১৪. ঘোড়ার পিঠে বাঁধা বার্টের দেহ

ঘোড়ার পিঠে বাঁধা বার্টের দেহটা নিয়ে ফ্রীডমে পৌঁছল ইউজিন। সোজা ফ্রেডের বারের সামনে গিয়ে থামল সে

এরমধ্যেই লোক জড়ো হতে আরম্ভ করেছে। গিবন, ডিক, ডেভ, অ্যালেন সবাই উপস্থিত। আড়ষ্টভাবে ঘোড়া থেকে নামল ইউজিন।

হা, এই লোকটাই বার্ট, বলল সে। মারা গেছে ও। আর এখনই যদি অন্য সবাইকে ঠেকানো না হয় তবে আরও লোক মারা পড়বে। নিরপরাধ শক্ত-পাল্লার সাথে ওর স্ত্রীকেও হত্যা করবে ওরা।

স্ত্রী? প্রশ্ন করল গিবন।

হ্যাঁ, সে-ই বার্টকে গুলি করেছে। লী-র সাথে কথা বলছিল শক্তপাল্লা, বলছিল ডেরিক ওর দিকে পিঠ দিয়ে গোপনে কোমরের সামনে গুঁজে রাখা পিস্তল বের করে বগলের তলা দিয়ে ওকে গুলি করার চেষ্টা করেছিল বলেই ওর গুলি ডেরিকের পিঠে লেগেছে। কিন্তু ওকে কথা শেষ করার সুযোগ না দিয়েই আত্মসম্মানহীন ইতরের মত বার্ট আর ক্লাইভ ওকে গুলি করে।

মরেনি সে? কে যেন প্রশ্ন করল।

মনে হয় না।

অন্য সবাই কী করছে? জটলার ভিতর থেকে প্রশ্ন এল। ও যদি সত্যি কথা বলে থাকে? আর একজন বলল। কোন প্রমাণ তো নেই? সবাই একসাথে কথা বলছে-কারও কথা কেউ শুনছে না।

চুপ করো! চিৎকার করে ধমকে উঠল গিবন। সবাই একসাথে কথা বললে কোন লাভ হবে না। মাথা ঠাণ্ডা রেখে কাজ করতে হবে। সবাই চুপ করলে ইউজিনের দিকে ফিরল সে। লী-র কী মত?

ওর ধারণা নিজেকে বাঁচাবার জন্যে শক্ত-পাল্লা এখন ওই কথা বলছে-ডেরিক অমন করতেই পারে না।

বার থেকে বেরিয়ে এসে এতক্ষণ ওদের কথা শুনছিল ফ্রেড। এবার এগিয়ে এল সে। প্রমাণ আছে। বোমার মত শোনাল কথাটা। আমি নিজের চোখে ডেরিককে পেটের কাছে পিস্তল খুঁজতে দেখেছি। জিজ্ঞেস করতেই ধমক দিয়ে আমাকে নিজের চরকায় তেল দিতে বলেছিল সে।

তা হলে বোঝা যাচ্ছে অন্যায়ভাবে পিঠে গুলি করে হত্যা করা হয়নি ওকে, চিন্তিত গম্ভীর স্বরে বলল গিবন।

কিন্তু এটা শুধু আমরা বুঝলে কী লাভ? ওদের বোঝাবে কে? ওরা যদি ভুল বুঝে দু’জন নির্দোষ মানুষকে হত্যা করে তবে আমাদের শহরের এই কলঙ্ক আর জীবনেও ঘুচবে না, হতাশ সুরে বলল ইউজিন।

যে করেই হোক ওদের ঠেকাতেই হবে, দৃঢ় কণ্ঠে বলল গিবন। ফ্রেড, দোকানের ভার আর কারও কাছে দিয়ে তুমিও চলো আমাদের সাথে। এক্ষুণি রওনা হচ্ছি আমরা।

পনেরো মিনিটের মধ্যেই গিবন, ইউজিন আর ফ্রেডের সাথে আরও তিনজন রওনা হয়ে গেল।

.

দুই ঘণ্টা কেটে গেছে। তবু জেকবকে ঘুম থেকে জাগায়নি ডালিয়া। আহত হওয়ার পরে এই প্রথমবারের মত বিশ্রাম নিচ্ছে সে। ডালিয়া যখন বুকের ড্রেসিং বদলে দিয়েছে তখন জাগেনি ও। আরও ক্লিফ রোজ ব্যবহার করেছে সে। ঘুমের মধ্যেই বিড়বিড় করে কী যেন বলে উঠেছিল, কিন্তু ঘুম ভাঙেনি তার।

এর মধ্যে দু’বার সে ক্লিফের ধারে গিয়ে আগুনে কাঠের জোগান দিয়ে এসেছে। দু’বারই খুব সাবধানে এগিয়েছে-ধারের কাছে গিয়ে কান খাড়া করে থেকেছে, কিন্তু নীচে থেকে কোনরকম শব্দই তার কানে আসেনি।

রাত বাড়ছে। সেই সাথে আরও সতর্ক হয়ে উঠছে ডালিয়া। অনেক আগেই রাত বারোটা বেজে গেছে। আর পারছে না সে-তার ভয় হচ্ছে আবারও ঘুমিয়ে পড়বে আগের মত। তা হলে আর রক্ষা নেই, ঘুমের মধ্যেই খুন হয়ে যাবে ওরা। আর ঝুঁকি নেওয়া ঠিক হবে না ভেবে এক কাপ গরম কফি হাতে জেকবকে ডেকে তুলল।

একটু নড়ে কয়েকবার মিটমিট করে চোখ খুলল জেকব। ডালিয়াকে দেখে একটু হেসে কাপটা হাতে নিয়ে উঠে বসল। একদিনেই তার স্বামীর চোখ-মুখ একেবারে বসে গেছে। কিন্তু কফি শেষ করে বিনা সাহায্যেই উঠে দাড়াল জেকব।

বাতাসে আগুনের তেজ কমে এসেছে। দূরে মেঘের গর্জন শোনা গেল। ঘুরে আকাশের দিকে চাইল জেকব। আকাশের একটা অংশ কালো হয়ে দ্রুত এগিয়ে আসছে মেঘ। চারদিক আলো করে দূরে একটা পাহাড়ের মাথায় বাজ পড়ল।

রাইফেলটা তুলে নিল জেকব। গাধাগুলোকে একত্র করে সামলে রাখতে হবে, বলতে বলতেই বৃষ্টির কয়েকটা বড় ফোঁটা পড়ল। আগুনটা এখনই নিভে যাবে।

একটু খুঁড়িয়ে বাকস্কিনটাকে কাছে এগিয়ে নিয়ে এল। তারপর হঠাৎ কী মনে করে জিন তুলে নিয়ে ঘোড়ার পিঠে চাপিয়ে দিল সে। গাধাগুলোকে জড়ো করে এনে ডালিয়া দেখল তার ঘোড়াও সাজা হয়েছে। ডালিয়াকে গাধাগুলোর পিঠে সব মাল তুলতে বলে আগুনের উপর বেশ কিছু কাঠ চাপিয়ে দিল জেকব।

নিজেকে টেনে জিনের উপর বসিয়ে মেসার উপর দিয়ে উত্তরে রওনা হয়ে জেকব বলল, নীচে থেকে মাইলখানেক উত্তরে কিছু ভাঙাচোরা নিচু জমি দেখেছি আমি-ওখানে হয়তো একটা আশ্রয় মিলতে পারে। তা ছাড়া নিচু জায়গায় আমাদের ওপর বাজ পড়ার সম্ভাবনা কম।

ঝমঝম করে বৃষ্টি শুরু হলো। সেই বুড়ো ঘোড়াটাই ওদের আগে যাচ্ছে। জেকবের ঘোড়ার সাথে বাঁধা গাধাগুলো পিছন পিছন চলেছে!

সামনের ঘোড়াটাই যেন ওদের পথ দেখিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। সামনে কয়েকটা ভাঙা জায়গা পড়ল। ওরই একটা বেছে নিয়ে ঘোড়াটা নীচে নামতে শুরু করল। প্রায় দু’শো ফুট নামার পরে বাঁক নিয়েই বিশাল গুহাটা দেখতে পেল ওরা।

বৃষ্টি অনেকটা ধরে এসেছে। জিন আর মালপত্র নামিয়ে পশুগুলোর জন্য একপাশে জায়গা করে দিল জেকব। অন্যদিকে ডালিয়া বিছানা পেতে ফেলেছে।

আবার মুষলধারে বৃষ্টি নামল। ঘনঘন বিকট শব্দে বজ্রপাত হচ্ছে। পাশাপাশি শুয়ে ডালিয়াকে আরও কাছে টেনে নিল জেকব! এই ঝড়বাদলের মধ্যে কেউ ওদের খুঁজতে আসবে না। আর এলেও, খুঁজে পাবে না-বৃষ্টিতে ওদের সব চিহ্ন ধুয়ে মুছে যাবে। পরস্পরের নিশ্চিন্ত সান্নিধ্যে ঘুমিয়ে পড়ল ওরা।

.

ভোর বেলা লী, কীথ আর ক্লাইভ এসে হাজির হলো মেসার ধারে নিকোলাসের ক্যাম্পে। ওদের দেখে খুশি হওয়ার কোন ভাব দেখাল না নিক। ওদের সাথে কেলভিনকে দেখে মন্টির মুখের ভাবও কঠিন হয়ে উঠল।

ওরা কোথায়? পালিয়ে গেছে? প্রশ্ন করল লী।

ওর কথার কোন জবাব না দিয়ে বুড়ো আঙুল দিয়ে পিছনে উপরদিকে দেখাল নিক।

ওখানে উঠল কীভাবে? উপরে ওঠার কোন রাস্তা আছে বলে তো শুনিনি? প্রশ্নটা নিককে করলেও কেলভিনের চোখ মন্টির উপর। ওর আশেপাশে কিছুটা জায়গা বেশ খুঁটিয়ে দেখল সে। ও যে কী ভাবছে তা বোঝা মুশকিল।

রাস্তা একটা খুঁজে পেয়েছে ওরা, মন্টি বলল। কতগুলো বুনো ঘোড়ার পিছু পিছু সোজা উঠে গেছে।

তোমরা ওপরে ওঠোনি?

উপায় ছিল না। মেসার ওপর কিনারা ঘেঁষে আগুন জ্বেলে রেখেছিল ওরা। বৃষ্টিতে নিভে গেছে। আগুনটা আর জ্বালা হয়নি-মনে হচ্ছে ওখান থেকে অন্যদিকে কোথাও সরে গেছে ওরা।

কীথ ওকে থামিয়ে বলে উঠল, তোমরা তিনজন ছিলে না? আর একজন কোথায় গেল?

ঘোড়াগুলো ওপরে ওঠার সময়ে ওকে পায়ের তলায় পিষে মেরে ফেলেছে। অবশ্য তার আগে জেকব গুলি করেছিল ওকে। ওর মৃতদেহ ওদিকে নিয়ে রেখেছি আমরা।

ওদিকে একবার চেয়ে দেখল সবাই কিন্তু কেউই ওর মরদেহের কাছে গিয়ে দুঃখ প্রকাশ করার তাগিদ অনুভব করল না। ওকে এই এলাকার সবাই চেনে। অত্যন্ত নিচু জাতের বদমাইশ ছিল লোকটা। ওর মৃত্যুতে ভাল বই খারাপ হবে না কারও।

তা হলে আর দেরি কীসের? বলল লী। চলো উপরে উঠে ওকে শেষ করে আসি?

নিকোলাস নড়ল না। তোমরা কাজের ভারটা আমার ওপর দিয়েছ, বলল সে। ওটা আমার দায়িত্ব।

আমরা সবাই যখন আছি এখানে-চলো একসাথে যাই।

সাহায্যের দরকার হবে না আমার, দৃঢ় কণ্ঠে জবাব দিল নিক।  

ওপরে ওর সাথে যে মেয়েটা আছে ডেরিকের মৃত্যুতে ওর কোন হাত ছিল–ওকে শহরে ফিরিয়ে নিয়ে যাব আমরা, বলল কীথ

ওই মেয়ের ব্যবস্থাও যা করার আমিই করব, জবাব দিল নিক।

জীবনে প্রথমবারের মত অনিশ্চিত বোধ করছে লী। নিকোলাস একজন ভয়ানক লোক সন্দেহ নেই, ওকে ভয় পাচ্ছে না সে-সে ভাবছে লোকটাকে সে-ই ক্ষমতা দিয়ে মার্শালের পদে বসিয়েছে। সে-ই উদ্যোক্তা হয়ে ওকে এই কাজটা দিয়েছিল।

ওই মেয়েটার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা আমরা আমাদের কর্তব্য মনে করি, বলল কীথ। আমরা ওকে ফ্রীড়মে ফিরিয়ে নিয়ে গিয়ে স্টেজ কোচে তুলে দেব।

এখানে যা করার আমিই করব। তোমাদের সাহায্যের দরকার নেই আমার-তোমরা, এখান থেকে বিদেয় হও এবার।

গুষ্টি মারি ওই ছুঁড়ীর! খেপে উঠল ক্লাইভ। হারামজাদী বার্টকে খুন করেছে-আমাকেও মারতে চেয়েছিল।

আমরাও তোমার সাথে যাব নিকোলাস, দৃঢ় স্বরে বলল লী।

আমি তোমাদের নির্বাচিত আইনসম্মত প্রতিনিধি, বলল নিক। আমার কাজে বাগড়া বাধাতে এলে তোমাদের গ্রেপ্তার করব আমি।

সে সাহস তোমার হবে না, ফুসে উঠল কীথ

তোমাকে বরখাস্ত করা হলো, নিকোলাস, দাঁতে দাঁত চেপে বলল লী। ফ্রীডমে ফিরে যেতে পারো তুমি।

হাসল না নিক। তাচ্ছিল্যের স্বরে সে বলল, আমাকে বরখাস্ত করার ক্ষমতা তোমাদের নেই। তোমাদের ভোটের নিয়ম আমার জানা আছে।

মন্টি এক পাশে সরে গেছে। লী জানে ওখান থেকে ওদের সবাইকেই বন্দুকের নলের মুখে পাচ্ছে সে। কিন্তু এত কথার পরে পিছিয়েও যেতে পারছে না

আমি এর মধ্যে নেই, বলে উঠল ক্লাইভ। ওই মাগী মরলেই বরং আমি খুশি হব।

তর্ক করে কী লাভ? বলল মন্টি। ওকে সবাই পালা করে ভোগ করলেই তো হয়?

রেগে উঠে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল লী, কিন্তু ওকে বাধা দিয়ে ঠাণ্ডা গলায় কীথ বলল, ছাড়ো, লী। ওই মেয়েকে নিয়ে আমাদের কোন মাথা ব্যথা নেই। চলে, যাওয়া যাক। ফিরে কীথের দিকে চেয়ে ওর চোখে বিপদ সঙ্কেত দেখতে পেয়ে চুপ করে গেল লী।

অনেক হয়েছে, চলো এবার ফেরা যাক, আবার বলল কীথ।

তাড়াতাড়ি নিজেকে সামলে নিল লী। ঘোড়ার মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে বলল, মরো। গে যাও-চলো, কীথ, বলেই ঘোড়া আগে বাড়াল সে

পঞ্চাশ গজ এগিয়ে গিয়েই কীথের দিকে ফিরে বলে উঠল লী, তুমি যদি মনে করে থাকো যে আমি…’

চুপ করো, লী, নিচু গলায় ধমক দিয়ে বলল কীথ। ওরা শুনতে পাবে। মাথা গরম করে বোকার মত প্রাণটা ভোয়ালে কার কী লাভ হবে? ওই লোকটার হাতে শটগান ছিল, দেখোনি?

ভয় আমি পাইনি, কীথ, এভাবে লেজ গুটিয়ে পালিয়ে আসাটা সে কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না।

ভয় তুমি পাওনি জানি। কিন্তু মিছেমিছি ওদের সাথে বিরোধে গিয়ে কী দরকার? একটু মগজ খাটাও। একবার একটা কিছু তোমার মাথায় ঢুকলে তুমি আর বিকল্প কোন উপায়ের কথা ভাবতেই চাও না। ওরা যাক না উপরে, ওরা উঠে যাবার অল্পক্ষণ পরেই আমরাও উঠব-কে বাধা দেবে?

সত্যিই তো! নিজের বোকামির জন্য নিজের উপরই রাগ হলো। এই সোজা কথাটা ওর মাথায় আসেনি কেন?

ক্লাইভ আপত্তি জানাল। তোমরা যদি ভেবে থাকো তোমাদের সাথে আমি উপরে উঠব, খুব ভুল করেছ। আমি

আর সহ্য করতে পারল না লী, তেলে বেগুনে জ্বলে উঠল সে। তোমাকে আমার খুব চেনা হয়ে গেছে। আমাদের ফ্রীডম শহরে তোমার মত লোকের কোন জায়গা নেই। তুমি নিজে থেকে না গেলে তোমাকে ঘাড়ে ধরে বিদায় করার ব্যবস্থা আমি করব।

একঘণ্টা পরে লী কীথ নো ম্যানস মেসার উপরে উঠল। কেলভিন নিকোলাসদের সাথেই থেকে গিয়েছিল, আর ক্লাইভ ফিরে গেছে।

বৃষ্টিতে সব চিহ্ন ধুয়ে গেছে। কোনদিকে যাবে মনস্থির করতে পারছে না ওরা। ঠিক এই সময়েই গুলির শব্দ শোনা গেল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *