১৩. লাইব্রেরির কাজে

লাইব্রেরির কাজে কিছুতেই মন বসাতে পারছে না রবিন। শেষে বই গোছানো বাদ দিয়ে কোডস অ্যাণ্ড সাইফারস নাম লেখা একটা বই তাক থেকে নিয়ে টেবিলে মেলে বসল। মাথায় ঘুরছে সাতটা মেসেজ। কিন্তু বইয়ের সাহায্য নিয়ে অনেক চেষ্টা করেও কিছু বুঝল না। বিরক্ত হয়ে রেখে দিল শেষে। আশা করল, এতক্ষণে হয়তো মানে বের করে ফেলেছে কিশোর।

ছুটির পর বাড়ি ফিরে কোনমতে নাকেমুখে কিছু খুঁজে দিয়ে সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়ল আবার।

নিরাশ হলো হেডকোয়ার্টারে ফিরে। শূন্য চোখে তার দিকে তাকাল মুসা।

নিচের ঠোঁটে চিমটি কাটছে কিশোর। রবিনের জিজ্ঞাসু দৃষ্টির জবাবে বলল, কয়েকটা ব্যাপার মোটামুটি আন্দাজ করা যাচ্ছে, বাকি কিছুই বুঝছি না। এক নম্বর ধরো, বো-পীপ তার ভেড়া হারিয়েছে, তারমানে ছবিটা হারানোর কথা বলছে, মিসেস হাইমাসেরও তাই ধারণা।

সায় জানিয়ে মাথা ঝাকাল অন্য দুজন।

কিন্তু কল অন শারলক হোমসের মানে কি? প্রশ্ন করুল রবিন।

ডেকে আনা গেলে তো ভালই হত, মুসা বলল। ভদ্রলোকের সাহায্য এখন খুব দরকার আমাদের।

বুঝতে পারছি না, মুসার রসিকতায় কান দিল না কিশোর। পাঁচ নম্বরে আবার শারলক হোমসের কথা বলা হয়েছে : ইউ নো মাই মেথডস, থ্রি সেভেনস লীড় টু থারটিন..

মাথা কাত করল ব্ল্যাকবিয়ার্ড, বলে উঠল, থ্রি সেভার্স লীড টু থারটিন।

সেভারস? মুসা ধরল শব্দটা।

সেভেনসকেই ওরকম উচ্চারণ করে অনেক ইংরেজ, বলল রবিন। তারপর, বলল, কিশোর?

দুই নম্বরে বিলি শেকসপীয়ার যা বলছে, বলল কিশোর, কিছুই বুঝতে পারছি।

তিন নম্বরে, রবিন বলল, মনে হয় কোন জলদস্যুর দ্বীপের কথা বোঝননা হয়েছে।

একটা ম্যাপ খুলল কিশোর। এই যে, এটা লোয়ার ক্যালিফোর্নিয়া। ডিয়েগো বলেছে, তিনদিনের জন্যে চলে গিয়েছিল জন সিলভার।.হেঁটে গিয়েছিল, না কাউকে ধরে গাড়িতে করে গিয়েছিল, জানি না। ওই তিন দিনেই বাক্সটা লুকিয়ে রেখে ফিরে এসেছিল। ধরি, হেঁটেই গিয়েছিল, অন্তত যাওয়ার সময়। গাড়িতে উঠলে তার চেহারা, পোশাক আর হাতের বাক্স দেখে লোকের কৌতুহল হতে পারে, সেটা এড়ানোর জন্যে। কতদূর যেতে পারে? ক্যাটালিনা আইল্যাও? মেকসিকো? বড় জোর ডেথ ভ্যালি?

ডেথ ভ্যালি, চেঁচিয়ে উঠল মুসা। মানুষের হাড়ের অভাব নেই ওখানে। ওটাই। কিন্তু একটা ছবির জন্যে যাব ওখানে? দুদিনেই ওখানে আরও তিনটে কঙ্কাল বাড়বে।

সম্ভাবনার কথা বলছি, বলল কিশোর। ওখানেই আছে, বলিনি।

চার নম্বরে বলছে, রবিন বলল, একশো কদম পশ্চিমে। কোনও একটা নির্দিষ্ট জায়গা থেকে কোনদিকে কতখানি যেতে হবে।

তা-তো বুঝলাম, সঙ্গে সঙ্গে বলল মুসা। কিন্তু কোন জায়গা থেকে? হলিউড, নাকি ভাই? নাকি পুরো উত্তর আমেরিকা?

পাঁচ নম্বর বুঝতে পারছি না, এবারেও মুসার কথায় কান দিল না কিশোর। ছয় নম্বরে আবার দিক নির্দেশনা, এবং ঠিক কোন জায়গায় খুঁজতে হবে, বলছে।

কিন্তু আবার সেই পাথর আর হাড়ের কথা, গজগজ করুল মুসা।

ঘুরেফিরে সেই জলদস্যুর দ্বীপ, রবিন যোগ করল।

ক্যাটালিনা আইল্যাণ্ডে কখনও জলদস্যু ছিল বলে তো শুনিনি? আর, ওদিকে ওই একটা দ্বীপই আছে।

স্বর্ণ-সন্ধানের যুগে দলে দলে চোর-ডাকাত ওদিকে ছুটেছিল, মনে করিয়ে দিল কিশোর। ওদের কথাও বলে থাকতে পারে।

হ্যাঁ, তা পারে, মাথা দোলাল রবিন। এবার শেষ মেসেজটা, কি বলতে চায়? আমার মনে হয় কি জানো, এটাতেই রয়েছে জন সিলভারের প্রতিশোধ। হয়তো বলছে, সবগুলো মেসেজের মানে বের করার প্রও ছবিটা তুমি খুঁজে পাবে না।

তাহলে আর কষ্ট করে লাভ কি? হাত ঝাড়ল মুসা।

রহস্য ভালবাসে কিশোর। জটিল রহস্যের সমাধান করে আনন্দ পায়। কিন্তু গোলকধাধায় পথ হারাতে রাজি নয়। এই কেস যেন অনেকটা তাই, গোলকধাধায় ফেলে দিয়েছে তাকে, কিছুতেই কিছু করতে পারছে না। শোঁপারও অবস্থা হয়তো আমাদেরই মত, বলল সে। মাথা ঘুরছে। আমাদের তো তবু ব্ল্যাকবিয়ার্ড আছে, মেসেজ সব পেয়েছি, তার তো তা-ও নেই। তবে, চিত্র-চোর তো, কোড-ফোড নিশ্চয় আরও অনেক ভেদ করতে হয়েছে, অভ্যস্ত। হয়তো বুঝে ফেলবে। তার আগেই কিছু একটা করা দরকার আমাদের।

কিছুক্ষণ নীরবতা।

তারপর উঠে দাঁড়াল গোয়েন্দাপ্রধান, যাও, বাড়ি চলে যাও, বসে থেকে লাভ নেই। কিছু বুঝলে ফোন করে জানাব। তোমরাও বুঝলে জানিয়ো।

এত তাড়াতাড়ি ছেলেকে বাড়ি ফিরতে দেখে রবিন আর মুসা দু-জনেরই বাবামা অবাক হলেন।

পরদিন, সারাদিন ইয়ার্ডে কাজ করল কিশোর। খরিদ্দারদের জিনিসের দাম হিসেব করতে ভুল করল তিনবার।

গ্যারেজে নিজেদের গাড়ি পরিষ্কার করতে গিয়ে আরও ময়লা লাগাল মুসা।

লাইব্রেরিতে এক তাকের বই আরেক তাকে রাখল রবিন, এক বই এনে দিতে বললে ভুলে এনে দিল অন্য বই। অন্যমনস্ক। ব্যাপারটা বুঝলেন লাইব্রেরিয়ান, ছুটি দিয়ে বাড়ি পাঠিয়ে দিলেন রবিনকে।

বাড়ি এসে সোজা বিছানায় গড়িয়ে পড়ল রবিন। চিত হয়ে বালিশে মাথা রেখে খোলা জানালা দিয়ে চেয়ে রইল সান্তা মনিকা পর্বত-চূড়ার ওপরে ভেসে যাওয়া মেঘের দিকে। সাতটা প্রশ্ন অস্থির করে তুলছে তাকে।

বাড়ি ফিরে ছেলের ভাবসাব দেখে অবাক হলেন মিস্টার মিলফোর্ড। কি রে, রবিন, কি হয়েছে? শরীর খারাপ?

বাবা, একটা জিনিস বুঝতে পারছি না, একটা ধাধা, উঠে বসল রবিন। ধরো, কেউ তোমাকে বলল, আহ্যাভ বারিড মাই ট্রেজার, হোয়্যার ডেড ম্যান গার্ড ইট এভার। কি বুঝবে?

ট্রেজার আইল্যাণ্ড, দাঁতের ফাঁক থেকে পাইপ সরিয়ে বললেন মিস্টার মিলফোর্ড। রবার্ট লুই স্টিভেনসনের সেই বিখ্যাত বই, জলদস্যুদের কাহিনী।

কিন্তু ধরো, যেখানকার কথা বলা হচ্ছে, তার ধারে-কাছে কোথাও কোন দ্বীপ নেই। তাহলে গুপ্তধন আর কোথায় লুকানো থাকতে পারে?

জোরে জোরে বার দুই পাইপ টানলেন বাবা, ধোঁয়া ছাড়লেন নাক দিয়ে, তারপর বললেন, তাহলে আর একটা জায়গার সঙ্গেই ওই বর্ণনা মেলে।

কোন জায়গা? লাফিয়ে বিছানা থেকে নামল রবিন। গোরস্থান, মিটিমিটি হাসছেন তিনি।

এত জোরে টেলিফোনের দিকে ছুটে গেল রবিন, আরেকটু হলে ধাক্কা দিয়ে বাবার হাত থেকে পাইপ ফেলে দিয়েছিল।

ছেলের কাণ্ড দেখে হেসে মাথা নাড়লেন মিস্টার মিলফোর্ড, হাত-মুখ ধোঁয়ার জন্যে বাথরুমে গিয়ে ঢুকলেন।

কিশোর, ওপাশ থেকে কথা শোনা যেতেই বলল রবিন, গোরস্থান! দ্বীপ বাদ দিলে আর একমাত্র ওখানেই মরা মানুষেরা গুপ্তধন পাহারা দিতে পারে।

দীর্ঘ এক মুহূর্ত নীরবতার পর শোনা গেল আবার কিশোর পাশার কণ্ঠ, রবিন, ফোনের কাছাকাছি থেকো। কোথাও বেরিয়ো না।

খাবার টেবিলে খাবারের দিকে মন দিতে পারল না রবিন, বার বার তাকাচ্ছে ফোনের দিকে। আধপ্লেট বাকি থাকতেই বাজল ফোন। দ্বিতীয় বার রিঙ হওয়ার আগেই রিসিভার তুলে নিল সে। বলো?

রবিন, কিশোরের উত্তেজিত গলা, লাল কুকুর চার! জলদি!

রিসিভার রেখে মা-বাবার দিকে তাকাল রবিন। আমার ফিরতে দেরি হবে: রাত দশটা…

কেউ মুখ খোলার আগেই ছুটে বেরিয়ে গেল সে।

ব্যাপার কি? জিজ্ঞেস করলেন মিস্টার মিলফোর্ড। এত উত্তেজিত?

একটা হারানো কাকাতুয়া খুঁজছে, জানালেন মিসেস মিলফোর্ড, সেদিন বলেছিল আমাকে।

হারানো কাকাতুয়া? হাহ-হা, কফির কাপে চুমুক দিলেন মিস্টার মিলফোর্ড। কিন্তু গোরস্থানে কি করতে যাবে

চমকে উঠলেন মা। তাড়াতাড়ি দরজার দিকে ছুটলেন। কিন্তু রবিনকে দেখা গেল না। চলে গেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *