পরদিন খুব ভোরে ঘুম ভেঙে গেল। পাশ ফিরে শোব, হঠাৎ মনে হল, সব যেন চুপচাপ। মনেই হচ্ছে না, কেউ আছে বাড়িতে। ব্যাপারটা স্বাভাবিক ঠেকল না আমার কাছে। কাপড় পাল্টে নিচে গেলাম। কোথাও কোন জনমন্যিষ্যির চিহ্ন নেই। থমথমে পরিবেশ। বাইরের উঠোনে গিয়ে দেখলাম লাকড়ির গাদার কাছে দাঁড়িয়ে আছে জ্যাক।

ব্যাপার কী, জ্যাক?

আপনি জানেন না, হুঁজুর?

না।

মিস সোফিয়া পালিয়েছেন। হারনি শেফার্ডসনের সাথে। সবাই নদীর ধারে গেছে, মিস্টার হারনিকে খুন করবে! ওঁদের ধারণা মিস সোফিয়াকে নিয়ে নদী পথেই পালাতে চেষ্টা করবেন তিনি।

ফেরিঘাটের দিকে ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুট লাগালাম আমি। কিছুদূর যেতেই গুলির আওয়াজ পেলাম। চটপট একটা তুলো গাছের দোতলায় উঠে বসলাম। গাছটার সামনেই স্তূপাকারে সাজান কাঠ। প্রথমে ওই কাঠের গাদায় পালাব ভেবেছিলাম। ভাগ্যিস পালাইনি।

জনা পাঁচেক ঘোড়সওয়ার কাঠ-গুদামের সামনের উঠোনে হৈ-হল্লা করছিল। স্টিমারঘাটের কাছেই আরেকটা কাঠের স্তূপ। ওটার পেছনে দুটো বাচ্চা ছেলে লুকিয়ে রয়েছে। ওদের সেখান থেকে বের করাই ঘোড়সওয়ারদের উদ্দেশ্য। কিন্তু ছেলে দুটো কিছুতেই বেরুতে পারছে না। সে চেষ্টা করলেই গেলেই রাইডাররা গুলি ছুড়ছে ওদের লক্ষ্য করে। ছেলে দুটো পিঠে পিঠ ঠেকিয়ে বসে আছে। ফলে দুপাশেই নজর রাখতে পারছে।

এক সময় লোকগুলো পাঁয়তারা থামিয়ে গুদামের দিকে এগিয়ে গেল। আচমকা একটা ছেলে উঠে দাঁড়িয়ে ওদের তাক করে গুলি ছুড়ল। গুলির আঘাতে মাটিতে পড়ে গেল একজন। অন্যেরা তখন ঘোড়া থেকে নেমে আহত লোকটাকে টেনে নিয়ে যেতে লাগল গুদামের দিকে। ঠিক সেই অবসরে ছেলে দুটো আমি যে গাছে বসে আছি সেদিকে দৌড়ে এল। মাঝপথেই ওদের ওপর চোখ পড়ল লোকগুলোর। নিমেষে ঘোড়া নিয়ে তেড়ে এল তারা। কিন্তু কিছু করার আগেই ছেলে দুটো কাঠের গাদার আড়ালে গা ঢাকা দিল। ওদের একজন বাক। অন্যজনকে আমি চিনি না। বছর উনিশ বয়েস তার।

লোকগুলো প্রথমে তোলপাড় করে খুঁজল ওদের, তারপর চলে গেল ঘোড়া ছুটিয়ে। ওরা দৃষ্টিসীমার বাইরে যেতেই বাককে জানান দিলাম, ঠিক ওর মাথার ওপরেই বসে রয়েছি আমি।

নজর রাখ, জর্জ, বাক চেঁচিয়ে বলল। ওদের আবার দেখলেই জানাবে।

আমার খুব ইচ্ছে হল গাছ থেকে নামি। কিন্তু সাহসে কুলালো না। বাক জানাল, তার বাবা আর বড় দুভাই মারা গেছে। বিপক্ষেরও দুতিনজন খতম হয়েছে।

মিস সোফিয়া, হারনি—এদের খবর কী?

নদীর ওপারে।

ওরা নিরাপদে আছে শুনে খুশি হলাম আমি। কিন্তু সেদিন হারনিকে মারতে না পারায় আফসোস করতে লাগল বাক।

গুড়ুম! গুড়ুম! গুড়ুম! আচমকা একঝাক গুলি ছুটে এল। লোকগুলো জঙ্গলের ভেতর দিয়ে পেছন থেকে চুপিসারে এগিয়ে এসেছে। বাক আর তার সঙ্গী নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়ল। তীর ধরে ওদের পিছু নিল লোকগুলো। অনবরত গুলি ছুড়ছে আর বলছে, মার শালাদের! মার! কথাটা দারুণ অস্থির করে তুলল আমাকে, আরেকটু হলেই পড়ে যাচ্ছিলাম গাছ থেকে।

সন্ধে অবধি গাছের ওপরই বসে রইলাম, ভয়ে নিচে নামলাম না। মাঝেমধ্যে দূর-জঙ্গল থেকে গুলির শব্দ ভেসে আসছিল। দু-দুইবার গুদাম ঘরের পাশ দিয়ে বন্দুক হাতে কয়েকজন ঘোড়সওয়ার ছুটে গেল। বুঝলাম, গোলমাল চলছে এখনও। ভীষণ দমে গেল আমার মন। গ্যানজারফোর্ডদের বাড়িতে আর যাব না, স্থির করলাম মনে মনে। অনুশোচনা হল, আমার দোষেই এসব ঘটেছে। মিস সোফিয়ার বাবাকে ওই কাগজটার কথা জানান উচিত ছিল আমার। তাহলে হয়ত মেয়েকে ঘরে আটকে রাখতেন তিনি। এবং এতসব কাণ্ড ঘটত না।

গাছ থেকে নেমে নদীর তীর ধরে বুকে হেঁটে চললাম। পথেই দুটো লাশ দেখতে পেলাম, জলের কিনারে পড়ে আছে। লাশ দুটো ডাঙায় টেনে তুলে তাদের মুখ ঢেকে দিলাম। বাকের মুখ ঢেকে দেয়ার সময়ে আমার দুচোখ জলে ভরে এল। ওর সাথে দারুণ ভাব ছিল আমার।

ইতিমধ্যে আঁধার বেশ জাঁকিয়ে বসেছে! জিম যেখানে আছে, দ্রুত এগিয়ে গেলাম সেদিকে। কিন্তু জিমকে পেলাম না দ্বীপে। তখন নদীর বাঁক লক্ষ্য করে ঝাউবনের ভেতর দিয়ে ছুটে চললাম। ভেলা নিয়ে যত তাড়াতাড়ি ভেসে পড়া যায় ততই মঙ্গল। কিন্তু বাঁকের মুখে পৌছুতেই রক্ত হিম হয়ে এল-ভেলা নেই। গলা ফাটিয়ে ডাকলাম জিমকে।

কে, হাক? কয়েক হাত দূর থেকে ওর গলা ভেসে এল।

জিমের সাড়া যেন আমার কানে মধু ঢালল। নদীর কিনার ধরে দৌড়ে গিয়ে ভেলায় উঠলাম। আমাকে জড়িয়ে ধরল জিম। গদগদ সুরে বলল, ঈশ্বর তোমার মঙ্গল করুন, বাছা! আমার তো ভয় হয়েছিল, এবার নিশ্চয়ই মারা গেছ তুমি। উফ! তোমাকে জ্যান্ত দেখে কী খুশিই-না লাগছে!

মিসিসিপি নদীতে আবার এসে না পড়া পর্যন্ত আমি স্বস্তি পেলাম না মনে। দুমাইল যাবার পর মাঝ-নদীতে পৌঁছে সঙ্কেত-লণ্ঠনটা ঝুলিয়ে দিলাম। নিজেদের আবার মুক্ত-স্বাধীন মনে হল। দুদিন যাবৎ অভুক্ত, ভুট্টার মোয়া, মাংস আর শাকসবজি দিয়ে খেতে দিল জিম। গোগ্রাসে খেতে লাগলাম আমি। ওই ভয়ঙ্কর পারিবারিক যুদ্ধ থেকে বেঁচে ফিরতে পেরে আনন্দ লাগছে। জিমও খুশি, জলাভূমি থেকে পালাতে পেরেছে সে।

ভেলার মত বাসা আর হয় না, বললাম।

ঠিক। অন্ধকারে জিমের দাঁত দেখা গেল। আরও তিনদিন পেরিয়ে গেল দেখতে দেখতে। মনে হচ্ছে, যেন তরতর সাঁতরে চলে যাচ্ছে সময়, সুন্দর শান্ত ভঙ্গিতে। সামনে বিশাল রাক্ষসী নদী। কোথাও কোথাও মাইল দেড়েক চওড়া। রাত্তিরে চলি আমরা, সকাল হবার আগেই মরা পানি দেখে কোন বাঁকের মাথায় ভেলা বেঁধে রাখি। ছোট ছোট ডালপালা কেটে ঢেকে দিই ভেলাটা। মাছের চার ফেলে নদীতে নেমে সাঁতরে নিই। বেশ ঝরঝরে লাগে শরীরটা। তারপর বালুচরে বসে সূর্য ওঠার অপেক্ষায় থাকি।

কোনখানে টু শব্দ নেই। নীরব-নিস্তব্ধ। গোটা পৃথিবী যেন ঘুমে আচ্ছন্ন। কেবল থেকে থেকে কোলা ব্যাঙের ডাক ভেসে আসে। পানির ওপর আবছা একটা রেখা দেখা যায় ওপাশের জঙ্গল। এছাড়া কিছুই চোখে পড়ে না তখন। তারপর একটু একটু করে ফরসা হতে শুরু করে আকাশ, কবুতরের ডিমের বরণ হয়, নদীর ওটাও ফিকে হয়ে আসে, তত কালো আর দেখায় না। ধীরে ধীরে লাল হয়ে ওঠে পুব-আকাশ। সতেজ, ঠাণ্ডা বাতাস ফুলের বুক থেকে মিঠে গন্ধ বয়ে আনে। একটু পরেই হেসে ওঠে সূর্য।

আরও কিছুক্ষণ পরে উঠে নাস্তা সারি। তারপর অলসভাবে বসে নদীর একাকিত্ব দেখতে দেখতে ঘুমিয়ে পড়ি এক সময়। জাগি, আবার ঘুমোই। কখনও হয়ত চোখে পড়ে দূর থেকে একটা স্টিমার এগিয়ে আসছে—থেকে থেকে খুক করে কেশে উঠছে ওটা। তারপর প্রায় ঘণ্টাখানেক আবার সব নিঝুম। চারদিকে কেবল নিরেট নির্জনতা।

এইভাবে বেশ কাটছে দিনগুলো। মাঝেমধ্যে অনেকক্ষণের জন্যে নদীটা একান্তই আমাদের হয়ে যায়। তখন আশপাশে কোথাও কোন জনপ্রাণী চোখে পড়ে না। মাথার ওপর তারার মেলা। একদিন কথায় কথায় জিম বলল, ওগুলো নাকি চাঁদের ডিম। কথাটা আমার কাছে যুক্তিসঙ্গত মনে হল। কারণ ব্যাঙও এরকম ডিম পাড়ে, আমি দেখেছি। যেসব তারা আকাশ থেকে ছিটকে পড়ে, সেগুলোও লক্ষ্য করি আমরা। জিম বলে, ওগুলো পচে গেছে, তাই বাসা থেকে ফেলে দেয়া হচ্ছে। কোন কোন রাতে দেখি এক-একটা স্টিমার অন্ধকার চিরে চলে যাচ্ছে। অনেক সময়ে সেগুলোর চিমনি দিয়ে, আগুনের ফুলকি বেরোয় বৃষ্টির মতো নদীর ওপর ঝরে পড়ে।

দুপুর রাতের পর নদীতীরের লোকেরা ঘুমোতে যায়। তখন দুতিন ঘণ্টার জন্যে ফের সবকিছু অন্ধকারে ঢাকা পড়ে। কোন ঘরের জানলা দিয়ে আলোর রেখাও বাইরে আসে না আর। ওই ক্ষীণ আলোটুকুই আমাদের ঘড়ি। আবার যখন কোন ঘরে বাতি জ্বলে ওঠে, আমরা বুঝতে পারি সকাল হতে আর দেরি নেই। তাড়াতাড়ি লুকোবার মত একটা জায়গা খুঁজে পেতে সেখানে বেঁধে ফেলি ভেলাটাকে।

একদিন ভোরে, পুবের আকাশ পুরোপুরি ফরসা হয়নি তখনও, কেবল কালো রেখাটা লাল হয়ে গিয়েছে, কপালগুণে একটা ডিঙি পেয়ে গেলাম আমি। ডিঙিটা নিয়ে পাড়ে গেলাম, ইচ্ছে ফল-মূল কিছু মেলে কি-না দেখব। হঠাৎ দেখলাম দুজন লোক গায়ের দিক থেকে ছুটতে ছুটতে আসছে।

আমাদের বাঁচাও, কেঁদে পড়ল ওরা। আমাদের পেছনে ওরা কুকুর লেলিয়ে দিয়েছে। ওরা লাফিয়ে আমার ডিঙিতে ওঠার চেষ্টা করল।

ভুলেও এ কাজ কোরো না, বললাম। এখন পর্যন্ত কোন কুকুর বা ঘোড়ার শব্দ পাচ্ছি না। তোমাদের হাতে এখনও সময় আছে। ঝোপের ভেতর দিয়ে দৌড়ে পালাও। খানিকটা গিয়ে এই নালায় নেমে পানি ভেঙে আমার এখানে এস। তাহলে গন্ধ শুকে শুকে কুকুরগুলো ধরতে পারবে না তোমাদের।

তাই করল ওরা। সাথে সাথে ডিঙি খুলে ভেলার উদ্দেশে রওনা দিলাম আমি। কয়েক মিনিটের ভেতর পৌঁছে গেলাম ভেলায়।

ওদের একজনের বয়েস সত্তর বা তার কিছু বেশি। মাথাটা শান বাঁধান স্টিমারঘাটের মত চকচকে। পাকানো গোঁফ, ঝাঁটার মত। পরনে তেলচিটে নীল পশমি শার্ট আর ছেঁড়া জিনসের প্যান্ট। প্যান্টের ঝুল বুটের ভেতর আঁটসাট করে ঢোকান।

অপরজনের বয়েস অনেক কম, তিরিশের বেশি নয়। মলিন বেশ। দুটো চটের থলে আছে ওদের সাথে; জীর্ণ, তালি মারা।

তুমি বিপদে পড়লে কীভাবে? যুবককে জিজ্ঞেস করল ঝাটা-গোঁফ।

দাঁতের মাজন বিক্রি করতাম আমি। মাজনটা ভাল, দাগ তুলে ফেলে, তবে দাঁতের এনামেল নষ্ট হয়ে যায়। ফলে লোকজন খেপে গেল, মারবে আমাকে। তাই পালিয়েছি। আঁটাগোঁফের দিকে ঘুরল সে, জিজ্ঞেস করল তুমি?

গেল হপ্তা থেকে মদ খাওয়ার বিরুদ্ধে প্রচার শুরু করি আমি। ভালই আয় হচ্ছিল প্রথম দিকে, প্রতি রাতে ছ ভলারের মত। তারপর কী করে যেন রটে গেল আমি আসলে একটা মাতাল। সর্বদা মদ লুকোনো থাকে সঙ্গে। আজ ভোরে এক নিগ্রো ঘুম ভাঙিয়ে জানাল, গোপনে তৈরি হচ্ছে সবাই, আমাকে সঙ সাজিয়ে গাধার পিঠে চড়িয়ে সারা গা ঘোরাবে। একথা শোনার পর আর দেরি করিনি।

বুড়ো খোকা, বলল যুবক, এস আমরা দুজন হাত মেলাই।

আমার আপত্তি নেই। কী কী কাজ পার তুমি?

ছাপাখানার কাজ। এক-আধটু ডাক্তারি। মাঝেমধ্যে রুচি বদলের জন্যে মাস্টারি। অভিনয়ও পারি, দুঃখের নাটক হলেই জমে ভাল। তোমার?

জীবনের বেশি সময় কেটেছে ডাক্তারি করে, বলল আঁটাগোঁফ। ভাগ্য গুনতেও জানি, মক্কেল সম্পর্কে আগেভাগে কিছু জানতে পারলে নেহাত মন্দ করি। আবার ধর্মপ্রচারেও বেশ হাতযশ আছে। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল যুবক।

কী হল? জিজ্ঞেস করল ঝাটা-গোঁফ।

ঘেন্না হচ্ছে নিজের ওপর, কী সব লোকের সাথে দিন কাটাচ্ছি! বলল যুবক। তারপর শার্টের খুঁট দিয়ে একটা চোখের কোণ মুছে বলল, যাক! এই নিষ্ঠুর পৃথিবী হয়ত আমার সবকিছু ছিনিয়ে নেবে, কিন্তু কবরটা তো আর নিতে পারবে না। সেখানেই আমার দুঃখী আত্মা শান্তিতে ঘুমুতে পারবে।

ব্যা! ভেংচি কাটল আঁটা-গোঁফ। কেন, আমরা আবার কী ক্ষতি করলাম তোমার? জিজ্ঞেস করল রাগত সুরে।

তোমরা কিছুই করনি। সব দোষ আমার। নিজের পায়ে নিজেই কুড়োল মেরেছি। কোন্ ঘরে আমার জন্ম, তোমরা হয়ত বিশ্বাসই…

কোন ঘরে?

ভাইয়েরা, গম্ভীর গলায় বলল যুবক, আমার কথা শোন তোমরা। জন্মসূত্রে আমি একজন ডিউক।

জিম আর আমি দারুণ চমকে উঠলাম, আরেকটু হলেই পড়ে যেতাম ভেলা থেকে।

জি, বলল যুবক। আমার দাদার দাদা, ডিউক অব ব্রিজওয়াটারের বড় ছেলে, পঞ্চাশ বছর আগে এদেশে আসেন। এখানেই বিয়ে করেন তিনি, এবং এক ছেলে রেখে মারা যান। ওই সময় তার বাবাও মারা যান। পিতার মৃত্যুর পর ছোট ছেলে ক্ষমতা দখল করে। কিন্তু আসল ডিউক তখন দুধের শিশু, কিছুই পেলেন না তিনি। আমি সেই শিশুরই বংশধর, ব্রিজওয়াটার রাজ্যের আইনসঙ্গত ডিউক! একটু থেমে যোগ করল যুবক, অথচ এখন, কতগুলো দুর্বৃত্তের সাথে ভেলায় দিন কাটাতে হচ্ছে।

লোকটার জন্যে ভীষণ দুঃখ হল আমাদের। সান্ত্বনা দিতে চেষ্টা করলাম।

কিন্তু ও বলল, খালি কথায় কোনই লাভ হবে না আমার। তোমরা সত্যিই আমার ভাল চাইলে, ডিউক-এর সম্মান দেখাবে আমাকে। কথা বলার আগে কুর্নিশ করবে। মালিক অথবা হুঁজুর বলে ডাকবে। শুধু ব্রিজওয়াটার বললেও চলবে। কারণ এটা কোন নাম নয়, পদবি। আর আমার খাওয়ার সময়ে দাঁড়িয়ে থাকবে। যখন যা বলব, করবে।

জিম আর আমি রাজি হলাম ওর কথায়। কিন্তু বুড়ো লোকটা ঠিক পছন্দ করল না এটা। গুম মেরে গেল। ওইদিন বিকেলেই সে বলল, দ্যাখো, ব্রিজওয়াটার, সত্যি আমার দুঃখ হচ্ছে তোমার জন্যে। তবে, কথা হচ্ছে গিয়ে তুমি একাই দুর্ভাগ্যের শিকার নও। তারপর কান্নাজড়িত গলায় বলল, ব্রিজওয়াটার, তোমাকে বিশ্বাস করতে পারি?

আলবত।

আমি ডফিন, যার কথা সবাই ধরে নিয়েছে সে মারা গেছে। জিম আর আমি ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলাম ওর দিকে।

কী? চমকে উঠল ডিউক।

হ্যাঁ, বন্ধু। আমিই ফরাসি সম্রাট ষোড়শ লুইয়ের হারিয়ে যাওয়া ছেলে ডফিন। ফ্রান্সের আইনসঙ্গত সম্রাট সপ্তদশ লুই।

বুড়োর জন্যে খুব দুঃখ হল জিম আর আমার। সান্ত্বনা দেয়ার চেষ্টা করলাম।

এসবে হবে না, বলল সে। আমাকে সম্রাট বলে অবশ্যই কুর্নিশ করবে। কিছু বলতে চাইলে আগে সম্মানসূচক শব্দ জাহাপনা ব্যবহার করবে। খাওয়ার সময় দাঁড়িয়ে থাকবে। এবং আমি হুঁকুম না-দেয়া পর্যন্ত বসবে না।

এবারেও জিম আর আমি আপত্তির কিছু দেখলাম। কিন্তু ডিউক মনমরা হয়ে রইল।

ব্রিজওয়াটার, বলল সম্রাট, মুখ ভার করে আছ কেন? নাও, এস, হাত মেলাও।

সম্রাটের সাথে করমর্দন করল ডিউক। জিম আর আমি খুশি হলাম; কারণ মানুষ যখন বন্ধুর মত ব্যবহার করে, জীবন অনেক সহজ হয়ে যায়।

তবে এরা দুজন যে ডাহা মিথুক, ঠগ-সেকথা বুঝতে বেশি সময় লাগল না আমাদের। অবশ্য সেটা জানতে দিলাম না ওদের। সম্রাট বা ডিউক বলে ডাকলে ওরা যদি খুশি হয়, আমাদের এই পরিবারের শান্তি বজায় থাকে, আমাদের আপত্তির কিছু নেই।

Share This