১২. অনেক দিন পর

অনেক দিন পর। শহরের সবার আজও মনে আছে কিনো আর আ হুয়ানার ফিরে আসার দিনটির কথা। রীতিমত সাড়া পড়ে যায় চারদিকে সেদিন। জনাকয় বৃদ্ধ নিজের চোখে ওদের ফিরে আসতে দেখেছে। অন্যরা ও ঘটনার কথা শুনেছে বাপ-দাদার মুখে। কিন্তু দিনটার কথা স্মরণ করে সবাই।

একদিন শেষ বিকেলে, কয়েকটা বাচ্চা ছেলে দৌড়তে দৌড়তে খবরটা নিয়ে শহরে এসে ঢোকে। সবাই বাসা থেকে বেরিয়ে আসে কিনো আর হুয়ানাকে স্বচক্ষে দেখার জন্যে।

সূর্য পাটে বসেছে তখন, মাটিতে দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে ছায়া। কিনো ও হুয়ানার মুখ, আর লম্বা, কালো ছায়ার ছবি জ্বলজ্বল করে আজও সবার স্মৃতিতে।

বালি ভরা রাস্তাটা ধরে শহরে প্রবেশ করে ওরা। কিনো আর হুয়ানা পাশাপাশি হাঁটছিল। সূর্য ছিল তাদের পেছনে, আর সামনে ছিল নিজেদের দীর্ঘ ছায়া।

কিনোর হাতে ছিল রাইফেল। হুয়ানা ভারী বস্তার মত কাঁধে বইছিল ওর শালটা। শালে চাপ চাপ রক্তের দাগ।

হুয়ানার মুখের চেহারায় অসংখ্য রেখা আর ক্লান্তির ছাপ চোখে পড়ে সবার। ওর বিস্ফারিত চোখের দৃষ্টি ছিল ফাঁকা, ভাবলেশহীন। কিনোর পাতলা ঠোট দুটো পরস্পর দৃঢ়বদ্ধ ছিল। লোকে বলে সেদিন নাকি ওকে হিংস্র পশুর মত ভয়ঙ্কর দেখাচ্ছিল। জনতা ঠেলাঠেলি করে সরে দাঁড়িয়ে পথ করে দেয় ওদের।

শহরের মধ্য দিয়ে হাঁটছিল কিনো আর হুয়ানা, কিন্তু কিছুই বুঝি তাদের চোখে পড়ছিল না। ডানে-বায়ে কোনদিকে দৃষ্টিক্ষেপ করেনি তারা। আশেপশে নয়, পিছে নয়, সোজা নাক বরাবর ছিল তাদের দৃষ্টি।

পাশাপাশি হাঁটছিল স্বামী-স্ত্রী, শহরের বুক চিরে চলে এসেছিল মুক্তোডুবুরিদের লোকালয়ে। পড়শীরা ওদের ঘাটায়নি, পথ ছেড়ে দিয়েছে।

হুয়ান টমাস হাত তুলেছিল, কিন্তু মুখে কিছু বলেনি। ওর ওঠানো হাত যেমনকে তেমন শূন্যেই ছিল।

ভস্মীভূত বাড়িটার পাশ কাটায় কিনো আর হুয়ানা, কিন্তু একটিবারও ফিরে তাকায়নি ওটার দিকে। ঝোপ-ঝাড়ের ভেতর দিয়ে পথ করে নিয়ে, সাগরের কাছে চলে আসে ওরা। কিনোর ভাড়া ক্যানুটার যে অস্তিত্ব আছে, ওদের হাবে-ভাবে মনেই হয়নি। পানির কাছে এসে থেমে দাঁড়ায় ওরা, একদৃষ্টে চেয়ে থাকে সাগরের পানে।

তারপর কিনো রাইফেলটা মাটিতে নামিয়ে রেখে, পকেটে হাত ভরে। বের করে আনে দামী মুক্তোটা।

মুক্তোটার দিকে চোখ রেখে ভয়ঙ্কর ঘটনাগুলো একে একে স্মরণ করে সে। মুক্তোটার ভেতর, ক্রুর-কুটিল মানুষের মুখ আর আগুনের লেলিহান শিখা দেখতে পায় কিনো। পাহাড়ী জলাশয়ে মৃত ওই লোকটার আতঙ্কে বিস্ফারিত চোখজোড়া ফুটে ওঠে ওর মানসচোখে। মাথায় রক্ত মেখে গুহায় পড়ে রয়েছে কয়েটিটো, দেখতে পায় কিনো। ওহ, কী কুৎসিত আর অশুভ এই মুক্তোটা।

হুয়ানার উদ্দেশে যখন ফিরল, হাত অল্প অল্প কাঁপছে কিনোর। মুক্তোটা বাড়িয়ে ধরল বউয়ের দিকে। হুয়ানা কাঁধে তখনও একমাত্র সন্তানের লাশ বহন করছে। পলকের জন্যে কিনোর হাতে ধরা রত্নটার দিকে চেয়ে রইল সে। তারপর সরাসরি, স্বামীর চোখে চেয়ে শান্ত সুরে বলল, না, কাজটা তোমাকেই করতে হবে।

কিনো হাত শূন্যে তুলে যতটা দূরে পারে ছুঁড়ে দেয় মুক্তোটা। পড়ন্ত বেলার ম্লান আলোয়, ঝিক করে ওঠে জিনিসটা। ওই যে, সাগরে টুপ করে গিয়ে পড়ল। বহুক্ষণ পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থাকে ওরা, বহতা পানির গতি লক্ষ্য করে।

সেদিন গোধূলিলগ্নে, সবুজ আয়নার মতন চিকচিক করছিল সাগরের পানি। নয়নাভিরাম সবুজাভ পানিতে পড়ে, সাগরের অতলে তলিয়ে গেছে মুক্তোটা। চিরতরে হারিয়ে গেছে কিনো আর হুয়ানার জীবন থেকে।

***

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *