১১. মার্লিন বেকিকে নিয়ে চলে যাচ্ছে জীপটা

মার্লিন বেকিকে নিয়ে চলে যাচ্ছে জীপটা, দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছেন গোল্ডম্যান এই সময়ে পাশে এসে দাঁড়াল রেনট্রি।

নিউক্লিয়ার ডিভাইস এসে গেছে, বলল রেনট্রি। ছোট্ট, এক মেগাটন। কিন্তু এটাই মাঝারি আকারের একটা পাহাড় উড়িয়ে দিতে যথেষ্ট।

ঠিক কোন জায়গায় বসান হবে বোমাটা? জানতে চাইলেন গোল্ডম্যান।

ব্যাটল মাউনটেনের মাইল দুয়েক উত্তর-পশ্চিমে, ফল্ট লাইন ঘেঁষে। হাইইনটেনসিটি লেজার ড্রিলের সাহায্যে গর্ত খোঁড়া হবে মাটিতে। ঘণ্টা তিনেকের মধ্যেই বসান হয়ে যাবে বোমা। সঙ্গে সঙ্গেই বিস্ফোরণ ঘটাব।

মার্লিনকে তো পেলাম, থমথমে গোল্ডম্যানের গলা। শুধু অস্টিনকে পাওয়া গেলেই নিশ্চিন্তে বোমা ফাটান দেখতাম আমি।

উপায় নেই, মিস্টার গোল্ডম্যান, সান্তনা দেবার মত করে বলল বিজ্ঞানী, কিন্তু জোর নেই গলায়। কম্পিউটার প্রিন্টআউট তো নিজের চোখেই দেখেছেন।

দেখেছি, টম, কিন্তু…! আশা ছাড়তে পারছেন না গোল্ডম্যান। স্যান আজি ফল্টে প্রলয়ংকরী ভূমিকম্পের ধারণা তো ভুলও হতে পারে। ধর, এইবারের মত ভুল করে বসল কম্পিউটার? ওটা তো যন্ত্র। সব সময়ই নির্ভুল সমাধান নাও তো দিতে পারে?

তা পারে, বলল রেনট্রি। কিন্তু সে সম্ভাবনা লাখে এক ভাগ। তবু অন্য একটা টেস্টের ব্যবস্থা করেছি।

কি, কি টেস্ট? আগ্রহে ঝুঁকে এলেন গোল্ডম্যান।

সেন্সর জানাচ্ছে, ট্রিনিটি ফল্ট সংলগ্ন আরও কয়েকটা সাব ফন্টে আগে ছোটখাট ভূকম্পন শুরু হবে। এগুলো থেকেই কম্পনটা মূল ফল্টে ছড়িয়ে পড়বে। আর…

হাতঘড়ির দিকে তাকাল রেনট্রি।

আর সতের মিনিটের মধ্যেই শুরু হবে প্রথম কম্পন। এবং তাহলেই।

তাহলে কি হবে?

বুঝব, প্রচন্ড ভূমিকম্প হবেই।

রেনট্রির চোখের দিকে তাকিয়ে আছেন গোল্ডম্যান।

কাজেই, আর সতের মিনিট পরেই পুরো শিওর হব আমরা কম্পিউটার মিথ্যে তথ্য দিয়েছে কিনা।

করিডোর ধরে এগিয়ে চলেছে শ্যালন আর স্টিভ। খুশি খুশি লাগছে শ্যালনকে। এক হাতে অস্টিনের বাহু জড়িয়ে ধরেছে। পৃথিবীবাসী পুরুষের ছোঁয়ায় কেমন যেন পুলক অনুভব করছে ভিনগ্রহবাসিনী।

আর কতদিন পৃথিবীতে থাকবে তোমরা? জিজ্ঞেস করল অস্টিন।

কমপক্ষে তিন বছর। তার আগে শিপ আসবে না।

তোমাদের শিপটা দেখতে ইচ্ছে করছে আমার।

তাহলে তিনটে বছর অপেক্ষা করতে হয় তোমাকে, হাসল শ্যালন। অস্টিনের বাহুতে নিজের বাহুর চাপ বাড়াল।

পৃথিবীতে, পুরুষের কাছে কেমন মেয়ে আকর্ষণীয়? আচমকা জিজ্ঞেস করল শ্যালন।

কেন, দুবছর ধরেই তো পৃথিবীর মানুষকে পরীক্ষা করছ। এখনও বোঝনি এখানকার পুরুষদের স্বভাব? পাল্টা প্রশ্ন করল অস্টিন।

প্রশ্ন আমি আগে করেছি, জেদি মেয়ের মত বলল শ্যালন। বল।

অনেক কিছুর উপর নির্ভর করে ব্যাপারটা। তবে নিজের কথা বললে, বুদ্ধিমতি মেয়ে পছন্দ আমার। হাসিখুশি আর আর…

স্বাস্থ্যবতী, সুন্দরী… অস্টিনের চোখে চোখে তাকাল শ্যালন।

তা তো অবশ্যই, তা তো অবশ্যই, শ্যালনের দিকে তাকিয়ে হাসল অস্টিন। হ্যাঁ, তা তোমাদের কেমন পুরুষ পছন্দ?

তোমাদের মত, নির্দ্বিধায় জবাব দিল শ্যালন। হাসল।

শ্যালনের দিকে তাকিয়ে আছে অস্টিন। অস্বস্তি বোধ করছে।

ডক্টর, বলল অস্টিন, ল্যাবরেটরীতে তোমার ব্যবহারে সত্যিই অবাক হয়েছিলাম আমি।

দুগালে রক্ত জমছে শ্যালনের। কথা বলল না।

এভাবেই রোগীদের আদরযত্ন কর নাকি তোমরা? জিজ্ঞেস করল অস্টিন।

আরও লাল হয়ে উঠেছে শ্যালনের গাল। হঠাৎই শব্দ করে হাসল সে। সহজ হতে চাইছে।

না, না, তা নয়, কৈফিয়ত দেবার মত করে বলল শ্যালন, আসলে দুটো বছর একদল কাজপাগল বিজ্ঞানীর সঙ্গে কাজ করে করে হাঁপিয়ে উঠেছি আমি। এরপর তুমি এলে দমকা তাজা হাওয়ার মত। শুধু বুদ্ধিমানই না, বায়োনিক-আমার স্পেশালিটি। তা ছাড়া, তা ছাড়া সুপুরুষ…

হা হা করে হাসল অস্টিন। তার দিকে স্থির চেয়ে আছে শ্যালন। হঠাৎ অস্টিনের বাহুর নিচ থেকে নিজের হাতটা বের করে এনে তার হাত ধরল সে। চাপ দিল আলতো করে। অনেক কথাই প্রকাশ পেল এতে।

একটা ব্যাপারে আমাকে সাহায্য কবে তুমি? কথার মোড় ঘোরাল শ্যালন।

কি ব্যাপার? একটু অবাক হল অস্টিন।

ভালই লাগবে তোমার, আবার গাল লাল হয়ে উঠেছে শ্যালনের। আর হ্যাঁ, সাসকোয়াচের অপারেশনেও আমাকে সাহায্য করলে খুশি হব।

ট্রিনিটি বেস। একটা ওয়র্ক টেবিল ঘিরে উদ্বিগ্নভাবে দাঁড়িয়ে আছে গোল্ডম্যান, রেনট্রি এবং আরও কয়েকজন। প্রথম ভূকম্পনের অপেক্ষা করছে সবাই।

পনের সেকেন্ড আর, ঘড়ি দেখে বলল ইন্ডিয়ান বিজ্ঞানী। মৃদু হাত কাঁপছে তার। ডান হাতটা একটা কফি কন্টেইনারের ওপর রাখা।

কাঁধ আর গালের মাঝখানে টেলিফোন রিসিভার চেপে ধরে আছেন গোল্ডম্যান।

হ্যাঁ, জেনারেল, জেনারেল ডেভিসের সঙ্গে কথা বলছেন গোল্ডম্যান, যদি প্রথমে এই ছোটখাট ভূকম্পন ঘটে, তো রেনট্রি বলছে, মেজর আর্থকোয়েকে আর সাত ঘণ্টা চল্লিশ মিনিটের মধ্যেই কয়েকটা বড় বড় শহর হারাব আমরা।

আট সেকেন্ড, ঘোষণা করল ওদিকে রেনট্রি।

প্লীজ, স্ট্যান্ড বাই, জেনারেল, অনুরোধ করলেন গোল্ডম্যান।

ছয় সেকেন্ড, হাতঘড়ির দিকে তাকিয়েই আছে রেনট্রি, পাঁচ…চার…তিন… দুই…এক…

অস্বস্তিকর নীরবতা। থমথম করছে টেবিল ঘিরে দাঁড়ান লোকগুলোর মুখ। কিন্তু কিছুই ঘটছে না। পরস্পর দৃষ্টি বিনিময় করল রেনট্রি আর গোল্ডম্যান।

আরও এক সেকেন্ড দেখল রেনট্রি। তারপর এগিয়ে গিয়ে খটাখট কয়েকটা বোতাম টিপল কম্পিউটারের। রিডিং ডায়ালের দিকে এক নজর দেখেই গোল্ডম্যানের দিকে তাকাল। ঠিকই আছে। কম্পন অনুভব করব আমরা, কনফার্ম করেছে কম্পিউটার।

ভোঁতা যন্ত্রটা ভুল বকছে, বললেন গোল্ডম্যান।

কি জানি। অনিশ্চিত রেনট্রির গলা।

কোন ধরনের ভূমিকম্পই হবে না, দৃঢ় গলায় বললেন গোল্ডম্যান। না এখন, না সাত-আট ঘণ্টা পরে।

হয়ত বা, জোর নেই রেনট্রির গলায়।

থ্যাংক গড, বললেন গোল্ডম্যান। নিউক্লিয়ার ওয়ারহেডগুলো আর্সেনালে ফিরিয়ে নেবার আদেশ দিচ্ছি আমি এখুনি। রিলিজ পেপার সই করে দিচ্ছি।

স্বস্তির শ্বাস ফেলেছে টেবিল ঘিরে দাঁড়ান সব কজন লোক।

রিলিজ পেপারটার দিকে তাকিয়ে আছে রেনট্রি। তার ধারণা ঠিক হল না, এতে বরং খুশিই সে। অস্টিনের জন্যে ভাবনা অনেকখানি কমে গেল ভূমিকম্প না হওয়ায়।

জেনারেল, ফোনে আবার কথা বলছেন গোল্ডম্যান, সুসংবাদ! খুশি উপচে পড়ছে তার গলায়, ভূকম্পন হল না! মনে হচ্ছে কম্পিউটার ভুল…

আচমকা থেমে গেলেন গোল্ডম্যান। পাহাড়ের দিক থেকে একটা অদ্ভুত চাপা ব্দ শোনা যাচ্ছে। ভয় পেয়ে আকাশে উঠে গেছে পাখির দল। রেডিওর ওপরে কফিভর্তি কাপ রেখেছিল রেনট্রি, কাঁপতে শুরু করেছে কাপটা। ছলকে রেডিওর ওপর পড়ল বাদামী তরল পদার্থ। কম্পন শুরু হয়ে গেছে। ছোট ছোট লাফে রেডিওর একেবারে কিনারায় চলে এল, তারপর কাত হয়ে টেবিলে গড়িয়ে পড়ে গেল কাপটা। ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। কফিতে ভিজে গেল রিলিজ পেপার।

মিনিট তিনেক থাকল কাঁপুনি। শুধু রেনট্রিরটাই নয়, টেবিলে রাখা আরও অনেকের কফির কাপ স্থানচ্যুত হয়েছে। এছাড়া আর কোন ক্ষতি হয়নি।

স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন গোল্ডম্যান। কানে ঠেকানোই আছে টেলিফোন রিসিভার। ওপাশ থেকে সমানে চেঁচাচ্ছেন জেনারেল ডেভিস, কি ঘটছে এদিকে, জানতে চাইছেন।

জেনারেলকে নয়, নিজেকেই ফিসফিস করে বললেন গোল্ডম্যান, অস্টিনকে আর বাঁচান গেল না। ঈশ্বর…!

শূন্য দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে আছে রেনট্রি।

ভূগর্ভের রহস্যপুরীতে অস্টিন এবং ভিনগ্রহবাসীরাও অনুভব করল কম্পন। বেস ক্যাম্পের মত এরা কিন্তু অত সহজে রেহাই পেল না। মাটির গভীরে কম্পনের পরিমাণ অনেক বেশি তীব্র, চাপা গর্জন অসহ্য। দেয়ালের গা থেকে ঝুর ঝুর করে ক্রিস্টাল খসে পড়ল। থির থির করে কাপতে লাগল আলগা যন্ত্রপাতি আর অন্যান্য জিনিসপত্র। মেঝেয় পড়ে গিয়ে কিছু কাঁচের তৈজসপত্রও ভাঙল।

মেন করিডোরে দেয়ালে ঠেস দিয়ে দাড়িয়ে অস্টিন এবং আরও কয়েকজন স্থির থাকার চেষ্টা করছে। নিজেকে সোজা রাখতে না পেরে মাটিতে পড়ে গেল একজন মহিলা। সমস্ত জিনিসপত্র, মানুষ আর মেঝের ওপর হালকা ধুলোর আস্তরণ, যেন একটা ফিনফিনে পাতলা ধূসর চাদর বিছিয়ে দেয়া হয়েছে সব কিছুর ওপরে। মহিলার পতন দেখল অস্টিন, ধুলোর চাদরের দিকে তাকাল। ওপরের দিকে চেয়ে ক্রিস্টাল খসে পড়াও দেখল। এরই ভেতরে ব্যাপারটা চোখে পড়ল তার। ইনফ্রা রেড চালু করল সঙ্গে সঙ্গে। ঠিক মাথার ওপরে, সিলিঙে অতি সূক্ষ্ম চিড় ধরেছে। কম্পনের সঙ্গে ক্রমেই বড় হচ্ছে ফাটল, ফাঁক হচ্ছে। শংকিত হয়ে পড়ল অস্টিন। যে কোন সময়ে পাথরের ছাদ মাথায় ভেঙে পড়তে পারে।

ফাটল বড় হয়ে যেতেই দুদিকের কিনারা থেকে পাথরের ছোট ছোট টুকরো টুপটাপ খসে পড়তে লাগল। তারপরই ঘটল ঘটনাটা। অনেকখানি জায়গা নিয়ে ভাঙল পাথর। ওজন মন ছয়কের কম হবে না। খুব ধীরে নেমে আসছে। খালি চোখে ভাঙনটা বুঝতে পারল না অস্টিন, কিন্তু বায়োনিক চোখে ঠিকই দেখেছে সে। ছাদে চিড় ধরার পর থেকে পনের সেকেন্ড কেটে গেছে। এই সময়টা ছাদের দিকেই তাকিয়েছিল অস্টিন।

সোজা পাথরটা এসে পড়বে মেঝেতে পড়ে থাকা মহিলার ওপর। লাফ দিল অস্টিন। চোখের পলকে পড়তে থাকা পাথরটার নিচে এসে দাঁড়াল। বায়োনিক হাত বাড়িয়ে ঠেলে ধরল পাথরটা ওপরের দিকে।

ভীত দৃষ্টিতে পাথরটার দিকে তাকিয়ে আছে শ্যালন। নিজেকে অনেক কষ্টে স্থির রাখার চেষ্টা করছে সে। বিশাল পাথরটা ধরে রাখতে পারবে তো আজব লোকটা? যদি ছুটে যায় তো মাটিতে পড়ে থাকা মহিলা এবং অস্টিন দুজনেই মরবে।

আরও দুই মিনিট পর আস্তে আস্তে থেমে এল কম্পন। পাথরটা একই ভাবে ঠেলে রেখেছে অস্টিন।

ভূমিকম্প থামতেই দুজন লোক ছুটে গিয়ে পড়ে থাকা মহিলাকে টেনে নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে আনল।

জলদি, চেঁচিয়ে আদেশ দিল শ্যালন, জলদি ঠেক দেবার একটা পিলার নিয়ে এস!

একজন টেকনিশিয়ান ছুটে চলে গেল করিডোর থেকে। তিরিশ সেকেন্ড পরেই একটা হালকা কিন্তু মজবুত পিলারের মত জিনিস নিয়ে এল। পরে শুনেছে অস্টিন, এই বিশেষ জিনিসগুলো আগে থেকেই তৈরি করে রাখা হয়েছে। ভূগর্ভকক্ষে এ ধরনের দুর্ঘটনা যে কোন সময় ঘটতে পারে, তাই এই সাবধানতা সত্যিই কাজে লেগে গেল এখন জিনিসটা।

টেকনিশিয়ানের সহায়তায় এগিয়ে এল শ্যালন। দুজনে মিলে পাথরের ঠিক মাঝামাঝি জায়গা থেকে মেঝের সঙ্গে ঠেক দিয়ে বসিয়ে দিল পিলারটা। হাতের চাপ হালকা করল অস্টিন। তারপর পাথরটা আর পড়বে না বুঝতে পেরে হাত নামিয়ে আনল।

ঘুরে দাঁড়াতেই দুহাতে অস্টিনকে জড়িয়ে ধরল শ্যালন। তোমার, তোমার কোন ক্ষতি হয়নি তো?

না।

কি ভূমিকম্পটাই না হল!

সামান্য একটু কম্পন মাত্র, ঠেস দিয়ে আটকে রাখা পাথরটার দিকে তাকিয়ে আছে অস্টিন। এতে ভয়ের কিছু নেই। কিন্তু আমি ভাবছি, পাথর থাকবে ত!

ট্রিনিটি বেস। একটু আগের ভূমিকম্প নিয়ে আলোচনা করছে রেনট্রি আর গোল্ডম্যান।

ভুল। ভুরু কোঁচকালেন গোল্ডম্যান, কম্পিউটার ভুল করেছে?

একটা ফিগারে একটু গন্ডগোল ছিল, ঠিক করে দিয়েছি, বলল রেনট্রি। আর এই ভুলের জন্যেই আসল সময়ের কয়েক সেকেন্ড আগে সময় নির্দেশ করেছে যন্ত্রটা।

তাহলে? মেজর আর্থকোয়েক ঠিক কখন ক্যালিফোর্নিয়া উপকূলে আঘাত হানবে?

ঘড়ি দেখল রেনট্রি, এখন থেকে ঠিক সাত ঘণ্টা ছত্রিশ মিনিট পর।

হুঁ। হতাশ দৃষ্টি গোল্ডম্যানের চোখে, কোন উপায় নেই আর, না। নিউক্লিয়ার বিস্ফোরণ ঘটাতেই হচ্ছে। ঠিক আছে, কাজ শুরু করে দিতে বল, টম।

ঠিক আছে, চেয়ার থেকে উঠে ঘুরে দাঁড়াল রেনট্রি। তারপর কি মনে হতেই ফিরে তাকাল, অস্টিনের আর কোন খবর পাওয়া যায়নি, তাই না মিস্টার গোল্ডম্যান?

রেনট্রির দিকে চাইলেন গোল্ডম্যান। মুখে কোন কথা বললেন না, এদিক ওদিক মাথা নাড়ালেন শুধু।

আর কোন কথা না বলে হাঁটতে শুরু করল রেনট্রি।

পরীক্ষাগারে, সাসকোয়াচকে শুইয়ে রাখা টেবিলটার পাশে দাঁড়িয়ে আছে অস্টিন আর শ্যালন।

কি চেহারা! ঠোঁট ওল্টাল অস্টিন।

আসলে কিন্তু ভারি মিষ্টি ছেলে ও, বলল শ্যালন। ভারি মিশুক?

ঠিক। বনের ভেতরে আসলে ও আমার সঙ্গে ঠাট্টা করছিল, তাই না? মৃদু শ্লেষ অস্টিনের গলায়।

আসলে তোমাকে ধরে আনার নির্দেশ ছিল ওর ওপর তখন, গম্ভীর শ্যালন। যাকগে ওসব কথা। এখন এসো তো, ওকে জাগিয়ে তোলার আগে কয়েকটা কাজ সেরে ফেলি।

একটা টেবিলে রাখা কন্ট্রোল সুইচবোর্ডের একাধিক বোতাম টিপল শ্যালন। ইলেকট্রোনিক যন্ত্রপাতির বিচিত্র আওয়াজ উঠল। একমনে কাজ করে গেল শ্যালন। মাঝেমধ্যেই এটা ওটার নির্দেশ দেয় অস্টিনকে। চিফ নার্সের কাজ করছে যেন অস্টিন।

কাঁধ আর জোড়া লাগান হাত নিয়ে আবার নাড়াচাড়া করছ কেন? জিজ্ঞেস করল অস্টিন। ওটা নাকি ঠিক করে ফেলেছিলে?

ফেলেছিলাম। কিন্তু এখন নতুন আইডিয়া ঘুরছে মাথায়। আরও বেশি শক্তিশালী করতে হবে ওর হাত। যখন বানিয়েছিলাম, তোমার মত বায়োনিক ম্যানের পাল্লায় পড়বে ভাবিনি।

ওর মত আরও রোবট আছে নাকি তোমাদের?

না। ওই আমার প্রথম সৃষ্টি। প্রথম খোকা।

কাঁচি, অস্টিনের দিকে না তাকিয়েই হাত বাড়াল শ্যালন। হাতে তুলে দিল অস্টিন।

অপারেশনের উপযুক্ত পোশাক পরছি না কেন আমরা? জিজ্ঞেস করল অস্টিন। আমাদের হাসপাতালে ছোট্ট কোন কাটাছেড়ার সময়েও বিশেষ পোশাক পরে সার্জনরা।

আমাদের এই পরীক্ষাগারের বাতাস হাইপার স্টেরিলাইজড়। জীবাণু পরিবাহী কোন কিছু কিংবা এক বিন্দু ময়লা নেই এঘরে। আর কোন অলৌকিক উপায়ে জীবাণু ঢুকে পড়লেও নিউট্রাক্সিন থ্রি ওদিকটা সামলাবে।

নিউ…কি বললে? জিজ্ঞেস করল অস্টিন।

নিউট্রাক্সিন থ্রি, অহংকার শ্যালনের গলায়। তোমাকে এর একটা শিশি দেখাবখন। এটা এক ধরনের ইলেকট্রোলাইটিক নিউরোপ্রোবেসিস, আমাদের দেহের ডি.এন.এ কণার সঙ্গে মিশে কাজ করে। রোগ ছড়াতে বাধা দেয়।

কোন্ রোগ?

সমস্ত রোগ। এ এক আশ্চর্য মহৌষধ!

ঝুঁকে সাসকোয়াচের বুকে মৃদু চাপড় দিল শ্যালন। নিজীব রোবটটার উদ্দেশ্যে বলল, আর বেশি দেরি নেই খোকা। এই কয়েক মিনিট। তারপরই ঘুম ভাঙাব।

আসলে ওর মা বলা চলে তোমাকে, না?

এই নিরানন্দ ল্যাবরেটরীতে ও না থাকলে সময়ই কাটত না আমার। অস্টিনের দিকে তাকাল শ্যালন। মৃদু হাসল। তারপর আবার কাজে মন দিল।

যন্ত্রপাতির ট্রেটা আঁতিপাতি করে খুঁজছে শ্যালন। কিন্তু প্রয়োজনীয় জিনিসটা কিছুতেই পাচ্ছে না। শেষ পর্যন্ত একটা নীডল-নোজড প্লয়ার্স তুলে নিল। তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে থাকল কিছুক্ষণ জিনিসটার দিকে, ঠিক পছন্দ হচ্ছে না।

জিভ আর টাকরার সাহায্যে চুক জাতীয় একটা শব্দ করল শ্যালন। বলল, এই প্লায়ার্সেরই নাক দুটো যদি ভেতরের দিকে সামান্য বাকান থাকত, চমৎকার হত।

দাও তো দেখি, শ্যালনের হাত থেকে প্লায়ার্সটা নিল অস্টিন। বায়োনিক আঙ্গুলে চেপে ভেতর দিকে একটু বাঁকিয়ে দিল নাক দুটো। প্লায়ার্সটা আবার শ্যালনকে ফিরিয়ে দিতে দিতে বলল, দেখ, এতে কাজ চলে কিনা!

প্লায়ার্সটার দিকে একবার তাকাল শ্যালন। তারপর অস্টিনের দিকে তাকাল। হাসল। ধন্যবাদ, বলে আবার ঝুঁকে কাজে মন দিল।

কাজ শেষ করে প্লয়ার্সটা ট্রেতে রাখল শ্যালন। তারপর ট্রেটা নিয়ে টেবিলের নিচে যন্ত্রপাতি থাকার বাক্সে রেখে দিল।

হয়েছে, বলল শ্যালন, ওর হাতটা জোড়া লেগেছে। শক্তিও অনেক বাড়ান হয়েছে আগের চেয়ে। তুমিও আর এখন টেনে ছিড়তে পারবে না।

দরকারও নেই, বলল অস্টিন। তবে লাগতে এলে চেষ্টা করে দেখব।

পারবে না, বলল শ্যালন। আর একটু বাকি। এই যে এখানে, সাসকোয়াচের পিঠের একটা জায়গা দেখিয়ে বলল সে, মারজানন পাওয়ার সেলটা বসিয়ে দিলেই কাজ শেষ।

টেবিলের একপাশে রাখা একটা প্লাস্টিকের বাক্স খুলল শ্যালন। ভেতর থেকে ছোট ব্যাটারির আকৃতির চৌকোনা কালো একটা বাক্স মত জিনিস বের করল।

এটা! কালো বাক্সটার দিকে নির্দেশ করে বলল অস্টিন, এটাই অতবড় দানবটার চলার শক্তি জোগাবে? এত ছোট জিনিস! তা এই মারজানন আসলে কি?

এক ধরনের অ্যান্টিম্যাটার পাওয়ার সোর্স, জানাল শ্যালন। আগামী একশো বছরের মধ্যে তোমাদের বিজ্ঞানীরাও এই জিনিস আবিষ্কার করে ফেলবে হয়ত।

হয়ত, অনিশ্চিতভাবে মাথা দোলাল অস্টিন। আবার সাসকোয়াচের দিকে মন দিল শ্যালন।

এই মারজাননের চাইতে তোমাদের নিউট্রাক্সিন সিরাম অনেক বেশি কাজের জিনিস মনে হচ্ছে, বলি বলি করে বলেই ফেলল অস্টিন কথাটা, এই ওষুধ পেলে পৃথিবীবাসীর খুব উপকার হত। এক আধ শিশি উপহার পাবার আশা করতে পারি কি?

সাসকোয়াচের পিঠে একটা মিটার জাতীয় যন্ত্র বসিয়ে রিডিং দেখছে শ্যালন। অস্টিনের কথায় ফিরে তাকাল। দেখ, তোমাকে এক শিশি ওষুধ উপহার দেয়াটা বড় কথা নয়। আমরা এখানে থেকে রিসার্চ করছি, আসলে এটাই জানতে দিতে চাই না পৃথিবীবাসীকে।

হাসল অস্টিন। শ্যালন, কথা দিচ্ছি, শিশিটা কোথায় পেয়েছি জানাব না কাউকে। তোমাদের কথাও বলব না। যত খুশি মানুষ ধরে নিয়ে পরীক্ষা চালাও তোমরা। বিন্দুমাত্র বাধা দিতে আসব না। এক শিশি নিউট্রাক্সিন পৃথিবীবাসীর যে উপকার করবে, তার বিনিময়ে কয়েকজন মানুষকে গিনিপিগ বানাতে চাওয়া তখন অন্যায় হবে না তোমাদের জন্যে। যদি বল, আবার হাসল সে, তোমাদের ছুরিকাচির তলায় আমিও নির্দ্বিধায় নিজেকে বলি দিতে রাজি আছি।

দুঃখিত, অস্টিন। তোমার কথা রাখা সম্ভব নয়, সত্যিই দুঃখিত আমি।

ও, গম্ভীর হয়ে গেল অস্টিন। কি যেন ভাবল। তারপর বলল, হ্যাঁ, ভাল কথা, আমি যে এখানে নিরাপদে আছি আমার লোকদের জানাতে পারলে ভাল হয়। তোমাদের কথা কিছু বলব না অবশ্যই। জানে অস্টিন, সরাসরি মানা করবে শ্যালন, তবু বলল সে। আসলে অন্য একটা ভাবনা মাথায় ঢুকেছে তার।

সম্ভব না, মানাই করল শ্যালন। এপ্লয় রাজি হবে না।

মর্স কোড পাঠাতে মাত্র দশ সেকেন্ড লাগবে।

মর্স তো দূরে কথা, স্মোক সিগন্যালও না।

কিন্তু…

এখন কোন কিন্তু না, লক্ষ্মী, পরে দেখা যাবে। হাতের কাজ রেখে এগিয়ে এসে অস্টিনের গালে চুমু খেল শ্যালন।

ঠিক আছে। আশা করছি শুধু বিজ্ঞানের উন্নতির জন্যেই এতসব করছ তোমরা? হাল ছেড়ে দেয়ার ভান করল অস্টিন।

বিজ্ঞানের উন্নতির জন্যেই শুধু।

পরিস্থিতি সহজ করার জন্যেই শব্দ করে হাসল অস্টিন। শ্যালনও হাসল তার দিকে তাকিয়ে। তারপর আবার সাসকোয়াচের দিকে ফিরল। ঠিক এই সময় সিলিঙে বসানো মাইক্রোফোনে একটা শব্দ হল। মেসেস পাঠানোর পূর্বসংকেত।

সুইচবোর্ডের একটা সুইচ টিপল শ্যালন। সঙ্গে সঙ্গে দেয়ালের গায়ে টেলিভিশনের পর্দা বেরিয়ে এল। তাতে এপ্লয়ের ছবি।

শ্যালন, ছবিটা তার দিকে তাকিয়ে ডাকল, জলদি চলে এস।

কেন ডাকছে, কিছুই জানতে চাইল না শ্যালন। শুধু বলল, আসছি।

সঙ্গে সঙ্গে মিলিয়ে গেল এপ্লয়ের ছবি।

অস্টিনের দিকে তাকাল শ্যালন, এখানেই থাক। আমি আসছি। বলেই দ্রুত ঘর থেকে বেরিয়ে গেল সে।

একটু ইতস্তত করল শ্যালন। একটু যেন লজ্জা পেল। তারপর বলেই ফেলল, আচ্ছা স্টিভ, থেকে গেলে হয় না?

হাসল অস্টিন। তুমিও চল না আমার সাথে।

সেটা কি সম্ভব?

মাথা ঝাঁকাল অস্টিন। হু, অসম্ভব। কাজেই…

দুজন দুজনের চোখের দিকে তাকাল কয়েক মুহূর্ত। চোখ নামিয়ে নিল শ্যালন। ঠিক আছে? তোমাকে কোনদিন ভুলব না, স্টিভ।

তোমাকেও ভুলব না।

অস্টিন ঘুরে দাঁড়াবার আগেই চট করে বলল শ্যালন, আরেকটা কথা। আবেগপ্রবণ পৃথিবীর মানুষের কাছে শিখলাম জ্ঞান সাধনাই সব নয়, সহানুভূতি, সাহায্য এসবেরও অনেক দাম আছে। তোমাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।

ঘুরে দাঁড়াল অস্টিন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *