১১. তীক্ষ্ণ চোখে শূন্য মরুভূমি

তীক্ষ্ণ চোখে শূন্য মরুভূমি নিরীখ করল এরিক ক্ৰেবেট। কোথাও সামান্য শব্দ বা নড়াচড়াও নেই। সূর্য এতটাই তাপ ছড়াচ্ছে, মনে হচ্ছে পুরো আকাশই সূর্য; কোথাও এতটুকু ছায়া নেই। মেস্কিটের জীর্ণ শাখাগুলো ঝুলে আছে নিপ্রাণ ও স্থবির কঙ্কালের মত, এমনকী চক্কররত শকুনগুলোও যেন পেতলরঙা আকাশে নিশ্চল হয়ে গেছে।

পাথর এতটা গরম হয়ে উঠেছে যে ছুঁলেই ফোস্কা পড়ে যাবে, অমসৃণ লাভার চাঙড় বা বোল্ডার দেখে মনে হচ্ছে বিশালকায় চুল্লী, জ্বলন্ত কয়লার মত উজ্জ্বল। তাপতরঙ্গ ধোয়াটে পর্দা তৈরি করেছে। শার্টের আরও একটা বোতাম খুলে দিল এরিক, ব্যান্ডানা দিয়ে কপাল আর মুখ মুছল। ঘর্মাক্ত হাত থেকে অন্য হাতে রাইফেল স্থানান্তর করল, গুলি করতে পারবে এমন টার্গেটের খোঁজে মরুভূমি তন্নতন্ন করে দেখছে।

ক্রল করে পাথুরে চাতালে উঠে এল ড্যান কোয়ান, এরিকের পাশে বসে ক্যান্টিন থেকে বড়সড় চুমুক দিল, তারপর বাড়িয়ে দিল এরিকের দিকে। গরম পানি বিস্বাদ লাগল মুখে।

অসহ্য লাগছিল ওখানে, নীচের অ্যারোয়ের দিকে ইশারা করল ভ্যান, ঘোড়াগুলো রয়েছে ওখানে। উনুনের মত উত্তপ্ত হয়ে আছে।

উপর থেকে ঘোড়াগুলোকে কাভার করতে পারব। সবাইকে এখানে চলে আসতে বলো।

পাথরের ফোকর গলে চলে গেল ড্যান, নীচে নেমে উঠে দাঁড়াল, ধীর পায়ে এগোল ক্যাম্পের দিকে। সঙ্কীর্ণ চাতালের মত একটা জায়গা পেরিয়ে গেল, ওখানেই থাকে মেয়েরা। আগুন জ্বালানোর ঝামেলায় যায়নি কেউ, কফির প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছে না। খাবারের ঘাটতি থাকলেও কেউই বোধহয় ক্ষুধা অনুভব করছে না, পরিস্থিতির ভয়ঙ্করত্ব আর টেরিল ডাফির করুণ মৃত্যু অনীহা তৈরি করেছে মনে।

উপর থেকে অন্যদের উঠে আসতে দেখতে পেল এরিক। ঘোড়ার উপর নজর রাখতে যে নীচেই থাকতে হবে, এমন কোন কথা নেই, সেটা এখান থেকেও সম্ভব। তবে করালটা রক্ষা করা যাবে কি-না, এ ব্যাপারে যথেষ্ট সন্দিহান ও। ওর অবচেতন মন বলছে প্রথম সুযোগে করাল ভেঙে ফেলবে অ্যাপাচিরা-ঘোড়াগুলো দখল করার চেষ্টা করবে। দুটো কারণে ঘোড়া দরকার ওদের-রাইড করবে, কিংবা চাইলে খেতেও পারবে।

তবে করালটা অরক্ষিত হয়ে পড়লেও, একসঙ্গে থাকায় ওদের তৈরি প্রতিরক্ষা ব্যুহ আরও দৃঢ় এবং সুসংহত হবে। অ্যারোয়োর চেয়ে বরং পাথুরে চাতাল অপেক্ষাকৃত নিরাপদও।

দৃষ্টিসীমায় কোন নড়াচড়া নেই। ধারে-কাছে অবস্থান নিয়েছে সবাই। অন্যদের আলাপ কানে আসছে। পাথরের ফাঁকে, নিজের জায়গায় নীরবে বসে থাকল এরিক, যে-কোন কিছুর জন্য তৈরি।

দৃশ্যত, করালটা তৈরি করতে দেখেছে অ্যাপাচিরা, কারণ এ-পর্যন্ত ঘোড়াগুলোকে স্ট্যাম্পিড করার চেষ্টা করেনি তারা, কিংবা কোন ঘোড়াকে মেরে ফেলার চেষ্টাও করেনি। তারমানে, ওরা ধরে নিয়েছে আগে-পরে যখনই হোক ঠিকই ঘোড়াগুলোর মালিক হতে পারবে।

কিছুই নড়ছে না। ওঅটরহোলের কাছে তিক্ত স্বরে খিস্তি করল কেউ

এরিকের কাছাকাছি ভনভন করছে একটা মাছি, মুখের সামনে দিয়ে উড়ে গেল একবার। নেহাত বিরক্তির সঙ্গে হাত ঝেড়ে ওটাকে তাড়ানোর চেষ্টা করল, পরমুহূর্তে সামনের বোল্ডারে পাথরকুচি ছোটাল একটা বুলেট, গ্যানিটের টুকরো এসে আঘাত করল মুখে। গুলির শব্দটা শোনা গেল বেশ পরে

মাথা নিচু করল ও, দুই বোল্ডারের ফাঁকে মাথা গুঁজে উঁকি দিল সামনে। একটা টার্গেট খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করছে। একটু নীচে কেলারকে দেখতে পেল, জুলিয়ার পাশে বসে ফিসফিস করে বলছে কী যেন। মুখ নিচু মহিলার, তাই কেলারের কথাগুলোর প্রভাব বা প্রতিক্রিয়া দেখতে পেল না। অন্যদের থেকে একটু দূরে আছে দু’জন, ইচ্ছে করেই সরে গেছে কি-না কে জানে!

ভয়ানক গরম পড়ছে। কোথাও কিছু নড়ছে না

গ্রানিটের ছায়া পড়েছে, এমন একটা জায়গা পেয়ে শুয়ে পড়ল সার্জেন্ট হ্যালিগান, রাতের পাহারার আগে খানিকটা সময় বিশ্রাম নিতে ইচ্ছুক। পাশাপাশি দুটো পাথরের কাছে অবস্থান নিয়েছে ডেভিস আর ব্লট, মরুভূমিতে চোখ রাখার ফুরসতে আলাপ করছে নিজেদের মধ্যে।

এখান থেকে বেরিয়ে যাওয়ার উপায় নিয়ে ভাবছে এরিক। একটা উপায় আছে নিশ্চই! সব সমস্যারই সমাধান থাকে, আসল কাজ হচ্ছে ওটা খুঁজে পাওয়া। এ-গ্যাড়াকল থেকে মুক্তি পাওয়ার উপায়ও আছে, মনে-প্রাণে বিশ্বাস করে এরিক। চোখ কুঁচকে মরুভূমিতে যত তীক্ষ্ণ দৃষ্টিই রাখুক না কেন, কিংবা মরিয়া হয়ে যতই ভাবুক, কোন উপায় খুঁজে পেল না।

এতদিনে নিশ্চই টনক নড়েছে সেনাবাহিনীর, সন্দেহ করেছে হারিয়ে গেছে অথবা বিপদে পড়েছে পেট্রল বাহিনী; এটাও জেনে থাকবে যে একই পরিণতি ঘটেছে পাসিবাহিনীর। দুটো সংগঠিত সশস্ত্র বাহিনীর একই সময়ে একই জায়গায় উধাও হয়ে যাওয়ার তাৎপর্য যে সেখানে ভয়ঙ্কর কিছু ঘটেছে, না বোঝার মত বোকা এমনকী সাধারণ মানুষও নয়। তা ছাড়া, এই সময়ে মরুভূমিতে সাধারণ অভিযাত্রীদের যাতায়াত কমে যাওয়াও ইন্ডিয়ান হামলার পক্ষে সাক্ষ্য দেয়। ইতোমধ্যে হয়তো দুটো বাহিনীর সম্ভাব্য পরিণতি সম্পর্কে জল্পনা কল্পনা শুরু হয়েছে, সার্চ পার্টি গঠন করে তল্লাশি করার তোড়জোড় শুরু হওয়াও বিচিত্র নয়।

মেয়ের খোঁজে টুকসনে গিয়েছিল জিম রিওস, এতদিনে হয়তো হাল ছেড়ে দিয়েছে সে, কিংবা আরও পশ্চিমে চলে গেছে। ব্যক্তিগতভাবে না চিনলেও রিওসের মত মানুষ সম্পর্কে জানে এরিক, প্রভাবশালী এই র‍্যাঞ্চার যদি আঁচ করতে পারে যে বিপদে পড়েছে তার মেয়ে, তৎক্ষণাৎ পশ্চিমে রওনা দেবে সে। পাপাগো ওয়েল্‌সে আসতে সময় নেবে না তারা। সেক্ষেত্রে, দ্বিগুণ সতর্ক থাকতে হবে ওদের। পাপাগো ওয়েলসের দিকে আগুয়ান সার্চ পার্টিকে সতর্ক করে দিতে হবে।

স্মোক সিগন্যালের কথা ভাবল এরিক…কিন্তু যথেষ্ট জ্বালানি নেই ওদের। সিগন্যাল দিতে গেলে হয়তো সব জ্বালানি শেষ হয়ে যাবে, কফি তৈরির জন্য অবশিষ্ট থাকবে না।

উনুনের মত উত্তপ্ত পাথুরে জমিতে দলবল নিয়ে পুড়ছে চুরুতি, কারণটা ব্যাখ্যাতীত মনে হলেও স্বস্তি বোধ করার নয়, বরং রীতিমত আশঙ্কাজনক। শুধু অবরোধ করেই ক্ষান্ত হয়নি, বরং সুযোগ পেলেই নিপুণ নিশানায় গুলিও করছে।

হঠাৎ উঠে দাঁড়াল জেফ কেলার। গোল্লায় যাও তোমরা! ধৈর্য হারিয়েছে সে। এখান থেকে চলে যাব আমি!

জবাব দিল না কেউ।

উঠে দাঁড়াল ড্যান, পাথুরে ঢাল ধরে উঠতে শুরু করল, এরিককে রেহাই দেবে। পায়ের কাছে বালিতে থুথু ফেলল বেন ডেভিস। অনেক আগেই গা থেকে কোট খুলে ফেলেছে, পরনের শার্ট শুধু নোংরাই নয়, ছিড়েও গেছে কয়েক জায়গায়। ছোট ছোট দাড়ির জঙ্গল জন্মেছে চোয়ালে, চোখে-মুখে ক্লান্তি আর অবসাদ। স্বাভাবিকের চেয়ে একটু বয়স্কই দেখা যাচ্ছে তাকে। নির্লিপ্ত চোখে কেলারকে দেখছে ওরা, কিন্তু কেউই কোন মন্তব্য করল না

খোলা জায়গার মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে বিশালদেহী সৈনিক, তাচ্ছিল্য আর বিদ্রূপ ঝরে পড়ছে চাহনিতে। আজ রাতেই এখান থেকে বেরিয়ে যাব আমি। আমার সঙ্গে যাওয়ার সাহস কারও আছে? থাকলে, স্বাগতম!

তার কাছে গিয়ে দাঁড়াল এরিক। আইডিয়াটা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলো, কেলার, বলল ও। হয়তো আরেকটু দেরি হবে, কিন্তু এখান থেকে সবাই বেরিয়ে যাব আমরা। আপাতত এখানেই টাইট হয়ে বসে থাকতে হবে।

ঝটিতি ঘুরে দাঁড়াল অবাধ্য সৈনিক। তোমার উপদেশ দরকার হলে চাইব আমি। সেধে দিতে বলল কে? আজ রাতেই এখান থেকে চলে যাব আমি।

বেশ, যেতে চাইলে যাও। কিন্তু ঘোড়া নিতে পারবে না।

ঘোড়া নিতে পারব না? উপহাসের দৃষ্টিতে ওকে মাপছে কেলার। একটা ঘোড়া যদি নিই আমি, থামাবে নাকি আমাকে?

ঘুম টুটে গেছে সার্জেন্টের। কেলার! তীক্ষ্ণ স্বরে নির্দেশ দিল সে। চাপাবাজি বন্ধ রেখে বসে পড়ো!

সার্জেন্টের দিকে ফিরেও তাকাল না কেলার। স্রেফ অগ্রাহ্য করল নির্দেশটা, দৃষ্টি স্থির হয়ে আছে এরিকের মুখে। তোমাকে একটুও পছন্দ করি না আমি, ক্ৰেবেট। এমনকী এক মুহূর্তের জন্যও ভাল লাগেনি। সারাক্ষণ শুধু একটা কথাই বলছ: টাইট হয়ে বসে থাকত্বে হবে। বসে থাকতে থাকতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছি আমি। এবার গা-ঝাড়া দিলেই নয়। যা বলেছি, রাতেই চলে যাব আমি। রাইড করেই যাব, তুমি চাও আর না-চাও, এবং ভাবছি তোমার ঘোড়াটাই নেব।

এক কদম এগিয়ে এল কেলার। একই জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে এরিক, মুখ নির্বিকার। অখণ্ড মনোযোগে ওকে দেখছে এড মিচেল। উঠে দাঁড়িয়েছে বেন, কৌতূহলী।

ছায়ায় বসে মাথাটা ঠাণ্ডা করো, কেলার। গরম আমাদের সবাইকে পেয়ে বসেছে। শান্ত, নিষ্কম্প সুরে বলল এরিক। এতক্ষণে হয়তো প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে সার্চ পার্টি। এখানে আসতে বেশি সময় লাগবে না, শিগগিরই বিপদ কেটে যাবে।

যখন খুশি যাব আমি, কে ঠেকাবে আমাকে? তড়পে উঠল কেলার। ভাবছি যাওয়ার আগে একটা কাজ করব। যাদের চাপা থাকে, পিস্তল দরকার হয় না তাদের। তোমার ওই পিস্তলটা বড় বেমানান, ওটা কেড়ে নিয়ে

কথাটা শেষ করার সুযোগ পেল না কেলার, তার আগেই ঘুসি চালিয়েছে এরিক। তৈরি ছিল বিশালদেহী সৈনিক, চট করে বাম হাতে ঠেকিয়ে দিল এরিকের ঘুসি। কিন্তু নিজের অজান্তে অরক্ষিত করে ফেলল চিবুক। সুযোগটা নিতে কার্পণ্য করল না এরিক, বাম হাতের পরপরই ধেয়ে গেল ওর ডান হাত, কেলারের চওড়া চোয়ালে ল্যান্ড করল। শব্দ শুনে মনে হলো যেন গাছের গুঁড়িতে আঘাত হেনেছে কুড়ালের বাট।

শব্দটা সবাই শুনতে পেল, এবং দেখতে পেল টলে উঠেছে জেফ কেলারের দেহ। চোখ ধাঁধানো ক্ষিপ্রতায় আবার ঘুসি চালাল এরিক, দুটোই আঘাত হানল মুখে। দড়াম করে বালির উপর আছড়ে পড়ল বিশালদেহী সৈনিক, স্থির পড়ে থাকল দুই সেকেন্ড, হতবাক। এদিকে পিছিয়ে গেল এরিক, কেলারকে উঠে দাঁড়ানোর সুযোগ দিল। হঠাৎ যেন পরিস্থিতি উপলব্ধি করতে সক্ষম হলো কেলার, এক ঝটকায় নিজেকে খাড়া করল, রাগে কাঁপছে শরীর; বুনো আক্রোশ নিয়ে তেড়ে এল সে, বিশাল শক্তিশালী দুই বাহু ছড়িয়ে দিয়েছে, চট করে দূরত্বটা, কমে গেল।

একচুলও নড়ল না এরিক, কাছে আসতে দিল প্রতিদ্বন্দ্বীকে। কেলার লাফ দিতে চট করে সরে গেল এক পাশে, একইসঙ্গে বাম হাতের জবর ঘুসি চালাল বিশালদেহীর মুখে। সঙ্গে সঙ্গে ফেটে গেল কেলারের ঠোঁট, রক্ত গড়াতে শুরু করল। কিন্তু উদ্দেশ্য সফল হয়েছে তার, সাঁড়াশি বন্ধনে আবদ্ধ করেছে এরিককে; তবে তুলনায় এরিক অনেক ক্ষিপ্র, চট করে ঘুরে দাঁড়াল, তারপর রোলিং হিপলকের সাহায্যে ছুঁড়ে ফেলল কেলারকে। শক্ত পাথুরে জমিতে আছড়ে পড়ল

শুয়ে থাকো, কেলার, বিশালদেহী উঠে দাঁড়াতে উদ্যত হতে নির্দেশ দিল এরিক। দাঁড়িয়েছ তো পিটিয়ে তক্তা বানিয়ে ফেলব তোমাকে!

চার হাত-পায়ে ভর দিয়ে উঠতে যাচ্ছিল কেলার, ওভাবেই পড়ে থাকল কয়েক মুহূর্ত, শেষে শরীর শিথিল করে দিল। এদিকে পিছিয়ে এসে নিজেকে সুস্থির করল এরিক। ভিতরে ভিতরে দুর্বল বোধ করছে। শরীরটা বিশাল হলেও হাতাহাতি লড়াইয়ে অভিজ্ঞ নয় কেলার, নিরস্ত হলে বাধ্য হয়ে তাকে পেটাত এরিক, কিন্তু উপভোগ্য হত না ব্যাপারটা। বরং হয়তো প্রয়োজনীয় একজন লোককে সাময়িকভাবে পঙ্গু করে দিতে হত। এরিক এটাও জানে জেফ কেলার নাছোড়বান্দা টাইপের মানুষ, সহজে নিরস্ত হতে জানে না, ওর প্রতি ঘৃণা বিদ্বেষ আজীবন পুষে রাখবে।

কেউ কিছু বলল না। বেশ কিছুক্ষণ পর উঠে দাঁড়াল কেলার, স্থলিত পায়ে অ্যারোয়োর অন্য প্রান্তে চলে গেল।

ওকে মিটিয়ে কী প্রমাণ করলে? জানতে চাইল ডুগান।

প্রশ্নটাকে উপেক্ষা করল এরিক। বাঁচতে হলে এখানেই থাকতে হবে আমাদের। এটাই একমাত্র উপায়। মরুভূমিতে খোলা জায়গায় যদি বেরিয়ে যাই, কেউ হাঁটবে কেউ ঘোড়ায় চড়বে, ওই অবস্থায় মিনিট কয়েকের বেশি টিকতে পারব না। মেয়েদের কথাও ভাবতে হরে। আর, দয়া করে আমার কথাটা বিশ্বাস করো, এখান থেকে ইয়োমা পর্যন্ত পথ দুনিয়ার সবচেয়ে খারাপ জায়গা। ঘুরে মার্ক ডুগানের দিকে ফিরল ও। তুমিও জানো এটা।

এ-পথে বহুবার যাতায়াত করেছি আমি, বলল সে। এবারও পারব।

সম্ভবত কোনবারই মেয়েদের নিয়ে ভাবতে হয়নি তোমার, এবং পর্যাপ্ত পানিও ছিল সঙ্গে।

মন্তব্যটা না-শোনার ভান করল ডুগান, উঠে দূরে সরে গেল। ব্লট আর ডেভিসের পাশে গিয়ে বসল। একটু পর বিগ জুলিয়া যোগ দিল ওদের সঙ্গে। মুহূর্ত খানেক চারজনের দলটাকে দেখল এরিক, তারপর আনমনে কাঁধ উঁচিয়ে অন্যদিকে মনোযোগ দিল।

উপর থেকে ওকে ডাকল ড্যান। এরিক। মনে হচ্ছে একটা কিছু নড়ছে মরুভূমিতে!

ছুটে পাথুরে চাতালে উঠে এল এরিক, কিন্তু মরুভূমিতে কিছুই দেখতে পেল না। একই চিত্র: তাপতরঙ্গ, পাথর, বোল্ডার, ঝোঁপ; একই

অ্যারোয়োর লাগোয়া পাথরের আড়াল থেকে ছুটে এল তীরটা, পাথরের সামনেই রয়েছে ঝোঁপ। ঘন ধোঁয়া উঠছে তীরটা থেকে, উপবৃত্তাকার পথে নেমে আসছে মাটির দিকে।

চিডল! এড! ঘোড়ার লাগাম হাতে রাখো! আগুন লাগানো তীর ছুঁড়েছে হারামীগুলো!

সঙ্গে সঙ্গে দাড়িয়ে গেল সবাই। করালের দেয়াল তৈরি করেছে, এমন একটা ঝোঁপের উপর পড়ল তীরটা। মুহূর্ত কয়েক নীববতার পর মৃদু পটপট শব্দে আগুন ধরে গেল ঝোপে।  

সবার আগে সক্রিয় হয়েছে টনি চিডল। পড়ে যাওয়ার আগেই ছুটে আসা তীরটা দেখতে পেয়েছে সে, সঙ্গে সঙ্গে ছুটতে শুরু করল। কয়েক কদম এগিয়ে ডাইভ দিল। দু’হাতে খাবলা মেরে বালি তুলে নিয়ে ছুঁড়ে মারল ঝোপে। ভাগ্য সহায়তা করল তাকে। আগুনের সরু শিখার উপর গিয়ে পড়ল বালি। ততক্ষণে দ্বিতীয় তীর চলে এসেছে, তৃতীয়টা আসতেও দেরি হলো না। দ্বিতীয়টা লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়েছে, ঝোঁপের পিছনে কোথাও বালির উপর পড়ল; কিন্তু পরেরটা ঝোপে পড়ার পরপরই আগুন ধরে গেল। মিচেল আর ডুগান চলে গেছে সেখানে, মরিয়া চেষ্টায় বালি ছুঁড়ে মারছে আগুনে।

আপাতত রক্ষা হলেও শেষপর্যন্ত করালটাকে বাঁচাতে পারবে না ওরা, দিব্যি বুঝতে পারছে এরিক। কটা তীর নেভাবে? একটা, দুটো…বড়জোর এক ডজন। কিন্তু ক্রমাগত চেষ্টা চালিয়ে যাবে অ্যাপাচিরা। নিপুণ নিশানায় তীর পাঠাতে থাকবে। শুকনো ঝোপে পড়া মাত্র দপ করে জ্বলে উঠবে। করাল বলে অবশিষ্ট থাকবে না কিছু।

সার্জেন্ট! চিৎকার করে নির্দেশ দিল ও। সব ঘোড়া নিয়ে উপরে চলে এসো! জলদি! দেখল প্রায় সঙ্গে সঙ্গে সক্রিয় হয়েছে সার্জেন্ট। ড্যান কোয়ানের দিকে ফিরল এরিক। আগুনের দিকে মনোযোগ দিয়ো না, ড্যান। এ-সুযোগে হয়তো হামলা করবে শয়তানগুলো!

বেন ডেভিসেরও একই ধারণা। ছুটে উপরে উঠে এল সে, লাভার দিকে মুখ করে পজিশন নিল, হাতে রাইফেল তৈরি। উত্তরমুখো হয়ে অবস্থান নিয়েছে কেলার, হঠাৎ গর্জে উঠল তার বন্দুক, সেকেন্ড পূর্ণ হওয়ার আগেই সুর মেলাল ড্যানেটা?

যাহ্, ফস্কে গেছে! ত্যক্ত স্বরে বলল তরুণ। একবার যদি ঠিকমত নিশানা করে গুলি করার সুযোগ পেতাম!

জ্বলন্ত ঝোঁপের দিকে তাকাল এরিক। আরও একটা তীর আগুন ধরিয়ে দিয়েছে করালের বেড়ায়, ওদের নাগালের বাইরে। কিছুক্ষণের মধ্যে পুরো বেড়ায় আগুন ধরে গেল, লেলিহান শিখা গ্রাস করে ফেলছে। পিছিয়ে এসো! চিৎকার করে অন্যদের সতর্ক করল ও। পিছিয়ে পাথরের কাছে চলে এসো!

ব্লট আর মেলানির সাহায্য নিয়ে ইতোমধ্যে ঘোড়াগুলোকে সরিয়ে নিয়ে এসেছে সার্জেন্ট হ্যালিগান। পিছু নিয়ে ছুটে এল অন্যরা, সুবিধাজনক জায়গায় পজিশন নিল। জ্বলছে করালের বেড়া, প্রচণ্ড উত্তাপ আর আগুনের ঔজ্জ্বল্য চোখ ধাঁধিয়ে দিচ্ছে ওদের, কিন্তু তারপরও স্থির পড়ে থাকল সবাই-সজাগ, সতর্ক।

নীচের কূপটা বেদখল হয়ে গেছে। করাল না থাকায় কূপের চারপাশের এলাকা কাভার করতে পারবে ইন্ডিয়ানরা, সেক্ষেত্রে ওই কূপ থেকে পানি যোগাড় করার কোন সম্ভাবনাই থাকল না। কিন্তু ঘোড়াগুলোকে পানি খাওয়ানোর জন্য ওটাই ব্যবহার করছিল ওরা। অবশ্য এমনিতেও বেশি পানি ছিল না, হয়তো আরও একটা দিন চলত। এখন ঘোড়া আর মানুষ, সবার পানির চাহিদা মেটাতে হবে উপরের দুই কূপ থেকে।

আরও আঁটসাট হয়ে গেছে ওদের অবস্থান, তবে মজবুত এখনও, কিংবা আচমকা আক্রমণ করেও সহজে সুবিধা করা যাবে না। কিন্তু চূড়ান্ত পরিণতিটাকে এগিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছে ধূর্ত অ্যাপাচিরা। জায়গার অভাব, পানি আর খাবারের ঘাটতি…।

পুরো আধঘণ্টা ধরে জ্বলল করালের বেড়া, তারপর শিখা নিভে গিয়ে জ্বলন্ত অঙ্গারের মত জ্বলতে থাকল। উপরে, নিষ্ঠুরতার চরম দেখাচ্ছে সূর্য, পুরো আকাশই ঝলসাচ্ছে যেন। মরুভূমিতে ঝলমল করছে তাপতরঙ্গ। অসীম ধৈর্য নিয়ে এখনও চক্কর কাটছে কয়েকটা শকুন

নীরব হয়ে আছে সবাই। খাটুনি এবং প্রচণ্ড উত্তাপের কারণে ক্লান্ত বোধ করছে মিচেল আর চিডল। ফ্যাকাসে হয়ে গেছে মার্ক ডুগানের মুখ, এই প্রথম ভাষা যোগাল না তার মুখে। সঙ্কটাপন্ন অবস্থা উপলব্ধি করে হতাশ হয়ে পড়েছে সবাই, পরিণতি আঁচ করতে পারছে।

বেন ডেভিসের কণ্ঠে সবার মনের ভাবনা প্রকাশ পেল। এবার কী করব আমরা, ক্ৰেবেট? এখনও কি টাইট হয়ে বসে থাকব?

হ্যাঁ

জ্বলন্ত দৃষ্টিতে এরিকের দিকে তাকাল ডুগান, কেলারের চোখে কেবলই ঘৃণা দেখা গেল। কিন্তু মিচেল বলল, হারামজাদা চুরুতি আমাদের সঙ্গে ইঁদুর-বেড়াল খেলছে! সে জানে যে গঁাড়াকলে আটকা পড়েছি, চাইলেও বেরিয়ে যেতে পারব না। রয়ে-সয়ে শিকার ধরবে, এই সুযোগে আনন্দের খোরাক জুটিয়ে নিচ্ছে।

প্রচণ্ড গরম লাগছে। পাথরের পিছনে ক্ষীণ ছায়া পড়েছে। লাভার চাঙড়ে ঠিকরে আসা রোদ চোখ ধাধিয়ে দিচ্ছে। ঝোঁপের কারণে যাও বা ছায়া পাচ্ছিল, করাল পুড়ে যাওয়ায় এতটুকু ছায়া নেই কোথাও। স্থাণুর মত বসে আছে সবাই, পরিস্থিতির পরিবর্তনে বিমূঢ়, কারও মুখে কথা যোগাচ্ছে না।

কারও সাহায্য ছাড়াই কাজ শুরু করল এরিক, পাথর তুলে নিয়ে বসাতে শুরু করল ফাঁকফোকরে, একশো বর্গমিটার পরিধির এই জায়গাটাকে দুর্ভেদ্য করে তুলতে চাইছে। একটু পর ওর সঙ্গে যোগ দিল টনি চিডল আর এড মিচেল। ডেভিসের দিকে তাকাল মেলানি, আশা করছিল সেও হাত লাগাবে এরিকের সঙ্গে, কিন্তু দেখল ব্লট এবং কেলারের সঙ্গে নিচু স্বরে আলাপ করছে সে।

দু’দিন কি বড়জোর তিনদিনের মত পানি আছে ওদের, সেটাও আধাআধিতে নামিয়ে আনতে হবে। খাবার যা আছে, সব মিলিয়ে কোনরকমে তিন বেলা হবে।

কাজ শেষে পাথরের কিনারে এসে যখন বসল এরিক, ড্যান জানতে চাইল: এবার কী করব আমরা?

শ্রাগ করল এরিক। সূর্য পশ্চিমে হেলে পড়ায় বিশাল এক বোল্ডারের ছায়া পড়েছে দুই পাথরের ফাঁকে, সেদিকে সরে গেল ও। একটা কাজই করার আছে এখন-অপেক্ষা। বাজি ধরে বলতে পারি, অপেক্ষা করতে ওদেরও ভাল লাগছে না। চিন্তিত দৃষ্টিতে হাতের উল্টো পিঠ নিরীখ করল ও। ভাবছি আজ রাতে পাল্টা হামলা করব কি-না।

আছি তোমার সঙ্গে।

এখনও সিদ্ধান্ত নেইনি…দেখা যাক, দৃষ্টি তুলে ড্যানের দিকে তাকাল ও। কেমন চলছে তোমাদের-মিমির কথা বলছি?

রক্ত উঠে এল ড্যানের মুখে। খুব ভাল মেয়ে ও।

হ্যাঁ, ওর মত মেয়ে সহজে খুঁজে পাওয়া যাবে না এখানে। পাশাপাশি বসে থেকে মরুভূমির উপর নজর রাখল ওরা। সূর্যের উত্তাপের চেয়ে বরং ঔজ্জ্বল্যই অসহ্য মনে হচ্ছে, যদিও দুপুর পেরিয়ে গেছে বেশ আগেই। শেষ বিকেলে দ্বিগুণ উৎসাহে দায়িত্ব পালন করছে সূর্য। ফিল্ডগ্লাস তুলে নিল এরিক, ইয়োমার দিকে দিগন্তের সীমানা নিরীখ করল। তারপর পুব দিগন্ত জরিপ করল।

কিচ্ছু নেই…।

গ্লাসের কাছাকাছি পাথরে লাগল একটা বুলেট, পরমুহূর্তে ছুটে এল, আরেকটা! তাল মিলিয়ে পাথর আর ঝোঁপের উপর দিয়ে অর্ধচক্রাকারে ছুটে এল একটা তীর, আগুনের কাছাকাছি পড়ল। তৃতীয় বুলেটটা সরু ফুটো তৈরি করল ড্যান কোয়ানের হ্যাটের ব্রিমে, পাথরের উপর এসে পড়ল আরেকটা তীর

রাইফেল হাতে অপেক্ষায় থাকল এরিক। রীজের চূড়ায় বালি ঝরে পড়তে দেখে সঙ্গে সঙ্গে গুলি করল, একটু নীচের দিকে রেখেছে নিশানা। শূন্যে খাবি খেল একটা হাত, দূর থেকে দেখতে পেল ওরা, ধীরে ধীরে নেমে গেল। বুকে বা মাথায় গুলি খেয়েছে লোকটা। বালি খামচে ধরল ইন্ডিয়ানের দশ আঙুল, একটু পর মুঠি আলগা হয়ে যেতে খসে পড়ল বালি, হাতটা উধাও হয়ে গেল ওদের দৃষ্টিসীমা থেকে।

একটা শেষ! উত্তেজিত স্বরে বলল ড্যান। দারুণ দেখিয়েছ, এরিক!

বরাত জোরে লাগাতে পেরেছি। মনে হলো ওখানে আছে ব্যাটা, দেরি না করে গুলি করেছি।

ভাবছি ব্যাটারা না জানি কী পরিকল্পনা করছে।

শ্রাগ করল এরিক। আদৌ বলা সম্ভব? তবে, আমার ধারণা, কিছুটা হলেও অধৈর্য হয়ে পড়েছে চুরুতি। আশায় ছিল পালানোর চেষ্টা করব আমরা, সেভাবেই পরিকল্পনা করেছিল সে..খোলা জায়গায় পেয়ে যাবে আমাদের। কিন্তু উল্টো ওদেরকেই খোলা জায়গায় থাকতে বাধ্য করেছি আমরা। যথেষ্ট পানি নেই, ওদের সঙ্গে, খাবারও নিশ্চই ফুরিয়ে আসছে। তা ছাড়া, রাইফেল আর ঘোড়ার লোভে অস্থির হয়ে পড়েছে অ্যাপাচিরা, আমাদের তাড়াতে পারলেই পেয়ে যাবে ওগুলো।

নীচে, পাহাড়ী চাতালে উঠে দাঁড়াল বেন ডেভিস।

তা হলে ওই কথাই রইল, আজ রাতে? জানতে চাইল ব্লট।

হ্যাঁ, ডেভিসের সংক্ষিপ্ত জবাব।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *