১১. মুক্তো, আবার বলল কিশোর

মুক্তো, আবার বলল কিশোর। মুক্তো এবং রেসিং হোমার কবুতর।

হেডকোয়ার্টারে আলোচনায় বসেছে তিন গোয়েন্দা। বিকেলে অসময়ে ফিরে এসে মেরিচাচীর বকাঝকা আর তার হাতে তৈরি অনেকগুলোস্যাণ্ডউইচ খেয়ে পেট ভরেছে মুসা আর কিশোর।

দুধের গেলাসটা হাতে নিয়ে গিয়ে ফ্রিজ খুলেছে কিশোর, হতাশা চেপে রাখতে পারেনি, মুখ দিয়ে বেরিয়েই গেছে, দৃর, নেই।

এই, কি নেই রে? কাছেই বসা ছিল চাচী।

আপেলের হালুয়া। বেশি করে কাঁচা মাখন দেয়া।

হঠাৎ করে হালুয়া খাওয়ার শখ হলো কেন? অন্য সময় তো সাধাসাধি করেও গেলাতে পারি না।

দুপুরে স্বপ্নে খেলাম তো, তখন থেকেই খেতে ইচ্ছে করছে।

স্বপ্ন দেখলি?কোথায় ঘুমিয়েছিলি? উঠে দাঁড়াচ্ছেন মেরিচাচী।

চুপ হয়ে গেল কিশোর। অনেক বেশি বলে ফেলেছে।

তুলসীবনে, চাচী, বেজায় ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম, ঢাকতে গিয়ে আরও ফাঁস করে দিল মুসা।

প্রমাদ গুণল কিশোর, তাড়াতাড়ি বলল, ওই পাহাড়ের ধারে, চাচী তুলসী গাছ ছিল কাছে, তার ছায়ায়। সাইকেল চালাতে চালাতে ক্লান্ত হয়ে জিরোতে বসেছিলাম, কখন যে তন্দ্রা এসে গেল…হি-হি…তো চাচী, হালয়া…

কোথায় যে কবে মরে পড়ে থাকবি, চাচীর মুখের মেঘ সরছে না। এই, তুলসীবন থেকে যদি সাপ বেবরাত? যদি…

দূর, চাচী, তুমি কিছু জানো না, হাত তুলল কিশোর। তুলসীবনে সাপ থাকে না।

তবে কি থাকে?

কিছুই থাকে না। হ্যাঁ, চাচী, হালুয়া…আপেল আছে তো, নাকি বাজার থেকে এনে দেব?

আছে আছে, রাতে খাস, বানিয়ে রাখব। তবে কথা দিতে হবে, তুলসীবনে…

ঠিক আছে, চাচী, আর যাব না, যাও, এক চুমুকে বাকি দুধটুকু খেয়ে মুসার হাত ধরে টেনে নিয়ে বেরিয়ে এসেছে কিশোর, চাচী আর কিছু বলার আগেই। সোজা এসে ঢুকেছে দুজনে হেডকোয়ার্টারে।

রবিন পরে এসেছে। কিশোরের অনুরোধে লাইব্রেরিতে গিয়েছিল দুটো বই আনতে,পথে রেস্টুরেন্টে খেয়ে এসেছে।

হ্যাঁ, রবিনের দিকে ফিরে জিজ্ঞেস করল কিশোর, মুক্তো চাষের ব্যাপারে কি লিখেছে বইতে?

মূল্যবান পাথরের ওপর লেখা বইটা খুলল রবিন। ভেতরে এক পাতা আলগা কাগজ, তাতে নোট লিখেছে সে। হ্যাঁ, মুক্তোর চাষ।…স্প্যাট, মানে শিশু ঝিনুক জোগাড় করে খাঁচায় ভরে পানিতে ডুবিয়ে রেখে দেয়া হয়। এগুলোর বয়েস যখন তিন বছর হয়, তুলে ফাক করে ভাঙা এক কণা মুক্তো ফেলা হয় ভেতরে। তারপর ঝিনুকগুলোকে আবার খাঁচায় ভরে ডুবিয়ে রাখা হয় পানিতে। শক্ত পাথর অস্ত্রের কাছের বিশেষ থলিতে আটকে খুব যন্ত্রণা দেয় ঝিনুককে, আপনা আপনি এক ধরনের রস বেরিয়ে তখন লাগতে থাকে কণাটার সঙ্গে, শক্ত হয়ে জমতে থাকে। এভাবেই ধীরে ধীরে বড় হতে থাকে কাটা, পূর্ণাঙ্গ মুক্তোয় রূপ নেয় এক সময়। তিন থেকে ছয় বছর লাগে একটা মুক্তো তৈরি হতে।

কণাটার চারপাশে ব্যাণ্ডেজের মত জড়িয়ে যায় রস, না? মুসা বলল। খুব নিষ্ঠুর মনে হচ্ছে। বছরের পর বছর প্রাণীগুলোকে এভাবে জ্যান্তরেখে কষ্ট দেয়া…

মানুষের কাজই তো এরকম। ওই যে, জোর যার মুল্লুক তার। হ্যাঁ, আবার নোট পড়ায় মন দিল রবিন। মুক্তো বড় হলে ঝিনুকের ভেতর থেকে বের করে নিয়ে পাঠানো হয় বাজারে। কালচার্ড মুক্তোর ব্যবসা জাপানেই বেশি, বড় বড় ফার্ম গড়ে উঠেছে। কালচার্ড হলে কি হবে, দাম কম না, কোন কোনটা কয়েকশো ডলারও ওঠে।

আচ্ছা, কালচার্ড বলে কেন এগুলোকে? জিজ্ঞেস না করে পারল না মুসা। সভ্য কিংবা সাংস্কৃতিমনা ঝিনুকের ভেতরে জম্মায়?

মুসার মোটা বুদ্ধি দেখে হতাশ ভঙ্গিতে ঠোঁট ওল্টালো কিশোর।

না না, অধৈর্য হলো না রবিন। কৃত্রিম বলে এই নাম রাখা হয়েছে।

অ, মাথা দোলাল মুসা, মুক্তোর ফার্মেই কাজ করে তাহলে হ্যারিকিরি, পেছনে বাগবাকুম শুনে ফিরে দেখল, তার দিকেই চেয়ে আছে টম। জালের ফাক দিয়ে আঙুল ঢুকিয়ে পাখিটাকে আদর করল সে। এজন্যেই ওখানে গার্ডের এত, কড়াকড়ি, মুক্তো যাতে চুরি হতে না পারে, তাই না, কিশোর?

তাই, চেয়ারে হেলান দিল কিশোর। ঢোকার সময় শ্রমিকদের তল্লাশি করা হয় না। তাতেই আইডিয়াটা খেলেছে হ্যারিকিরি আর হ্যারিসের মাথায়। সহজ ফন্দি, মজাটাই ওখানে, বেশি সহজ হওয়াতেই ধোকা খাচ্ছে গার্ডেরা। খাঁচায় ভরে একটা রেসিং হোমারকে ভ্যানে রেখে দিয়ে আসে হ্যারিস। ফার্মে ঢোকার আগে খাঁচা থেকে পাখিটাকে বের করে লাঞ্চ বক্সে ভরে নেয় হ্যারিকিরি, চুপ করল সে।

অপেক্ষা করছে অন্য দুজন।

ঝিনুকে ভাল মুক্তো পেলে সেটা রেখে দেয় হ্যারিকিরি, আবার বলল কিশোর, লাঞ্চের সময় বাক্স থেকে কবুতরটাকে বের করে তার পায়ে ঝিনুক বেঁধে দেয় কোনভাবে, হয়তো ছোট থলিটলিতে ভরে বা অন্য কোনভাবে। আশেপাশে এত পাখির ছড়াছড়ি, বিশেষ কবুতরটাকে খেয়ালই করে না গার্ডের। উড়ে সোজা বাড়ি চলে যায় ওটা, তখন খুলে নেয় রিচার্ড হ্যারিস।

বুঝলাম, বলল রবিন, লাঞ্চের আগে ভাল মুক্তো পাওয়া না গেলে একটা মেসেজ বেঁধে কবুতর ছেড়ে দেয় হ্যারিকিরি। জাপানী ভাষায় মেসেজটাতে লেখা থাকে, আজ মুক্তো নেই, যে রকম পেয়েছি আমরা দু-আঙুলা কবুতরটার পায়ে বাধা। কিন্তু, থামল সে, কিছু একটা ভেবে অবাক হচ্ছে, খাপে খাপে মেলাতে পারছে না বোধহয়। আবার বলল, কিন্তু…

কিন্তু এটা রিচার্ড হ্যারিসের নয়, রবিনের কথাটা শেষ করল কিশোর, ব্লিংকির, এই তো? অন্তত স্ন্যাকস রেস্টুরেন্টে তার কাছে ছিল ওটা। খাঁচাটাও হ্যারিসের কবুতরের খাঁচার মত; একই ধরনের চীজকুথে মোড়া, হাত বাড়াল সে, দেখি,অন্য বইটা দাও।

দ্বিতীয় যে বইটা লাইব্রেরি থেকে নিয়ে এসেছে রবিন ওটা আসলে ম্যাপ, দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ার রোড অ্যাটলাস। পাতা উল্টে স্মল-স্কেলের একটা ম্যাপ বের করল কিশোর, তাতে রকি বীচ আর সান্তা মনিকার বিভিন্ন পথ দেখানো রয়েছে। অন্য দুই গোয়েন্দাও প্রায় হুমড়ি খেয়ে পড়ল ম্যাপের ওপর।

এই যে, এটা উইলস বীচ, ম্যাপের এক জায়গায় আঙুল রাখল কিশোর। ঝিনুকের খামারটা হবে এখানে। আর রিচার্ড হ্যারিসের বাড়ি, উপকূল বরার ধীরে ধীরে আঙুল সরাল কিশোর, রকি বীচে এসে থামল। এই যে, এখানে। ফোন গাইডে তার ঠিকানা পেয়েছি। এটা হলোগে শহরের পশ্চিম সাইড।

ড্রয়ার থেকে একটা রুলার বের করে ফার্ম আর রিচার্ডের বাড়ি, এই দুটো পয়েন্টের ওপর রাখল কিশোর, কি বোঝা যায়?

সরাসরি আকাশ পথ বেশির ভাগটাই সাগরের ওপর দিয়ে, বলে উঠল মুসা। ফার্ম থেকে হ্যারিসের বাড়ি ছয় মাইল!

রেসিং হোমারের জন্যে বড় জোর ছয় মিনিটের পথ, মুসার মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বলল রবিন। দুপুরে বাড়ি গিয়ে হ্যারিসকে মোটেই অপেক্ষা করতে হয় না, মুক্তো কিংবা মেসেজ পেয়ে যায়।

কিন্তু তাহলে মিস কারমাইকেলের বাগানে কবুতর মরে কি করে, মানে রেসিং হোমারের লাশ পাওয়া যায় কিভাবে? প্রশ্ন রাখল মুসা। তাঁর বাড়ি তো শহরের পুবধারে। ম্যাপে আঙুল রাখল, এই যে, এখানে। রিচার্ডের বাড়ি থেকে অনেক দূরে। কোর্স থেকে এতখানি সরে গিয়েছিল দু-আঙুলা?

হ্যারিসের বাড়িতে যায় ভাবলে সেটা মনে হবে, লার সরিয়ে ফার্ম আর মিস কারমাইকেলের বাড়ির ওপর রাখল কিশোর। কিন্তু যদি এখানে যায়? ম্যাপের আরেক জায়গা নির্দেশ করল সে।

সান্তা মনিকা, বিড় বিড় করল রবিন।

রিংকির বাড়িতে? মুসা বলল।

হতে পারে, রবিনের মনে পড়ল, রিংকি বলেছিল সে সান্তা মনিকায় থাকে…

সুতরাং, আগের কথার খেই ধরল কিশোর, দু-আঙুলার মালিক যদি রিংকি হয়, আর বাড়ি যেতে চায় কবুতরটা তাহলে মিস কারমাইকেলের বাগানের ওপর দিয়ে যেতে হবে। ধরে নিতে অসুবিধে নেই, বাজের কবলে পড়েছে ওটা তখনই। টেবিলে বার দুই টোকা দিল সে। আর, আমার মনে হয় দু-আঙুলাই প্রথম মারা পড়েনি, রিংকির আরও কবুতর মারা পড়েছে মিস কারমাইকেলের বাগানে। মহিলা বলেছেন, এক মাসে তাকে তিনটে মুক্তো এনে দিয়েছিল হীরা। পেল কোথায় পাখিটা? নিশ্চয় বাগানে, মরা কবুতরের পায়ে বাধা, ঠুকরে ঠুকরে কোনভাবে খুলে নিয়ে গেছে মনিবকে উপহার দিতে।

মিলছে, একমত হলো মুসা।

ম্যাপ বই বন্ধ করল কিশোর, ভুরু কেঁচকাল মেলে, যদি হ্যারিস আর রিংকি পার্টনার হয়। তাহলে একদিন হ্যারিসের কবুতর ব্যবহার করবে, আরেক দিন রংকির। আর তা হলেই শুধু হ্যারিসের আজব ব্যবহারের একটা অর্থ করা যায়। ব্রিংকির পাখি মারা পড়ায় পার্টনার হিসেবে সে-ও উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেছিল, রাতের বেলা তদন্ত করতে গিয়েছিল মিস কারমাইকেলের বাগানে। আমাকে দেখে ভেবেছিল আমিই খুনী, তাই রাগ সামলাতে না পেরে বাড়ি মেরে বসেছে।

মাথা নাড়ল সে, নিজের কথাই যেন বিশ্বাস করতে পারছে না। তারপর মিস কারমাইকেলের কাছে শুনল, আমরা তাঁকে সাহায্য করছি। তখন খাতির করার চেষ্টা করল আমাদের সঙ্গে। ডেকে নিয়ে গিয়ে খাওয়াল, পাখির খুনীকে ধরে দেয়ার জন্যে উৎসাহিত করল। ধরে নিতে হয়, সে চাইছিল, মিস কারমাইকেলের পাখি খুনের তদন্ত করতে গিয়ে রিংকির কবুতর কিভাবে মারা গেছে সেটা বের করি আমরা। আবার মাথা নাড়ল সে। কিন্তু রিংকি আর হ্যারিস বন্ধু হতে পারে না।

কেন? সঙ্গে সঙ্গে কথাটা ধরল রবিন। পারে না কেন?

ঠোঁট কামড়াল কিশোর। পারে না এই জন্যে, রিংকি আর হ্যারিকিরিকেও তাহলে পার্টনার হতে হয়। তাহলে রিংকির জানার কথা হ্যারিকিরির নতুন বাসার খবর। জানা থাকার কথা, হ্যারিকিরি নতুন বাড়ি নিয়েছে। স্ন্যাকস রেস্টুরেন্টে বসে থেকে অনুসরণ করার দরকার পড়ত না। সবুজ ভ্যানের পিছু নিয়ে গিয়ে লুকিয়ে দেখে আসার দরকার পড়ত না কোথায় বাড়ি নিয়েছে হ্যারিকিরি।

উঠে দাঁড়াল কিশোর। বাড়ি যাও তোমরা। রাতে বাইরে কাটানোর অনুমতি নিয়ে এসো। দু-ঘণ্টার মধ্যে ফিরে আসবে। স্লীপিং ব্যাগ নিয়ে আসবে সঙ্গে করে।

কেন? রবিন আর মুসা, দুজনেই জানতে চাইল।

কাল সকালে হ্যারিকিরির জন্যে তৈরি থাকতে পারব আমরা।

আবার কি করতে হবে, প্রশ্ন করল মুসা। অনুসরণ?

না, মাথা নাড়ল কিশোর। কেসটার সমাধান করব। খুব সহজ উপায়ে। খাঁচার দিকে তাকাল সে। টমকে দিয়ে ফাদে ফেলব রিংকিকে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *