১২. সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে বেন ডেভিস

সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে বেন ডেভিস। কোন সম্ভাবনাই নেই, এদের, স্রেফ নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে, সময়ের ব্যাপার মাত্র। এদের সঙ্গে শামিল হওয়ার ইচ্ছে নেই ওর। গত কয়েক রাত ধরে পাথরসারির ফাঁকে সম্ভাব্য একটা পথ খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করেছে ও, এবং শেষপর্যন্ত সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছে যে এখান থেকে নিরাপদে বেরিয়ে যাওয়ার একমাত্র পথ ওটাই। পথটা বালিময় হওয়ায় যাওয়ার সময় শব্দ হবে না বললেই চলে।

ঘোড়ায় স্যাডল রানোর দায়িত্ব দেওয়া যাবে ব্লটকে, রাতে সরাই ঘুমিয়ে পড়লে চুপিসারে সরে পড়তে পারবে ওরা। এক কি দু’জন পাহারায় থাকবে চাতালের উপর, সতর্কতার সঙ্গে এগোলে কিছুই টের পাবে না তারা, আর ওই সময়ে যদি ওরাই পাহারায় থাকে, তা হলে তো সোনায় সোহাগা হবে। কয়েক মাইল এগিয়ে, জোর কদমে ছুটিয়ে দেবে ঘোড়া। ইন্ডিয়ান কোন পনিই আর ধরতে পারবে না ওদের। বিশেষ করে ওর থরোব্রেড ঘোড়াটা তো অপ্রতিদ্বন্দ্বী। প্রথমে উত্তরে এগোবে, তারপর পশ্চিমে মোড় নিয়ে কিছুদূর এগালে ইয়োমায় পৌঁছে যাবে। নদীর তীরে শহরটার অবস্থান। দীর্ঘ নদীটা খুঁজে না পাওয়ার কোন কারণ নেই, তীক্ষ্ণ মোড় নিয়ে কলোরাডো নদীতে পতিত হয়েছে ওটা, অ্যারিজোনার পশ্চিম সীমান্ত বরাবর প্রবাহিত হয়েছে।

গাঁট হয়ে বসে থাকার খেলা যত ইচ্ছে খেলতে থাকুক এরিক ক্ৰেবেট, বিতৃষ্ণার সঙ্গে ভাবল বেন, তাতে কিছু যায়-আসে না ওর। মরুক শালা এখানে! ইন্ডিয়ানদের নিক্ষিপ্ত তীর বা বুলেটের আঘাতে যদি নাও মরে, না খেয়েই মারা পড়বে সবাই। সাহায্য আসার বিন্দুমাত্র সম্ভাবনা নেই। কেউ জানে না ওদের সম্পর্কে, জানেও না কী চরম বিপদে আছে।

ওর সঙ্গী হতে চায় জেফ কেলার, কিন্তু নিজস্ব কিছু আইডিয়া আছে তার••বেশ, শক্ত-সমর্থ কেউ থাকলে উপকারই হবে। টার্গেট হিসাবে দু’জনের চেয়ে তিনজন থাকা শ্রেয়তর; আর কেলার বিশালদেহী মানুষ। বড় শরীর টার্গেট হিসাবেও বড়। আবছা অন্ধকারের মধ্যে কেলারই যে বেশিরভাগ ইন্ডিয়ানের টার্গেটে পরিণত হবে, তাতে কোন সন্দেহ নেই বেনের।

মেলানিকে মাংসের ফালি আগুনে ঝলসাতে দেখে সেদিকে এগিয়ে গেল ও। মাথা ঝাঁকিয়ে কপালে এসে পড়া চুল সরিয়ে দিল মেয়েটি, স্মিত হাসল ওর উদ্দেশে। অদ্ভুত একটা পরিবর্তন ঘটে গেছে মেলানির মধ্যে, বিস্ময়ের সঙ্গে উপলব্ধি করল বেন, কারণ বা উৎসটা ওর বোধগম্য নয়। আগের মত দুর্বিনীত, অস্থির মনে হচ্ছে না রিওস কন্যাকে, বরং অনেক পরিণত, আত্মবিশ্বাসী এবং অন্তর্মুখী। পরিবর্তনটা মোটেও পছন্দ হচ্ছে না বেনের।

তোমার জন্য আর কোন কাজ জুটল না, মন্তব্য করল ও।

কাউকে তো করতেই হবে, তাই না? মিমি ওর ভাগের চেয়ে ঢের বেশি খাটছে।

শিগ্‌গিরই এখান থেকে বেরিয়ে যাব আমরা।

মুখ তুলে ওর দিকে তাকাল মেলানি। শুনে খুশি হালাম। প্রায় সবাই ভাবছে এখান থেকে কখনও বেরিয়ে যেতে পারব না আমরা, তোমার যে উপলব্ধি হয়েছে সেজন্য খুশি আমি।

সবাই হয়তো পারবে না, কিন্তু তুমি নিরাপদে বেরিয়ে যেতে পারবে।

তীক্ষ দৃষ্টিতে ওর মুখ জরিপ করল মেলানি। কথাটার মানে কী, বেন?

প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম যেমন, মেলানি, সবসময় তোমার নিরাপত্তা আর যত্ন নিয়ে ভাবছি আমি। তুমি যাতে এখান থেকে নিরাপদে বেরিয়ে যেতে পারো, সেটা নিশ্চিত করব।

কোমল হয়ে এল মেলানির চাহনি। ডেভিসের আস্তিনে একটা হাত রাখল। নিশ্চই, বেন, সবসময়ই চেষ্টা করছ তুমি। আমি তোমার প্রতি কৃতজ্ঞ।

খানিকটা বিশ্রাম নিয়ে নাও। পরে হয়তো সুযোগ পাবে না।

চলে গেল বেন ডেভিস। ঘোড়ার কাছে তাকে যেতে দেখল মেলানি। দুদিন ধরে নিজের থরোব্রেড়টার জন্য বাড়তি খাবার সংগ্রহ করছে বেন, দেখেছে মেলানি, হ্যাটের তলা ভরে মেস্কিট বীন খাইয়েছে।

কফি তৈরি করল ও। একজন একজন করে খেতে এল অন্যরা। পাপাগো ওয়েসে আসার পর আজই রেনকে প্রথম হাসি-খুশি দেখতে পেল, ব্যাপারটা স্বস্তি এনে দিয়েছে ওর মনে। কিন্তু এরিক ক্রেবেটের দিকে তাকাতে অজানা কারণে ভিতরে ভিতরে অস্বস্তি বোধ করল।

সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে। পাথরের আড়াল থেকে হামাগুড়ি দিয়ে বেরিয়ে এল ছায়ার দল, অগভীর নিচু জায়গায় জমাট বাঁধল; আঙুলাকৃতির ক্যাকটাস আর ওকটিয়ার ছায়া দীর্ঘ হচ্ছে, তবে রাতের আঁধার নামতে অনেক দেরি। প্রায় প্রত্যেকের মনে তীব্র আশঙ্কা, রক্তপিপাসু অ্যাপাচিরা বেশি দূরে নেই এখন। করালটা না থাকায় ওদের প্রতিরক্ষা ব্যুহে ফাটল সৃষ্টি হয়েছে, একটা পথ উন্মুক্ত হয়েছে। ইন্ডিয়ানদের জন্য, একইসঙ্গে পানির অন্তত এক-তৃতীয়াংশ থেকে বঞ্চিত করেছে ওদের। অনাগত রাত হবে ওদের জন্য সবচেয়ে বিপজ্জনক, কারণ আজকের আগে এতটা কাছে ছিল না অ্যাপাচিরা, যে-কোন মুহূর্তে নাগালের মধ্যে চলে আসতে পারবে তারা।

আজ আর গল্প করছে না কেউ, এমনকী স্বাভাবিক কথাবার্তাও বন্ধ; ঘুমাচ্ছে না কেউ। প্রায় সবাই অস্থির, গম্ভীর, কিন্তু বিপদের জন্য সতর্ক। ভয়ের সঙ্গে বসবাস গত কয়েকদিনেও ছিল, সম্পর্কটা ঘনিষ্ঠ হয়েছে আজ। কাঁপা হাতে অমসৃণ চোয়াল থেকে ঘাম মুছল টিমথি ব্লট। কঠিন পাত্র হিসাবে নিজেকে জাহির করতে অভ্যস্ত মার্ক ডুগান আগের ছায়া মাত্র, সামান্য শব্দে চমকে উঠছে; মেজাজ তেতে আছে তার, প্রায় বিস্ফোরনুখ। এমনকী মিচেলও চাপটা অনুভব করছে। এক জায়গায় স্থির নেই সে, এদিক-ওদিক পায়চারি করছে, তবে সারাক্ষণই নজর রাখছে মরুভূমিতে, গুলি করার জন্য একটা টার্গেট দেখতে অধীর হয়ে পড়েছে। একমাত্র টনি চিডলের মধ্যে কোন ভাবান্তর বা পরিবর্তন নেই, তবে খানিকটা সতর্ক সে। শান্ত নির্লিপ্ত চোখজোড়া খানিক বড়সড় দেখাচ্ছে।

চোখাচোখি এড়িয়ে যাচ্ছে ওরা, ভুলেও কেউ কারও দিকে তাকাচ্ছে না, প্রত্যেকের মনে আশঙ্কা-মৃত্যু খুবই কাছে! কালকের সূর্যোদয় ক’জনের দেখার সৌভাগ্য হবে না, কে জানে! পুড়ে যাওয়া করালটা একটা পরিবর্তনের সাক্ষী এবং হুমকি-ওদের মনে করিয়ে দিচ্ছে চাইলে যে-কোন সময়ে ওটা পুড়িয়ে দিতে পারত অ্যাপাচিরা, আজকের আগে করেনি যখন, সুনির্দিষ্ট কারণ ছিল নিশ্চই! এবার সেই মোক্ষম সময় এসে গেছে!

স্বস্তি বোধ করছে বেন ডেভিস। স্বস্তির কারণ একটা সিদ্ধান্তে পৌঁছতে সক্ষম হওয়া। সাফল্য নিয়ে সামান্য দ্বিধা বা সন্দেহও নেই ওর মনে। হ্যাঁ, ঝুঁকি নিতে হচ্ছে, কিন্তু নেহাত দুর্ভাগা না হলে বহাল তবিয়তে ইয়োমায় পৌঁছতে সক্ষম হর্বে ও। আর মাত্র কয়েক ঘণ্টা, তারপরই হতচ্ছাড়া এই জায়গা ছেড়ে চলে যাবে চিরদিনের জন্য। মেলানিকে নিয়ে বেরিয়ে যাবে, চাই কি ইয়োমায় হয়ে যেতে পারে বিয়েটা।

তবে, চিন্তাটা হঠাৎ উঁকি দিল মাথায়, এখনই অ্যারিজোনা ত্যাগ করা ঠিক নাও হতে পারে। জিম রিওস যদি ওদের অনুসরণ করে এসে থাকে, হয়তো ইন্ডিয়ানদের তোপের মুখে গিয়ে পড়েছে, কে জানে মরে গিয়েও থাকতে পারে। সেক্ষেত্রে, বিশাল ওই সাম্রাজ্যের মালিক বনে গেছে মেলানি। তাই, ইয়োমায় গিয়ে দেরি না করে বিয়ে করে ফেলতে হবে।

বরাবরই সহজ পরিকল্পনা করতে অভ্যস্ত ডেভিস। পরিকল্পনা যত, জটিল হয়, ঝুঁকি তত বেশি থাকে, সাফল্যের সম্ভাবনাও কমে যায়। ঘোড়াগুলো নাগালের মধ্যে রয়েছে, এবং বোল্ডার সারির ফাঁকে বেরিয়ে যাওয়ার মত একটা পথ রয়েছে। চারটা ঘোড়া বোল্ডারের ওপাশে নিয়ে যাবে-ব্লট আর কেলার সাহায্য করবে। ওপাশের অন্ধকারের মধ্যে স্যাডলে চড়বে, প্রথমে হেঁটে এগোবে কিছুদূর, তারপর তুমুল বেগে ছুটবে। ওদের অনুপস্থিতি টের পেতে হয়তো কয়েক ঘণ্টা লেগে যাবে। পাহারা না থাকার চিন্তাটা বাতিল করে দিল ডেভিস। বড়জোর কয়েক মিনিটের ব্যাপার। এমনিতে জেগে যাবে কেউ। তা ছাড়া, কেউ পাহারায় না থাকলে ওদের কী? দুনিয়ায় যার যার সুবিধামত কাজ করে সবাই, অন্যের স্বার্থ দেখতে গেলে নিজের উপকার হয় না।

আগুনের অবশিষ্ট জ্বলন্ত কয়লার পাশে বসে সিগারেট ধরাল এরিক ক্রেবেট। মনে মনে নিকট ভবিষ্যৎ ভাবছে-অনুমান করার চেষ্টা করল কী ধরনের পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে হতে পারে। সত্যি কথা হচ্ছে, প্রতিরক্ষার বিবেচনায় যে-কোন সময়ের চেয়ে সুবিধাজনক অবস্থায় রয়েছে ওরা; যেহেতু পরস্পরের খুব কাছে আছে সবাই। তবে সমস্যার কথা হচ্ছে, ঘোড়ার খাবার প্রায় নিঃশেষ হয়ে গেছে, পানির পরিমাণও কম; বারোজনের জন্য রয়েছে আটটা ঘোড়া; বেরিয়ে গেলে, সামনে মরুভূমির যা অবস্থা, এরিক জানে অন্তত একটা ঘোড়ার পিঠে পানি বহন করতে হবে। অন্যথায় মানুষ এবং পশু, সবাই মারা পড়বে।

অ্যাপাচিদের পাল্টা আক্রমণ করার চিন্তাটা আবারও উঁকি দিল মাথায়। এখানে কোণঠাসা হওয়ার পর থেকে আইডিয়াটা মাথায় রয়ে গেছে, খুব জুৎসই মনে না হলেও একেবারে বাতিলও করে দিতে পারেনি। হামলার সময়টাই মুখ্য ব্যাপার, খুবই সতর্কতার সঙ্গে বেছে নিতে হবে। এখনই সুবর্ণ সময়, একরকম নিশ্চিত ও। প্রথম দিকে উদ্বিগ্ন এবং সতর্ক ছিল অ্যাপাচিরা, কিন্তু নিজেদের সাফল্যের ব্যাপারে নিশ্চিত হয়ে গেছে এখন। রুটিনমাফিক কাজ করে যাবে, ঘুণাক্ষরেও আশা করবে না উল্টো সাদারাই হামলা করে বসবে ওদের উপর।

দলটা বড় হলে অনেক শব্দ হবে, নিজেদের অবস্থান লুকিয়ে রাখতে পারবে না। উত্তম হবে যদি এরিক একাই যায়, কিন্তু একা সুবিধা করতে পারবে না। সম্ভাবনা খুবই কম। সেক্ষেত্রে বড়জোর তিন কি চারজন, শেষে সিদ্ধান্তে উপনীত হলো ও। লোক বাছাই করতে গিয়ে প্রথমেই এসে পড়ল টনি চিডলের নাম। এ-ধরনের লড়াইয়ের ক্ষেত্রে সবার মধ্যে সে-ই সেরা। তা ছাড়া, চাইলেও বাদ দেওয়া যাবে তাকে। বললেই যেতে রাজি হয়ে যাবে ড্যান, এবং অন্যদের মধ্যে থেকে একজনকে বেছে নিতে হবে। বেন ডেভিসের কথা মনে এলেও বাতিল করে দিল এরির্ক। ডেভিস সাহসী তাতে কোন সন্দেহ নেই, কিন্তু অশ্বারোহী সৈনিক ছিল সে, বালিতে ক্রল করে এগোনোর ক্ষেত্রে বা ঘণ্টার পর ঘণ্টা একই জায়গায় পড়ে থেকে অপেক্ষার ক্ষেত্রে আস্থা রাখা যাবে না তার উপর।

হ্যালিগানকে রেখে যেতে হবে, কারণ ওদের কিছু হয়ে গেলে এদিকের পরিস্থিতি সামাল দেবে সার্জেন্ট। কেলার বা ব্লটকে সঙ্গে নেওয়ার ইচ্ছে নেই ওর, কারণ এদের কাউকে বিশ্বাস করে না ও। সেক্ষেত্রে, বাকি থাকল কেবল ডুগান আর মিচেল। দু’জনের একজনকে নিতে হবে।

*

সূর্যাস্তের পর ভূতুড়ে পরিবেশ নেমে এল মরুভূমিতে, চারপাশে কালিগোলা অন্ধকার। ঝিরঝিরে বাতাসে ঠাণ্ডা হয়ে এসেছে বালি, তাড়িয়ে নিয়ে গেল তপ্ত বাতাস। বাতাসে মৃদু নড়ছে গাছের পাতা, তবে ধুলো উড়ানোর মত যথেষ্ট জোরাল নয়। দূরের এক বালিয়াড়ির আড়ালে ডেকে উঠল একটা কোয়েল। পশ্চিমে পাহাড়সারিতে গাঢ় হয়ে এসেছে ছায়া, কিন্তু শেষ মুহূর্তের আলোয় ফ্যাকাসে উজ্জ্বল দেখাচ্ছে পুবের গুটিকয়েক শৃঙ্গ।

আগুনে জ্বালানি যোগ করে আলোর পরিধি বড় করে তুলল ডুগান। মরুভূমিতে নজর রাখতে ব্যস্ত টনি চিডলের পাশে এসে দাঁড়াল এরিক, গোড়ালির উপর বসে নিচু স্বরে বলল, এখন থেকে তিন বা চার ঘণ্টা পর কয়েকজন বেরিয়ে যাব আমরা, পাল্টা হামলা করব অ্যাপাচিদের।

আমি যাব। আর…এটাই উপযুক্ত সময়।

নিচু স্বরে পিমা ইন্ডিয়ানের সঙ্গে পরামর্শ করল এরিক, নিজের পরিকল্পনা খুলে বলল, চিডলের প্রতিক্রিয়া বা দৃষ্টিভঙ্গি জানতে অধীর হয়ে পড়েছে। আজন্ম লড়াকু মানুষ সে, অ্যাপাচিদের সম্পর্কে ওদের যে-কারও চেয়ে বেশি জানে; এরিকের পরিকল্পনায় কোন খুঁত বের করতে পারলে, শুধু সে-ই পারবে, কিংবা বলতে পারবে সাফল্যের কতটা সম্ভাবনা রয়েছে।

প্রতিবাদ করল না টনি, বরং পরিকল্পনাটা সংশোধন করল। রুট একই থাকল, তবে সম্ভাব্য অ্যাপাচি পাহারাদারের অবস্থান সম্পর্কে নিজের মতামত জানাল।

সন্তুষ্ট মনে ড্যানকে খুঁজতে গেল এরিক।

মিমির সঙ্গে কথা বলছে সে। ওকে দেখে এগিয়ে এল ড্যান, সংক্ষেপে তাকে উদ্দেশ্য ও পরিকল্পনা জানাল এরিক। লম্বা একটা কাঠি দিয়ে নেড়েচেড়ে আগুন উস্কে দিল, জ্বলন্ত কাঠি তুলে সেটার আগুন থেকে সিগারেট ধরাল ও, সিগারেট মুখ থেকে না সরিয়েই বলল, তুমি, টনি এবং আমি যাচ্ছি। আর একজন হলেই চলবে। বেশি দরকার নেই আমার।

ওদের ক্যাম্পে হামলা করবে?

এবং সম্ভব হলে ওদের দু’একটা ঘোড়া নিয়ে আসব। চাই কি তিন-চারটাও পেয়ে যেতে পারি।

মস্ত কঠিন কাজ।

আসল উদ্দেশ্য ওদের উৎসাহ কমিয়ে দেওয়া। ওরা ভাবছে শেষ হয়ে গেছি আমরা।

বেশ…তৈরি আছি আমি। ডাকলেই চলে যাব।

এগারোটায়?

দিনের শেষ আলো মিলিয়ে যাওয়ার আগেই আক্রান্ত হলো ওরা। আগুনে চড়ানো কফির পাত্র শূন্যে উঠে গেল প্রথম গুলিতে, আরেক গুলিতে চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ল জ্বলন্ত কয়লা। মাটিতে ঝাপিয়ে পড়ল ড্যান, আন্দাজের উপর একটা ঝোপে গুলি করল। অন্যরাও বসে নেই, ছুটে গিয়ে অবস্থান নিল, ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পজিশন নিয়েছে গুলি করার জন্য। মিনিট কয়েক দু’পক্ষে টানা গুলি বিনিময় হলো। তীব্র স্বরে চেঁচিয়ে উঠল একটা ঘোড়া, হুমড়ি খেয়ে পড়ে গেল পাথুরে মাটিতে; সৌভাগ্যক্রমে স্রেফ কাঁধে আঁচড় কেটে চলে গেছে বুলেট। গড়িয়ে পাথরের পিছনে আশ্রয় নিল মিচেল, তলা দিয়ে পেরিয়ে গেল, ওপাশে গিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে খিচে দৌড় দিল অপেক্ষাকৃত নিরাপদ আশ্রয়ের দিকে।

ঠিক সেই মুহূর্তে থেমে গেল গোলাগুলি।

ফুটো হয়ে গেছে কফির পাত্র। একটা ঘোড়া সামান্য আহত, আর কানের শীর্ষভাগ পুড়ে গেছে ড্যানের; কিন্তু আক্রমণটা তীব্র নাড়া দিয়েছে ওদের তটস্থ নার্ভে। এত কাছে ছিল ইন্ডিয়ানরা, অথচ ওদের ক্ষয়ক্ষতি সামান্যই, ব্যাপারটা প্রায় অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছে।

হয়তো আমাদের জীবিত ধরতে চায় ওরা, বলল মিচেল।

সন্তর্পণে মাথা তুলে মিচেলের দিকে উঁকি দিল ডুগান। বেকুবের মত বললে! কেন আমাদের জীবিত চাইবে ওরা?

আমাদের সঙ্গে মেয়েরা আছে, গম্ভীর স্বরে বলল মিচেল। জীবিত বন্দির সামনে মেয়েদের নিয়ে ফুর্তি করবে, অ্যাপাচিদের কাছে লোভনীয় সুযোগ এটা।

আড়ষ্ট হয়ে গেল মার্ক ডুগানের মুখ, বরাবরের গাম্ভীর্য বা কাঠিন্য হারিয়ে গেছে অভিব্যক্তি থেকে, আগের মত আত্মবিশ্বাসও নেই। এড মিচেলের উপর থেকে এরিকের দিকে চলে গেল তার দৃষ্টি। জীবনেও শুনিনি অমন কাজ করেছে ওরা, বিড়বিড় করে বলল সে। অসম্ভব!

মুখে বললেও সুরটা শুনে বোঝা গেল কথাটা বিশ্বাস করেছে। ডুগান। দক্ষিণ-পশ্চিমের প্রতিটি লোকই জানে বন্দির সঙ্গে কী ধরনের আচরণ করে অ্যাপাচিরা, কিন্তু নিজের ক্ষেত্রে যে এমন ঘটতে পারে, এই প্রথম সম্ভাবনাটা বিচার করছে ডুগান। দৃষ্টি নিচু হয়ে গেল তার, খাবলা মেরে বালি তুলে নিল, পেশি ঢিলে হয়ে যেতে আঙুলের ফাঁক দিয়ে ঝুরঝুর করে খসে পড়ল সব বালি। কেউ কিছু বলল না। ড্যানের কানের ক্ষতের শুশ্রূষা করছে মিমি; রাইফেলের মেকানিজম পরখ করছে মিচেল।

আগুনটা নিষ্প্রভ হয়ে এসেছে।

ঘোড়ার কাঁধের ক্ষতে গ্রিজ ঘষছে চিডল। কয়েক মিনিট কেটে গেল, কেউ কোন মন্তব্য করল না। সান ফ্রান্সিসকোর কথা ভাবছে বেন ডেভিস…এখান থেকে যদি বেরোতে পারে, জীবনেও আর ফিরে আসবে না। নিকুচি করি পশ্চিমের! জিম রিওস যদি মারা গিয়ে থাকে এবং র‍্যাঞ্চ বা তার সমস্ত সম্পত্তি যদি ওদের হয়ে যাওয়ার কথা; সব বেচে দিয়ে পুবে চলে যাবে ওরা। ভদ্রলোকের বাস করার উপযুক্ত স্থান নয় এটা।

দুটো তারা উঁকি দিল আকাশে। স্থবির হয়ে গেছে বাতাস। দূরে কোথাও ডেকে উঠল একটা কয়োট। জ্বলন্ত কয়লার ম্লান আভা এসে পড়েছে মিচেলের বয়স্ক মুখে, রাইফেলের ব্যারেলে লেগে ঝিকিয়ে উঠল মুহূর্তের জন্য। মাটিতে পা দাবাল একটা ঘোড়া, হ্রেষাধ্বনি করল। পাথরের সঙ্গে হেলান দিয়ে দে আর টেন্টিং টুনাইট অন দ্য ওল্ড ক্যাম্প গ্রাউন্ড গাইতে শুরু করল সার্জেন্ট হ্যালিগান। গানটার করুণ সুর বিষণ্ণ করে তুলল পরিবেশ। আগুনে কাঠ যোগ করল মেলানি, অল্পক্ষণ পরেই উস্কে উঠল আগুন। আগুনের শিখা নাচানাচি করছে ওদের মুখে; গানটা যখন শেষ। হলো, অখণ্ড নীরবতা নেমে এল ছোট্ট ক্যাম্পে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *