১৩. পরদিন সকালে খাওয়া-দাওয়ার পর

পরদিন সকালে খাওয়া-দাওয়ার পর কাজের জন্যে তৈরি হলো সবাই।

একেবারে গোঁড়া থেকে শুরু করতে হবে সবকিছু। ক্যাপ্টেন বললেন, কাঠ আর কয়লার অভাব নেই দ্বীপে! শুধু তন্দুরটা হলেই আগুনে পুড়িয়ে মাটির বাসন পেয়ালা তৈরি করে ফেলা যাবে।

তন্দুর! অবাক কণ্ঠে প্রশ্ন করল পেনক্র্যাফট, তন্দুর পাব কোথায়?

বানিয়ে নেব। ইট দিয়ে।

ইট পাব কোথায়?

কাদামাটি দিয়ে বানিয়ে আগুনে পুড়িয়ে নিতে হবে। ইট পোড়ানোর জায়গাতেই খাড়া করব তন্দুরটা। তাতে ঝামেলা কমবে, সময়ও বাঁচবে। চিমনি থেকে খাবার পৌঁছানোর দায়িত্ব থাকবে নেবের ওপর।

ইট তৈরির কারখানাটা কোথায় বসাব?

হ্রদের পশ্চিম তীরে। প্রচুর কাদামাটি আছে সেখানে। কাল দেখে এসেছি আমি।

শিকারের হাতিয়ারের কিন্তু বড় অভাব আমাদের, স্পিলেট বললেন।

ইস, এখন যদি অন্তত একটা ছুরিও থাকত! আক্ষেপ করে বলল পেনক্র্যাফট।

ছুরি, তাই না? তাহলে একটা ছুরি দরকার? বলতে বলতে এদিক ওদিক চাইতে লাগলেন ক্যাপ্টেন। টপের দিকে চোখ পড়তেই কি যেন ভাবলেন  তারপর ডাকলেন, টপ, এদিকে আয় তো।

টপ কাছে এসে দাঁড়াতেই ওর গলা থেকে বেল্টটা খুলে নিলেন ক্যাপ্টেন। দুহাতে চাপ দিয়ে বেল্টে আটকানো টেম্পার্ড স্টিলের বকলসটা মাঝখান থেকে দুটুকরো করে ভাঙলেন।  পেনক্র্যাফটের দিকে টুকরো দুটো এগিয়ে দিয়ে বললেন, এই নাও। পাথরে ঘষে শান দিয়ে নিলেই দুটো ছুরি পেয়ে যাবে তুমি।

প্রায় দুঘণ্টা খরচ করে অদ্ভুত ছুরিতে শান দিয়ে নিল পেনক্র্যাফট! তারপর গন্তব্যস্থলের দিকে রওনা দিল সবাই। মার্সি নদীর পাড় বেয়ে, প্রসপেক্ট হাইটকে পেছনে ফেলে, মাইল পাঁচেক পথ পেরিয়ে জঙ্গলের কাছে একটা ঘাস জমিতে পৌঁছুল অভিযাত্রীরা। এখান থেকে দুশো ফুট দূরে লেক গ্র্যান্ট।

জঙ্গলে এক ধরনের গাছের সন্ধান পেল হার্বার্ট। বাঁশ গাছের মত এসব গাছ দিয়ে ধনুক বানায় আমেরিকার রেড ইন্ডিয়ানরা। অন্য এক ধরনের গাছের ছাল দিয়ে তৈরি হয় ছিলা। ওই গাছ দিয়েই ধনুক বানানো হলো কয়েকটা। এখন বাকি শুধু তীর আর তীরের ফলা।

এপ্রিলের দুই তারিখে মৌলিক পদ্ধতিতে দ্বীপের মধ্য-রেখা নির্ণয় করলেন ক্যাপ্টেন। আগের দিনই দেখে রেখেছেন কোন বিন্দুতে অস্ত গেছে সূর্য। আজকে কোন বিন্দুতে সূর্য উঠেছে তাও খেয়াল করছেন। কালকে ঘড়ি দেখে ঠিক করেছেন সূর্যোদয় এবং সূর্যাস্তের মধ্যে সময়ের ব্যবধান বারো ঘন্টা ছাব্বিশ মিনিট। তার মানে ঠিক ছঘণ্টা তেরো মিনিট পর মধ্যরেখা পেরিয়ে যাবে সুর্য!

হ্রদের তীর খুঁজে খুঁজে ইট বানানোর উপযোগী মাটি জোগার করে কাজে লেগে গেল সবাই। সামান্য একটু বালি মিসিয়ে নিয়ে হাত দিয়ে টিপে টিপেই ইট বানানো চলতে লাগল। ইটের ধারগুলো একটু এবড়োখেবড়ো হলেও মোটামুটি কাজ চালানো যাবে। দুদিনেই হাজার তিনেক ইট তৈরি হয়ে গেল। দিন চারেক পর দেখা গেল তন্দুর বানানোর পক্ষে যথেষ্ট ইট রোদে শুকাচ্ছে। প্রচুর ইট পোড়ানোর জন্য প্রচুর কাঠও জোগার করা হল। শিকার অভিজানও চলতে লাগল এরই ফাঁকে ফাঁকে।

বনে নিরীহ প্রাণীদের সাথে সাথে হিংস্র প্রাণীর দেখা পাওয়া গেল। জাগুয়ারের মত এক ধরনের প্রাণী দেখলেন স্পিলেট। কোনমতে একটা বন্দুকের বন্দোবস্ত করতে পারলেই ওগুলোকে মেরে শেষ করবেন, মনে মনে প্রতিজ্ঞা করলেন তিনি। একদিন তীরের ফলার বন্দোবস্ত করে ফেলল টপ। ঝোপের ভেতর থেকে একটা শজারু মেরে নিয়ে এল সে। শজারুর কাটা বেছে মসৃণ কাঠির মাথায় বেঁধে নিতেই চমৎকার তীর তৈরি হয়ে গেল।

এই তীর দিয়ে অবশ্য জাগুয়ার মারা সম্ভব নয়। ভয়ে তাই বনের খুব গভীরে ঢোকে না কেউ। ইট নিয়ে ব্যস্ত থাকায় চিমনির দিকে খেয়াল ছিল না কারোই। থাকার একটা নতুন জায়গা ছাড়া আর চলছে না—ভাবলেন ক্যাপ্টেন। চিমনিতে ফাঁক ফোঁকর প্রচুর, তাছাড়া জোয়ার এলেই গুহার ভেতর ঢুকে পড়ে সাগরের পানি ।

নোট বইয়ে রীতিমতই ডাইরী লিখে রাখছেন স্পিলেট। সেদিন পাঁচই এপ্রিল বলে জানালেন তিনি  অর্থাৎ দ্বীপে নামার পর বারো দিন পেরিয়ে গেছে।

ছয়ই এপ্রিল তৈরি হয়ে গেল তন্দুর। ওটার মধ্যে জ্বালানী কাঠ ঠেসে ভরে সন্ধ্যার দিকে আগুন দেয়া হলো উত্তেজনা আর উদ্বেগে সে রাতে কারোই ভাল ঘুম হলো না। ঝাড়া দুদিন ধরে ইট পুড়াবার পর আস্তে আস্তে ঠান্ডা হতে লাগল ঝামা ইটের পাজা, অপরিশুদ্ধ চুনাপাথর সংগ্রহ করা হলো হ্রদের ধার থেকে। ওগুলো আগুনে পোড়াতেই কার্বনিক অ্যাসিড ঝরে গিয়ে কুইক লাইম বেরিয়ে এল। তার সাথে বালি আর পাথর মিশিয়ে তৈরি হলো ইট গাঁথার মশলা। ইট দিয়ে বাসন পোড়াবার ভাটি বানালেন ক্যাপ্টেন। পাঁচদিন পর রেডক্রীকের মুখে মাটিতে পড়ে থাকা কয়লা এনে ভাটিতে ঠাসা হলো। তন্দুরে আগুন দিতেই বিশ ফুট উঁচু চিমনি দিয়ে গল গল করে ধোঁয়া বেরোতে শুরু করল।

কাদামাটির সাথে চুন আর বেলে পাথর মিশিয়ে বাসনের মশলা বানালেন ক্যাপ্টেন, যেমন তেমন একটা কুমোরের চাকা বানিয়ে থালা, বাটি, গেলাস সবই তৈরি করা হলো। আনাড়ি হাতে বানানো ওসব জিনিসই মহা মূল্যবান মনে হতে লাগল ওদের কাছে। চুন কাদার এই মিশেলটির ইংরেজি নাম পাইপ ক্লে। তামাক খাওয়ার চমৎকার পাইপ বানানো যায় এই কাদা দিয়ে। কয়েকটা পাইপ বানিয়ে নিল তামাকখোর পেনক্র্যাফট  কিন্তু তামাক কোথায়? কথাটা মনে হতেই হতাশ ভাবে পাইপগুলোর দিকে চেয়ে রইল সে।

পনেরোই এপ্রিল মাটির তৈজস পত্র নিয়ে চিমনিতে ফিরে এল অভিযাত্রীরা। বনমোরগের ঝোল আর ক্যাপিবারার রোস্ট দিয়ে রাতের খাওয়া হলো। খাওয়ার পর হার্বার্টকে নিয়ে চিমনির বাইরে এসে তারাজ্বলা আকাশের দিকে স্থির দৃষ্টিতে চেয়ে রইলেন ক্যাপ্টেন। সন্ধ্যা তখন আটটা। মিনিট কয়েক চুপ করে থেকে বললেন তিনি, আজ পনেরোই এপ্রিল, না, হার্বার্ট?

হ্যাঁ, আস্তে করে উত্তর দিল হার্বার্ট।

কাল ষোলো। বছরের যে চারদিন প্রকৃত সময় গড়পড়তা সময়ের সমান হয়, কাল সে-ই চারদিনের একটা দিন। কাল কাটায় কাটায় বারোটায় মধ্য আকাশে মধ্যরেখা অতিক্রম করবে সূর্য। আবহাওয়া পরিষ্কার থাকলেই দ্বীপের লংগিচিউড বের করা যাবে।

সেক্সট্যান্ট কোথায় পাবেন?

শুধু তাই নয়, হার্বার্টের কথার উত্তর না দিয়েই বললেন ক্যাপ্টেন। আকাশে মেঘ নেই যখন, সাদার্নক্রস তারার উচ্চতা বের করে দ্বীপের ল্যাটিচিউড বের করে ফেলব।

মশালের আলোয় কাজে লেগে গেলেন ক্যাপ্টেন! কাঠ কেটে দুটো চ্যাপ্টা স্কেলের মত কাঠি বানিয়ে বাবলার কাঁটা দিয়ে একটা দিক এঁটে দিতেই কম্পাস তৈরি হয়ে গেল। তারপর সাথীদের নিয়ে প্রসপেক্ট হাইটে উঠলেন তিনি। দক্ষিণ দিগন্তে তখন ঝিকমিক করছে চাঁদ।

দক্ষিণ মেরু ঘেঁষে আলফা নক্ষত্রের উপরিভাগে হঠাৎ যেন আকাশ ফুঁড়ে আবির্ভূত হলো সাদার্নস। দক্ষিণ মেরু থেকে আলফার ব্যবধান সাতাশ ডিগ্রী। কম্পাসের একটা কাটা আলফার দিকে, অন্যটা সাগর দিগন্তের দিকে ফেরালেন ক্যাপ্টেন। দিগন্ত থেকে আলফার কৌণিক দূরত্ব পাওয়া গেল। এখন অংক কষলেই দিগন্ত থেকে আলফার উচ্চতা বের করে নেয়া যাবে। ওই কৌণিক দূরত্বের ওপরই নির্ভর করছে ল্যাটিচিউড। হিসেবটা আগামী দিনের জন্য মুলতবী রেখে চিমনীতে ফিরে এলেন সবাই।

পরদিন ঈস্টার সানডে। কাজেই সেদিন আর কোন কাজ করবে না বলে সিদ্ধান্ত নিল অভিযাত্রীরা। বিকেল নাগাদ ক্যাপ্টেন এক অসাধারণ আবিষ্কার করে বসলেন।

একটা গাছ—নাম ওয়ার্ম উড। এ গাছ শুকিয়ে পটাশিয়াম নাইট্রেটে চুবিয়ে নিলে দেশলাইয়ের মত দাহ্য পদার্থ তৈরি করা যায়। খুঁজতে খুঁজতে পটাশিয়াম নাইট্রেট অর্থাৎ সোরারও সন্ধান পাওয়া গেল।

সারাটা দ্বীপে প্রাকৃতিক সম্পদের ছড়াছড়ি। ক্রমেই আশায় আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে উঠছে অভিযাত্রীদের অন্তর। নতুন এক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে পাঁচ্ছে ওরা নিজেদের। আবিষ্কার করছে নিজেদের অন্তর্নিহিত ক্ষমতা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *