১৩. মাঝরাতের ঘণ্টা দুয়েক বাকি

মাঝরাতের ঘণ্টা দুয়েক বাকি, ঘোড়ায় যখন স্যাডল পরানো শেষ করল টিমথি ব্লট, ক্যাম্পের সবাই ঘুমে আচ্ছন্ন। খুবই সতর্কতার সঙ্গে কাজ সেরেছে সে, কারও ঘুমের ব্যাঘাত ঘটেনি। পাথুরে চাতালে পাহারার দায়িত্বে রয়েছে বেন ডেভিস, আর জেফ কেলার ক্যাম্পের ধারে-কাছে কোথাও আছে।

এরিক ক্রেবেটের দুটো ছাড়াও অন্যদের কয়েকটা ক্যান্টিন পানিতে ভরে একটা ঘোড়ার স্যাডলের সঙ্গে জুত করে বেঁধে নিয়েছে। নিজের রাইফেল তুলে নিয়ে ক্রেবেটের ডান ঘোড়ার কাছে চলে এল ব্লট, ঠিক করেছে এটায় চড়বে ও। দেখতে তেজী, শক্তিশালী মনে হয় ঘোড়াটাকে, এ-মুহূর্তে তেজী ঘোড়াই দরকার ওর…কিন্তু ডানটার স্বভাব সম্পর্কে কিছুই জানে না সে। জানে না মিসৌরি মিউলের মত চালাক ওটা, শয়তানের মত মেজাজী।

কাজ শেষে চাতালে বেনের কাছে চলে এল ব্লট। কী অবস্থা? ফিসফিস করে জানতে চাইল সে।

মোক্ষম সময়। কিছুই নড়ছে না, কবরের মত নিস্তব্ধ।

শিউরে উঠল ব্লট, ঠাণ্ডা বাতাসের কারণেও হতে পারে। তা হলে আর দেরি কীসের?

মুহূর্ত কয়েক ইতস্তত করল বেন। পাহারার দায়িত্ব ছেড়ে যেতে অনীহা বোধ করছে। একসময় সৈনিক ছিল সে, লুকআউটে একজন সেন্ট্রির অনুপস্থিতির ভয়াবহতা সম্পর্কে জানে। যার উপর অন্যদের জীবনের দায়িত্ব থাকে, কোনক্রমেই ঘুমানো উচিত নয় তার, কিংবা পোস্টও ত্যাগ করা উচিত নয়। তবে সেনাবাহিনীর দায়িত্ব পালন করছে না ও, রাতটাও নিরুপদ্রবে কেটে যাবে বলে মনে হচ্ছে।

কেলার কোথায়?

আশপাশে কোথাও আছে।

বেশ, মনস্থির করল বেন। মিস্ রিওসকে নিয়ে আসছি আমি।

চলে যেতে গিয়েও থমকে দাঁড়াল ব্লট। কিছু বলল না সে, তবে মেলানি রিওসকে সঙ্গে নেওয়ার ধারণা পছন্দ করতে পারছে না। সঙ্গে মেয়ে থাকা মানে বাড়তি দায়িত্ব, বাড়তি ঝামেলা, এবং বরাবরই এ ব্যাপারটা এড়িয়ে চলতে অভ্যস্ত সে। ওকে নেওয়ার কী দরকার? দেখো, কর্নেল, আমার তো মনে হয়…’।

আমাদের সঙ্গে যাচ্ছে ও, ব্লটের মুখের কথা কেড়ে নিল বেন, গম্ভীর হয়ে গেছে মুখ, কণ্ঠস্বর সোজাসাপ্টা। এখুনি নীচে চলে যাও।

মনে মনে খিস্তি করতে করতে নীচের পথ ধরল টিমথি ব্লট। ব্যাটা নিজেকে আমার কমান্ডিং অফিসার ভাবছে! তীব্র অসন্তোষে গাল বকল সে। আগে তো বেরিয়ে যাই, তারপর দেখাব কে কাকে নির্দেশ দেয়!

*

প্রস্তুত জেফ কেলার…প্রায়। শুধু ছোট্ট একটা কাজ বাকি। একটা জিনিস চাই তার, সেটা না হলেই নয়-বিগ জুলিয়ার স্যাডল ব্যাগ দুটো। ক্যাম্পের একেবারে কিনারে চলে গেছে সে, পাথর আর বোল্ডারের ফাঁকে খোঁজাখুঁজি করছে। এরিক ক্রেবেটের মতই সেও ব্যাগ লুকিয়ে রাখতে দেখেছে জুলিয়াকে, তবে জায়গাটা স্পট করতে পারেনি। অনুমানের উপর নির্ভর করে খুঁজছে। আরও একটা ব্যাপার, ব্যাগ দুটোয় কী আছে বা কোত্থেকে এসেছে, সেটাও জানা আছে। কেলারের।

গত কয়েক বছর ধরে এই সোনার ব্যাপারে ভাবছে সে, কত স্বপ্ন দেখেছেফোর্ট ইয়োমায় এক, বন্দির কাছ থেকে শুনেছিল, মুক্তি পাওয়ার বিনিময়ে গোপন তথ্য প্রকাশ করেছিল বন্দি। কেলারের সঙ্গে চুক্তি হলো, তাকে বেরিয়ে যেতে সাহায্য করবে, বিনিময়ে সোনার সন্ধান জানিয়ে দেবে সে। সত্যি সত্যি জেল থেকে বেরিয়ে গেল বন্দি, কিন্তু দু’শো গজ যাওয়ার আগেই পিঠে গুলি খেয়ে মারা পড়ে। বলা বাহুল্য, গুলিটা জেফ কেলার নিজেই করেছিল।

সোনার উৎস, কুইটোবাকের খনিটা সীমান্ত থেকে খানিকটা দক্ষিণে। এক আমেরিকান এবং চার-পাঁচজন স্পেনিশ পিয়ন থাকে পাহারায়। চালু এক বা দু’জন লোক হলে সোনা লুট করা কোন ব্যাপার নয়, ঠিক এরকম পরিকল্পনাই করছিল কেলার। ঝুঁকি নিতে হয়নি তাকে, বিগ জুলিয়া আগেই লুট করে ফেলেছে সেই সোনা, এবং ভাগ্যের ফেরে এখানে এসে উপস্থিত হয়েছে। যেভাবেই হোক, এই সোনা এখন চাই ওর।

ঘুমন্ত মেলানির উপর ঝুঁকে পড়ল বেন ডেভিস। কাঁধ স্পর্শ করার প্রায় সঙ্গে সঙ্গে চোখ মেলে তাকাল মেলানি। মেলানি, ফিসফিস করল বেন। জলদি তৈরি হয়ে নাও। এখনই চলে যাব আমরা।

চট করে উঠে বসল মেলানি। চলে যাব? কোথায়? ঘুমন্ত কাঠামোগুলোর উপর নজর চালাল ও। এরিক যাচ্ছে তোমার সঙ্গে?

এরিক? বিহ্বল বোধ করল বেন।

ব্লটের সঙ্গে পরিকল্পনা করার সময় দু’একটা কথাবার্তা কানে এসেছে মেলানির, ও নিশ্চিত সেই পরিকল্পনা বাস্তবে পরিণত করতে যাচ্ছে সে।

এরিক যাবে কেন? এবার ত্যক্ত শোনাল রেনের কণ্ঠ। এসবের সঙ্গে কোন সম্পর্ক নেই ওর! জলদি, আর এক মুহূর্তও এখানে থাকতে রাজি নই আমি। যত দ্রুত সম্ভব ইয়োমায় পৌঁছতে চাই!

বেন! তুমি নিশ্চই এদেরকে ছেড়ে চলে যেতে চাইছ না? তারপরই ওর মনে পড়ল এ-মুহূর্তে পাহারায় থাকার কথা তার। আরে, তোমার না পাহারায় থাকার কথা?

তুমি কি তর্ক করেই যাবে? রেগে যাচ্ছে বেন। চাইলে এখানে। থাকতে পারে ক্ৰেবেট, যাকে ইচ্ছে ওর সঙ্গী করুক! আমি থাকছি না। মেলানি, একটা কথা শুনে নাও, এদের একজনও বাঁচতে পারবে না, একে একে সবাই খুন হয়ে যাবে। এখানে থাকলে আমরাও মরব। চলে এসো, ঘোড়ায় স্যাডল পরানো হয়ে গেছে।

কম্বল ছেড়ে উঠে দাঁড়াল মেলানি। ইয়োমার কথা মনে পড়ল ওর-শহর, বাড়ি, লোকজন…নিরাপত্তা। তারপর যা বলল ও, নিজেও জানে না, কী বলেছে, ভাবেওনি কথাটা বলতে সক্ষম হবে। উঁহু, আমি যাচ্ছি না, বেন। এখানেই থাকব।

স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকল বেন, রাগে কাঁপছে শরীর। এমন বোকামি করে কোন মানুষ? মেলানি, সধৈর্যে বলল ও। বুঝতে পারছ তুমি। সবাইকে এখান থেকে বের করে নিয়ে যাবে বলে আশ্বস্ত করছে ক্ৰেবেট, অথচ সফল হওয়ার সামান্য সম্ভাবনাও নেই। ফাঁদে আটকা পড়েছি আমরা, সে নিজেও জানে এটা। কিন্তু ওর মত বোকামি করব কেন আমরা? পরিস্থিতি অনুকূল, এখনই বেরিয়ে গেলে ঘণ্টা দুয়েকের মধ্যে ইয়োমায় পৌঁছে যাব।

ইতস্তত করছে মেলানি। নিশ্ৰুপ সারা ক্যাম্প। এরিককে দেখতে পাচ্ছে না, তবে নিশ্চই ধারে-কাছে আছে সে। হয়তো যে-কোন মুহূর্তে জেগে যাবে। চুপিসারে যদি বেরিয়ে যেতে পারে ওরা…হয়তো ইয়োমায় পৌঁছতে সক্ষমও হবে। বিপদের ভয় থাকবে না, মৃত্যুর আশঙ্কা চলে যাবে…আরামদায়ক পরিবেশে স্বস্তি বোধ করবে, এই অভিজ্ঞতাকে মনে হবে দুঃস্বপ্ন; বিয়েটা সেরে পুবে চলে যেতে পারবে-ঝলমলে শহর, পার্টির আনন্দ, বিকালে চায়ের ফাঁকে অলস আলাপ করার আনন্দ..

এই তো চেয়েছে ও, নাকি? এই লোকগুলোর সঙ্গে কী সম্পর্ক ওর? এদের সঙ্গে না আছে কোন বন্ধন, না তৈরি হয়েছে হৃদয়ের টান। ও চলে গেলে কিছু যাবে-আসবে এদের? এরিক ক্ৰেবেট এক ভবঘুরে কাউহ্যান্ড-কিংবা তারচেয়েও খারাপ, ঠিক ওর বাবার মত-নিষ্ঠুর, উদ্ধত, বেপরোয়া, স্বেচ্ছাচারী। হৃদয় বলে কিছু থাকে না, এদের। অন্যরাও কি এরচেয়ে শ্রেয়তর? রাস্তায় হাঁটার সময় এ-ধরনের মানুষকে পাশ কাটিয়ে চলে যায় ও; কথা বলা দূরে থাক, বড়জোর হয়তো শুভেচ্ছার উত্তরে সামান্য মাথা ঝাঁকায়। অন্য সময়ে, ভিন্ন কোন পরিস্থিতি হলে এদের কাউকেই চেনা হত না ওর।

জলদি করতে হবে, সোনা, কোমল স্বরে তাগাদা দিল বেন ডেভিস। সবকিছু তৈরি। কেলার আর ব্লট যাবে আমাদের সঙ্গে।

এক পা এগিয়েও থমকে দাঁড়াল মেলানি। তুমি যাও, বেন। এখানেই থাকব আমি।

এবার সত্যি সত্যি খেপে গেল কেন। মেলানি! ঠাণ্ডা মাথায় ভেবে দেখো তো, কেন এখানে থাকবে? এদের সঙ্গে কী সম্পর্ক তোমার? এদের প্রতি কোন দায় আছে আমাদের? নেই। বরং চলে গিয়ে ওদের জন্য বরাদ্দের চেয়ে বেশি খাবার আর পানি রেখে যাচ্ছি আমরা, এতে হয়তো প্রাণ রক্ষা হয়ে যেতে পারে ওদের।

এখানেই থাকব আমি, বেন। ওরা না ওঠা পর্যন্ত কাউকে পাহারায় থাকতে হবে। তুমি বরং চলে যাও।

তোমাকে ছাড়া যাব?

মুখ তুলে তাকাল মেলানি। হ্যাঁ, আমাকে ছাড়াই যাবে।

কিন্তু আমাদের বিয়ের কী হবে? এনৃগেজমেন্ট হয়েছে কি এভাবে সম্পর্কটা শেষ হওয়ার জন্য? মাত্র কয়েক মাইল দূরে ইয়োমা, পৌঁছা’র সঙ্গে সঙ্গে বিয়েটা সেরে ফেলব।

দুঃখিত, বেন। বিয়ের ব্যাপারটা এ-মুহূর্তে তুচ্ছ ও সস্তা মনে হচ্ছে আমার কাছে। এতগুলো মানুষ আটকা পড়েছে, খুন হয়ে যেতে, পারে যে-কেউ, এসময়ে বিয়ের মত তুচ্ছ বিষয়ে ভেবে নিজেকে ছোট করতে রাজি নই আমি। তুমি বরং চলে যাও, ইয়োমায় পৌঁছে সাহায্য পাঠিয়ে দিয়ে আমাদের জন্য। যদি বেঁচে থাকি, ইয়োমায় পৌঁছে না হয় ভাবব তোমার প্রস্তাবটা।

অবিশ্বাস নিয়ে মেলানির দিকে তাকিয়ে থাকল বেন, বুঝতে পারছে রাগ সামলাবে নাকি আবারও বোঝানোর চেষ্টা করবে মেয়েটিকে। মেলানিকে ছাড়া ইয়োমায় পৌঁছে কী হবে? ফুটো পয়সারও দাম নেই। জুয়ার হলে ফিরে যেতে হবে ওকে, ঘৃণ্য সেই জীবনে গা ডুবাতে হবে। অথচ নিশ্চিত প্রতিশ্রুতিও দেয়নি মেলানি। কী যেন বলেছে? সাহায্য পাঠিয়ে দিয়ে আমাদের জন্য। হ্যাঁ, সাহায্য নিয়ে ফিরে আসতে পারবে ও, দেরি হয়ে যাওয়ার আগেই হয়তো বাঁচাতে পারবে এদের।

মেলানি, বড় ভুল করছ তুমি। আমার সঙ্গে যাওয়া উচিত। তর্ক করার সময় নেই। ইয়োমায় পৌঁছে আর্মিকে পাঠানোর ব্যবস্থা করব। কথা দিচ্ছি, ওদের সঙ্গে ফিরে আসব, কিন্তু এমন মহা বিপদের মধ্যে তোমাকে ফেলে যেতে পারি না আমি। নিরাপদ জায়গায় তোমাকে পৌঁছে দিতে পারলে যে-কোন ঝুঁকি নিতে রাজি আছি। আমার কাছে তোমার নিরাপত্তাই বড় ব্যাপার।

না, বেন, গেলে সবাই যাব, নইলে যাব না আমি, মৃদু স্বরে শেষ কথা বলে দিল মেলানি।

*

মাত্র ত্রিশ গজ দূরে আছে জেফ কেলার, অনুমান অনুযায়ী উদ্দিষ্ট জায়গায় পৌঁছে গেছে। পাথুরে ফাটলে রয়েছে ব্যাগ দুটো। ফোকর দিয়ে ভিতরে হাত গলিয়ে দিল সে, সত্যি সত্যি স্যাডল ব্যাগের ঠাণ্ডা চামড়ার স্পর্শ পেল। ধক করে উঠল কলজে, একটা স্পন্দন মিস্ করল ওর হৃৎপিণ্ড। এত ভারী! তারমানে ঠিকই আন্দাজ করেছিল-সোনাই রয়েছে ব্যাগে! স্বাভাবিকের চেয়ে বেশ বড় বাকস্কিন ব্যাগ দুটো, ভারী কিছু বয়ে নেওয়ার জন্য তৈরি করা হয়েছে। ব্যাগ দুটো বের করতে খানিকটা কসরত করতে হলো, তবে শেষপর্যন্ত দুই হাতে দুই ব্যাগ নিয়ে উঠে দাঁড়াল সে।

আলোর বৃত্তের বাইরে এসে দাঁড়াল জেফ কেলার। এক পা এগিয়েও জমে গেল, পিছনে শটগানের দুই ব্যারেল কক্ করার জোড়া শব্দ শুনতে পেয়েছে

শটগান এখানে একজনেরই আছে-বিগ জুলিয়ার।

ব্যাগ দুটো নামিয়ে রাখো, কেলার, মহিলার হিমশীতল কণ্ঠ শুনে গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল কেলারের। নইলে দুই টুকরো করে ফেলব তোমাকে!

অসহায় বোধ করছে কেলার, দুই হাতে দুই ব্যাগ, চাইলেও অ্যাকশনে যেতে পারছে না। জুলিয়া যে গুলি করবে, এ-ব্যাপারে মনে সামান্য সন্দেহও নেই ওর; কিংবা এও ধুঝতে পারছে যে এর আগেও অবলীলায় মানুষ খুন করেছে মহিলা। সম্ভবত এই সোনার জন্য। আরে, এত ঘাবড়ে যাওয়ার কী আছে, চেষ্টাকৃত কোমল স্বরে বলল সে, অদ্ভুত শোনাল কণ্ঠ। দেখো, আমরা দুজনেই

ফেলে দাও ব্যাগ দুটো, মিস্টার!

সঙ্গে সঙ্গে নির্দেশ তামিল করল কেলার। ঘোড়ার লাগাম হাতে স্থির দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকিয়ে আছে টিমথি ব্লট। কথাবার্তা শুনে ওদের প্রতি মনোযোগ দিয়েছে ডেভিস আর মেলানি। দুজনের পিছনে, আলোর বৃত্তের উল্টোদিকে, ছায়ার মধ্যে স্থির দাঁড়িয়ে আছে এরিক ক্ৰেবেট।

ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াল জেফ কেলার। শটগানের নল স্থির হয়ে আছে ওর বেল্ট বরাবর, দৃশ্যটা পেটে অস্বস্তি ধরিয়ে দিল। একটা পিস্তলের মুখে দাঁড়ালে হয়তো ঝুঁকি নেওয়া যায়, হিসাব গড়বড় করে দেওয়া সম্ভব, কিন্তু ডাবল-ব্যারেল শটগানের বিরুদ্ধে সবচেয়ে টাফ লোকও অসহায়।

আধাআধি ভাগ করব, বিনিময়ে তোমাকে সঙ্গে নিয়ে যাব আমি, প্রস্তাব করল কেলার।

ওকে নিয়ে কোথাও যাচ্ছ না তুমি, ওপাশ থেকে ভেসে এল এরিকের কণ্ঠ।

যথেষ্ট অপেক্ষা করেছে ব্লট। লোভের কাছে পরাস্ত হয়েছে কেলার, আর অযথা মেয়েটার পিছনে সময় নষ্ট করছে বেন ডেভিস; চুপিসারে কেটে পড়ার সুযোগটা হাত ফস্কে গেছে। তবে ওর জন্য পথ খোলা আছে এখনও! কেউ মনোযোগ দিচ্ছে না ওর দিকে, দেখেই এক লাফে স্যাডলে চেপে বসল সে, নির্দয়ভাবে স্পার দাবাল। লাফ মেরে আগে বাড়ল ঘোড়াটা, লাফিয়ে টপকে গেল একটা পাথর, ওপাশে বালির উপর পড়েই ছুটতে শুরু করল। মুহূর্তে অন্ধকার গ্রাস করল ওকে।

সবাই জেগে গেছে। আর কিছু করার নেই বলে ছুটন্ত ঘোড়ার খুরের শব্দ শুনছে মনোযোগ দিয়ে।

আমার ঘোড়ায় চড়েছে তো, শেষে স্মিত হেসে বলল এরিক। বেশিদূর যেতে পারবে না।

তাতে কী? ঘোড়া তো ঘোড়াই! মিচেলের মন্তব্য।

ডান ঘোড়াটাকে চিনি আমি। হঠাৎ ওর পিঠে চেপে বসায় চমকে গেছে বটে, তবে শিগগিরই সামলে নেবে। কী ঘটেছে বোঝার পর ঘটবে আসল ঘটনা।

তুমুল বেগে ছুটছে ডান ঘোড়াটা। বুক ধড়ফড় করছে ব্লটের। মুক্ত হয়ে গেছে সে! নিরাপদ দূরত্বে চলে এসেছে! আর মাত্র কয়েকটা মিনিট, তার

পিঠে অচেনা রাইডারের অস্তিত্ব টের পাওয়া মাত্র গতি কমিয়ে ফেলল ডান! চার পা প্রায় একত্র করে ফেলল, জড়িয়ে গেল পরস্পরের সঙ্গে। স্যাড়লে টলে উঠল টিমথি ব্লটের দেহ, সামলে নিতে দেরি হয়ে গেল। ততক্ষণে ধনুকের মত বাঁকা হয়ে গেছে ঘোড়ার পিঠ, শূন্যে নিক্ষিপ্ত হলো ব্লট। উড়ে গিয়ে বালির উপর পড়ল সে, ছুটে গেল ঘোড়াটা, অল্পের জন্য মাথায় লাগেনি খুরের আঘাত। মুহূর্তে অন্ধকারে হারিয়ে গেল ডান ঘোড়াটা.

রাগে, ব্রহ্মতালু জ্বলছে, ঝট করে খাড়া হলো, সে, চেঁচিয়ে গাল দেবে ঘোড়াকে, এসময়নিজের অবস্থান সম্পর্কে সচেতন হলো। শব্দ করা মানে অ্যাপাচিদের জানিয়ে দেওয়া! পিস্তলটাই ওর শেষ সম্বল, ঘোড়াটা বেহাত হয়ে গেছে, এমনকী একটা ক্যান্টিনও নেই। চারপাশে আছে শুধু ইন্ডিয়ানরা।

মুহূর্ত খানেক স্থির দাঁড়িয়ে থাকল সে। ইচ্ছে করলে ফিরে যেতে পারে। চিন্তাটা মাথায় উঁকি দিলেও বাতিল করে দিল। উঁহু, বহু কষ্টে পাওয়া স্বাধীনতা বিসর্জন দেওয়া ঠিক হবে না। যে যাই বলুক, ব্লটের ধারণা ধারে-কাছেই রয়েছে পানি, এবং প্রয়োজনে পায়ে হেঁটে এগিয়ে যাবে। অ্যাপাচিরা যদি মরুভূমিতে টিকে থাকতে পারে, সেও পারবে। পাশ ফিরে উত্তর-পশ্চিমে হাঁটা ধরল টিমথি ব্লট।

হঠাৎ একটা শব্দ শুনেছে বলে সন্দেহ হলো ওর। থেমে কান পাতল, কিন্তু কোন আওয়াজই কানে এল না। মিনিট খানেক অপেক্ষার পর আবার হাঁটতে শুরু করল, এবং আরারও শুনতে পেল শব্দটা। হাঁটার গতি দ্রুত হয়ে গেল, তারপর দৌড়াতে শুরু করল।

ছুটছে তো ছুটছেই, থামার সাহস করতে পারছে না। পাছে ওকে ধরে ফেলে ইন্ডিয়ানরা। ক্লান্তিতে পা চলছে না, একসময় মুখ থুবড়ে পড়ে গেল। টলমল পায়ে উঠে দাঁড়াল ব্লট, হাত-পা থেকে রক্ত ঝরছে, কিন্তু ভয় আর শঙ্কা শক্তি যোগাল ওকে। ছুটে গিয়ে শোলা ঝোঁপের উপর পড়ল, অন্ধকারে দেখতে পায়নি। অসংখ্য কাঁটা বিদ্ধ হলো শরীরে, যন্ত্রণায় অস্ফুট স্বরে গুঙিয়ে উঠল ও। এত অসহায় অবস্থা যে চিৎকারও করতে পারছে না। অসহ্য ব্যথা অগ্রাহ্য করে আবার ছুটতে শুরু করল

ভোরের আলো যখন ফুটতে শুরু করেছে, তখন ক্লান্তির চরমে পৌঁছে গেছে, টিমথি ব্লট। খাঁ খাঁ মরুভূমিতে রয়ে গেছে তখনও, গন্তব্যের দেখা নেই। এক ঘণ্টা পর মনে হলো, একই জায়গায় রয়েছে, সূর্য এখন উত্তাপ ঢালছে রুক্ষ মরুভূমির বুকে। থেমে শরীরে বেঁধা কাটা তোলার প্রয়াস পেল সে, হাতেরগুলো দিয়ে শুরু করল-দাঁত দিয়ে তুলতে চাইছে। একটা তুলতে সক্ষম হলো, দ্বিতীয়টা কামড়ে ধরেছে, এসময় ক্ষীণ শব্দ শুনতে পেয়ে চোখ তুলে তাকাল সামনের দিকে।

মুহূর্ত খানেক স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকল, মনে শঙ্কা আর ভয়ের দ্বৈরথ চলছে, তারপর ধীরে ধীরে ডানে-বামে দৃষ্টি প্রসারিত করল। এক কদম পিছিয়ে এল ও, দরদর করে ঘামছে, ঘুরে দাঁড়াল, কাটাটা এখনও কামড়ে ধরে আছে। ওকে ঘিরে ফেলেছে অ্যাপাচিরা। পালানোর কোন পথ নেই।

ঠিক মাঝ দুপুরে টিমথি ব্লটের আর্তনাদ শুনতে পেল অন্যরা।

ঝট করে দাঁড়িয়ে পড়ল বেন ডেভিস, ফ্যাকাসে হয়ে গেছে মুখ। কী ওটা?

দীর্ঘ একটা মিনিট কেটে গেল, কেউ কিছু বলল না, শেষে জবাব দিল এরিক: ব্লটের চিৎকার ওটা…ইয়োমায় আর পৌঁছা’নো হলো না বেচারার।

*

দুপুরের একটু পর ফিরে এল ডান ঘোড়াটা। হালকা তালে ছুটে এল, স্টিরাপ দুটো লুটাচ্ছে। এরিক ওটার পাশে গিয়ে দাঁড়াতে ঝট করে মাথা তুলল ঘোড়াটা, চোখজোড়া ঘুরপাক খাচ্ছে। মৃদু স্বরে কথা বলে ওটাকে শান্ত করল এরিক, ব্রিডল ধরে নিয়ে এল পানির কাছে। স্যাডল খুলে, ওটাকে পিকেট করল, ঘাস খাওয়ার সুযোগ দিল, একইসঙ্গে বিশ্রামও পাবে। ঘোড়ার নাগালের বাইরে আছে, এমন মেস্কিট বীন তুলে এনে রাখল ওটার সামনে। গত এক ঘণ্টা ধরে টিমথি ব্লটের চিৎকার শুনতে পেয়েছে ওরা, কিন্তু ক্রমে ক্ষীণ হয়ে আসছে।

দীর্ঘক্ষণ কেউই কিছু বলছে না। শেষে এরিকের পাশে এসে দাঁড়াল কেলার। ব্লটকে কী করছে ওরা, বলতে পারবে? কর্কশ স্বরে জানতে চাইল সে, কণ্ঠে ভয় চাপা থাকল না; আতঙ্কে ফ্যাকাসে হয়ে গেছে মুখ, ঘাম ঝরছে ভুরু থেকে। ব্লটের গলা শুনে মনে হচ্ছে একটা পশু চিৎকার করছে।

আহত পশুর চিল্কারের মত, গম্ভীর স্বরে বলল এরিক। তবে এখন আর নিজেকে মানুষ বলে মনে হচ্ছে না ওর। অ্যাপাচিরা ওকে নিয়ে কী করছে জানি না, হয়তো একটু একটু করে ওর চামড়া ছিলছে, কিংবা শোলার কাঁটা বিধাচ্ছে ওর দেহে, তারপর কাটায় আগুন ধরিয়ে দিচ্ছে। অত্যাচার করার ব্যাপারে অভিনব সব আইডিয়া গিজগিজ করে অ্যাপাচিদের মাথায়।

বিশাল হাতের পাঞ্জা দিয়ে মুখ মুছল কেলার। কী মনে হয়। তোমার কোন সম্ভাবনা আছে আমাদের, ক্রেবেট?

এখনও বেঁচে আছি, তাই না? আছি যখন, একটা সম্ভাবনা তো আছেই।

ইন্ডিয়ান ক্যাম্পে হামলার পরিকল্পনা বাতিল করতে হয়েছে, কিন্তু এরিক জানে যে সুযোগ পেলে তাই করা উচিত, সম্ভাবনা শেষ হয়ে যায়নি। হয়তো এতেই পাশার দান উল্টে দিতে সক্ষম হবে ওরা। তবে একজন লোক কম আছে এখন।

স্যাডল ব্যাগ দুটোর দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে মার্ক ডুগান। ওগুলোয় কী আছে? জানতে চাইল সে

নিজের চরকায় তেল দাও! খেঁকিয়ে উঠল বিগ জুলিয়া।

আমি বলছি, শয়তানি হাসি ফুটল কেলারের মুখে। শুনবে, কী আছে ব্যাগে? সোনা। খাঁটি সোনা। ষাট-সত্তর হাজার ডলার হবে দাম। আরেকটা কথা জেনে নাও, চুরি করা সোনা এগুলো।

চুরি করা?

হ্যাঁ। আমার ধারণা ওগুলো আসলে কুইটোবাক খনি থেকে এসেছে। টুকসনে এ-সম্পর্কে যত গাঁজাখুরি গল্পই চালু থাকুক, বাস্তবে সোনা ছিল কুইটোবাকে। বন্ধু সহ ওগুলো চুরি করেছে বিগ জুলিয়া, সম্ভবত বুড়ো অ্যাডামকে খুনও করেছে।

ম্যাম, হঠাৎ তীক্ষ্ণ স্বরে বলল মার্ক ডুগান। আইনের লোক আমি। সোনাগুলো আমার হাতে তুলে দাও।

ঘাম আর বালি জমে বিচিত্র আঁকিবুকি তৈরি হয়েছে জুলিয়ার মুখে। পরনের কাপড় এলোমেলো, ধূলিমলিন, একটা স্টকিং নীচে নেমে গেছে; কিন্তু মহিলার হাতের শটগানটার ভয়ঙ্করত্ব সম্পর্কে কারও মনে এতটুকু সন্দেহ নেই। বেশ, সাহস থাকলে এসে নিয়ে যাও, বিগ জুলিয়ার সংক্ষিপ্ত উত্তর।

জিভ চালিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে নিল ডুগান। লোভী চাহনিতে দেখল ব্যাগ দুটো, কিন্তু এগিয়ে গিয়ে ওগুলো নেওয়ার আগ্রহ দেখা গেল না তার মধ্যে।

এত তাড়াহুড়োর কিছু নেই, অপেক্ষা করো, পরামর্শ দিল জেফ কেলার। এই গ্যাড়াকল থেকে যেই মুক্তি পাবে, নিঃসন্দেহে বড়লোক হয়ে যাবে সে।

যথেষ্ট হয়েছে! নাক গলাল এরিক। নিজেদের মধ্যে শুধু খুনোখুনিই বাকি আছে। কেলার, এ-নিয়ে আর একটা কথা বলেছ কি ব্লটের মতই মরুভূমিতে পাঠিয়ে দেব তোমাকে।

হাতে শটগান, বিগ জুলিয়ার চোখে যুগপৎ চ্যালেঞ্জ এবং ঔদ্ধত্য। কিন্তু মহিলাকে রীতিমত অগ্রাহ্য করল এরিক। মহা বিপদে আছে ওরা এখন। টিমথি ব্লটের ধৈর্য আর সহিষ্ণুতার পরীক্ষা নিচ্ছে অ্যাপাচিরা। বেশ কয়েক ঘণ্টা হলো নারকীয় যন্ত্রণা ভোগ করছে সে, কিন্তু সহ্যের সীমা তারও আছে; ব্লটের মৃত্যুর পরপরই ওদের দিকে মনোযোগ দেবে ইন্ডিয়ানরা।

এরিকের সামনে এসে দাঁড়াল সার্জেন্ট। ফ্যাকাসে এবং বয়স্ক দেখাচ্ছে তাকে। দুঃখিত, এরিক। ব্লটের পক্ষ থেকে আমিই দুঃখ প্রকাশ করছি। আসলে সত্যিকার সৈনিক হওয়ার যোগ্যতা কোন কালেই ছিল না ওদের, খেয়ালের বশে চলে এসেছে, আমাদেরও লোক দরকার বলে বাছ-বিচার না করে নিয়ে নিয়েছিলাম। কেলারের ক্ষেত্রেও একই ব্যাপার…পুবে ঝামেলায় ছিল ও, পশ্চিমে এসে সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়েছে স্রেফ নিজেকে রক্ষা করার জন্য।

এগিয়ে এল ডুগান। ক্ৰেবেট, ওই মহিলাকে সমস্ত সোনা আমার হাতে সোপর্দ করতে বলে। এখানে আমিই আইনের একমাত্র লোক।

ঝটিতি তার দিকে ঘুরে দাঁড়াল এরিক। ডুগান, তুমি আসলে ব্যবসায়ী। জরুরি প্রয়োজনে পাসির সদস্য হিসাবে বেছে নেওয়া হয়েছিল তোমাকে, তারমানে এই নয় যে আইনের নিয়মিত লোক তুমি। যাই হোক, ক্ষণিকের ডেপুটি হয়তো ছিলে, কিন্তু এখানে তাও নও, স্রেফ নিজের জীবন বাঁচানোর জন্য লড়ছ। জুলিয়া কীভাবে সোনা লে বা ওগুলো নিয়ে কী করবে, তাতে একটুও মাথাব্যথা নেই আমার। আমার চিন্তা কেবল একটাই, কীভাবে এই বিপদ থেকে উদ্ধার পাব আমরা।

হ্যাঁ, এখান থেকে যখন বেরিয়ে যাবে তুমি, স্পষ্ট বিদ্বেষের সুরে বলল ডুগান। তোমার অতীত যাচাই করার ব্যবস্থা করব, ক্ৰেবেট। সম্ভবত আইনের উল্টো পথে তোমার যাতায়াত।

চাপাটা বন্ধ রাখো! নিজের জায়গায় গিয়ে রাইফেল হাতে নাও। ব্লটের মত অসহ্য কষ্টে মরতে না চাইলে নজর রাখো, যে-কোন সময়ে হামলা করতে পারে ইন্ডিয়ানরা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *