১২. পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠেই

পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠেই ক্যাপ্টেন বললেন, নতুন পথে চিমনিতে ফিরব আমরা। তাহলে আরও ভাল করে জানা যাবে দ্বীপটাকে। এই দ্বীপে প্রাকৃতিক সম্পদ কি আছে তাও খুঁজে দেখতে হবে। জীবনের শেষ দিনটি পর্যন্ত যদি লিঙ্কন আইল্যান্ডেই থাকতে হয়, তাহলে সেভাবেই গুছিয়ে নিতে হবে জীবনটা।

সূর্য যখন ঠিক মাথার ওপরে, তখন ঘড়ির কাঁটা দুটো ঘুরিয়ে বারোটার ঘরে এনে রাখলেন ক্যাপ্টেন। দেখাদেখি স্পিলেটও ঘড়িতে হাত দিতেই বাধা দিলেন তিনি, রিচমন্ডের সময় দিচ্ছে আপনার ঘড়ি। রিচমন্ড আর ওয়াশিংটনের সময় একই। রোজ নিয়মিত চাবি দিতে থাকুন ঘড়িতে। পরে কাজে লাগবে সময়টা!

লাঞ্চ সেরে লেক গ্র্যান্ট দেখতে বেরোলেন অভিযাত্রীরা  বৃষ্টির পানিতে নিশ্চয় ভরে যায় হ্রদ। হ্রদের বাড়তি পানি কোথায় কোন নদীতে গিয়ে পড়ছে দেখতে চান ক্যাপ্টেন। এদিকে ওদিকে ছড়ানো গ্রানাইটের স্তুপ। আগ্নেয় পাথরের ছোট ছোট পাহাড় মাথা তুলে আছে বন-জঙ্গলের ফাঁকে ফাঁকে।

প্রকৃতির এই মুক্ত পরিবেশে এসে হঠাৎ উদ্দাম আদিমতায় পেয়ে বসল অভিযাত্রীদের। ক্যাপ্টেন আর সাংবাদিককে পেছনে ফেলে এদিক ওদিক ছুটাছুটি করতে শুরু করল বাকি তিনজন। নেবের চিৎকারটা শোনা গেল তখনই। চমকে উঠে দেখলেন স্পিলেট আর হার্ডিং, উধ্বশ্বাসে ছুটে আসছে হার্বার্ট। ফ্যাকাসে হয়ে গেছে মুখ  একটু দূরে পাথরের আড়ালে লুকিয়ে পড়েছে পেনক্র্যাফট আর নেব।

ধোঁয়া, ক্যাপ্টেন, ধোঁয়া! ধোঁয়া!

কোথায়?

এই, এই যে,পাহাড়ের আড়ালে। জংলী ছাড়া আর কে আগুন জ্বলবে? বেটারা নরখাদক হলেই গেছি।

কথা শুনে ক্যাপ্টেনেরও মুখ শুকিয়ে গেল। নিরস্ত্র অবস্থায় জংলীদের বিরুদ্ধে কি করে দাঁড়াবেন ওঁরা? স্পিলেটকে বললেন, চুপিচুপি এগিয়ে দেখলে কেমন হয়?

চলুন, দেখে মনে হলো একটুও ভয় পাননি স্পিলেট।

পাহাড়ের গায়ে গা মিলিয়ে ঝোপঝাড়ের আড়ালে আড়ালে উপরে উঠতে শুরু করলেন দুজনে। আগুনটার কাছাকাছি পৌঁছে অতি সাবধানে উঁকি মেরে দেখলেন ক্যাপ্টেন। পরক্ষণেই গলা ফাটিয়ে হো হো করে হেসে উঠলেন। অন্যেরাও উঠে এসেছে ক্যাপ্টেনের পিছনে পিছনে। হতভম্ব হয়ে ক্যাপ্টেনের মুখের দিকে চেয়ে রইল সবাই। হাসতে হাসতে বললেন ক্যাপ্টেন, আগুনই, মি. স্পিলেট। তবে মানুষের জ্বালানো নয়, গন্ধকের গুঁড়োর হলদে ধোঁয়া। গলার ঘায়ের চমৎকার ওষুধ এই গুড়ো।

তাই নাকি! লাফ মেরে কাছে এসে দাঁড়ালেন পিলেট সাথে সাথে আর সবাই পাহাড়ের গা বেয়ে চলেছে নীল আগুনের স্রোত। পাথরের গা বেয়ে নামতে নামতে বাতাসের অক্সিজেন শুষে নিয়ে সালফিউরিক অ্যাসিডের কড়া গন্ধ ছড়াচ্ছে তরল গন্ধক।

দেখেছেন? বললেন ক্যাপ্টেন, গন্ধকের আগুনের রঙ হয় নীল, লাল নয়।

কিন্তু ব্যাপার কি, ক্যাপ্টেন? জিজ্ঞেস করলেন স্পিলেট, নীল আগুন ছড়িয়ে পাহাড়ের গা বেয়ে গন্ধকের স্রোত বয়ে চলেছে কেন?

আশপাশের গ্রানাইট পাথর দেখলেই এর কারণ বোঝা যায়। এককালে যথেষ্ট অগ্ন্যুৎপাতের ফলে লাভা জমে জমে সৃষ্টি হয়েছে এই গ্রানাইট পাহাড় হয়তো কোথাও কোন জালামুখ এখনো একেবারে নিভে যায়নি।

ভূগর্ভের তরল লাভা অল্পমাত্রায় বেরিয়ে বেরিয়ে এই গন্ধক কুন্ডে জমা হচ্ছে।

কথাটা বলে তেলতেলে পানিতে আঙুল ডোবালেন ক্যাপ্টেন। জিভে ছোঁয়ালেন—বেশ মিষ্টি। অনুমান করলেন পানির তাপমাত্রা ৯৫ ডিগ্রী ফারেনহাইট। থার্মোমিটার ছাড়াই কিভাবে তাপমাত্রা আন্দাজ করা যায় তা হার্বার্টকে বুঝিয়ে দিলেন, হাত ডুবিয়ে দেখো, পানিটা গরমও না ঠান্ডাও না। তার মানে তোমার দেহের স্বাভাবিক তাপমাত্রার সমান। আর তোমার দেহের স্বাভাবিক তাপমাত্রা কত? পঁচানব্বই ডিগ্রী ফারেনহাইট।

বিকেল নাগাদ লেক গ্রান্টের কাছে পৌঁছে গেল অভিযাত্রীরা। লেকের চারপাশে গাছপালার ছড়াছড়ি। রঙবেরঙের পাখি নেচে বেড়াচ্ছে গাছের ডালে ডালে। বেশির ভাগ গাছই ইউক্যালিপটাস আর ক্যাসুয়ারিনা গোষ্ঠীর। অষ্ট্রেলিয়ান দেবদারুও আছে প্রচুর। নিউজিল্যান্ডের টুসাক ঘাসে ছাওয়া বনভূমি  কিন্তু এখন পর্যন্তও একটা নারকেল গাছ চোখে পড়ল না।

ডানা মেলে লেজ নাচিয়ে ছুটছে সাদা,কালো, ধূসর কাকাতুয়া  রামধনুর রঙে চোখ ধাঁধিয়ে উড়ছে বার্ড-অব-প্যারাডাইজ  একই অঙ্গে লাল, নীল, সবুজের গভীর ছোপ লাগিয়ে গম্ভীর মুখে বসে আছে মাছরাঙা।

হঠাৎ জন্তু জানোয়ারের সম্মিলিত তীক্ষ্ণ তীব্র চিৎকারে চাপা পড়ে গেল পাখির ডাক। শব্দের উৎস লক্ষ্য করে ঝোপের মধ্যে দৌড়ে গেল হার্বার্ট আর নেব।  তীক্ষ্ণ শব্দ সৃষ্টিকারী প্রাণীটাকে চেনে নেব। এক ধরনের পাখি। এদের গোশত খেতে চমৎকার। ডালের গদা দিয়ে বেশ কটা পাখিকে পিটিয়ে মারল নেব।

অপূর্ব সুন্দর কতগুলো পায়রা দেখল হার্বার্ট। ওদের উজ্জ্বল হলদে শরীরে বিকেলের পড়ন্ত রোদ পড়ে চকচকে সোনালী আভার সৃষ্টি করেছে। মুগ্ধ বিস্ময়ে ওদের দিকে চেয়ে চেয়ে ভাবতে লাগল হার্বার্ট—একটা শটগান হলে মন্দ হত না।

হঠাৎ ঝোপঝাড়ের মাথার ওপর দিয়ে লাফ মেরে ছিটকে বেরিয়ে এল এক ঝাঁক চতুস্পদ প্রাণী।

ক্যাঙারু, ক্যাঙারু! খুশির ঠেলায় চেঁচাতে শুরু করল হার্বার্ট।

খেতে কেমন? জিজ্ঞেস করল পেনক্র্যাফট।

খেতে কেমন জিজ্ঞেস করছ? ভেড়ার গোশত খেয়েছ কখনও?

আর শোনার অপেক্ষা করল না পেনক্র্যাফট। গদা হাতে তাড়া লাগাল ক্যাঙারুগুলোকে! হার্বার্ট আর টপও ছুটল পেছন পেছন। টেনিস বলের মত ড্রপ খেতে খেতে উধাও হয়ে গেল ক্যাঙারুর দল। হাঁপাতে হাঁপাতে ফিরে এল শিকারীরা।

একটা কথা, ক্যাপ্টেন। ক্যাপ্টেনের দিকে ফিরে বলল পেনক্র্যাফট ।

কি?

গাছের ডাল দিয়ে শিকার করা কি সম্ভব? দেখলেন তো কি দৌড়টাই না দিতে হলো। একটা বন্দুক-টন্দুক যদি বানিয়ে দিতেন।

সে পরে দেখা যাবে। আপাতত কিছু তীর ধনুক বানিয়ে দিচ্ছি।

তীর ধনুক! ঠোঁট উল্টে বলল পেনক্র্যাফট, ও দিয়ে কি হবে?

কি হবে? কদিন হলো বন্দুক আবিষ্কার হয়েছে? এর আগে তীর ধনুক দিয়ে যুদ্ধ করত না লোকে?

আবার কিছু খেয়ে নিয়ে রওনা দিল অভিযাত্রীরা বন-জঙ্গল, চড়াই উৎরাই পেরিয়ে নতুন জায়গা আর জিনিস দেখতে দেখতে পথ চলতে লাগল ওরা। হঠাৎ তিনটে ক্যাপিবারার পথ আটকে দাঁড়াল টপ। গদা দিয়ে পিটিয়ে দুটোকে সাবাড় করে দিল হার্বার্ট, পেনক্র্যাফট আর নেব। খুশিতে লাফাতে শুরু করল পেটুক পেনক্র্যাফট।

হাঁটতে হাঁটতে একটা নদীর কাছে পৌঁছে গেল ওরা। নদীর মাটির রঙ লাল। মাটিতে আকরিক লোহার প্রাধান্য থাকলেই এরকম হয়। নদীটার নাম দেয়া হলো। রেডক্রীক।

সারাটা দিন লেক গ্রান্টের আশপাশে ঘুরে বেড়িয়ে, বিকেল নাগাদ মার্সি নদীর বাঁ তীর ধরে হাঁটতে হাঁটতে যখন চিমনিতে পৌঁছল অভিযাত্রীরা, সাঁঝের আঁধার নামছে তখন। হতাশ হলেন ক্যাপ্টেন হার্ডিং! এত ঘুরেও হ্রদের বাড়তি পানি কোথায় যায় খুঁজে পেলেন না।

রাতের খাওয়া শেষে আগুনের পাশে গোল হয়ে বসল সবাই! পকেট থেকে একে একে কয়েকটা জিনিস বের করলেন ক্যাপ্টেন হার্ডিং। জিনিসগুলো খনিজ লোহা, চুন, কয়লা আর কাদামাটি  সারাদিন ধরে নমুনাগুলো সংগ্রহ করে পকেটে ভরে রেখেছেন তিনি।

সবাই জিনিসগুলোর দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকাতেই বললেন ক্যাপ্টেন, প্রাকৃতির সম্পদকে কাজে লাগানোই বুদ্ধিমানের কাজ। কাল থেকে সে-কাজই শুরু করতে হবে আমাদের।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *