১৫. গহ্বরের মুখ

চওড়ায় বিশ ফুট, কিন্তু উচ্চতায় মাত্র দুফুট গহ্বরের মুখটা! এত কম উচ্চতায় চলবে না। আপাতত নেব আর পেনক্র্যাফট গাঁইতি চালিয়ে খানিকটা বড়ো করে নিল সুড়ঙ্গ-মুখ। চকমকি আর ইস্পাত ঠুকে দুটো মশালে আগুন জ্বালানো হলো। যুগ যুগ ধরে প্রবল বেগে পানি বয়ে যাওয়া আশ্চর্য সুড়ঙ্গে একে একে প্রবেশ করল সবাই। পথ সাঘাতিক পিচ্ছিল। পা পিছলে পড়ে যাবার ভয়ে একটা দড়ি কোমরের সাথে বেঁধে নিয়েছে অভিযাত্রীরা! আগে আগে চলেছে উত্তেজিত টপ।

তেমন ঢালু নয় গহ্বরের মেঝে। ক্রমশ উঁচুতে উঠে গেছে ছাদ। একটু পরই মাথা উচু করে দাঁড়াতে পারল ওরা। এগিয়ে চলল প্রকৃতির একান্ত গোপন এক পাথরের গুহাপথ ধরে।

হঠাৎ ঘেউ ঘেউ করে চেঁচিয়ে উঠল টপ। আরও একটু এগোবার পর দেখা গেল সুড়ঙ্গের শেষ মাথায় একটা কুয়ো। কুয়োটার পাড়ে উত্তেজিত ভাবে ছুটোছুটি করছে টপ, আর মাঝে মাঝে নিচের অন্ধকারের দিকে চেয়ে গোঁ গোঁ করে গজরাচ্ছে। যেন বলতে চাইছে, ওখানে কি করছিস? উঠে আয় দেখি, হয়ে যাক এক হাত।

সবাই উঁকি মেরে দেখল কুয়োর ভেতর। কিছুই নেই। হয়তো কোন জলজন্তু ঘাপটি মেরে ছিল ওখানে। ওদের আসতে দেখে পালিয়েছে। এই কুয়ো দিয়েই হ্রদের জল সাগরে গিয়ে পড়ত—অনুমান করলেন ক্যাপ্টেন। একটা জ্বলন্ত মশাল কুয়োর ভেতর ফেলে দিলেন তিনি। জ্বলতে জ্বলতে নেমে গেল মশালটা। পানির সংস্পর্শে আসতেই ছ্যাৎ করে নিভে গেল। মশালটার নিচে পড়তে কতটা সময় লেগেছে তা দেখে নিয়ে হিসেব করে বললেন তিনি, কুয়োর মুখ থেকে সমুদ্র সমতল প্রায় নব্বই ফুট নিচে।

গুহার দেয়ালে গাইতি দিয়ে ঠুকে দেখতে লাগলেন ক্যাপ্টেন। এক জায়গায় আওয়াজটা একটু হালকা মনে হওয়ায় ওই জায়গায়ই খুঁড়তে বললেন পেনক্র্যাফটকে। সাথে সাথে কাজে লেগে গেল সে। পেনক্র্যাফট পরিশ্রান্ত হয়ে গেলে ওর জায়গা দখল করল নেব। এরপর স্পিলেটের পালা। খুঁড়তে খুঁড়তে ছিদ্র হয়ে গেল দেয়াল। ক্রমশ বেড়ে চলল ছিদ্রের পরিধি। হঠাৎ হাত ফসকে দেয়ালের ফুটো দিয়ে ওপাশে ছিটকে পড়ল গাঁইতিটা। ক্যাপ্টেন মেপে দেখলেন তিন ফুট পুরু এখানকার দেয়াল। ফুটোটা দিয়ে আলো এসে পড়েছে গুহায়। পরিষ্কার দেখা গেল এবার গুহার ভেতরটা। এক প্রান্তে তিরিশ ফুট উঁচু গুহার ছাদ। ক্রমশ উঁচু হতে হতে প্রায় আশি ফুটে গিয়ে ঠেকেছে অন্য প্রান্তের ছাদ।

ঘর পেয়ে গেছি আমরা, গম্ভীর গলায় বললেন ক্যাপ্টেন, নিচু ছাদের তলায় হবে আমাদের ভাঁড়ার আর শোবার ঘর। উঁচু ছাদের তলায় বসার ঘর। একটা জাদুঘরও বানিয়ে নেয়া যাবে।

বাড়ির নাম? জিজ্ঞেস করল হার্বার্ট।

গ্রানাইট হাউস। সাথে সাথেই উত্তর দিলেন ক্যাপ্টেন।

হিপ হিপ হুররে! সমবেত চিৎকারে প্রতিধ্বনিত হলো গুহার দেয়াল। এরপর চিমনিতে ফিরে গেল সবাই।

পরদিন বাইশে মে। সকাল হতেই শুরু হলো নতুন আস্তানার কাজ। চিমনি গুহাটাকে রেখে দেয়া হলো ভবিষ্যৎ কারখানার জন্যে। প্রথমে দল বেঁধে গেল সবাই সমুদ্র তীরে। স্পিলেটের হাত ফসকে ছিটকে যাওয়া গাঁইতিটা পাওয়া গেল সেখানে। ওপরের দিকে তাকাতেই চোখে পড়ল পাহাড়ের গায়ের ফুটোটা। ঠিক হলো পাঁচটা কক্ষ করা হবে গ্রানাইট হাউসে। পাঁচটা ঘরের পাঁচটা জানালা। দরজা থাকবে মাত্র একটা। দরজা থেকে নিচে মাটি পর্যন্ত ঝোলানো সিঁড়ির ব্যবস্থা থাকবে।

হ্রদের দিকের ঢোকার পথটা বন্ধ করে দিতে হবে, বললেন ক্যাপ্টেন, নইলে অনাহুত উপদ্রব হানা দিতে পারে। সিঁড়ি বেয়ে গ্রানাইট হাউসে উঠে সিঁড়িটা তুলে নিলেই হবে। পাখি ছাড়া আর কেউ ঢুকতে পারবে না।

কিন্তু অত ভয় কাকে? জানতে চাইল পেনক্র্যাফট, সারা দ্বীপে তো জনমানবের চিহ্নও দেখলাম না।

এখন নেই। কিন্তু বাইরে থেকে আসতে কতক্ষণ?

পাথুরে দেয়াল ফুটো করে জানালা বানানোর কাজ শুরু করেই টের পেল ওরা, গাইতির কর্ম নয় এটা। কাজেই নাইট্রোগ্লিসারিনের সাহায্য নিতে হলো  জানালার জায়গা করার পর গাইতি আর শাবল দিয়ে ঠুকে ঠুকে ঠিক করে নিল জানালার অসমান ধারগুলো। পাঁচ ভাগ করা হলো গহ্বরটাকে। প্রতিটা ঘরের সামনের দিক থাকবে সাগরের দিকে। আবার তৈরি হলো ইট। সেই ইট গহ্বরে তোলার জন্যে বানানো হলো সিঁড়ি।

একাই সিঁড়ি তৈরির ভার নিল নাবিক পেনক্র্যাফট। বেত পাকিয়ে সিঁড়ির দুপাশের ঝুল দড়ি তৈরি হলো। আড়াআড়ি ভাবে লাগানো হলো কাঠের ধাপ। সিঁড়ির দৈর্ঘ্য দাঁড়াল আশি ফুট। ওপরের পাথরের চাতালে আটকানো হলো সিঁড়ির এক মাথা। মাঝ বরাবর আটকে দেয়া হলো আরেকটা চাতালে।

গাছের ছালের দড়ি, হাতে বানানো কপিকলে আটকে হাজার হাজার ইট তোলা হলো। প্রচুর চুন দিয়ে ইট গেঁথে পার্টিশান করা হলো গহ্বরের ভেতর। রান্নাঘরের ধোঁয়া বেরোবার চিমনিও তৈরি হলো ইট দিয়ে।

এদিককার কাজ শেষ হয়ে গেলে বড় বড় পাথর গড়িয়ে নিয়ে বন্ধ করে দেয়া হলো হ্রদের দিকের সুড়ঙ্গ মুখ। সিমেন্ট দিয়ে একটার সাথে আরেকটা পাথরকে আটকে দিয়ে তার ওপর পুরু করে মাটির প্রলেপ লাগিয়ে ঘাসের চাপড়া দেয়া হলো। নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল সুড়ঙ্গের মুখ। বাকি রইল ঘরের ফার্নিচার তৈরির কাজ। ওসব শীতকালের জন্যে মুলতবী রাখা হলো।

ওদিকে স্পিলেট আর হার্বার্ট আবিষ্কার করে বসেছে এক বিশাল খরগোশের আড্ডা। ঝাঁঝরির মত অসংখ্য গর্ত মাটির ওপর। ওরা সারা জীবন খেয়ে শেষ করতে পারবে না অত খরগোশ। ঘর হলো, খাবারের সংস্থান হলো। আর চিন্তা কি? এবার আসুক শীত। আসুক মালয়ী জলদস্যু।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *