১৪. এখানে আর কথা বলা যাবে না

চলো যাই, জিনা বললো। এখানে আর কথা বলা যাবে না। মিসেস ডেনভারও বোধহয় আর কিছু জানে না। ওর ছেলেটাকে ধরে নিয়ে যাওয়ায় খুব খুশি হয়েছি। আমি। আর এসে মাকে মারতে পারবে না। এমন বদমাশ ছেলে, মাকে মারে…

তোমরাও কি কম নাকি? জানালার বাইরে থেকে বললেন ডাউসন।

চুপ করুন! রেগে গেল জিনা। আপনার সঙ্গে কে কথা বলে? না বুঝে বক বক করেন…

এই মেয়ে, মুখ সামলে কথা বলবে। ধমকে উঠলেন ডাউসন।

জিনাকে আর কিছু বলতে হলো না। প্রচণ্ড ঘাউ করে উঠে লাফিয়ে গিয়ে জানালার কাছে পড়লো রাফি। পারলে জানালা দিয়ে মুখ বের করেই ডাউসনকে কামড়ায়। আর দাঁড়ালেন না ওখানে প্রজাপতি মানব। ঘুরেই দিলেন দৌড়।

রান্নাঘর থেকে বেরোতেই দেখা গেল কাঁচের ঘরগুলোর কাছে দাঁড়িয়ে আছেন ডাউসন।

আমরা যাচ্ছি, শীতল গলায় বললো কিশোর। পুলিশের সাথে দেখা হলে ভালোই হয়। আমাদেরও কথা আছে ওদের সঙ্গে। এখানে অনেক কিছু ঘটছে, আপনি এর কিছুই জানেন না। প্রজাপতি ছাড়া আপনার চোখে আর কিছু পড়ে না।

তাতে তোমার কি, বেয়াদব ছেলে!

আমার কিছু না, আপনারই ক্ষতি হচ্ছে। আপনি কি জানেন, এই বাড়িতে কি সব কাণ্ড ঘটছে? জানেন, টেড ডেনভার তার মাকে ধরে ধরে মারে? চোখে যে কালশিরা পড়েছে মহিলার, আজ সকালে তা-ও নিশ্চয় আপনার চোখে পড়েনি। পুলিশ আপনাকেও ধরবে। আপনার এখানে যে চার চারটে মানুষ লুকিয়ে থাকতো, দিনরাত আনাগোনা করতো, পুলিশ আপনাকে সেসব কথা জিজ্ঞেস করবে না ভেবেছেন?

কি বলছো তুমি, বদমাশ ছেলে? বিস্ময়ে হাঁ হয়ে গেল ডাউসনের মুখ। মানুষ? কেথেকে এলো? কারা?

জানি না। তবে জানতে পারলে ভালো হতো। আর কোনো কথা না বলে দলবল নিয়ে পাহাড়ের দিকে এগোলো কিশোর। পেছনে তাকালে দেখতে পেতো, এখনও হাঁ করে রয়েছেন বিস্মিত প্রজাপতি বিশেষজ্ঞ।

কি মানুষরে বাবা! ঝাঁঝালো কণ্ঠে জিনা বললো। একই বাড়িতে থাকে, অথচ কিছুই দেখে না, খেয়াল করে না! বিজ্ঞানীগুলো সব এক। আমার বাবাকে দেখোনা, খালি থাকে গবেষণা নিয়ে, বাইরের আর কিছু চোখে পড়ে না।

এখন কথা হলো, অন্য প্রসঙ্গে চলে গেল রবিন, লোকগুলো কে? পাহাড়ে উঠে কিসের ওপর চোখ রাখতো? কেন? কিশোর, ঝড়ের রাতে ওদেরই একজনকে দেখেছিলে। নিজেকে ডরি বলে চালিয়েছে। হাতে ছিলো প্রজাপতি ধরার জাল, যাতে তার এই রাতে ঘোরাঘুরির ব্যাপারে কু প্রশ্ন না তোলে।

হ্যাঁ, তুমি ঠিকই বলেছে, কিশোর বললো। চোখ রেখেছিলো ওরা এয়ারফীন্ডের ওপর। আমি একটা আস্ত গর্দভ! আগে কেন ভাবলাম না কথাটা? রাতদিন পাহারা দিয়েছে ওরা। দুজন রাতে, দুজন দিনে। দুজন করে লুকিয়ে থেকেছে মিসেস ডেনভারের শোবার ঘরে।

কিশোর, উত্তেজিত হয়ে উঠেছে জিনা, প্লেন চুরির সাথে এর কোনো সম্পর্ক নেই তো?

নিশ্চয় আছে। এছাড়া আর কি? কিন্তু এর সাথে রিড আর জ্যাককে কিভাবে জড়ালো, সেটাই বুঝতে পারছি না। পুলিশকে জানানো দরকার। তবে তার আগে জানানো দরকার, বড় কাউকে। পুলিশ আমাদের কথা বিশ্বাস না-ও করতে পারে। এখানে একমাত্র জনির বাবাকেই বলা যায়।

আমারও তাই মনে হয়, রবিন বললো।

চলো।

পাহাড়ী পথ ধরে প্রায় ছুটে চললো ওরা।

ফার্মের চত্বরে ঢুকেও কাউকে চোখে পড়লো না। একেবারে নির্জন।

জনির নাম ধরে ডাকলো মুসা।

গোলাঘরের দরজায় দেখা দিলে জনি। চেহারা ফ্যাকাসে। রাতে নিশ্চয় ভালো ঘুম হয়নি। উদ্বিগ্ন কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলো, কি ব্যাপার? খুব উত্তেজিত মনে হচ্ছে?

তোমার বাবা কোথায়? কিশোর জিজ্ঞেস করলো। জরুরী কথা আছে।

দীর্ঘ এক মহূর্ত কিশোরের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো জনি। আর কোনো প্রশ্ন করলো না। মাঠের দিকে তাকিয়ে-যেখানে লাল-সাদা গরুগুলো চরছেচেঁচিয়ে বাবাকে ডাকলো সে।

ডাক শুনে তাড়াহুড়ো করে এগিয়ে এলেন মিস্টার কলিউড। কি ব্যাপার? বাবা, কিশোর কি যেন বলবে তোমাকে।

এক এক করে ছেলেমেয়েদের মুখের দিকে তাকালেন কলিউড। বললেন, তোমরাই তাহলে জনির বন্ধু। গুড়। তা কি বলবে?

আপনি নিশ্চয় খুব ব্যস্ত, কিশোর বললো। বেশি দেরি করাবো না। সংক্ষেপে সব কথা বলতে লাগলো সে। প্রজাপতির খামারে কাকে কাকে দেখেছে, পাহাড়ের ওপর কাকে দেখেছে, খামারের বৃদ্ধা মহিলা আর তার ছেলের কথা…টেডের কথায় আসতেই মাথা ঝাঁকালেন কলিউড। অতো খারাপ ছিলো

আগে। বছরখানেক আগে থেকে শুরু হয়েছে, যখন অসৎ-সঙ্গে পড়লো।

ওর সঙ্গীদের কয়েকজনের সাথে দেখা হয়েছে কাল রাতে, গতরাতের অভিযানের কথা খুলে বললো কিশোর। সকালে খামারে গিয়েছিলো, মিসেস ডেনভারের সাথে কি কি কথা হয়েছে, তা-ও জানালো।

খারাপ কাজ করলে শাস্তি পেতেই হবে, আনমনে বললেন কলিউড। সব কথা বলতে হবে তাকে, কাকে কাকে জায়গা দিয়েছিলো, কেন দিয়েছিলো, ওরা কারা, সঅব। আমারও মনে হচ্ছে পেন চুরির সঙ্গে এসবের সম্পর্ক আছে।

উত্তেজনায় লাল হয়ে গেছে জনির মুখ। বাবা, আমার মনে হয় ওই লোকগুলোই প্লেন চুরি করেছে! চারজন তো। সহজেই জ্যাক ভাইয়া আর রিডকে ধরে, বেঁধে সরিয়ে ফেলতে পারে। তারপর দুজনে দুটো প্লেন উড়িয়ে নিয়ে যাওয়াটা কিছু না, প্লেন চালানো জানলেই হলো। সেটা তো আজকাল অনেকেই জানে। নিয়েছে ওই হারামজাদারা, মাঝখান থেকে দোষী হলো আমার ভাই।

হ্যাঁ, ঠিকই বলেছো, বাবাও একমত হলেন। এখন তাড়াতাড়ি পুলিশকে জানানো দরকার। টেডকে চাপ দিলেই গড়গড় করে সব বলে দেবে। জ্যাক আর রিডকে কোথায় রেখেছে, তা-ও জানা যাবে।

আনন্দ, উত্তেজনায় প্রায় লাফাতে শুরু করলো জনি। আমি জানতাম! তখনই বলেছিলাম, আমার ভাই হতেই পারে না! বাবা, বলেছি না তোমাকে! জলদি চলো, পুলিশকে জানাতে হবে।

দ্রুত ঘরের দিকে রওনা হলেন কলিউড। টেলিফোন করলেন থানায়। তারপর রিসিভার রেখে দিয়ে বললেন, ওরা খুব সিরিয়াসলি নিয়েছে। টেডকে জিজ্ঞেস করতে যাচ্ছে। আধ ঘণ্টা পর এখানে ফোন করবে বললো।

ওই আধ ঘণ্টা যেন আর কাটতেই চাইলো না। বার বার ঘড়ি দেখছে কিশোর। স্থির হয়ে বসতে পারছে না কেউই। সব চেয়ে বেশি অস্থির হয়ে আছে জনি। ল্যারি আর তার ভেড়ার বাচ্চাটাকে এতোক্ষণে একবারও দেখা গেল না। গেল কোথায়?—অবাক হয়ে ভাবলো জিনা।

টেলিফোনের শব্দ যেন বোমা ফাটালো ঘরে, খুব জোরে বেজেছে বলে মনে হলো ওদের কাছে। প্রায় ছুটে গিয়ে রিসিভার তুললেন কলিউড। হ্যাঁ হ্যাঁ, বলছি…খবর কি?…ও, হ্যাঁ…হ্যাঁ… রিসিভার কানে ঠেসে ধরেছেন তিনি। তাই নকি?…থ্যাঙ্ক ইউ। গুড-বাই।

রিসিভার নামিয়ে রেখে ছেলেমেয়েদের দিকে ফিরলেন তিনি।

জ্যাক ভাইয়া চুরি করেনি, তাই বললো না? জনি জিজ্ঞেস করলো।

হ্যাঁ।

হাত তালি দিয়ে বাচ্চা ছেলের মতো লাফাতে শুরু করলো জনি। বলেছিলাম ! বলেছিলাম না! ও চোর হতেই পারে না, হতেই পারে না…

খারাপ খবরও আছে, বাবা বললেন।

কী? থমকে গেল জনি।

টেড স্বীকার করেছে, কলিউড বললেন, প্লেন চুরি করতেই এসেছিলো চারজন লোক। ওদের দুজন খুব ভালো পাইলট। বিদেশী। অন্য দুজন সাধারণ অপরাধী, ওদেরকে আনা হয়েছে ঝড়ের রাতে বিড় আর জ্যাককে কিডন্যাপ করার জন্যে। ওদেরকে বেহুশ করে ধরে এনে এয়ারফীন্ডের বাইরে লুকিয়ে রাখা হয়েছে কোথাও। ওদেরকে সরিয়ে ফেলার পর দুই পাইলট গিয়ে প্লেন নিয়ে উড়ে গেছে। এয়ারফীন্ডের লোকেরা টের পেলো যখন তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে।

তারমানে, সাগরে পড়ে যারা মারা গেছে, তারা রিড আর জ্যাক নয়, ওই দুজন বিদেশী পাইলট? কিশোর বললো।

হ্যাঁ। তবে ওদের জন্যে ভাবছি না আমি। আমার উদ্বেগ রিড আর জ্যাককে নিয়ে। ওদেরকে কোথায় লুকানো হয়েছে, টেড জানে না। তাকে বলা হয়নি। তাকে টাকা দেয়নি, কারণ প্লেন দুটো সাগরে পড়ে গেছে, তাদের উদ্দেশ্য সফল হয়নি।

পাইলট দুজন মরেছে, বাবার উদ্বেগের কারণ বুঝে উদ্বিগ্ন হলো জনিও, আর চোর দুটোও নিশ্চয় পালিয়েছে! এমন কোথাও রেখে গেছে বন্দিদেরকে, যেটা কোনোদিনই জানা যাবে না!

ঠিক তাই, বাবা বললেন। এখন যত তাড়াতাড়ি সম্ভব দুজনকে খুঁজে বের করতে হবে। এমনিতেই দেরি হয়ে গেছে অনেক, অনেক কষ্ট হচ্ছে নিশ্চয় ওদের। হাত-পা বাঁধা থাকলে, খাবার আর পানি না পেলে মরে যাবে। চোর দুটো যদি পালিয়ে থাকে কে ওদেরকে খাবার দিয়ে আসবে?

আতঙ্কিত হয়ে বললো জনি, ওদেরকে খুঁজে বের করতেই হবে, বাবা!

কিন্তু কোথায় খুঁজতে হবে জানি না আমরা। পুলিশও জানে না।

বিড়বিড় করে কি বললো কিশোর, বোঝা গেল না। নিচের ঠোঁটে ঘনঘন চিমটি কাটতে শুরু করলো সে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *