১২. বোটহাউসে ঢুকল ভেলা

বোটহাউসে ঢুকল ভেলা। খুঁটিতে আগের জায়গায় বাঁধা রয়েছে লিটল মারমেইড, ডারটি আর টিকসি নেই।

গেল কোথায়? টর্চ জ্বেলে দেখছে কিশোর। শোনো, ভেলাটা এখানে রাখা ঠিক না। চলো, কোন ঝোপের তলায় লুকিয়ে রাখি।

ঠিকই বলেছে কিশোর। অন্যেরাও একমত হলো। হাত অবশ হয়ে গেছে। তবু কোনমতে ভেলাটা আবার বের করে এনে পানির ওপর এসে পড়া কিছু ডালপাতার তলার শেকড়ে শক্ত করে বাঁধল।

লতা আর শেকড় ধরে ধরে পাড়ে উঠে রওনা হলো আস্তানায়। চোখ চঞ্চল দুই ডাকাতকে খুঁজছে। ছায়াও দেখা যাচ্ছে না ওদের। পোড়া বাড়িতে ভাড়ারে ঢুকে বসে নেই তো?

আগে রাফিয়ানকে ঢুকতে বলল ওরা।

সিঁড়িমুখে মাথা ঢুকিয়ে দিল রাফিয়ান। শব্দ করল না। সিঁড়ি টপকে নেমে গেল নিচে।

নেমেই গোঁ গোঁ করে উঠল।

কি ব্যাপার? বলল কিশোর। বসে আছে নাকি নিচে?

মনে হয় না, মাথা নাড়ল জিনা। অন্য কিছু। কী?

চলো না, নেমেই দেখি, সিঁড়িতে পা রাখল জিনা।

বিছানা যেভাবে করে রেখে গিয়েছিল, ঠিক তেমনি রয়েছে। ব্যাজ আর কাপড় চোপড়ও রয়েছে জায়গামত। মোম জ্বেলে টর্চ নিভিয়ে দিল কিশোর।

কি হয়েছে, রাফি? জিজ্ঞেস করল জিনা। এমন করছিস কেন?

গোঙানি থামছে না রাফিয়ানের।

গন্ধ পেয়েছে নাকি? চারপাশে তাকিয়ে বলল মুসা। ওরা এসেছিল এখানে?

আসতেও পারে, রবিন বলল।

মরুকগে, হাত নাড়ল মুসা। খিদে পেয়েছে। কিছু খেলে কেমন হয়?

ভালই হয়, আমারও খিদে পেয়েছে, বলতে বলতে আলমারির দিকে এগোল কিশোর। কিন্তু টান দিয়ে দরজা খুলেই স্থির হয়ে গেল।

নেই!

অথচ ওখানেই রেখে গিয়েছিল সব খাবার। থালা-বাসন, প্লেট-কাপ, সব সাজানোই রয়েছে আগের মত, নেই শুধু খাবারগুলো। রুটি নেই, বিস্কুট নেই, চকলেট নেই…কিচ্ছু নেই।

কিশোরের ভাব দেখেই বুঝল অন্যেরা, কিছু একটা অঘটন ঘটেছে। এগোল আলমারির দিকে।

খাইছে! আঁতকে উঠল মুসা। কিছুই তো নেই। একটা বিস্কুটও না। ইস আগেই ভাবা উচিত ছিল। আল্লাহরে, কি খেয়ে বাঁচি এখন!।

খুব চালাকি করেছে, রবিন বলল। জানে, খাবার ছাড়া থাকতে পারব না এখানে। আমাদের তাড়ানোর এটাই সবচেয়ে ভাল কৌশল। রাতে খিদেয় মরব, সকালে উঠেই দৌড়াতে হবে গায়ে, অনেক সময় পাবে ওরা।

মাথায় হাত দিয়ে ধপ করে তালমারির কাছেই বসে পড়ল মুসা। গায়ে। যাওয়ারও সময় নেই এখন। যা পথ-ঘাট, অন্ধকার! উফ, খিদেও পেয়েছে। নাহ্ রাতটা টিকব না।

মন খারাপ হয়ে গেছে সবার। কতক্ষণ আর খিদে সওয়া যায়? ক্লান্তিতে ভেঙে পড়ছে শরীর, ভেবেছিল খেয়েদেয়ে চাঙা হবে, তার আর উপায় নেই।

বিছানায় বসে দীর্ঘশ্বাস ফেলল রবিন। একবার ভেবে ছিলাম, কয়েকটা চকলেট সরিয়ে রেখে যাই, রাখলাম না…রাফি, ওভাবে আলমারির দিকে চেয়ে লাভ নেই। কিচ্ছু নেই ওতে।

আলমারি শুকছে, আর করুণ চোখে ফিরে ফিরে তাকাচ্ছে রাফিয়ান।

হারামীগুলো কোথায়? হঠাৎ রেগে গেল কিশোর। ব্যাটাদের একটা শিক্ষা দেয়া দরকার। বুঝিয়ে দেয়া দরকার লোকের খাবার চুরি করার ফল।

হুফ, পুরোপুরি একমত হলো রাফিয়ান।

সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠল কিশোর। দুই ডাতাক কোথায়? ভাঙা, শূন্য দরজার কাছে গিয়ে দূরে তাকাল।

বনের মাঝে এক জায়গায় দুটো তাবু খাটানো হয়েছে। তাহলে ওখানেই ঘুমানোর ব্যবস্থা করেছে, ভাবল সে। চোরগুলোকে গিয়ে গালাগাল করে আসবে নাকি? হ্যাঁ, তাই যাবে।

আয়, রাফি, বলে পা বাড়াল কিশোর।

কিন্তু তাঁবুতে কেউ নেই। কয়েকটা কম্বল, একটা প্রাইমাস স্টোভ, একটা কেটলি আর অন্যান্য কিছু দরকারী জিনিস অগোছাল হয়ে পড়ে আছে। একটা তাঁবুর কোণে গাদা করে রাখা আছে কি যেন, কাপড় দিয়ে ঢাকা।

টিকসি আর ডারটি গেল কোথায়?

খুঁজতে বেরোল কিশোর।

পাওয়া গেল হ্রদের ধারে গাছের তলায়, পায়চারি করছে। কথা বলছে। বাহ, সান্ধ্যভ্রমণ, মুখ বাঁকাল সে। দাঁড়িয়ে পড়ল। নিচের ঠোঁটে চিমটি কাটছে, ভাবছে কিছু। যে কাজে এসেছিল, সেটা না করে ফিরে চলল আস্তানায়।

পেছনে রাফিয়ান, বাতাসে কি যেন শুকতে শুকতে চলেছে।

তাঁবু খাঁটিয়েছে, বন্ধুদের জানাল কিশোর। ব্যাটারা রয়েছে লেকের পাড়ে। লুটের মাল না নিয়ে যাবে না।

আরে রাফি কোথায়? সিঁড়িমুখের দিকে চেয়ে আছে জিনা। কিশোর, কোথায় ফেলে এলে ওকে?

পেছনেই তো আসছিল: দেখি তো, সিঁড়ির দিকে পা বাড়াতে গিয়ে থেমে গেল কিশোর। ওপরে মেঝেতে পরিচিত নখের শব্দ।

সিঁড়ি বেয়ে নেমে এল রাফিয়ান।

আরে, দেখো, মুখে করে কি জানি নিয়ে এসেছে। বলে উঠল জিনা।

তার কোলের কাছে এনে জিনিসটা রাখল রাফিয়ান।

বিস্কুটের টিন! চেঁচিয়ে উঠল মুসা। পেল কই?

নীরব হাসিতে ফেটে পড়ল কিশোর। বলল, আমি যা করব ভাবছিলাম, রাফিই। সেটা করে ফেলল। তাঁবুতে কাপড়ে ঢাকা রয়েছে খাবার, অনেক খাবার। ফিরে এসেছি, সবাই মিলে গিয়ে লুট করে আনার জন্যে। আর দরকার হবে না।

আবার সিঁড়ি দিয়ে উঠে যাচ্ছে রাফিয়ান।

ওরা যেমন করমচা, আমরা তেমনি বাঘা তেঁতুল, হাসতে হাসতে বলল মুসা। কারও চেয়ে কেউ কম নই।…রাফিটা আবার গেল?

যাক, বলল জিনা।

এক মিনিটের মধ্যেই ফিরে এল রাফি। মুখে বাদামী কাগজে মোড়া মস্ত এক প্যাকেট।

বিশাল কেক।

হেসে গড়াগড়ি খেতে শুরু করল গোয়েন্দারা।

রাফি, তুই একটা বাঘের বাচ্চা, হাসি থামাতে পারছে না মুসা।

আরে না, সিংহের, শুধরে দিল জিনা।

আমার তো মনে হয় ওর বাপ বাবুর্চি ছিল, পেট চেপে ধরেছে রবিন, চোখের কোণে পানি। বেছে বেছে পছন্দসই খাবারগুলো আনছে।

আবার চলে গেছে রাফিয়ান। ফিরে এল শক্ত মলাটের একটা বাক্স নিয়ে। গরুর মাংসের বড়া।

তাজ্জব করে দিল দেখি। বলল মুসা। কোথায় পেটে পাথর বাঁধার কথা ভাবছিলাম, আর হাজির হয়ে গেল একেবারে রাজকীয় ভোগ…

দারুণ হয়েছে, মাথা ঝাঁকাল কিশোর। আমাদেরগুলো ব্যাটারা নিয়েছে, আমরা ওদেরগুলো নিয়ে এসেছি। রাফি, আবার যা।

কিশোরের বলার আগেই রওনা দিয়েছে রাফিয়ান।

কি আনে, দেখার জন্যে উৎসুক হয়ে রইল চারজন।

নিয়ে এল আরেক বাক্স মাংসের কাবাব।

তুই একটা সাংঘাতিক লোক, রাফি! উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করল মুসা, খুব ভাল মানুষ। এত সুগন্ধ, তা-ও ছুঁয়েও দেখছিস না। আমি হলে তো চাখার লোভ সামলাতে পারতাম না।

খাবার চুরি করার নেশায় পেয়েছে রাফিয়ানকে। যাচ্ছে-আসছে, যাচ্ছেআসছে, প্রতিবারেই মুখে করে নিয়ে আসছে একটা কিছু।

এবার ওকে থামানো দরকার, বলল কিশোর। যথেষ্ট হয়েছে। যা নিয়েছিল ব্যাটারা, তার তিনগুণ এসেছে।

থাক, শুধু আরেকবার, হাত তুলল জিনা। দেখি, এবার কি আনে।

টেনে-হিঁচড়ে ইয়া বড় এক বস্তা নিয়ে হাজির হলো রাফিয়ান।

আবার হাসাহাসি শুরু হলো। না ঠেকালে সব নিয়ে আসবে। কিছু রাখবে না, শূন্য করে দিয়ে আসবে।

রাফি, বেল্ট টেনে ধরল জিনা, আর না। শুয়ে পড়, জিরিয়ে নে। বাঁচালি আমাদের।

প্রশংসায় খুব খুশি হলো রাফিয়ান। জিনার গালটা একবার চেটে দিয়ে গড়িয়ে পড়ল তার পায়ের কাছে। জিভ বের করে হাঁপাচ্ছে।

বস্তাটা খুলল মুসা। ঘরে বানানো পাউরুটি আর বনরুটি। হুররে… আনন্দে নাচতে শুরু করল সে। রাফি, তো পায়ে হাত দিয়ে সালাম করতে ইচ্ছে করছে।

কি বুঝল কুকুরটা কে জানে, একটা পা বাড়িয়ে দিল।

নাও, করো এবার, হা-হা করে হেসে উঠল কিশোর। সবাই যোগ দিল হাসিতে।

পেট পুরে খেলো ওরা। রাফিয়ানের পেট ফুলে ঢোল, নড়তে পারছে না ঠিকমত। হাস্যকর ভঙ্গিতে পেটটাকে দোলাতে দোলাতে উঠে গেল সিঁড়ি বেয়ে, পানি খাওয়ার জন্যে। কল ছেড়ে দিল জিনা। সামনের দুই পা সিংকে তুলে দিয়ে পানি খেলো রাফিয়ান।

সিংক থেকে থাবা নামিয়েই স্থির হয়ে গেল সে। ঘুরে বনের দিকে চেয়ে ঘেউ ঘেউ করে উঠল।

ছুটে এল সবাই। ঝোপঝাড়ের ওপর দিয়ে ডারটির মাথা দেখা যাচ্ছে। এদিকেই আসছে।

কাছে এসে চেঁচিয়ে উঠল সে, আমাদের খাবার চুরি করেছ?

কে বলল? চেঁচিয়ে জবাব দিল কিশোর, আমাদের খাবারই আমরা ফিরিয়ে এনেছি।

এত্তবড় সাহস, আমার তাঁবুতে হানা… রাগে বাকরুদ্ধ হয়ে গেল ডারটির। ঝাঁকড়া চুল নাড়ল, সঁঝের আবছা আলোয় অদ্ভুত দেখাচ্ছে তার চেহারা, চুলের জন্যে।

না আমরা যাইনি, সহজ কণ্ঠে বলল কিশোর, রাফি গিয়েছিল। আমরা বরং ঠেকিয়েছি, নইলে রাতে তোমাদের খাওয়া জুটত না। আমাদের তো উপোস। রাখতে চেয়েছিলে, আমরা তোমাদের মত অত ছোটলোক নই…না, না, আর কাছে এসো না, রাফি রেগে যাবে। আর হ্যাঁ, সারা রাত পাহারায় থাকবে ও। গায়ে ওর সিংহের জোর, মনে রেখো।

গরররর, এত জোরে গর্জন করল রাফিয়ান, লাফিয়ে উঠল ডারটি। তার মনে হলো সিংহেরই গর্জন।

ভীষণ রাগে হাত নেড়ে ঝটকা দিয়ে ঘুরল সে। চলে গেল।

সিঁড়িমুখে রাফিয়ানকে মোতায়েন করে ভাঁড়ারে ফিরল চারজন।

ব্যাটাদের বিশ্বাস নেই, চিন্তিত ভঙ্গিতে বলল কিশোর।

নিশ্চয় পিস্তল-টিস্তল কিছু আনেনি, নইলে এতক্ষণে গুলি করে মারত রাফিকে।

তাড়াতাড়ি করা দরকার আমাদের, বলল রবিন। মালগুলো খুঁজে বের করে নিয়ে পালানো দরকার। ঠিকই বলেছ, ব্যাটাদের বিশ্বাস নেই। কখন যে কি করে…আচ্ছা, নকশা নিয়ে বসলে কেমন হয়? টল স্টোন তো দেখেছি।

নকশা বের করে সমাধান করতে বসল ওরা।

এই যে, একটা রেখার মাথায় আঙুল রাখল কিশোর। তাহলে, এটার উল্টো দিকে টক হিল, এই যে, আরেক মাথায় আঙুল রাখল।

তুমি ভাবতে থাকো, চিত হয়ে শুয়ে পড়ল মুসা। আমি একটু গড়িয়ে নিই। গতর খাটানোর দরকার পড়লে ডেকো।

মোমের আলোয় গভীর মনোযোগে নকশাটা দেখছে কিশোর। ঘন ঘন চিমটি কাটছে নিচের ঠোঁটে। বিড়বিড় করল, চারটে…টল স্টোন…টক হিল-চিমনি… স্টীপল। হঠাৎ চেঁচিয়ে উঠল, ইউরেকা! ইউরেকা!

লাফিয়ে উঠে বসল মুসা। আমেরিকা আবিষ্কার করলে নাকি?

না, লুটের মাল।

কোথায়? ঘরের চারদিকে তাকাল গোয়েন্দা-সহকারী। চোখে বিস্ময়।

আরে ওখানে না, এখানে, নকশাটায় হাত রাখল গোয়েন্দাপ্রধান। বুঝে গেছি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *