১১. হুড়মুড় করে ঘরে ঢুকল কিশোর

হুড়মুড় করে ঘরে ঢুকল কিশোর। মূসা আর রবিনের ঘুম তখনও পুরোপুরি ভাঙেনি। শব্দ শুনে দুজনেই চোখ মেলে তাকাল। কিশোরের হাতের কমিকগুলো দেখে পুরো সজাগ হয়ে গেল।

খাইছে! বিছানায় উঠে বসতে বসতে বলল মুসা, কোথায় পেলে?

পানির কাছে। খুলে বলতে যাচ্ছিল কিশোর, তার আগেই ফোন বাজল।

জ্বালাল! গিয়ে রিসিভার তুলল মুসা। কানে ঠেকিয়ে শুনে ভুরু উচু হয়ে গেল। রবিনের দিকে তাকিয়ে বলল, তোমার আব্বা।

উঠে এসে রিসিভার নিয়ে কানে ঠেকাল রবিন। বাবা, কি ব্যাপারও, তাই নাকি?..আচ্ছা, দেখি… রিসিভার নামিয়ে রেখে বন্ধুদের দিকে ফিরে বলল, মিস্টার বার্টলেট লজ। ভ্যান নুইজে একটা ব্যান্ড পার্টি হবে, একটা ক্যাসেট পাঠাবেন, সেজন্যেই বাড়িতে ফোন করেছিলেন আমাকে। যেতে হবে।

দিয়ে আসতে হবে নাকি আমাকে? মূসার প্রশ্ন।

যদি দয়া করো, হেসে বলল রবিন।

আমিও আসছি তোমাদের সঙ্গে, কিশোর বলল। যেতে যেতে বলব সব।

আচ্ছা। আবার রিসিভার তুলে ডায়াল শুরু করল রবিন। মিস্টার লজকে ফোন করে বলল, এক ঘণ্টার মধ্যেই আসছে সে।

কয়েক মিনিটেই তৈরি হয়ে ঘর থেকে বেরোল তিনজনে। নিচে নামার জন্যে রওনা হলো এলিভেটরের দিকে। ৩১৪ নম্বর ঘরের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় দরজা খুলে গেল। বেরিয়ে এল একজন লোক। শজারুর কাঁটার মত খাড়া খাড়া চুল। হাতে কার্ডবোর্ডের একটা বড় বাক্স। কাঁধের ওপর দিয়ে ফিরে ভেতরে তাকিয়ে বলল, আচ্ছা, চলি। নিচে নিয়ে যাচ্ছি এগুলো।

লোকটা ওদের পেছনে পড়ে গেল। এলিভেটর এল। উঠে পড়ল তিন গোয়েন্দা। ডেকে বলল লোকটা, অ্যাই, দাঁড়াও, চলে যেও না।

ওপেন লেখা বোতামটা টিপে দিল মুসা।

ভেতরে ঢুকল লোকটা। থ্যাংকস। এই জিনিস নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা যায় না। বাপরে বাপ, পাথর!

বাক্সটা পিছলে গেল। খসে পড়ে যাচ্ছিল। তাড়াতাড়ি হাত বাড়িয়ে ধরে ফেলল কিশোর। এই সুযোগে ভেতরে তাকানোর সুযোগ হয়ে গেল। ভিডিও টেপে বোঝাই।

আরেকবার ধন্যবাদ দিল লোকটা। জিজ্ঞেস করল, লবিটা একটু টিপবে, প্লীজ?

মাথা ঝাঁকাল কিশোর। টিপে দিল বোতামটা।

লবিতে এলিভেটর থামতেই আর যাতে পিছলাতে না পারে এমন ভাবে বাক্সটা শক্ত করে ধরে বেরিয়ে গেল লোকটা। তিন গোয়েন্দা রয়ে গেল। আন্ডারগ্রাউন্ড গ্যারেজে নামবে ওরা।

বেলা বেশি হয়নি। রাস্তায় যানবাহনের ভিড় কম। দ্রুত গাড়ি চালিয়ে চলে এল ওরা রকি বীচে বার্টলেট লজের অফিসে। বাড়িতেই অফিস করেছেন তিনি। ওরা থামতে না থামতেই ভেতর থেকে বেরিয়ে এলেন ট্যালেন্ট এজেন্ট, পরনে ফুটবল খেলোয়াড়ের জারসি, চোখে সানগ্লাস। ব্যায়াম করতে যাচ্ছিলেন। রবিনকে দেখে বললেন, এসেছ। এক মিনিট। আসছি। আবার ভেতরে চলে গেলেন তিনি। বেরিয়ে এলেন ছোট একটা প্যাকেট নিয়ে। সেটা রবিনের হাতে দিয়ে বললেন, ঘুম থেকে জাগিয়েছে আমাকে ক্লাবের মালিক। এটা চায়। দিয়ে আসতে পারবে? হাই তুললেন তিনি। বলো, সারা রাতে কাজ করে এত সকালে ওঠা যায়? ব্যবসাটাই নিশাচরদের।

যেন তার হাইয়ের জবাবেই হাই তুলল মুসা। রবিনও। দেখে হেসে ফেললেন তিনি। বাহ্, তোমাদেরও দেখি একই অবস্থা! জেগে ছিলে নাকি সারারাত? জবাবের অপেক্ষা না করেই রবিনকে বললেন, প্যাকেটের গায়ে ঠিকানা আছে। যেতে বেশিক্ষণ লাগবে না। কিছু মনে করে না। আর কাউকে…

বাধা দিয়ে মুসা বলল, না না, ঠিক আছে।

প্যাকেটে গানের টেপ রয়েছে, ক্লাবের মালিকের দরকার। পৌছে দিতে বেশিক্ষণ লাগল না ওদের। স্যান ডিয়েগো ফ্রিওয়ে ধরে আবার লজ অ্যাঞ্জেলেসে ফেরার সময় ট্রাফিকের ভিড় দেখতে পেল।

ফ্রিওয়ে থেকে সরে এল মুসা। বিকল্প রাস্তা হিসেবে বেছে নিল সেপুলভেড়া বুলভারকে। সান্তা মনিকার ভেতর দিয়ে যাওয়ার সময় আবার রাস্তা বদল করে পিকো ধরে চলল সে।

কি হলো? জিজ্ঞেস করল রবিন, যাচ্ছ নাকি কোথাও?

এলামই যখন, জবাব দিল মুসা। আরেকবার ম্যাড ডিকসনের দোকানটা ঘুরে যেতে চাই। কাল রাতের একটা ব্যাপার খচখচ করছে মনের মধ্যে।

পুরানো একটা সবুজ ভ্যানের কাছে এসে গাড়ি রাখল সে। সেই গাড়িটাই, আগের দিন যেটাতে করে কমিক নিয়ে গিয়েছিলেন ডিকসন।

কাল রাতে একটা ভ্যান আরেকটু হলেই চাপা দিয়ে মেরে ফেলেছিল আমাদেরকে, নিজেকেই যেন বলছে মুসা। আমার কাছে তখন অন্য রকম রঙ লেগেছে। কিন্তু কিশোর বলল সবুজ, তাই একবার দেখতে এলাম।

লস অ্যাঞ্জেলেসে সবুজ ভ্যান অনেক আছে, কিশোর বলল।

কিন্তু একটা সূত্র আছে আমাদের হাতে। গাড়ি থেকে নেমে ঘুরে গাড়ির সামনের দিকে চলে গেল মুসা। ফিরে এল একবার দেখেই। গম্ভীর হয়ে মাথা ঝাঁকাল, আমাদের সাইক্লপসকে পেয়েছি। একটা হেডলাইট ভাঙা।

বাকি পথটা আলোচনা করল ওরা ব্যাপারটা নিয়ে।

তার মানে, রবিন বলল, কাল রাতে আমাদের ঘরে ঢুকেছিলেন ডিকসনই। কেন? আমরা তো তাঁর হয়েই কাজ করছি, তাই না? তিনি আমাদের মক্কেল।

হতে পারে, কিশোর বলল, আমাদেরকে একটা কভার হিসেবে ব্যবহার করছেন তিনি।

ঝট করে তার দিকে ফিরল রবিন। তীক্ষ্ণ হয়ে উঠেছে দৃষ্টি। তুমি বলতে চাইছ, তিনিই কমিকগুলো চুরি করেছেন, আমাদের বোকা বানিয়েছেন, কাজে লাগিয়ে দিয়ে সবাইকে দেখাতে চেয়েছেন তিনি নিরপরাধ। যাতে কেউ সন্দেহ করতে না পারে! মাথা ঝাঁকাল সে। চমৎকার একটা মোটিভও রয়েছে তার। বিজ্ঞাপন।

ডিকসনের স্টলের ডাকাতির কথা কনভেনশনে আসা প্রতিটি মানুষ শুনেছে, কিশোর বলল। বাজি রেখে বলতে পারি, সবাই ওরা স্টলে গিয়েছে দেখার জন্য।

একমত হয়ে মুসাও মাথা ঝাঁকাল। হ্যাঁ। এবং এটাই চেয়েছিলেন ম্যাড। তৈরি থেকেছেন ওদের জন্যে। কাল আরও কত বই আনিয়েছেন, মনে আছে? ভ্রূকুটি করল সে। কিন্তু ডাকাতির সময় স্টলেই ছিলেন। তিনি ক্রিমসন ফ্যান্টম নন।

না। কিন্তু তাঁর সহকারী থাকতে বাধা কোথায়? কাজ শেষ করে লোকটাকে দ্রুত সরে পড়তে বলে রেখেছেন।

হ্যাঁ, এইবার মিলে যাচ্ছে খাপে খাপে, মাথা দোলাল মুসা। আর একটা প্রশ্ন। কোন্ লোকটাকে সহকারী বলে মনে হয় তোমার?

রবিন বলল, জেনেই যখন ফেলেছি, আর তাঁকে ব্যবসার সুযোগ দেব কেন? দুষ্ট হাসি ফুটল তার মুখে। চলো, তার ঘাম ছুটিয়ে দিই। হারিয়ে যাওয়া কমিকগুলো রহস্যময় ভাবে আবার আমাদের হাতে চলে এসেছে, সেটা জানলে ভিড়মি খেয়ে পড়বেন পাগল সাহেব।

হাসল কিশোর। কথাটা মন্দ বলোনি। তাঁর প্রতিক্রিয়া দেখেই অনুমান করতে পারব, কাজটা তিনিই করেছেন কি-না। আবার চোরের সন্ধানে বেরোতে হবে কি না আমাদেরকে। হোটেলের ঘর থেকে কমিকগুলো নিয়ে কনভেনশন ফ্লোরেই চলে যাব, চলো।

হোটেলে পৌছে নিজেদের ঘরে চলল ওরা। এই বার ৩১৪ নম্বর ঘরের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় লুই মরগান স্বয়ং বেরিয়ে এলেন। এই যে, তোমাদেরই খুঁজছিলাম! কথাটা কি সত্যি? মিরিনা জরডান নাকি চোরাই কমিকগুলো খুঁজে পেয়েছে?

সবগুলো নয়, কিছু, মরগানের কথায় হাসি চেপে রাখতে পারছে না কিশোর, কেবল আমাদেরগুলো। তাহলে যা আন্দাজ করেছিল, তা-ই ঠিক। মিসেস জরডান এভাবে বিজ্ঞাপনই করতে চেয়েছিলেন।

কিশোরের মনের কথা পড়তে পেরেই যেন মরগান বললেন, মিরিনার মা কিছুই বলছে না। তবে তার মেয়ের বিজ্ঞাপন হয়ে গেল ভালমত। যা-ই হোক, তোমাদের খুঁজছিল মহিলা। কমিকগুলোর জন্যে, ওগুলো হাতে নিয়ে ক্যামেরার সামনে দাঁড়াবে মিরিনা।

নাক ঘোঁত ঘোঁত করলেন তিনি। খবর পেয়ে ইতিমধ্যেই কয়েকজন সাংবাদিক হাজির হয়ে গেছে। মিসেস জরডানের ভাবসাব দেখে মনে হচ্ছে গন উইথ দ্য উইন্ডের মত আরেকটা ছবি তৈরি করতে যাচ্ছেন তিনি।

লোকের ভিড় জমে যাবে তো হোটেলে! কিশোর বলল। মিরিনাকে দেখার জন্যে…

এটাই চেয়েছেন মহিলা। কি করে কাজটা করলেন তিনি, জানি না, ম্যানেজারকে রাজি করিয়ে ফেলেছেন। তার মেয়ের জন্যে আলাদা এলিভেটরের ব্যবস্থা হয়েছে, সাথে থাকবে ইউনিফর্ম পরা আর্দালি।

এক মুহূর্ত চুপ করে থেকে বললেন তিনি, ভাব একবার অবস্থাটা! এই হোটেলে ঢুকেছিল স্টারগার্লের সাধারণ মডেল হয়ে, ফেরত যাবে রীতিমত স্টার হয়ে।

এই সময় দেখা গেল মিরিনাকে। এলিভেটরের দিকে চলেছে। পরনে আবার সেই স্টেলারা স্টারগার্লের পোশাক। কিশোরের ওপর চোখ পড়তে অস্বস্তি ভরা হাসি হাসল। বুঝতে পারল কিশোর, মঞ্চ-ভীতিতে ধরেছে মেয়েটাকে। আরেকটা ব্যাপার, মিরিনা একা।

আমার মনে হয়, ব্যাপারটা মরগানও লক্ষ্য করেছেন, আগেই নিচে চলে গেছেন মিসেস জরডান। রিপোর্টারদের সঙ্গে আলাপ জমিয়েছেন। একটা বিষয়ে অন্তত শিওর হলাম, আগাগোড়া মিথ্যে বলেননি মহিলা।

ঘরে ফিরে গেলেন মরগান।

অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে কিশোর। ভাবছে। ঘটনাটা কি? এরকম করলেন কেন কনভেনশন চীফ? এটা তো তার সম্মেলনের জন্যেও একটা বিরাট বিজ্ঞাপন।

মিরিনাকে কমিকগুলো দেয়া যায়, কি বল? দুই সহকারীর মতামত জানতে চাইল কিশোর।

শ্রাগ করল শুধু মুসা। রবিন বলল, অসুবিধে নেই।

ঘরে ঢুকল ওরা। কমিকগুলো নিয়ে তাড়াতাড়ি বেরিয়ে এসে রওনা দিল এলিভেটরের দিকে।

ব্যক্তিগত এলিভেটরের সামনে তখনও দাঁড়িয়ে রয়েছে মিরিনা। নিঃসঙ্গ। পরনে নীল আলখেল্লাটা শেষ বারের মত টেনেটুনে ঠিক করল। এলিভেটরের দরজার দিকে এমন ভঙ্গিতে তাকাল, যেন আলিবাবার ডাকাতের পাহাড়ের দরজা খুলতে যাচ্ছে। ভেতরে গিয়ে ধনরত্নও পেতে পারে, আবার ডাকাতের তলোয়ারে মুন্ডও কাটা যেতে পারে।

ওর কাছ থেকে দশ ফুট দূরে রয়েছে কিশোর, এই সময় এলিভেটর এল।

মিরিনা, ডাকল কিশোর। মেয়েটা ফিরে তাকাতেই হাতের কমিকগুলো তুলে দেখাল।

কিশোরকে দেখে খুশি হলো মিরিনা। একা যেতে ভয় করছিল যেন। পরিচিত একটা মুখ দেখে সাহস পেল।

এবং এদিকে তাকিয়ে ছিল বলেই এলিভেটরের গোলমালটা চোখে পড়ল না তার। দরজা খুলে গেছে। ভেতরে উজ্জ্বল আলো থাকার কথা। অথচ আলোই নেই। অন্ধকার।

বেরিয়ে এল একটা হাত। আর্দালির নয়। ধরে, এক হ্যাঁচকা টান দিয়ে ভেতরে নিয়ে গেল মিরিনাকে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *