১৪. মাপজোকের কাজ শুরু করলেন ক্যাপ্টেন

মাপজোকের কাজ শুরু করলেন ক্যাপ্টেন। আগের রাতের অর্ধেক বের করে রাখা ল্যাটিচিউডের কাজ শেষ করতে হবে, তাই সাগরতীর থেকে বিশ ফুট আর পাহাড় থেকে পাঁচশো ফুট দূরে একটা বারো ফুট লম্বা লাঠি পুঁতলেন ক্যাপ্টেন। লাঠিটার দুফুট রইল মাটির তলায়, দশফুট ওপরে। তারপর পিছু হটতে লাগলেন ক্যাপ্টেন! মাঝে মাঝে মাটিতে শুয়ে পড়ে দেখলেন লাঠির মাথা পাহাড়ের চূড়ার সাথে এক সরলরেখায় দেখা যাচ্ছে কিনা। যেখান থেকে সরলরেখায় দেখা গেল সেখানে একটা কাঠি পুঁতলেন। মেপে দেখা গেল কাঠি থেকে লাঠির দূরত্ব পনেরো ফুট আর পাহাড়ের দূরত্ব পাঁচশো ফুট  এবার শুরু হলো জ্যামিতির হিসাব। হার্বার্টকে বোঝালেন, সমকোণী ত্রিভুজ আকারে ছোট বড় হলেও অনুরূপ ভুজগুলো সমানুপাতিক। ঝিনুক দিয়ে মাটিতে অংক কষে পাহাড়ের উচ্চতা বের করে ফেললেন তিনি। পাহাড়টার উচ্চতা দেখা গেল তিনশো তেত্রিশ ফুট।

পাহাড়ের উচ্চতা মাপা শেষ করে আগের রাতে বানানো কাটা কম্পাস নিয়ে বসলেন ক্যাপ্টেন।  বালির ওপর একটা বৃত্ত একে বৃত্তটাকে ৩৬০ ভাগে ভাগ করলেন। কাঁটা কম্পাসের দুই কাটার মাঝখানের কৌণিক দূরত্ব পাওয়া গেল। কম্পাসের হিসেব অনুযায়ী দক্ষিণ মেরু থেকে আলফার উচ্চতা ২৭ ডিগ্রী  কৌণিক দূরত্বের সঙ্গে জোড়া হলো। এই ২৭ ডিগ্রী পাহাড়ের উচ্চতাকে সমুদ্রপৃষ্ঠের পর্যায়ে এনে অংক কষতেই সব মিলিয়ে হলো ৫৩ ডিগ্রী। মেরু থেকে নিরক্ষরেখা ৯০ ডিগ্রী। এখন ৯০ ডিগ্রী থেকে ৫৩ ডিগ্রী বাদ দিয়ে থাকল ৩৭ ডিগ্রী।

লিঙ্কন দ্বীপের দক্ষিণ ল্যাটিচিউড হচ্ছে সাঁইতিরিশ ডিগ্রীর কিছু কম বা বেশি—অর্থাৎ পঁয়তিরিশ থেকে চল্লিশের মধ্যে। মাথা তুলে সঙ্গীদেরকে ফলাফল জানালেন ক্যাপ্টেন।

এবার লংগিচিউড নির্ণয় করতে হবে। ওটা দুপুরের জন্য মূলতবী রেখে সবাইকে নিয়ে বেড়াতে বেরোলেন ক্যাপ্টেন। হাঁটতে হাঁটতে চলে এলেন সবাই হ্রদের উত্তর পাড় আর শার্ক গালফের মাঝখানে। অসংখ্য সীল মাছ রোদ পোহাচ্ছে গালফের তীরে। এদিক ওদিক বালির উপর ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে শাঁখ, ঝিনুক আর শামুকের খোলা। হাঁটু জলে ঝিনুকের বিরাট খেত আবিষ্কার করল নেব। এই ঝিনুকের ভেতরই মুক্তো পাওয়া যায়। মুক্তোর খেতের দিকে খেয়াল নেই ক্যাপ্টেনের। সীলমাছগুলোর দিকে চেয়ে মন্তব্য করলেন তিনি, আবার আসতে হবে এখানে।

হঠাৎ কি মনে হতে ঘড়ি দেখলেন ক্যাপ্টেন। সাগর-তীরে পরিষ্কার জায়গা দেখে ছফুট লম্বা একটা লাঠি পুতে মাথাটা সামান্য দক্ষিণে হেলিয়ে দিলেন। তৈরি হয়ে গেল সূর্য ঘড়ির কাটা। কাঠির ছায়ার দিকে নজর রাখলেন হার্ডিং। ছায়া যখন সবচেয়ে ছোট হবে, বুঝতে হবে দুপুর ঠিক বারোটা বেজেছে। ছোট ছোট কাঠি পুতে ছায়ার ছোট হওয়ার হিসেব রাখতে লাগলেন ক্যাপ্টেন। ছায়া যখন একেবারে ছোট হয়ে আবার বড় হতে যাচ্ছে তখন স্পিলেটকে জিজ্ঞেস করলেন তিনি, কটা বাজে?

পাঁচটা বেজে এক মিনিট। রিচমন্ডের সময়ের সঙ্গে মেলানো ঘড়ির সময় বললেন স্পিলেট।

হিসেব শুরু করলেন হার্ডিং। ওয়াশিংটন থেকে লিঙ্কন দ্বীপের ব্যবধান হলো পাঁচ ঘন্টার। ঘণ্টায় পনেরো ডিগ্রী পথ অতিক্রম করছে সূর্য। মানে পাঁচ ঘণ্টায় পঁচাত্তর ডিগ্রী  গ্রীনউইচের সাতাত্তর ডিগ্রী পশ্চিমে অবস্থিত ওয়াশিংটন। লিঙ্কন দ্বীপের লংগিচিউড হচ্ছে ১৫২ ডিগ্রী (পশ্চিম) অর্থাৎ ১৫০ থেকে ১৫৫-এর মধ্যে। সোজা কথায় সভ্যলোকের সাথে কোন যোগাযোগ নেই লিঙ্কন দ্বীপের। প্রশান্ত মহাসাগরের এই অক্ষাংশ-দ্রাঘিমাংশে কোন দ্বীপের চিহ্ন কখনও কোন ম্যাপে দেখেছেন কিনা মনে করতে পারলেন না ক্যাপ্টেন। লিঙ্কন দ্বীপ থেকে তাহিতি এবং প্রশান্ত দ্বীপপুঞ্জের দূরত্ব কম করে হলেও বারোশো মাইল। নিউজিল্যান্ড এখান থেকে আঠারোশো মাইলেরও বেশি দূরে। আর প্রায় সাড়ে চার হাজার মাইলের মত দূরে হবে আমেরিকার উপকূল! ভেলায় করে এত পথ পাড়ি দেয়া অসম্ভব, নৌকো দরকার।

পরদিন সতেরোই এপ্রিল  আলোচনায় বসলেন দ্বীপবাসীরা।  তৈজস পত্র তৈরি শেষ, এবার যন্ত্রপাতি দরকার। আর ভাল নৌকো বানাতে হলে তো যন্ত্রপাতি ছাড়া গতিই নেই। অগ্ন্যুৎপাতের ফলে ছড়িয়ে থাকা প্রচুর খনিজ-পদার্থকে কাজে লাগাতে হলে একটা লোহার কারখানা দরকার। আর সবচেয়ে বড় দরকার শীত আসার আগেই একটা বাসোপযোগী আশ্রয়। শীতকালে চিমনিতে থাকা যাবে না কোনমতেই।

বন্দুক না থাকায় পেনক্র্যাফটের দুঃখের সীমা নেই। স্পিলেট অবশ্য আশার বাণী শুনিয়ে যাচ্ছেন, বন্দুক বানানো আসলে এমন কিছুই না। বন্দুকের জন্যে খনিজ পদার্থ, কাজের জন্যে সোরা, কয়লা, গন্ধক আর সীসা চাই। এসব জিনিসের অভাব নেই দ্বীপে। কাজেই এই জিনিসটা একদিন না একদিন বানানো হয়ে যাবেই—বিশেষ করে ক্যাপ্টেন যখন আছেন।

অত সোজা না, হেসে বললেন ক্যাপ্টেন। বন্দুক বানাতে উন্নত কারিগরি আর অনেক সূক্ষ্ম যন্ত্রপাতি দরকার।

মাটিতে পরিশোধিত অবস্থায় থাকে না ধাতু। অক্সিজেন অথবা গন্ধকের সাথে মিশে থাকে  দ্বীপের উত্তর-পশ্চিমে প্রচুর আকরিক লোহার সন্ধান পাওয়া গেছে, আয়রন সালফাইড আর আয়রন অক্সাইডকে প্রচন্ড উত্তাপে গলালে ময়লা বাদ গিয়ে বেরিয়ে পড়তে খাটি ইস্পাত। কিন্তু ওই পরিমাণ উত্তাপ সৃষ্টি করাটাই আসল সমস্যা।

সেফটি আইল্যান্ড থেকে কয়েকটা সীল মেরে আন পেনক্র্যাফট, হুকুম দিলেন ক্যাপ্টেন। লোহা সাফ করতে হবে।

সীল দিয়ে লোহা সাফ করবেন? একটু অবাক হলো পেনক্র্যাফট।

লোহা গরম করতে হলে হাপর দরকার, সীলের চামড়া নিয়ে হাপর বানাব।

পানিতে সীল শিকার খুবই কঠিন ব্যাপার। ওস্তাদ সাঁতারু ওরা। কাজেই সীলেরা ডাঙায় না ওঠা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। পাথরের আড়ালে লুকিয়ে রইল পেনক্র্যাফট, হার্বার্ট আর নেব।  ঘণ্টখানেক অপেক্ষার পর পানি ছেড়ে বালির চড়ায় উঠে এল ছটা সীল। একলাফে পাথরের আড়াল থেকে বেরিয়ে এল পেনক্র্যাফট আর হার্বার্ট। লাঠি দিয়ে পিটিয়ে মেরে ফেলল দুটো সীল। বাকিগুলো ঝাপ দিল পানিতে। তিনজন মিলে চামড়া ছাড়িয়ে নিল সীল দুটোর। শুধু চামড়া দুটো নিয়ে চিমনিতে ফিরে এল ওরা। কাঠের ফ্রেমে আটকে ভাল করে শুকোনো হলো চামড়া দুটো। গাছের ছাল পাকিয়ে তৈরি হলো মজবুত দড়ি! তিনদিনেই তৈরি হয়ে গেল ক্যাপ্টেনের হাপর।

পরদিন বিশে এপ্রিল। সকালে ঘুম থেকে উঠেই রেডক্রিকের দিকে রওনা হয়ে গেল সবাই। বনের মধ্যে দিয়ে যেতে যেতে ঝোপঝাড় কেটে পথ করে এগোতে হলে ওদের। এতে আরও একটা লাভ হলো। ফ্রাঙ্কলিন হিল আর প্রসপেক্ট হাইটের মাঝে একটা সোজা রাস্তা তৈরি হয়ে গেল। জঙ্গলে জ্যাকামার পাখিই বেশি। তাই জঙ্গলের নামটাও দিয়ে ফেলল জ্যাকামার ফরেস্ট। পথ চলতে চলতে তীর ধনুক দিয়েই ক্যাঙারু মেরে ফেলল হার্বার্ট আর পিলেট। শজারু আর পিপীলিকা ভুখ এর মাঝামাঝি দেখতে একটা জানোয়ারও মারা পড়ল। ঘোঁত ঘোঁত করে ঝোপঝাড় ভেঙে ছুটে গেল একটা দাঁতাল শুয়োর, বাধা পেলে সাংঘাতিক রকম হিংস্র হয়ে ওঠে এরা।

জ্যাকামর ফরেস্ট পেরিয়ে রেডক্রীকে পৌঁছুতে পাঁচটা বেজে গেল। নদী থেকে শখানেক গজ দূরে একটা কুঁড়েঘর তৈরি করে নিল ওরা। সেদিন আর কিছু করা যাবে না। আগুনের কুন্ড জ্বেলে একজনকে পাহারায় রেখে শুয়ে পড়ল বাকি সবাই।

একুশে এপ্রিল ভোর হতেই কাজে লেগে গেল ওরা। শিরার মত সরু সরু লোহার স্তর খুঁজে বের করলেন ক্যাপ্টেন। মাটির ওপর আলগা ভাবে পড়ে থাকা প্রচুর কয়লাও পাওয়া গেল। মাটি দিয়ে চোঙা বানিয়ে হাপরে পরানো হলো! পর পর বিছানো হলো কয়লা আর লোহার স্তর। উত্তপ্ত লোহা আর কয়লার ফাক দিয়ে ঢুকবে হাপরের হাওয়া। পদ্ধতিটা প্রাচীন কিন্তু কার্যকরী। হাপরের হাওয়ায় কয়লা প্রথমে কার্বনিক অ্যাসিডে পরিণত হবে, তারপর কার্বন মনোক্সাইডে। ফলে আয়রন অক্সাইড থেকে বেরিয়ে যাবে অক্সিজেন। থাকবে শুধু আয়রন।

এভাবে লোহা পাওয়া যেতেই তা দিয়ে হাতুড়ি, কাচি, খুন্তি, কুড়াল, কোদাল একটার পর একটা তৈরি হয়ে গেল। তরল লোহার সাথে পরিমাণ মত কয়লা মিশিয়ে ইস্পাত পর্যন্ত বানিয়ে ফেললেন ক্যাপ্টেন। এভাবেই বুদ্ধি আর মেহনতের জোরে সমস্ত নিত্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি তৈরি করে ফেলল ওরা। ইস্পাতের যন্ত্রপাতি, অস্ত্রশস্ত্র ইত্যাদি নিয়ে পাঁচই মে চিমনিতে ফিরে এল সবাই।

মে মাসের ছতারিখে আকাশের অবস্থা দেখে চিন্তা বেড়ে গেল ওদের। শীত আসতে দেরি নেই। তার ওপর আরও একটা কথা বললেন ক্যাপ্টেন, এসব নির্জন দ্বীপে প্রায়ই আস্তানা গাড়তে আসে মালয়ী জলদস্যুরা। শীঘ্রিই চিমনি ছেড়ে একটা অপেক্ষাকৃত নিরাপদ গুহায় আশ্রয় না নিলে চলছে না আর।

কোথায় পাওয়া যাবে সে রকম আস্তানা? চিমনির চেয়ে বড় গুহা কোথায়? পাহাড় খুঁড়ে নতুন গুহা বানানো সোজা কথা নয়। কাজেই গুহা খুঁজতে লেগে গেল ওরা। গুহা খুঁজতে গিয়ে সারা লেক ঘুরে এসেছেন ক্যাপ্টেন। কিন্তু একটা  রহস্যের মীমাংসা করতে পারলেন না কিছুতেই। রেডক্রীকের পানি হ্রদে এসে পড়ছে, কিন্তু বেরোচ্ছে কোন দিক দিয়ে? নিশ্চয়ই বাড়তি পানি বেরিয়ে গিয়ে সাগরে পড়ছে। নাহলে পানিতে সয়লাব হয়ে যেত আশপাশটা!

যেখান দিয়ে খুশি বেরাক না ওটার পানি, তাতে তাদের কি? ক্যাপ্টেনের রকম সকম দেখে বললেন স্পিলেট।

আমাদের কি? বাড়তি পানি যদি মাটির নিচে কোন সুড়ঙ্গ পথে বেরোয় তাহলে সেটাকে বাড়ি বানালে চমৎকার হয় না?

এবার বুঝলেন স্পিলেট, হ্রদের পানি বেরোনোর পথটা খুঁজে পাওয়ার জন্যে ক্যাপ্টেন এত ব্যস্ত হয়ে উঠেছেন কেন।

হ্রদের পাড়ে হাঁটতে হাঁটতে বিশাল এক সাপ দেখে চেঁচাতে লাগল টপ। চোদ্দ পনেরো ফুট লম্বা হবে সাপটা। লাঠি দিয়ে পিটিয়ে সাপটাকে মেরে ফেলল নেব।

ঢোঁড়া জাতীয় সাপ, নির্বিষ, বললেন ক্যাপ্টেন। হ্রদ আর রেডক্রীকের সঙ্গমস্থলে এসে পৌঁছতেই কেন যেন ভীষণ অশান্ত হয়ে উঠল টপ। হ্রদের কাছে ছুটে গিয়ে পরক্ষণেই ফিরে আসছে। কখনও পানির ধারে থমকে দাঁড়িয়ে মনিবের দিকে চেয়ে কি যেন বোঝাতে চাইছে ৷ হ্রদের পানিতে কি কিছু দেখতে পেয়েছে টপ? একটু অবাক হলেন ক্যাপ্টেন। হঠাৎ দৌড়ে গিয়ে পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়ল টপ।

এই, টপ, উঠে আয় জলদি। ডাকলেন ক্যাপ্টেন।

ওখানকার পানিতে নিশ্চয় আছে কিছু, হার্বার্ট বললেন।

কুমীর না তো? স্পিলেট জিজ্ঞেস করলেন।

না। এ ল্যাটিচিউডে কুমীর থাকে না, উত্তর দিলেন ক্যাপ্টেন।

ক্যাপ্টেনের ডাকে পানি থেকে উঠে এলেও কিছুতেই শান্ত হতে পারল না টপ। লম্বা ঘাসের মধ্যে দিয়ে পানির কিনারা ধরে হাঁটতে শুরু করেছে কুকুরটা। যেন পানির তলায় হেঁটে বেড়াচ্ছে কেউ, তার সঙ্গ ছাড়তে চাইছে না সে। অথচ শান্ত পানির উপরিভাগটা খুঁটিয়ে দেখেও তলার কিছু আঁচ করতে পারছে না অভিযাত্রীদের কেউ।

দারুণ বিস্মিত হয়েছেন ক্যাপ্টেনও। আধঘণ্টা একনাগাড়ে টপের পেছন পেছন হেঁটে প্রসপেক্ট হাইটে এসে পৌঁছে গেলেন অভিযাত্রীরা। হঠাৎ থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল টপ। হ্রদের শান্ত পানির দিকে তাকিয়ে আগের চেয়েও বেশি চেঁচামেচি শুরু করে দিল। পরক্ষণেই বিশাল একটা তিমি জাতীয় প্রাণী ভেসে উঠল পানির ওপর। কেউ কিছু বোঝার আগেই পানিতে ঝাঁপ দিল টপ। সাঁতরাতে লাগল প্রাণীটার দিকে। বিশাল হাঁ করে টপকে গিলতে এল ওটা। কয়েক মুহুর্ত হুটোপুটি করেই টপকে নিয়ে পানিতে ডুব দিল অতিকায় জলজন্তু।

আর ফিরবে না টপ। বিষণ্ণ বদনে বিড় বিড় করল নেব। সেও ঝাঁপিয়ে পড়তে যাচ্ছিল, কিন্তু বাধা দিলেন ক্যাপ্টেন। এমন সময় সবাইকে হতভম্ব করে দিয়ে পানির দুই ফুট ওপরে ছিটকে উঠল টপ। আশ্চর্য কান্ড  ভেসে উঠেই তীরের দিকে সাঁতরাতে শুরু করল সে। ডাঙায় উঠতেই ওর ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়ল সবাই। কিন্তু, না। শরীরের কোথাও তো আঘাতের চিহ্ন নেই। দানবীয় প্রাণীর হাত ফসকে বেরিয়ে এল অথচ বিন্দুমাত্র আঁচড়ও লাগেনি গায়ে!

এতক্ষণ টপের দিকে মনোযোগ থাকায় পানির দিকে তাকায়নি কেউ। হঠাৎ সেদিকে হার্বার্টের নজর পড়তেই চেঁচিয়ে উঠল সে, আরে! দেখুন, দেখুন, কি আলোড়ন উঠেছে শান্ত পানিতে। পানির নিচে মারামারি করছে নাকি কেউ?

বিকেল গড়িয়ে গোধূলির রক্তিমাভা দেখা দিয়েছে তখন। হ্রদের পানিতেও তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। সহসা যেন আরও লাল হতে শুরু করল হ্রদের পানি। রক্ত, রক্ত মিশছে হ্রদের পানিতে। খানিক পরই পানির ওপর ভেসে উঠল অতিকায় প্রাণীটা। মৃত।

নিপ্রাণ প্রাণীটা ডাঙায় টেনে আনল অভিযাত্রীরা। আরে, এ যে ডুগং! বলল হার্বার্ট।

স্থির দৃষ্টিতে ডুগংটার গলার দিকে তাকিয়ে আছেন ক্যাপ্টেন। গলাটা কাটা। ধারাল অস্ত্রের আঘাতে কেটে গেছে।

ছুরি! সংক্ষেপে উচ্চারণ করলেন ক্যাপ্টেন।

ছুরি! মুখ কালো হয়ে গেল নেবের, ভূত আছে নাকি হ্রদের পানিতে?

কে জানে! দ্বীপে আসার পর থেকেই তো ভৌতিক সব কাজ কারবার ঘটে চলেছে। বেলুন থেকে পড়ে যাওয়ার পর ডুবলাম না কেন? অজ্ঞান অবস্থায় আমাকে সাগর তীর থেকে গুহায় পৌঁছে দিল কে? টপকে শুকনো অবস্থায় কে পৌঁছে দিয়েছিল তোমাদের কাছে? এই মাত্র সাক্ষাৎ মৃত্যুর হাত থেকে কে বাঁচাল টপকে? ছুরি মেরে ডুগংটাকে হত্যা করল কে? নিজে অদৃশ্য থেকে আমাদের ওপর তীক্ষ্ণ নজর রেখে চলেছে, কে সে?

চিন্তা ভারাক্রান্ত মনে সেদিন চিমনিতে ফিরে এল অভিযাত্রীরা।

৭ মে স্পিলেটকে নিয়ে প্রসপেক্ট হাইটে উঠলেন ক্যাপ্টেন। রান্নার জন্যে চিমনিতেই রইল নেব। কাঠকুটো আনতে নদীর ধারে গেল হার্বার্ট আর পেনক্র্যাফট।

হ্রদের পানির দিকে চেয়ে কি যেন ভাবছেন ক্যাপ্টেন। এইখানেই গতকাল মারা গিয়েছিল ডুগংটা। কি এক রহস্যকে অনুসরণ করে টপ তাদেরকে পথ দেখিয়ে এনেছে এখানে। হঠাৎ পানিতে একটা স্রোতের টান লক্ষ্য করলেন ক্যাপ্টেন। কয়েকটা পাতাসহ ছোট্ট শুকনো গাছের ডাল ওখানে ছুঁড়ে দিতেই পানির টানে ভেসে চলল ওগুলো। ওগুলোকে অনুসরণ করে চললেন দুজনে। হ্রদের দক্ষিণ পাড়ে পৌঁছে এখানকার পানিতে ঘূর্ণিপাক দেখতে পেলেন ক্যাপ্টেন। হাতের লাঠি ডুবিয়ে পানির টান পরীক্ষা করতে যেতেই হাত থেকে ছুটে গেল লাঠিটা। শাঁ করে ঘূর্ণির কাছে গিয়েই টুপ করে তলিয়ে গেল সেটা। সেজদার ভঙ্গিতে বসে পড়ে মাটিতে কান পাতলেন ক্যাপ্টেন। একটু পরই হাসিমুখে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, স্পষ্ট গুম গুম শব্দ শোনা যাচ্ছে। ফুটখানেক নিচেই রয়েছে সুড়ঙ্গ।

তা না হয় আছে। কিন্তু এরপর কি করবেন?

অন্য কোন পথে পানি বের করে দিয়ে শুকিয়ে নেব সুড়ঙ্গটা।

কিন্তু কি করে?

বিস্ফোরক দিয়ে উড়িয়ে দেব গ্রানাইট পাথর। হ্রদের ওই পাড়টা সাগরের দিকে থাকায় হ্রদের পানি সাগরে ঢালার ব্যবস্থা হয়ে যাবে।

বিস্ফোরক? চোখ বড় হয়ে গেল স্পিলেটের, বিস্ফোরক মানে তো গান পাউডার। তাও জোগাড় করে নিতে হবে। ওই জিনিস দিয়ে একটা ছোটখাট গ্রানাইটের পাহাড় ওড়াবেন আপনি?

গান পাউডার দিয়ে ওড়াব কে বলল? ওড়াব শক্তিশালী বিস্ফোরক দিয়ে।

ডুগংটার চর্বি জমিয়ে রাখলেন ক্যাপ্টেন। সামুদ্রিক গুল্ম পুড়িয়ে পাওয়া গেল সোডা সমৃদ্ধ ক্ষার। সেই সোডা দিয়ে সাবান বানাতেই চর্বি থেকে আলাদা হয়ে গেল গ্লিসারিন। প্রাকৃতিক কয়লার স্তর থেকে পাওয়া গেল খনিজ ধাতু। মন মন পাইরাইটস পুড়িয়ে পাওয়া গেল কৃস্টাল-অব সালফেট-অব-আয়রন (হীরাম)। আর এর থেকে তৈরি হলো সালফিউরিক অ্যাসিড। ফ্র্যাঙ্কলিন পাহাড়ের তলা থেকে খুঁজে আনা হলো সোরা। সালফিউরিক অ্যাসিডের সাথে সোরা মিশিয়ে তৈরি হলো নাইট্রিক অ্যাসিড। তাতে গ্লিসারিন মিশাতেই পাওয়া গেল কয়েক বোতল হলুদ রঙের তেলতেলে তরল পদার্থ।

ব্যস, তৈরি হয়ে গেল বিস্ফোরক, বন্ধুদের উদ্দেশে বললেন ক্যাপ্টেন।  জানো এর নাম কি? নাইট্রোগ্লিসারিন  এ জিনিস আর একটু থাকলে পুরো দ্বীপটাকেই উড়িয়ে দেয়া যেত।

তাহলে এই টুকুন তরল পদার্থ দিয়েই গ্রানাইটের স্তুপ গুঁড়ো করতে যাচ্ছেন আপনি? পেনক্র্যাফটের কথায় সন্দেহের সুর।

তাই করব। কাল ছোট্ট একটা গর্ত খুঁড়বে তুমি। মজা দেখবে তারপরই।

পরদিন সকাল সকাল খেয়ে নিয়ে লেক গ্র্যান্ট এর পূর্ব পাড়ে চলে এল পেনক্র্যাফট। সারাদিন ধরে গাইতি চালাল সে। মাঝে মাঝে নেব এসে সাহায্য করে গেল ওকে। বিকেলের দিকে খোঁড়া হলো গর্ত।

ভয়ঙ্কর এক্সপ্লোসিভ নাইট্রোগ্লিসারিন। আঘাত লাগলেই ফেটে যায়। গর্তটার ওপর তেরছা ভাবে তিনটে খুঁটি পোঁতা হলো। খুঁটি তিনটের মাথা একসাথে বেঁধে ট্রাইপড বানিয়ে বাধা জায়গা থেকে ঝুলিয়ে দেয়া হলো একটা ভারি লোহার পিন্ড। পিন্ড বাঁধা দড়ির সঙ্গে আর একটা দড়ি লাগিয়ে সেটা টেনে নিয়ে যাওয়া হলো বেশ খানিকটা দূরে। শুকনো ঘাস পাকিয়ে তৈরি দড়িটায় গন্ধকের গুড়ো মাখানো হয়েছে আগেই। লোহার ডেলার ঠিক নিচে পাথরের গর্তে এবার ঢেলে দেয়া হলো নাইট্রোগ্লিসারিন। গন্ধক মাখানো দড়ির অন্য মাথায় আগুন ধরিয়ে দিলেন ক্যাপ্টেন। দিয়েই সবাইকে নিয়ে ছুটলেন চিমনির দিকে। লোহার পিন্ড ঝোলানো দড়িতে আগুন পৌঁছুতে সময় লাগবে পঁচিশ মিনিট। অবশ্য তার আগেই নিরাপদ জায়গায় পৌঁছে গেলেন অভিযাত্রীরা।

দড়ি বেয়ে আগুন গিয়ে পৌঁছল পিন্ড বাঁধা দড়িতে। দড়ি পুড়ে নিচের নাইট্রোগ্লিসারিনের ওপর খসে পড়ল ভারি লোহার পিন্ড। ওইটুকু আঘাতই যথেষ্ট। বিস্ফোরণের প্রচন্ড শব্দে থর থর করে কেঁপে উঠল গোটা দ্বীপটা। বড় বড় পাথরের টুকরো ছিটকে পড়ল এদিক ওদিক। মাইল দুয়েক দূরে চিমনিতে বসেও বিস্ফোরণের কম্পন অনুভব করল অভিযাত্রীরা।

সব শান্ত হয়ে যেতেই হৈ হৈ করে ছুটল ওরা হ্রদের পাড়ে। বিশাল গহ্বর দিয়ে ফেনিল প্রপাতের মত বেরিয়ে যাচ্ছে হ্রদের পানি। খুশিতে আকাশ কাঁপিয়ে হুল্লোড় করে উঠল সবাই। সেদিন একুশে মে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *