচরাচর যেখানে দাড়িয়ে থেকে মরুভূমির দিকে নজর রাখে ওরা, ওই জায়গার ঠিক পিছনে পাথরটার অবস্থান। চিন্তা কোরো না, আমি নিজেই তৈরি করব আগুনটা। সবাই মিলে এবার হাত লাগাও, যতটা পারো কাঠ যোগাড় করে নিয়ে এসো।

ক্যাম্পে কয়েকটা কাঠি আগে থেকে ছিল, ওগুলো তুলে নিয়ে চ্যাপ্টা পাথরের কাছে চলে এল এরিক। চারপাশে পাথরের মধ্যে ওটাই সবচেয়ে উঁচু, এরিকের কাধ সমান উঁচুতে। দ্রুত কাজে নেমে পড়ল ও, সবকটা কাঠি সাজিয়ে রাখল পাথরের উপর, তার উপর রাখল শুকনো লতাপাতা; শার্টের হাতা থেকে এক টুকরো ছিড়ে যোগ করেছে পাতার সঙ্গে, পাশেই রাখল ছোট ছোট কাঠি। আগুন জ্বালাতে তেমন বেগ পেতে হলো না। ততক্ষণে জ্বালানি কাঠ, নিয়ে চলে এসেছে অন্যরা। ঝুঁকে পড়ে পাথরের কাছে চলে এল এরিক, সতর্কতার সঙ্গে কাঠি যোগ করল আগুনে, যাতে মরুভূমি থেকে ওকে চোখে না পড়ে।

কিছুক্ষণের মধ্যে বেশ বড়সড় হয়ে জ্বলতে শুরু করল আগুন। লেলিহান শিখা উঠে যাচ্ছে কয়েক ফুট, চ্যাপ্টা পাথরের বুকে প্রায় কয়েক ফুট পরিধির জায়গা জুড়ে জ্বলছে। শিখাদের নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতা চলছে, কে কতটা উঁচু আর উজ্জ্বল হতে পারে। ক্রমাগত কাঠ জুগিয়ে চলল ওরা। কিছুক্ষণের মধ্যে অন্তত দশ ফুট উঁচু শিখা জ্বলতে শুরু করল। ঝোঁপের নীচে পড়ে থাকা শুকনো ডালপালা, কাঠি আর কাঠ আনতে চলে গেল কেউ কেউ। বেশ উৎসাহের সঙ্গে কাজটা করছে সবাই।

হঠাৎ বিচ্ছিন্ন একটা গুলি ছুটে এসে আঘাত করল আগুনের কাছাকাছি, পাথরে, বিই শব্দে রিকোশেট ছুটল অন্যদিকে। শব্দটা কলজে কাঁপানো। প্রায় সঙ্গে সঙ্গে একযোগে গুলি শুরু করল অ্যাপাচিরা, বুঝে ফেলেছে আগুনের কাছাকাছি রয়েছে ওরা, দেখতে না পেলেও পাথরে গুলি ছুঁড়ে রিকোশেটের মাধ্যমে লক্ষ্যভেদ করতে চাইছে।

পরিস্থিতিটা বিপজ্জনক, তবে পাথুরে চাতালের আড়াল থাকায় কারও বিপদ হলো না। অপেক্ষায় আছে ওরা। গোলাগুলির ঝড় থামতে উঠে দাঁড়াল, নীচে নেমে গেল আরও কাঠ আনতে। অ্যারোয়োয় ঢুঁ মেরে এক মানুষের বাহুর চেয়েও চওড়া এক ফালি কাঠ খুঁজে পেল ড্যান কোয়ান।

বগলদাবা করে বিগ জুলিয়াকে কাঠ নিয়ে আসতে দেখে রীতিমত বিমূঢ় বোধ করল এরিক। পাথরের কাছে এসে ওগুলো নামিয়ে রাখল মহিলা, তারপর ফিরে গেল আরও আনতে। একটা শব্দও উচ্চারণ করল না, কিংবা একবার তাকালও না কারও দিকে। কাঠ নিয়ে ফিরে আসার সময় হঠাৎ মেলানির দিকে ফিরল জুলিয়া, বলল: মেলানি, এবার বোধহয় আমাদের ধরতে আসবে ওরা।

অস্বাভাবিক কোমল কণ্ঠ, অনুত্তেজিত, নিঃসঙ্কোচ। চোখে প্রশ্ন নিয়ে এরিক ক্রেবেটের দিকে তাকাল মেলানি, বুঝতে পারছে না আসলেই সত্যি বলেছে কি-না জুলিয়া।

ব্যস্ততার সঙ্গে কাজ করছে ওরা। প্রচণ্ড গোলাগুলির মধ্যেও আগুনটাকে জিইয়ে রাখতে সক্ষম হলো। রাইফেল নিয়ে পাথুরে চাতালে চলে এসেছে এরিক, শত্রুদের উদ্দেশে পাল্টা গুলি করছে আন্দাজের উপর। বন্দুকের গানফ্ল্যাশ দেখেছে, এমন আশ্রয় বা ঝোঁপের উদ্দেশে গুলি করছে। একবার লক্ষ্যভেদ করতে সক্ষম হলো ও, আর্তনাদটা সবাই শুনতে পেল, তারপর ক্ষণিকের জন্য একেবারে শান্ত হয়ে গেল সব

লকলক করে জ্বলছে আগুনের লেলিহান শিখা, নীল আকাশের পটভূমিতে লালচে-সোনালি রঙ ধারণ করেছে। আশপাশে কম্নেক ফুট পর্যন্ত সব জায়গা দিনের আলোর মত আলোকিত হয়ে উঠেছে। গোলাগুলি চলছে সমানে।

দূরে, পাহাড়ী আলোর ঔজ্জ্বল্য কমে এসেছে। সত্যি কি বন্ধুভাবাপন্ন কেউ জ্বালিয়েছে ওটা? এতদূর থেকে ওটাকে ওদের কাছে মনে হচ্ছে এমন একটা সঙ্কেত, যেটা বাড়ি, নিরাপত্তা, বন্ধু বা মুক্তির উপায় নির্দেশ করছে। তবে মনে যাই হোক, বাস্তবের সঙ্গে এর আকাশ-পাতাল, ফারাক। ওদের আগুনটা দেখেছে তারা? কিংবা দেখলেও কি গুরুত্ব দেবে কেউ?

গুলির শব্দ আর গানফ্ল্যাশ দেখে বোঝা যাচ্ছে আগের চেয়ে অনেক কাছে চলে এসেছে অ্যাপাচিরা। ছোট্ট জায়গাটাকে ঘিরে অবস্থান নিয়েছে এরিকরা, পাল্টা গুলি করছে অন্ধকারে লুকিয়ে থাকা টার্গেটকে নিশানা করে।

চালিয়ে যাও, চিডলকে বলল এরিক। আগুন দেখতে না পেলেও গোলাগুলির শব্দ শুনতে পাবে ওরা। বাতাস একেবারে পরিষ্কার।

তারপরও এটাকে দুরাশাই বলা চলে। সকালের মধ্যে ওদের ঘেরাও করে ফেলবে ইন্ডিয়ানরা। ভোরের প্রচণ্ড ঠাণ্ডায় যখন ক্লান্ত হয়ে পড়বে ওরা, আগুনটা নিশ্চই নিভে যাবে তখন। প্রতিটি লোক থাকবে ক্লান্ত, পর্যদস্ত; অথচ পুরো একটা দিন পড়ে থাকবে সামনে। সারাটা দিন কি অ্যাপাচিদের ঠেকিয়ে রাখতে পারবে ওরা?

যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে এরিকের মনে। চূড়ান্ত ব্যাপারটা কালই ঘটবে।

কেউ আমাদের সঙ্কেত দেখতে পাবে বলে ভড়কে যাবে ওরা, বলল এরিক। কারও না কারও চোখে পড়বে নিশ্চই। ঝুঁকিটা নেবে না ওরা, কাল সকালে চূড়ান্ত হামলা করবে, যাতে কেউ এখানে পৌঁছা’নোর আগেই কাজ শেষ করে ফেলতে পারে।

হঠাৎ চেঁচিয়ে উঠল বিগ জুলিয়া। কর্কশ, চাপা চিৎকারটা শুনে চমকে উঠল সবাই। দ্রুত জুলিয়ার দিকে ফিরল ওরা, দেখল সতর্ক পায়ে পিছিয়ে যাচ্ছে জেফ কেলার। ভারী স্যাডল ব্যাগ দুটো দখল করে ফেলেছে সে। ডান হাতে বিশাল একটা কোল্ট শোভা পাচ্ছে, সবকটা দাঁত বের করে হাসছে সে।

আগুনটা যেখানেই থাকুক, বলল বিশালদেহী সৈনিক। এর মানে হচ্ছে আগুনের পাশে লোকজনও আছে। আর যেখানে লোক আছে, সেখানেই যেতে চাই আমি। সাহায্য পাব তা হলে।

সব সোনা ফিরিয়ে দাও ওকে, নির্দেশ দিল এরিক। আচমকা বরফশীতল হয়ে গেছে ওর কণ্ঠ, চাহনি কঠিন। পিস্তল ফেলে দাও, কেলার। তারপর চাইলে চলে যেতে পারবে তুমি।

গোল্লায় যাও তুমি! সখেদে খেকিয়ে উঠল সে। পায়ে পায়ে ঘোড়ার কাছে চলে যাচ্ছে সে, চোখের কোণ দিয়ে দেখতে পেল একটা ঘোড়ার পিঠে স্যাডল চাপানো রয়েছে। চাইলে থাকতে পারো তুমি, ক্রেটে, কিন্তু আর এক মুহূর্তও এখানে থাকতে রাজি নই আমি।

এরিকের উপর থেকে মুহূর্তের জন্যও চোখ সরায়নি সে, হাসিও ম্লান হয়নি; কোল্টের নল স্থির হয়ে আছে এরিকের পেট বরাবর। পিছিয়ে যেতে যেতে সবার উপর নজর রাখছে কেলার, হস্তগত হওয়া সোনা আর একটা ঘোড়া দখল করার প্রয়োজনীয়তা ছাড়া এ-মুহূর্তে কিছুই নেই, তার মনে।

স্থিরদৃষ্টিতে তাকে দেখছে এরিক, নিশ্চিত জানে একটা সুযোগ আসবেই। কিন্তু কেলার অতি সতর্ক মানুষ। লাথি মেরে জুলিয়ার শটগানটা দূরে ঠেলে দিয়েছে। এরিকের মত অন্যরাও জানে বিনা দ্বিধায় যে-কাউকে খুন করবে কেলার, কাউকে বাধা হয়ে দাঁড়াতে দেবে নিজের পথে।

অন্যদের উপর দৃষ্টি রেখেই স্টিরাপে পা রাখল সে, শরীরে মোচড় তুলে উঠে পড়ল, স্যাডলে। এদের যে-কেউ বিপজ্জনক শত্রু হয়ে উঠতে পারে, মুহূর্তের জন্যও ভুলে যায়নি কেলার, সবার উপর চোখ রেখেছে, কাউকে কোন সুযোগ দিচ্ছে না; কিন্তু নিজের মাথাটা যে নিচু রাখতে হবে, অতি সতর্কতার কারণে বেমালুম বিস্মৃত হয়েছে

ঘোড়াটা প্রথম লাফ দিয়েছে, এসময় পাথরের আড়াল থেকে গর্জে উঠল একটা রাইফেল, এবং বিস্ময়ে আড়ষ্ট হয়ে গেল জেফ কেলারের দেহ। দৌড়ের মধ্যে পাথরসারি ছাড়িয়ে বালির কাছে চলে গেল ঘোড়াটা, তখনই স্যাডল থেকে হুড়মুড় করে পড়ে গেল বিশালদেহী সৈনিকের মৃতদেহ, তবে পুরোপুরি খসে পড়ল না, স্টিরাপে একটা পা আটকে রয়েছে।

কেলারকে টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে চলল ঘোড়াটা, কয়েক কদম এগিয়ে যাওয়ার পর ভারী শরীরের চাপে একপাশে হেলে পড়ল স্যাডলটা, হেঁচড়ে নেমে এল। থেমে গেল ঘোড়াটা। স্টিরাপে এখনও এক পা আটকে আছে কেলারের।

দৌড়ে পাথরের কাছে চলে গেল ডুগান। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কী। দেখছ সবাই? সোনাগুলো হাতছাড়া করা যাবে না!

চুলোয় যাক সোনা! ত্যক্ত স্বরে বলল এরিক। ওই ঘোড়াটা দরকার আমাদের।

পাথরের ফাঁক গলে ছুটে চলেছে মার্ক ডুগান। পিছন থেকে চিৎকার করে তাকে থামানোর প্রয়াস পেল এরিক। ফিরে এসো, ডুগান! নইলে তোমাকেও নিকেশ করে ফেলবে ওরা?

কে শোনে কার কথা! হিতাহিত জ্ঞান লোপ পেয়েছে মার্ক ডুগানের। মুহূর্তের জন্য সামান্য দ্বিধা করল সে, তারপর ছুটে বেরিয়ে গেল খোলা জায়গায়, ঢাল পেরিয়ে এক দৌড়ে চলে গেল দাঁড়িয়ে থাকা ঘোড়াটার কাছে। সরে যাওয়ার চেষ্টা করল ঘোড়াটা, কিন্তু হাঁটু গেড়ে ওটার পাশে বসে পড়ল ডুগান, এস্ত হাতে স্যাডল ব্যাগের বাধন খুলতে শুরু করল।

এদিকে বসে থাকেনি এরিকরা। রাইফেল হাতে ডুগানকে কাভার করছে এরিক, ডেভিস আর ড্যান। উল্টোদিক থেকে সতর্ক দৃষ্টি রেখেছে টনি চিডল, মিচেলের রাইফেল হাতে ওর পাশে অবস্থান নিয়েছে মিমি রজার্স।

উন্মত্ত হয়ে গেছে ডুগান। ঝকি দিয়ে স্যাডল ব্যাগের বাঁধন মুক্ত করল, তারপর ফিরে আসার চেষ্টা না করে এক টানে পেটি ঢিলে করে উন্মুক্ত করে ফেলল ঘোড়ার পিঠ। এবার এক লাফে স্যাডলহীন ঘোড়াটার পিঠে চেপে বসল সে। নির্দয়ভাবে বুট দিয়ে আঘাত করল ওটার পাঁজরে, চমকে লাফিয়ে উঠল ঘোড়াটা।

আস্ত বেকুব! রাগে কেঁপে উঠল এরিকের কণ্ঠ। পালানোর চেষ্টায় আছে ও!

সন্ত্রস্ত খরগোশের মত ছুটছে ঘোড়াটা। নিচু স্বরে খিস্তি করল বেন ডেভিস। উচিত কাজই করেছে। ঠিকই পালিয়ে যেতে পারবে ও! বেকুব আসলে আমরাই, এখানে বসে থেকে অপেক্ষায় আছি ঈশ্বরের কৃপায় হয়তো মুক্তি পেয়ে যাব!

খোলা মরুভূমি ধরে তুফান বেগে ছুটছে ঘোড়াটা, ক্রমশ দূরে সরে যাচ্ছে, এসময় গুলির শব্দ শুনতে পেল ওরা। একটা-দুটো নয়, অসংখ্য রাইফেলের গর্জনে কেঁপে উঠল এলাকার নিস্তরঙ্গ বাতাস। যেন অদৃশ্য কোন দৈত্য হ্যাচকা টান দিয়েছে পিছন থেকে, মুহূর্তে স্যাডলচ্যুত হলো ডুগান। বালির উপর পড়ে ছিটকে সরে গেল কয়েক গজ, তারপর স্থির হয়ে গেল দেহটা। পরমুহূর্তে এক লাফে খাড়া হলো ডুগান, ঘুরেই ছুটতে শুরু করল ওদের দিকে, যেন বোধধাদয় হয়েছে; পিছনে আধ চক্কর ঘুরে দাঁড়িয়ে পড়ল ঘোড়াটা, ফিরে তাকাল অদ্ভুত সওয়ারীর দিকে।

মরিয়া চেষ্টায় দৌড়াচ্ছে ডুগান। ওদের কাছ থেকে বেশ দূরে রয়েছে সে, ফিরে আসতে পারবে না বুঝতে পেরে কূপের পাদদেশে পাথরের চক্রের উদ্দেশে ছুটছে।

সম্ভবত পৌঁছে যাবে ও! বলল ড্যান।

পারবে না, মাথা নাড়ল এরিক। সামান্য সম্ভাবনাও নেই ওর। ওকে নিয়ে খেলছে অ্যাপাচিরা, মওকা পেয়ে মজা লুটছে। কাছাকাছি পৌঁছে গেলে তবে গুলি করবে। বিমূঢ় দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকাল মেলানি। এটাই ঘটবে, দেখো, যোগ করল এরিক। কোন চান্সই নেই ডুগানের।

এদিকে ছুটে চলেছে ডুগান, ক্লান্তি ভুলে গেছে যেন। ঢালের গোড়ায় পৌঁছে গেছে প্রায়, আচমকা হুমড়ি খেয়ে পড়ে গেল, নরম বালির উপর গড়ান খেল দেহটা। পড়িমরি করে উঠে দাঁড়াল সে, টলমল পায়ে এগোল দুই কদম, দৃষ্টি নামিয়ে নিজের পায়ের দিকে তাকাল। বুলেটে ফুটো হয়ে গেছে একটা স্যাডল ব্যাগ। সোনা নয়, বালি আর ছোট ছোট নুড়িপাথর গড়িয়ে পড়ছে ফুটো দিয়ে!

বরফের মত জমে গেছে যেন, স্থির দাঁড়িয়ে আছে ডুগান। বেকুব বনে গেছে। নিজের চোখে দেখেও বিশ্বাস করতে পারছে না। তারপর ঘুরে দাঁড়িয়ে পাথুরে চাতালের দিকে তাকাল।

অবিশ্বাসে উন্মত্ত হয়ে গেছে ডুগান, অন্য স্যাডল ব্যাগটা তুলে নিয়ে ছিড়ে ফেলল। ভিতরের সবকিছু উজাড় করে দিল বালির উপর, কিন্তু লাভার ছোট ছোট চাঙড়, বালি আর নুড়িপাথর ছাড়া কিছু বেরোল না। এক রত্তি সোনাও নেই! হঠাৎ নিজের অবস্থান সম্পর্কে পুরোপুরি সচেতন হলো সে-এই প্রথম খোলা জায়গায় রয়েছে; ঝট করে সিধে হলো, চকিত দৃষ্টি হানল চারপাশে। আশপাশে কেউ নেই, নিরাপদ আড়াল থেকে অন্তত ষাট গজ দূরে রয়েছে!

মূল্যহীন ব্যাগটা ছেড়ে দিয়ে দৌড়াতে শুরু করল ডুগান। এখন আর অতটা জোর নেই, দৌড়াচ্ছেও টলমল পায়ে। পাথুরে চাতাল থেকে এরিকরা দেখতে পেল মরিয়া চেষ্টার ছাপ স্পষ্ট ফুটে উঠেছে মার্ক ডুগানের মুখে, ক্লান্তির চেয়ে হতাশাই বেশি প্রকাশ পাচ্ছে। ঢালের উদ্দেশে ছুটল সে, মনে হলো, পৌঁছতে সক্ষম হবে, তখনই খুব দ্রুত তিনটা গুলির শব্দ হলো। হঠাৎ যেন পিছন থেকে খামচে ধরেছে কেউ, আচমকা স্থির হয়ে গেল ডুগানের দেহ, বাঁকা হয়ে গেল পিঠ, আধ-পাক ঘুরে যাওয়ার পর সটান হেলে পড়ল পিছনে। গড়িয়ে ঢালের নীচে চলে গেল লাশটা।

বোকা! তোমরা সবাই আস্ত বোকা! আঙুল তুলে দেখাল বিগ জুলিয়া, হিস্টিরিয়াগ্রস্তের মত শোনাচ্ছে কণ্ঠ। দেখো! ভাল করে দেখে নাও! দৌড়ে পাথরসারির কাছে চলে গেল ও, ক্যানভাসের টুকরো সরিয়ে দিল এক টানে। আমাকে কী মনে করেছ, এতই বোকা? সময়মত সোনা সরিয়ে ফেলেছি, বালি আর পাথরের জন্য অহেতুক জীবন বিলিয়ে দিল ওরা! কর্কশ স্বরে হাসতে থাকল মহিলা, হাসিটা পুরুষদের অট্টহাসির মতই শোনাল ওদের কানে

হতচকিত চোখে জুলিয়ার দিকে তাকিয়ে আছে মেলানি। কজি চেপে ধরে ওর মনোযোগ অন্য দিকে ফেরাল এরিক, বলল মাথা খারাপ হয়ে গেছে ওর। একেবারে পাগল হয়ে গেছে!

সহসা মুহুর্মুহু গর্জে উঠল টনি চিডলের বন্দুক, লক্ষ্যে গুলি বেঁধার ভোঁতা শব্দ স্পষ্ট শুনতে পেল ওরা। মুহূর্ত কয়েক অপেক্ষা করল পিমা

ইন্ডিয়ান, তারপর আরও একবার গুলি করল, আগের চেয়ে একটু নিচুতে। ওর লক্ষ্য, উদ্দিষ্ট ঝোঁপটা সামান্য নড়ে উঠল, যেন হাত দিয়ে সরিয়েছে কেউ, শেষে একেবারে স্থির হয়ে গেল।

কোথাও কোন নড়াচড়া নেই। নিচু দিয়ে বইছে বাতাস, ব্যস, এই হচ্ছে প্রকৃতির সাড়া।

এরিক, ফিসফিস করল মেলানি। মনে হলো দূরে..বহু দূরে ধুলোর ঝড় দেখতে পেয়েছি!

তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকাল ওরা। বুঝতে পারছে না। কয়েকটা ঘোড়ার খুরের আঘাতে উড়ন্ত বালি দেখতে পাচ্ছে, নাকি ছোট্ট বায়ুপ্রপাত? মরুভূমিতে এমন বালি-ঝড় সবসময়ই চোখে পড়ে। তাপতরঙ্গের কারসাজি নয়তো? নিশ্চিত হওয়ার উপায় নেই। নিষ্পলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকল ওরা, একসময় ক্লান্তিতে ব্যথা বোধ হলো চোখে, কিন্তু আর কোন নড়াচড়া চোখে পড়েনি।

হঠাৎ গোলাগুলি শুরু হলো আবার। বালি চটকাচ্ছে গুলি, কিংবা পাথরে লেগে ছিটকে যাচ্ছে। দ্রুত জায়গা বদল করছে এরিক, কোথাও থাকছে না বেশিক্ষণ, নড়াচড়া চোখে পড়লে বা সম্ভাব্য কার্ভার দেখামাত্র গুলি করছে। যেন ছায়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে, কিন্তু জানে যে ওদের প্রতিরক্ষার ছোট্ট ব্যহ যদি ভেদ করতে সক্ষম হয় অ্যাপাচিরা, নিমেষে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে সবাই। আচমকা সবাই মিলে যদি ছুটে আসে, হয়তো পতন হবে ওদের। জ্বলন্ত আগুনটা কারও দৃষ্টিগোচর হলে সাহায্য পাবে, এই আশাও চিরতরে নিভে যাবে তা হলে।

গোলাগুলির তীব্রতা কমে এসেছে, আগের চেয়ে সতর্কতার সঙ্গে গুলি করছে অ্যাপাচিরা। মাত্র দু’একটা রাইফেলের গর্জন শোনা যাচ্ছে এখন, একটু পর ওগুলোও নীরব হয়ে গেল। কোন তীর ছুটে এল না। হঠাৎ করেই নিজেদের চারপাশে অস্বস্তিকর নীরবতা আবিষ্কার করল এরিকরা।

আশাহতের দৃষ্টিতে মরুভূমির দিকে তাকাল বেন ডেভিস, মনটা তেতো হয়ে আছে। শন্য মরুভূমি। কোথাও কিছু নেই। ঠিক ওর মনের

হ যদি ভেদ ক যুদ্ধ করছে, কি কাভার দেখামাত্র মতই। সমস্ত পরিকল্পনা ভেস্তে গেছে। এই কদিন আগেও অ্যারিজোনার সবচেয়ে সুন্দরী, কাভিক্ষতা ও ধনী মেয়েটির স্বামী হওয়ার সুযোগ ছিল ওর, কিন্তু কখন যে ফস্কে গেছে সুযোগটা! ওর কথা ভুলেই গেছে মেলানি। এর পিছনে আছে একজনই-এরিক ক্ৰেবেট।

অন্ধকার, অনিশ্চয়তায় ভরা ভবিষ্যৎ অপেক্ষা করছে ওর জন্য। পশ্চিমের সবচেয়ে ঘৃণ্য পেশায় ফিরে যেতে হবে-জুয়ার আড্ডার অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে কাটাতে হবে টাকা কামানোর ধান্ধায়, ঘামের দুর্গন্ধে ভরা নোংরা কিন্তু বেপরোয়া কিছু মানুষের পকেট খালি করার ফিকির করতে হবে সর্বক্ষণ; এত বিপজ্জনক জীবন যে যে-কোন দিন হয়তো ওর চেয়ে সেয়ানা কারও সামনে পড়ে যাবে, পিস্তলটা হয়তো সেদিন অত দ্রুত উঠে আসবে না হোলস্টার থেকে। সেদিন শেষ হয়ে যাবে বেন ডেভিসের সমস্ত জারিজুরি! জীবনে কখনও এই একটা জিনিসে অবহেলা করেনি সে-বরাবর চোখের পলকে পিস্তল ড্র করেছে। এ-মুহূর্তে এটাই ওর একমাত্র অবলম্বন কিংবা অবশিষ্ট সম্পদ।

ঠাণ্ডা মাথায় পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করল সে। মাত্র কয়েকজনই বেঁচে আছে এখন। পিছনে কোথাও লুকিয়ে রাখা হয়েছে সত্তর হাজার ডলারের সোনা, ওগুলো পেলে সান ফ্রান্সিসকোয় উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ গড়ে নিতে পারবে যে-কেউ। পছন্দমাফিক ব্যবসায় খাটাতে পারবে। সত্তর হাজার থেকে সত্তর বিলিয়নের মালিক হওয়াও বিচিত্র নয়, যদি সঠিক জায়গায় খাটানো যায়।

মরুভূমিতে কোথাও কিছু নড়ছে না।

ক্ৰেবেট। এই ব্যাটাই যত নষ্টের গোড়া! ক্রেবেট বাগড়া না দিলে মেলানিকে নিয়ে অনেক আগেই ইয়োমায় পৌঁছে যেত। আপদটাকে বিদায় করতে পারলে পরিস্থিতি হয়তো বদলে যেতেও পারে। না বদলাক, কিছু উন্নতি যে হবে তাতে কোন সন্দেহ নেই। মেলানিকে বোঝানো কঠিন হবে না, ক্রেবেট না থাকলে ওর কর্তৃত্ব মেনে নেবে। মেয়েটা। মিমি রজার্স বা ড্যান কোয়ান কোন ব্যাপারই নয়। ওদেরকে সামাল দিতে সমস্যা হবে না। টনি চিডল আছে অবশ্য, তবে হলুদ চামড়ার এই ব্যাটাকে এ-পর্যন্ত কেউই তেমন আমল দেয়নি; আর আছে জুলিয়া-এতক্ষণে বদ্ধ পাগল বনে না গেলেও বনতে দেরিও নেই।

লেনদেন শেষ হয়নি এখনও, এখান থেকে বেরিয়ে যাওয়ার আগে আরও দু’একজন যদি মারা পড়ে, এমন কিছু হেরফের হবে না

গতরাতে দূরের এক পাহাড়ে আগুন দেখেছিল ওরা। হয়তো সত্যি কেউ ছিল ওখানে। ব্যাপারটা তাৎপর্যপূর্ণ হতে পারে, আবার নাও হতে পারে; তবে একটা ব্যাপারে নিশ্চিত বেন ডেভিস-শুরুতে যা ছিল, এ মুহূর্তে এরচেয়ে অনেক কম ইন্ডিয়ান আছে চারপাশে। একটু আগে প্রচণ্ড গোলাগুলির সময়, একজন খুন হয়েছে ওর হাতে, নিশ্চিত বেন, অন্যরাও ছাড় দেয়নি। গত এক ঘণ্টায় অ্যাপাচিদের পক্ষ থেকে খুব কমই গুলি ছুটে এসেছে।

আশপাশে অপর্যাপ্ত আড়ালের কারণে প্রায় সমস্ত এলাকাই ওদের দৃষ্টিসীমায় ছিল, এমন কোন জায়গা ছিল না যেটা ওদের চোখে পড়ছে; তা ছাড়া, গত কয়েকদিনে যথেষ্ট গোলাগুলি হয়েছে। বিপদের সম্ভাবনা এখন অনেক কেটে গেছে।

জীবনে এমন কিছু মুহূর্ত আসে যখন চট করে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। যুদ্ধের পর দ্বিধা করেনি বেন ডেভিস, সিদ্ধান্ত নেওয়া মাত্র ঝটপট খামার বিক্রি করে পশ্চিমের উদ্দেশে পাড়ি জমিয়েছে। মেলানি রিওসকে দেখে এরকম দ্বিতীয় সিদ্ধান্তটা নিয়েছিল, সান ফ্রান্সিসকোয় গিয়ে মেলানির সঙ্গী হয়েছে। এখন ঠিক ওরকম একটা সিদ্ধান্ত নিতে হবে: নিশ্চিত ভবিষ্যৎ গড়ার প্রেরণা হিসাবে রয়েছে সত্তর হাজার ডলারের সোনা এবং কাঙ্ক্ষিতা এক নারী। সম্ভবত যে-কোন একটাকে বেছে নিতে হবে। তবে একটু চালাকি করলে হয়তো দুটোই পেতে পারে। কাজ উদ্ধারের জন্য হাতিয়ার হিসাবে রয়েছে প্রিয় সিক্স শূটারটা

পিস্তল তুলে ট্রিগার টিপে দিলেই হয়! প্রলোভনটা উপেক্ষা করা দুঃসাধ্য মনে হলো বেনের কাছে। ঠাণ্ডা মাথায় খুন হবে ব্যাপারটা। কিন্তু খুন আগেও করেছে সে। যুদ্ধের সময় যারা মারা গেছে, কিংবা এখানে যে-সব ইন্ডিয়ান ওদের হাতে মারা গেছে, সবই তো খুন। ধরা, যাক; ও ছাড়া অন্য কেউ যদি বেঁচে না থাকে? অস্বাভাবিকতা নেই এতে, কারণ ওরা সবাই মারা পড়তে পারে, এমনকী ও-ও এর বাইরে নয়। মাত্র একজন বা দুজন যদি শেষপর্যন্ত বেঁচে থাকে, আসলে কী ঘটেছে কারও পক্ষে নিশ্চিত বলা সম্ভব?

ফাঁকা দৃষ্টিতে বালির দিকে তাকাল বেন। অতীত অনেক পিছনে ফেলে এসেছে। ইচ্ছে করেই বাবার স্মৃতি ভুলে থাকে ও। বুড়োর মুখটা স্পষ্ট মনে পড়ল। এখন যে-কাজটা করতে যাচ্ছে বেন, বুড়ো যদি ছেলের এই ভবিষ্যৎ আঁচ করতে পারত, সঙ্গে সঙ্গে খুন করে ফেলত ওকে। তবে এমন পরিস্থিতিতেও কখনও পড়েনি বুড়ো। সবকিছু এখন নির্ভর করছে হাতের পিস্তল আর ওর উপর।

কোথাও কোন সাড়া নেই। নড়াচড়া, এমনকী বালিঝড়ও নেই। হলদেটে বর্ণ ধারণ করেছে আকাশ, জীবনে কখনও এমন দেখেনি বেন, মনে হচ্ছে গড়পড়তার চেয়ে অনেক উঁচু, বিশাল এবং শূন্য আজকের আকাশ। হলুদ বিশাল এক গোলক যেন।

বালিঝড় আসছে! পিছনে এরিক ক্রেবেটের কণ্ঠ শুনতে পেল ও। মারাত্মক বিপদ হতে পারে।

বালিঝড়…এমন ঝড়ে সমস্ত ট্রাক, ট্রেইল, এমনকী মানুষও চাপা পড়ে। মরুভূমির একটা অংশের পুনর্জন্ম হয় যেন, ঝড়ের আগের কোন কিছু অবশিষ্ট থাকে না, পুরু বালির নীচে চাপা পড়ে যায়। সময় আছে। অপেক্ষা করতেই মনস্থ করল বেন ডেভিস।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *