১৪. পরদিন সকালে নতুন আরেকটা বিজ্ঞাপন

পরদিন সকালে নতুন আরেকটা বিজ্ঞাপন সাঁটলাম আমরা। ওতে লেখা:

কোট হাউসে!

মাত্র তিন রাত্রির জন্য!

ডেভিড গ্যারিক (ছোট)

এবং

এডমন্ড কিন (বড়)

রোমাঞ্চকর ট্র্যাজেডি পালা

দ্য রয়াল নানসাচ!!!

প্রবেশ মূল্য পঞ্চাশ সেন্ট।

মহিলা ও শিশুদের প্রবেশ নিষেধ

বিজ্ঞপ্তিটা ডিউকের মনে ধরেছিল। এরপরেও যদি মেয়েদের সঙ্গে না আনে ওরা, বলল সে, আরকান-সায়ের লোকদের এখনও চিনতে পারিনি আমি।

সে-রাতে দর্শক হুঁমড়ি খেয়ে পড়ল হলে, তিলধারণের জায়গা রইল না আর। শো শুরুর তখনও ঢের দেরি। শো আরম্ভ হবার আগমুহূর্তে স্টেজে এসে দাঁড়াল ডিউক। পালা আর এডমন্ড কিনের প্রশংসা করে লম্বা লম্বা বোলচাল দিল। তারপর মঞ্চের পর্দা উঠল। ব্যাঙের মত লাফাতে লাফাতে স্টেজে এল সম্রাট। প্রায় ন্যাংটো, সারা গায়ে বিচিত্র রঙের আঁকিবুকি। বুড়ো ভামের কীর্তি দেখে দর্শকরা হেসেই খুন।

একটু বাদেই ড্রপসিন নামিয়ে আবার দর্শকদের সামনে এল ডিউক। কুর্নিশ করে জানাল, এই পালা আর মাত্র দুদিন চলবে। কারণ লন্ডনে শো আছে। সব টিকেট গেছে সেখানে।

ডিউকের কথা শেষ হতে না হতেই কয়েকজন চেঁচিয়ে উঠল, একি? শেষ হয়ে গেল?

হ্যাঁ, বলল ডিউক।

অমনি রোল উঠল দর্শকসারিতে, শালা ঠকিয়েছে। মঞ্চের দিকে ধেয়ে এল সবাই। এমন সময় এক দীর্ঘদেহী তাগড়া লোক একটা বেঞ্চের ওপর উঠে দাঁড়াল।

থাম! বাজখাই গলায় বলল সে। আমার কথা শোন তোমরা।

সবাই চুপ করল। আমাদের বোকা বানিয়েছে তাতে ভুল নেই, লোকটা বলল। কিন্তু আমরা গোটা শহরের হাসির খোরাক হতে চাই না। অতএব, অন্যদেরও বোকা বানাতে হবে। ঠিক কি-না?

ঠিক। ঠিক। একযোগে সায় দিল সবাই। তাহলে বাসায় গিয়ে সবাইকে বলবে, চমৎকার নাটক। না-দেখলে পস্তাবে।

পরের রাতে আবার লোক ঠকালাম আমরা। তৃতীয় রাতেও হল গমগম করছিল লোকে। নতুন কেউ আসেনি; আগের দুরাতে যারা ঠকেছিল, তারাই এসেছে। ওদের হাতে পচা ডিম, টমেটো। আমাকে পেছন দরজা দিয়ে কেটে পড়ার নির্দেশ দিল ডিউক।

জলদি হাঁট, বলল সে। ভাগতে হবে।

রেকর্ড টাইমে ভেলায় পৌঁছে রওনা দিলাম আমরা। বেচারা সম্রাটের জন্যে দুঃখ হল আমার। নির্ঘাত ওকে কিলিয়ে কাঁঠাল পাকাবে দর্শকেরা।

সম্রাটের কপালে খারাবি আছে, ডিউককে বললাম।

ঠোটের ফাঁক গলে আমার কথা বেরুনোর অবসর পেল না, ছইয়ের নিচ থেকে বেরিয়ে এল সম্রাট। এবার ওদিককার খবরাখবর বল, ডিউক। দাঁত কেলিয়ে হাসল সে।

অর্থাৎ, সম্রাট আদৌ শহরে যায়নি!

ওই শহর ছেড়ে দশ মাইল যাবার পর আলো জ্বেলে ডিনার সারলাম আমরা। তারপর গ্রীন হর্নস-এর লোকদের কীভাবে বুদ্ধু বানিয়েছে তাই নিয়ে মজাসে গল্প জুড়ল দুই ঠগ। টাকা গোনার সময় পাটাতনের ওপর গড়াগড়ি খেল। তিন রাতের রোজগার চারশ পঁয়ষট্টি ডলার।

কিছুক্ষণ পর ঘুমোতে গেলাম আমি। আমার পাহারা দেয়ার পালা এলেও জিম জাগাল না। প্রায়ই এমনটা করে সে। সকালে জেগে দেখলাম, দুহাঁটুর মাঝে মাথা গুজে আপন মনে হা-হুঁতাশ করছে জিম। ব্যাপারটা না-দেখার ভান করলাম। জানি, বাড়ির জন্যে বড্ড উতলা হয়ে পড়েছে ওর মন। বউ-ছেলেদের কথা চিন্তা করে কাতর হয়ে পড়েছে। বেচারা জিম! জীবনে কখনও বাড়ির বাইরে থাকেনি।

পরদিন সকালে একটা উইলো গাছের নিচে আস্তানা গাড়লাম। ভেলার মুখ মাঝনদীর দিকে তাক করা রইল। নদীর দুতীরেই গাঁ। ঠক দুজন ফন্দি আঁটতে বসল, কীভাবে সেখানে গিয়ে কাজ হাসিল করা যায়।

আমাকে বেঁধে রেখে যেয়ো না, মিনতি করল জিম। খুব কষ্ট হয়।

ঠিক আছে, বলল ডিউক।

ওর মাথায় প্রচুর বুদ্ধি। জিমকে কিং লিয়ারের জোব্বা, সাদা পরচুলা পরাল। ঝাটা-গোঁফ লাগিয়ে দিল নাকের নিচে। তারপর সারা গায়ে ফ্যাকাসে নীল রং মাখিয়ে দিল যাতে ওকে পানিতে ডোবা লোকের মত দেখায়। বীভৎস হয়ে উঠল জিমের চেহারা। ওরকম ভয়ানক চেহারা জীবনে দেখিনি আমি। ডিউক এবার গোটা গোটা হরফে একটা সাইনবোর্ড লিখল:

অসুস্থ আরব। বিপজ্জনক।

ছইয়ের সামনে বোর্ডটা টাঙিয়ে দিল সে। জিমকে বলল, কেউ আসছে টের পেলে খ্যাপা কুকুরের মত ঘেউ করে বেরিয়ে আসবে। তাহলেই ব্যাটারা ভেগে যাবে।

খাঁটি কথা বলেছে ডিউক, ভাবলাম। জিমকে এই অবস্থায় দেখলে অতি বড় সাহসীরও পিলে চমকে যাবে। মরা মানুষের চেয়েও ভয়ঙ্কর দেখাচ্ছে ওকে!

গায়ে যাবার জন্যে তৈরি হয়ে নিল সম্রাট। নতুন কালো স্যুটে চমৎকার মানিয়ে গেল তাকে। চেহারায় আভিজাত্যের ভাব ফুটে উঠল। সামান্য পোশাক কী করে যে একজন অতি সাধারণ লোককেও অসাধারণ করতে পারে, এই প্রথম দেখলাম। একটা স্বর্গীয় ভাব ফুটে উঠেছে সম্রাটের মুখে, যেন এইমাত্র রথে চেপে নেমে এসেছে মর্ত্যে। জিম ডিঙিটা সাফ করল। দূরে একটা স্টিমার দাঁড়িয়ে আছে, মাল তুলছে।

এই পোশাকে, সম্রাট বলল, সেন্ট লুইস কিংবা সিনসিন্যাটির মত বড় কোন শহর থেকে আসা উচিত আমার। চল, হাকলবেরি, ওই স্টিমারে চড়েই গাঁয়ে আসব আমরা।

স্টিমারে চড়ার লোভে সাথে সাথে রাজি হয়ে গেলাম। বৈঠা মেরে এগিয়ে গেলাম। পথে গোবেচারা টাইপের এক গ্রাম্য যুবকের সাথে দেখা হল। একটা গাছের গুড়িতে বসে কপালের ঘাম মুছছিল। তার সঙ্গে দুটো বিরাট সুটকেস। যুবককে দেখে ডিঙি তীরে ভেড়াতে বলল সম্রাট।

কোথায় যাচ্ছ? ডাঙায় উঠে লোকটাকে জিজ্ঞেস করল সে।

স্টিমার ধরতে। নিউ অরলিয়ন্স যাব, যুবক বলল।

ডিঙিতে এস, সম্রাট আমন্ত্রণ জানাল। আমার এই চাকর ছোড়া তোমার স্যুটকেস নামিয়ে আনবে। যাও, এডোলাস, আমাকে উদ্দেশ করে বলল সম্রাট, সাহায্য কর ভদ্রলোককে।

আমাদের ধন্যবাদ জানিয়ে ডিঙিতে উঠল যুবক। আবার রওনা দিলাম আমরা। আমাদের নতুন যাত্রী একটু বাচাল প্রকৃতির।

এই গরমে মালসামান নিয়ে চলা খুবই কঠিন ব্যাপার, মুখ খুলল সে। প্রথমে তোমাকে হার্ভে উইলকস্ মনে করে ভাবলাম যাক তাহলে সময় মতই এসে পড়েছ। কিন্তু পরক্ষণেই মনে পড়ল সে-তো ভাটির দিক থেকে আসবে, উজান থেকে নয়। তুমি তো হার্ভে নও, নাকি?

না, বলল সম্রাট। আমার নাম ব্লজেট, আলেকজান্ডার ব্লজেট। মিস্টার উইলকসের জন্যে দুঃখ হচ্ছে আমার। আহা! দেরি হওয়ায় বেচারার না জানি কত লোকসান হচ্ছে।

সম্পত্তি অবশ্য মার যাবে না, তবে ভাই মারা যাবার সময় সেখানে থাকতে পারল না, এটাই যা দুঃখ। ওর ভাই, পিটার, গত রাতে মারা গেছে। বহুকাল আগে ছাড়াছাড়ি হয়েছে দুজনার। সেই ছেলেবেলায়। আর একদম ছোট ভাই, উইলিয়মকে তো দেখেইনি কোনদিন। সে আবার বোবা-কালা। পিটার আর জর্জ—এই দুই ভাই এখানে এসে বসত গাড়ে। জর্জ গেল বছর মারা গেছে। এর মাসকয়েক পর তার স্ত্রী। এখন কেবল হার্ভে আর উইলিয়মই বেঁচে রইল। দুর্ভাগ্য ওদের, ভাইকে দেখতে পেল না।

খবর দেয়া হয়নি?

হয়েছে। পিটার বিছানায় পড়ার পরপরই-তাও প্রায় দুমাস হল। মরার আগে দুভাইকে দেখতে চেয়েছিল পিটার। হার্ভের নামে একটা চিঠি লিখে গেছে সে। তাতে জানিয়েছে কোথায় আছে তার টাকা-পয়সা। আর সম্পত্তি এমনভাবে ভাগ করতে বলেছে যাতে জর্জের মেয়েরা কোন অসুবিধেয় না পড়ে।

হার্ভের আসতে দেরি হচ্ছে কেন? কোথায় থাকে?

ইংল্যান্ডে। শেফিল্ড বলে একটা জায়গা আছে, সেখানে। ওখানকার পাদ্রি সে।

বোধহয় চিঠি পায়নি, বলল সম্রাট। পরক্ষণে জিজ্ঞেস করল, আচ্ছা, জর্জের মেয়েরা কত বড়?

মেরি জেনের উনিশ, সুসান পনের আর জোয়ানা চোদ্দ।

জিভ নেড়ে চুকচুক্ শব্দ করল সম্রাট। আহা! বেচারাদের না জানি কত কষ্ট হচ্ছে!

আরও খারাপ হতে পারত। পিটারের বন্ধুরা আছে বলেই বাঁচোয়া। ওরাই মেয়ে তিনটের দেখভাল করছে। পাদ্রি হবসন, লট হভে, বেন রাকনার, অ্যাবনার শ্যালফোর্ড, উকিল লেভি বেল, ডাক্তার রবিনসন। এদের বউরাও আছে। আর আছে এক বিধবা। মিস্টার বার্টলের স্ত্রী। এদের প্রত্যেকের কথা চিঠিতে উল্লেখ করেছে পিটার। এখানে এসে হার্ভে অনেক বন্ধু পাবে।

এসব ব্যাপারে সম্রাটকে অতি উৎসাহী মনে হল আমার। নানান জেরায় যুবকের কাছ থেকে পিটার উইল সম্পর্কে অনেক তথ্য বের করে নিল। স্পষ্ট বুঝতে পারলাম, তলে তলে কোন মতলব আঁটছে বুড়ো ঝাঁটা-গোঁফ।

পিটার কী অনেক বড়লোক? জিজ্ঞেস করল সে।

বড়লোক? তা বলা যায়। একটা বাড়ি আর কিছু জায়গা আছে। অনেকে বলে নগদ চার-পাঁচ হাজার ডলারও নাকি লুকোন আছে কোথাও।

অন্ত্যেষ্টি নিশ্চয়ই কাল?

হ্যাঁ। দুপুর নাগাদ।

ইতিমধ্যে স্টিমারে পৌঁছে গেলাম আমরা। লোকটাকে স্যুটকেস নিয়ে জাহাজে উঠতে সাহায্য করলাম আমি। হাত নেড়ে বিদায় জানালাম।

স্টিমারে যাওয়ার ব্যাপারে সম্রাট তার খানিক আগের মত বদলাল। ডাঙায় নামিয়ে দিতে বলল তাকে।

জলদি ভেলায় ফিরে গিয়ে ডিউককে পাকড়াও কর, বলল আমাকে। নতুন স্যুটটা পরে আসতে বলবে। সঙ্গে যেন নতুন স্যুটকেস দুটোও আনে।

নির্দেশ মত ডিউককে নিয়ে এলাম। সেই যুবকের কাছ থেকে যা-যা শুনেছে তাকে জানাল সম্রাট।

ব্রিজওয়াটার, আমাদের সামনে সুদিন, বলল ঝাঁটা-গোফ। তারপর দুজনেই হাসল একচোট। শালাদের মতলবটা কী? ভাবতে লাগলাম।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *