১১. লোকটার মধ্যে মানবিকতার ছিটেফোঁটাও নেই

লোকটার মধ্যে মানবিকতার ছিটেফোঁটাও নেই, কিশোর বলল। দক্ষিণে স্যান কাউন্টারের ফ্র্যান্সিসকোর দিকে চলেছে ওরা। প্রচন্ড স্বার্থপর।

যা বলেছ। তবে সঙ্গে জানোয়ার শব্দটা যোগ করতে পারতে।

আর তেমন কোন কথা হলো না। নীরবে গাড়ি চালাল মুসা। সাতটা বাজে। শহর থেকে মাত্র কয়েক মাইল দূরে রয়েছে। আচমকা চিৎকার করে উঠল কিশোর, রাখ! রাখ!

কি হয়েছে? পথের পাশে গাড়ি নামিয়ে এনে জিজ্ঞেস করল মুসা। তারপর চোখে পড়ল নির্দেশকটা। একটা বাড়ির লাল রঙ করা ছাতে বসানো একটা মুরগী। ভেতরে জ্বলছে নিয়ন আলো। চিকেন লারসেন রেস্টুরেন্টের চিহ্ন।

সেদিকে গাড়ি এগিয়ে নিয়ে গেল মুসা। সে পার্ক করে বেরোতে বেরোতে রওনা হয়ে গেছে কিশোর। একটা সেকেন্ড দেরি করেনি।

দরজায় দাঁড়িয়ে লম্বা দম নিল। খাবারের সুগন্ধে ভুরভুর করছে বাতাস।

আরে সর না, মুসা বলল। জায়গা দাও। লোকে ঢুকবে তো।

কাউন্টারের কাছে এগিয়ে গেল দুজনে। সতেরো-আঠারো বছরের একটা মেয়ে ওদের দিকে তাকিয়ে হাসল। গায়ে লাল শার্ট। পরনে খাকি প্যান্ট। মাথায় সাদা ক্যাপ। সামনের দিকের বাড়তি অংশটা মুরগীর ঠোঁটের মত। ক্যাপে লাল সুতোয় তোলা লেখা পড়ে বোঝা গেল ওর নাম নেলি।

মোলায়েম ভদ্র গলায় ওদেরকে জিজ্ঞেস করল মেয়েটা, কি দেব?

বিষাক্ত খাবার, বিড়বিড় করল মুসা অন্যমনস্ক ভঙ্গিতে।

কী?

আঁ! ও, মুরগী। আর কি। এখানে তো ওটাই স্পেশাল। কিশোরের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করল মুসা, খাবে তো? তোমার পেট…

চুলোয় যাক পেট। অনেক সয়েছি। আর না। এত সুগন্ধ, না খেয়ে আর পারব না।

জানালার কাছে একটা টেবিল বেছে নিল দুজনে। খাবার এল। কিন্তু আসার সঙ্গে সঙ্গে যার ঝাপিয়ে পড়ার কথা সে-ই ছুঁল না। হাত গুটিয়ে বসে রইল মুসা।

কি ব্যাপার? ভুরু নাচাল কিশোর।

বলা যায় না। এখানকার খাবারেই হয়তো বিষ মিশিয়েছে। যদি থাকে?

তা থাকতেই পারে। তবে জীবনটাই ঝুঁকিপূর্ণ। রিস্ক তো নিতেই হবে, বলে আর কথা না বাড়িয়ে মুরগীর মাংসে কামড় বসাল কিশোর।

শ্রাগ করল মুসা। তারপর সে-ও আর দ্বিধা করল না।

এই কেসের সমস্ত রহস্যের সূত্র লুকানো রয়েছে জুনের ব্রিফকেসে, চিবাতে চিবাতে বলল কিশোর। আমার বিশ্বাস। কি ছিল জানতে পারছি না। ওর অ্যামনেশিয়া না কাটলে বলতে পারবে না। যে লোকটা বিষ মেলাতে চায় সে জানে আমরা এ কেসের তদন্ত করছি। আমাদেরকে ভয় দেখিয়ে সরাতে না পারলে তার পরিকল্পনা বদল করবে। সময়টা এগিয়ে নিয়ে আসবে।

তো?

তো, আমাদেরকেও তাড়াতাড়ি রহস্যটা ভেদ করতে হবে। তিনজনকে  সন্দেহ করি আমরা আপাতত। ওদের নিয়েই আলোচনা করা যাক।

করো। মুসা জানে, আলোচনা এবং বিশ্লেষণ দুটোই কিশোর করবে, সে শ্রোতা মাত্র।

প্রথমেই ধরা যাক, কেন অপরাধ করে লোকে। কোন একটা বিশেষ উদ্দেশ্য থাকে। ধরলাম, এ ক্ষেত্রে চিকেন লারসেন কাজটা করতে চাইছেন। তার পক্ষে বিষ মেশানো খুব সহজ। মুরগীর খাবারে কিছু মিশিয়ে দিতে পারেন। কিংবা মুরগী দিয়ে খাবার তৈরি করার সময় মাংসে মেশাতে পারেন।

মাংস মুখে পুরতে গিয়ে মাঝপথে থেমে গেল মুসা। তাকিয়ে রইল সেটার দিকে। তারপর রেখে দিল প্লেটে।

কিন্তু চিকেন লারসেনের উদ্দেশ্য কি? নিজেকেই যেন প্রশ্ন করল কিশোর। মোটিভ?

কি আর? পাগল!

এতটাই পাগল, যে লাখ লাখ মানুষকে মারবেন? নিজের মেয়েকে অ্যাক্সিডেন্ট করিয়ে মেরে ফেলতে চাইবেন?

আমি কি করে জানব? কিন্তু গলা কেটে আর কে মুরগী পাঠাতে যাবে আমাদের কাছে?

যে কেউ পারে। বাজার থেকে কিনে নিলেই হলো। হেনরি অগাসটাসের কথা ধরতে পারি আমরা। তার মোটিভ খুব জোরাল। লারসেনের বদনাম করে দিয়ে তাকে ধ্বংস করে দিতে চায়। নিজের ব্যবসা বাড়ানোর জন্যে। পিটালুমায় মুরগীর ঘরে ঢুকে আজ একটা কথা বলেছিল, খেয়াল করেছ? মুরগীর খাবারের ব্যাপারটা সে নিজে দেখবে। হতে পারে, খাবারে বিষ মেশানোর কথাই বলেছে। এমন কিছু, যেটা মুরগীর তেমন ক্ষতি না করলেও মানুষের করবে। খামারটা না কিনেও যে কেউ করতে পারে কাজটা। যে কেউ ঢুকতে পারে। ইচ্ছে করলে আমরাও মিশিয়ে দিতে পারতাম। কেউ বাধা দেয়ার ছিল না।

বেশ, দুজন গেল। আরেকজন কে?

মিস্টর এক্স। যাকে আমরা চিনিই না এখনও।

সন্দেহভাজনদের নিয়ে আরও কিছুক্ষণ আলোচনা করল ওরা। খাওয়া শেষ করে বেরিয়ে এল। গাড়ির দিকে এগোল।

স্যান ফ্রান্সিসকোতে পৌঁছতে পৌঁছতে অন্ধকার হয়ে গেল। জায়গাটা কুয়াশার জন্যে বিখ্যাত। ইতিমধ্যেই নামতে আরম্ভ করেছে। ঘিরে ফেলেছে গোল্ডেন গেট ব্রিজকে। চোখে পড়ছে কেবল ব্রিজের দুটো টাওয়ারের ওপরের অংশ আর একেবারে নিচে চলমান যানবাহন। মাঝখানটা ফাঁকা, কুয়াশার জন্যে চোখে পড়ে না, যেন কিছুই নেই ওখানটায়।

স্যান ফ্রান্সিসকোর সাতটা পাহাড়েরও একই অবস্থা। চূড়া আর গোড়ার উপত্যকা চোখে পড়ে, মাঝখানটা অদৃশ্য। আরও অনেকবার দেখেছে মুসা। তার কাছে ব্যাপারটা একটা বিরাট রহস্য। এরকম কেন হয়? মধ্যগ্রীষ্মের প্রতি রাতেই ঘটে এই একই কান্ড।

রেডিও অন করে দিল সে। রক মিউজিক বাজছে একটা স্টেশনে।

বিমান বন্দর থেকে মাইল পনেরো দূরে থাকতে অস্বস্তিতে পড়ল। বার বার রিয়ারভিউ মিররের দিকে তাকাচ্ছে। বলল, পেছনে দেখো। একটা লাল রঙের ক্যাভেলিয়ার।

তাতে কি? কিশোরের প্রশ্ন।

মনে হয় আমাদের অনুসরণ করছে।

কে করবে? ভাবতে লাগল কিশোর। ওরা যে স্যান ফ্রান্সিসকোয় এসেছে একথা কেউ জানে না। কিন্তু মুসার সন্দেহ গেল না কিছুতেই। অবশেষে কিশোর বলল, রাখ তো। দেখি।

গতি কমাল মুসা। দ্রুত এগিয়ে এল লাল গাড়িটা। আরেকটু হলেই বাম্পারে বাম্পারে লেগে যাবে। ভেতরে কে আছে দেখার চেষ্টা করল কিশোর। পারল না। হেডলাইটের আলো এসে পড়ে চোখে। ডানে কাটছে গাড়িটা। পাশ কাটিয়ে এগিয়ে যেতে লাগল। জানালা নামিয়ে দিল কিশোর। ওর দিকেই তাকিয়ে রয়েছে। লোকটা। একেবারে মুখোমুখি।

অস্ফুট একটা শব্দ করে প্রায় ছিটকে জানালার কাছ থেকে সরে এল কিশোর। মিস্টার এক্স! সেই আর্মি ক্যামোফ্লেজ জ্যাকেট। মুখে গর্ত গর্ত দাগ। গুটি বসন্ত হলে কিংবা ব্রণের ক্ষত হলে যেমন হয় অনেকটা সে রকম। শীতল একটা হাসি যেন জমাট বেঁধে রয়েছে ঠোঁটে। সাপের চোখের মত ঠান্ডা চোখ জোড়ার দিকে তাকিয়ে মনে হলো, খুনীর চোখের দিকে চেয়ে আছে।

চলো! পালাও! চিৎকার করে মুসাকে বলল কিশোর।

কেন চিৎকার করল কিশোর, দেখার জন্যে রাস্তা থেকে চোখ সরিয়ে দেখতে চাইল মুসা। হেসে উঠল মিস্টার এক্স। স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে গুঁতো মারতে এল ওদের গাড়িকে।

কিন্তু ততক্ষণে গ্যাস প্যাডালে চাপ বাড়িয়ে দিয়েছে মুসা। খেপা ঘোড়ার মত, লাফিয়ে আগে বাড়ল ওদের গাড়ি।

অনুসরণ নয়, রিয়ারভিউ মিররে চট করে একবার দেখে নিয়ে বলল সে, আমাদেরকে রাস্তার সঙ্গে মিশিয়ে দিতে এসেছে ব্যাটা!

ঠিক পেছনে লেগে রইল মিস্টার এক্স। সামনে গাড়িটাড়ি কিছু পড়লে, কিংবা অন্য কোন কারণে মুসা গতি কমাতে বাধ্য হলে শাঁ করে পাশের লেনে সরে যায় লাল গাড়িটা, ধেয়ে এসে ভ্রাম করে বাড়ি লাগিয়ে দেয়। তবে এখনও বডিতে লাগাতে পারেনি, কেবল বাম্পারে লাগিয়েছে।

বেরোও, কিশোর বলল। ওকে আটকে রেখে বেরিয়ে যাও কোনখান দিয়ে। খসাতেই হবে!

দ্রুত মহাসড়ক থেকে নেমে পড়ল মুসা। লাল গাড়িটাও নামল। মুসা যত জোরেই চালাক না কেন, ঠিক পেছনে লেগে থাকে। আর সুযোগ পেলেই এসে গুতো মারে। কিছুই করার নেই আর, চালানো ছাড়া। কিন্তু এভাবে কতক্ষণ?

এই অন্ধকারে কি করবে?

মুসার একবার মনে হলো, রুখে দাঁড়ায়। সে-ও ধাক্কা মারে। কিন্তু ওই গাড়িটা অনেক বেশি শক্ত, ওটার সঙ্গে পারবে না। পালিয়ে বাঁচা ছাড়া আর কোন পথ নেই।

পাহাড়ের কোলে একটা আবাসিক এলাকায় চলে এল ওরা। নামেই আবাসিক, বাড়িঘরগুলো এত দূরে দূরে, জনবসতিশূন্যই মনে হয়। হঠাৎ তীক্ষ্ণ মোড় নিয়ে পাহাড়ের ওপর দিকে উঠতে শুরু করল মুসা। ভ্রাম করে গুঁতো লাগল পেছনে। একটা নির্দেশকে দেখা গেল স্যান ফ্রান্সিসকোর বিখ্যাত ট্যুরিস্ট স্পট টুইন পিকসের দিকে চলেছে ওরা। পর্বতের চূড়াদুটোর ওপরে দাঁড়িয়ে নিচের চমৎকার দৃশ্য চোখে পড়ে। সুন্দর উপত্যকা, জলরাশি, শহরের আলো, সব দেখা যায়।

মোড় নিয়ে উঠে গেছে পথটা। আরেকটু উঠতেই খেয়াল হলো মুসার, সামনের কুয়াশার ভেতরে ঢুকতে হবে। ভ্রাম করে বাড়ি লাগল আবার।

বাপরে বাপ, এমন কুয়াশা জিন্দেগিতে দেখিনি, গাড়ির গতি কমিয়ে ফেলল সে। দিশেহারা হয়ে পড়েছে। কি করবে বুঝতে পারছে না। এতই ঘন কুয়াশা হেডলাইটের তীব্র আলোও সামনে ফুটখানেকের বেশি ভেদ করতে পারে না। একবার ভাবল, গাড়ি ঘুরিয়ে ফিরে যায় আবার যে পথে এসেছে। কিন্তু ঘোরানোর জায়গা নেই। আর মিস্টার এক্সও ওদেরকে সে সুযোগ দেবে না।

ধ্রাম!

পেছনে তাকাল কিশোর। কুয়াশার জন্যে দেখাই যাচ্ছে না ক্যাভেলিয়ারটাকে। এমনকি হেডলাইটও দেখতে পাচ্ছে না। গুতো মারছে বলেই বুঝতে পারছে, ওদের পেছনে রয়েছে মিস্টার এক্স।

তারপর একসময় থেমে গেল গুতো মারা। কয়েক মিনিট পেরিয়ে গেল, একটিবারও আর তো লাগল না।

কি ব্যাপার? ফিসফিস করে বলল মুসা।

বুঝতে পারছি না। কিছুই দেখতে পাচ্ছি না পেছনে। চালাতে থাকো।

আরও শক্ত করে স্টিয়ারিং চেপে ধরল মুসা। একটা মোড় এগিয়ে আসছে। বুঝতে পারছে না সে। কিছুই দেখার জো নেই। পথের কিনারে হঠাৎ করে কোনখান থেকে খাড়া নেমে গেছে ঢাল, তা-ও জানে না।

মোড়ের কাছাকাছি চলে এসেছে সে…মোড় পেরোচ্ছে… এই সময় কুয়াশার ভেতর থেকে উদয় হলো আবার লাল কনভারটিবলটা, বাঁ দিক থেকে ঠেলে ফেলে দেয়ার চেষ্টা করল ওদের গাড়িটাকে।

চিৎকার করে উঠল কিশোর।

বাঁয়ে কাটল মুসা। টায়ারের কর্কশ আর্তনাদ তুলে সরে এল গাড়ি। মোড়টা পেরিয়ে এসেছে। এমনিতেও মরবে ওমনিতেও, কাজেই ঝুঁকিটা নিতে আর বাধল না ওর। তীব্র গতিতে কুয়াশার ভেতরে অন্ধের মত চালিয়ে দিল গাড়ি।

পাহাড়ের ওপরে উঠতেই নেমে গেল কুয়াশা। আসলে বেরিয়ে এসেছে কুয়াশার ভেতর থেকে।

ধড়াস ধড়াস করছে বুক। সামনে একটা পার্কিং লট। ওখানে গাড়ি রেখে নিচের দৃশ্য দেখে দর্শকরা। সোজা সেখানে গাড়ি ঢুকিয়ে দিল সে। হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে ঘাম মুছল কপালের।

এইবার আসুক দেখি ব্যাটা! সমস্ত ক্ষোভ ঝরে পড়ল কণ্ঠ থেকে। বাপের নাম ভুলিয়ে ছেড়ে দেব!

হ্যাঁ, কিশোরের কণ্ঠও কাঁপছে, যদি পিস্তল না থাকে!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *