১১-১৫. মাইলখানেক পথ অতিক্রম করার পর

মাইলখানেক পথ অতিক্রম করার পর এরফান আবার স্বভাবগত স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে এলো। এখন নিজের ওপরই, রাগ হচ্ছে ওর। এভাবে একটা তরুণী মেয়েকে কথা শোনানো তার মোটেও ঠিক হয়নি।

যখন বলেছিল বন্দি যুবককে সে কিভাবে উদ্ধার করবে তা ওর জানা নেই তখন মিথ্যে বলেনি ও। এখনও কোন প্ল্যান সে ঠিক করেনি। ওর নিশ্চিত ধারণা, লরি নয়, সে নিজেই ওদের টার্গেট। ওকে ফাঁসানোর জন্যেই লরিকে ওরা বন্দি করেছে। মুক্তি পণটা কাকে আনতে হবে তার নাম উল্লেখ করাতেই সে বুঝে নিয়েছে ওদের আসল টার্গেট কে। কঠিন একটা হাসি ফুটে উঠল ওর ঠোঁটে; সে ইচ্ছে করেই ধরা দেবে।

বিগত দিনগুলোর ঘটনা, মেয়েটার অপছন্দ, এবং ওর সাথে বার্টের সম্পর্ক, এসবই আমাকে এই এলাকায় একটা ভেজা কুকুরের মত প্রিয় করে তুলেছে, মনে মনে ভাবল এরফান।

প্রায় দুপুর হয়ে এসেছে, এই সময় স্কাল ক্যানিয়নে ঢুকল ও। ঘোড়া থামিয়ে অপেক্ষায় থাকল; ওর ঠোঁটে একটা বেপরোয়া হাসি ফুটে উঠেছে। কোন ঝোঁপের আড়াল থেকে শব্দ তুলে একটা গুলি এসে ওকে ফুটো করে দিলেও অবাক হত না, কিন্তু তার বদলে ঝোঁপের আড়াল থেকে স্বর ভেসে এলো।

কোমরের বেল্ট আর রাইফেলুটা মাটিতে ফেলে দাও, জেমস, আমরা তোমাকে কাভার করে আছি, দাবি করল সে। মনে রেখো তোমার পিছনেও আমাদের দুজন লোক রয়েছে। তুমি আমার পিছন পিছন এসো, কোন চালাকি বা পালাবার চেষ্টা করলে তোমাকে গুলি করার নির্দেশ দেয়া আছে ওদের।

আমি এখানে কোন খেলা খেলতে আসিনি, কঠিন স্বরে জবাব দিল এরফান। আমাকে কোথায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে?

অপেক্ষা করো, নিজেই দেখতে পাবে, জবাব এলো।

ওদের মধ্যে আর কোন কথা হলো না। এরফান নীরবেই তার কালো মুখোশধারী পথ প্রদর্শককে অনুসরণ করছে ট্রেইলটা নিছক একটা আবছা পথ ছাড়া আর কিছুই নয়। বোঝাই যাচ্ছে এটা ওদের আস্তানায় পৌঁছা’র প্রধান রাস্তা নয়। ওকে কোন ঘোরা পথে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। দেবদারু আর, অ্যাসপেনের একটা বনের ভিতর দিয়ে এগোচ্ছে ওরা। একটু পরেই ওরা এমন একটা ভাঙাচোরা বুনো এলাকায় ঢুকল যে এমন দুর্গম ট্রেইল, এরফান জীবনে খুব কমই দেখেছে

সারাটা পথ ক্রমশ ওরা কেবল উপর দিকেই উঠেছে। হঠাৎ করেই ওরা উঁচু পাহাড়টার পাদদেশে পৌঁছল। নিচের ঢালটা পাইন গাছে ভরা। এখানকার বাতাস অপেক্ষাকৃত ঠাণ্ডা। গাছ আর ঘন ঝোঁপের ফাঁক দিয়ে মাত্র কয়েক চিলতে রোদ ভিতরে ঢোকার অধিকার পেয়েছে। এরফান পিছন ফিরে দেখল দুজন মুখোশ পরা লোক হাঁটুর উপর আড়াআড়ি রাইফেল তৈরি রেখে রাইড করছে। ওই সামনের লোকটা তাহলে মিথ্যে ধাপ্পা দেয়নি। ওরা নিশ্চয়ই এর মধ্যে আড়াল ছেড়ে কিছুটা সামনে এগিয়ে এসেছে; কারণ এর আগে ওদের দেখতে পায়নি জেসাপ। উপরে ওঠায় গাছের সংখ্যা ক্রমেই কমে আসছে। ওদের অনেক উপরে চূড়াগুলোর দৈত্যাকার দাঁতের সারি দেখা যাচ্ছে। ছোট একটা নিচু ঢলের কাছে পৌঁছল ওরা। প্রায় এক মাইল লম্বা আর আধমাইল চওড়া পেয়ালা আকারের সীমানা ওটা। ঝোপে ভরা ঢালগুলো ছাড়া পুরো এলাকাটাই গাঢ় সবুজ ঘাসে ছাওয়া। এর ঠিক মাঝখানে একটা ছোট লেকও দেখা যাচ্ছে। অনেক গরু আর ঘোড়া সন্তুষ্ট মনে ওখানে চরছে।

আপাতদৃষ্টিতে নিচে নামার কোন পথই দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু ওর গাইড নির্দ্বিধায় ঘোড়াকে একটা ঢাল বেয়ে পিছলে নিচে নামাল। চক্রাকারে কিছু ঝোঁপঝাড় কাটিয়ে একটা করালের সামনে থামল সে।

তোমার ঘোড়াটাকে ওই করালে ঢুকিয়ে রাখো; এখন আমাদের কিছুদূর হাঁটতে হবে। লোকটা প্রথমে নিজেই, তাই করল।

এরফানও অনুসরণ করল। তারপর একটা সরু পাথুরে পথ ধরে প্রায় একশো ফুট উঁচুতে উঠে দেখল ওখানে কয়েকটা গুহার মুখ দেখা যাচ্ছে; সে বুঝল এগুলো হোপি ইন্ডিয়ানদের তৈরি। তবে সম্ভবত এর বর্তমান বাসিন্দরা ওদের চেয়েও নিষ্ঠুর। এরফান লক্ষ করল কয়েকটা গুহার মুখে দরজা বসানো হয়েছে। ওগুলোর মধ্যে একটায় এরফানকে, ঢোকানো হলো।

আপাতত তুমি এখানেই থাকো, আমাদের যখন দরকার ডাকা হবে, বলল লোকটা। খিদে পেয়েছে?

তা পেয়েছে বটে; সেই ভোর বেলায় নাস্তার পর আর পেটে কিছু পড়েনি, বলল লেজি এমের ফোরম্যান। তারপর পকেট থেকে একটা পাঁচ ডলারের নোট বের করে বলল, তুমি কি এক বোতল হুইস্কির ব্যবস্থা করতে পারবে? গলাটা বড্ড শুকিয়ে এসেছে

ডাচ কারেজ, অ্যাঁ? খিকখিক করে লোকটা হাসল। আমি দেখছি তোমার জন্যে কোন ব্যবস্থা করা যায় কিনা।

লোকটা চলে গেল, কিন্তু যাবার আগে দরজায় তালা লাগিয়ে গেল। একটু পরেই সে কিছু মাংস, রুটি, আর এক বোতল মদ নিয়ে ফিরে এলো।

ওই মাল একটু কম করে খাওয়াই ভাল, সাবধান করল সে, অভ্যস্ত না হলে ওটা ডিনামাইটের চেয়েও খারাপ।

মাথা ঝাঁকাল এরফান; ওই জিনিসের সাথে তার পরিচয় আছে। লোকটা চলে যাওয়ার পর ওকে যেখানে বন্দি করা হয়েছে সেই কামরাটা ভাল করে পরীক্ষা করে দেখল। পাথর খুড়ে তৈরি করা একটা গর্ত ছাড়া আর কিছুই নয়। আলো বাতাস কেবল অপটু হাতে তৈরি দরজার ফাঁক দিয়ে সামান্য আসছে। ওটাই ভরসা। খাবার শেষ করে এক চুমুক মদ মুখে নিয়ে কুলি করে ফেলে দিল এরফান, তারপর বাকি মদের তিন ভাগের দুই ভাগ মাটিতে ঢেলে ফেলে বোতলটা নিজের পাশেই রেখে দিল।

দেয়ালে হেলান দিয়ে বসে একটা সিগারেট ঠোঁটের ফাঁকে ভরে পরবর্তী ঘটনা ঘটার অপেক্ষায় থাকল সে। ওর চোখে কোন পট্টি না বেঁধে এখানে আনা এবং হাতও না বেঁধে মুক্ত রাখাতেই সে স্পষ্ট বুঝে নিয়েছে শেষ পর্যন্ত ওর ভাগ্যে কি ঘটুবে। ওকে কোনমতেই এখান থেকে জীবন্ত বেরোতে দেয়া হবে না। লরিকে কোথায় রাখা হয়েছে সেটাই ভাবছে সে।

ঘণ্টা দুই পরে বাইরে পায়ের শব্দ শুনতে পেয়েই এরফান বুকের সাথে থুতনি ঠেকিয়ে এমন ভাবে কাত হয়ে বসল যেন সে পুরোপুরি মাতাল অবস্থায় কুঁদ হয়ে আছে। যে লোকটা ওকে নিয়ে এসেছিল বোতলটার দিকে একবার চেয়েই সে খিস্তি করল।

ইউ ড্যাম ফুল-আমি আগেই সাবধান করেছিলাম, কিন্তু তুমি আমার কথায় কান দাওনি, বলল মুখোশধারী।

পাঁড় মাতালের মত জড়ানো স্বরে বিড়বিড় করল এরফান, আওয়ি ঠিগই আসি, তুয়ি গি চাও?

এরফানের বাহু জড়িয়ে ধরে ওকে উঠতে সাহায্য করল সে। তারপর একরকম জোর করেই ওকে নিয়ে এগোল। টলতে টলতে কোনরকমে ওর সাথে চলেছে এরফান। উঁচু ছাদওয়ালা একটা গুহায় ওকে ধাক্কা দিয়ে ঢুকিয়ে দিল লোকটা। বড় গুহাটা থেকে কয়েকটা সুড়ং বিভিন্ন দিকে গেছে। পাথরের একটা গর্ত দিয়ে আলো আসছে। ওখানে সাতজন লোক আলোর কাছে চেয়ারে বসা রয়েছে। প্রত্যেকের মুখই কালো মুখোশে ঢাকা; কেবল চোখদুটো দেখা যাচ্ছে।

ওকে তুমি বাঁধোনি কেন? ওদের একজন জিজ্ঞেস করল; যার আকৃতি এরফানের কাছে কেমন যেন পরিচিত মনে হলো।

কি দরকার? জবাব দিল লোকটা। ও তো নিজেকেই নিজে বেঁধে ফেলেছে-দেখছ না ওর অবস্থা?

প্রচুর মাল গিলেছে, না? অবজ্ঞার সাথে বলল প্রথম বক্তা। ওই লোকটা যে নেতা ধরনের কেউ তা ওর কথায় বোঝা যায়। তারপর সে এরফানের দিকে চেয়ে বলল, ডলারগুলো কোথায়?

সম্মানের সাথে মাথা তুলে দাঁড়াতে গিয়ে প্রায় পড়ে যাওয়ার ভান করল এরফান।

তোমরা আমাকে কি এতই বোকা মনে করো যে আমি তোমাদের ওই ফাঁদে পা দেব? জড়ানো স্বরে বলল সে। আমি কচি খোকা নই।

তুমি যদি টাকাটা না এনে থাকো, তাহলে তোমাদের দুজনকেই আমি এক সাথে ঝুলিয়ে দেব, অপরিচিত লোকটা গর্জে উঠল।

এরফান মাথা নাড়ল। ওসব হুমকিতে কোন কাজ হবে না, দাঁত দেখিয়ে হাসল সে দুজন কাউবয়ের লাশ দিয়ে তোমার কি লাভ হবে? ভারী স্বরে জবাব দিল সে। মাংস আর চামড়া বিক্রি করবে? আমার কথা শোনো, আমি কিভাবে নিশ্চিত হব যে তুমি আমার লোককেই আটক করেছ? প্রমাণ করো যে ও আমারই লোক, তাহলে আমি র‍্যাঞ্চে চিঠি দিয়ে টাকাটা আনাব। তোমার একজন সঙ্গী •ওটা আনতে যাবে। এর চেয়ে ভাল ব্যবস্থা আর কি হতে পারে? (কথাগুলো এরফান জড়ানো ভাবে তোতলামির সাথে বললেও পাঠকের বোঝার সুবিধার জন্যে বিকৃত করা হয়নি।)।

ওই গাধাটাকেও এখানে নিয়ে এসো, সামনে দাঁড়ানো টলায়মান লোকটার দিকে বিষ্ণা নিয়ে চেয়ে নির্দেশ দিল লীডার।

দুমিনিটের মধ্যেই হাত পিছনে বাঁধা অবস্থায় ওখানে হাজির করা হলো লরিকে। ফোরম্যানকে ভারী চোখে পিটপিট করে ওকে দেখতে দেখে লরি অবাক চোখে তাকিয়ে রইল।

ওটা লরিই বটে, কিন্তু ওরা দুজন কেন? কৌতুক মেশানো স্বরে বলল সে। ওরা কি যমজ নাকি?

ওর কথা শুনে মুখোশের আড়াল থেকে সমস্বরে হাসির শব্দ শোনা গেল। পেঁচার মত ভারিক্কি চেহারা করে ওদের দিকে কিছুটা এগিয়ে গেল সে।

হ্যাঁ, স্যার, যমজ বা একই বাপের ছেলে না হলে এতটা মিল একেবারে অসম্ভব। আমি কখনও ভিন্ন বাপের একই চেহারার ছেলে থাকার কথা শুনিনি।

আবার দর্শকদের মধ্যে হাসির ফোয়ারা ঠেল। আমোদ ফুর্তির মধ্যে, ডাকাত দল একটু অসতর্ক হয়ে উঠল। এই ধরনের একটা সুযোগই খুঁজছিল এরফান। সে আগেই খেয়াল করেছে, যে-লোকটা ওদের এখানে নিয়ে এসেছে সে ঠিক তার পিছনেই দাড়িয়ে আছে। বিরক্তিতে-সে-ও বেখেয়াল হয়ে পড়েছে।

টুইনরা সমাজের জন্যে খুব ক্ষতিকর হয়।

হঠাৎ দুহাত দুপাশে তুলে নিজের ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টায় ওই পিছনের গার্ডের সাথে ধাক্কা খেলো এরফান। পরমুহূর্তেই ঝট করে সামনের লোকগুলোকে দুহাতে দুটো পিস্তল নিয়ে কাভার করে দাঁড়াল সে। হুমড়ি খেয়ে পড়ে গার্ডের দুটো পিস্তলই ছিনিয়ে নিয়েছে ও।

তোমরা সবাই ছাদের দিকে হাত তুলে দাঁড়াও। আমি যেমন বলছিলাম-টুইনরা সত্যিই খুব সাংঘাতিক হয়; এবং এই গান দুটো টুইন।

মাতাল কাউরয়ের কথায় এখন আর বিন্দুমাত্রও জড়তা নেই। এখন সে একটু কুঁজো হয়ে হিংস্র কঠিন দৃষ্টিতে ওদের দিকে চেয়ে আছে। এখন একজনের বিরুদ্ধে আটজন হলেও ওরা সবাই জানে কেউ বিরোধিতা করতে গেলেই তার মৃত্যু অনিবার্য। মরতে ওদের কেউই রাজি নয়; তাই সবাই এরফানের আদেশ মত হাত তুলল।

ওরা সবাই দ্রুত এরফানের আদেশ পালন করার পর একটা পিস্তল খাপে ভরে এগিয়ে গিয়ে সে একজন ডাকাতের বেল্ট থেকে তার ছুরিটা বের করে নিয়ে লরিকে কাছে ডেকে নিয়ে হাতের বাঁধন কেটে দিল। বিষদাঁত ভেঙে দেয়ার জন্যে ওদের প্রত্যেকের হাত পিছমোড়া করে বেঁধে ফেলো, সঙ্গীকে নির্দেশ দিল সে।

উল্লসিত একটা চিৎকার দিয়ে লরি কেবল ওদের বেঁধেই ক্ষান্ত হলো না, পিস্তলগুলোও বের করে নিয়ে মাঝখানে ফেলল। ওখানে খুঁজে এরফান নিজের পিস্তল দুটো পেল বটে, কিন্তু নিজের রাইফেল ছাড়াই ওকে কাজ চালাতে হবে।

এবার যাকে পরিচিত মনে হয়েছিল তার পিছনে গিয়ে এক টানে লোকটার মুখোশ খুলে ফেলল।

যা ভেবেছিলাম ঠিক তাই, বলল সে। তোমার আকৃতিটা বেশ কিছুটা অসাধারণ, মিস্টার শ্যাডওয়ার্থ-ওরফে শেডি। চলো তোমাকেও আমরা সাথে নিয়ে যাচ্ছি।

ড্যাম ইউ, আমি তোমাদের দুজনকেই শেষ করব, হিসিয়ে উঠল সে।

হয়ত, কিন্তু আপাতত নয়, এখন তুমি আমাদের হাতে, বলল এরফান। আমাদের আগে আগে এগিয়ে চলে, পাজি কুকুর, নইলে তোমাকে কবর দেয়ার মতও বিশেষ কিছু অবশিষ্ট রাখব না আমি।

ওকে আর দ্বিতীয়বার বলতে হলো না, পাঁজরে পিস্তল ঠেকাতেই সে মাথা হেঁট করে চলতে শুরু করল। এর আগেই এরফানের নির্দেশ অনুযায়ী ওদের সব অস্ত্র নিচের উপত্যকায় ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছে লরি। করালে পৌঁছে এরফান নিজের ঘোড়াটাই নিল। লরি তার নিহত ঘোড়ার বদলে ভাল দেখে একটাতে চড়ে বসল। শেডিকেও একটা ঘোড়ায় তুলে দেয়া হলো। পাদানির সাথে ওর পা দুটো বেঁধে ওর গলাটাও দড়িব ফাঁসে আটকে নিজের জিনের সাথে বেঁধে নিল এরফান।

তুমি যদি লাফিয়ে পড়ে জল্লাদের কাজটা কমিয়ে দিতে চাও তাতে আমি আপত্তি করব না, হালকা সুরে মন্তব্য করল এরফান।

জবাবে শেডি কেবল আক্রোশে ভরা একটা ভেঙচি কাটল।

অনেক মানুষেরই এমন আক্রোশ এরফান আগেও দেখেছে, তাই এখান। থেকে হোপে পৌঁছা’র সবথেকে কাছের ট্রেইটা ধরতে বলল ও সাবধান করল, অযথা দেরি করাবার চেষ্টা কোরো না, কারণ তোমার সঙ্গ যদি আমাদের অসহ্য হয়ে ওঠে তাহলে এখানে গাছের কোন অভাব নেই।

তুমি আর কাউকে সঙ্গে আনননি কেন? নাকি জয়ের পুরো গৌরব তুমি একাই লুটতে চেয়েছিলে?

ওদের চিঠিতে ওকে একা আসতে বলার কথা মনে করিয়ে দিয়ে সে আরও বলল, তাছাড়া প্রিন্সেস গতকালই তোমার খোঁজে না আসার জন্যে আমার ওপর খুব খেপেছিল। একটা কিছু না করে আমার আর কোন উপায় ছিল না। তোমার জন্যে সে যে কেন এতটা উতলা হয়ে উঠেছিল তা তুমিই জানো।

লরির মুখটা লজ্জায় ঈষৎ লাল হয়ে ওর সানসেট নামকরণের যথার্থতা প্রমাণ করল।

এই শয়তামটাকে সাথে নিয়ে যাওয়ার তোমার কি কারণ? মাথা হেলিয়ে সামনে ঘোড়ার পিঠে কুঁজো হয়ে বসা লোকটার দিকে ইঙ্গিত করল লরি।

ওকে শেরিফের হাতে তুলে দেব।

তাতে কি লাভ হবে? টেলর ওকে ঠিকই ছেড়ে দেবে।

বাজি ধরে বলা যায় ঠিক তাই সে করবে; কিন্তু এতে হোপের অর্ধেক লোকের মত ওর বিপক্ষে চলে যাবে। এটা সে মোটেও পছন্দ করবে না বলেই আমার বিশ্বাস।

এরফান ওকে গাছে ঝুলিয়ে দেয়ার ভয় দেখানোতেই হোক, বা ওর নিজস্ব বিশেষ কোন কারণেই হোক, শেডিকেও তাড়াতাড়ি শহরে পৌঁছা’নোয় অত্যন্ত উদগ্রীব বলে মনে হলো।

সন্ধ্যার আগেই ওরা হোপে পৌঁছে গেল। ওদের আবির্ভাবে রাস্তায় কৌতূহলী দর্শকের ভিড় জমে গেল। কিছু লোক ওদের পিছুপিছু টেলরের বাড়ি পর্যন্ত গেল। হাজত আর টেলরের বাড়ি দুটোই একসঙ্গে। টেলরকে বাড়িতেই পাওয়া গেল। যাকে বেঁধে আনা হয়েছে তার চেহারা দেখে শেরিফের চোখ দুটো কোটর ছেড়ে বেরিয়ে আসার জোগাড় হলো।

এর মানেটা কি? উদ্ধত সুরে প্রশ্ন করল সে।

অল্প কথায় লরিকে উদ্ধার আর শ্যাডওয়ার্থকে বন্দি করার ঘটনা ব্যাখ্যা করল এরফান। ফোরম্যানের কথা শেষ হতেই তুমুল প্রতিবাদ জানাল শেডি।

সব মিথ্যে কথা। কোন মেয়ের কথা আমি কিছুই জানি না। এর আগে একদিন সেলুনে দেখার আগে জীবনে এদের আমি আর কখনও দেখিনি। সেদিন এদের একজন আমার পিঠে পিস্তল ঠেসে ধরেছিল রি অন্যজন আমাকে ঘুসি মেরে অজ্ঞান করেছিল। আজ বিকেলে আমি ডেজার্ট এজের, ট্রেইল ধরে যাচ্ছিলাম, এই সময়ে এরা দুজন হঠাৎ আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে আমাকে এখানে নিয়ে এসেছে।

তাহলে এটাও নিশ্চয় তোমার নয়? কালো মুখোশটা পকেট থেকে বের করে দেখাল এরফান।

কোনদিন দেখিওনি, নির্বিকার মুখে মিথ্যা বলল সে। এবার টেলরের দিকে ফিরল শেড়ি। আমার বিশ্বাস তুমিই এই শহরের শেরিফ; এরা দুজন কি তোমার ডেপুটি?

অবশ্যই না, জোর দিয়ে বলল সে।

দর্শকদের মধ্যে একটা নড়াচড়ার আভাস দেখা গেল; বার্টকে ভিতরে ঢোকার জন্যে দর্শকরা রাস্তা ছেড়ে দিল। বিশাল লোকটা আউটলর দিকে তাকাল বটে, কিন্তু ওর চাহনিতে শেডিকে চেনার কোন চিহ্নই ধরা পড়ল না।

তাহলে এই হচ্ছে তোমাদের ডাকাত সর্দার, তাই না? বলল সে। এটা ঠিক, ওর চেহারাটা যথেষ্ট কুৎসিত। দর্শকদের কিছু লোক ওর কথায় হেসে উঠল। এরফান তীক্ষ্ণ, চোখে শেডির চেহারা লক্ষ করছি-ওর চোখদুটো রাগে জ্বলে উঠতে দেখল। এই লোকটাই সেদিন কাম এগেইন সেলুনের সেই ঝামেলায় জড়িত ছিল, তাই না? তা ঘটনাটা কি?

এরফান যা বলেছিল সেটারই পুনরাবৃত্তি করল শেরিফ। বার বি র‍্যাঞ্চার এরফানের দিকে ফিরে জিজ্ঞেস করল, ওই চিঠিটা তোমার কাছে আছে?

কাগজটার ওপর একবার চোখ বুলিয়ে দেখল বার্ট। তারপর ওর পরামর্শে বন্দিকে শেরিফের অফিসে নিয়ে ওকে একটা কাগজ আর পেনসিল ধরিয়ে দেয়া হলো। বার্ট চিঠির লেখাগুলো পড়ে গেল, এবং শেডিকে কথাগুলো লিখতে বলা হলোঁলৈখার পরে স্পষ্টই বোঝা গেল যে দুটো লেখায় কোন মিল নেই।

এরফান এগিয়ে গিয়ে চিঠিটা ফেরত নেয়ার জন্যে হাত বাড়িয়ে বলল, ওই চিঠিটা আমার, সুতরাং ওটা আমার কাছেই থাকবে।

আইনত ওটা একটা এভিডেন্স, ত্বাই ওটা শেরিফের ধীছেই থাকবে, বলল বার্ট।

ওর যখন প্রয়োজন হবে সে ওটা চাইলেই ফেরত পাবে। এখন, ওটা আমি ফেরত চাই। ওর স্বরে স্পষ্ট হুমকি।

এক মুহূর্ত ইতস্তত করল বার্ট। মুখটা রাগে লাল হয়ে উঠেছে। কাগজটা এরফানের হাতে না দিয়ে টেবিলের ওপর ছুঁড়ে ফেলল সে।

তোমার ঔদ্ধত্ব দিনদিন বেড়েই চলেছে, গ্রীন, হিসহিসিয়ে বলল সে, একটা মোকাবিলার দিন ক্রমেই ঘনিয়ে আসছে।

টেবিল থেকে কাগজটা তুলে নিয়ে ওটা আসল কিনা নিশ্চিত হয়ে ভাজ করে পকেটে ভরে রাখল এরফান। নিশ্চয়, যেকোন সময়ে, হেসে জবাব দিল। এবং যদি সাহসে কুলায় তবে তুমি তোমার পাসিকে জড়ো করো, আমি নিজে লীড করে ওদের আড্ডায় তোমাদের পৌঁছে দেব।

আমার যদি তোমার সাহায্যের প্রয়োজন হয় তুমি জানবে, বলল বার্ট। যাক, আমি কাল সকালেই মিস মাস্টারসনের সাথে দেখা করে জানব তোমার গল্প কতটা সত্যি।…এই লোকের ব্যাপারে আপাতত তুমি চার্জ নাও, টেলর। ওর কি হবে সেটা আমি পরে তোমাকে জানাব। লেজি এমের কোন লোকের কথায় এখন আমি আর বিশ্বাস করি না।

হ্যাঁ, যখন থেকে তোমার স্পাইরা ওখান থেকে দেশান্তরে গেছে তার পর থেকেই, পাল্টা খোঁচা দিতে ছাড়ল না এরফান।

ওর মন্তব্যে বার্টকে একটু চমকে উঠতে দেখে মনে মনে বেশ আনন্দ পেল এরফান। ওখান থেকে বেরিয়ে নিজের ঘোড়ার পিঠে উঠল সে। শেরিফকে একটা বেকায়দা অবস্থায় ফেলতে পেরেও ওর মন কিছুটা হালকা হয়েছে।

*

বাঙ্কহাউস থেকে একটা সমস্বরে উল্লসিত আওয়াজ ফিলকে বাইরে বারান্দায় এনে হাজির করল। ওখানে দাঁড়িয়েই সে লরিকে সাথে নিয়ে বিজয়ী ফোরম্যানকে উঠানে প্রবেশ করতে দেখল। অল্পক্ষণ পরই বাঙ্কহাউস থেকে হাসির শব্দ আসতে শুনে ফিলের কৌতূহল চরমে উঠলেও ড্যানিয়েল না আসা পর্যন্ত পুরো সংবাদটা শোনার জন্যে ওকে অপেক্ষা করতে হলো। কিন্তু সব শোনার পরেও সে বুঝে উঠতে পারছে না জেমস সম্পর্কে ও কি ভাবকে। মাত্র একজন লোকের পক্ষে কি এভাবে ডাকাতদের ডেরায় ঢুকে অক্ষত অবস্থায় বেরিয়ে আসা সম্ভব। শুধু তাই নয়, ওদের সর্দারকে ধরে নিয়ে আসা-একেবারেই অসম্ভব ব্যাপার। শেষে বিরক্ত হয়ে চিন্তাটা বাদ দিল সে।

পরদিন সকালে লরির ডাকে অদ্ভুত একটা লজ্জা-জড়িত হাসি মুখে সাড়া দিল ফিল। মেয়েটা রাইডে যাবে কিনা জানতে এসেছে সে। লরি অক্ষত অবস্থায় ফিরে আসায় সে যে খুব খুশি হয়েছে বলার পর সে জানাল আজ আর বেড়াতে বেরোবে না ও।

মেয়েটাকে তাদের অ্যাডভেঞ্চারের গল্প শোনাবার জন্যে অস্থির হয়ে আছে লরি। আমরা আজ দক্ষিণে বেড়াতে যেতে পারি, প্রস্তাব দিল সে।

না, আজ আমার কাছে একজন অতিথি আসার কথা।

জবাব শুনে লরির মুখটা চুপসে গেল।

মর্নিং, ফিল, ওই বাচ্চাটা কি চায়? ঘোড়ার পিঠ থেকে নামতে নামতে বলল বার্ট।

মেয়েটার কপালে সামান্য ভাঁজ পড়ল। বার্টের গলার সুর বা সম্বোধন, কোনটাই ওর পছন্দ হয়নি। ওর মানসিক তুলনামূলক বিচারে তরুণ লরির থেকে বয়স্ক কঠিন বার্টের স্থান অনেক নিচে।

ও আমাকে জিজ্ঞেস করতে এসেছিল আমি আজ বাইরে যাব কিনা; আজকাল বাইরে যতে হলে আমাকে একজন সঙ্গী নিয়ে যেতে হয়-এই এলাকায় এখন মেদের জন্যেও একা বাইরে যাওয়া আর নিরাপদ নয়। একটু কড়া সুরেই জবাব দল ফিল। এর পর ব্ল্যাক মাস্কদের সাথে ঝামেলা হওয়ার কথা জানাল। প আরও বলল, তাহলে বুঝতেই পারছ, লরির ভাষায়, ঝামেলা যখন আসে, দল বেঁধেই আসে।

কাউবয়ের সাথে ওকে প্রথম নামে ডাকার মত ঘনিষ্ঠতা হতে দেখে বার্টের ভুরতে একটু ভাঁজ পড়ল। এই সম্ভাবনাটার কথা তার একবারও মাথায় আসেনি।

তাহলে গল্পের ওই অংশটা অন্তত ঠিক, মন্তব্য করল সে। ও, ভাল কথা, শোনো ফিল, এভাবে তোমার সাধারণ কাউবয়ের সাথে এদিক-ওদিক ঘুরে বেড়ানো আমি পছন্দ করি না।

তীব্র প্রতিবাদে ফিলের চোখদুটো জ্বলে উঠল। রাগের সাথে সে বলল, আমার যেমন ইচ্ছা তা-ই আমি করব। আমাকে নির্দেশ দেয়া বা আমার কোন সমালোচনা করার কোন অধিকার তোমার নেই।

আমার বিশ্বাস তা আমার আছে, বলল সে। তুমি জানো আমরা বিয়ে করতে যাচ্ছি।

সেটা আমি জানি না, এবং অন্তত বর্তমানে, আমার তেমন কোন ইচ্ছে নেই, পাল্টা জবাব দিল ফিল।

যদিও স্পষ্ট বুঝতে পারছে ভুল পদ্ধতিতে এগিয়েছে সে; তবু সেটা শুধরে নেয়ার চেষ্টায় বেড়াতে যাওয়ার প্রস্তাব দিল বার্ট। কিন্তু ফিল সরাসরি তা নাকচ করে দিল। খেপা একটা রাগে জ্বলতে জ্বলতে লেজি এম ত্যাগ করে বার বির ট্রেইল ধরল সে।

বার বিতে যাওয়ার পথ খোলা রেঞ্জ পার হয়ে সোজা উত্তর-পশ্চিমে এগিয়েছে; তারপর ঢাল বেয়ে কিছুটা নিচে নেমে জংলা কিছু ভাঙাচোরা অঞ্চলে ঢুকেছে। ওই এলাকাটা সিঙ্গ নামেই বেশি পরিচিত। ছোট ছোট ঝোঁপের জঙ্গল আর ক্যানিয়নের কাঁধগুলো কখনও সমতল জমির চেয়ে উঁচুতে ওঠেনি বলেই এর নাম সিঙ্ক। একটা ছোট ক্যানিয়নের মুখ পার হওয়ার সময়ে বার্ট লক্ষ করল বালুর ওপর একটা ঘোড়ার ট্র্যাক দেখা যাচ্ছে। ট্র্যাকটা নতুন নয়, ওটা হয়ত একটু আড়ালে থাকাতেই এতদিন কারও চোখে পড়েনি। কৌতূহলী হয়ে ওটা অনুসরণ করল সে। ঝোঁপের ভিতর দিয়ে পথ করে নিয়ে ওকে এগোতে হচ্ছে।

দুশো গজ দূরে একটা ছোট ক্লিফের ধারে ঘন ঝোঁপের ভিতরে ঢুকেছে ওটা। র‍্যাঞ্চার ঘুরতে যাচ্ছে, এই সময়ে ঝোঁপের পাতার ভিতর থেকে একটা চকচকে ঝিলিক ওর নজর আকর্ষণ করল। নিচে নেমে সে পাতা সরিয়ে একটা। ছোট খাজ থেকে ওটা বের করে আনল। দেখল কিছু কাপড় আর একটা সমব্রেরো আছে ওখানে। শার্টের চকচকে বোতামটাই ওর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। একটা একটা করে সবগুলোই খুঁটিয়ে পরীক্ষা করে দেখল সে। ওই হ্যাটের ব্যান্ডে কালি দিয়ে লেখা রয়েছে দুটো অক্ষর-জে, এম। শার্টের পকেটে একটা খালি খাম পাওয়া গেল যেটার ওপর ঠিকানা লেখা আছে, জ্যাক মাস্টারসন, লেজি এম র‍্যাঞ্চ।

এই নতুন আবিষ্কারে আশ্চর্য হয়ে একটা শিস দিয়ে উঠল বার্ট। এই জামা কাপড়গুলো এখানে কিভাবে এলো? শেষ যেদিন সে জ্যাককে দেখেছে সেদিন এইসব জামাই তার পরনে ছিল। কিন্তু এগুলো এই নিভৃত স্থানে এলো কিভাবে? লাশটা কোথায়? এখন আর তার মনে কোন সন্দেহ নেই যে জ্যাক মৃত। পুরো ক্যানিয়নটা সে তন্নতন্ন করে খুঁজেও লাশের কোন হদিস দেখতে পেল না।

আমার আগে এখানে কেবল একটা লোকই এসেছে, আপন মনেই মন্তব্য করল সে। বালুতে আর কোন ছাপ ওখানে নেই।

সবদিক বিচার করে সে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছল যে খুনী আর কোন জায়গায় ওকে হত্যা করে কবর দিয়ে ওর জামা-কাপড় এই জায়গায় ফেলে গেছে। কেবল একটা ঘোড়ার পায়ের ছাপই ওখানে দেখা যাচ্ছে; এবং সেই ঘোড়াটাই আবার ফিরে গেছে। কাপড়গুলো এমন জায়গায় ফেলে গেছে, কারও এগুলো খুঁজে পাওয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। ওগুলো যেখানে পেয়েছিল সেখানেই আবার রেখে গভীর চিন্তায় মগ্ন হয়ে সে আবার নিজের র‍্যাঞ্চের পথ ধরল। অল্পক্ষণের মধ্যেই তার ঠোঁটে সাফল্যের একটা ক্রুর হাসি ফুটে উঠল।

এর চেয়ে ভাল আর হতে পারত না। আমার বিশ্বাস, তোমাকে আমি জীবিত অবস্থায় যেমন ব্যবহার করেছি, নিহতও তেমনি ব্যবহার করতে পারব, মিস্টার মাস্টারসন। হাসল সে।

সেই রাতে ডোভারের সাথে লম্বা সময় ধরে আলাপ করল র‍্যাঞ্চার। ডোভার যখন আলাপ সেরে ফিরল তখন ফোরম্যানের তিক্ত চেহারাতেও হাসি দেখা গেল, কিন্তু হাসিটা কুৎসিত।

১২.

গত দুদিনে আর বেড়াতে বেরোয়নি ফিল। যদিও লরির সাথে বেড়াতে বের হওয়ার জন্যে ওর মনটা ছটফট করছিল তবু কেমন যেন একটা অহেতুক লজ্জায় সে ওর মুখোমুখি হতে পারেনি। আজ তৃতীয় দিন লরির সাথে দক্ষিণে রওনা হলো সে। লজ্জিত একটা ভাব যেন ফিলকে আরও মোহনীয় করে তুলেছে। পাশাপাশি চলতে চলতে মেয়েটা মনোযোগ দিয়ে জেমস ওকে কি উপায়ে সিংহের গুহা থেকে উদ্ধার করল সেই গল্প শুনছে। কিন্তু ফোরম্যানের প্রশংসা ওর মনকে মোটেও প্রভাবিত করল না।

তোমরা যে পরস্পরের ঘনিষ্ঠ বন্ধু তা আমার জানা ছিল না, মন্তব্য করল ফিল।

লোকটা আমার বন্ধু মোটেও নয়, মিথ্যা বলল লরি, তবে যে নিজের জীবন বিপন্ন করে আমার জীবন বাঁচিয়েছে, তার প্রতি কি আমার কৃতজ্ঞ থাকা। উচিত নয়?

মিস্টার বার্ট সম্পর্কে তোমার কি ধারণা? প্রশ্ন করল ফিল।

কথার জালে ধরা দিল না লরি। ওর সম্পর্কে আমি বিশেষ কিছুই জানি, জবাব দিল সে, তবে এটা ঠিক যেবার বির হয়ে আমি কখনও রাইড করব না।

লোকটাকে যাচ্ছেতাই ভাষায় গালি দিলেও ফিলের মনে ওর কথাটা এত গভীর প্রভাব ফেলত না। ইদানীং ও লক্ষ করেছে যে বার্ট অত্যন্ত প্রভাবশালী লোক হলেও কারও মুখে ওর কোন প্রশংসা সে কখনও শোনেনি। কেউ ওর সমালোচনা করলেও তা রেখেঢেকে করে। কিছুক্ষণ চুপ করে থাকার পর সে আবার প্রশ্ন করল, তাহলে জেমস যে আউটল তা তোমার মনে হয় না?

না, আমি তা হলপ করে বলতে পারব না, তবে এটুকু বলতে পারি যে ব্ল্যাক মাস্কের সাথে সে জড়িত নয়, জবাব দিল লরি।

একটা সরু খাজের ভিতর দিয়ে এগোচ্ছিল ওরা। দুপাশের পাথুরে দেয়ালে প্রচুর ছোটছোট ঝোঁপ আর ক্যাকটাস গজিয়েছে। দুএকটা বড় গাছও জন্মেছে মাঝে। ওগুলোর ডালপালা লম্বা হয়ে ছড়িয়ে ছোট্ট ক্যানিয়ন কিছু জায়গায় ঢেকে ফেলেছে। পাতার ফাঁক দিয়ে রোদ এসে ক্যানিয়নের গায়ে বিভিন্ন আকারের ছায়া ফেলছে। বাতাসে পাতা নড়লেই ছায়া আকার বদলাচ্ছে।

হঠাৎ লাগাম টেনে ঘোড়া থামিয়ে ফিল বলে উঠল, ওহ, কী সুন্দর দৃশ্য!

ওর আঙুল অনুসরণ করে লরি দেখল ঢালের ওপর কয়েক সারি ওকাটিয়া (Occatilla) ক্যাকটাস গাছে অপূর্ব সুন্দর ফুল ফুটে রয়েছে। ফিল কিছু বুঝে ওঠার আগেই লরি তার ঘোড়ার পিঠ থেকে নেমে ঢাল বেয়ে উঠতে শুরু করল। মেয়েটাও নেমে একটা গাছের গুড়ির ওপর বসল। অল্পক্ষণের মধ্যেই সে কয়েকটা রক্ত-লাল ফুল হাতে ফিরে এলো। ফিলের সামনে এসে থেমে সে আনুষ্ঠানিক ভাবে বাম হাতে মাথা থেকে হ্যাট নামিয়ে ঝুঁকে কুর্নিশ করে ফুলগুলো ওর দিকে বাড়িয়ে ধরল। হেসে ফুলগুলো নিয়ে সে লরিকে ধন্যবাদ জানাল। লাল ফুলের রক্তের ছোয়া কিছুটা যেন ওর গালেও লাগল।

এই সময়ে একজন রাইডার বাঁক ঘুরে এগিয়ে আসতে গিয়েও ওদের দেখে থেমে দাড়াল। কিন্তু পরক্ষণেই চিনতে পেরে আবার এগিয়ে এলো।

অসময়ে বাধ সাধার জন্যে দুঃখিত, বলল সে। ওর গলার স্বর আর বলার ভঙ্গিটা অপমানজনক।

কোন জবাব না পেয়ে সে ধীর গতিতে ওদের পেরিয়ে আবার এগিয়ে গেল। পরবর্তী বাঁক নিয়ে অদৃশ্য হওয়ার আগে সে পিছন ফিরে চেয়ে অশ্লীল ইঙ্গিতে হাত নাড়ল।

ফিল তার সঙ্গীর দিকে চোরা চোখে চেয়ে দেখল লরি জুলন্ত দৃষ্টিতে ওই বাকের দিকে চেয়ে আছে। ওর চোয়াল দুটো শক্ত হয়ে উঠেছে।

ওই লোকটা কে? প্রায় রুক্ষ স্বরে প্রশ্ন করল সে।

বুল ডেভিস, জবাব দিল সে। লোকটা আমাদের না দেখলেই ভাল হত। ফোরম্যান ওকে র‍্যাঞ্চ থেকে তাড়িয়ে দেয়ায় সে লেজি এমের ওপর খেপে আছে। বিভিন্ন দুর্নাম ছড়াবে ও।

আমাদের হয়ত এখন ফিরতি পথ ধরাই ভাল, বলল লরি।

ফিরতি পথে ওদের মধ্যে খুব কমই কথা হলো। কাউবয় বেশ বেগে ঘোড়া ছোটাচ্ছে, যেন র‍্যাঞ্চে পৌঁছা’নোর জন্যে ওর, বিশেষ কোন তাড়া আছে। ওর চেহারা থেকে স্বাভাবিক হালকা ভাবটা বিদায় নিয়ে মুখটা এখন দৃঢ় সংকল্পে কঠিন হয়ে উঠেছে। মেয়েটা পরিবেশ হালকা করার চেষ্টা করল।

তোমাকে দেখে মনে হচ্ছে যেন তুমি কাউকে খুন করতে চলেছ, বলল মেয়েটা।

ঝট করে ঘুরে তাকাল লরি। ফিল দেখল,ওর গাল একটু লাল হয়ে উঠল। তারপরে সে হাসল।

হ্যাঁ, তাই আমি করব যদি ফিরে দেখি ড্যানিয়েল এখনও সাপার তৈরি করেনি।

ফিল আর কোন কথা বলল না। জবাব, শুনে ওর মনের সন্দেহটা কেবল আরও গভীর হলো। কেমন যেন একটা ভয় আর অস্বস্তি বোধ করছে সে। র‍্যাঞ্চে সরাসরি ঘোড়া দুটোকে, করালে ভরে একটা ফ্রেশ ঘোড়া নিয়ে তৎক্ষণাৎ হোপের ট্রেইল ধরে রওনা হয়ে গেল লরি। খাওয়ার জন্যেও অপেক্ষা না করে এমন অদ্ভুত আচরণ করায় ফিলের সারাটা বিকেল অস্থিরভাবে ট্রেইলের দিকে চেয়ে কাটল। এরফান যখন অন্যান্য কাউবয়দের সাথে ফিরল, তাকে একপাশে ডেকে নিয়ে বিকেলের পুরো ঘটনা জানাল ও।

লরি লোকটাকে চেনে বলেই মনে হলো-ঘৃণাও করে, অথচ সে আমার কাছে ওর নাম জানতে চেয়েছিল, বলল সে। অবশ্যই ওই লোকের ব্যবহার অত্যন্ত রুক্ষ ছিল, কিন্তু আমার ধারণা এর পিছনে অন্য কোন কারণও আছে।

আমার মনে হচ্ছে তোমার কথাই ঠিক, মিস মাস্টারসন। কোন বিশেষ কারণে, ওই লোককেই খুঁজতে গেছে লরি। ডেভিস লোকটা কাপুরুষ হলেও শুনেছি পিস্তলে ওঁর হাত খুব চালু।

ওহ, জলদি করো, হয়ত এখনও চেষ্টা করলে তুমি ওদের দেখা হওয়া ঠেকাতে পারবে, অনুনয় জানাল সে।

আমি যদি তা না পারি, আর লরির যদি কিছু হয়, তাহলে বুলকে আর কখনও সূর্যোদয় দেখতে হবে না, প্রতিজ্ঞা করল এরফান। সোজা করালে ঢুকে একটা ঘোড়ায় জিন চাপিয়ে ঊর্ধ্বশ্বাসে শহরের দিকে ছুটল ও। এরফান জানে। শহরে পৌঁছা’র আগে লরিকে ধরতে পারার কোন সম্ভাবনাই ওর নেই। তবে ওদের দুজনের হয়ত এখনও দেখা না-ও হয়ে থাকতে পারে।

কাম এগেইন সেলুন সান্ধ্যকালীন সমাবেশের জন্যে ধীরে ধীরে ভরে উঠছে। তেলতেলে চেহারার মালিক খুশি মনে নিজের হাত দুটো ঘষছে। আজকের রাতটা বেশ লাভজনক হবে বলেই মনে হচ্ছে।

ভাবছি বার্টকে আজ এত চিন্তিত দেখাচ্ছে কেন, আপন মনে বিড়বিড় করল সে।

আসলে ব্ল্যাক বার্টকে কেন লোকে ওই নাম দিয়েছে তা ওর চেহারাই বলে দেয়। মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সে নিচু স্বরে বুলের সাথে কথা বলছে। বার্টের চেহারা দেখেই বোঝা যাচ্ছে কথার বিষয়বস্তু তার কাছে মোটেও ভাল ঠেকছে না। আসলে বুল ডেভিস আজ তার সাথে ফিলের দেখা হওয়ার কথা মিথ্যে রং মিশিয়ে শোনাচ্ছে। সে মানুষকে দুঃখ দেয়ার মত আনন্দ আর কিছুতে পায় না। তার মিথ্যে বানানো গল্প বার্টকে রাগে অন্ধ করে তুলল।

যে, ওই কুকুরের বাচ্চা কাউবয়টাকে শেষ করতে পারবে তাকে আমি পাঁচশো ডলার পুরস্কার দেব, ঘোষণা করল সে। এই কাজটা আমি খুশি মনে নিজেই করতাম, কিন্তু তাতে মেয়েটার চোখে আমি ঘূণ্য হয়ে যাব।

মাথা ঝাঁকিয়ে সম্মতি জানাল ডেভিস। মানুষ হত্যা ওর কাছে নগণ্য একটা কাজ। এর আগেও সে এর চেয়ে অনেক কম টাকার জন্যেও বহু খুন, করেছে। ঠিক ওই মুহূর্তেই লরি সেলুনে ঢুকল।

তোমাকে আর কষ্ট করে ওকে খুঁজতে যেতে হবে না, বলল বার্ট। লোকটা নিজেই সেধে বাঘের খাঁচায় ঢুকেছে, ফিসফিস করে বলে সেলুন ছেড়ে বেরিয়ে গেল র‍্যাঞ্চার। এইমাত্র যাকে সে ভাড়া করেছে সে-ই বাকি কাজ শেষ করবে-ঘটনার ঘটার সময়ে সে ওখানে হাজির থাকতে চায় না।

লরির তীক্ষ্ণ চোখে নড়াচড়াটা ঠিকই ধরা পড়েছে। সে বুঝল বার্টের কাছে খবরটা পৌঁছে দিতে ডেভিস মোটেও দেরি করেনি। কামরার চারপাশে চেয়ে টিমকে দেখতে পেয়ে সে নড় করল। একটা টেবিলে বসে তার দুই কর্মচারী আর স্টোরকীপার কাভানার সাথে পোকার খেলছে টিম।

আবার ডেভিসের দিকে চোখ ফেরাল। সে এখন তিনজন সঙ্গীর সাথে কথা বলছে। আরে মেয়েরা সব একই রকম; ওই মাস্টারসনের মেয়ের কথাই ধরো, আজ বিকেলেই আমি দেখলাম সে দক্ষিণের একটা নিভৃত জায়গায় বসে। চুমোচুমি করছে। সেটাও নেহাত সাধারণ একজন মাসে চল্লিশ ডলার বেতনের কাউবয়ের সাথে!

বিজয় উল্লাসে সে তার শ্রোতাদের দিকে চাইল। ওদের কয়েকজনকে খিকখিক করে হাসতে শোনা গেল। বাকি যাদের কানে কথাটা পৌঁছেছে তারা বুঝল বুলের কথার পিছনে বিশেষ কোন উদ্দেশ্য আছে। ওরা খেলা থামিয়ে ঘটনা কোনদিকে গড়ায় লক্ষ করছে। সবার চোখ এখন দরজার কাছে আড়ষ্ট হয়ে দাঁড়ানো লেজি এম কাউবয়ের ওপর।

ডেভিস!

শব্দটা লরি বস্টনের এঁটে বসা ঠোঁটের ফাঁক দিয়ে বুলেটের মতই বের হলো। এর পরেই শোনা গেল মেঝের ওপর চেয়ার আর বুট ঘষার শব্দ। যারা ওদের দুজনের মাঝে গুলির আওতায় ছিল তারা তড়িঘড়ি সরে গেল। রাগের এই প্রচণ্ড বহিপ্রকাশ ওর সম্পূর্ণ আচরণ বিরুদ্ধ; সে নিজেও এ-সম্পর্কে সচেতন নয়। লরি কেবল জানে ওর সামনে একটা সাক্ষাৎ শয়তান দাঁড়িয়ে আছে, যাকে তার শেষ করতেই হবে।

লরির ডান হাত ওর পাশে ঝুলছে-আঙুলগুলো ছড়ানো; ড্র করার জন্যে প্রস্তুত।

ডেভিসের নিষ্ঠুর চেহারায় কেবল একটা ভাবই প্রকাশ পাচ্ছে; এবং সেটা হচ্ছে সাফল্যের বিষাক্ত একটা আনন্দ। ঠাণ্ডা মাথায় খুন করার একটা পরিবেশ সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছে সে।

অবজ্ঞার সাথে হেসে সে জবাব দিল, আমার নাম। আরে, এর কথাই তো আমি এতক্ষণ বলছিলাম-মিস মাস্টারসনের নয়া নাগর। দেখো লজ্জায়, কেমন লাল হয়ে উঠেছে ও।

সত্যিই ওর মুখটা লাল হয়ে উঠেছে, কিন্তু ওর গলার স্বরটা বরফ শীতল এবং চামড়া ভেদ করে কেটে বসার মত তীক্ষ্ণ।

বুল ডেভিস, তুমি একটা মিথ্যুক এবং কাপুরুষ, দৃঢ় স্বরে বলল লরি। বাড়তি অপমানে নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারায়নি সে।

ওই কথার কেবল একটা জবাবই হয়। কথার চাবুকের আঘাতে পিস্তল বের করার জন্যে ছোবল দিল বুল গর্জে উঠল, শয়তান কুকুর ছানা!

দুটো পিস্তলের মুখে একই সাথে আগুনের ঝিলিক দেখা দিল। বাম কাঁধে গুলি খেয়ে ভারী বুলেটের ধাক্কায় আধপাক ঘুরে গেল লরি। ডেভিস একটা গালি দিয়ে একটু দুলে কাত হয়ে পড়ে গেল। পিস্তলটা সশব্দে ওর পাশেই। পড়ল। গুলিতে ওর বুক ফুটো হয়ে গেছে। লোকটা এখনও মরেনি দেখে টলতে টলতে ওর দিকে এগিয়ে গেল লরি। পিস্তলটা লাথি দিয়ে সরিয়ে দিয়ে পাশে হাঁটু গেড়ে বসল।

বুল, বলল সে। একটা কথা আমি তোমাকে জানাতে চাই।

ফিসফিস করে কয়েকটা কথা বলল সে। এবং মরণাপন্ন বুল বিস্ফারিত চোখে ওর দিকে তাকাল। হেল! ফুঁপিয়ে উঠল সে, তুমি- তার গলা থেকে কেবল একটা ঘড়ঘড় শব্দ বের হলো; তারপরেই সে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ল।

কষ্ট করে কোনমতে নিজের পায়ে উঠে দাড়াল লরি, কিন্তু তার পরেই একটা খালি চেয়ারে ধপাস করে বসে পড়ল। অসুস্থ বোধ করছে সে, মাথাটাও কেমন ঝিমঝিম করছে। কেউ একজন এগিয়ে এলো। ওর ক্ষত থেকে রক্ত ঝরছে। টিম আর তার লোক লাফিয়ে এগিয়ে ওর ক্ষত থেকে রক্ত ঝরা বন্ধ করায় সচেষ্ট হলো। যে নীরবতা নেমে এসেছিল সেটা দূর হয়ে বার আবার সরগরম হলো; লড়াইয়ের দর্শকরা সবাই ওই সম্পর্কেই আলোচনা করছে। শেরিফ ভিড় ঠেলে এগিয়ে এলো।

কিছু লোক সরে দাঁড়ানোয় মৃত লোকটার চেহারা দেখে চমকে উঠল শেরিফ টেলর। আরে! এটা যে দেখছি ডেভিস! বিস্মিত স্বরে বলল সে। আমি ভেবেছিলাম-ওরা বলল আর কেউ।

যে-কোন নিরপেক্ষ দর্শকই ভাববে লোকটা খুব নিরাশ হয়েছে। অনেক দর্শকই আগ্রহের সাথে ওখানে কি ঘটেছে তা জানাল এবং অফিসারের খুদে চোখ দুৰ্বত্তের মত অশুভ দৃষ্টিতে সন্তুষ্টি নিয়ে আহত কাউবয়কে দেখল।

ভাল, তুমি ঝামেলা চাইছিলে, তাই পেয়েছ, বলল সে। আমি আঁচ করছি তোমাকে এখন জেলে পচতে হবে।

আবার আঁচ করো, হয়ত এবার তুমি ঠিক আঁচ পাবে, লেজি এম ফোরম্যানের ভারি কণ্ঠস্বর শোনা গেল।

সবার অজান্তে কখন যে সে ভিতরে ঢুকেছে তা কেউ খেয়াল করেনি। ঝট করে ঘুরে দাড়িয়ে পিস্তলের দিকে হাত বাড়াল শেরিফ।

ওটার কথা ভুলেও ভেবো না, নবাগত লোকটা শান্ত স্বরে বলল, তোমার যেমন বাঁচার যোগ্যতা নেই, তেমনি মরারও যোগ্য তুমি নও। একটা ব্যাঙ মেরে হাত গন্ধ করতে চাই না আমি।

টেলরের চেহারা একেবারে হলুদ হয়ে গেল। ওর ভঙ্গিটা ছিল একটা ভাঁওতা, এবং সে সচেতন যে দর্শকরাও তা জানে। ওই ঠাণ্ডা চেহারার লোকটার বিরুদ্ধে লড়তে নামার গেন ইচ্ছাই তার ছিল না। বার বি, মালিকের ওখানে হাজির হওয়ায় সে বুকে কিছুটা বল পেল, এবং তার ভেঙে চুরমার হওয়া সম্মান কিছুটা ফিরে পাওয়ার চেষ্টায় সে বলল, এই শহরের শেরিফ হিসেবে।

তুমি একটা করুণ দৃষ্টান্ত, বাধা দিয়ে ওর অসমাপ্ত বাক্যটা শেষ করল এরফান। সেটা তোমার বলার কোন প্রয়োজন নেই। এখন আমার কথা শোনো, শেরিফ, এখানে বিশিষ্ট নাগরিক মিস্টার বার্ট হাজির আছে এবং সে এই ঝামেলা সম্পর্কে কিছুই জানে না। ধরো ওর মতামতটাই আমরা জিজ্ঞেস করি।

কনুইয়ের গুঁতোয় জায়গা করে নিয়ে বুলের লাশ দেখে ক্ষণিকের জন্যে তার যা চেহারা হয়েছিল তা এরফানের নজর এড়ায়নি। লরির দিকে কেমন বিষাক্ত দৃষ্টিতে সে তাকিয়েছিল সেটাও ও দেখেছে।

কিন্তু মুহূর্তে নিজেকে সামলে নিল বার্ট। শেরিফের কাছ থেকে নির্বিকার চেহারায় ঘটনার পুরো বিবরণ শোনার পর সে সাথে সাথেই রায় দিল, ওর মত খটাশের, মরাই উচিত। এই লোক এটা না করলে কাজটা আমি নিজেই করতাম। যদিও সে মুখে কথাটা বলল, বার্ট ভাল করেই টের পাচ্ছে জেমস কেমন চতুর কায়দায় লোকটাকে কোণঠাসা করেছে। যে ওই ফিলের নামে। কুৎসা রটিয়েছে তার পক্ষ নেয়া কোন মতেই সম্ভব নয়। সে জোর দিয়ে বলল, এখানে যদি এমন কেউ থাকে যে মনে করে বুল মিথ্যে বলেনি; সে এগিয়ে আসুক।

ওর আমন্ত্রণে কেউ সাড়া দিল না দেখে বার্ট শেরিফকে জিজ্ঞেস করল, তুমি বলছ লড়াইয়ে দুজনেই সমান সুযোগ পেয়েছে?

ঘটনার সময়ে আমি উপস্থিত ছিলাম না, কিন্তু আমাকে তাই বলা হয়েছে, স্বীকার করল টেলর।

তাহলে আমাদের আর করার কিছু নেই, বলল র‍্যাঞ্চার। বীতশ্রদ্ধ ভাবে এরফানকে বলল, তুমি তোমার লোককে নিয়ে যেতে পারো, কিন্তু ওকে সাবধান থাকতে বোলা, পরেরবার হয়ত ওর কপাল এত ভাল নাও হতে

আমার বিশ্বাস লেজি এম নিজেরটা নিজেই সামলাতে পারবে, জবাব দিল ফোরম্যান।

টিম এবং তার দুই কর্মচারীর সহযোগিতায় লরিকে র‍্যাঞ্চে নিয়ে এলো এরফান। ওর ফেরার সাড়া পেয়ে ফিল নিজের সম্ভ্রম বিসর্জন দিয়ে ওদের দিকে দৌড়ে ছুটে গেল। দুজন রাইডার লরিকে দুপাশ থেকে ধরে নিয়ে আসছে দেখে ওর বুকের ভিতরটা মোচড় দিয়ে উঠল।

কি হয়েছে? উদ্বিগ্ন স্বরে প্রশ্ন করল ফিল!

বস্টনের সাথে বুলের সংঘর্ষ হয়েছিল তাতে কাঁধে সামান্য চোট পেয়েছে সে-মারাত্মক কিছু নয়, জবাব দিল রাইডারদের একজন।

আর ডেভিস?

মরেছে, সংক্ষিপ্ত জবাব এলো।

মেয়েটা শিউরে উঠল; কিন্তু মার কোন প্রশ্ন হল মা লরি একটা লোককে হত্যা করেছে। বস্টনকে র‍্যাঞ্চহউসে বয়ে নিয়ে যাওয়া হলো এবং মাস্টারসনের খালি বিছানাতেই ওকে শোয়ানো হলো। ফিল বাখ্যা দিল যে ড্যানিয়েলের বউ আর সে, দুজনে মিলে র‍্যাঞ্চহাউসেই তারির উপযুক্ত না করতে পারবে লরি বেশ দুর্বল আর অত্যন্ত কুষ্টের মধ্যে থাকতে ও দেখাতে, চাইছে যেন তার কিছুই হয়নি। কিন্তু কষ্টের মধ্যে থাকলেও তাকে যেটা সবচেয়ে বেশি ব্যথা দিচ্ছে সেটা হচ্ছে ওর প্রতি ফিলের ঠাণ্ডা একটা দূরত্বের ভাব।

তোমাকে এই ঝামেলার মধ্যে ফেলার জন্যে আমি সত্যিই খুব দুঃখিত, বলল লরি। তুমি বাঙ্কহাউসের বয়েজদের ওপর আমার দেখাশোনার ভার ছেড়ে দিলেই পারতে।

মেয়েটা মাথা নাড়ল; তারপর প্রশ্ন করল, ওহ, লরি, তুমি এই কাজ কেন করতে গেলে? সে-ও তো একজন মানুষ?

মেয়েটা ওর ফেকাসে চেহারাটা লাল হয়ে উঠতে দেখল, এবং ওর ঠোঁট জোড়াও শক্ত হয়ে এঁটে বসল।

ডেভিসের মত কেউ মানুষ বলে গণ্য হওয়ার যোগ্য নয়, সে একটা ব্যাটল স্নেকের চেয়েও নীচ, ধীর স্বরে বলল সে। ওই বুল সম্পর্কে কিছু জানলে তুমি ওই কথা বলতে না। সে আর তার কিছু সঙ্গী একবার একজন প্রৌঢ় লোককে নির্দোষ জেনেও ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করেছিল। ডেভিস নিজে ওর গলায় ফাঁস পরিয়েছিল। এটা পুরোপুরি সত্যি ঘটনা।

কিন্তু তুমি ওকে সাজা দিতে গেলে কেন, এর জন্যে আইনই তো রয়েছে, প্রতিবাদ করল ফিল।

আমি যে ঘটনা তোমাকে বললাম, সেটা দশ বছর আগে ঘটেছিল; আর আইন এদেশে খুব ধীর গতিতে চলে, একটু থেমে সে আবার বলল, প্রয়োজন হলে আমি আবারও তাই করব।

মেয়েটা জানে লরির কথাই সত্যি, কিন্তু এটা ঠিক মেনে নিতে পারছে না। লরি ছাড়া আর কেউ এটা করলে এই হত্যা ওকে এত বিচলিত করত না, কিন্তু এটাও সে স্বীকার করে নিতে পারছে না; এমনকি নিজের কাছেও না।

পরদিন সকালে শহরে যাওয়ার পরে গোলাগুলির পুরো ঘটনা জানতে পারল। হোপে, পৌঁছে কাভানার দোকানের সামনে নেমেই সে বাটের মুখোমুখি পড়ে গেল। ওকে দেখামাত্রই বার্টের মুখ গম্ভীর হয়ে উঠল।

দেখলে ফিল, বলল সে। এখন নিশ্চয় তুমি স্বীকার করবে যে আমি ঠিকই বলেছিলাম? একটা কর্মচারীর সাথে রাইড করে বেড়াবার ফলাফল কি হলো দেখলে? একজন মরল আরেকজন আহত হয়েছে।

কিন্তু আমাদের বেড়ানোর সাথে এর কোন সম্পর্ক নেই, ফিল প্রতিবাদ করল।

কিন্তু ওর কারণেই এইসব ঘটেছে, রাগের সাথে বলল বার্ট। ডেভিস কাম এগেইন সেলুনে এসে ফলাও করে বলছিল সে নাকি তোমাদের দুজনকে স্নেক কূলিতে জড়াজড়ি করে চুমো খেতে দেখে এসেছে। বস্টন ওকে মিথ্যেবাদী বলায় গোলাগুলি হয়েছে।

ফিলের বুকটা ধড়াস করে উঠল; তাহলে লরি তার সুনাম রক্ষা করার জন্যে লড়েছে। সে আসলে ঠাণ্ডা মাথার খুনী নয়!

ওখানে অনেক দেরিতে না পৌঁছলে ওই কুকুরটাকে আমি নিজেই শেষ করতাম, বলে চলল বার্ট। অবশ্যই এর কিছুই আমি বিশ্বাস করি না, কিন্তু এইরকম রটনা কেউ তার ভবিষ্যৎ স্ত্রীর সম্পর্কে শোনা পছন্দ করবে না।

আমি ওই রকম মেয়ে নই, মিস্টার বার্ট, আমি যদি কখনও তোমাকে তেমন ধারণা দিয়ে থাকি তাহলে আমি দুঃখিত। কথাটা তোমার ভুলে যাওয়াই ভাল।

ওর কথার সুরটা ঠাণ্ডা এবং চূড়ান্ত। র‍্যাঞ্চার স্পষ্ট বুঝতে পারছে কথাগুলো মেয়েটা বুঝে এবং মেপেই বলেছে, কিন্তু কথাটা সে কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না। একটা অন্ধ রাগে ফুসে উঠল বার্ট। তবু জোর করে একটু হাসল।

ওহ, আমার ওপর রাগ কোরো না, ফিল। সুন্দর সুন্দর কথা শুছিয়ে বলার কৌশল আমার জানা নেই বটে, কিন্তু তোমাকে আমি চাই। তুমি যা বললে সেটা তোমার ফাইনাল জবাব হিসেবে আমি মেনে নিতে রাজি নই।

আমি বদলাব না, শান্ত স্বরে বলে চলে গেল মেয়েটা।

বার্ট কিছুক্ষণ ওর দিকে চেয়ে থেকে ঘুরে উল্টো দিকে হাঁটা ধরল। রাগে দিশেহারা হয়ে ওপাশ থেকে আসা এক পথচারীর সাথে ধাক্কা খেল সে। দোষটা নিজের হলেও গালি দিয়ে এক বাড়ি মেরে হালকা লোকটাকে সে ফুটপাত থেকে রাস্তায় ফেলে দিল। লোকটার ডান চোখের ওপর একটা পট্টি বাধা। ফিল দেখল ওর সঙ্গে একটা পিস্তল রয়েছে। লোকটা উঠে দাঁড়িয়ে বিষাক্ত দৃষ্টিতে বার্টের দিকে তাকিয়ে পাল্টা একটা গালি দিয়ে হাঁটা শুরু করল। ফিল আশা করেছিল লোকটাকে হয়ত রাগে বার্ট গুলিই করে বসবে। কিন্তু তা না করে সে ঘড়ঘড়ে স্বরে একটা হুমকি দিয়ে আবার নিজের পথ ধরল। ফিল লক্ষ করল কাঁচাপাকা দাড়িওয়ালা বয়স্ক লোকটা ওকে পার হওয়ার সময়ে কেমন যেন একটা অদ্ভুত দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকাল।

১৩.

তার প্রতি ফিলের প্রকৃত মনোভাব কি এটার আবিষ্কার বার্টের মনে এবং অহমিকায় এমন প্রচণ্ড আঘাত হানল যে ওর আউটফিটের বাকি সারাটা দিন খুব খারাপ কাটল। সন্ধ্যায় যখন ডোভার ওর সাথে দেখা করতে র‍্যাঞ্চহাউসে গেল তখন সে তাকে খুব খারাপ মানসিক অবস্থায় দেখল। ফোরম্যান, যে গত চব্বিশ ঘন্টায় ওর দেখা পায়নি, সে সরাসরি কাজের কথায় এলো।

কি ব্যাপার, তোমার মেজাজ এমন খারাপ কেন? প্রশ্ন করল সে।

প্রায় সবই ওলটপালট হয়ে গেছে, বিরক্ত স্বরে জবাব এলো। ডেভিসের কথা কিছু শুনেছ?

আমি এইমাত্র ওকে দেখে এলাম, বলল ডোভার।

কটমট করে ডোভারের দিকে কতক্ষণ চেয়ে থাকল বার্ট। ওই জেমসই তাহলে তার পুরোনো খেলা খেলে চলেছে?

আমি তোমাকে প্রথমে যা বলেছিলাম সেটাই তোমার করা উচিত ছিল। শুরুতেই ওকে শেষ করে ফেলাই ঠিক হত। তাহলে মেয়েটা জাজ এমারিকে সামলাবার একটা উপায় খুঁজে বের করে ফেলত। এখনও সময় আছে-মেয়েটার জেমসকে ভুলতে বেশি সময় লাগবে না।

ওর কথা বাদ দাও। মেয়েটা ওকে মোটেও পছন্দ করে না। ডেভিসকে খতম করেছে ওই কুকুরের বাচ্চা লরি বস্টন, জানাল বার বি র‍্যাঞ্চার।

আজ সকালে ফিলের সাথে ওর কি কথা হয়েছে তাও বলল।

ও, তাহলে মেয়েটা তোমাকে ঠ্যাঙ্গা দেখিয়ে দিয়েছে? বলল ডোভার। এটা তো সম্পূর্ণ ভিন্ন ব্যাপার। তোমার এখন লেজি এমকে বাই বাই জানানো ছাড়া আর উপায় কি? ফিলের বিয়েতে তোমাকে বেস্ট ম্যান হয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হবে, বাট।

ফোরম্যানের তিক্ত ব্যঙ্গে ভরা মুখের দিকে তাকিয়ে র‍্যাঞ্চারের চেহারাটা আরও কালো হলো।

আমার এখন হাসি-ঠাট্টার মূড নেই, ডোভার, বলল বার্ট।

আমি নিজেও এতে কৌতুকের কিছু দেখছি না, জবাব দিল ফোরম্যান। আমি তোমার বর্তমান মনের অবস্থাটাকেই কথায় রূপ দিলাম মাত্র, যদি তোমাকে আমি কখনও হতাশ হয়ে হাল ছাড়তে দেখিনি।

এখনও, তা আমি করছি না, রুক্ষ স্বরে বলল বার্ট। আমি যা চাই সেটা আমি না পেয়ে ছাড়ি না। তবে কাজটা যত সহজ হবে বলে মনে করেছিলাম ততটা সহজ হবে না। আমাকে কিছু ঝুঁকি নিতে হবে।

সেটা আমরা আগেও কয়েকবার নিয়েছি, নির্বিঘ্নে পারও পেয়েছি, ওর কথা সমর্থন করল ডোভার এমারিকে আমাদের পক্ষে আনাটা হয়ত সম্ভব হবে না।

শয়তানিতে ভরা একটা হাসি ফুটল বার্টের মুখে। তুমি নিশ্চয় একজন মাইন্ড রীডার, ডোভার, বলল সে। হ্যাঁ, একটা উপায় ঠিকই আছে, কিন্তু প্ল্যানের পুরোটা এখনও মনেমনে গুছিয়ে উঠতে পারিনি। আপাতত জেমসই হয়ত মাস্টারসনকে মেরেছে, এই লাইনে কিছু চিন্তাভাবনা করো।

স্টিভকেও সে-ই সরিয়েছে বলা যেতে পারে, বলল ডোভার।

ওতে কাজ হবে না, বলল বার্ট। সহজেই সে প্রমাণ করতে পারবে যে ওই সময়ে এই তল্লাটেই ছিল না ও।

স্টিভকে খুন করে জায়গাটা বুলের জন্যে খালি করে তাহলে আমাদের কোন লাভই হয়নি, মন্তব্য করল ফোরম্যান।

তুমি ঠিকই ধরেছ, কিন্তু তখন কে ভাবতে পেরেছিল জ্যাক কোন স্ট্রেঞ্জারকে এনে ওর জায়গায় বসাতে পারে? গর্জে উঠল সে। আমরা ভেবেছিলাম ডেভিসই ওর পদটা পাবে।

মাস্টারসনকে আমরা যতটা বোকা ভেবেছিলাম আসলে তত বোকা সে নয়, বেরিয়ে যাওয়ার আগে বলল ডোভার।

কেবল একটা ঘোৎ শব্দ করে ওর কথা সমর্থন করল বার্ট।

টিমের, পাঠানো রাইডারের কাছে একটা খবর পেয়ে গোলাগুলির কয়েক দিন পরে হোপে পেীছল এরফান। ফেনটনের সেলুনে যাওয়ার পথে সে লক্ষ করল। শহরের লোকজন য়েন তার দিকে একটু অন্যরকম দৃষ্টিতে তাকাচ্ছে। কয়েকজন লোক যা আগে ওর সাথে কথা বলেছে বা নড় করেছে তারা যেন ওকে দেখেও না দেখার ভান করে এড়িয়ে যাচ্ছে। টিম ওর জন্যেই সেলুনে অপেক্ষা করছিল। সে এর কারণটা ব্যাখ্যা করল।

বার্টের লোকজন কথা বলতে শুরু করেছে, জানাল টিম। তোমার হয়ত এর জবাবে বলার কিছু থাকতে পারে।

বার্টের লোকেরা বলে বেড়াচ্ছে তুমিই নাকি জ্যাককে খতম করেছ, সরাসরি বলল ফেনটন। তোমার কোন বিপদ ঘটুক এটা চাই না আমরা।

এরফানের চোখ দুটো কঠিন হলো। নিশ্চয়, অনেক কথাই বলার আছে আমার। আমি এখনই কাম এগেইনে গিয়ে সরাসরি মিস্টার বার্টের সাথেই কথা বলছি।

তুমি একা ওখানে মোটেও যাবে না, বলে উঠল টিম।

আমি যদি সেলুন ছেড়ে যেতে শুরু করেছিল সেলুনের মালিক, কিন্তু হাত তুলে ওকে থামিয়ে দিল এরফান।

আমি কৃতজ্ঞ, কিন্তু তোমাদের এই ঝামেলায় জড়াবার কোন প্রয়োজন নেই।

কাম এগেইন বারটা যথারীতি প্রায় ভরপুর। ওর বিরুদ্ধে যে যথেষ্ট গুজব ছড়ানো হয়েছে সেটা বুঝতে এরফানের বেশি সময় লাগল না। ওর অভিবাদনের জবাবে কেবলমাত্র দুএকজনই নড় করল। বার্ট, ডোভার, পাগলা মার্টির সাথে আরও কয়েকজন একত্রে দাড়িয়ে গল্প করছে। লেজি এমের ফোরম্যান সোজা ওদের দিকে এগিয়ে গেল।

বার্ট, বলল সে। শুনলাম তুমি গুজব ছড়াচ্ছে যে আমিই নাকি জ্যাক মাস্টারসনকে হত্যা করেছি?

এমন সরাসরি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে একটু ভেবাচেকা খেয়ে গেল বার্ট। এটা সে মোটেও আশা করেনি। কয়েক মুহূর্তেই সে নিজেকে সামলে নিয়ে একটু অবজ্ঞার হাসি হেসে জবাব দিল, ধরো কথাটা আমিই বলেছি, তাতে কি হয়েছে?

শুধু এটাই, হয় তুমি এর প্রমাণ দেবে-নয়ত মিথ্যা রটনার জন্যে ক্ষমা চাইবে, অথবা লড়বে।

আমি তোমার কথায় চলি না, জবাব দিল সে।

না? ভাল কথা, তাহলে এটা হজম করো, ব্যাটা কাপুরুষ।

কথা শেষ করেই এক পা আগে বেড়ে খোলা হাতে ওর গালে প্রচণ্ড একটা চড় বসাল এরফান। চড়ের বেগে টলতে টলতে পিছিয়ে গেল বাট। রাগে দিশেহারা হয়ে খাপ থেকে পিস্তল অর্ধেক বের করে ফেলল। এই সময়ে একটা গম্ভীর স্বর ওকে সাবধান করল:

ওটা খুব ভুল হবে!

বার্ট একটু ইতস্তত করে অবাক হয়ে বিস্ফারিত চোখে দেখল এরফানের ডান হাতের কোল্টটা ওকে কাভার করে রয়েছে। অত্যন্ত দ্রুত ড্র করতে পারে বলে বহুদূর পর্যন্ত ব্ল্যাক বার্টের সুনাম আছে। কিন্তু উপস্থিত সবাই দেখল এরফানের তুলনায় সে ছেলেমানুষ। প্রায় তিরিশ সেকেন্ড সম্পূর্ণ নীরবতার মধ্যে কাটার পর পিস্তল হাতে লোকটা আবার কথা বলল।

বার্ট, তুমিই আগে পিস্তল বের করার জন্যে হাত বাড়িয়েছিলে তাই এখন আমি তোমাকে মেরে ফেললেও সেটা অন্যায় হবে না। তুমি একেবারে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকো, এক ইঞ্চি নড়লেই আমি তোমাকে সোজা নরকে পাঠিয়ে দেব।

বক্তার কড়া অ্যাসিডের মত স্বর বিশাল লোকটার কানে ঢুকে মগজ একেবেরে অকেজো করে দিল। খাপ থেকে অর্ধেক বের করা পিস্তলটা এখনও হাতের মুঠোয় ধরা রয়েছে; কিন্তু ওটা ওঠাবার সাহস পাচ্ছে না। জানে একটু নড়তেই সামনে দাঁড়ানো লোকটা ওকে গুলি করে মেরে ফেলতে দ্বিধা করবে না। এরফানের কৃপার পাত্র হয়ে একেবারে স্থির দাঁড়িয়ে আছে বার্ট।

ব্র্যান্ডিঙের জন্যে বাঁধা গরুর মত নিরুপায় অবস্থা। এবার এরফান যা বলল তাতে কামরার লোকজনের টানটান উত্তেজনা কিছুটা হ্রাস পেল। কিন্তু সবাই জানে ঘটনা পুরো শেষ হয়নি।

আমি প্রমাণ করে দেখিয়েছি, তোমাকে মেরে ফেলা আমার পক্ষে কতটা সহজ ছিল; কিন্তু আমার নিজস্ব ব্যক্তিগত একটা কারণে আমি তোমাকে আরও কিছুদিন বেশি বাড়ার সুযোগ দিচ্ছি।

নিশ্চিত মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসে বার্টের চেহারায় স্বভাবজাত অবজ্ঞার ভাবটা আবার ফিরে এলো। এরফানের পরবর্তী চালের অপেক্ষায় আছে সে। ফোরম্যান যখন আবার মুখ খুলল তখন গমগমে নিচু স্বরেই কথা বলল।

আমি শুনলাম তুমি নাকি আমাকে শায়েস্তা করার একটা সুযোগ খুঁজছ, বার্ট। তাই তোমাকে তোমার গানবেল্ট খুলে ফেলে খালি হাতে লড়ার সুযোগ দিচ্ছি আমি; কারণ পিস্তলে তুমি আমাকে কোনদিনই হারাতে পারবে না।

প্রস্তাবটা শুনে কিছুক্ষণ অবাক বিস্ময়ে চেয়ে থাকল, তারপর চোখদুটো একটা নারকীয় আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠল বার্টের। ওখানে সবাই জানে তার সাথে হাতাহাতি লড়াইয়ে পারার মত লোক এ-দেশেই কেউ নেই। আর এই লোকটা কিনা স্বেচ্ছায় নিজেকে ভেড়ার মত বলি দিতে চাইছে।

টিমের মুখের ভাবে গজর উদ্বেগ প্রকাশ পেল। সে ফিসফিস করে বলল, তোমার কি মাথা খারাপ হয়েছে? ওই লোক ডেজার্ট এজে একজনকে খালি হাতে পিটিয়েই হত্যা করেছে।

ভয়ের কিছু নেই, বন্ধু, শান্ত স্বরে বলল এরফান।

দুজনই তাদের শার্ট, পিস্তলের বেল্ট আর স্পার খুলে তৈরি হলো; ইতোমধ্যে আগ্রহী দর্শকরা কামরার মাঝখান থেকে টেবিল-চেয়ার সরিয়ে। জায়গাটা খালি করে দিল। ড্রিঙ্ক আর তাস খেলার কথা সবাই ভুলে গেছে। লড়াই দেখতে সবাই ঠাসাঠাসি করে গোল হয়ে দাড়িয়েছে। শহরের প্রায় সবাই ওখানে হাজির আছে। কথাবার্তা আর তর্কাতর্কির শব্দও এখন একেবারে থেমে গেছে।

কামরার মাঝখানে দাঁড়িয়ে এরফান তার প্রতিপক্ষকে লক্ষ করছে। লোকটা উচ্চতা আর ওজন দুদিক দিয়েই বড় এবং ভারী। ভাল করেই জানে একটা ঝুঁকি নিচ্ছে সে। লোকটার বয়স তার চেয়ে বেশি হলেও এখনও খুব শক্ত। তবু এরফান মোটেও তোয়াক্কা করছে না। এটা জিদের লড়াই।

দর্শকদের কাছে মনে হচ্ছে এটা নেহাত অন্যায় প্রতিযোগিতা, লড়াইটা মোটেও সমানে সমানে হচ্ছে না। ওরা দেখছে র‍্যাঞ্চারের প্রতিটা নড়াচড়ায় তার শক্তিশালী পেশীগুলো কিলবিল করে নড়ে উঠছে। তার সামনে এই কাউবয়ের দাঁড়াতে পারার কোন প্রশ্নই ওঠে না। কারও মনেই লড়াইয়ের ফলাফল সম্পর্কে কোন সন্দেহ নেই। পাশবিক শক্তি দিয়ে জেমসের মাথা ফাটিয়ে ঘিলু বের করে ছাড়বে বার্ট।

লবণ ছাড়াই জেমসকে খেয়ে ফেলবে আজ, মন্তব্য করল একজন।

কাজটা বার্ট যত সহজ মনে করছে তত সহজ হবে না, বলল একজন প্রতিবেশী। লোকটা এতক্ষণ এরফানকে খুঁটিয়ে দেখছিল; ‘কাটাতার আর শুকনো চামড়ার মত শক্ত ওর পেশী, বলল সে।

তা যা-ই হোক, আমি এক ডলারের বদলে দুই ডলার বাজি ধরতে রাজি আছি বার্টের পক্ষে, জোর গলায় ঘোষণা করল প্রথম বক্তা।

আমি পঞ্চাশ ডলার ধরলাম জেমসের ওপর, বলল টিম।

এরফানের দুএকজন বন্ধু টিমকে সমর্থন করল বটে, কিন্তু আর কেউ বাজি ধরল না। ৰাজির শর্তের হার বাড়ানোর পরেও কেউ আর বাজি ধরল না দেখে বার্ট সশব্দে হাসল।

তোমরা কেউ আর বাজির টাকা জিততে পারলে না দেখে আমি দুঃখিত, বয়েজ, খুব সহজেই তোমরা টাকাটা অর্জন করতে পারতে। আমি ওর দেহের সবকটা হাড় ভেঙে দেব।

মুখে সস্তা ফটফট করা সহজ, গর্জে উঠল এরফান। এগিয়ে এসে কাজটা করে দেখাও-মিস্টার মাস্ক।

কথাটা খুব নিচু স্বরে বলেছে, এরফান। কোলাহলরত দর্শকরা কেউ না শুনলেও বার্টের কানে ওটা ঠিকই পৌঁছেছে। সে যে একটু চমকে উঠল সেটা এরফান লক্ষ করে ফেলেছে দেখে খিস্তি করল সে।

কয়েক সেকেন্ড পরস্পরের দিকে চেয়ে দাড়িয়ে রইল ওরা। কিন্তু তারপরেই প্রথম ঘুসিটা নিজেই মারার উদ্দেশ্যে বিদ্যুৎ বেগে আগে বেড়ে বার্টের পেটে দুহাতে দুটো জোরালো ঘুসি বসিয়ে দিল এরফান। প্রতিপক্ষ সামলে ওঠার আগেই তার হাতের আওতা থেকে সরে এলো। প্রচণ্ড রাগে একটা হুঙ্কার ছেড়ে বিশাল পাকানো মুঠিতে দুহাতে ঘুসি ছুঁড়তে ছুঁড়তে ছুটে এগিয়ে এলো বার্ট। ওগুলোর যেকোন একটা ঠিক মত লাগলে ওই মুহূর্তেই লড়াই শেষ হয়ে যেত। খুব সাবধানে লড়ছে এরফান। জানে কাছাকাছি রেঞ্জে লড়তে গেলে সে-ই অসুবিধায় পড়বে। তার জেতার একমাত্র উপায় হচ্ছে শত্রুকে সব সময়ে চক্করের ওপর রেখে লোকটা একটু অসাবধান হলেই ঝট করে এগিয়ে কয়েকটা ঘুসি বসিয়ে আবার পিছিয়ে আসা। বার্ট ওকে ভীতু মনে করে উৎসাহের সাথে বারবার এগিয়ে ওর ফাঁদে পা দিয়ে মার খাচ্ছে।

এরফান ওর চারপাশে নেচে বেড়াচ্ছে; আর মাঝেমাঝে হঠাৎ এগিয়ে ভীমরুলের মত হুল ফুটিয়ে ফিরে এসে আবার নাচা শুরু করছে। এরফানের লড়ার পদ্ধতি শুধু র‍্যাঞ্চারকে নয়, তার বন্ধুদেরও বিরক্ত করে তুলেছে। এখন পর্যন্ত বার্ট এরফানকে ছুঁতেও পারেনি; তাই ওদের থেকে মাঝেমাঝে রাগ মেশানো রব উঠছে: স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে পুরুষের মত লড়ো।

ওদের কথাকে কোন পাত্তা দিল না এরফান। সে ভাল মতই জানে ওদের কথা শোনার ফল কি দাঁড়াবে। এর আগেও ওর চেয়ে ভারী মানুষের বিরুদ্ধে সে বহুবার লড়েছে। আগের পদ্ধতিই ব্যবহার করে সে ঝট করে ভিতরে ঢুকে পেটে বা পাজরে ঘুসি মেরে হাসতে হাসতে বেরিয়ে আসছে। লড়াই শেষ করার আগে শক্তিশালী লোকটাকে বডি পাঞ্চে দুর্বল করে নেয়াই ওর উদ্দেশ্য। কিন্তু উত্তেজিত দর্শকরা কাছে থেকে লড়াইটা ভাল করে দেখার জন্যে ধীরেধীরে এগিয়ে এসে খালি জায়গাটাকে আরও ছোট করে তুলছে।

টিম এবং আরও দুএকজনের চেষ্টায় বৃত্তটা ছোট হওয়া অল্প সময়ের জন্যে স্থগিত থাকলেও ওটা আবার ছোট হতে শুরু করল; অবশ্য এটা বার্টের সমর্থকদেরই সমবেত চেষ্টার ফল। বার্ট এই সুযোগের পুরো সদ্ব্যবহার করল। ঘুসি ছুঁড়তে ছুঁড়তে এগিয়ে এলো সে। যতগুলো সম্ভব কাটিয়ে, এরফানও সমানে মেরে চলল; কিন্তু এতে ওকেও যথেষ্ট মার হজম করতে হলো। সে আগেই পেট আর পাজরকে বার্টের দুর্বল জায়গা হিসেবে টার্গেট করেছে, তাই ওখানেই সে মেরে চলেছে। লোকটা যে দুর্বল হয়ে এসেছে তা এরফানের প্রতিটা ঘুসির সাথে ওর ব্যথায় মুখ কুঁচকানো দেখেই বুঝতে পারা যাচ্ছে।

মার অবশ্য লেজি এম ফোরম্যানও কম খায়নি। সবকটা ঘুসি কাটানো ওর পক্ষে সম্ভব হচেছ না; ওই মুহূর্তে হাত ঘুরিয়ে মারা একটা প্রচণ্ড ঘুসি সোজা এরফানের কপালে লাগল। হাঁটু মুড়ে পড়ে গেল সে। বার্টের সমর্থকদের হর্ষধ্বনির মাঝে র‍্যাঞ্চার ছুটে এসে ওর মাথা লক্ষ্য করে লাথি মারল এরফান। ঠিক সময় মতই ওর মাথা সরিয়ে নিয়ে দুহাতে পায়ের গোড়ালি শক্ত করে ধরে উঠে দাঁড়াল। ভারসাম্য হারিয়ে দড়াম করে মেঝের ওপর উল্টে পড়ল বার্ট। শক্ত কাঠের মেঝেতে তার মাথা সজোরে ঠুকে গেল। ভারী দেহ নিয়ে আছাড় খেয়ে ওখানেই পড়ে জোরে জোরে শ্বাস টানছে লোকটা। এরফান স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে তাকে দেখছে। ওখানে ওর জায়গায় বার্ট থাকলে লাথি মেরে শত্রুর মাথা সে ছাতু করে দিত; কিন্তু এরফান ওভাবে লড়ে না। উত্তেজনাময় পরিস্থিতিতে দর্শকরা সবাই নীরবে অপেক্ষা করছে। এই সময়ে কেউ ব্যঙ্গভরে বলে উঠল, গুড নাইট, বাট; প্লেজেন্ট ড্রীমস!

ইলেকট্রিক শক খেয়েই যেন ক্রোধে উন্মত্ত বার্ট লাফিয়ে উঠে এরফানের দিকে ছুটে এলো। কিন্তু এবারে এরফান তার জায়গা থেকে একটুও নড়ল না। পরবর্তী কয়েক মিনিট দুজনের তুমুল লড়াই চলল-দুজনেই সমানে ঘুসি ছুঁড়ছে। নিজেকে গার্ড দেয়ার কথা যেন ওরা ভুলেই গেছে। পরস্পারকে আঘাত করে কাবু করে ফেলার জন্যে ওরা হন্যে আর বুনো হয়ে উঠেছে। এরফান জানে এটা করা ওর পাগলামি হচ্ছে, কিন্তু যে কাপুরুষ লোকটা ওকে বেকায়দা অবস্থায় পেয়ে মাথায় লাথি মারার চেষ্টা করেছিল, তাকে মেরে তার মুখটা ফাটিয়ে দেয়ার নেশা ওকে পাগল করে তুলেছে। ও দেখতে পাচ্ছে এরই মধ্যে বার্টের একটা চোখ বুজে আসতে শুরু করেছে। বুঝতে পারছে সে নিজেও দুর্বল হয়ে পড়ছে, ওর মাথাটা ঝিমঝিম করছে, হাত দুটোও সীসার মত ভারী হয়ে উঠছে, কিন্তু ও জানে, ওর প্রতিপক্ষের অবস্থাও ওর চেয়ে কোন অংশে ভাল নয়। শক্ত আছাড় ওকে বেশ কাবু করে ফেলেছে; শ্বাস নিতে তার বেশ কষ্ট হচ্ছে, গালটাও ফেটে রক্ত ঝরছে, তার ঘুসিতেও আর আগের মত সেই জোর নেই। নড়াচড়াও এখন অনেক ধীর হয়ে গেছে।

জেমসের ওপর ইভন মানি, চিৎকার করে ঘোষণা করল যে-লোকটা বার্টকে গুড নাইট জানিয়েছিল।

লোকটা যদি বার্টকে খেপিয়ে তুলে ফাইটে নতুন উদ্দম ফিরিয়ে আনার জন্যে কথাটা বলে থাকে, তাহলে তার উদ্দেশ্য সফল হলো। এখন উৎসাহী দর্শকের দল খালি জায়গাটাকে প্রায় অর্ধেক করে ফেলেছে দেখে বার্ট আবার এগিয়ে এলো। এবার শুরু হলো হাড্ডাহাডিড লড়াই। কেবল হাড়ে হাড়ে ঠোকাঠুকি আর ফুপিয়ে শ্বাস নেয়ার শব্দ শোনা যাচ্ছে। প্রচণ্ড একটা ঘুসি আসতে দেখে সময় মতই ডান পাশে সরে গেল এরফান। ঘুসিটা নিষ্ফল ভাবে। গলা ঘেঁষে ওর কাঁধের উপর দিয়ে বেরিয়ে গেল। সুযোগটা পুরোপুরি কাজে লাগাল জেসাপ, কাঁধের পুরো ওজন ব্যবহার করে বাম হাতে জোরালো একটা ঘুসি বসাল বাটের কণ্ঠার ওপর। বাটের চোখের সামনে থেকে সেলুনের আলো আর উৎসাহী দর্শকের দল অদৃশ্য হলো। সে কেবল ওর সামনে দাঁড়ানো এরফানের কঠিন বুনো চেহারাটা দেখতে পাচ্ছে। জ্ঞান হারাবার আগে শেষ চেষ্টায় বার্ট ওর মুখ লক্ষ্য করে একটা ঘুসি মারল। মুহূর্তের জন্যে এরফান চোখে অন্ধকার দেখল। আবার দৃষ্টি ফিরে এলে সে দেখল টিম আর কাভানা ওকে ঠেকা দিয়ে ধরে আছে, আর বার্ট অচেতন হয়ে একটা অস্বাভাবিক ভঙ্গিতে মেঝের ওপর পড়ে আছে। দর্শক কয়েকজন নিঃসঙ্কোচে হেসে এরফানকে অভিনন্দন জানাল। কিন্তু যদিও বেশিরভাগ দর্শকই এতে খুশি হতে পারেনি, তবু ওদের চেহারা বা আচরণে সেটা প্রকাশ পেল না। ক্ষীণ একটু হাসি দিল এরফান; অত্যন্ত ক্লান্ত সে, ওর গলা দিয়ে স্বর বেরোতে চাইছে না।

কি ঘটেছে? জিজ্ঞেস করল সে।

কি ঘটেছে? পুনরাবৃত্তি করল টিম। ওহ, এমন কিছুই ঘটেনি! তুমি কেবল ওর চিবুকে একটা টোকা দিয়েছ-শুয়ে শুয়ে ওটার কথাই ভাবছে বাট। আমার ধারণা এক রাতের জন্যে ওর যথেষ্ট হয়েছে। চলো, ফেনটনের সেলুনে গিয়ে হাতমুখ ধুয়ে একটু পরিচ্ছন্ন হও। মুখ দেখে তোমার ওপর ইন্ডিয়ান হামলা হয়েছে বলে মনে হচ্ছে।

মেঝের ওপর পড়ে থাকা মানুষটাকে ঘিরে জটলা থেকে কোন বাধাই এলো; ওরা কাম এগেইন সেলুন ছেড়ে নির্বিঘ্নেই বেরিয়ে রাস্তায় নামল। কেবল খাটো গড়নের এক কমবয়সী কাউবয় গোপনে ওদের যাওয়া লক্ষ করল। লোকটার পা দুটো অনবরত রাইডিঙের কারণে ধনুকের মত বাকা। ঊরুর সাথে নিচু করে বাঁধা দুটো পিস্তল ঝুলছে-ওগুলোর কালো বাঁট দুটো বহুল ব্যবহারে কিছুটা ক্ষয়ে গেছে। লোকটাকে এরফান খেয়াল করলেও কোন পাত্তা দিল না।

দা সান অভ এ গান, বিড়বিড় করে আউড়ে লোকটা নিজের ঘোড়ার খোঁজে বার ছেড়ে বেরিয়ে এলো।

ঘণ্টাখানেক পরে ফোরম্যান তার চেহারা থেকে মারপিটের চিহ্ন যতটা সম্ভব দূর করে লেজি এমের ট্রেইল ধরল। দেহে প্রচণ্ড ব্যথা থাকলেও মনটা তার অদ্ভুত এক প্রশান্তিতে ভরে উঠেছে।

শহর থেকে এরফান মাত্র মাইলখানেক এগিয়েছে, এই সময়ে তার ঘোড়াটা হেষাধ্বনি করে উঠল। একটা ঝোঁপের আড়ালে কিছু নড়ে উঠতে দেখল জেসাপ।

হাইস্ট দেম, (হাত তোলো) একটা স্বর আদেশ দিল, কিন্তু ওই স্বরের পিছনে রয়েছে একটা হাসির আভাস।

হাইস্ট না ছাই, বলল এরফান। ইয়ার্কি ছেড়ে ঝোঁপের আড়াল থেকে বেরিয়ে এসো ইয়র্কি। আর তোমার আচরণ ব্যাখ্যা করো-তোমাকে আমি র‍্যাঞ্চেই থাকার নির্দেশ দিয়েছিলাম।

কি করব, তোমার বসের নির্দেশ! ইয়েস স্যার, মিসেস রাকা জেসাপ। হাসি থামাবার চেষ্টায় কয়েক মুহূর্ত সময় নিয়ে আবার সে বলে চলল, জানি, বিয়ের পরে বেশ কয়েক বছর পার হয়ে গেলেও সে এখনও তোমার বস। এবং আমারও। সে আমাকে বলল, ইয়ার্কি, আমি আমার স্বামীর একটা চিঠি পেলাম, তাতে সে লিখেছে সব কিছু শান্ত এবং নিঝঞ্ঝাটেই চলছে। তাই আমাকে তখনই আদেশ দেয়া হলো এখানে হাজির হয়ে নিজের চোখে সব দেখে গিয়ে, রিপোর্ট করতে হবে। তার ধারণা তুমি যত বেশি ভাল চলছে বলো, ঝামেলা নাকি ততই জটিল হয়। সে নিশ্চিত এবারে তুমি বেশি ঝামেলায় পড়ে গেছ। তুমি যে সত্যিই একটা ভাল বউ পেয়েছ তাতে কোন সন্দেহ নেই-যখন খুশি ঘোড়ার পিঠে চড়ে বেরিয়ে পড়ো, কেউ বাধা দেয় না। আমারও মনে হচ্ছে এবার বড় একটা ঝামেলাতেই পড়েছ তুমি।

(এই ইয়র্কিকেই আবার এরফান অভিযানে সে যক্ষ্মায় নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচিয়েছিল। ভালবাসা দিয়ে সিগারেট ছাড়িয়ে এবং রোজ পাইন বনে নিয়ে পাইনের তাজা হাওয়া খাইয়ে আর সাঁতার কাটিয়ে ওর নিত্য সঙ্গী হয়ে ওকে ওর প্রথম নিজস্ব পিস্তল, ঘোড়া, আর ঘোড়ার জিন, রাইফেল; এসবও এরফানই কিনে দিয়েছিল। এরপরে ইয়র্কি আর জেসাপের পিছু ছাড়েনি; ওর সাথেই ওর র‍্যাঞ্চে গিয়ে এতদিন কাটিয়েছে। রোপিং থেকে শুরু করে ফাঁদ পাতা, পিস্তল আর রাইফেলের ড্র করায় সে এখন প্রায় এরফানের মতই দক্ষ হয়ে উঠেছে। স্যান্ডি বেন্ডের ডাবল বার ছাড়ার পর থেকে সে এরফানের র‍্যাঞ্চেই আছে।)

বিষণ্ণ মুখে একটু হাসল এরফান। আমি মেয়েদের কখনও বুঝে উঠতে পারলাম না, বলল সে। ওদের ধোকা দেয়া সত্যিই অসম্ভব। আমি যদি লিখতাম আমি একটু সমস্যায় আছি, তবু সে তোমাকে পাঠাত। ওখানকার আর সবাই কেমন আছে?

সিল্কের মত মসৃণ, জবাব দিল ইয়র্কি। তোমার ছেলে জিম এখন আমার সাথে সমানে সমানে পাল্লা দেয়, অথচ বয়স মাত্র সতেরো! সে যে বড় হলে তার বাপকেও ছাড়িয়ে যাবে এতে কোন সন্দেহ নেই। আর লীয়াও (আর কতদূর দ্রষ্টব্য) বেশ বড়সড় হয়ে উঠেছে। তবে এখন সে আর জিমের পিছন পিছন আগের মত বনে-বাদাড়ে ঘুরে বেড়ায় না। রাকা ওকে নিখুঁত লেডি বানিয়ে ফেলেছে।

আমিও তাই আশা করেছিলাম, গর্বের সাথে বলল এরফান তা তুমি এখানে কখন এসে পৌঁছলে?

ঠিক সময় মতই, শোটা পুরোই দেখেছি, এরফান।

এখানে আমি আর এরফান জেসাপ নই, আমি এখন জেমস গ্রীন। কথাটা মনে রেখো, ওকে সাবধান করল এরফান।

তোমার শেষ ঘুসিটা ছিল একেবারে ঘুসির বাপ, বলল ইয়র্কি। আমি এসে পড়ায় ভালই হয়েছে। এখানকার পরিস্থিতি আমার কাছে বেশ উত্তপ্ত বলেই মনে হচ্ছে।

সত্যি কথা বলতে গেলে ব্যাপারটা তাই দাঁড়ায় বটে।

যতটা সম্ভব সংক্ষেপে এখানকার পরিস্থিতি ওকে জানাল এরফান।

তুমি কি শেডি নামে কারও কথা উল্লেখ করেছিলে?

কেন, তুমি ওকে চেনো নাকি?

না, ঠিক চিনি না বটে, তবে ওর কথা আমি অনেক শুনেছি। শুনেছি ওর আঙুল ছাড়া আর সব কিছুই নাকি বাঁকা। এখন তুমি আমাকে কি করতে বলো?

তুমি হোপেই থাকো, মনে রেখো, এখনকার মত তুমি আমাকে চেনো না, জবাব দিল এরফান। শহরে ফেনটনের একটা ছোট সেলুন আছে, লোকটা সৎ। টিমের র‍্যাঞ্চ আছে রিজের ওপর, সেও ভাল লোক; আজ তুমি ওকে দেখেছ, ফাইটের পর সে আর তার একজন কর্মচারী আমাকে কাম এগেইন সেলুন থেকে ধরাধরি করে বের করে এনেছিল। ওদের ছাড়া শহরের আর কাউকে বিশ্বাস কোরো না-করলে ঠকবে। তুমি হচ্ছ আমার আরেকটা তুরুপের তাস। এখন তোমার শহরের পথ ধরাই ভাল। আপাতত বিদায়।

ইয়র্কি শহরের দিকে রওনা হয়ে গেল; এরফানও লেজি এমের ট্রেইল ধরে এগোল। তাঁর নিজস্ব এ. জে. র‍্যাঞ্চ থেকে কেউ আসায় এখন এরফানের মনের জোর অনেক বেড়ে গেছে।

১৪.

পরদিন সকালে বাঙ্কহাউসে নাস্তা খেতে বসে ফোরম্যানের বিক্ষত চেহারা সবার মনেই কৌতূহল জাগাল, কিন্তু কেউ কোন মন্তব্য করল না। র‍্যাঞ্চহাউসে লরির চামরায় পৌঁছা’নোর পথে ফিলের দেখা পেল না এরফান। এরফানকে দেখে আহত লরি স্লিঙে ঝুলানো হাত নিয়েই বিছানার ওপর উঠে বসল। এরফান দেখল .৪৫-এর গুলি খাওয়ারও কিছু সুবিধা আছে। ফিলের অনুপস্থিতিতে সে অন্যান্য কাউবয়ের মত চুপ করে থাকল না।

তুমি আবার কে? ঠাট্টা করে প্রশ্ন করল লরি।

আমি হয়ত ইউনাইটেড স্টেইটসের প্রেসিডেন্ট হতে পারি, কিন্তু তা আমি নই, বলল এরফান।

ওকে খুঁটিয়ে লক্ষ করে সে বলল, আমার পছন্দ হচ্ছে না।

কি পছন্দ হচ্ছে না, রামছাগল?

তোমার এই চেহারার ভোল পালটানো; অবশ্য আগেরটাও এমন কিছু সুন্দর ছিল না। এই! আমার হ্যাট ছেড়ে ওঠো।

ফোরম্যান ইচ্ছে করেই যে চেয়ারের ওপর লরির স্টেটসনটা রাখা আছে বসার জন্যে সেই চেয়ারটাই বেছে নিয়েছিল। উঠে সে লরির চ্যাপটা হ্যাটটা হাতে তুলে নিল।

এই পুরোনো হ্যাট দিয়ে আর কতদিন চালাবে? হাড়কিপটে লোকও তো বেশি পুরোনো হয়ে গেলে নতুন হ্যাট কেনে! মন্ত্য করল সে। আরে, শান্ত হও; অসুস্থ মানুষের বেশি উত্তজিত হওয়া ঠিক নয়। আজকাল প্রিনসেস তোমার কেমন যত্ন নিচ্ছে?

সে একজন লেডি, এরফান, জবাব দিল কাউবয়।

আমাকে আবার ওই নামে ডাকলে আমি ফিলকে জানিয়ে দেব তুমি আমার বন্ধু, হুমকি দিল এরফান।

কসম লাগে, ওই কাজটা তুমি ভুলেও করতে যেয়ো না। কিন্তু তোমার এই ছদ্মবেশ নেয়ার কারণটা তুমি এখনও বলেনি।

এটা কোন ছদ্মবেশ নয়, হাঁদারাম। গতরাতে বার্টের সাথে আমার সামান্য মতবিরোধ ঘটেছিল, এই যা।

আমার আগেই বোঝা উচিত ছিল, সব শোনার পর বলল সে। যখনই আমি তোমার দেখাশোনার জন্যে পাশে নেই তুমি তখনই একটা গোলমাল পাকিয়ে বসো খোঁচা দেয়া শেষ করে সে আবার বলল, ও যে আজ সকালে কেমন বোধ করছে আমি তা বেশ আন্দাজ করতে পারছি, এরফান।

ওহ, ওই লোকটা মানুষ নয়, ও একটা গরিলা। হ্যাঁ, আর একটা কথা, ভাল হয়ে ওঠার পর শহরে যদি ইয়র্কির সাথে তোমার দেখা হয় তাহলে তুমি ওকে চেনো না, বুঝলে?

এই! এটা কি ধরনের কথা হলো?

যাওয়ার জন্যে আগেই উঠে দাঁড়িয়েছিল; ওর কথার কোন জবাব না দিয়ে বেরিয়ে গেল এরফান।

ফেরার পথেও ওই চেহারা নিয়ে ফিলের সামনে না পড়ায় সে নিজের কামরায় ঢুকে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। মেয়েটার সামনে পড়ে গেলে অযথা ওকে অনেক ব্যাখ্যা দিতে হত।

আসলে লরির কামরায় ঢুকতে যাওয়ার পথে ভিতরে এরফানের গলার স্বর শুনে সে দরজার কাছেই থেমে দাঁড়িয়েছিল। যতটুকু সে শুনেছে তাতেই সে বুঝেছে লরি তাকে ধোকা দিয়েছে। নিজের শোবার ঘরে বিছানার ওপর বসে শূন্যদৃষ্টিতে জানালার দিকে চেয়ে সে ভাবছে ও কি জেগে আছে, নাকি স্বপ্ন দেখছে। লরি জেমসকে আগে থেকেই চেনে, এবং জেমস আসলে ছদ্মনাম নিয়ে কাজ করছে এখানে। ওর আসল নাম এরফান। এসবের মানে সে কিছুই বুঝতে পারছে না। শেষ পর্যন্ত এর কোন কূল-কিনারা না পেয়ে সে কান্নায় ভেঙে পড়ল।

বার বির মালিক সম্পর্কে লরির ধারণা একেবারে পুরোপুরি ঠিক-লোকটা মানসিক এবং দৈহিক, দু’ভাবেই সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত। বিকৃত চেহারা নিয়ে কারও সামনে মুখ দেখাবার জো নেই ওর, তাছাড়াও শহরের সবার সামনে এভাবে। এরফানের কাছে মার খেয়ে মানসম্মান একেবারে ধুলোর সাথে মিশে গেছে। সে। র‍্যাঞ্চহাউসে বসে ও-কথা নিয়েই ভাবছে। তার কথা শুনতে শুনতে ফোরম্যানের চেহারায় একটা ক্ষীণ উদ্ধত ভাব ফুটে উঠেছে।

মিছে গালাগালি করে আমাদের কোন লাভ হচ্ছে না, শান্ত স্বরে বলল ডোভার। আমার কাছে তোমার জন্যে কিছু খবর আছে, কিন্তু সেটা ঠিক সুখবর নয়।

মনে হয় ইদানীং আমরা সুখবর পাওয়া ভুলেই গেছি, বলল বার্ট। বলে ফেলো, বলতে পুরো সপ্তাহ লাগিয়ো না।

আমাদের হাতে এখন প্রচুর সময় আছে। কিন্তু সে যাই হোক, খবরটা সম্পর্কে আমি এখনও পুরোপুরি নিশ্চিত নই, ঠাণ্ডা স্বরে বলল ফোরম্যান। আমরা সবাই জানি পিস্তল ড্র করায় তুমি যথেষ্ট ফাস্ট, তাই না?

আমার চেয়ে ফাস্ট কারও দেখা অন্তত আমি এখনও পাইনি, স্বীকার করল, বার্ট।

তার মানে গতরাতের আগে, এই তো? বলে চলল ডোভার। জেমসের তুলনায় তুমি ছিলে অত্যন্ত স্লো। অথচ এর চেয়ে দ্রুত ড্র করতে তোমাকে আমি আগে কখনও দেখিনি। তবু জেমস তোমাকে খুবই সহজে হারিয়ে দিল।

তুমি কি বোঝাতে চাইছ? তিক্ত স্বরে প্রশ্ন করল বার্ট, কারণ ফোরম্যানের মুখে বসের সমালোচনা ওর ঠিক পছন্দ হচ্ছে না।

হ্যাচেটস ফলি থেকে টারম্যানের দলটাকে কে শেষ করেছিল তা তোমার মনে আছে?

বিদ্যুৎ এরফান, বলল সে। তুমি বলতে চাও জেমসই-

আমি তাই আঁচ করছি, বাধা দিয়ে বলে উঠল ডোভার। এ ছাড়া আর কেউ তোমাকে এমন ছেলেমানুষের মত হারাতে পারবে বলে আমার বিশ্বাস হয় না।

বার্টের ফোলা মুখটা যেন আরও একটু ফেকাসে হলো। ডোভারের কথা যদি সত্যি হয়, তাহলে সে ড্র করার চেষ্টা করে মৃত্যুর দুয়ার থেকেই ফিরে এসেছে। এরফান ওই টারম্যানের গরু চোরের দলটাকে ধ্বংস করার পর সৎ কাউম্যান হয়ে একেবারে হারিয়ে গেলেও টপ আউটল গানম্যান হিসেবে ওর সুনাম এখনও মানুষ ভুলে যায়নি।

বার্ট নীরবে বসে রইল। ভুরুতে দুশ্চিন্তার ভাঁজ পড়ে ওর বিকৃত মুখ এখন আরও কুৎসিত দেখাচ্ছে। সে যখন আবার মুখ তুলে চাইল তখন তার চেহারা দৃঢ় আত্মবিশ্বাসে কঠিন হয়ে উঠেছে।

এরফান জেসাপই হোক বা না হোক, সেও মানুষ, এবং আমি ওকে যেমন করে পারি শেষ না করে ছাড়ব না, বলল বার্ট। ওর সম্পর্কে যেসব গল্প শোনা যায় সেগুলো যদি সত্যি হয় তবে সে কয়েকবারই ফাঁসিতে ঝোলার থেকে বেঁচে গেছে। কিন্তু ওর কপাল সবসময়েই এমন ভাল যাবে তার কোন কারণ নেই। শোনো, তোমার এই ধারণার কথা যেন গোপন থাকে সেদিকে তুমি খেয়াল রেখো। এই কথা যদি কোনক্রমে প্রকাশ হয়ে পড়ে তাহলে শহরের সবকটা ভীত কয়োটি ওকে শ্রদ্ধার চোখে দেখে ওর কথা মতই চলবে।

কথাটা বাইবেলের বাণীর মতই সত্যি, স্বীকার করল ডোভার। বিশেষ করে ওর কাছে গতরাতে মার খাওয়ায় শহরের লোকজনের কাছে তোমার মর্যাদা অবশ্যই ক্ষুণ্ণ হয়েছে। ওকে এখন আমাদের শেষ করতেই হবে, নইলে সে-ই আমাদের শেষ করবে। ওর জন্যে আমার ওষুধ হচ্ছে পিঠে একটা বুলেট। কিন্তু তোমার হয়ত অন্য কোন প্ল্যান থাকতে পারে।

আমার আস্তিনের নিচে একটা ভাল তাস লুকানো আছে, যার কথা এখনও কেউ জানে না, বলল বার্ট। ঠিক সময় মতই ওটা আমি খেলব; এবং খেলায় জেতার জন্যে ওই একটা তাসই হবে যথেষ্ট।

ডোভার বিদায় নিয়ে চলে যাওয়ার পরও র‍্যাঞ্চার অনেকক্ষণ ওখানে বসে চুরুট চিবাচ্ছে। চিন্তায় তার কপালে গভীর ভাঁজ পড়েছে। কিন্তু লেজি এম পাওয়ার জন্যে তাকে যে-কোন উপায়েই হোক লড়তে হবে-এবং ওই মেয়েটাকেও তার চাই। ওদের শেষ সাক্ষাতের কথা স্মরণ করে তার মুখ থেকে একটা গালি বেরিয়ে এলো।

ইচ্ছায় হোক, বা অনিচ্ছাতেই হোক, মেয়েটাকে আমার পেতেই হবে, দাঁত কিড়মিড় করে বলল সে। এবং যে বাগড়া দিচ্ছে–বাকিটা অসমাপ্তই রাখল বার্ট।

*

বিশাল লোকটা বর্ষাকালে পানির তোড়ে তৈরি একটা গভীর নালার ঢাল বেয়ে এঁকেবেঁকে তার পেপানিকে উপরে উঠিয়ে কিছু ঘন ঝোঁপ পেরিয়ে চূড়ায় উঠে খোলা রেঞ্জের দিকে তাকিয়ে খিস্তি করে লাগাম টেনে ঘোড়া থামাল। ওখানে গোটাছয়েক লোক বেশ নিশ্চিন্ত ধীর গতিতে লেজি এমের গরু জড়ো করছে। ওদের কেউ তার পরিচিত নয়। চট করে রাইফেলটা খাপ থেকে বের করে নিয়ে ঘোড়ার পিঠ থেকে ঝাঁপ দিয়ে একটা ঝোঁপের আড়ালে চলে গেল। ঠিক সময় মতই নিরাপদ আশ্রয় নিয়েছে ও, কারণ ওই মুহূর্তেই ঘোড়ার গায়ে ভোঁতা শব্দ তুলে একটা বুলেট এসে বিধল; পরক্ষণেই শোনা গেল রাইফেলের ক্রুদ্ধ গর্জন। ঘোড়াটা মাটিতে পড়ে কিছুক্ষণ পা ছুঁড়ে স্থির হয়ে গেল।

রাইফেলের মাথাটা ঝোঁপের ফাঁক দিয়ে সামান্য একটু বের করে পরপর তিনটে গুলি ছুঁড়ল সে, একজন রাইডারকে ঘোড়ার পিঠ থেকে পড়ে যেতে দেখে সে সন্তুষ্ট হলো।

আমার ঘোড়াটাকে তোমরা মেরেছ বটে, বলল সে, কিন্তু তার শোধও আমি সাথে সাথেই তুলে নিয়েছি।

সে জানে বর্তমান পরিস্থিতিতে তার বাঁচার কোন আশা নেই। ঘোড়া ছাড়া তার করার কিছুই নেই; এখন ওরা নিজস্ব সময়ে ওকে ঘিরে ফেলে যখন খুশি মারতে পারবে। কিন্তু সে অবাক হয়ে দেখল রাইডাররা আর কোন গুলি ছুঁড়ল, না; ওরা যত জলদি সম্ভব গরুগুলোকে রেঞ্জ থেকে সরিয়ে নিতে ব্যস্ত হলো। সে আরও কয়েক রাউন্ড গুলি ছুঁড়ল বটে কিন্তু তাতে ওদের কোন ক্ষতি হলো না। যখন রাইডাররা রেঞ্জের ওপর বিন্দুতে পরিণত হলো তখন কাউবয় তার আশ্রয়। ছেড়ে উঠে দাঁড়াল।

অবাক কাণ্ড! বলে উঠল পাঞ্চার। বিষণ্ণ দৃষ্টিতে নিজের ঘোড়াটার দিকে তাকাল। তুমি এমন কিছু ভাল ঘোড়া ছিলে না বটে, কিন্তু তবু বর্তমান পরিস্থিতিতে তোমার জন্যে আমি দুই মাসের বেতনও খুশি মনেই দিতে রাজি হতাম, মন্তব্য করল সে। এখান থেকে ব্ল্যাঞ্চ অন্তত দশ মাইল দূরে। আমার কপাল খারাপ, কি আর করা!

যেসব মানুষ ঘোড়ার পিঠেই বেশিরভাগ সময় কাটায় তাদের জন্যে পায়ে হেঁটে চলা একটা অভিশাপ-তাও আবার কড়া রোদে উঁচু গোড়ালির বুট পরে। তার ওপর গোদের ওপর বিষফোঁড়া হিসেবে রয়েছে চল্লিশ পাউন্ড ভারী জিন আর রাইফেল এবং মাথার সাজ। কিন্তু এই গরু চুরির খবর যত জলদি সম্ভব লেজি এমে পৌঁছে দেয়া খুব জরুরী। মনের ঝাল মিটিয়ে আরও একটা বিচ্ছিরি গালি দিয়ে রওনা হলো কাউবয়।

যাত্রাটা সে যতটা কষ্টের হবে মনে করেছিল তার চেয়েও খারাপ হলো। প্রথম দুই মাইল যেতে না যেতেই ওর পায়ে ফোস্কা পড়ে গেল। এরপর প্রতি পদক্ষেপ হলো অত্যন্ত বেদনাদায়ক। রোদের হাত থেকে বাচার জন্যে মাথার ওপর ধরা জিনটা দ্বিগুণ ভারী হয়ে উঠল। জট পাকানো লম্বা ঘাসে যতবার হোঁচট খাচ্ছে, ওর মুখ থেকে গালি বেরোচ্ছে। শেষে গলা শুকিয়ে এমন অবস্থা যে গালিও বের হলো না আর।

হোঁচট খেতে খেতে একপা একপা করে এগিয়ে চলেছে সে। এখন কেবল মনোবল আর জিদের বশেই এগোচ্ছে লোকটা; যে করেই হোক ওকে নিজেদের। লেজি এম র‍্যাঞ্চে পৌঁছতেই হবে। এই দুর্ভোগের প্রতিশোধ সে নিয়েই ছাড়বে। কটনউড আর উইলোতে ঘেরা ঝর্নাটার কাছে এসে থামল কাউবয়। বড় একটা। গাছের ছায়ায় জিনটা নামিয়ে রেখে ঝর্ণা থেকে আশ মিটিয়ে পানি খেয়ে পানির বোতলটা ভরে নিয়ে গাছের তলায় বসে সে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে আবার হাটা ধরল। র‍্যাঞ্চের কাছাকাছি পৌঁছে গেছে সে। শেষ কয়েকশো গজ প্রায় হামাগুড়ি দিয়েই এগোল ও। বাঙ্ক-হাউসে ঢুকে কোনমতে জিনটা নামিয়ে রেখে সামনের চেয়ারটাতে বসে পড়ল ক্লান্ত লোকটা।

তুমি হেঁটে ফিরতে গেলে কেন? প্রশ্ন করল ল্যাঙ্কি।

কারণ আমার কোন পাখা নেই, গাধা ছেলে, তিক্ত স্বরে জবাব দিল পরিশ্রান্ত কাউবয়। আমার জন্যে কিছু খাবার ব্যবস্থা করে জেমসকে ডেকে আনো। সাপারের সময় আগেই পেরিয়ে গেছে।

এরফান নীরবে বসে ওর সব কথা শুনল।

আবার সেই ব্ল্যাক মাস্ক, না? বলল সে। ওরা আমাদের প্রায় পঞ্চাশটা গরু নিয়ে গেছে?

আমি রাইফেল ছুঁড়ে ওদের কাজ যতটা সম্ভব কঠিন করেও ওদের ঠেকাতে পারিনি, বলল বিগ বয়। ওরা সংখ্যায় অনেক বেশি ছিল।

ভাবছি ওরা তোমাকে প্রথমে কেন শেষ করল না, মন্তব্য করল হেনডন।

এর কারণ ওদের সাহসের অভাব। আমি গুলি ছুড়ে ওদের একটাকে বেশ ভালরকম জখম করেছি। আমার পিছনে এলে ওরা অন্তত কিছু লোক মরত।

মাথা নাড়ল এরফান। আমার ধারণা এর পিছনে আরও কিছু কারণ আছে।

পুবের দিগন্তে একটা সোনালি আলো গাঢ় হয়ে হয়ে আরও একটা প্রভাতের আগমন ঘোষণা করল। সমতল রেঞ্জ এবং পাহাড়ের পাদদেশে কিছুটা রক্তাভ রঙের কুয়াশা ঘুরপাক খাচ্ছে। পাহাড়ের চূড়া থেকে চিমনির ধোয়ার মত বাষ্প উপর দিকে উঠছে। লেজি এম র‍্যাঞ্চের লোকজন সবাই যেন উত্তেজনায় টগবগ করে ফুটছে। কেবল লরি আর রাধুনী ছাড়া আর সবার সাথে এরফান কথা বলছে। শুধু গরু উদ্ধার করেই সে ক্ষান্ত হতে চায় না, চোরদের শায়েস্তা করাও ওর উদ্দেশ্য।

র‍্যাঞ্চের সবথেকে বিক্ষুব্ধ মানুষ হচ্ছে লরি। তার এই অক্ষম অবস্থার জন্যে নিজেকে সে কিছুতেই ক্ষমা করতে পারছে না। কাউবয়ের দল রওনা হয়ে যাওয়ার পর ওকে শান্ত করতে ফিলের অনেক বেগ পেতে হলো।

কাঁধে চোট পাওয়ার কারণেই আমাকে আজ এই আনন্দ থেকে বঞ্চিত হতে হচ্ছে। কথাটা শেষ করেই ফিলের চেহারা দেখে সে টের পেল ভুল কথা বলা হয়ে গেছে। আমি ঠিক ওকথা বোঝাতে চাইনি, কিন্তু-

তুমি বয়েজদের সাথে রাইড করেই বেশি আনন্দ পেতে, কথাটা শান্ত-খুব বেশি শান্ত স্বরে শেষ করল ফিল। লরির যদি মেয়েদের সাথে মিশে ওদের মন জুগিয়ে চলার কৌশল শেখা থাকত তবে সে কখনও ওই কথা বলত না।

বিগ বয় খাওয়া সেরে কয়েক ঘণ্টা ঘুমিয়ে কিছুটা ফ্রেশ হয়ে নেয়ায় সেও ওদের সাথে যোগ দিয়ে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্যে জিদ ধরে ঘটনাস্থলে পৌঁছে দিল। ওরা দেখল ঘোড়াটাকে শকুনে খেয়ে পুরোই শেষ করে ফেলেছে। তবে রাসলারদের যাত্রাপথ খুঁজে বের করতে ওদের বেশি সময় লাগল না। ওরা ট্রেইলটা ঢাকার কোন চেষ্টাই করেনি এটা লক্ষ করে এরফানের মন সন্দিগ্ধ হয়ে উঠল। ট্রেইলটা সোজা উত্তরের পাহাড়ের দিকে কিছুটা দূর এগিয়ে হঠাৎ মোড় নিয়ে ডান দিকে ঘুরে পাহাড়ী জঙ্গলে ঢুকেছে। এরফান সবাইকে রাইফেল বের করে সাবধানে এগোবার নির্দেশ দিল। স্পষ্টতই ওরা গরুগুলোকে নিচের ভাল ঘাসে ভরা বেসিনের দিকে নেয়ার কোন চেষ্টাই করেনি। সরু খাঁজটা ধরে এগিয়ে এক জায়গায় ওটা বারো গজ চওড়া হলো। অ্যামবুশ আশা করে সবাইকে আড়ালেই দাঁড় করিয়ে এরফান, বিগ বয়, আর হেনডন খোলায় বেরিয়ে এসে থেমে দাঁড়ানোর পরও কোন গুলি এলো না। অবাক হয়ে হেনডন এরফানের দিকে তাকাল।

এটা কেমন ধরনের কাজ হলো? প্রশ্ন করল সে। গরুগুলো এখানে কোন পাহারা ছাড়া রাখার কারণ একটাই হতে পারে, আমরা যেন এগুলো সহজে খুঁজে পাই। এর পিছনে বিশেষ কোন উদ্দেশ্য নিশ্চয় আছে।

আমার মনে হচ্ছে তুমি ঠিকই বলেছ, হেনডন, স্বীকার করল এরফান। ওরা ট্রাক না ঢেকে একটা টোপ ফেলেছিল, আর সেটা আমি গিলেছি। ওরা কেন আমাদের এখানে টেনে এনেছে তা আমি জানি না, কিন্তু সেটা আমি এখনই দেখছি। তিনজনে মিলে তোমরা সহজেই গরুগুলোকে র‍্যাঞ্চে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে পারবে; বাকি লোক আমার সাথে আসবে।

বিগ বয়ের সাথে আরও দুজনকে গরুগুলো লেজি এম রেঞ্জে ফিরিয়ে নেওয়ার দায়িত্ব দিয়ে এরফান বাকি লোক নিয়ে দ্রুত বেগে র‍্যাঞ্চে ফেরার পথ ধরল। পথে কোথাও সময় নষ্ট না করেও ফিরতে সন্ধ্যা হয়ে এলো। দূর থেকে সবকিছু স্বাভাবিক দেখালেও র‍্যাঞ্চের কোথাও এখনও বাতি জ্বলছে না দেখে সাবধান হলো ওরা। ওদের একজন রাঁধুনীকে খাবার তৈরি করার নির্দেশ দিতে চিৎকার করে নিজেদের আগমনবার্তা জানাল। কিন্তু রাধুনীর দিক থেকে কোন সাড়া এলো না।

এখানে নিশ্চয় কোন সমস্যা আছে-চলো র‍্যাঞ্চহাউসে গিয়ে দেখা যাক, বলে এরফানই প্রথমে এগোল। বাড়িটাও নিস্তব্ধ আর অন্ধকার। ফোরম্যান। পিছনের দরজার দিকে এগিয়ে ওটা ভোলাই পেল। ভিতরে ঢুকে একটা অস্পষ্ট ককানির শব্দে সে থমকে থেমে দাঁড়াল। একটা ম্যাচ জ্বেলে এরফান দেখল আতঙ্কে বিস্ফারিত চোখে রাধুনী ড্যানিয়েল ওর দিকে তাকিয়ে আছে। ওকে চিনতে পেরে আশ্বস্ত হলো লোকটা। বাতি জ্বেলে ছুরি বের করে চেয়ারের সাথে বাধা বাধন কেটে তার গ্যাগ খুলে দিল এরফান।

ঘটনাটা কি? প্রশ্ন করল।

মুখ শুকিয়ে থাকায় জবাব দিতে কয়েক সেকেন্ড দেরি হলো। সে জানাল, ব্ল্যাক মাস্কের লোক মিস মাস্টারসনকে নিয়ে গেছে।

এরফান সিঁড়ি বেয়ে দ্রুত উপরে উঠে ফিলের কামরায় ঢুকে দেখল রাধুনীর স্ত্রী ডিনাকেও একটা চেয়ারের সাথে বেঁধে রাখা হয়েছে। বাঁধন কেটে গ্যাগ খুলে দেয়ার পরও মেয়েটার আতঙ্ক কাটেনি, প্রলাপ বকছে সে। এবার সে লরির কামরায় গিয়ে ওকেও বাধা অবস্থায় দেখতে পেল।

তোমাকে তো প্রায় পরিণত বয়স্ক পুরুষের মতই দেখাচ্ছে, ঠাট্টা করে বলল এরফান। এবার তুমি আমাদের কিছু শোনাও।

ওকে মুক্ত করার পর সে স্বাভাবিক ভাবেই কথা বলতে পারল। বেশ লম্বা একটা কাহিনী। তখনও বিকেল হয়নি, এমন সময়ে বাইরে ঘোড়ার খুরের আর কথাবার্তার আওয়াজ পেয়ে সে মনে করেছিল র‍্যাঞ্চের লোকজন তাড়াতাড়িই ফিরে এসেছে। এই সময়ে হঠাৎ ওর দরজা খুলে গেল, কিন্তু তার সাধের তরুণী নার্সের বদলে ঘরে ঢুকল দুজন কালো মুখোশধারী লোক। ওদের একজন পিস্তল তাক করে ওকে কাভার করে রাখল, অন্যজন ওকে বেঁধে ফেলল।

আমি এই জখম হাত নিয়ে ওদের বিরুদ্ধে গালাগালি ছাড়া আর কিছুই করতে পারিনি, ব্যাখ্যা করল লরি, কিন্তু আমাকে গ্যাগ করার পর বাধ্য হয়ে গালাগালিও বন্ধ করতে হলো। ওরা কিসের উদ্দেশ্যে এসেছিল?

ফিলকে নিতে, এবং ওকে নিয়েও গেছে, এরফান জানাল। কথাটা শুনে অসুস্থ লোকটার ভাযা অলঙ্কত হয়ে উঠল।

ওহ, এখন গালাগালি করে কি লাভ-ওতে সমস্যার কোন সমাধান হবে না।

তুমি কি আজ রাতেই ওকে উদ্ধার করতে যাচ্ছ? উদ্বিগ্ন স্বরে প্রশ্ন করল লরি।

না, এখন আমি ঘুমাতে যাচ্ছি, তুমিও তা-ই করার চেষ্টা করো, হেসে কথাটা বলে গালাগালি শোনার অপেক্ষা না করেই ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল এরফান।

বাঙ্কহাউসে গিয়ে খাওয়া সেরে নিজের ঘরে ফিরল সে। এবার তার মনে পড়ল যে ফেরার পর থেকে এখন পর্যন্ত টমিকে কোথাও দেখতে পায়নি ও। ওকে ডেকে বা শিস দিয়েও কোন লাভ হলো না। নিজের কামরাটা ভাল করে পরীক্ষা করে দেখল সব কিছুই ঠিক আছে। কেউ কোনকিছু ঘাটাঘাটি করেনি। শেষে সে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছল যে মেয়েটাই ছিল ওদের এই রেইডের মূল উদ্দেশ্য। শেডিই কি শোধ নেয়ার জন্যে এটা করিয়েছে? কেবল আর একটা লোকেরই এতে কোন স্বার্থ থাকতে পারে। তবে কি ব্ল্যাক বার্টই তার লোকজনকে কালো মুখোশ পরিয়ে এই কাজটা করিয়েছে, যেন সবাই মনে করে এটা ডাকাতদেরই কারসাজি?

১৫.

গতদিন হাড় ভাঙা খাটুনি গেলেও লেজি এমের ফোরম্যান সূর্য ওঠার সঙ্গে সঙ্গে সবাইকে কাজে যাওয়ার জন্যে তৈরি দেখতে পেল। কিন্তু আজ ওদের মধ্যে আগের সেই হাসিখুশি ভাবটা আর নেই; সবার মুখই গোমড়া। মিস মাস্টারসন ওদের সবার কাছেই ছিল খুব জনপ্রিয়। এছাড়া তরুণী মালিকাকে এভাবে তুলে নিয়ে যাওয়াকে ওদের প্রত্যেকের কাছেই ব্যক্তিগতভাবে অপমানজনক বলে মনে হচ্ছে। ওই লোকগুলো ওদের এভাবে বোকা বানানোয় রীতিমত খেপে আছে ওরা।

          ওরা প্রত্যেকেই নিজেদের পিস্তল আর রাইফেলে যত্নের সাথে গুলি ভরে নিয়েছে। ওদের বেল্টগুলোও পুরোপুরি বুলেটে ঠাসা। ওরা সবাই বাছাই করা ঘোড়ায় জিন চাপিয়ে এরফানের জন্যে অপেক্ষা করছে-কারণ সে আজ তার নিজের কামরাতেই নাস্তা খাচ্ছে। এরফান বেরোবার জন্যে মাত্র ঘুরেছে, এই সময়ে হাঁপাতে হাঁপাতে টমি তার প্রভুর পায়ের কাছে শুয়ে পড়ল। ঝুঁকে কুকুরের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে গিয়ে ওর চোখে পড়ল টমির চামড়ার কলারের ফাঁকে একটা সাদা কি যেন গোঁজা আছে। বের করে দেখল ওটা একটা পেঁচালো কাগজ। ওতে লেখা আছে:

ব্ল্যাক মাস্কের হাতে মেয়েটা গুহায় আছে। জলদি এসো।
        একজন বন্ধু।

চিঠির লেখাটা ঠিক আগের চিঠিগুলোর মত। ওটার দিকে অবাক চোখে চেয়ে থাকল এরফান। ভাবছে, লোকটা কে হতে পারে? হেনডন গতকাল সারাক্ষণ আউটফিটের সাথেই ছিল। মনে হচ্ছে টমি ওদের চোখকে ফাঁকি দিয়ে মেয়েটার পিছু নিয়েছিল, তাই লোকটা ওর মাধ্যমেই চিঠিটা পাঠানোর সুযোগ পেয়েছে। টমিকে আদর করে ওর মাথা চুলকে দিল এরফান।

তুমি নিঃসন্দেহে এই র‍্যাঞ্চেরই একজন, বলল সে।

বাইরে বেরিয়ে এরফান তার লোকজনকে পরিস্থিতিটা জানিয়ে ওদের পরামর্শ চাইল।

হোপে লোক পাঠিয়ে শেরিফকে ঘটনা জানিয়ে একটা পাসি গঠন করালে কেমন হয়? প্রস্তাব দিল একজন।

মাথা নাড়ল ফোরম্যান। টেলর আমাদের মোটেও দেখতে পারে না এ তাছাড়া আমার বিশ্বাস এটা প্রধানত লেজি এমের কাজ। তারচেয়ে বরং টিমের র‍্যাঞ্চে গিয়ে ওর এবং ওর লোকজনের সাহায্য চাওয়া অনেক ভাল ওদের সাহায্য পেলে সহজেই ওই কয়োটিগুলোকে ওদের গর্ত থেকে টেনে বের করতে পারব।

সবাই সমস্বরে ওর প্ল্যান অনুমোদন করল। ল্যাঙ্কি বলল, ওই শেরিফের মুরোদ থাকলে অনেক আগেই এই কাজটা সে করত।

সবার সমর্থন পেয়ে এরফান আর দেরি করল না, সবাই মিলে টিমের এক্স টি র‍্যাঞ্চের পথে রওনা হয়ে গেল ওরা। কেবল লরি, যাকে ওর জখম নিয়ে যেতে দেয়া হয়নি, বিছানা ছেড়ে উঠতে পারেনি বলে ওখানেই শুয়ে অসহায় অবস্থায় ছটফট করছে।

তুমি দুশ্চিন্তা কোরো না, বাছা, আমরা তোমার প্রিনসেসকে ঠিকই ফিরিয়ে আনব, যাওয়ার আগে ওকে আশ্বস্ত করে গেছে ওর ফোরম্যান। সেইসাথে ডাকাতের দলটাকেও নির্মূল করে আসব।

এক্স টি র‍্যাঞ্চে ফ্রেশ ঘোড়া পাওয়া যাবে জেনে ঘোড়াগুলোকে ঊর্ধ্বশ্বাসে ছোটাল ওরা। ট্রেইলটা সহজ হওয়ায় সময় মতই পৌঁছল সবাই। টিম ওদের একটা আনন্দের হাঁক ছেড়ে স্বাগত জানাল। এরফান যখন ওদের আসার কারণ জানানোয় টিম সঙ্গে সঙ্গে বলল, আমরা সাহায্য করব মানে? চেষ্টা করেও তুমি আমাদের ঠেকাতে পারবে না। কাউকে প্রকাশ্যে দিনের আলোয় জোর করে উঠিয়ে নিয়ে যাবে, তা-ও ফুলের মত সুন্দর একটা ভদ্র মেয়েকে-যে কিনা আমারই এক ঘনিষ্ঠ বন্ধুর মেয়ে! ওদের আমরা বুঝিয়ে দেব যে এটা মগের মুল্লুক নয়! তুমি ওর সম্পর্কে কিছু জানো? বুড়ো আঙুল ঝাঁকিয়ে বাঙ্কহাউসের বাইরে দাঁড়ানো ইয়র্কিকে দেখাল টিম।

তোমাদের আউটফিটের কেউ? প্রশ্ন করল এরফান।

এখনও নয়; আজ সকালেই সে এখানে এসেছে, মনে হয় ও একটা কাজের খোঁজেই আছে, জবাব দিল টিম। ওকে দেখে কি মনে হয় তোমার?

মনে হয় গোলাগুলিতে ওর ভাল দখল আছে; যে পিস্তল দুটো ওর কোমরে। ঝুলছে সেগুলো মোটেও নতুন নয়। লড়াইয়ে দক্ষতা আছে, জবাব দিল এরফান।

আমারও মনে হচ্ছে তোমার কথাই ঠিক, বলল টিম। আজই তার প্রমাণ পাওয়া যাবে। ওকে আমাদের সাথে এই নাচে যোগ দিতে ডাকলে কেমন হয়? আমি এক ডলার বাজি ধরছি সে ঝুঁকি না নিয়ে এড়িয়ে যেতে চাইবে।

এটা সরাসরি ডাকাতি, কিন্তু তবু আমি বাজিটা ধরছি।

টিম এগিয়ে গিয়ে নির্বিকার যুবকের সাথে কথা বলে ফিরে এসে এরফানকে একটা ডলার দিয়ে বলল, বেশি টাকা না ধরেই ভাল করেছি আমি। আশ্চর্য, ওর ভাব দেখে মনে হলো আমি যেন ওকে একটা ড্রিঙ্ক অফার করছি!

এরফান টিমের দিকে চেয়ে হাসল। এটা ফেয়ার বাজি ধরিনি আমি; ওই লোক আমারই বন্ধু। ও এখানে চাকরির খোঁজে আসেনি, কিন্তু তুমি ওর ওপর পুরো ভরসা রাখতে পারো, বলে ডলারটা ওকে ফেরত দিল এরফান।

ওর দিকে মুঠি কঁকাল টিম। তুমি একটা বুড়ো শয়তান, বেশি গভীর জলের মাছ, বলল সে। তবে আমি তোমাকে শেষ পর্যন্ত সমর্থন দিয়ে যাব।

ওখানে ঘোড়া বদল করে নিয়ে টিম আর ওর পাঁচজন লোক সহ ইয়র্কিকে সাথে নিয়ে দল ভারী করে ওরা পাহাড়ের চূড়ায় গুহার উদ্দেশে রওনা হয়ে গেল। কয়েক মাইল ঘেসো সমতল জমি সহজেই পার হয়ে এবার পাহাড়ে ওঠা শুরু করল ওরা। ওদের মধ্যে খুব কমই কথাবার্তা হচ্ছে। প্রত্যেকেই নিজের ঘোড়া আর ট্রেইলের ওপর তীক্ষ্ণ নজর রেখেছে, কারণ একবার ঘোড়ার পা ফস্কালে যে-কোন অঘটন ঘটে যেতে পারে।

মাইলের পর মাইল কষ্টসাধ্য পথ বেয়ে উপরে উঠছে ওরা। পাইন জঙ্গলের পরে ঘন ঝোঁপঝাড়ের ভিতর দিয়ে পথ করে নিয়ে ওদের এগোতে হচ্ছে। কিছুদূর যাওয়ার পর একটা ঢালের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময়ে নিচে কতগুলো গরু আর ঘোড়াকে আনন্দের সাথে ঘাসের ওপর চরতে দেখা গেল।

খুব শান্তিময় একটা পরিবেশ, তাই না? মন্তব্য করল টিম। কিন্তু আমি বাজি ধরে বলতে পারি ওগুলো সব চুরির মাল।

ক্যানিয়নের খাড়া পাথুরে দেয়ালের আশি ফুট উঁচুতে গুহায় ঢোকার কার্নিস। ওদের ওখান থেকে টেনে বের করা বোতলের ছিপি বের করার মত সহজ কাজ হবে না, বলল এরফান। হয়ত গুহার ভেতরে ঢোকার অন্য কোন পথও থাকতে পারে, কিন্তু কেবল সরু কার্নিসের ওপর দিয়ে যাওয়ার পথটাই কেবল আমার পরিচিত। কিন্তু ওই কার্নিসের ওপর ওদের একটা লোক থাকলে তার পক্ষে বিশজনকে ঠেকিয়ে রাখা সম্ভব। তাই আমার পরামর্শ হচ্ছে, আমি দুতিনজন লোক নিয়ে কার্নির্স ধরে এগোব, বাকি সবাই উপত্যকার এপাশেই ঝোঁপের ভিতর লুকিয়ে আমাদের কাভার দেবে। এখান থেকে গুহার মুখের দূরত্ব সাতশোর বেশি হবে না; গুহা থেকে কেউ বেরোলেই তোমরা তাকে গুলি করবে।

এর চেয়ে ভাল প্রস্তাব কেউ দিতে না পারায় ওর কথাই সবাই মেনে নিল। তাই এরফান, ইয়র্কি, ল্যাঙ্কি আর বিগ বয়-যার ধারণা ওদের কাছে ওর একটা দেনা রয়ে গেছে-কার্নিসের দিকে এগোল। যতটা সম্ভব আড়াল ধরে এগিয়ে ওরা। শীঘ্রি গুহার মুখে পৌঁছে গেল। ও-পথেই এরফানকে গুহায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। গুহার মুখে কোন গার্ড নেই দেখে ঘোড়াগুলোকে লুকিয়ে রেখে ওরা কার্নিসে ওঠার পথ ধরল। তাকিয়ে দেখল করালে কয়েকটা ঘোড়া দেখা যাচ্ছে। ওরা গুহার কাছে প্রায় পৌঁছে গেছে ঠিক এই সময়ে পরপর দুটো গুলির শব্দ। শোনা গেল; কিন্তু বেসিনের ওপাশ থেকে গুলি আসেনি; এসেছে কোন গুপ্ত অবস্থান থেকে।

ওটা সতর্ক করার নির্দেশগুহার মুখে না, থেকে ওরা আর কোথাও থেকে নজর রেখেছে, বলল ফোরম্যান।

ওই সতর্ক সঙ্কেত পেয়ে নিশ্চয় কিছু লোক গুহার মুখে বেরিয়ে এসেছিল; বেসিনের ওপাশ থেকে গুলিবৃষ্টি শুরু হলো। বোঝা গেল টিমও তার লোকজন নিয়ে খেলায় নেমেছে। এখন ওই সরু পথ দিয়ে নিচে নামা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠল, কারণ যেসব জায়গায় ক্লিফ ফুলে কিছুটা বেরিয়ে এসেছে সেখানে ওদের দেখা দিতেই হবে। উপরের কার্নিসের ডাকাতরা সেটা ভাল করেই জানে। উপুড় হয়ে শুয়ে ওরা আক্রমণকারীদের দেখা দেয়ার অপেক্ষায় রাইফেল তৈরি রেখেছে।

দেয়ালের সাথে একেবারে সেঁটে থাকো, বয়েজ, নির্দেশ দিল এরফান। আর পাহাড়ের ফোলা জায়গাগুলো ঝট করে পার হবে। ওরা যেন গুলি করার কোন সুযোগ না পায়। ক্লিফের সাথে পিঠ ঠেকিয়ে কনুইয়ে ভর দিয়ে ওরা এক এক ফুট করে গুহার মুখের দিকে এগোচ্ছে। বিপজ্জনক বাঁকগুলো পার হওয়ার সময়ে ওদের কানের পাশ দিয়ে অশুভ শব্দ তুলে উপর থেকে ছোড়া বুলেটগুলো বেরিয়ে গেল। ক্লিফের শেষে বেরিয়ে আসা বাকটা গুহার মুখ থেকে মাত্র বিশ গজ দূরে। এখানে ওরা একটু ভেবে দেখার জন্যে থামল; ওপর থেকে গুলি আসা এখন থেমে গেছে। বেরিয়ে থাকা পাথরটার আড়াল থেকে সাবধানে উঁকি দিয়ে এরফান দেখল, উপরের গার্ড দুজন দেয়ালের সাথে সেটে থাকা শত্রুকে গুলি করে টার্গেটে লাগানোর চেষ্টা নিষ্ফল বুঝেই এবার ধীরে উঠে দাঁড়াল। এই সুবর্ণ সুযোগটা ছাড়ল না সে; রাইফেল তুলে ট্রিগার টিপে দিল। ওদের একজন দুহাত শূন্যে ছুঁড়ে টলতে টলতে চিৎকার করে খাদে পড়ল।

এগিয়ে এসো, বয়েজ, উপরে এখন একজন মাত্র আছে, জানাল এরফান।

কথা শেষ করেই সে দ্রুত পায়ে পাথরটা পেরিয়ে ওপাশে চলে গেল। উপরের লোকটা সঙ্গীর অবস্থা দেখে হতভম্ব হয়ে একটা নিষ্ফল গুলি ছুঁড়েই গুহায় ঢোকার অন্য কোন রাস্তার উদ্দেশে দৌড় দিল। কিন্তু পিছন থেকে একটা গুলি খেয়ে রাইফেল ছেড়ে ঝপ করে লুটিয়ে পড়ল সে। একটা চিৎকার শুনে এরফান ফিরে তাকিয়ে দেখল টিম তার লোকজন নিয়ে কার্নিস বেয়ে উঠে আসছে। ক্লিফের দেয়াল ঘেঁসে দাঁড়িয়ে সে আর সবাইকে এসে পৌঁছা’র সুযোগ দিল। কালো অন্ধকার গুহার মুখটা বিপজ্জনক আর ভয়াবহ দেখাচ্ছে, কিন্তু ওই পথেই ওদের ঢুকতে হবে।

ভাবলাম এখানে আমাদের উপস্থিতি বেশ কিছু কাজে আসবে, উপরে পৌঁছে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল র‍্যাঞ্চার। এখন আমাদের পরবর্তী চাল কি?

গুহার মুখটা দেখিয়ে এরফান বলল, ওই পথেই আমাদেরকে ঝট করে হুড়মুড়িয়ে ঢুকে পড়তে হবে। এতে ঝুঁকি আছে বটে, কিন্তু দ্বিতীয় আর কোন পথ আমার জানা নেই।

যতটা সম্ভব নিজেদের আড়ালে রেখে ওরা একত্রে জড়ো হয়ে সবাই একসাথে গুহার মুখ দিয়ে ঢুকে মেঝের ওপর শুয়ে পড়ল। অন্ধকার চিরে গুলির আগুনের ঝিলিক দেখা যাচ্ছে। কিন্তু মাটিতে শুয়ে পড়ায় গুলিগুলো সব ওদের মাথার ওপর দিয়ে চলে গেল। অন্ধকারে উপুড় হয়ে শুয়েই ওরা পাল্টা জবাব দিল। এরফানের বুদ্ধি মেনে চলায় ওদের কেউ আহত হলো না। বারুদের ঝাঝাল গন্ধ আর নীল ধোয়া ওদের পিছনে গুহার গর্ত দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে, আর এরফানের দল আগুনের ঝিলিক লক্ষ্য করে গুলি করছে। গোলাগুলির শব্দ গুহার দেয়ালে দেয়ালে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। ওরা হয় কিছু মারা পড়েছে অথবা আহত হয়েছে, কারণ ওদের গুলির সংখ্যা এখন বেশ কমে এসেছে। কিন্তু কতজন লোক যে ওদের বিরুদ্ধে লড়ছে তা অন্ধকারে বোঝা যাচ্ছে না। এরফানের নিচু স্বরের একটা আদেশ পেয়ে ওর লোকজন উঠে ছুটে সামনে এগিয়ে গেল।

অন্ধকারে পিস্তলের মুখে বর্শার ফলার মত আগুন দেখা যাচ্ছে এবং সেই আলোতে মুহূর্তের জন্যে কালো মুখোশ পরা মাথা দেখা যাচ্ছে। হামলাকারীরা সেগুলো লক্ষ্য করেই গুলি ছুঁড়ছে। এক্স টি র‍্যাঞ্চের নোক পড়ে গেল। একই সাথে একটা লোকের দেহের সাথে হোঁচট খেল এরফান। প্রায় ওর মুখের কাছে একটা পিস্তল গর্জে উঠল-হোঁচট না খেলে ওই গুলিতে ফোরম্যানের খুলি ফুটো হয়ে যেত। লোকটার কোমর জড়িয়ে ধরে এরফান ওকে নিয়েই মাটিতে পড়ল। লোকটা দুহাতে ফোরম্যানের গলা টিপে ধরল। লোহার সাড়াসির মত আঙুলগুলো এরফানের শ্বাসনালীর ওপর শক্ত হয়ে এঁটে বসেছে। আর কোন। উপায় না দেখে পিস্তলের নল দিয়ে এরফান ওর মাথায় কঠিন বাড়ি বসাল। সাথেসাথে গলা টিপে ধরা লোকটার হাতের আঙুল শিথিল হলো। একটু ককিয়ে সে জ্ঞান হারাল। উঠে দাঁড়িয়ে এরফান দেখল লড়াই শেষ হয়েছে। ওদেরই কেউ একটা লণ্ঠন খুঁজে পেয়ে ওটা জ্বেলেছে। দেখা গেল কাউবয়দের কিছু লোক আহত হয়েছে, কিন্তু মারাত্মক ভাবে জখম হয়নি কেউ। এরফান পিস্তলের আঘাতে যাকে অজ্ঞান করেছে তার হুশ এখনও ফেরেনি। বাকি সবাই অদৃশ্য হয়েছে।

আরও কিছু বাতি জোগাড় করে প্রত্যেকটা গুহা ভাল করে খুঁজে দেখো, নির্দেশ দিল এরফান। এখান থেকে বেরোবার অন্য কোন পথও নিশ্চয় আছে।

ইয়র্কিও অদৃশ্য হয়েছে। লণ্ঠনের আলোর প্রথম ঝলকেই একটা লোককে গুহার আরও ভিতরে অন্ধকারে অদৃশ্য হতে দেখে সে ওর পিছু নিয়েছে। সুড়ং ধরে এগোবার সময়ে একটা সরু আলোর রেখা ওর দৃষ্টি আকর্ষণ করল। ওটার কাছে হাত বাড়িয়ে দেয়াল স্পর্শ করে বুঝল ওটা এটা দরজা-এবং খোলাই আছে। সামান্য ধাক্কা দিয়ে ওটা একটু ফাঁক করে ভিতরে উঁকি দিয়ে দেখল একটা লোক ব্যস্ত হাতে একটা ব্যাগে জিনিসপত্র ভরছে।

ইয়র্কির চোখদুটো রাগে জ্বলে উঠল। দরজা ঠেলে নিঃশব্দে গুহার ঘরে ঢুকল সে। ওকে দেখেই চিনতে পেরেছে ইয়র্কি। ওই লোকটাই শেডি। (কেবল। বর্ণনা থেকেই মানুষ চিনতে পারার এক অদ্ভুত ক্ষমতা পশ্চিমের লোকের আছে।) তারপর সশব্দে দরজা বন্ধ করে একপাশে সরে গেল সে। লোকটা ঝট করে ফিরল, ওকে দেখে বিস্ময়ে লোকটার চোখ বিস্ফারিত হলো। মুখ হাঁ হয়ে গেছে।

কে, ইয়র্কি না? বলল সে।

হ্যাঁ, ঠিকই ধরেছ-আমিই ইয়র্কি, জবাব দিল সে। মিছেই মাল গুছাচ্ছ, তুমি যেখানে যাচ্ছ সেখানে ওগুলো তোমার কোন কাজে আসবে না, শেডি।

ইয়র্কির চালু হাতের গল্প সে-ও শুনেছে। সাক্ষাৎ যমদূত ওর সামনে দাড়িয়ে আছে। টেবিলের ওপর যে মোমবাতিটা জ্বলছিল সেটা এক থাবায় নিভিয়ে দিয়ে লাফিয়ে নিজের জায়গা থেকে সরে গেল শেডি। অন্ধকারে ইয়র্কির গলা শোনা গেল:

ভয় পেয়েছ, শেড়ি? ভাল, অন্ধকার তোমাকে হয়ত কিছুটা ভাল সুযোগ দেবে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তোমাকে মরতেই হবে। তুমি যদি বলো মেয়েটা কোথায় আছে, তবে এবারের মত তোমাকে ছেড়ে দিতে পারি আমি।

তোমার সাথে আমার নরকে দেখা হবে, জবাব এলো।

হয়তো হবে, যদিও সম্ভাবনা কম, আমার জন্যে তোমাকে হয়তো নিষ্ফল অপেক্ষা করতে হবে।

ওর কথার কোন জবাব দিল না আউটল। ভয় পাচেছ কথার শব্দে ইয়র্কি ওর অবস্থান জেনে ফেলবে। কয়েকটা মুহূর্ত নীরবতার মাঝে কাটল। দুজনই উঁচু মানের পিস্তলবাজি, এবং ওরা দুজনেই জানে সামান্য ভুল মানেই মৃত্যু। একটু কুঁজো হয়ে পিস্তল হাতে প্রস্তুত হয়েই কান পেতে স্থির দাঁড়িয়ে আছে শেডি বুটের তলায় কাকর পিষ্ট হওয়ার সামান্য একটু শব্দ ওর কানে এলো। শব্দের উৎসস্থল কোথায় বোঝার চেষ্টায় ওর কান আরও সজাগ হলো আবার শব্দটা শেডির কানে পৌঁছল। শত্রু ওর দিকেই এগিয়ে আসছে ভেবে সে শিউরে উঠল। এবারে শব্দ ঠিক কোন দিক থেকে আসছে নিশ্চিত হয়ে শেডি গুলি করল। বারুদের ঝিলিকে মুহূর্তের আলোয় সে দেখতে পেল ভুল আঁচ করেছিল। একই সাথে দেখল কাউবয়ের হাসিভরা মুখ রয়েছে বেশ কিছুটা বামে। কিন্তু দ্বিতীয় গুলি ছোড়ার আগেই ওদিক থেকে ইয়র্কির পিস্তলটা অন্ধকারে গর্জে উঠল। শেডির বাম দিকটা কাঁধের কাছ থেকে অবশ হয়ে গেল। হাতটা অকেজো ভাবে ঝুলছে। ওর ঠোঁট চিরে একটা গোঙানির আওয়াজ বেরিয়ে এলো।

তোমার বাম ডানাটা জখম হয়েছে, তাই না, শেডি? এবার তোমার ডানটা যাবে, পাখি তারপর–ওখানেই বিদ্রুপের কথা শেষ হলো।

আহত লোকটা বুনো ক্রোধে অন্ধের মত গুলি ছুঁড়ে ডানদিকে ঝাঁপ দিল; কিন্তু এর জবাবে কোন গুলি এলো না। শ্বাস নেয়াও বন্ধ করে চুপ করে দেয়ালে সেটে দাড়িয়ে আছে শেডি। ওর বাম কাধটা এখন ব্যথায় দপদপ করছে। ভাবছে তবে কি সে কপাল জোরে ঠিক জায়গা মতই গুলি লাগাতে পেরেছে?

এই সময়ে বাইরে সুড়ঙ্গে পায়ের আওয়াজ পাওয়া গেল। বাইরে থেকে কেউ জিজ্ঞেস করল, এই, স্ট্রেঞ্জার, তুমি কি ভিতরে?

হ্যাঁ, চলে যাও, আমি ব্যস্ত, জবাব দিল ইয়র্কি। শেডি শিউরে উঠল, কথার সুরটা কোন আহত লোকের নয়।

লোকটার পায়ের শব্দ দূরে চলে যাওয়ার শব্দ শোনা গেল। শেডির কাছে। ইয়র্কির কথাগুলো মৃত্যুর ঘণ্টার মতই শোনাল। আবার সেই অসহ্য নীরবতা কিছুক্ষণ বিরাজ করার পর ইয়র্কির গলা শোনা গেল:

শোনো, শেডি, আমি তোমাকে একটা চমৎকার সুযোগ দিচ্ছি। মোমবাতিটা আমি খুঁজে পেয়েছি, ওটা আমি জ্বালাবার পর আমরা দুজনেই একসাথে ড্র করব–তুমি কি বলো?

ঠিক আছে, জবাব দিল শেডি। গলার স্বর থেকে খুশি চাপার চেষ্টা করল সে।

অল্পক্ষণ পরেই ম্যাচটা জ্বলে উঠল। ওটা জ্বলে ওঠার সাথেই গুলি করল শেডি কিন্তু আগুনটা একটুও নড়ল না। ইয়র্কির ডান কোমরের কাছ থেকে ওর। পিস্তলটা গর্জে উঠল। গুলিতে মগজ ফুটো হয়ে সামনের দিকে উপুড় হয়ে পড়ল আউটল। ইয়র্কির কাছে চাতুরীতে হেরে গেছে সে। চুরি করে জেতার উদ্দেশে ম্যাচ জুলার সাথেই গুলি করেছিল লোকটা-তার ধারণা ছিল ডান হাতে ম্যাচ ধরাবে ইয়র্কি, তাই আগুনের বাম দিকে তাক করে গুলি করেছিল সে। কিন্তু এটা আশা করেই নিজের হাত দেহ থেকে দূরে নিয়ে বাম হাতের নখ দিয়ে ম্যাচ জ্বেলেছিল ইয়র্কি। শেডি বেশি চালাকি করতে গিয়ে নিজের জীবনটাই খোয়াল।

জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্তও সে শঠতাই করে গেল, ওর সম্পর্কে আমি তাহলে ঠিকই শুনেছিলাম, মন্তব্য করল ইয়র্কি।

লোকটা সত্যিই মরেছে কিনা পরীক্ষা করে নিশ্চিত হয়ে খুপরি ছেড়ে বেরিয়ে সে সঙ্গীদের খোঁজে বেরোল। গুহার মুখের কাছে পৌঁছে দেখল অজ্ঞান। লোকটার জ্ঞান ফিরেছে, টিম তাকে জেরা করছে। কঠিন চেহারার লোকটা যে। বদমেজাজী তা তাকে দেখেই বোঝা যায়।

এরফানের সহ্যের সীমা পার হয়ে গেছে। ও যদি মুখ খুলতে না চায়, তাহলে ওকে সোজা ঝুলিয়ে দাও, টিম, বোকা লোকের ওপর নষ্ট করার মত সময় আমাদের নেই, বলল সে।

মৃত্যুর আসন্ন সম্ভাবনায় লোকটা এবার মুখ খুলল।

তোমরা কি জানতে চাও? রুক্ষ স্বরে প্রশ্ন করল সে।

মিস মাস্টারসন কোথায়? জানতে চাইল এরফান। সত্যি কথা না বললে নরকে পৌঁছতে তোমার বেশিক্ষণ লাগবে না।

এখানে একটা মেয়েকে আনা হয়েছিল বটে, কিন্তু ওরা তাকে গোলা-বারুদ লুকিয়ে রাখার গুহায় নিয়ে গেছে, জবাব দিল সে।

ওটা কোথায়? ধমকে উঠল ফোরম্যান।

জানি না-আমাকে কখনও ওখানে নিয়ে যাওয়া হয়নি, বলল সে। আমি অল্পদিন হলো এই দলে যোগ দিয়েছি। এখন মনে হচ্ছে এই দলে যোগ না দেয়াই ভাল ছিল।

এই দলের নেতা কে?

তাকে আমি কখনও দেখিনি। আমাদের আদেশ দিত শেডি নামের একটা চওড়া লোক। দলের সবার চেহারাও আমরা চিনি না, কারণ বেশিরভাগ সময়েই আমাদের চেহারা কালো মুখোশে ঢাকা থাকত।

কেন যেন এরফানের মনে হলো, লোকটা সত্যি কথাই বলছে। সে বলল, তোমার স্বাস্থ্য ভাল রাখতে চাইলে একটা ঘোড়া আর কিছু খাবার সাথে নিয়ে এই দেশ ছেড়ে আর কোথাও চলে যাও।

দুঃখের বিষয় আমরা শেডিকে মিস করেছি, বলল টিম।

না, আমি মিস করিনি, বলে ইয়র্কি সোজা হেঁটে এগিয়ে গেল।

ওর পিঠের দিকে চেয়ে টিম মন্তব্য করল, লোকটা খুব কমই কথা বলে, তাই না?

হাসল এরফান। কিন্তু কথা হচেছ আমরা এখন কি করব?

ইয়র্কির সাথে আরও দুজনকে বাকি গুহাগুলো খুঁজে দেখার জন্যে রেখে বাড়ি ফেরা ছাড়া এখানে আমাদের আর কিছু করার আছে বলে মনে হয় না, জবাব দিল র‍্যাঞ্চার।

এরফানও ওর কথায় সায় দিল। দুই র‍্যাঞ্চ থেকেই একজন করে লোক রেখে পুরো এলাকাটা ভাল করে খুঁজে ডাকাতদের দ্বিতীয় গোপন আস্তানাটা বের করতে পারলেই খবর পাঠাবার নির্দেশ দিয়ে বাকি সবাই ওরা যার যার র‍্যাঞ্চের পথ ধরল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *