১৪. বনসীমার দিকে এগিয়ে চলেছে অস্টিন

বনসীমার দিকে এগিয়ে চলেছে অস্টিন। কাঁধে শ্যালন। পায়ের নিচে এখনও মাটি কাঁপছে, কিন্তু কম। বনের কাছে পৌঁছে ফিরে দাঁড়াল সে। ইনফ্রারেড স্ক্যানার ব্যবহার করে দেখল, বিস্ফোরিত এলাকার কেন্দ্রে প্রায় শখানেক গজ বৃত্তাকার জায়গায় মাটি লালচে দেখাচ্ছে। কালো ধোঁয়া উড়ছে আকাশে। ওই অংশে যত গাছপালা-ঘাস ছিল, পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। জায়গাটার আশেপাশে গাছপালা তেমন নেই, নইলে দাবানল শুরু হয়ে যেত এতক্ষণে।

কাঁধ থেকে শ্যালনকে নামিয়ে দিল অস্টিন। তাকে জড়িয়ে ধরে রেখে ফুঁপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদছে মেয়েটা। পুরো নির্ভরশীল এখন তার ওপর। বিস্ফোরণের পরের বিপদ এখনও শেষ হয়নি, জানে অস্টিন। ইনফ্রা রেড চালু করে ঘুরে ঘুরে দিগন্তের দিকে চাইতে লাগল সে। ব্যাটল মাউনটেনের পশ্চিম ধারের ঢালের দিকে তাকাতেই ব্যাপারটা চোখে পড়ল তার।

ছোট একটা চড়া ফেটে চৌচির হয়ে গেছে। বড় বড় পাথর গড়িয়ে নামছে, এগিয়ে আসছে এদিকেই। আচমকা খসে পড়ল চূড়াটা। হিমবাহের মত যেন পাথরবাহ ছুটে ছুটে আসছে পাথরের স্তৃপ! হ্যাঁচকা টানে শ্যালনকে আবার কাঁধে তুলে নিল অস্টিন। দ্রুত ঢুকে গেল বনের ভেতরে। কিছুক্ষণের মধ্যেই তার পেছনে ভয়ঙ্কর গতিতে গাছপালার ওপর এসে ঝাঁপিয়ে পড়ল পাথরের স্তৃপ। বিরাট বিরাট গাছগুলোকে পাটখড়ির মত ভাঙতে ভাঙতে এগিয়ে আসছে ক্রমশ।

বনের ভেতরে গাছপালার জন্যে খুব একটা দ্রুত ছুটতে পারছে না অস্টিন। তার ওপর কাঁধে বোঝা। পেছনে ক্রমেই এগিয়ে আসছে পাথর। প্রায় তিন-মনি একটা পাথর হঠাৎ এসে বাড়ি খেল তার পায়ে। হুমড়ি খেয়ে পড়ে গেল অস্টিন। তার সামনের মাটিতে ধপাস করে গিয়ে আছড়ে পড়ল শ্যালনের দেহ। ব্যথায় ককিয়ে উঠল মেয়েটা।

দ্রুত আবার উঠে দাঁড়াল অস্টিন। ছুটে গিয়ে মাটি থেকে কুড়িয়ে নিল শ্যালনকে। আবার ছুটল। তার আশপাশ দিয়ে ছিটকে বেরিয়ে যাচ্ছে বড় বড় পাথর।

প্রাণপণে ছুটল অস্টিন। যে করেই হোক এই পাথরবাহের কবল থেকে বেরোতেই হবে।

ভূমিকম্পের প্রচন্ডতা সবচেয়ে বেশি অনুভব করল ভূগর্ভ আস্তানার ভিনগ্রহবাসীরা। চারদিকে বিশৃঙ্খলা। জায়গায় জায়গায় ক্রিস্টালের দেয়াল, সিলিং ভেঙে পড়েছে। মেঝেতে গড়াগড়ি খাচ্ছে যন্ত্রপাতি। কোন কোন ঘরের সিলিং ভেঙে নিচে পড়েছে বিশাল পাথর। যন্ত্রপাতি, আসবাব আর অন্যান্য জিনিসপত্র ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছে।

মেইন করিডোরে দাঁড়িয়ে আছে সাসকোয়াচ। প্রচন্ড ঝাঁকুনিতে তার ইলেকট্রোনিক ব্রেন কয়েক সেকেন্ডের জন্যে অকর্মণ্য হয়ে পড়েছিল, তারপর আবার ঠিক হয়ে গেছে আপনা আপনি। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে পাথর পড়া দেখছে সে। পায়ের ওপর এসে পড়ছে একটা আধটা। কিন্তু কোন ক্ষতি করতে পারছে না ওর কৃত্রিম দেহের।

সাসকোয়াচের কাছাকাছি দাঁড়িয়ে আছে একজন পুরুষ আর একজন মহিলা। আতংকে, বিস্ময়ে স্তব্ধ হয়ে গেছে দুজনেই।

কাউন্সিল চেম্বারে ভয়ঙ্কর কম্পনের মধ্যে নিজেদের সামলানর চেষ্টা করছে এপ্লয় আর ফলার। ওদিকে মিট মিট করতে শুরু করেছে ক্রিস্টাল আলো। ওদের শক্তির উৎস নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। হঠাৎই দপ করে নিভে গেল সমস্ত কৃত্রিম ক্রিস্টাল। আতংকে চিৎকার করে উঠল ফলার।

হামাগুড়ি দিয়ে একপাশের দেয়ালের কাছে চলে এল এপ্লয়। সমানে কাঁপছে মাটি। দেয়ালের সঙ্গে কাঁধ ঠেকিয়ে বসল সে। অন্ধকারে দেখতে পেল না, তার মাথার ওপরে পাথরের দেয়ালে ফাটল ধরেছে। আধ সেকেন্ডের মধ্যেই বড় হল ফাটলটা, ধসে পড়ল বিকট শব্দে। নিজেকে বাঁচাতে কিছুই করতে পারল না এপ্লয়। শেষ মুহূর্তে পাথরটা ঠেকাতে একটা হাত তুলেছিল, কিন্তু দেশলাইয়ের কাঠির মত ভেঙে গেল হাতটা। ব্যথায় আর্তনাদ করে উঠেছে সে, পরমুহূর্তেই চাপা পড়েছে পাথরের তলায়।

পাথুরে গুহাটার ভেতরে গুটিয়ে বসে আছে অস্টিন আর শ্যালন। মাথার ওপরে বাইরের দিকে বেরিয়ে আছে একটা বিরাট চ্যাপ্টা পাথর। এটার জন্যে পাখরবাহের আঘাত থেকে বেঁচে গেছে ওরা।

ধীরে ধীরে কমে এল আওয়াজ। পাথরে পাথরে ঠোকাঠুকির শব্দ কমতে কমতে একেবারে থেমে গেল। শ্যালনকে বসে থাকতে বলে বেরিয়ে এল অস্টিন। পায়ের তলায় শুধু পাথরের কুচি। ধুলোর মেঘে ছেয়ে আছে এখনও চারদিক। শ্যালনকে গুহা থেকে বেরিয়ে আসতে ডাকল সে।

কিন্তু শ্যালন বেরোল না। উঁকি দিল অস্টিন। গোঁজ হয়ে একটা পাথরের ওপর বসে আছে মেয়েটা। ভেতরে নেমে তার হাত ধরতে গেল অস্টিন। ঝটকা মেরে হাতটা সরিয়ে নিল শ্যালন, খবরদার, ছোবে না আমাকে!

শ্যালন… ডাকল অস্টিন। তোমাকে সাহায্য করতে চাই আমি।

কি সাহায্য করবে? কঠোর দৃষ্টিতে অস্টিনের দিকে তাকাল শ্যালন, যা হবার তো হয়েই গেছে। কেউ কি আর বেঁচে আছে ওরা!

সবাই মারা নাও যেতে পারে, বলল অস্টিন।

শালনের চোখে দ্বিধা।

হ্যাঁ, শ্যালন, বলল আবার অস্টিন, কেউ কেউ হয়ত বেঁচে আছে এখনও। তাহলে ওদের সাহায্য দরকার নিশ্চয়ই। হাত বাড়াল অস্টিন, এস, যাই।

ওদের থেঁতলান লাশগুলো দেখতে পারব না আমি, দুহাতে মুখ ঢাকল শ্যান।

তাহলে ওদের সাহায্য করতে চাও না তুমি?

অস্টিনের চোখে চোখে তাকাল শ্যালন। সিদ্ধান্ত নিল। তারপর বাড়ানো হাত ধরে উঠে দাঁড়াল। মেয়েটাকে সোজা হয়ে দাঁড়াতে সাহায্য করল অস্টিন। হাত দিয়ে ধুলো ঝাড়ল শ্যালনের কাপড় জামা থেকে। তারপর প্যান্টের পকেট থেকে টি.এল.সিটা বের করে বাড়িয়ে ধরল, এটা ব্যবহার করবে তুমি।

হাত বাড়িয়ে যন্ত্রটা নিল শ্যালন।

ঠিক আছে, বলল অস্টিন। চল, যাই।

ছুটতে শুরু করল অস্টিন। স্লো মুভমেন্টে এডজাস্ট করে তার সঙ্গে একই গতিবেগে চলল শ্যালন। তবু গুহামুখের কাছে অস্টিনের আগেই এসে পৌঁছুল সে। অপেক্ষা করতে লাগল। এখন ওই গুহায় একা প্রবেশ করতে সাহস পাচ্ছে না সে।

অস্টিনের হাত ধরে গুহায় ঢুকল শ্যালন। পুরু ধুলো জমে আছে গুহার মেঝেতে। আইস টানেলের প্রবেশমুখে এসে দাঁড়াল দুজনে। অবাক হয়ে ভাঙা ধাতব দরজাটার দিকে তাকাল শ্যালন। অস্টিনের দিকে চেয়ে জিজ্ঞেস করল, নিশ্চয়ই তোমার কাজ?

দরজা ভাঙা আমার স্পেশালিটি, হালকা গলায় বলল অস্টিন। বিশেষ করে বায়োনিক হবার পর।

লাথি মেরে সামনে থেকে কয়েকটা পাথর সরিয়ে শ্যালনের হাত ধরে ভেতরে ঢুকল অস্টিন। অন্ধকার টানেল। ঝিরঝির মৃদু আওয়াজ করে কি যেন ঝরে পড়ছে। পানিই হবে হয়ত।

অন্ধকার কেন? জিজ্ঞেস করল অস্টিন।

নিশ্চয়ই পাওয়ার চেম্বারের ক্ষতি হয়েছে, বলল শ্যালন। অন্ধকারে দেখতে পাও তো? এক কাজ কর, কয়েক গজ এগোলেই টানেলের গায়ে বসান একটা গুপ্ত কুঠুরি পাবে। ওতে লণ্ঠন আছে।

ইনফ্রারেড চালু করল অস্টিন। চোখে বসানো বিশেষ নাইট গ্লাসটাও। অন্ধকার দূর হয়ে গেল তার চোখের সামনে থেকে। শ্যালনের হাত ধরে এগিয়ে চলল সে। দুপাশে সুড়ঙ্গের দেয়াল তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে দেখতে দেখতে চলেছে। দশ গজ মত গিয়ে কুঠুরির ডালাটা দেখতে পেল সে। বাঁ হাতে ঘুসি মেরে লক ভেঙে খুলে ফেলল ডালা। সত্যিই, ভেতরে লণ্ঠন আছে। আরও কয়েকটা টুকিটাকি প্রয়োজনীয় জিনিসও আছে।

চৌকোনা লন্ঠনটা বের করে আনল অস্টিন। ব্যাটারিতে জ্বলে। সুইচ টিপতেই আলো জ্বলে উঠল। এতে শ্যালনের সুবিধে হল। অস্টিনের আলো ছাড়াই চলে।

আইস টানেলের দুই তৃতীয়াংশ এসে থমকে দাঁড়াল অস্টিন। এখানেই পাথর ফেলে দেয়াল তুলেছিল সে। এখন আর নেই। তবে পাথরগুলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে। একটা বিশাল পাথরের নিচে চাপা পড়ে আছে একজন মানুষ। ঝুঁকে লোকটার মুখের কাছে লণ্ঠন ধরল অস্টিন। লোকটা জীবিত কি মৃত বোঝা যাচ্ছে না। লণ্ঠনটা শ্যালনের হাতে তুলে দিয়ে হাঁটু গেড়ে বসল অস্টিন। লোকটার একটা হাত হাতে তুলে নিল। দুই সেকেন্ড দেখেই ঘাড় ফিরিয়ে জিজ্ঞেস করল, শ্যালন, তোমাদের বডি কনট্রাকশনে পালস্ আছে নিশ্চয়ই, না?

মাথা ঝাঁকাল শ্যালন, হ্যাঁ।

লোকটার হাত আবার আস্তে করে নামিয়ে রেখে উঠে দাঁড়াল অস্টিন, মারা গেছে।

কয়েক ফুট দূরে একজন টেকনিশিয়ানকে পাথরের নিচে চাপা পড়ে থাকতে দেখা গেল। এগিয়ে গিয়ে পাথরটা ঠেলে সরিয়ে লোকটাকে বের করে আনল অস্টিন। মরেনি।

লোকটার কাছে গিয়ে উবু হয়ে বসল শ্যালন। পরীক্ষা করল। ডান পায়ে হাত দিতেই ব্যথায় চেঁচিয়ে উঠল লোকটা।

একটা পা ভেঙেছে, ঘোষণা করল শ্যালন। লোকটাকে বলল, আপাতত এখানেই থাক। ভেতরে গিয়ে দেখি, মেডিক্যাল টীম পাঠাতে পারি কিনা।

আইস টানেল পেরিয়ে এল শ্যালন আর অস্টিন। এরপরের পাথুরে সুড়ঙ্গটায় কোন মানুষ দেখা গেল না। সারা পথে পাথরের ছড়াছড়ি। পুরু ধূলোর আস্তরণ।

প্রধান করিডোরও পাথরে ছেয়ে আছে, আর ধুলো। ধুলোয় ভারি হয়ে আছে বাতাস। শ্বাস নিতে কষ্ট হয়।

কাউন্সিল চেম্বারে এসে ঢুকল ওরা। অস্টিনের হাতের লণ্ঠনটার মত আরেকটা লণ্ঠন জ্বালিয়ে পাথরের ওপর রাখা হয়েছে। ঘরে হলদেটে মৃদু আলো। দুটো লণ্ঠনের আলোয় অন্ধকার আরেকটু দূর হল। ঘরের একটা জিনিসও আস্ত নেই। ভেঙেচুরে একাকার। পাথর আর ধুলো তো আছেই।

একটা বিশাল চ্যাপ্টা পাথরকে টেনে তুলে সরাবার প্রাণপণ চেষ্টা করছে সাসকোয়াচ। পারছে না। তার পাশেই দাঁড়িয়ে চোখ বড় বড় করে দেখছে ফলার।

দ্রুত ফলারের পাশে গিয়ে দাঁড়াল অস্টিন আর শ্যালন।

এপ্লয়, আঙুল তুলে দেখিয়ে ফিসফিস করে বলল ফলার। পাথরের নিচে চাপা পড়ে আছে।

জীবিত আছে? জিজ্ঞেস করল শ্যালন।

হ্যাঁ, বলল ফলার, কিন্তু পাথরটা সরাতে না পারলে…

সরানো যাবে, বলল অস্টিন। লণ্ঠনটা শ্যালনের হাতে তুলে দিয়ে সাসকোয়াচের পাশে গিয়ে দাঁড়াল সে। সন্দিহান চোখে অস্টিনের দিকে তাকাল রোবটটা।

এগিয়ে গিয়ে উবু হয়ে পাথরটার কার্নিশ ধরে ওপরে টানতে শুরু করল অস্টিন। কিন্তু পাষাণ অনড়। আরও বার দুই ঠেলে এক ইঞ্চিও সরাতে না পেরে ঘাড় ফিরিয়ে সাসকোয়াচের দিকে তাকাল সে। একভাবে তারই দিকে তাকিয়ে আছে রোবট।

হাঁ করে দেখছ কি? বলল সে, এস, হাত লাগাও।

ঘোৎ জাতীয় একটা শব্দ করে এগিয়ে এল সাসকোয়াচ। অস্টিনের পাশাপাশি উবু হয়ে দাঁড়িয়ে পাথরে হাত লাগাল। একই সঙ্গে টানতে শুরু করল দুজনে। এইবার আর গ্যাট হয়ে থাকতে পারল না পাথর, নড়ে উঠল। উঠছে ইঞ্চি ইঞ্চি করে। আরও জোরে টান লাগাল অস্টিন আর সাসকোয়াচ। পাথরটা ফাঁক হতেই এগিয়ে গেল শ্যালন আর ফলার। টেনে হিঁচড়ে নিচ থেকে এপ্লয়কে বের করে নিয়ে এল। আস্তে করে আবার পাথরটা নামিয়ে রাখল সাসকোয়াচ আর অস্টিন।

এপ্লয়ের বুকে কান ঠেকিয়ে হৃৎপিন্ডের শব্দ শুনল শ্যালন। মাথা তুলে ফলারের দিকে তাকিয়ে বলল, এখনও বেঁচে আছে। জলদি টি.এল.সি-টা খোল।

এপ্লয়ের কোমরের বেল্ট থেকে যন্ত্রটা নিয়ে শ্যালনের হাতে দিল ফলার।

কি করবে? জানতে চাইল অস্টিন।

ওর দেহের মেটাবলিজমের সঙ্গে টি.এল.সি. অ্যাডজাস্ট করে দেব। অপারেশন করা পর্যন্ত ওকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে ত। কথা বলতে বলতেই যন্ত্রটা এপ্লয়ের দেহে সেট করে দিল শ্যালন।

হঠাৎ জ্বলে উঠল ক্রিস্টাল। কিন্তু আগের উজ্জ্বলতা নেই, টিমটিমে। করিডোরে বেরিয়ে এল অস্টিন। দ্রুত ছুটে আসছে একজন টেকনিশিয়ান। অস্টিনকে দেখেও দেখল না। তাকে পাশ কাটিয়ে ঘরে ঢুকেই চেঁচিয়ে বলল, শ্যালন, আরও অনেকে আহত হয়েছে।

আচ্ছা শ্যালন, এই সব আহতদের বাঁচান সম্ভব? দরজায় এসে দাঁড়িয়েছে অস্টিন।

জানি না, অনিশ্চিত শ্যালনের গলা, তরে ইলেকট্রোমেডিক্যাল টেকনিকে কাজ করতে পারলে হয়ত সম্ভব। নিউট্রাক্সিন কম্পাউন্ড তো আছেই। কিন্তু তার জন্যে পাওয়ার দরকার।

পাওয়ার চেম্বারটা কোথায়? টেকনিশিয়ানকে জিজ্ঞেস করল অস্টিন।

কমপ্লেক্সের তলায়। জবাব দিল শ্যালন। থার্মাল কনভার্টারের সাহায্যে ভূগর্ভের উত্তাপকে কাজে লাগিয়ে ইলেকট্রিক্যাল এনার্জি তৈরি করি আমরা।

কিন্তু পাথর পড়ে এক্সেস টানেল বুজে গেছে, বলল টেকনিশিয়ান। যাওয়ার উপায় নেই।

টানেলটা কোথায়? জিজ্ঞেস করল অস্টিন।

ওর ভেতর দিয়ে যাওয়া অসম্ভব, বলল টেকনিশিয়ান।

যা বলছি উত্তর দাও! সাসকোয়াচকে দেখিয়ে বলল অস্টিন, ও আর আমি দুজনে মিলে পাথর সরাতে পারব না?

কি জানি! নিশ্চিত হতে পারছে না টেকনিশিয়ান।

চল, আমিও যাচ্ছি, উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বলল শ্যালন। সাসকোয়াচের দিকে ফিরে ডাকল, সাসকোয়াচ।

অস্টিনকে পথ দেখিয়ে নিয়ে চলল শ্যালন। পাশে হাঁটছে সাসকোয়াচ। কি ভেবে ওদের পিছু নিয়েছে ফলার। অস্টিনের হাতে হাত রাখল শ্যালন। হঠাৎ মৃদুকণ্ঠে জিজ্ঞেস করল, আচ্ছা স্টিভ, এসব কেন করছ, বল তো?

থমকে দাঁড়াল অস্টিন। অবাক হয়ে তাকাল শ্যালনের মুখের দিকে। কেন করছি মানে? নইলে মারা যাবে তো ওরা।

তাতে তোমার কি? আমরা তো তোমাদের লক্ষ লক্ষ লোক মেরে ফেলার জন্যে তৈরি হয়ে গিয়েছিলাম।

হেসে উঠল অস্টিন। আবার সামনে এগোল। পৃথিবীর মানুষ এমনি। আমাদের আবেগ অনুভূতি একটু বেশিই।

স্প্রিঙের মত পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে মাটির একশো ফুট গভীরে নেমে গেছে মেন করিডোরের এক মাথা। দুপাশে এর সারি সারি সাব করিডোর। মেন করিডোরের এদিককার শেষ প্রান্ত থেকে শুরু হয়েছে এক্সেস টানেল। সরু, তিনজন লোক পাশাপাশি হাঁটতে পারবে। মেঝে থেকে সিলিঙের উচ্চতা আট ফুট।

সত্যিই, ঢোকার মুখেই বড় বড় পাথর পড়ে পথ একেবারে বন্ধ হয়ে আছে। এটাই এক্সেস টানেল, আঙুল দিয়ে দেখিয়ে বলল শ্যালন।

দুই হাতের তালু একবার ডলল অস্টিন। এগিয়ে গেল। সাসকোয়াচও সঙ্গে এগোল।

পেছনে সরে যাও তোমরা, শ্যালন আর ফলারের উদ্দেশ্যে বলল অস্টিন।

পিছিয়ে গিয়ে এক পাশের দেওয়ালের সঙ্গে সেঁটে দাঁড়াল দুজনে। ওদিকে কাজ শুরু করে দিয়েছে সাসকোয়াচ আর অস্টিন। অবলীলায় দুমনি তিনমনি পাথরগুলো তুলে নিয়ে সুড়ঙ্গের বাইরে ছুঁড়ে ফেলছে। মিনিটখানেকের মধ্যেই একটা অতি বিশাল পাথরের চাঙর ছাড়া সবই সরিয়ে ফেলল দুজনে। খাড়াভাবে দেয়ালের মত দাঁড়িয়ে আছে চৌকোনামত পাথরটা।

এটা সরাতে খাটতে হবে, সবাইকে শুনিয়ে বলল অস্টিন।

কাঁধ লাগিয়ে ঠেলা দিল অস্টিন। তার দেখাদেখি পাথরটায় কাঁধ লাগাল সাসকোয়াচও। নড়তে শুরু করল বিশমনি পাথর, কিন্তু অতি ধীরে। আধ মিনিটের চেষ্টায় মাত্র কয়েক ইঞ্চি সরান গেল। থামল অস্টিন। সাসকোয়াচের দিকে তাকাল। দেখ খোকা, পাথরটা সরাতেই হবে আমাদের। নইলে মান থাকবে না। বলেই আবার পাথরে কাধ লাগাল।

কি বুঝল সাসকোয়াচ, কে জানে। কিন্তু আরও জোরে ঠেলতে লাগল সে। আরও কয়েক ইঞ্চি সরল পাথরটা, আরও কয়েক ইঞ্চি। একজন মানুষ কোনরকমে গলে ওপাশে বেরোনর মত ফাঁক করে থামল অস্টিন। ফাঁকে দাঁড়িয়ে উঁকি দিল ভেতরে।

পাওয়ার রূম দেখা যাচ্ছে। বিশাল জেনারেটরের আশেপাশে শুধু নীল আগুনের ফুলকি। নীল আলোতে ভরে গেছে টানেলের অন্য মাথা। ছেঁড়াখোঁড়া তারের মাথাগুলো একনাগাড়ে বিদ্যুৎ-ফুলিঙ্গ ছিটাচ্ছে। এগুলোর তীক্ষ্ণ ছট ছট শব্দ ছাপিয়ে আরেকটা একটানা হিস হিস শব্দ কানে আসছে। যেন বিশাল এক চায়ের কেটলিতে পানি ফুটছে।

একটা মোটা স্টিলের পাইপ ঢোকান হয়েছে পাথরের ভেতর। এটাকে অবলম্বন করে চারপাশ থেকে আটকে দেয়া হয়েছে বিচিত্র সব যন্ত্রপাতি। কয়েকটা যন্ত্রের গায়ে বসান লাল আলো জ্বলছে নিভছে। অজগরের মত মোটা একটা বৈদ্যুতিক তারের এক মাথা ছিড়ে সিলিঙ থেকে ঝুলছে, দুলছে, বাড়ি খাচ্ছে পাইপের গায়ে। স্টিলের পাইপের গায়ে তারের বেরিয়ে থাকা মাথাগুলোর ছোঁয়া লাগামাত্র ছড় ছড় শব্দে ফুলিঙ্গ ছড়িয়ে যাচ্ছে। পাইপের একটা জয়েন্ট ছুটে গেছে। জোরে বাষ্প বেরোচ্ছে ওপথে। হিস হিস শব্দ আসছে ওখান থেকেই।

এগিয়ে এসে অস্টিনকে সরিয়ে ফাঁক দিয়ে টানেলের ভেতরে উঁকি দিল শ্যালন। হতাশ হয়ে বলল, ওখানে যেতে পারবে না। ওই পাইপ দিয়েই মাটির নিচ থেকে গরম বাষ্প উঠে আসছে। সুপার হিটেড স্টিম।

তার মানে সতর্ক হয়ে এগোতে হবে আমাকে, শ্যালনের দিকে তাকাল অস্টিন। হাসল, যাতে আঙুল না পুড়ে যায়। বলেই ফাঁক গলে ওপাশে চলে গেল সে।

স্টিভ! ভয়ার্ত গলায় প্রায় আর্তনাদ করে উঠল শ্যালন। ভেতরে ঢোকার ফাঁকটার কাছে এসে দাঁড়িয়েছে সে। দেখছে।

পাওয়ার হাউসের দরজায় এসে দাঁড়াল এস্টিন। ঢুকতে যাবে, কানে এল শ্যালনের ডাক। স্টিভ, আগে ওই মোটা তারটা রিপ্লেস কর। ওই যে, কমলা রঙের জাংশন বক্স, ওর ভেতরেই ফিউজ।

ভেতরে ঢুকেই এক পাশের দেয়ালে বসান কমলা বাক্সটার দিকে এগিয়ে গেল অস্টিন। বাক্সের তলায় একটা প্লাগ। বুঝল সে, ওতেই তারটা লাগবে। বায়োনিক হাতের কড়ে আঙুলের নখ দিয়ে প্লাগের ভেতরে ছেড়া তারের মাথা খুঁচিয়ে বের করে আনল সে। পরিষ্কার করল। এগিয়ে গিয়ে ঝুলন্ত তারটা ধরল। বায়োনিক আঙুলের নিচে বিদ্যুৎ-ফুলিঙ্গের ছড়াছড়ি শুরু হয়ে গেল। তারের মাথাটা প্লাগের ভেতরে ঠেলে ঢুকিয়ে দিল সে। স্কুলিঙ্গ ছিটান বন্ধ হয়ে গেল। সেট হয়ে গেছে তারটা।

স্টিম পাইপের দিকে নজর দিল এবার অস্টিন। জয়েন্টের কাছে এগিয়ে গেল। তীক্ষ্ণ চোখে একবার পরীক্ষা করে দেখল। পাথর পড়ে নয়, ভূকম্পনের প্রচন্ড চাপ সইতে পারেনি স্ক্রুগুলো। ছুটে গেছে।

টুলস্ বক্সটা খুঁজে বের করল অস্টিন। একটা রেঞ্চ বের করে নিয়ে আবার গেল জয়েন্টের কাছে। মোট দশটার মধ্যে মাত্র চারটে স্ক্রু জয়েন্টের ছিদ্রগুলোতে আটকান গেল, কিন্তু ঢিল হয়ে আছে প্যাচ। বাকি স্ক্রুগুলো নেই। বাষ্পের ধাক্কায় কোথায় গিয়ে পড়েছে কে জানে। আপাতত চারটে স্ক্রু দিয়েই জয়েন্টটা জোড়া লাগাল অস্টিন। ছোট ছোট ফাঁক রয়েই গেল। স্টিম লিক করছে, কিন্তু খুবই সামান্য। জেনারেটর চালাতে অসুবিধে হবে না।

রেঞ্চটা আবার টুলস বক্সে রেখে দিয়ে পাইপের গায়ে বসান যন্ত্রগুলোর দিকে ফিরে তাকাল অস্টিন। নিভে গেছে লাল আলোগুলো। জ্বলছে না আর। বিপদ সংকেত শেষ।

পাওয়ার হাউস থেকে বেরিয়ে এল অস্টিন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *