১৪. দ্রুত পায়ে সিঁড়ি বেয়ে

দ্রুত পায়ে সিঁড়ি বেয়ে নেমে এলো টেম্পলার বোয়া-গিলবার্ট। দুর্গের হলঘ ঢুকে দেখলো দ্য ব্রেসি ইতোমধ্যেই সেখানে পৌঁছে গেছে। একটু পরেই দুর্গাধিপতি রেজিনাল্ড ট্রুত দ্য বোয়েফও এলো। একটা চিঠি তার হাতে।

দেখি কি লিখেছে এতে, কে, বললো রেজিনান্ড। চিঠিটা খুলে মেলে ধরলো চোখের সামনে। কিন্তু পড়তে পারলো না। স্যাক্সন ভাষায় লেখা ওটা। দ্য ব্রেসির দিকে তাকালো সে। দেখ তো পড়তে পার কি না।

দ্য ব্রেসিও পড়তে পারলো না।

দাও দেখি আমার কাছে, বললো টেম্পলার। স্যাক্সন ভাষা অল্প স্বল্প বুঝি আমি। চিঠিটা নিয়ে পড়তে শুরু করলো সে। তার পরেই সবিস্ময়ে চিৎকার করে উঠলো, আরে, এ যে দেখছি ভয় দেখিয়ে লিখেছে–নাকি ঠাট্টা?–কিছু তো বুঝতে পারছি না!

ঠাট্টা! আমার সাথে! চিৎকার করলো ত দ্য বোয়েফ। জোরে পড় তো। কার এত বড় সাহস, আমার সাথে ঠাট্টা করে!

টেম্পলার পড়তে লাগলো :

রদারউডের মহান জমিদার সেড্রিকের ভাঁড় ওয়াম্বা ও শুয়োর পালক গার্থ, এবং তাদের মিত্র ব্ল্যাক নাইট ও ললির কাছ থেকে।

রেজিনাল্ড ট্রুত দ্য ববায়েফ ও তার মিত্রদের কাছে।

তোমরা আমাদের মনিব সেড্রিক, লেডি রোয়েনা, স্যাক্সন বীর অ্যাথেলস্টেন ও তাদের চাকরবাঁকরদের বন্দী করেছে। জনৈক ইহুদী ইয়র্কের আইজাক এবং তার মেয়ে রেবেকাকেও বন্দী করেছে।

আমরা, এক ঘণ্টার ভেতর এই সব কজন বন্দীর মুক্তি দাবি করছি। যদি এক ঘণ্টার ভেতর ওঁদের মুক্তি দেয়া না হয়, আমরা তোমাদের দুর্গ আক্রমণ করে তোমাদের ধ্বংস করে দেবো।

হার্ট হিল ওয়াক-এর বিশাল ওক গাছের নিচে বসে আমরা স্বাক্ষর করছি এই চিঠিতে।

ওয়াম্বা
গার্থ
ব্ল্যাক নাইট
লক্সলি।

পড়া শেষ হতেই হো-হো করে হেসে উঠলো বোয়া-গিলবার্ট। দ্য ব্রেসিও যোগ দিলো তার সঙ্গে। কিন্তু ফ্ৰঁত দ্য বোয়েফের মুখে হাসি ফুটলো না। কেমন যেন সন্ত্রস্ত দেখাচ্ছে তাকে। এক পার্শ্বচরকে ডেকে জিজ্ঞেস করলো, বাইরে কত লোক জড় হয়েছে দেখেছো নাকি?

শ দুয়েক তো হবেই, স্যার।

যখনই তোমাদেরকে আমার দুর্গ ব্যবহার করতে দেই, এ ধরনের কিছু কিছু ঘটবেই, ঝঝের সাথে বললো রেজিনান্ড। মহা বিপদে পড়া গেল দেখছি! এক মুহূর্ত থেমে আবার বললো, তখনই বলেছিলাম, ভালো করে ভেবে দেখ এখানেই আনবে কি না।

এত ভয় পাচ্ছো কেন তুমি, রেজিনান্ড! বিরক্ত হয়ে বললো টেম্পলার

ভয় পাব না? ওদের যে নেতা, দুর্দান্ত সাহস তার। কোনো কিছুতেই তার পরোয়া নেই। তবে কামান, মই, এবং সুদক্ষ অধিনায়ক ছাড়া এ দুর্গ জয় করা সম্ভব নয়, এই যা ভরসা।

আমার তো মনে হয় আধ ঘণ্টার ভেতর আমরা ঐ দুশো লোককে শেষ করে দিয়ে আসতে পারবো, বললো টেম্পলার। আমরা একজনই ওদের বিশ জনের সমান। তোমার লোকদের সব ডাক দাও, এক্ষুনি হতভাগাগুলোকে আক্রমণ করবো আমি।

ডাক দেবো! এখানে কেউ থাকলে তো ডাক দেবো। যুদ্ধ করার মতো যত লোক ছিলো সবাইকে ইয়র্কে পাঠিয়ে দিয়েছি। দ্য ব্রেসি, তোমার লোকরাও তো সব চলে গেছে, না?

হ্যাঁ। ইয়র্কে একটা খবর পাঠালে কেমন হয়?–ওরা চলে আসতো।

পাঠাতে পারলে তো ভালোই হয়, কিন্তু পাঠাবোটা কি করে? পুরো দুর্গ ওরা ঘিরে ফেলেছে। প্রতিটা পথে পাহারা রেখেছে। একটা মাছিও ওদের অগোচরে বেরোতে পারবে না এখান থেকে। চুপ করে গিয়ে কিছুক্ষণ ভাবলো ফ্ৰঁত দ্য বোয়েফ। তারপর বললো। আমার মাথায় একটা বুদ্ধি এসেছে–।

কি? এক সাথে প্রশ্ন করলো বোয়া-গিলবার্ট আর দ্য ব্রেসি।

চিঠিটার একটা জবাব দিতে হবে। বোয়া-গিলবার্ট, আমার পক্ষ থেকে তুমিই লেখো। আমি বলছি–।

কলম নয়, তলোয়ার দিয়ে জবাব দিলেই ভালো হতো, বললো বোয়াগিলবার্ট। তবু তুমি যখন বলছো লিখছি। কাগজ-কলম টেনে নিলো সে।

বলতে লাগলো ফ্ৰঁত দ্য বোয়েফ। নরম্যান ভাষায় লিখতে লাগলো টেম্পলার। লেখা শেষ হতেই রেজিনা বললো, হ্যাঁ, পড় তো একবার।

পড়লো ব্রায়ান:

রেজিনাল্ড ট্রুত দ্য বোয়েফ ও তার মিত্ররা ক্রীতদাস ও রাজদ্রোহী গুণ্ডাদের চোখরাঙানীকে ভয় করে না। ব্ল্যাক নাইট যদি সত্যিই তাদের সাথে হাত মিলিয়ে থাকে তাহলে বলতে হবে আসলে সে কোনো নাইটই নয়।

আজ দুপুরের আগেই বন্দীদের প্রাণদণ্ড কার্যকর করা হবে। সুতরাং তাদের শেষ স্বীকারোক্তি শোনার জন্যে তোমরা ইচ্ছে হলে একজন পাদ্রী পাঠাতে পারো।

.

গার্থ এবং ওয়াম্বার দূত দুর্গ ফটকে অপেক্ষা করছিলো। তার হাতে দিয়ে দেয়া হলো চিঠিটা। কিছুক্ষণের ভেতর যথাস্থানে পৌঁছে গেল সেটা। এতক্ষণ সবাই অধীর আগ্রহে বসে ছিলো এই চিঠির জন্যে।

দেখা গেল এপক্ষে একমাত্র ব্ল্যাক নাইটই নরম্যান ভাষা জানে। সে চিঠিটা পড়ে স্যাক্সন ভাষায় অনুবাদ করে শোনালো সবাইকে।

জমিদার সেড্রিককে হত্যা করবে! আর্তনাদ করে উঠলো ওয়াম্বা। আপনি নিশ্চয়ই ভুল পড়েছেন, স্যার নাইট।

না, এই কথাই এখানে লেখা আছে: আজ দুপুরের আগেই বন্দীদের প্রাণদণ্ড কার্যকর করা হবে।

খালি হাতেই ওদের এই দুর্গ আমরা মাটিতে মিশিয়ে দেব, গর্জে উঠলো গার্থ।

হ্যাঁ, খালি হাত ছাড়া তো আর কিছু নেই আমাদের, বললো ওয়া।

আমার মনে হয় ওদের একটা চাল এটা, চিন্তিত কণ্ঠে বললো লক্সলি। কিছু সময় হাতে পেতে চায় আসলে।

দুর্গে ওদের কতজন লোক আছে জানতে পারলে ভালো হতো, ব্ল্যাক নাইট বললো। ওদের প্রস্তাব মতো তাহলে পাঠানো যাক কাউকে। কে যাবে? আমার মনে হয়, কপম্যানহারে মাননীয় সন্ন্যাসী, আপনিই যোগ্য লোক।

না, না, ললি আমাকে কি নামে ডাকছিলো শোনোনি? বললেন সন্ন্যাসী। আমি গেলে ওরা ঠিকই ধরে ফেলবে।

তাহলে কে যাবে? পাদ্রী-পুরুত তো আমাদের ভেতর আর কেউ নেই।

কাউকে সাজিয়ে পাঠাতে হবে।

কাকে?

সবাই চুপ। ঝুঁকিপূর্ণ কাজটায় যেতে রাজি নয় কেউ।

জ্ঞাণী গুণীরা কেউ যখন যেতে চাইছে না তখন বোকা-গাধা-ভাঁড় আমিই যাই, বললো ওয়া।

সন্ন্যাসী তার গাউন ও হুড খুলে দিলেন। পরে নিলো ওয়া। সঙ্গীদের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর মুখে পাদ্রীদের অনুকরণে বললো প্যাক্স ভবিসকাম। তারপর ঘুরে দাঁড়িয়ে টরকুইলস্টোন দুর্গের দিকে হাঁটতে শুরু করলো সে।

.

যে সাহস নিয়ে ওয়াম্বা রওনা হয়েছিলো ফ্ৰঁত দ্য বোয়েফের সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই তা কপুরের মতো উবে গেল। ভয়ে তার শরীর কাঁপছে রীতিমতো।

রেজিনান্ড জানে, অনেকেই ভয় পায় তার সামনে দাঁড়াতে। তাই পাদ্রীবেশী ওয়াম্বার ভীত ভাব দেখে অবাক হলো না সে। গম্ভীর কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলো, কে আপনি? কোত্থেকে আসছেন?

প্যাক্স ভবিসকাম, মনের সমস্ত সাহস এক করে জবাব দিলো ওয়া। আমি সেইন্ট ফ্রান্সিসের একজন দীন অনুসারী। বনের পথ ধরে যাচ্ছিলাম নিজের কাজে। হঠাৎ এক দল ডাকাত চড়াও হয় আমার ওপর। আপনার দুর্গের ওপাশেই একটা ঝোপের ভেতর নিয়ে এসে তারা বললো, আপনার এখানে নাকি মৃত্যুপথযাত্রী কয়েকজন লোক আছে, আমাকে তাদের শেষ স্বীকারোক্তি শুনতে হবে। তাই আমি এসেছি। প্যাক্স ভবিসকাম!

কত জন হবে ডাকাত? সত্যি জবাব দেবেন, নইলে আপনার কপালে দুঃখ আছে।

মিথ্যে বলে আমার কি লাভ, স্যার নাইট?

হুঁ। ঠিক আছে বলুন, ওখানে কতজন ডাকাত আছে।

অসংখ্য।

এটা কোনো জবাব হলো না, ঠিক সংখ্যা বলুন।

আমি তো গুণিনি, তবে মনে হয় চার পাঁচ শোর কম…।

ঠিক এই সময় ঘরে ঢুকছিলো টেম্পলার ব্রায়ান। দরজার কাছ থেকে সে চিৎকার করে উঠলো, কি! এর ভেতর ওরা এত লোক জুটিয়ে ফেলেছে। আর তো দেরি করা যায় না, রেজিনান্ড, এবার কিছু একটা ব্যবস্থা নিতে হয়!

তা তো নিতে হয়। কিন্তু কি ব্যবস্থা?

দাঁড়াও, একটু সময় দাও, আমাকে। ভেবে চিন্তে বুদ্ধি কিছু একটা বের করে ফেলবোই। তার আগে তুমি একটু শোনো-। রেজিনাকে এক পাশে টেনে নিয়ে গেল বোয়া-গিলবার্ট। জিজ্ঞেস করলো, এই পাদ্রীটাকে তুমি চেনো?

না। ও এ এলাকার লোক নয়। দূরের কোন মঠ থেকে এসেছে।

তাহলে তো চিন্তার কথা, বলে এক মুহূর্ত ভাবলো ব্রায়ান। তারপর বললো, ওকে এক ফোটাও বিশ্বাস কোরো না, কিন্তু ভাব দেখাবে যেন পুরো বিশ্বাস করছে। ব্যাটা কে, কি মনে করে এসেছে কে জানে? যা হোক, স্যাক্সন শুয়োরগুলোর কাছে পাঠিয়ে দাও ওকে, যে কাজে এসেছে সেরে ফেলুক তাড়াতাড়ি।

ঘণ্টা বাজিয়ে এক ভৃত্যকে ডাকলো ত দ্য বোয়েফ।

সেড্রিক আর অ্যাথেলস্টেন যে ঘরে আছে সে ঘরে নিয়ে যাও ফাদারকে, নির্দেশ দিলো সে।

রেজিনাল্ড আর ব্রায়ানের সামনে থেকে সরতে পেরে হাঁপ ছেড়ে বাঁচলো ওয়া। দুই স্যাক্সনের বন্দীখানার সামনে তাকে নিয়ে গেল ভৃত্য। তালা খুলে মেলে ধরলো দরজা।

প্যাক্স ভবিসকাম, দরাজ গলায় উচ্চারণ করলো ওয়া।

হঠাৎ করে দরজায় একজন পাদ্রীকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ভীষণ অবাক হলেন সেড্রিক। কি বলবেন বা করবেন ভেবে পেলেন না প্রথমে।

ভেতরে আসুন, অবশেষে বললেন তিনি। কি জন্যে পাঠিয়েছে আপনাকে?

আপনারা যাতে সহজে মৃত্যুর জন্যে তৈরি হতে পারেন তার ব্যবস্থা করতে, ভৃত্যকে শুনিয়ে শুনিয়ে বললো ওয়া। আমি আপনাদের শেষ স্বীকারোক্তি শুনবো।

শেষ স্বীকারোক্তি! চিৎকার করলেন সেড্রিক। অসম্ভব! যত নির্দয়, যত বেপরোয়া হোক, খামোকা কেন ওরা খুন করবে, তাও আবার আমাদের মতো লোকদের?

তা তো জানি না, আমি যা শুনেছি তাই বলছি, জবাব দিলো ওয়া।

ঠিক আছে, মরতে যদি হয়ই মানুষের মতো মরবো। ওদের কাছে দয়া ভিক্ষা করতে যাবো না, কি বলল, অ্যাথেলস্টেন?

আপুনি ঠিকই বলেছেন, সেড্রিক, জবাব দিলো অ্যাথেলস্টেন। ওদের মতো দুশ্চরিত্র লোকের কাছে মাথা নোয়ানো অসম্ভব। আমি তৈরি। খাওয়ার টেবিলে যেমন যাই তেমনি শান্তভাবে এগিয়ে যাবো মৃত্যুর দিকে।

এত তাড়াহুড়োর কি আছে, চাচা, ভৃত্য দরজা ভিড়িয়ে দিয়েছে দেখে স্বাভাবিক আমুদে কন্ঠে বললো ওয়া। গুণীজনেরা বলে গেছেন, ভাবিয়া করিও কাজ, করিয়া ভাবিও না। তাই বলছি ভালো করে ভেবে নিন আগে।

আঁ–গলাটা যেন চেনা চেনা লাগে! সেড্রিক চেঁচিয়ে উঠলেন।

লাগবারই কথা, বলতে বলতে মাথার ওপর থেকে হুডটা সরিয়ে ফেললো ওয়াম্বা। আমি আপনার বিশ্বস্ত ভাঁড় ওয়া। কিন্তু আমি এখন ভাঁড়ামি করতে আসিনি, স্যার।

ওয়া! তুই কোত্থেকে এলি! কি করে ঢুকলি এই দুর্গে? পাদ্রীর পোশাক কোথায় পেলি?

এসব প্রশ্নের জবাব এখন দিতে পারবো না, যা বলছি শুনুন।

তুই আবার কি বলবি আমাকে? সারাজীবন তোকেই আমি বলে এসেছি–।

হ্যাঁ, কিন্তু এখন আমি বলছি, এবং যা বলছি সেই মতো করুন। তাড়াতাড়ি আমার এই আলখাল্লা আর হুড পরে বেরিয়ে যান এখান থেকে। মুখটা ভালো করে ঢেকে নেবেন। গলাটা একটু বিকৃত করে বলবেন, স্বীকারোক্তি নেয়া শেষ। ওরা আপনাকে বেরিয়ে যেতে দেবে দুর্গ থেকে।

তোর কি মাথা খারাপ হয়েছে, ওয়া? আমার বদলে তোকে দেখলে তো এক মুহূর্ত দেরি করবে না ওরা, সোজা ঝুলিয়ে দেবে। আমি মরি মরি, তুই কেন মরতে যাবি আমার জন্যে?

প্রভুর জন্যে মরবো না তো কার জন্যে মরবো? আবার কৌতুকের সুর ফিরে এসেছে ওয়াম্বার গলায়।

ব্যাপারটা তোমার কাছে ভাড়ামি মনে হলেও আমার কাছে হচ্ছে না। রেগে গেছেন সেড্রিক। তার কণ্ঠস্বর শুনেই তা বোঝা গেল।

আমি ভঁড়ামি করছি না, স্যার।

বেশ ভালো কথা। কিন্তু যা বলছিস সে অসম্ভব।

মোটেই অসম্ভব নয়। আপনি চলে যান।

এতই যদি তোর মরার ইচ্ছা, অ্যাথেলস্টেনকে দে তোর পোশাক।

না, না। নিজের প্রভু ছাড়া আর কারো জন্যে আমি মরতে রাজি নই।

এখানে অন্য যারা রয়ে যাচ্ছে–রোয়েনা, অ্যাথেলস্টেন, এদের কি হবে? বাঁচার কোনো সুযোগ পাবে?

প্রচুর। পাঁচশো লোক ঘিরে রেখেছে এই দুর্গ। প্রয়োজন হলে এটাকে মাটির সাথে মিশিয়ে দেবে ওরা। নরম্যান জানোয়ারগুলোর হাতে কতজন লোক আছে ওরা জানতে চায়। আপনি যান, গিয়ে জানান।

কিন্তু…তোর বদলে… ইতস্তত করছেন সেড্রিক।

আর কোনে যদি-কিন্তু শুনতে চাই না, আপনি যান। অস্থির হয়ে উঠেছে ওয়াম্বা। সময় চলে যাচ্ছে দ্রুত।

হ্যাঁ, এই সুযোগ ছাড়বেন না, বললো অ্যাথেলস্টেন। তাড়াতাড়ি চলে যান আপনি। আপনাকে পাশে পেলে আমাদের বন্ধুরা খুবই উৎসাহ পাবে। আপনি এখানে থাকলে কারো তো কোনো লাভ হবে না।

আর আপত্তি করলেন না সেড্রিক। ওয়াম্বার খুলে দেয়া পোশাক পরে নিলেন। হুডটা মাথায় পরতে পরতে বললেন, যাই রে, ওয়াম্বা।

যাওয়ার আগে আপনাকে একটা অনুরোধ করবো স্যার, বললো ওয়াম্বা। গার্থের সাথে একটু ভালো ব্যবহার করবেন দয়া করে। আর আর আমার টুপিটা আপনার হলঘরের দেয়ালে ঝুলিয়ে রাখবেন।

করবো রে, ওয়া। আর তোর টুপিও আমি হলঘরে ঝুলাবো। সারা জীবন আমার মনে থাকবে তোর কথা, বলতে বলতে বাষ্পরুদ্ধ হয়ে এলো সেড্রিকের গলা। ভাবিস না। আমার উপর বিশ্বাস রাখ। বাইরে যদি বেরোতে পারি তোদেরও মুক্ত করার একটা ব্যবস্থা নিশ্চয়ই করবো। রওনা হলেন তিনি। কিন্তু দরজা পর্যন্ত গিয়েই হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়লেন আবার! কি করবো আমি? স্যাক্সন ছাড়া তো আর কোনো ভাষা জানি না। ল্যাটিনের এক বর্ণও বুঝি না। নরম্যান শব্দ অবশ্য দুচারটে জানি, কিন্তু এই সম্বল নিয়ে কিভাবে আমি পাদ্রীর অভিনয় করবো?

কোনো দরকার নেই জানার, বললো ওয়াম্বা। কেউ কোনো প্রশ্ন করলে স্যাক্সনেই জবাব দেবেন। দুটো ল্যাটিন শব্দ মুখস্থ করে নিন: প্যাক্স ভবিসকাম। যা-ই বলেন না কেন, আগে বা পরে এই শব্দ দুটো আওড়াবেন। ওতেই চলবে। স্যাক্সন ছাড়া আর কোনো ভাষা আমিই কি জানি? তবু তো দিব্বি চলে এলাম এ পর্যন্ত। আপনিও পারবেন।

প্যাক্স ভবিসকাম। প্যাক্স ভবিসকাম, প্রথমে কয়েকবার শব্দ করেই তারপর মনে মনে আওড়াতে লাগলেন সেড্রিক। অবশেষে বললেন, আশা করি মনে থাকবে আমার। আসি তাহলে, অ্যাথেলস্টেন; আসি রে, ওয়া।

আসুন, স্যার। শব্দ দুটো মনে রাখবেন, প্যাক্স ভবিসকাম।

বেরিয়ে এলেন সেড্রিক। প্রায়ান্ধকার অলি-পথ ধরে এগিয়ে চললেন হলঘরের দিকে। হঠাৎ একটা মেয়ে ছুটে এসে থামালো তাকে।

প্যাক্স ভবিসকাম, গম্ভীর গলায় বলেই পাশ কাটিয়ে এগিয়ে যেতে চাইলেন সেড্রিক।

কিন্তু মেয়েটা তাকে ছাড়লো না। আলখাল্লার হাতা খামচে ধরে ল্যাটিন ভাষায় কি যেন বললো।

দুঃখিত, মা, গলার স্বরটা করুণ করে তুলে বললেন সেড্রিক, আমি একটু কানে কম শুনি।

ফাদার, এবার স্যাক্সন ভাষায় শুরু করলো মেয়েটা, আহত এক বন্দীকে একটু দেখে যাবেন দয়া করে?

মা, আমার হাতে যে একদম সময় নেই। এক্ষুনি আমাকে এই দুর্গ ছেড়ে যেতে হবে।

ফাদার, ফাদার আমি আপনার কাছে এই দয়াটুকু ভিক্ষা চাইছি, ফাদার, একটু আসুন আমার–

বুড়ি উলরিকার খনখনে গলার নিচে চাপা পড়ে গেল মেয়েটার কণ্ঠস্বর।

ফাদারকে যেতে দাও, রেবেকা, বললো বুড়ি। এক্ষুনি রোগীর কাছে যাও! আমি বলছি, এক্ষুনি যাও! বলতে বলতে সেড্রিকের কাছে এসে দাঁড়ালো উলরিকা। আমার সঙ্গে আসুন, ফাদার, বললো সে। আমি আপনাকে এখান থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পথ দেখিয়ে দেবো।

অনিচ্ছা সত্ত্বেও চলে গেল রেবেকা। বেচারা আশা করেছিলো, ফাদারের মাধ্যমে বাইরে জড় হওয়া লোকগুলোর কাছে একটা খবর অন্তত পাঠাতে পারবে।

————–
*ল্যাটিন। অর্থ, তোমরা শান্তিতে থাকো।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *