১২. শ্যালন চলে যেতেই

শ্যালন চলে যেতেই দ্রুত ক্যুনিকেটরের কাছে গিয়ে দাঁড়াল অস্টিন। বোতাম টিপতেই ছবি ফুটল টেলিভিশনের পর্দায়। করিডোরের একটা অংশ পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। কি ভেবে আরও দুটো টেলিভিশনের বোতামও টিপল সে। কাউন্সিল চেম্বার দেখা গেল একটায়। তৃতীয় টেলিভিশনটা ভূগর্ভের বাইরের দৃশ্য দেখার জন্যে। বুঝল, এর সাহায্যেই ট্রিনিটি বেসের ওপর নজর রেখেছে শ্যালন আর এপ্লয়।

ট্রিনিটি বেসের ওপরই এখন সেট করা আছে টেলিভিশন। ওয়ার্কিং টেবিলের সামনে অসকার গোল্ডম্যান আর টম রেনট্রিকে বসে থাকতে দেখল অস্টিন। টেলিভিশনের প্রেরক যন্ত্রটা খুঁজতে লাগল সে। বেশিক্ষণ লাগল না, দেয়ালের গায়ের একটা গুপ্ত কুঠুরি থেকে যন্ত্রটা বের করে নিল। ওটা টি.ভি. সেটে লাগিয়ে অ্যাডজাস্ট করতে করতেই দেখল, ক্যাপ্টেন এগিয়ে যাচ্ছে গোল্ড-ম্যান আর রেনট্রির দিকে।

ডায়াল সেট করতেই কথা ভেসে এল টি.ভি-র মাইক্রোফোনে।

বোমা বসান কদূর? জিজ্ঞেস করল গোল্ডম্যান।

বোমা! অবাক হল অস্টিন।

মাত্র তো গ্রিভগুলো নিয়ে গেছে, জবাব দিল রেনট্রি।

ছবি এবং কথার প্রেরণ-গ্রহণ দুটো কাজই করতে পারে কিনা টি.ভি. গেজেটটা পরীক্ষা করতে লাগল অস্টিন।

মিস্টার গোল্ডম্যান, গেজেটের মাইক্রোফোনে মুখ লাগিয়ে বলল সে, মিস্টার রেনট্রি…আমার কথা শুনতে পাচ্ছেন?

কিন্তু শুনল না ওরা। নিজেদের কথাই বলে চলেছে।

নিউক্লিয়ার ওয়ারহেডটা বসান হয়ে গেছে, বলল রেনট্রি।

কি বলছে ওরা! বোম…নিউক্লিয়ার ওয়রহেড…, বিড় বিড় করল অস্টিন।

মাইক্রোফোনে মুখ লাগিয়ে আবার ডাকল, মিস্টার গোল্ডম্যান, মিস্টার রেনট্রি…আমার কথা শুনতে পাচ্ছেন?

এবারেও শুনল না ওরা।

আসলে ঠিক কখন, কোন পজিশনে বিস্ফোরণ ঘটবে? জানতে চাইল আর্মি ক্যাপ্টেন।

গোল্ডম্যানের দিকে তাকাল রেনট্রি। তিনিও সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন।

ওয়ান সিক্স জিরো এইট আওয়ারে উনিশ নম্বর স্টেশনে ডেটোনেশন ঘটবে, বলল রেনট্রি। বিস্ফোরণের দুই কি তিন সেকেন্ড পরেই ভূমিকম্প হবে ব্যাটল মাউনটেনের চুড়ার আশেপাশে। রিখটার স্কেলে কম্পনের মাপ উঠবে সেভেন পয়েন্ট নাইন।

সেভেন পয়েন্ট নাইন! ভুরু কুঁচকে গেছে অস্টিনের।

যেন তার কথার জবাবেই বলে গেল রেনট্রি, প্রথমে যা ভেবেছিলাম, কম্পিউটারকে জিজ্ঞেস করে জেনেছি, ও জায়গায় বিস্ফোরণ ঘটান উচিত হবে না এখন কিছুতেই। কারণ, একটু আগের ভূকম্পনে মারাত্মকভাবে নড়তে শুরু করেছে রকপ্লেট। কাজেই পর্বতের একটু ধার ঘেঁষে কৃত্রিম পদ্ধতিতে বিস্ফোরণ ঘটাতে হবে এখন। এতে জোর ভূমিকম্প হবে, কিন্তু জনবসতি পর্যন্ত পৌঁছতে পৌছতে কম্পনের শক্তি একেবারেই কমে যাবে। কারও কোন ক্ষতি হবে না এতে। আর পাঁচ ঘণ্টা পরেই বিস্ফোরণ ঘটান হবে।

কি? চেঁচিয়ে উঠল অস্টিন।

অস্টিনের চিৎকারে সাসকোয়াচের ঘুম ভেঙে গেল। শ্যালন যাবার আগেই ওর যান্ত্রিক স্লপিং-প্রসেসের কানেকশন কেটে দিয়ে গেছে। অস্বাভাবিক চিৎকার রোবটটার কানে যাবার সঙ্গে সঙ্গে সচেতন হয়ে উঠেছে তার ইলেকট্রোনিক ব্রেন। হুকুম দিতে শুরু করেছে যান্ত্রিক দেহকে। চোখ মেলেই কাত হয়ে অস্টিনের দিকে তাকাল সাসকোয়াচ। তার দিকে পেছন ফিরে আছে অস্টিন।

অ, অ, বুঝেছি, বলল ক্যাপ্টেন। এজন্যেই ব্যাটল মাউনটেনের পশ্চিম ধারে যাতে কেউ না যায়, দেখতে বলেছেন। কিন্তু ওখানে আর কে যাবে। কয়েকজন মেষ পালক মেষ চরাচ্ছিল, সরিয়ে দিয়েছি। মাঝে মধ্যে শিকারীরা যায় ওদিকে, আজ যায়নি একজনও। গোল্ডম্যানের দিকে তাকাল সে, কিন্তু মিস্টার গোল্ডম্যান, সবাইকে তো সরিয়ে রাখছি, ওদিকে কর্নেল অস্টিনই বেরিয়ে গেলেন! পাহাড়ের ঠিক ওই দিকেই তো গেছেন উনি।

পরস্পরের দিকে চাইলেন গোল্ডম্যান আর রেনট্রি।

আধ সেকেন্ড চেয়ে থেকেই চোখ নামাল রেনট্রি।

টেবিলে রাখা একটা ডিজিটাল কাউন্টারের দিকে তাকাল। রিডিং দেখল। তারপর রেডিও মাইক্রোফোনে কাকে আদেশ দিল, নিউক্লিয়ার ডেটোনেশন বার মিনিট মার্ক করে রাখ।

দ্রুত পরিষ্কার হয়ে এল বিগফুটের ইলেকট্রোনিক ব্রেন। পুরোপুরি কাজ করতে শুরু করেছে। কনুইয়ে ভর দিয়ে উঠে বসল সাসকোয়াচ। অস্টিন কি করছে ভাল মত দেখতে চায়।

তাকে লক্ষ্য করা হচ্ছে, টের পেল না অস্টিন। গভীর মনোেযোগে টি.ভি-র প্রেরক যন্ত্রটা পরীক্ষা করছে সে। মিনিটখানেক পরেই বুঝল, কয়েকটা বিশেষ যন্ত্রাংশ খুলে নেয়া হয়েছে, লাগিয়ে নিলেই আবার কাজ করবে। আপাতত অকেজো। অগত্যা নিজের পায়ের চেম্বারে রাখা ভি.এইচ.এফ. ট্রানসিভারটা বের করে নিল। অ্যান্টেনা তুলে সুইচ টিপল। কিন্তু কোন সাড়া নেই। আরও বার দুই সুইচ টেপাটেপি করেই বুঝে গেল, কাজ করবে না। তার দেহের ভেতরের পাওয়ার সোর্স থেকে রেডিওটার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়া হয়েছে। আবার জোড়া লাগাতে পারে সে, কিন্তু অত সময় হাতে নেই এখন। যন্ত্রটা আবার আগের জায়গায় রেখে দিয়ে দ্রুত ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। সাসকোয়াচের দিকে চাইবার কথা পর্যন্ত মনে হল না একবার।

মিনিট তিনেকের চেষ্টায় কাউন্সিল চেম্বার খুঁজে পেল সে। সোজা ঢুকে পড়ল ভেতরে। টেবিল ঘিরে বসে কথা বলছে এপ্লয়, ফলার এবং আরও কয়েকজন। শ্যালন অনুপস্থিত।

এপ্লয়, সরাসরি বলল অস্টিন। ক্যালিফোর্নিয়া কোস্ট ধরে একটা মেজর আর্থকোয়েক ঘটতে যাচ্ছে আগামী কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই। এটাকে রোধ করতে চাইছে আমার সঙ্গীরা। একটা কৃত্রিম ভূমিকম্প ঘটাবে ওরা আগামী কয়েক ঘণ্টার মধ্যে। আর ঘটাবে পর্বতের এদিকটাতেই।

জানি আমরা, বলল এপ্লয়।

জান!

হ্যাঁ।

কিন্তু তাহলে যে ভয়ঙ্কর বিপদ ঘটবে! তোমাদের এই আন্ডারগ্রাউন্ড কমপ্লেক্স পুরো ধ্বংস হয়ে যাবে।

না, শান্ত কণ্ঠে বলল এপ্লয়, যাবে না। কৃত্রিম ভূমিকম্পটা ঘটতেই দেয়া হবে না।

মানে? ভুরু কোঁচকাল অস্টিন।

ডেটোনেশান সাইটে চলে গেছে শ্যালন। ডেটোনেটরের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেবে সে।

কিন্তু তুমি বুঝতে পারছ না, প্রতিবাদ করল অস্টিন। কৃত্রিম ভূকম্পনের সাহায্যে প্রেশার না কমালে ক্যালিফোর্নিয়া কোস্ট ধরে ভয়ঙ্কর ভূমিকম্প হয়ে যাবে।

বললাম তো, জানি আমরা।

এর ফলে কয়েকটা বড় বড় শহর ধ্বংস হয়ে যাবে! হাজার …না না, লাখ লাখ লোক মারা যাবে।

কিন্তু আমাদের করার কিছু নেই।

নিশ্চয়ই আছে, চেঁচিয়ে উঠল অস্টিন। শ্যালনকে থামাও।

দুঃখিত, বলল এপ্লয়, সম্ভব নয়।

সম্ভব নয়। কি বলতে চাইছ তুমি? কঠোর হয়ে উঠল অস্টিনের দৃষ্টি। বুঝেছি। সাসকোয়াচকে দিয়ে ধরে এনে বহু লোককে আধপাগল করে ছেড়ে দিয়েছ তোমরা। ওদেরকে গিনিপিগ বানিয়েছ। এখন আবার লাখ লাখ নিরপরাধ লোককে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিচ্ছ। কোন জাতের সভ্য তোমরা?

স্যাক্রিফাইস শব্দটা তোমাদের অভিধানেই দেখেছি। বিজ্ঞানের উন্নতির জন্যে, বিশেষ করে কোটি কোটি মানুষের উপকারের জন্যে সাধারণ কয়েক লাখ কিছুই না।

রাগে জ্বলে উঠল অস্টিন। চেঁচিয়ে বলল, দেখ, এই পৃথিবীটা আমাদের তোমরা এখানে অনধিকার প্রবেশ করেছ। অনুপ্রবেশকারীদের কি করে ঘাড় ধরে বের করতে হয় ভালমতই জানা আছে আমাদের। তোমরা পৃথিবীতে বসে পৃথিবীর লোকদেরই চিড়িয়াখানার জীব বানাবে, তা আর হতে দিচ্ছি না কিছুতেই।

চরকির মত ঘুরে দাঁড়াল অস্টিন। দরজার দিকে ছুটল।

সাবধান, পিছন থেকে ডেকে বলল এপ্লয়, পালানোর চেষ্টা করলে ফল ভাল হবে না।

বাধা দিয়ে দেখ, বলেই বেরিয়ে গেল অস্টিন। ছুটল করিডোর ধরে। এঁকেবেঁকে, পাক খেয়ে এগিয়ে গেছে করিডোর। অসংখ্য সাব-করিডোর বেরিয়ে গেছে আবার এটা থেকে। ঠিক কোনদিকে এগোলে আইস টানেলটা পাওয়া যাবে জানে না সে। অনুমানেই এগিয়ে চলেছে। প্রধান করিডোর থেকে সরছে না। এখানে এসে অবধি কোন ধরনের অস্ত্র চোখে পড়েনি অস্টিনের। তবে কি অস্ত্রের ব্যবহার প্রয়োজন মনে করে না এরা? বুঝতে পারছে অস্টিন, নিজেদের অসম্ভব ক্ষমতাশালী মনে করে এরা। মনে করে, পৃথিবীবাসীর সঙ্গে লাগতে অস্ত্রের প্রয়োজন নেই। একটা কল্পিত আদিম জীবের যান্ত্রিক সংস্করণ বানিয়ে ছেড়ে দিলেই মানুষকে কব্জা করা যাবে অনায়াসে। নিজেদের সমস্ত অকাজ কুকাজ করে যেতে পারবে নির্বিঘ্নে। যতই ভাবছে, রাগে পাগল হয়ে উঠছে অস্টিন। হাঁটার গতি বেড়ে যাচ্ছে নিজের অজান্তেই।

শখানেক ফুট কিংবা তারও কিছু বেশি এগিয়ে, পাথর খুঁড়ে বের করা সরু লম্বা অন্ধকারাচ্ছন্ন সুড়ঙ্গে এসে মিশেছে প্রধান করিডোর। সুড়ঙ্গের শেষ মাথায় উজ্জ্বল আলো। ক্রিস্টাল। ওখানে থেকেই শুরু হয়েছে আইস টানেল। সুড়ঙ্গে নেমে এল অস্টিন। বড় জোর তিন কদম এগিয়েছে, হঠাৎ প্রচন্ড দমকা হাওয়া ছুঁয়ে গেল যেন তার শরীর। ভারি কিছু ছুটে গেল তার গা ঘেঁষে, অকল্পনীয় গতিতে। তারপরই, তার সামনে যেন মাটি খুঁড়ে উদয় হল এপ্লয়, ফলার এবং আরও কয়েকজন। টি.এল.সির সাহায্যে এসেছে। অস্টিনের পথ রোধ করে দাঁড়িয়েছে ওরা। দূরত্ব তিরিশ ফুট।

প্লীজ, কর্নেল, থামতে বলা ভঙ্গিতে হাত তুলল এপ্লয়, আপনার নিজের এবং আমার লোকদের স্বার্থে দয়া করে চলে যাবার চেষ্টা করবেন না।

শোন, ধমকে উঠল অস্টিন, তোমাদের সঙ্গে নোবল স্যাভেজ খেলায় বিরক্ত হয়ে গেছি আমি। পথ ছাড়, নইলে জোর করে বেরোব।

কর্নেল…

বুঝেছি, দাঁতে দাঁত চাপল অস্টিন, ভায়োলেন্স স্টাডি করতে এসেছ। বেশ… বায়োনিক, ভয়ঙ্কর গতিতে সামনে ছুটে গেল অস্টিন। সরে যাবার সময় পেল না এপ্লয় আর ফলার। অস্টিনের দুই কনুইয়ের ধাক্কায় প্রায় উড়ে গিয়ে পড়ল পাথুরে দেয়ালের গায়ে। ব্যথায় চিৎকার করে উঠল দুজনেই। ময়দার বস্তার মত ধপাস্ করে মাটিতে গড়িয়ে পড়ল। জ্ঞান হারাল সঙ্গে সঙ্গেই।

ফিরে দাঁড়াল অস্টিন। অন্য লোকগুলো আক্রমণ করতে আসছে কিনা দেখল। তেমন কোন ইচ্ছেই দেখা যাচ্ছে না ওদের মাঝে। চোখ বড় বড় করে একবার এপ্লয়-ফলার, আরেকবার অস্টিনের দিকে তাকাচ্ছে।

তারপর? মুচকে হাসল অস্টিন। ডান হাতের তর্জনীর ইঙ্গিতে ডাকল, আর কারও সখ আছে? নাকি ছাগল দুটোর মাজা ভেঙেছে দেখেই আক্কেল হয়েছে?

কেউ কিছু বলল না। আচমকা সুড়ঙ্গে এসে ঢুকল আরও দুজন লোক। একেবারে অস্টিনের সামনে এসে থামল। আক্রমণ করবে কি না দ্বিধা করছে।

এসব ঝামেলায় নিশ্চয়ই জড়াতে চাও না? ইঙ্গিতে এপ্লয় আর ফলারের পড়ে থাকা দেহ দুটো দেখিয়ে জিজ্ঞেস করল অস্টিন।

কিন্তু আমাদের কর্তব্য করতেই হবে, আগম্ভক দুজনের একজন বলল। কিন্তু গলায় জোর নেই।

ভেরি গুড। এস তাহলে, শার্টের হাতা গুটাচ্ছে অস্টিন। কার আগে দরকার?

পিছিয়ে এল দুজনেই। দ্বিতীয়জন বলল, ঠিক আছে, ঠিক আছে, মারপিটের দরকার কি। আমরা শুধু বোঝাতে এসেছি…

তোমাদের চেয়ে অনেক বেশি বুঝি আমি। গেট আউট… তাড়া করার ভঙ্গি করল অস্টিন। বিদ্যুৎগতিতে ঘুরেই ছুটল দুজনে। নিরাপদ দূরত্বে নিজের সঙ্গীদের কাছে এসে থামল। ফিরে তাকাল, যেন খুন হতে হতে বেঁচে ফিরে এসেছে এমনি ভাবসাব। দাঁত বের করে হাসছে অস্টিন।

এই সাহস নিয়েই পৃথিবীর মানুষকে গিনিপিগ বানাতে এসেছ? বলল সে, অথচ কেঁচোর চেয়ে অধম তোমরা।

আর কিছু না বলে ঘুরে দাঁড়াল অস্টিন। দ্রুত ছুটে গিয়ে আইস টানেলে ঢুকল। এক ছুটে চলে গেল পঞ্চাশ ফুট মত। থামল। বায়োনিক চোখ ব্যবহার করে পরীক্ষা করতে শুরু করল দেয়াল, সিলিঙ, মেঝে। তার ইনফ্রারেড পদ্ধতি সিগন্যাল দিচ্ছে, এখানেই দুর্বল জায়গা আছে কোথাও। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই খুঁজে পেল সে জায়গাটা। সিলিঙে। বায়োনিক হাতটা তুলে সিলিঙের ওই জায়গায় ঘুষি মারল সে। ঝন ঝন শব্দে ক্রিস্টাল ভেঙে পড়ল। তারপরই ঝুর ঝুর করে ঝরল ক্রিস্টাল স্তরের ওপাশের আলগা ধুলো। এবারে আর ঘুসি নয়। সিলিঙে হাত ঠেকিয়ে ওপরের দিকে ঠেলা দিল সে। চাপা, অদ্ভুত গোঙানি বেরোল যেন পাথরের বুক চিরে, এমনি আওয়াজ উঠল পাথরে পাথরে ঘষা খেয়ে। আরও জোরে ঠেলল অস্টিন। গোঙানিও জোরাল হল। কিন্তু পুরো সরছে না আলগা পাথরটা। হাত নামিয়ে নিল অস্টিন। ইনফ্রা-রেডের সাহায্যে পরীক্ষা করে বুঝল, সিলিঙের এই অংশটা নিরেট নয়। বেশ কয়েকটা আলগা পাথর গায়ে গা ঠেকিয়ে আটকে আছে শুধু। যে কোন একটা পাথর সরে গেলেই হুড়মুড় করে নিচে পড়বে সব কটা। আবার হাত তুলে ঠেলতে শুরু করল অস্টিন। তার বায়োনিক শক্তিকেও হার মানিয়ে দিচ্ছে ভারি পাথর। দাঁতে দাঁত চেপে, জোরে, আরও জোরে ঠেলতে লাগল সে। হঠাৎই ঘটল ঘটনা। আচমকা ওপর দিকে আধ হাত উঠে গেল পাথরটা। গায়ের ওপর থেকে চাপ সরে যেতেই ওটার পাশের অপেক্ষাকৃত ছোট পাথরটা ছুটে গিয়ে নিচে পড়ে গেল। মহাপ্রলয় শুরু হয়ে গেল যেন সঙ্গে সঙ্গে। প্রচন্ড কান ফাটান শব্দ করে আইস টানেলের মেঝেতে গড়িয়ে পড়তে লাগল আলগা পাথরগুলো! একেকটা দুই তিন মনের কম হবে না। প্রথম পাথরটা পড়ার সঙ্গে সঙ্গে ডাইভ দিয়েছে অস্টিন। পাথরটা ডিঙিয়ে চলে এসেছে। তারপর এক বিরাট লাফে এগিয়ে গেছে আরও ফুট দশেক সামনে।

ঘুরে দাঁড়িয়ে পাথর পড়া দেখছে অস্টিন। দ্রুত বুজে যাচ্ছে আইস টানেলের এক মাথা। অস্টিন আর আন্ডারগ্রাউন্ড কমপ্লেক্সের মাঝে বাধা হয়ে দাড়িয়েছে। এই পাথরের দেয়াল সরিয়ে টানেল পরিষ্কার করতে প্রচুর সময় লাগবে এপ্লয়ের টেকনিশিয়ানদের।

হাতের উলেটা পিঠ দিয়ে কপালের ঘাম মুছল অস্টিন, তারপর হাতটা প্যান্টের পাছায় মুছে ঘুরে দাঁড়াল। স্বাভাবিকভাবে হেঁটে চলল টানেলের শেষ প্রান্তের দিকে।

অপরূপ আলো ক্রিস্টালের। কিন্তু অস্টিনের এখন এসব দেখার সময় নেই। এগিয়ে চলেছে সে। হঠাৎই কমে আসতে লাগল আলো। আবার বাড়ালো। বিচিত্র শব্দ শুরু হল সেই সাথে। থমকে দাঁড়াল অস্টিন। ইলেকট্রোস্লীপের কথা ভুলেই গিয়েছিল সে।

মাথার ভেতরে ইতিমধ্যেই ঝিম ঝিম শুরু হয়ে গেছে অস্টিনের। চেতনা আচ্ছন্ন হবার পূর্বলক্ষণ দেখা দিয়েছে। যা করার এক্ষুনি করতে হবে। এর আগের বার টানেলের ভেতরে ঠিক কতটা প্রবেশ করার পর ঘুমিয়ে পড়েছিল সে মনে করার চেষ্টা করল। হ্যাঁ, মনে পড়েছে। টানেলের ঠিক মাঝামাঝি আসার পর পুরো কাজ করেছে ইলেকট্রোস্লীপ।

টানেলের মাঝামাঝি পৌঁছুতে আর কতখানি বাকি, দেখে নিল অস্টিন। খুব বেশি না, বড়জোর ফুট দশেক হবে। যদি বায়োনিক গতিবেগে ছুটে যায়, বিপদ ঘটার আগেই হয়ত বিপদসীমা পেরোন সম্ভব। রওনা হতে যাবে, হঠাৎ খুলে গেল টানেলের ওমাথার ধাতব দরজা। মেরামত করে ফেলা হয়েছে ওটা আগেই। ভেতরে এসে ঢুকল বিগফুট। পেছনে দরজাটা আবার বন্ধ হয়ে যেতেই পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়াল রোবট সাসকোয়াচ। অস্টিনের দিকে চেয়ে তীব্র যান্ত্রিক গর্জন করল।

থমকে দাঁড়াল অস্টিন। ব্যাটা বেরোল কখন! বিড় বিড় করল সে।

অস্টিন পরীক্ষাগার থেকে বেরিয়ে যাবার সঙ্গে সঙ্গে টেবিল থেকে নেমে বেরিয়ে পড়ে সাসকোয়াচ। তার ইলেকট্রোনিক ব্রেনে প্রথম চিন্তাটা আসে, অস্টিন পালাচ্ছে। অতএব তাকে ধর। সোজা আইস টানেল ধরে বাইরে বেরিয়ে যায় রোবটটা। আশেপাশে কোথাও অস্টিনকে না পেয়ে আবার এসে ঢুকছে এখানে।

পেছনে শব্দ হতেই ফিরে তাকাল অস্টিন। পাথরের দেয়ালের ওপাশ থেকে আসছে আওয়াজ। পাথর সরানোর কাজ শুরু করে দিয়েছে টেকনিশিয়ানরা। সাসকোয়াচ এবং টানেলের ইলেকট্রোস্লীপ, দুটোকে এক সঙ্গে সামলান সম্ভব নয় অস্টিনের পক্ষে। কি করে সাসকোয়াচকে ফাঁকি দেয়া যায় ভাবছে অস্টিন। সেই সঙ্গে পিছিয়ে এল কয়েক পা। আশ্চর্য! কমে যাচ্ছে ইলেকট্রোম্লীপের ক্রিয়া। তার মানে টানেলের দুই প্রান্ত যান্ত্রিক ঘুম থেকে নিরাপদ।

এই যে খোকা, চেঁচিয়ে বলল অস্টিন, এবারে কোন অঙ্গ খসাতে চাও? একটা পা?

গর্জন করে উঠল আবার সাসকোয়াচ। কয়েকটা হর্ন ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছে ওর ভেতরে। ইচ্ছেমত যেটা খুশি ব্যবহার করে সাধারণ মানুষকে ভয় পাওয়াতে এইই যথেষ্ট।

অস্টিনের ইচ্ছে, রোবটটা আগে আক্রমণ করুক তাকে। সেজন্যে তাকে ক্ষেপিয়ে তুলতে হবে। মাথার ওপর দুহাত তুলে বিচিত্র ভঙ্গিতে নাচল একবার অস্টিন। তারপর বুক চাপড়াল। বনের ভেতরে তাকে আক্রমণ করার আগে এভাবেই নেচেছে সাসকোয়াচ। বার দুই বুক চাপড়েই সাসকোয়াচের অনুকরণে চাপা গর্জন করে উঠল অস্টিন।

গোঁ গোঁ করে উঠল সাসকোয়াচ। রেগে কাঁই হয়ে গেছে। কিন্তু দরজার কাছ থেকে নড়ল না।

ব্যাটারা আসছে না কেন? বিড় বিড় করে নিজেকেই প্রশ্ন করল অস্টিন। অন্যভাবে চেষ্টা করা স্থির করল সে।

আরেক পা পিছিয়ে এসে মাটিতে বসে পড়ল অস্টিন। অবাক হয়ে তার দিকে তাকাল সাসকোয়াচ। রোবটটা আক্রমণ কিংবা ভয় পাওয়ার আশা করেছিল। কিন্তু এরকম অদ্ভুত ব্যবহার দেখে ঠিক কি করতে হবে বুঝতে পারল না। বুঝল অস্টিন, রোবটটার ব্রেন খুব একটা পাকা নয়। কাজেই বুদ্ধির জোরেই পরাস্ত করতে হবে ওটাকে এখন।

পুরো এক মিনিট দুজন দুজনের দিকে তাকিয়ে থাকল। বসেই আছে অস্টিন। বসে বসেই বিচিত্র অঙ্গভঙ্গি করছে। শেষ পর্যন্ত এই আজব ব্যবহার আর সহ্য হল না সাসকোয়াচের। পায়ে পায়ে এগিয়ে আসতে শুরু করল সে। রোবটটার বিশ ফুট দূরে থাকতেই হঠাৎ লাফিয়ে উঠল অস্টিন। চোখে মুখে প্রচন্ড ভয়ের চিহ্ন ফুটিয়ে তুলে পিছোতে থাকল দ্রুত। সঙ্গে সঙ্গে ভয়ঙ্কর গর্জন করে উঠল সাসকোয়াচ। ছুটে এল তীব্র গতিতে।

সাসকোয়াচ একেবারে গায়ের ওপর এসে পড়তেই থমকে দাঁড়াল অস্টিন। থাবা মেরে বোবটের দুই কব্জি চেপে ধরল। বিদ্যুৎ গতিতে চিত হয়ে শুয়ে পড়ল মেঝেতে। প্রচন্ড ঝটকা খেয়ে অস্টিনের ওপরই পড়ে গেল সাসকোয়াচ। দুই পা গুটিয়ে ওটার পেটের তলায় নিয়ে এল অস্টিন। বিন্দুমাত্র দেরি না করে পা দিয়ে প্রচন্ড জোরে ঠেলে দিল ওপর দিকে। সেই সঙ্গে দুই কব্জি ধরা হাতে টান মারল সামনে। মাথার ওপর দিয়ে উড়ে চড়ে গেল রোবটটা। গিয়ে পড়ল পাথরের দেয়ালের ওপর।

পাথরে ভয়ানকভাবে মাথা ঠুকে গেছে রোবটটার। একটা যান্ত্রিক গোঙানি বেরিয়ে এল ওর মুখ থেকে, তারপরই স্থির হয়ে গেল। ইলেকট্রোনিক ব্রেনে চোট পেয়েছে।

উঠে দাঁড়াল অস্টিন। সাসকোয়াচের দিকে একবার তাকাল। রোবটটাকে সামলানো গেছে। এবারে ইলেকট্রোস্লীপকে ফাঁকি দিতে পারলেই বেরিয়ে যেতে পারবে সে এই যান্ত্রিক মায়াপুরী থেকে।

ধীরে ধীরে সামনের দিকে এগিয়ে চলল অস্টিন। ঘুম ঘুম ভাবটা অনুভব করে থমকে দাঁড়াল। তৈরি হয়ে নিয়েই ছুটল। ঘণ্টায় চল্লিশ মাইল গতিবেগ। টানেলের মাঝামাঝি আসতেই প্রচন্ডভাবে আঘাত হানলো ইলেকট্রোস্লীপ। সঙ্গে সঙ্গে লাফ দিল অস্টিন। একেবারে উড়াল দিয়েই যেন এসে নামল ধাতব দরজার সামনে। ঘুম এবার পরাস্ত হল তার কাছে। দুই সেকেন্ড স্থির দাঁড়িয়ে একটু জিরিয়ে নিয়েই দরজা লক্ষ্য করে লাফ দিল। আগের বারের মতই গোটা দুই ফ্লাইং কিক ঝেড়ে দরজাটা ভেঙে ফেলল সে। বাইরে এসে পড়ল।

মাটিতে পড়ে গিয়েছিল, উঠেই গুহামুখের দিকে ছুটল অস্টিন। এক ছুটে বেরিয়ে এল বাইরে। সঙ্গে সঙ্গে গায়ে আঘাত হানলো তীব্র সূর্যালোক। কিন্তু ভালই লাগল অস্টিনের। খোলা পাহাড়ী বাতাস টানল বুক ভরে। জুড়িয়ে গেল শরীর মন।

দেরি করল না অস্টিন। শ্যালনকে খুঁজে বের করতে হবে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব। ছুটল সে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *