১৩. জিরিয়ে নিয়ে বলল কিশোর, কাজ হয়েছে

যাই হোক, জিরিয়ে নিয়ে বলল কিশোর, কাজ হয়েছে। গাড়িতে করে টমকে নিয়ে গেছে হ্যারিকিরি।

তা গেছে, কপালের ঘাম মুছতে মুছতে বলল মুসা। কিন্তু এরপর কি?

খাঁচার চীজক্লথ খুলছে কিশোর। আমাকে একটু সাহায্য করবে, রবিন?

চীজক্লথ ছিড়ে খাঁচার দরজা খুলে পায়রাটাকে বের করল দুজনে।

ধরো, শক্ত করে ধরে রাখো, বলল কিশোর।

রবিন ধরে রাখল।

পকেট থেকে একটা অ্যালুমিনিয়মের পাতলা পাতের আঙটা বের করে লাগিয়ে দিল কিশোর কবুতরের পায়ে, তাতে কায়দা করে লাগিয়ে দিল তিন গোয়েন্দার একটা কার্ড। কার্ডটা ভাঁজ করে শক্ত করে গুঁজে দিয়েছে আঙটার ভেতরে, কেউ না খুললে আপনা-আপনি খুলে পড়বে না। আরও নিশ্চিত হওয়ার জন্যে পায়ের সঙ্গে শক্ত করে টেপ দিয়ে পেঁচিয়ে দিল।

মুসা, বলল কিশোর, পায়রাটাকে ছাড়ার সম্মান তোমারই প্রাপ্য।

খুশি হলো মুসা। কবুতরটাকে নিয়ে উঠে দাঁড়াল। এক হাতে ধরে রেখে আরেক হাত ওটার পিঠে বুলিয়ে আদর করল। বলল, বাড়ি যাও, খোকা, বলে উড়িয়ে দিল।

কয়েক সেকেণ্ড মাথার ওপর ফড়ফড় করল পাখিটা, তারপর কোণাকুণি উড়ে শ করে উঠে গেল রকেটের মত, তীব্র গতিতে উড়ে গেল উপকূলের দিকে।

দুই ঘণ্টা পর ইয়ার্ডে ফিরে এল তিন গোয়েন্দা।

এসেছ, ওদের দেখেই এগিয়ে এলেন মেরিচাচী। আমি তো ভাবলাম, দিনটাও কাটিয়ে আসবে কিশোর, একগাদা মাল নিয়ে এসেছে তোর চাচা। বোরিস আর রোভার মাল আনতে গেছে আরেকখানে, তোরা একটু হাত লাগাবি?

মাথা কাত করল কিশোর। কাজ করতে অসুবিধে নেই। দুপুরের দেরি আছে এখনও আরও দু-ঘন্টা। তাছাড়া অপেক্ষার মুহূর্তগুলো হয় বড় দীর্ঘ। কাজ করলে, বরং দ্রুতই কাটবে সময়।

হাত চালাচ্ছে বটে, কিন্তু কাজে মন নেই ওদের। বার বার তাকাচ্ছে আকাশের দিকে। কান খাড়া করে রেখেছে ডানার ঝটপট শব্দের জন্যে।

সাড়ে এগারোটার দিকে চাচাকে ড্রাইভার বানিয়ে নিয়ে চাচী গেলেন বাজার করতে। দুটোর আগে ফিরবেন বলে মনে হয় না। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল কিশোর। চাচীর সামনে কবুতরটা নামলে প্রশ্নের জবাব দিতে দিতে জান খারাপ হয়ে যেত ওর। সেদিক থেকে আপাতত নিশ্চিন্ত।

দুপুরের আগে কাজ থামিয়ে দিল ওরা। ওয়ার্কশপের বাইরে বসে অপেক্ষা করতে লাগল। আকাশের দিক থেকে চোখ নামাচ্ছে না তিনজনের একজনও।

বার বার ঘড়ি দেখছে কিশোর।

হঠাৎ লাফিয়ে উঠে দাঁড়াল মুসা। কিন্তু বোকা বনে গেল পরমুহূর্তেই। একটা সোয়ালো উড়ে চলে গেল স করে।

ঠিক কখন যে ছাড়বে হ্যারিকিরি, জানি না, বলল কিশোর। হয়তো আগে খাওয়া-দাওয়া, তারপর…

আবার লাফিয়ে উঠল মুসা।

না, এবার আর ভুল করেনি।

কিশোর আর রবিনও দেখল, চকচকে পালক। মাথার ওপর একবার চক্কর দিয়ে নেমে আসতে শুরু করল।

টম! হাত নেড়ে চেঁচিয়ে ডাকল মুসা। টম! এই যে, এখানে টম!

টমও দেখেছে। গোত্তা দিয়ে নেমে পড়ল একেবারে মুসার বাড়ানো হাতের তালুতে। বার দুই ডানা ঝাপটে চুপ হয়ে বসল।

প্রায় ছোঁ মেরে পাখিটাকে ছিনিয়ে নিল কিশোর। প্রথমেই পা দেখল। পাতলা ধাতুর একটা আঙটা পরানো। কাঁপা হাতে আঙটাটা খুলে ফেলতেই টুপ করে মাটিতে পড়ল উজ্জ্বল একটা কিছু।

উবু হয়ে তুলে নিল কিশোর।

অন্য দুজনও ঝুঁকে এল দেখার জন্যে।

কিশোরের খোলা হাতের তালুতে ঝকমক করছে মস্ত একটা মুক্তো।

যাক, আমাদের অনুমান তাহলে ঠিকই হয়েছে, বলল কিশোর। হ্যারিকিরি, রিচার্ড হ্যারিস, দু-আঙুলা কবুতর…

আমাকে দাও ওটা, কর্কশ কন্ঠে বলে উঠল কেউ।

ঝট করে ফিরে তাকাল তিন গোয়েন্দা।

ওয়ার্কশপের ভেতর থেকে কথা বলেছে লোকটা। জঞ্জালের বেড়া ঘুরে দরজায় বেরিয়ে এল। পরনে কালো অয়েলস্কিন, চোখে কালো চমশা। দাড়িগোফের জঙ্গলের মাঝে একটুখানি পরিষ্কার জায়গা নাকের ফুটো দুটো।

ডান হাত বাড়িয়ে ধীরে ধীরে এগোল লোকটা। শক্ত করে ধরে রেখেছে লম্বা ব্যারেলের একটা পিস্তল।

মুসার মনে হলো নলের কালো ছিদ্রটা তার বুকের দিকেই নিশানা করে আছে। বুক ধড়ফড়ানি শুরু হলো আবার তার। মনে মনে বলল, বলেছিলাম না, রোগটা পারমানেন্ট হয়ে গেছে। আস্তে করে পাশে সরে যাচ্ছে সে, বেড়ার কাছে।

কিশোরের দিকে এগিয়ে আসছে লোকটা। দাও, মুক্তোটা আমাকে দাও।

লোকটার পিস্তল বা মুখের দিকে নজর নেই কিশোরের, সে তাকিয়ে আছে পায়ের দিকে, জুতোর দিকে। লোকটা কিছু বুঝে ওঠার আগেই চোখের পলকে মুক্তোটা মুখে পুরে জিভের ডগা দিয়ে ঠেলে একদিকের গালের কোণায় নিয়ে এল সে। শান্তকণ্ঠে বলল, আর এক পা যদি এগোন, মুক্তোটা আমি গিলে ফেলব।

রাগে কেঁপে উঠল লোকটা। ঝাপিয়ে পড়ল কিশোরের ওপর। গলা চেপে ধরতে চায়, যাতে গিলতে না পারে কিশোর।

লাফ দিয়ে এগিয়ে এল রবিন। লোকটার কাঁধ চেপে ধরে হ্যাঁচকা টানে সরিয়ে নেয়ার চেষ্টা করল।

সরতে গিয়ে একটা ঝাড়ুর ডাণ্ডায় হোঁচট খেল মুসা।

কিশোরের গলা চেপে ধরে আরেক হাতে পিস্তল দিয়ে বাড়ি মেরে রবিনকে ঠেকানোর চেষ্টা করছে লোকটা। বুকে বাড়ি খেয়ে ব্যথায় উফ করে উঠল রবিন। কিন্তু লোকটার কাঁধ ছাড়ল না, অয়েলস্কিন খামচে ধরে প্রায় ঝুলে রইল।

ঝাড়া দিয়ে লোকটার হাত ছাড়াতে চাইছে কিশোর। মুক্তোটা গালের কোণে আটকে রেখেছে শক্ত করে।

সরো, রবিন, সরো! চেঁচিয়ে উঠল মুসা।

সাহস ফিরে পেয়েছে আবার গোয়েন্দা-সহকারী। তার এই আরেক গুণ, এমনিতে ভয় পেলেও সত্যিকার বিপদের সময় বাঘের বাচ্চা হয়ে ওঠে সে, রীতিমত দুঃসাহসী বলা যায় তখন।

সরে গেল রবিন। ঝাটার ডাণ্ডা দিয়ে ধা করে নোকটার ঘাড়ে বাড়ি লাগিয়ে দিল মুসা।

কিশোরের গলা ছেড়ে দিল লোকটা, টলে পড়ে যাচ্ছে। হাত থেকে পিস্তল ছুটে গেল, নাকের ওপর থেকে খসে পড়ল চশমা।

কোনমতে সামলে নিল সে আবার, কিন্তু দাঁড়ানোর শক্তি নেই। বসে পড়ল। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, পারলাম না আমি। তোমাদেরই জিত হলো! চোখ টিপল অদ্ভুত ভঙ্গিতে।

পিস্তলটা কুড়িয়ে নিল কিশোর। গুলি আছে?

না না, বাতিল, নষ্ট পিস্তল। বন্দুক-টন্দুককে সাংঘাতিক ভয় পাই আমি, চোখ পিটল লোকটা পর পর দুবার। ইচ্ছে করে করছে না এমন, এটা তার মুদ্রাদোষ। দুর্বল ভঙ্গিতে উঠে দাঁড়াল।

বাড়ি মারার জন্যে ডাণ্ডা তুলল মুসা।

মেরো না, মেরো না, তাড়াতাড়ি দু-হাত নাড়ল লোকটা। আর ভাল লাগছে না আমার এসব। কেন যে মরতে এই অকাজ করতে গিয়েছিলাম। সব সর্বনাশের মূল ওই ঘোড়া, বুঝেছ, ঘোড়া। রেস খেলে ফতুর হয়ে গেছি, ধারকর্জ করে করে…লোকজন তাগাদা দিচ্ছে টাকার জন্যে। তাই কিছু টাকা জোগাড় করতে চেয়েছিলাম।

লোকটার জন্যে এখন দুঃখই হচ্ছে কিশোরের। হয়ে যেত জোগাড়, মিস কারমাইকেলের বাজপাখিগুলোর জন্যে পারলেন না।

মুখ থেকে মুক্তোটা বের করে পকেটে রেখে দিল কিশোর।

চুপচাপ দেখল লোকটা, অসহায় ভাবভঙ্গি।

ওগুলো আর খামোকা লাগিয়ে রেখেছেন কেন? বলল কিশোর। ওই দাড়িগোঁফ। খুলে ফেলুন। অস্বস্তি লাগছে না?

হ্যাঁ, খুলেই ফেলি, চোখ টিপল রিংকি।

দাড়িগোঁফ আর কালো অয়েলস্কিন খুলে ফেলার পর উলঙ্গ মনে হলো অসকার স্লেটারকে। দেহের আকারও যেন এক ধাক্কায় কমে গেছে অনেক।

নার্ভাস ভঙ্গিতে ক্রমাগত চোখ টিপে যাচ্ছে লোকটা। রবিন আর মুসাকে পাহারায় রেখে থানায় ফোন করতে চলল কিশোর।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *