১৩. বেচারা আইজাক

বেচারা আইজাক! বরফের মতো ঠাণ্ডা তার ছোট্ট কুঠুরিটা। অন্ধকার আর স্যাতসেঁতে ভাব তো আছেই; আরো আছে ইঁদুর। সংখ্যায় অজস্র। এই অন্ধকুঠুরীতে আগে যেসব বন্দী মারা গেছে তাদের কঙ্কাল এখনো দেয়ালে ঝুলছে শেকলে বাঁধা অবস্থায়। ভয়, দুঃখ, হতাশা সব কিছু এক সাথে গ্রাস করেছে বুড়ো ইহুদীকে। এক কোণে হাঁটু দুটো বুকের সাথে ঠেকিয়ে বসে আছেন তিনি।

হঠাৎ লোহার ভারি দরজায় একটা শব্দ হলো। চমকে মুখ তুলে তাকালেন আইজাক। এক সেকেন্ড পর খুলে গেল দরজা। ভেতরে ঢুকলো রেজিনান্ড ফ্ৰঁত দ্য বোয়েফ। পেছনে কয়েকজন ভূত্য। বিরাট এক দাঁড়িপাল্লা, অনেকগুলো বাটখারা আর কয়েক ঝুড়ি কয়লা নিয়ে এসেছে তারা।

বিশালদেহী ফ্ৰঁত দ্য বোয়ে এগিয়ে এলো আইজাকের সামনে। ক্রূর দৃষ্টিতে তাকালো বৃদ্ধের দিকে। আতঙ্কে কেঁপে উঠলেন আইজাক সে দৃষ্টি দেখে।

দেখেছে দাঁড়িপাল্লা? শীতল কণ্ঠে বললো রেজিনাল্ড।

মাথা ঝাকালেন বৃদ্ধ, গলা দিয়ে কোনো স্বর বেরোলো না।

এই পাল্লায় তুমি আমাকে এক হাজার পাউন্ড রূপা ওজন করে দেবে। যদি না দাও, এই অন্ধকার কক্ষে তোমাকে তিলে তিলে মরতে হবে। ভেবো

আমি মিথ্যে ভয় দেখাচ্ছি, তোমার আগে অনেকেই মরেছে এখানে। দেয়ালের দিকে তাকাও, তাহলেই প্রমাণ পাবে। কেউ তাদের খবর পায়নি, আচমকা একদিন তারা হারিয়ে গেছে এ পৃথিবী থেকে। আমার আদেশ পালন না করলে তুমিও যাবে।

ওহ নবী আব্রাহাম! রুদ্ধশ্বাসে চিৎকার করে উঠলেন আইজাক। বিশ্বাস করুন এত রূপা আমার কাছে নেই। ইয়র্ক শহরে যত ইহুদী আছে সবার বাড়ি খুঁজলেও আপনি অত রূপা পাবেন না।

ভালো কথা, রূপা যদি না-ই প্লকে, সোনা দেবে।

দয়া করুন আমাকে, স্যার নাইট, কাতর কণ্ঠে বললেন আইজাক। আমি বুড়ো মানুষ, অসহায়, আমার কিছু নেই। বিশ্বাস করুন আমি কপর্দকশূন্য।

কপর্দকশূন্য! হাসলো রেজিনান্ড। ইয়র্কের আইজাক, কপর্দকশূন্য! পাগলেও তো বিশ্বাস করবে না। শোনো, আইজাক, তোমার সাথে রসের আলাপ করার সময় আমার নেই। যা চাইলাম দেবে কিনা বলল, না হলে তৈরি হও যন্ত্রণাদায়ক মৃত্যুর জন্যে।

বিশ্বাস করুন, অত টাকা–

শেষ করতে পারলেন না বৃদ্ধ। ফ্ৰঁত দ্য বোয়েফ ভৃত্যদের দিকে তাকিয়ে হাঁক ছাড়লো, শুরু করো!

মেঝের ওপর এক ঝুড়ি কয়লা ঢেলে রাখলো এক ভৃত্য। অন্য একজন আরেকটা ঝুড়ি থেকে কয়েক টুকরো শুকনো কাঠ বের করে আগুন জ্বাললো চকমকি ঠুকে। জ্বলন্ত কাঠের ওপর মুঠো মুঠো কয়লা দিতে লাগলো প্রথম ভৃত্য, আর অন্যজন বাতাস করতে লাগলো হাতপাখা দিয়ে। দেখতে দেখতে গনগনে হয়ে জ্বলে উঠলো কয়লা।

দেখতে পাচ্ছো, আইজাক, আগুন? আগের মতোই শান্ত শীতল কণ্ঠে প্রশ্ন করলো রেজিনা। একটু পরেই ওর ওপর শুইয়ে দেয়া হবে তোমাকে। জ্যান্ত কাবাব বানানো হবে…।

না! না! চিৎকার করে উঠলেন আইজাক।

আরে, এখনই না না করছো কেন, সবটা তো এখনো বলিনি! মাংস যাতে ধীরে ধীরে পোড়ে সে জন্যে আমার চাকররা অল্প অল্প করে ঠাণ্ডা তেল ঢালবে তোমার ওপর।

না! না! না! রক্ত হিম করা স্বরে আর্তনাদ করে উঠলেন বৃদ্ধ।

ধরো তো ওকে!নির্দেশ দিলো ফ্ৰঁত দ্য বোয়েফ। ব্যাটা ইহুদীকে উলঙ্গ করে শুইয়ে দাও আগুনের ওপর!

সঙ্গে সঙ্গে ভৃত্যরা তৎপর হয়ে উঠলো আদেশ পালন করার জন্যে। নরম্যান লোকটার মুখের দিকে তাকালেন আইজাক। দয়া বা মায়ার লেশমাত্র দেখতে পেলেন না সে মুখে।

দেবো! আমি দেবো! ভূত্যদের সাথে ধস্তাধস্তি করতে করতে তিনি বললেন।

থামো তোমরা! ভৃত্যদের দিকে ফিরে হাঁক ছাড়লো রেজিনাল্ড। এই তো পথে এসেছো বাছা!

এক হাজার পাউন্ড রূপাই আমি দেবে আপনাকে। কিন্তু আগে তা আমাকে জোগাড় করতে হবে ইয়র্কের অন্য ইহুদীদের কাছ থেকে। সেজন্যে কয়েক দিন সময় দিতে হবে আমাকে। আমাকে ছেড়ে দিন, সব জোগাড় করে পৌঁছে দেবো এখানে।

আহ্লাদের আর জায়গা পাওনি, ইহুদী কুত্তা? রূপা বা সোনা যা-ই হোক আগে আমার হাতে আসবে তারপর তোমাকে ছাড়ার প্রশ্ন।

তাহলে আমার মেয়ে রেবেকাকে ইয়র্কে যেতে দিন। ও টাকা জোগাড় করে নিয়ে আসবে।

রেবেকা? অসম্ভব! রেবেকাকে ধরেছে বোয়া-গিলবার্ট। ও-কিছুতেই ওকে ছাড়বে না।

রেবেকা বোয়া-গিলবার্টের বন্দী! ওহ নবী আব্রাহাম! ওহ ঈশ্বর! দুঃখে হতাশায় হৃদয়টা গুঁড়িয়ে যেতে চাইছে আইজাকের। রেজিনান্ডের পায়ের ওপর আছড়ে পড়ে কেঁদে উঠলেন তিনি। যা চেয়েছেন তার দশগুণ দেব! চান তো শত গুণ দেবো। কিন্তু কিন্তু আমার মেয়েটাকে বাঁচান! বাঁচান দয়া করে!

কি আশ্চর্য! আমি কি করে বাঁচাবো তোমার মেয়েকে? বললাম না, ও বোয়া-গিলবার্টের বন্দী!। মুহূর্তে ভয়, ভাবনা, দুশ্চিন্তা সব দূর হয়ে গেল বৃদ্ধের মন থেকে। সোজা হয়ে দাঁড়ালেন রেজিনান্ডের মুখোমুখি। চোখ রাখলেন ওর চোখের দিকে। তারপর শান্ত কণ্ঠে বললেন, রেবেকাকে যতক্ষণ না মুক্তি দিচ্ছো, ততক্ষণ এক পয়সাও পাবে না আমার কাছ থেকে।

আরে, ইহুদী কুত্তা, তুমি কি পাগল হয়ে গেলে? আগুনের কথা মনে নেই?

আগুন কেন, ইচ্ছে হলে আরো খারাপ কিছু আনতে পারো, কিন্তু আমি যা বলেছি তাতে কোনো নড়চড় হবে না।

ধরো ওকে! চিৎকার করে উঠলো ফ্ৰঁত দ্য বোয়েফ।

এবারও এক মুহূর্ত দেরি না করে নির্দেশ পালন করতে লেগে গেল ভৃত্যরা। বৃদ্ধের আলখাল্লাটা খোলার চেষ্টা করছে। এই সময় বাইরে থেকে ভেসে এলো ট্রাম্পেটের তীক্ষ্ণ আওয়াজ। তারপর চিৎকার। উদ্বিগ্ন কণ্ঠে কে যেন উপরে ডাকছে ফ্ৰঁত দ্য বোয়েফকে।

বিরক্তির ছাপ পড়লো রেজিনান্ডের চেহারায়।

এখনকার মতো বেঁচে গেলে, ইহুদীর বাচ্চা, চিবিয়ে চিবিয়ে বললো সে। পরের বার আর বাঁচবে না। কথাটা মনে রেখো।

বেরিয়ে গেল সে কুঠরি থেকে। ভূত্যরা অনুসরণ করল তাকে।

হাঁটু মুড়ে বসে ঈশ্বরকে ধন্যবাদ জানালেন বৃদ্ধ। তারপর তার সেই কোনায় গিয়ে কাঁদতে লাগলেন মেয়ের কথা মনে করে।

.

যে মুহূর্তে আইজাকের কুঠরিতে ঢুকেছে ফ্ৰঁত দ্য বোয়েফ ঠিক সেই মুহূর্তে রোয়েনার কক্ষে ঢুকলো দ্য ব্রেসি। ওর পরনে এখন ডাকাতদের নয়, সর্বশেষ ছাঁট কাটের দামী অভিজাত পোশাক। হাঁটু পর্যন্ত মাথা নুইয়ে রোয়েনাকে অভিবাদন জানালো সে।

আমাকে এখানে ধরে এনেছেন কেন? কেন আমাকে বন্দী করা হয়েছে?

সুন্দরী, বিগলিত হেসে দ্য ব্রেসি বললো, কে বলেছে তুমি বন্দী?–বন্দী তো আমি। তোমার রূপের শিকল আমাকে যে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলেছে, রোয়েনা।

দেখুন, আপনাকে আমি চিনি না, শীতল কণ্ঠে বললো রোয়েনা। আবার আপনাকে জিজ্ঞেস করছি, কেন আমাকে ধরে এনেছেন?

তুমি আমার স্বপ্নের রানী, হৃদয়ের রানী শুরু করলো দ্য ব্রেসি, কিন্তু তাকে থামিয়ে দিলো রোয়েনা।

দয়া করে প্রলাপ বন্ধ করুন, বললো সে। আমার প্রশ্নের জবাব দিন। কেন আমাকে ধরে আনা হয়েছে?

দ্য ব্রেসির অমায়িক মুখখাশটা এবার খসে পড়ে গেল।

শাদা কথায় জানতে চাও, তাই তো? রুক্ষ হয়ে উঠেছে তার গলা। তাহলে শোনো, শাদা কথায়ই বলছি, আমাকে যদি বিয়ে না করো এই প্রাসাদ-দুর্গ থেকে তুমি বেরোতে পারবে না। নিজেকে সামলে নিয়ে আবার অমায়িক মুখোশটা পরে নিলো দ্য ব্রেসি। প্রিয়তমা, যা করেছি তোমার মঙ্গলের জন্যেই করেছি। যে জঘন্য স্যাক্সন পরিবেশে তুমি মানুষ হয়েছে তা থেকে মুক্তি দিতে চাই। দেশের অভিজাত মহলে প্রতিষ্ঠা পেতে হলে, সারা ইংল্যান্ডে তোমার সৌন্দর্যের খ্যাতি ছড়িয়ে দিতে হলে আমার মতো সভ্রান্ত মানুষকে বিয়ে করা ছাড়া তোমার আর পথ কোথায়?

কে চায় অভিজাত মহলে প্রতিষ্ঠা পেতে, বিশেষ করে আপনার মতো বদমাশরা যে মহলের বাসিন্দা? আর যে জঘন্য পরিবেশের কথা বলছেন ছেলেবেলা থেকে সেখানেই আমি মানুষ হয়েছি। তা যদি কোনো দিন ছেড়ে যেতে হয়, যাব এমন লোকের সাথে যে ঐ পরিবেশের নামে আপনার মতো নাক সিঁটকাবে না।

তোমার মনের গোপন ইচ্ছাটা যে জানি না তা নয়, আবার জ্বর হয়ে উঠেছে দ্য ব্রেসির দৃষ্টি। তাহলে শুনে রাখো আমার নাম মরিস দ্য ব্রেসি, আমি যা চাই সব সময় তা পেয়ে থাকি। আপোষে না পেলে শক্তি প্রয়োগেও দ্বিধা করি না। যদি ভেবে থাকো স্বপ্নের কোনো বীর এসে তোমাকে উদ্ধার করবে তাহলে ভুল ভেবেছো। রিচার্ড আর কোনোদিনই ইংল্যান্ডের সিংহাসনে বসবে না; তার প্রিয় পাত্র আইভানহোও কোনোদিন তোমার হাত ধরে তার সামনে যাওয়ার সুযোগ পাবে না। আইভানহো এখন আমাদের হাতে বন্দী। এই দুর্গেই আছে।

আইভানহো! এখানে! সবিস্ময়ে চিৎকার করে উঠলো রোয়েনা।

হ্যাঁ, সুন্দরী। ইহুদী আইজাকের মেয়ে রেবেকার পাল্কি-গাড়িতে ও ছিলো। তোমাদের সাথেই এসেছে অথচ তুমি কিছু জানো না, আশ্চর্য ব্যাপার! তাহলে শোনো, আরেকটা খবর তোমাকে দেই, ফ্ৰঁত দ্য বোয়েফ এখন আইভানহোর প্রতিদ্বন্দ্বী।

আইভানহোর প্রতিদ্বন্দ্বী ফ্ৰঁত দ্য বোয়েফ! কেন?

তুমি ভান করছে, নাকি আর দশজন মেয়ের মতো ছলনার জাল বিস্তার করতে চাইছে আমি বুঝতে পারছি না, রোয়েনা। একজন অসুস্থ মানুষের সঙ্গে সুস্থ মানুষের প্রতিদ্বন্দ্বিতা কখন হতে পারে বোঝো না? ঈর্ষা। হ্যাঁ, রোয়েনা, ঈর্ষা। রেজিনান্ড চায় রেবেকাকে, অথচ রেবেকা হৃদয় দিয়ে বসে আছে তোমার আইভানহোকে। এখন রেবেকাকে পেতে হলে কি করবে রেজিনাল্ড? আইভানহোকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দিলেই সব দিক থেকে সুবিধা তার। মনের মানুষই যদি পৃথিবীতে না থাকে তাহলে মন দেবে কাকে রেবেকা? তাছাড়া আইভানহোর যে সব সম্পত্তি রেজিনান্ড ভোগ করছে সেগুলোর ব্যাপারেও একশো ভাগ নিশ্চিত হয়ে যেতে পারবে সে। আইভানহো না থাকলে কে আর দাবি করবে আইভানহোর সম্পত্তি? বুঝতেই পারছো, আইভানহোর সামনে এখন মহাবিপদ। কিছু না, ডাক্তারকে ওর ওষুধের সাথে এক ফোটা বিষ মিশিয়ে দিতে বললেই হবে।

ঈশ্বরের দোহাই, আপনি বাঁচান আইভানহোকে!

হ্যাঁ বাঁচাতে পারি, মুচকি হাসলো দ্য ব্রেসি, যদি তুমি আমার কথায় রাজি হও। আমার স্ত্রীর আত্মীয় স্বজন বা ছেলেবেলার খেলার সাথীর গায়ে হাত দেয়ার সাহস কারো হবে না। কিন্তু ঐ যে বললাম, তার আগে তোমাকে আমার স্ত্রী হতে হবে। নইলে কেন আমি কোথাকার কোন আইভানহোর জন্যে ঘনিষ্ঠ বন্ধুর সাথে বিবাদ করতে যাবো?

এতক্ষণ কোনো রকমে আত্মসংবরণ করে ছিলো রোয়েনা, এবার আর পারলো না। একেবারে ভেঙে পড়লো। তার দুচোখ ছাপিয়ে জল নেমে এলো মুখে ঘনিয়ে উঠলো হতাশা আর বিষাদের কালো ছায়া।

কয়েক মুহূর্ত রোয়েনাকে কাঁদতে দিলো দ্য ব্রেসি। তারপর কোমলকণ্ঠে বললো, এক্ষুনি অবশ্য তোমার ভাবনার কিছু নেই। তবে সিদ্ধান্ত নিতে খুব বেশি দেরি করে ফেলল না, তাহলে যে কি হবে আমি বলতে পারি না।

এমন সময় বাইরে থেকে ভেসে এলো ট্রাম্পেটের আওয়াজ। দ্রুত পায়ে বেরিয়ে গেল দ্য ব্রেসি।

মেঝের ওপর আছড়ে পড়ে কান্নায় ভেঙে পড়লো রোয়েনা।

.

দুজন লোক দুর্গের মিনারগুলোর একটার একেবারে ওপরের একটা কক্ষে নিয়ে গেল রেবেকাকে। সেখানে বসে চরকায় সূতা কাটছে শীর্ণদেহ এক বৃদ্ধা।

এই, বুড়ি, ভাগো এখান থেকে। চিৎকার করে উঠলো এক লোক। ঘরটা আমাদের লাগবে। এক্ষুনি বেরোও!

এক্ষুনি বেরোববা! আমি! হাহ্‌, আমার সেই দিনগুলোর কথা মনে পড়ে যাছে, যখন আমিই এখানে আদেশ করতাম, আর তোরা শুনতি।

উলরিকা, ঐ সব মনে করাকরি এখন থামাও, যা বললাম তাড়াতাড়ি করো। খালি করে দাও ঘরটা। তোমার যখন দিন ছিলো আদেশ করছে, এখন আমাদের দিন আমরা করছি।

মর তোরা, কুত্তার দল! একেবারে খ্যাক ম্যাক করে উঠলো বুড়ি। হাতের কাজ শেষ হওয়ার আগে এঘর থেকে আমি কোথাও যাচ্ছি না। যা পারিস তোরা কর।

দেখ, বুড়ি, একটু নরম হয়েছে লোকটার গলা, মনিব একথা জানলে কি…

দূর হ শয়তানের বাচ্চারা! এবার আরো জোরে চিৎকার করলো বুড়ি উলরিকা।

তাকে আর ঘটানোর সাহস পেলো না লোক দুজন। বললো, ঠিক আছে, আমরা যাচ্ছি। এই মেয়েটা থাকলো। খেয়াল রেখো, এখান থেকে যেন না যায় কোথাও। তোমার কাজ শেষ হলে আমরা আবার আসবো।

চলে গেল দুজন।

শয়তানগুলো আবার কোন কুকীর্তি করেছে কে জানে? বিড় বিড় করে বললো বুড়ি। ফুলের মতো মেয়েটাকে কোত্থেকে ধরে আনলো? যেখান থেকেই আনুক, ওর কপালে যে কি আছে তা আমি ভালোই বুঝতে পারছি। চরকা কাটা থামিয়ে রেবেকার দিকে তাকালো উলরিকা। বললো, কালো চুল, কালো চোখ, শাদা চামড়া! বুঝতে পারছি, কেন তোকে এনেছে। তুই বিদেশী, তাই না? কোথায় তোর দেশ? মিসর না প্যালেস্টাইন?

কি বলবে রেবেকা? নিঃশব্দে কাঁদছে ও।

কথা বল, মেয়ে। কাঁদতে পারছিস কথা বলতে পারছিস না?

এখনো চুপ রেবেকা। অসহিষ্ণু হয়ে উঠলো বুড়ি।

আ মলো যা, বোবা নাকি? খনখনে গলায় চিৎকার করলো সে।

বুড়ি মা, রাগ কোরো না, চোখের পানি মুছে বললো রেবেকা।

বাহ্, এই তো কথা বেরিয়েছে!

বলতে পারো, এরা আমাকে ধরে এনেছে কেন?

কেন ধরে এনেছে?–হি-হি-হি, হেসে উঠলো বুড়ি। আমার দিকে তাকা, এককালে আমিও তোর মতো তরুণী, সুন্দরী ছিলাম। আর এখন! এই দুর্গ-প্রাসাদের মালিক ছিলো আমার বাবা, একজন গর্বিত স্যাক্সন। তোকে যে ধরে এনেছে সেই ফ্ৰঁত দ্য বোয়েফের বাবা তাকে হত্যা করে দখল করে নেয় এই দুর্গ। আমার সাত ভাইও মারা যায় ঐ বদমাশের হাতে। আমি একাই কেবল বেঁচে যাই–বলা ভালো আমাকে ওরা বাঁচিয়ে রাখে ওদের দাসত্ব করার জন্যে।

পালানোর কোনো পথ নেই?

এখান থেকে? মৃত্যুর দরজা ছাড়া আর কোনো পথ নেই এখান থেকে পালানোর। নিজেই দেখতে পাবি, হি-হি-হি।

পাগলের মতো হাসতে হাসতে উঠে দাঁড়ালো বুড়ি উলরিকা। তারপর বেরিয়ে গেল তার চরকা, সূতো নিয়ে। দরজা বন্ধ করে তালা লাগিয়ে দিলো বাইরে থেকে।

ভালো করে ঘরটা পরীক্ষা করলো রেবেকা, পালানোর কোনো পথ পাওয়া যায় যদি। কিন্তু না, তেমন কিছু ওর নজরে পড়লো না। আক্রান্ত হলে আত্মরক্ষা করার মতো কোনো কিছুও দেখতে পেলো না। ভেতর থেকে দরজা বন্ধ করার ব্যবস্থা নেই। একটা মাত্র জানালা ঘরে। খুলে দেখলো রেবেকা। নিচে, অনেক নিচে, দুর্গের শান বাঁধানো চত্বর। খাড়া নেমে গেছে মিনারটা। হ্যাঁ এ জানালা দিয়ে পালানো যায় বটে, তবে পালিয়ে চলে যেতে হবে একেবারে পরপারে। শিউরে উঠলো রেবেকা।

কয়েক মিনিট পরেই বাইরে পায়ের আওয়াজ পাওয়া গেল। দরজা খুলে ঘরে ঢুকলো এক লোক। দীর্ঘদেহী, পরনে ডাকাতের পোশাক। শরীরে যত গহনা ছিলো সব একে একে খুলতে শুরু করলো রেবেকা। দরজা বন্ধ করে ওর দিকে মুখ করে দাঁড়ালো লোকটা। গহনাগুলো এগিয়ে দিয়ে রেবেকা বললো, এগুলো সব নিয়ে ছেড়ে দাও আমাকে আর আমার বুড়ো বাবাকে।

প্যালেস্টাইনের ফুল, নরম্যান ভাষায় জবাব দিলো লোকটা, গহনাগুলো সুন্দর, উজ্জ্বল; কিন্তু তুমি যে আরো বেশি সুন্দর, আরো বেশি উজ্জ্বল। আমি তোমার গহনা নয়, সুন্দরী, তোমাকে চাই।

আপনি তাহলে ডাকাত নন! বিস্মিত কণ্ঠে, চিৎকার করে উঠলো রেবেকা। আপনি নরম্যান নাইট!

ঠিকই ধরেছে। আমি নাইট টেম্পলার ব্রায়ান দ্য বোয়া-গিলবার্ট। আমি তোমার গা থেকে অলঙ্কার কেড়ে নেয়ার চেয়ে তাকে আরো ভালো অলঙ্কার দিয়ে সাজাতে আগ্রহী।

আমাকে সাজিয়ে কি লাভ হবে আপনার? আপনি খ্রীষ্টান, আমি ইহুদী। আপনার, আমার কোনো ধর্ম অনুযায়ী তো আমাদের বিয়ে হতে পারে না।

দেখ, আমি আমার বাহুবলে তোমাকে বন্দী করে এনেছি, এখন আমার ইচ্ছাই হবে তোমার আইন, তোমার ধর্ম, বলতে বলতে রেবেকার দিকে এক পা এগোলো, বোয়া-গিলবার্ট।

ওখানেই দাঁড়ান! চিৎকার করে উঠলো রেবেকা, আর এক পা-ও এগোবেন না!

আচমকা এই চিৎকারে থমকে গেল ব্রায়ান। পর মুহূর্তে আবার এগোতে লাগলো পা পা করে।

চেঁচাও যত চেঁচাবে, বললো সে, কেউ তোমার চিৎকার শুনতে পাবে। পেলেও এগিয়ে আসবে না সাহায্য করতে। এই দুর্গে যারা আছে সবাই আমাদের লোক। তারচেয়ে বলি কি, আমার বউ হও। এমন প্রাচুর্যের ভেতর রাখবো, আমাদের নরম্যান মহিলারা পর্যন্ত হিংসে করবে তোমাকে।

না! না! আমি তোমাকে ঘৃণা করি। থুতু দেই তোমার মুখে! আর এগিও না!

স্পষ্ট ভীতি ফুটে উঠেছে রেবেকার চোখে মুখে। এদিক ওদিক তাকাচ্ছে। আর দুতিন পা এগোলেই ওকে ধরে ফেলবে বোয়া-গিলবার্ট! কি করবে কিছু বুঝতে পারছে না রেবেকা। শ্বাস প্রশ্বাস দ্রুত হয়ে উঠেছে ওর আতঙ্কে। হঠাৎ চোখ পড়লো জানালাটার ওপর। তখন যে খুলেছিলো আর বন্ধ করেনি। আচমকা দুই লাফে ছুটে গিয়ে ও উঠে দাঁড়ালো চৌকাঠের ওপর। ওখান থেকে লাফ দিলেই পড়বে নিচের বাঁধানো চত্বরে–তার অর্থ অবশ্যম্ভাবী মৃত্যু!

ব্যাপারটা এত দ্রুত ঘটে গেল যে, বাধা দেয়ার সামান্যতম সুযোগও পেলো না টেম্পলার। হতবুদ্ধি হয়ে কয়েক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে রইলো সে। তারপর এগোলো জানালার দিকে। অমনি চিৎকার করে উঠলো রেবেকা, যেখানে আছে সেখানেই দাঁড়াও, নাইট টেম্পলার! আর এক পা এগিয়েছো কি আমি লাফিয়ে পড়বে।

ব্রায়ান কোনদিন, কোনো পরিস্থিতিতেই তার সংকল্প থেকে পিছু হটেনি। কারো অনুনয়-বিনয় বা দুঃখ-কষ্টে তার মন কখনো গলেনি। কিন্তু আজ রেবেকার সাহস ও মানসিক শক্তি দেখে গললো। রীতিমতো মুগ্ধ হয়ে গেল টেম্পলার। কোমল কণ্ঠে বললো, এসো এসো, রেবেকা। এমন পালগামি করে না। কথা দিচ্ছি তোমার কোনো ক্ষতি আমি করবো না।

কথা দিচ্ছো! তোমার কথা আমি বিশ্বাস করি না!

তুমি আমার ওপর অবিচার করছে, রেবেকা। সত্যিই বলছি, আমি তোমার কোনো ক্ষতি করবে না। তোমার নিজের জন্যে না হোক তোমার বুড়ো বাবার কথা ভেবে অন্তত আমার কথা বিশ্বাস করো। সে-ও এই দুর্গে বন্দী, আমি পাশে দাঁড়ালে কেউ তার কোনো ক্ষতি করতে পারবে না।

এবার একটু নরম হলো রেবেকার মন।

তোমাকে বিশ্বাস করবো? ইতস্তত করছে সে। বুঝতে পারছি না ঠিক হবে কিনা…।

শোনো রেবেকা, জীবনে অনেক বেআইনী কাজ আমি করেছি, অনেক অধর্মাচরণ করেছি, কিন্তু কথার খেলাপ কখনো করিনি।

বেশ, বিশ্বাস করলাম। কিন্তু যেখানে আছে সেখান থেকে তুমি এক পা-ও এগোবে না, তাহলে আবার আমি বিশ্বাস হারাবো।

আমাদের মধ্যে তাহলে সন্ধি হলো, রেবেকা। আমার আপত্তি নেই। কিন্তু শর্ত হলো আমাদের মাঝে এই দূরত্ব ঠিক রাখতে হবে। তুমি এক চুলও এগোতে পারবে না।

বেশ, দূরেই থাকবো, তবু তুমি আমাকে ভয় পেও না।

আমি তোমাকে ভয় পাইও না। ঈশ্বরকে ধন্যবাদ, আমার মনের জোর নষ্ট হয়নি।

এখনও তুমি আমার উপর অবিচার করছে, রেবেকা। অনুযোগের সুর ব্রায়ানের কণ্ঠে। আমার উপর থেকে তোমার সন্দেহ এখনও যাচ্ছে না। আমাকে যত খারাপ ভাবছো, সত্যিই আমি তত খারাপ নই…।

এই সময় বাইরে থেকে ভেসে এলো ট্রাম্পেটের তীক্ষ্ণ আওয়াজ। ব্যস্ত হয়ে উঠলো ব্রায়ান। নিশ্চয়ই কোনো দুঃসংবাদ।

…যাক এ নিয়ে আমরা পরে আবার আলাপ করবো। এখন যাই।

তোমার সাথে যে রূঢ় আচরণ করেছি সেজন্যে ক্ষমা চাইব না। কারণ ঐ আচরণ না করলে তোমার এই কোমল দেহে এমন বজ্রকঠিন একটা মন লুকিয়ে আছে তা বোধ হয় জানতে পারতাম না। শিগগিরই আবার আমাদের দেখা হবে, ততক্ষণ আমার কথাটা একটু ভেবে দেখ।

বেরিয়ে গেল ব্রায়ান। জানালার ওপর থেকে নেমে এলো রেবেকা! ধপ করে বসে পড়লো মেঝেতে। এই এক কৌশলে কবার বাঁচা যাবে, ভাবছে ও।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *