১৩. এক দুজন নানান প্রশ্ন করল আমাদের

এক দুজন নানান প্রশ্ন করল আমাদের। জানতে চাইল, আমরা কেন রাতের বেলায় চলি, আর দিনে লুকিয়ে রাখি ভেলা।

জিম কি পলাতক নিগ্রো? ওরা জিজ্ঞেস করল।

পাগল! আঁতকে ওঠার ভান করলাম, তাহলে কি আর দক্ষিণে যায়। এরপর আমাদের এহেন আচরণকে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে একটা গল্প খাড়া করলাম: মিসৌরির পাইক কাউন্টিতে থাকতাম আমরা। সেখানেই আমাদের জন্ম। আমার বাবা, আমি আর ছোট ভাই আইক ছাড়া সবাই মরে হেজে গেছে। বাবা ঠিক করল আমার বেন কাকার ওখানে গিয়ে থাকৰে। অরলিয়স থেকে চল্লিশ মাইল দক্ষিণে বেন কাকার ছোট্ট একটা কুঁড়ে আছে। বাবা ছিল গরিব, কিছু ঋণও ছিল তার। ফলে ঋণ শোধের পর তার কাছে মাত্র ষোলটি ডলার আর আমাদের এই নিগ্রো চাকর জিম ছাড়া কিছুই রইল না। কিন্তু ওই পয়সায় তো আর স্টিমারে চৌদ্দশ মাইল পাড়ি দেয়া যায় না। জোর বরাত, একদিন নদীতে যখন জোয়ার এল, বাবা ভেসে আসা এই ভেলাটা ধরে ফেলল। ঠিক হল, এটাতে চেপেই অরলিয়ন্স যাব আমরা। কিন্তু বাবার এই সৌভাগ্য শেষ অবধি টিকল না। ভেলার ওপর একটা স্টিমার চড়ে বসায় পানিতে ডুবে যাই আমরা। পরে জিম আর আমি ঠিক মত উঠলেও বাবা এবং আইক আর কোনদিনই উঠল না। বাবা ছিল বেহেড মাতাল, আর আইকের বয়েস তখন মাত্র চার বছর। এর পরের দুতিনটে দিন ভয়ে ভয়ে কাটে আমাদের। নৌকোয় যারাই জিমকে দেখেছে তারাই ছিনিয়ে নেয়ার চেষ্টা করেছে। ওরা মনে করত জিম নিশ্চয়ই কোন পলাতক নিগ্রেী। সেই থেকে আমরা দিনের বেলায় চলাফেরা বাদ দিয়েছি।

ওদের হাবভাবে মনে হল আমার গুল বিশ্বাস করেছে। দেখি চিন্তাভাবনা করে, বলল সম্রাট, দিনের বেলায় চলাফেরার কোন মতলব ঠাওরান যায় কি-না। এমন একটা ফন্দি আঁটব, সব একদম ঠিক হয়ে যাবে।

রাতের দিকে ঘোর হয়ে এল চারদিক। মনে হল বৃষ্টি নামবে ঘন ঘন বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে, গাছের পাতা কাঁপছে তিরতির। অনুমান করলাম একটা প্রলয়কাণ্ড ঘটতে যাচ্ছে। আমরা সবাই মিলে গোছগাছ করতে লেগে পড়লাম।

রাত একটু গভীর হতেই ছেড়ে দিলাম ভেলা। প্রায় দশটা নাগাদ বৃষ্টি শুরু হল, সঙ্গে ঝড়। বাইরে আমাদের দুজনকে পাহারায় রেখে সম্রাট আর ডিউক ছইয়ের ভেতর আশ্রয় নিল। বারটা অবধি আমার পাহারা দেয়ার কথা। কিন্তু শোবার মত জায়গা পেলেও বাইরে থেকে নড়তাম না আমি। এরকম ঝড় দেখার সৌভাগ্য খুব কম মেলে। বাতাসের ভয়াবহ শো শো গর্জন। প্রতি এক সেকেন্ড পরপর আকাশটা ফালাফালা করে দিচ্ছে বিজলিচমক। সেই আলোয় আধমাইল এলাকা আলোকিত হয়ে উঠছে। বৃষ্টিধারার মাঝে ধুলোটে দেখাচ্ছে দ্বীপগুলো। কয়েকবার পাহাড় সমান ঢেউ ভেলা থেকে ভাসিয়ে নিয়ে যেতে চেষ্টা করল আমায়। কোন কাপড় ছিল না আমার পরনে, তাই কিছু হল না। হানাহুঁটো গাছের ডালপালা উড়ে আসার কোন ভয় ছিল না আমাদের, চোখ ধাঁধানো বিজলিচমকে পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছিলাম আশপাশ।

এক সময় ঘুমে ঢলে পড়লাম আমি। বৃষ্টিবাদলের পরোয়া করলাম না, দিনটাও ছিল বেশ গরম। হঠাৎ একটা ঢেউ আমাকে ভাসিয়ে নেয়ার উপক্রম করল। ওই দেখে জিমের সে-কী হাসি। অগত্যা আবার পাহারায় বসলাম। জিম শুয়ে নাক ডাকতে লাগল। ধীরে ধীরে থামল ঝড়ের দাপাদাপি, প্রকৃতি একেবারে নিথর হয়ে গেল। তীরে, একটা কেবিনে আলো জ্বলে উঠতে দেখলাম। সঙ্গে সঙ্গে জাগালাম সবাইকে। তারপর ভেলাটা লুকিয়ে রাখলাম এক জায়গায়। থিয়েটারে অভিনয় করেছ কখনও? নাস্তার পর সম্রাটকে প্রশ্ন করল ডিউক।

না।

করবে। এর পরের শহরটাতেই নেমে গিয়ে মঞ্চ ভাড়া করব আমরা। সেখানে তৃতীয় রিচার্ড-এর তলোয়ার যুদ্ধ আর রোমিও-জুলিয়েট-এর ব্যালকনি দৃশ্য অভিনয় করব।

অভিনয়ের অ-ও জানি না আমি, ব্রিজওয়াটার, বলল সম্রাট। আমাকে শিখিয়ে নিতে হবে।

কুছপরোয়া নেই। এখনই পাঠ শুরু হোক!

সম্রাটকে রোমিও-জুলিয়েটের পরিচয় জানাল ডিউক। ওরা একে অন্যকে ভালবাসত; কিন্তু বিয়ে হয়নি, দুই পরিবারের মধ্যে ঝগড়া ছিল। তাই মনের দুঃখে আত্মহত্যা করে তারা। সবশেষে ডিউক যোগ করল, সে বরাবর রোমিও হয়; অতএব, সম্রাটকে জুলিয়েট হতে হবে।

তা কী করে হয়, প্রতিবাদ করল সম্রাট। আমার মাথায় টাক, গোঁফ সাদা, ঝাটার মত। মেয়েলোকের চেহারায় বেখাপ্পা দেখাবে না?

সব ঠিক হয়ে যাবে। এখানকার লোকজন সব গেঁয়ো, অশিক্ষিত। কিস্যু টের পাবে না। তাছাড়া মেক-আপ থাকবে।

ঝোলার ভেতর থেকে কয়েক প্রস্থ পোশাক বের করল ডিউক। পর্দার কাপড় দিয়ে তৈরি। ওগুলোর দুটো দেখিয়ে বলল, এগুলো তৃতীয় রিচার্ড এবং তার প্রতিদ্বন্দ্বীর যুদ্ধের পোশাক। তারপর একটা নাইটি আর নাইট-ক্যাপ দেখিয়ে বলল, এগুলো জুলিয়েটের পোশাক।

কাপড়গুলো দেখে সন্তুষ্ট হল সম্রাট। ডিউকের নির্দেশমত নাটকের মহড়া দিতে লাগল।

বাঁকের তিন মাইল ভাটিতে ছোট্ট একটা জনপদ পড়ল। ডিনারের পর জায়গাটা ঘুরে দেখে আসতে ডাঙায় গেল ডিউক। কিছুক্ষণ বাদে ফিরে এসে আমাদের একটা ছাপানো বিজ্ঞপ্তি দেখালো। তাতে জিমের ছবি আঁকা। নিচে লেখা: ধরিয়ে দিন। পুরস্কার দুশ ডলার।

এবার, বলল ডিউক, দিনেও চলতে পারব আমরা। কাউকে আসতে দেখলে জিমকে হাত-পা বেঁধে ফেলে রাখব। আর যারা আসবে তাদের ইস্তাহারটা দেখিয়ে বলব, ওকে ধরিয়ে দিতে যাচ্ছি।

পরদিন নাস্তার পাট চুকে যাবার পর পার্ট মুখস্থ করতে বসল সম্রাট, রোমিও জুলিয়েট নাটকের। বেশ কিছুটা আয়ত্তে আসার পর মহড়া শুরু করল। কীভাবে সংলাপ বলতে হবে, বারবার তাকে দেখিয়ে দিল ডিউক। বুকের ওপর হাত রেখে কেমন করে হা-হুঁতাশ করতে হয় শেখাল। সম্রাটের কাজ দেখে সন্তুষ্টির ভাব ফুটে উঠল তার চেহারায়।

ভালই হচ্ছে। তবে, সম্রাটকে বলল ডিউক, ওরকম ষাঁড়ের মত গলায় রোমিও বললে হবে না। নরম, কাতর স্বরে, রুগীর মতো করে বলতে হবে; রো-ও-ও-মি-ই-ও। জুলিয়েট শিশুর মত মিষ্টি একটা মেয়ে। সে গর্দভের মত চেঁচায় না।

এরপর ওরা দুটো কাঠের তলোয়ার দিয়ে ডুয়েলের মহড়া দিতে লাগল। সে এক দেখার মত জিনিস বটে। ভেলাজুড়ে নেচে কুঁদে বেড়াচ্ছে। একবার এ ওকে ধরে তো আরেকবার সে তাকে মারে। হঠাৎ এক সময় পা ফসকে পানিতে পড়ে গেল সম্রাট। আর সেই সাথে ওদের মহড়াও শেষ হল সেদিনের মত।

প্রথম সুযোগেই নাটকের কিছু বিজ্ঞাপনও ছেপে নিয়েছিল ডিউক। পরের দুতিনটে দিন ভেসে চললাম আমরা। ওদের মহড়ায় প্রাণবন্ত হয়ে উঠল ভেলাটা। বেশির ভাগই তৃতীয় রিচার্ড নাটকের। একদিন সকালে ছোট্ট একটা শহরে এসে পৌঁছুলাম। শহরটা ছাড়িয়ে কিছুদূর গিয়ে একটা খাড়ির ভেতর বাঁধলাম ভেলা। খাড়িটা ঘন সাইপ্রাস গাছে ছাওয়া। জিমকে ভেলায় রেখে ডিঙি নিয়ে শহরে গেলাম আমরা। উদ্দেশ্য, সেখানে নাটক করা যাবে কি-না দেখব ঘুরে।

আমাদের ভাগ্য ভাল, ওইদিন বিকেলেই সার্কাস হবে সেখানে। ভাঙাচোরা ওয়াগন আর বেতো ঘোড়ায় চড়ে গা থেকে লোক আসছে সমানে। সন্ধের পরপর সার্কাস পার্টি চলে যাবে, সহজেই শো করতে পারব আমরা। ডিউক একটা হল ভাড়া করল। আমরা শহরময় পোস্টার সাঁটলাম। পোস্টারে লেখা:

আবার শেক্সপিয়র!!!

বিরাট আকর্ষণ!

কেবল এক রাতের জন্যে!

ট্র্যাজেডি-সম্রাট ডেভিড গ্যারিক (ছোট), ড্রারি লেন

থিয়েটার, লন্ডন, এবং এডমন্ড কিন (বড়), রয়্যাল হে মার্কেট থিয়েটার, লন্ডন, ও

কন্টিনেন্টাল থিয়েটার্স

রোমিও-জুলিয়েট-এর ব্যালকনি দৃশ্য

রোমিও মিস্টার গ্যারিক

জুলিয়েট মিস্টার কিন

নতুন পোশাক, নতুন দৃশ্যসজ্জা!

এবং (বিশেষ অনুরোধে)

তৃতীয় রিচার্ড

রক্তহিম অসি-যুদ্ধের ভয়াবহ দৃশ্য

তৃতীয় রিচার্ড মিস্টার গ্যারিক

রিচমন্ড মিস্টার কিন

প্রবেশ মূল্য মাত্র ২৫ সেন্ট

শিশু ও চাকরদের জন্যে দশ সেন্ট

 

সন্ধের পর শেষ হল সার্কাস। বেশ জমাট ছিল। ভাল লাগল আমার। ঠিক করলাম, যখনই এরকম সার্কাস পাব, পকেট খালি করে হলেও দেখব।

আমাদের নাটকও হল সে-রাতে। মাত্র দশ-বারোজন দর্শক। কোনমতে খরচটা উঠে গেল। অভিনয় দেখে দর্শকরা হেসেই কুটিকুটি। ডিউক ক্ষিপ্ত হয়ে উঠল এতে। শো ভাঙার আগেই সব লোক চলে গেল। কেবল একটা বাচ্চা ছেলে শেষ পর্যন্ত ছিল, ঘুমিয়ে পড়েছিল সে।

এই গেঁয়ো ভূতগুলো শেক্সপিয়র বোঝে না, বলল ডিউক। সস্তা ভাঁড়ামি চায়। ঠিক আছে তা-ই পাবে ওরা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *