১২. ঘনিয়ে আসা আঁধারের বিরুদ্ধে

ঘনিয়ে আসা আঁধারের বিরুদ্ধে সমস্ত মনোবল দিয়ে লড়ছে জেকব। চেষ্টা করে চোখ খুলল। তবু অন্ধকার। স্থির হয়ে শুয়ে রইল সে।

কোথায় আছে ও? সে কি মরে গেছে? জীবন্তই কবর দেওয়া হয়েছে ওকে।

ব্যথাটা রয়েছে। তাহলে বেঁচেই আছে। নড়ার চেষ্টা করতেই কোমরের কাছে। নতুন একটা ব্যথা আবিষ্কার করল সে।

ধীরে ধীরে সব মনে পড়ছে তার। মাথাটা পরিষ্কার হয়ে আসছে। গুলিতে আহত হয়েছে সে। পড়ার পর খাজটার ভিতর ঢুকে পড়েছিল-তারপরেই জ্ঞান হারিয়েছে জেকব। কিন্তু তার আগে একটা কাজ করেছে-হ্যাঁ, রক্ত। এখানে ঢুকে পড়ার আগে রুমাল চিপে কিছুটা রক্ত নীচে ফেলেছে সে।

হাতড়ে দেখল পিস্তলটা এখনও তার সাথেই আছে। পড়ার আগে নিজের অজান্তেই পিস্তলের উপরকার চামড়ার বাধুনীটা এঁটে দিয়েছিল সে। ছুরিটাও তার সাথেই রয়েছে।

এখন রাত-বাতাসে রাতের ঠাণ্ডা ভাব টের পাচ্ছে জেকব।

ডালিয়া…ডালিয়ার কাছে যেতে হবে তার। নো ম্যানস মেসার কাছে তার জন্য অপেক্ষা করবে ডালিয়া। এখান থেকে মাত্র কয়েক মাইল দূরেই সেই জায়গা। ওকে যতটুকু চিনেছে তাতে সে নিশ্চিত জানে বেঁচে থাকলে ডালিয়া অবশ্যই ওখানেই তার জন্য অপেক্ষা করবে। অবশ্য সে যদি বন্দী থাকে তাহলে ভিন্ন কথা।

নড়তে হবে, এখান থেকে বেরিয়ে পড়তে হবে। ওরা নিশ্চয়ই খুঁজবে তাকে, পেলে আবার এখানেই ফিরে আসবে। সেটাই স্বাভাবিক।

ওরা কি কাউকে পাহারায় রেখে গেছে? হ্যাঁ, আবছাভাবে মনে পড়ছে, উপরে কাদের যেন কথাবার্তা বলতে শুনেছে সে। পাথরের উপর বুটের আওয়াজও কানে এসেছে তার।

নীচে নামলে বেশিদূর যেতে হবে-উপরে ওঠাই বরং সহজ। তা ছাড়া একটা ঘোড়া দরকার-তার বাকস্কিনটা উপরেই কোথাও আছে। খুব সাবধানে হাতে চাপ দিয়ে ওঠার চেষ্টা করল। একটু একটু করে উঠে বসল সে।

আকাশে তারা দেখা যাচ্ছে। ধোয়ার গন্ধ এল ওর নাকে।

গুলির শব্দ শুনেছিল মনে আছে-হয়তো ডালিয়া বা কেলভিনের গুলিতে ওদের একজন আহত হয়েছে। আশেপাশে ওদেরই কেউ আগুন জ্বেলেছে। হাতে কোন চোট লাগেনি তার। পাথর আঁকড়ে ধরে একটু একটু করে নিজেকে টেনে তুলল সে। উপরে মাথা বের করার আগে কান পেতে একটা অস্পষ্ট শব্দ শুনতে পেল। খুব সতর্কতার সাথে মাথাটা সামান্য তুলে উঁকি দিল সে।

বিশ গজ দূরে আগুনটা জ্বলছে। আগুনের ধারে বসা লোকটার মুখে আলো পড়েছে কিন্তু চেনা যাচ্ছে না। ওদিকে লক্ষ্য রেখে অপেক্ষা করছে জেকব। ভাবছে হামাগুড়ি দিয়ে যদি সে বেরিয়ে পড়ে, আর লোকটা তখনই এদিকে ফিরে তাকায়-সাথেসাথেই ধরা পড়ে যাবে ও।

সাবধানে আশেপাশে চাইল জেকব। ঘোড়াগুলো কোথায় আছে খুঁজছে সে। নিজের জখমের কথা ভুলে থাকতে চেষ্টা করছে ও। গলাটা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। বুকের কাছে কেমন ভেজা-ভেজা লাগছে-বুঝতে পারছে তার ক্ষত থেকে আবার রক্ত বেরুচ্ছে। তার দেহের একপাশে কিছু অসুবিধা হচ্ছে। কোমরের কাছে জায়গাটা শক্ত আর আড়ষ্ট বোধ হচ্ছে। কয়েক ফুট উঠেই সে বুঝতে পারছে চট করে কোন নড়াচড়া এখন তার পক্ষে অসম্ভব।

গর্তের মধ্যে ফিরে লাভ নেই। সকাল হলেই ভাল করে খোঁজাখুঁজি করবে ওবা। ঠিকমত বাতাস বইলে ধোয়া দিয়েই বের করবে তাকে। না, কোন উপায় নেই। তাকে এখনই বেরিয়ে পড়তে হবে। পিস্তল ব্যবহার করতে পারবে না, তাহলে শব্দে অন্যরাও এসে হাজির হবে।

হাতে ভর দিয়ে নিজেকে টেনে উপরে তুলল জেকব। তারপর কোমরের ব্যথাটাকে বাঁচিয়ে একটু একটু করে এগোতে শুরু করল।

উৎকণ্ঠায় ঘামছে জেকব। আগুনের ধারে বসা লোকটা কোন কারণে একবার এদিকে চাইলেই সব শেষ। অথচ তিরিশ গজের মধ্যে আর কোন আড়াল নেই। একেবারে ফাঁকা।

খুব ধীরে নিঃশব্দে এগোচ্ছে সে। তার টেনে চলার সাথে তাল মেলাতে মুহূর্তগুলোও যেন টেনেটেনে চলছে। বারবারই তার মনে হচ্ছে, এই বুঝি লোকটা তাকে দেখে ফেলবে, কিংবা আওয়াজ শুনল। পরনের মোটা জামা পাথরের সাথে ঘষা খেয়ে একটা হালকা খসখস শব্দ তুলছে-কিন্তু এটা ঠেকাবার কোন রাস্তা নেই।

দুই হাত আর একটা হাঁটু ব্যবহার করে প্রায় অর্ধেক পথ চলে এসেছে-আরও একটু এগোল সে। আর একটু সামনেই একটা ঝোঁপের ছায়া পড়েছে। তাড়াতাড়ি ওখানেই পৌঁছতে চেষ্টা করল। পরিশ্রমে হাঁপাচ্ছে জেকব। বুকের কাছে ছুরি বেঁধার মত যন্ত্রণা হচ্ছে।

বুলেটটা ফুসফুস ছোঁয়নি-নইলে শ্বাস ধীর হয়ে আসত। যেমন আশঙ্কা করেছিল সেই হারে রক্তক্ষরণ হয়নি-তবে তাকে বেশ দুর্বল করে ফেলার মত রক্ত সে হারিয়েছে।

প্রথমে হাত, পরে ওর সম্পূর্ণ দেহই ছায়ার উপর পৌঁছে গেল। এতক্ষণে একটু বিশ্রাম নেওয়ার সুযোগ পেল জেকব। আড়চোখে চেয়ে দেখল লোকটা উঠে দাঁড়িয়ে আড়মোড়া ভাঙছে। কাছে থেকে এবারে লোকটাকে চিনতে পারল। টিউবা সিটিতে যে দু’জনের সাথে ওর দেখা হয়েছিল, লোকটা তাদেরই একজন। একবার জেকবের দিকে চেয়ে আবার অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে নিল লোকটা। এগিয়ে গিয়ে আরও দু’টো কাঠের টুকরো আগুনে চাপিয়ে দিল সে।

এতক্ষণ আগুনের দিকে চেয়ে বসেছিল বলেই ছায়ায় শোয়া জেকবকে দেখতে পায়নি লোকটা। পাথরের উপর দিয়ে নিজেকে টেনে নিয়ে সীডার গাছের আড়ালে চলে এল। তারপর আবার এগিয়ে চলল সে।

ঘোড়ার গায়ের গন্ধ পেল জেকব। পরক্ষণেই ওগুলোকে দেখতে পেল সে। একটা ঝোঁপের ধারে বাঁধা রয়েছে। আরও একটু এগোল-একটা ঘোড়া ভয় পেয়ে নাক দিয়ে শব্দ করে উঠল। মনে মনে গালি দিয়ে যতদূর সম্ভব কোমল নিচু স্বরে সে বলল, রও বেটা! রও!

ঘোড়াটা গলা টান দিল। সশব্দে নড়ে উঠল ঝোঁপ। ক্রল করে আরও এগিয়ে গেল জেকব। ঘোড়াশুলোকে চেনার চেষ্টা করছে সে। একটা ঘোড়া মাথা ঝুঁকিয়ে ওকে শুকল। দু’হাতে ওর গলা জড়িয়ে ধরে উঠে দাঁড়াল জেকব। অন্ধকারেও সে চিনতে পেরেছে এটা তারই বাকস্কিন।

অনেক কষ্টে ঘোড়ার পিঠে উঠে বসে টান দিয়ে বাঁধনটা খুলে দিল। কিন্তু দুর্বল শরীরে তার মনে হচ্ছে পড়ে যাবে সে। পড়লে আবার ওঠার শক্তি আর থাকবে না। উপুড় হয়ে শুয়ে ঘোড়ার গলা জড়িয়ে ধরল জেকব।

কানের কাছে ফিসফিস করে নির্দেশ দিতেই ধীর পায়ে অন্ধকারের মধ্যে হাঁটতে শুরু করল বাকস্কিন। লাগাম ধরে ঘোড়ার গতি নিয়ন্ত্রণের কোন চেষ্টা করল না সে। নিজের উপর আধ শোয়া থাকার চেষ্টাতেই ওর সব শক্তি খরচ হচ্ছে। নিজের খুশি মতই নীচের দিকে নামতে শুরু করল ঘোড়াটা।

.

সহজাত প্রবৃত্তিতেই দূরে পালিয়ে যাবার জন্য ছুটেছিল ডালিয়া। মাইল খানেক যাবার পর মাল-বোঝাই গাধাগুলোর কথা মনে পড়ল তার। গতি কমিয়ে পিছন ফিরে চাইল সে। ছড়িয়ে পড়ে ডালিয়াকে ধরার জন্যে ছুটছে গাধাগুলো।

মোট চারটে গাধা এসে পৌঁছল। ডালিয়ার ঘোড়াকে অনুসরণ করতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে ওরা। পিছনে কোথাও আরও তিনটে রয়ে গেছে। দরকারী জিনিসপত্র সব এগুলোর পিঠেই আছে-তাই বাকিগুলোর অপেক্ষায় আর সময় নষ্ট না করে এগিয়ে চলল সে।

কখনও ওদের ছাড়াছাড়ি হলে নো ম্যানস মেসার একটা বিশেষ জায়গায় তাকে অপেক্ষা করতে বলেছিল জেকব। কিন্তু সেই জায়গা আর ডালিয়ার মাঝখানে রয়েছে কেলভিন আর ফ্রীডমের সেই দলটা। সম্পূর্ণ মেসা ঘুরে উল্টো দিক থেকে ওখানে পৌঁছা’নোর সিদ্ধান্ত নিল সে। ঘোড়া থেকে নেমে মাল-টানা জম্ভগুলোকে দড়ি দিয়ে নিজের ঘোড়ার সাথে বেঁধে নিয়ে আবার রওনা হয়ে গেল। সন্ধ্যায় কপার ক্যানিয়নের ট্রেইল ধরল সে।

রাত হয়ে আসছে। একটা তারা উঠল আকাশে…একটা বাদুড় ওর মাথার উপর একটা চক্কর দিয়ে গেল। শূন্য মরুভূমিতে বহুদূর থেকে একটা কয়োটির ডাক ভেসে এল।

রাইফেলটা শক্ত করে ধরে আছে ডালিয়া। এই নির্জন এলাকায় জেকবের অনুপস্থিতিতে রাইফেলটাই ওর সাহস জোগাচ্ছে। ঘোড়াটাই কেবল নির্ভয়ে ট্রেইল চিনে এগিয়ে চলেছে।

ক্যানিয়নের দু’পাশে দেয়ালগুলো আরও উঁচু হলো। অন্ধকার আরও গাঢ় হয়েছে। স্তব্ধ রাত। মাথার উপরে ওই এক চিলতে আকাশের তারাগুলোই কেবল একটু মিটমিট আলো দেখিয়ে ওকে আশ্বাস দিচ্ছে।

ক্লান্ত ঘোড়াটা সমান তালে এগিয়ে চলেছে। গাধাগুলো এখন অনিচ্ছা সত্ত্বেও পিছন পিছন আসছে। শক্ত পাহাড়ী ঘোড়া বলেই এখনও এগোতে পারছে। ঘোড়ার পিঠে এতক্ষণ বসে থেকে ডালিয়া নিজেও অত্যন্ত ক্লান্ত হয়ে পড়েছে।

সময়ের সব রকম বোধ লোপ পেয়েছে তার। হঠাৎ পরিশ্রান্ত ঘোড়াটা থেমে থেমে লাফিয়ে একটা ক্লিফের উপর উঠতে শুরু করল। শেষ মাথায় প্রায় পা পিছলে পড়তে পড়তেও সামলে নিল। রাতের ঠাণ্ডা হাওয়ার পরশ লাগল ডালিয়ার মুখে। ক্যানিয়ন থেকে বেরিয়ে এসেছে ওরা।

পথে একবার থেমে ঘোড়াকে পানি খাইয়ে খালি বোতলগুলো ভরে নিয়েছে সে। ওখানে কিছু খেয়ে ঘন্টা দুই ঘুমিয়ে নিয়েছে ডালিয়া

ভোরের দিকে নো ম্যানস মেসার ধার ঘেঁষে মোড় নিল সে। একটু থেমে কান পেতে শুনল-তারপর আবার এগোল। 

মেসার ধার ঘেঁষে ছায়ায় ছায়ায় এগিয়ে যাচ্ছে সে। খুব কাছে না এলে কেউ দেখতে পাবে না ওকে। জেকব তাকে যে খাজটার কথা বলেছিল, তার প্রায় কাছাকাছি এসে পড়েছে সে। কিন্তু ওদিক থেকে যেকোন মুহূর্তে কেলভিন, নিকোলাস ফ্রীডমের দলটা এসে পড়তে পারে। খুব সাবধানে এগোতে হচ্ছে ওকে। ধুলো না উড়িয়ে পাথরের উপর দিয়ে চলছে সে।

হঠাৎ একটা গুলির শব্দ শোনা গেল। ক্লিফের দেয়ালে প্রতিধ্বনি তুলে দূরে মিলিয়ে গেল শব্দটা। তাড়াতাড়ি আরেকটা বাকের কাছে এগিয়ে সাবধানে উঁকি দিল সে। দেখল নীচে আধমাইল দূরে একটা ঘোড়া পাগলের মত ছুটছে-ঘোড়ার জিনে আরোহী নেই-শূন্য। বুকটা ধড়াস করে উঠল-ওটা জেকবের ঘোড়া নয়তো? রেকাবের উপর দাঁড়িয়ে ভাল করে দেখার চেষ্টা করল। বারবার মনকে বোঝাতে চেষ্টা করছে, ভুল দেখেছে সে-এতদূর থেকে চেনা সম্ভব নয়।

ধুলো উড়ছে ওখানটায়। আরও কয়েকটা গুলির শব্দ উঠল। অনেক দূরে রয়েছে ডালিয়া। ঘোড়া ছুটিয়ে গেলেও সাহায্যের জন্য সময় মত ওখানে পৌঁছতে পারবে না। কিছু করার নেই। জেকব যদি এই বিপদ থেকে রক্ষা পায় তবে সোজা তার কাছেই আসবে। পিছন থেকে একটা শব্দে ফিরে তাকাল সে।

তিনজন ঘোড়-সওয়ার!

জেকব বলেছিল নিকোলাসের সাথে দু’জন লোক আছে। সম্ভবত তার ঘোড়ার চিহ্ন খুঁজে পেয়ে তাকেই অনুসরণ করছে ওরা। দেখে ফেলেছে কিনা ঠিক বুঝতে পারল না ডালিয়। তাড়াতাড়ি এগিয়ে চলল সে।

মেসার ধারটা এখানে দ্রুত ঘুরে কিছুটা ভিতরে ঢুকে গেছে। মাঝে একটা খাজ দেখা যাচ্ছে। আশপাশে ঘন গাছ-পালা জন্মেছে। আরও একটু নীচে ক্যানিয়নের শুরু। ঘোড়া আর গাধাগুলোকে একত্র করে খাজের ফাঁকে ঢুকিয়ে দিয়ে রাইফেল হাতে মাটিতে শুয়ে পড়ল ডালিয়া।

এখানেই আসবে বলেছিল জেকব। যতদিন সে না আসে, কিংবা ওর মৃত্যু সম্পর্কে নিঃসন্দেহ না হয়, ততদিন ডালিয়া এখানেই অপেক্ষা করবে।

চারপাশটা এবার ভাল করে চেয়ে দেখল সে। জেকব নেই-ওর উপস্থিতির কোন চিহ্নই নেই এখানে। বুকের ভিতরে কেমন যেন একটা অপার শূন্যতা অনুভব করছে ও। সুদীর্ঘ পথ চলতে চলতে আশা নেই জেনেও ভেবেছিল এখানে এলেই সে জেকবের দেখা পাবে। হয়তো আহত অবস্থাতেই দেখবে, কিন্তু দেখা সে পাবেই। এখানে পৌঁছে তার যত্নে পুষে রাখা আশা একেবারে ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে।

কিন্তু এখন ভাবপ্রবণ হলে চলবে না-তার পিছনে ধাওয়া করে আসছে নিকোলাস।

নিজেকে সামলে নিল ডালিয়া।

জায়গাটা বেশ ভাল। ক্লিফটা ঢালুভাবে উঠে গেছে উপর দিকে। বৃষ্টির সময়ে মনে হয় এই পথেই উপর থেকে জলপ্রপাতের মত পানি নামে-এখন শুকনো। পাঁচ-ছয় ফুট জায়গা জুড়ে এখনও কিছুটা পানি জমে রয়েছে।

আশেপাশে কিছু বুনো ঘোড়ার পায়ের ছাপ দেখা যাচ্ছে। কেউ যেন বাতাস আড়াল করার জন্য বা আক্রমণের হাত থেকে বাঁচার জন্য পাথর জড়ো করে একটা আশ্রয় তৈরি করে রেখেছে। নিজের পাশে সার বেঁধে কার্তুজ সাজিয়ে হাটু গেড়ে পাথরের আড়ালে বসল সে।

বেশ দূরে নিকোলাসকে দেখা গেল। বিনা দ্বিধায় রাইফেল তুলে ঘোড়ার পায়ের কাছে গুলি বেঁধাল ডালিয়া। চমকে লাফিয়ে উঠে ঘোড়াটা দাপাদাপি শুরু করল। ওর সঙ্গী লোক দুটো চোখের আড়ালে লুকাল।

ঘোড়াটা শান্ত হবার পর কঠিন চোখে যেখান থেকে গুলিটা এসেছে সেদিকে চাইল নিক। কে গুলি করেছে তা ভাল করেই জানে সে।

কোন লাভ নেই, ডালিয়া, বলল নিক। শেষ পর্যন্ত ধরা দিতেই হবে। তোমাকে না নিয়ে এখান থেকে নড়ব না আমি।

জবাব দিল না ডালিয়া।

আমি জানি তুমি কোথায় আছ। ভাল চাও তো বেরিয়ে এসো-নইলে আমরাই তোমাকে ধরতে আসব।

পকেট থেকে তামাক বের করে সিগারেট বানাতে শুরু করল নিক। কোন লাভ নেই, আবার বলল সে।

ওরা জেকবকে ছাড়বে না, খতম করবে ওকে। আর তা না হলে কাজটা আমিই শেষ করব। তুমি এখন একা-আমাকে ছাড়া তোমার কোন গতি নেই।

ডালিয়া টের পেল কথার ফাঁকে একটু একটু করে এগিয়ে আসছে নিক। ঘোড়াটা অস্থিরভাবে নড়াচড়া করছে-কিন্তু কৌশলে ওটাকে এগিয়ে নিয়ে আসছে বদমাইশ লোকটা

আবার গুলি করল সে।

লাফ দিয়ে ঘোড়াটা ঝোঁপের আড়ালে অদৃশ্য হলো। ওর পায়ের তলা থেকে পাথর ছিটকে উঠল। বুলেটটা এবার নিকের মাথার মাত্র দু’ইঞ্চি দূর দিয়ে হ্যাটের কোণায় লেগে বেরিয়ে গেছে! মাথা থেকে খুলে মাটিতে পড়েছে হ্যাট।

হুড়মুড় করে আছাড় খেয়ে পড়ল ঘোড়াটা। গালি দিয়ে উঠল নিক। কিন্তু ওই শব্দের সাথে দূরে নীচে থেকেও একটা শব্দ এল না?…নাকি ওর মনের ভুল?

ডাইনে-বাঁয়ে চাইল ডালিয়া। রাতের অন্ধকারে ওদের এগিয়ে আসা কী করে ঠেকাবে সে?

ওর তিনদিকে মেসার দেয়াল-ডাইনে, বয়ে আর পিছনে। এখান থেকে বেরিয়ে উপরে ওঠার কোন পথ সত্যিই আছে কিনা দেখতে যাবারও সাহস হচ্ছে না তার। কান খাড়া করে ওখানেই বসে রইল সে।

সময় কাটছে…এক ঘণ্টা…দু’ঘণ্টা কিন্তু কিছুই ঘটল না। সূর্যের তাপ ওর পেশীগুলোকে শিথিল করে দিচ্ছে। চোখের পাতা ভারি হয়ে আসছে। কয়েকবার নড়েচড়ে বসল-কিন্তু বারবারই ক্লান্তিতে ঝিমানি এসে যাচ্ছে তার। সিধে হয়ে বসল সে। দূরের পাহাড়গুলো পড়ন্ত রোদে জ্বলন্ত পাহাড়ের মত দেখাচ্ছে।

সে বুঝতে পারছে রাতের অন্ধকারে তাকে আরও বেশি সজাগ থাকতে হবে। মুহূর্তের জন্য পাশের সীডার গাছটার সার্থে মাথা ঠেকিয়ে একটু চোখ বুজল সে। রাজ্যের ঘুম নেমে এল ওর দু’চোখে

আমিষ-খেকো পাখি ধীর অলস গতিতে চক্কর দিচ্ছে আকাশে। সীডার গাছের তলায় গাধাগুলো অবসন্নভাবে মাথা নীচের দিকে ঝুলিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ডালিয়ার ঘোড়াটা খোলা জায়গায় এগিয়ে গিয়ে পাথরে আটকা স্থির ঠাণ্ডা পানিতে চুমুক দিল।

.

ক্যানিয়নের ভিতরে পিছনে ফেলে আসা একটা মাইল কোনমতে হোঁচট খেয়ে, হামাগুড়ি দিয়ে আর ক্রল করে এগিয়েছে জেকব। নাকিয়ার কাছে, যেখানে সোনালী স্ট্যালিয়নটা বেরিয়ে এসেছিল-সেখানকার নরম বালির কথা জেকবের মনে ছিল। তার বাকস্কিনটা ওখান দিয়ে ছুটে যাবার সময়ে পানির বোতল আর রাইফেল হাতে ঘোড়ার পিঠ থেকে লাফিয়ে পড়েছে সে।

মেসার দেয়ালে সেই খাজটার সিকি মাইলের মধ্যে এসে গেছে জেকব। কথাগুলো বুঝতে না পারলেও নিকোলাসের চেঁচিয়ে কিছু বলা, তারপরেই গুলির শব্দ, সব শুনেছে সে। দ্বিতীয় গুলির পরে এখন সব নীরব।

ডান পা-টা টেনে টেনে চলছে সে। তার প্যান্টের কাপড় রক্ত জমে শুকিয়ে শক্ত হয়ে আছে। ভিতরে কোন হাড় ভেঙেছে বলে তার মনে হচ্ছে না। বুকের গুলিটা তাকে সোজা এফোঁড় ওফোঁড় করে বেরিয়ে গেছে। রক্ত হারিয়ে বেশ দুর্বল হয়ে পড়লেও মনে হচ্ছে এতে ওর দেহের মারাত্মক কিছু ক্ষতি হয়নি। কঠিন মাটিতে সংগ্রাম করে বাঁচতে অভ্যস্ত জেকব। কষ্ট সহিষ্ণুতা ওর দ্বিতীয় ধর্ম উপায় নেই, এখন তাকে এগিয়েই যেতে হবে। নইলে অবধারিত মৃত্যু।

ডালিয়ার কাছে পৌঁছতে হবে তাকে। ওর কাছে গাধার পিঠে রয়েছে ওষুধ আর খাবার। ওর এখন সবচেয়ে বেশি দরকার খুব গরম আর কড়া এক কাপ কফি। পিস্তল আর রাইফেলের গুলির বাক্সগুলোও রয়েছে ডালিয়ার কাছে। অবশ্য বেশি গুলি খরচ হয়নি তার। এখনও ওর কাছে প্রায় ত্রিশ রাউন্ড গুলি রয়ে গেছে।

আরও একশো গজ সহজেই এগোল সে। তারপর একটা শুকনো জলপ্রপাত বেয়ে মোলা ফুট উপরে উঠল। তার ভাগ্য ভাল যে প্রপাতটা একবারে সোজা না নেমে ধাপে ধাপে তিনচার ফুট করে নেমেছে। পানির পাত্রটা বারবারই বাধার সৃষ্টি করছে-ওটা নিয়ে ক্রল করে চলতে খুব অসুবিধা হচ্ছে, কিন্তু ওকে যদি বেকায়দায় কোথাও আটকা পড়তে হয় তবে ওই পানিই হয়তো ওর প্রাণ বাঁচাবে। খাবার ছাড়াও চলতে পারবে সে-আগেও চলেছে।

ওখানে স্থির হয়ে কিছুক্ষণ পড়ে রইল জেকব। হাঁপাচ্ছে সে। একটু বিশ্রাম নিয়ে একটু পানি মুখে ঢেলে ভিতরটা ভাল করে ভিজিয়ে গলা দিয়ে ওটা নীচে নামাল।

সে বুঝতে পারছে ওরা এতক্ষণে আন্দাজ করে ফেলবে সে কোথায় আছে। ওর খালি ঘোড়াটা কিছুদূর পর্যন্ত অনুসরণ করেই চালাকিটা বুঝতে পেরে আবার ফিরে আসবে ওরা। ঘোড়া থেকে সে কোথায় নেমেছে সেটা খুঁজে বের করতে ওদের বেশি সময় লাগবে না। তারপরই ক্যানিয়ন ধরে সোজা এগিয়ে আসবে।

সময়ের হিসাব অনেক আগেই হারিয়েছে জেকব। চলতে চলতে বারবার মাটিতে পড়েছে, উঠেছে, আবার পড়েছে কিন্তু তবু এগিয়েছে। এখন আর ইচ্ছাশক্তি ব্যবহার করে এগোচ্ছে না সে-যন্ত্রের মত চলছে।

ডালিয়া…ডালিয়া আমার জন্যে একটু দাঁড়াও। ভাঙা গলায় ফিসফিসিয়ে উচ্চারণ করল জেকব। কথাটা এই নিয়ে কতবার বলেছে সে?

পিছনের লোকগুলো পিছু ছাড়েনি। শক্ত মানুষ ওরা! আজ সারাটা দিনে বহুবার টের পেয়েছে জেকব-ওদের সহজে ফাঁকি দেওয়া যাবে না। ওই কঠিন লোকগুলোর একটাই উদ্দেশ্য-শক্ত-পাল্লাকে শেষ করতে হবে। এবারে আদা-জল খেয়ে লেগেছে ওরা। ফেরানো যাবে না।

ওদের কথা মনে পড়তেই আবার এগোতে শুরু করল জেকব। কিছুদূর এগিয়েই আবার পড়ে গেল সে। ধীরে ধীরে উঠে বসতে চাইল।

সামনেই বালুর উপর রয়েছে ঘোড়ার পায়ের চিহ্ন। নালবিহীন ছাপ-বুনো ঘোড়ার! ওগুলো এখানে কীভাবে এল? তবে কি এখানে পৌঁছবার আর কোন সোজা পথ আছে যেটা তার চোখে পড়েনি? এখানেই বা কেন এসেছিল ওরা?

রাইফেলে ভর দিয়ে উঠে দাঁড়াল জেকব। খুঁড়িয়ে এগিয়ে চলল সে। প্রতি পদক্ষেপেই হোঁচট খাচ্ছে, প্রায় পড়ে যাবার অবস্থা হচ্ছে। কতগুলো পাথরের ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে আরও সামনে নো ম্যানস মেসার খাজটা দেখতে পেল। ওটা উপর দিকে ধীরে ধীরে সরু হয়ে গেছে। আরও একটা জায়গায় আবার ঘোড়ার পায়ের ছাপ দেখা গেল।

এখানে নিশ্চয়ই পানি আছে কোথাও। ঠিক-ওই পানির আশেপাশেই কোথাও অপেক্ষা করবে ডালিয়া।

আবার পড়ে গেল জেকব। হাতে ভর দিয়ে উঠতে গিয়ে খেয়াল করল বালুর উপর রক্ত। ক্ষতস্থান থেকে রক্ত পড়া অনেক আগেই বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। এখন আবার সেখান থেকে রক্ত পড়তে শুরু করেছে। পিছন থেকে পাথরের উপর খটর খটর আওয়াজ হচ্ছে। চমকে উঠে পিছন ফিরে চাইল। কেউ-কিছু একটা ওর দিকে দ্রুত এগিয়ে আসছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *