১১. উজ্জ্বল ঝলমলে দিন

উজ্জ্বল ঝলমলে দিন। বিপক্ষদলের সবকটা লোককে অবাক করে দিয়ে একাই ওদের মোকাবিলা করার জন্য এগিয়ে যাচ্ছে জেকব। ধী। সমান গতিতে এগোচ্ছে বাকস্কিন। জিনের উপর নির্বিকারভাবে বসে আছে শক্ত-পাল্লা। বাম হাতে লাগাম-ডান হাতটা অলসভাবে উরুর উপর রাখা।

বাকস্কিনটাও টের পেয়েছে। ঘোড়াটার চলার ভঙ্গিতে তা বুঝতে পারছে জেকব।

ওদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামতে চায়নি সে। ওরাই বাধ্য করছে তাকে। ডালিয়ার গায়ে গুলি লাগার ঝুঁকি সে নিতে চায় না বলেই একা এগিয়ে যাচ্ছে। কেলভিনের সাহায্য নেওয়ার কথা একবারও ভাবেনি, কারণ এটা তার ব্যক্তিগত সমস্যা, এর সমাধানও তার নিজেরই করতে হবে।

দূরত্ব কমে আসছে। নির্দিষ্ট কারও দিকে তাকিয়ে নেই জেকব। একসাথে ওদের সবার চাল-চলন লক্ষ করছে তার চোখ। দু’জন পিছিয়ে পড়ে একপাশে সরে গেল। এর মানে কী: ওরা কি গোলাগুলি শুরু হওয়ার আগেই ঝামেলায় থাকতে চায় না বলে সরে গেল? নাকি পাশ থেকে আক্রমণ চালাবে?

ওদের মধ্যে দূরত্ব একশো গজ থাকতেই রাশ টেনে থেমে দাঁড়াল শক্ত পাল্লা। ওর বায়ে রয়েছে পাথরের ধার থেকে গজানো কয়েকটা গাটওয়ালা সীডার গাছ-ফুট তিনেক উঁচু। ডানদিকে আরও সামনে পাথরে একটা সরু ফাটল। একটু সামনে এগিয়ে ওটা প্রায় খাড়াভাবে নীচের ক্যানিয়ন পর্যন্ত নেমে গেছে।

রেকাব থেকে পা দুটো আলগা করে নিয়ে সোজা হয়ে বসল। তৈরি হয়ে আবার আগে বাড়ল সে। আর মাত্র পঞ্চাশ গজ থাকতে সে চিৎকার করে নির্দেশ দিল, ব্যস! ওইখানেই দাঁড়াও!

ওরা থেমে দাঁড়াতেই সে আবার বলল, তোমাদের আগেই বলেছি কাপুরুষের মত পিঠে গুলি করে আমি মারিনি ওকে। বরং তোমাদের ঝগড়াটে বন্ধুই মরদের মত না লড়ে পেটের কাছে গুঁজে রাখা পিস্তল বের করে বেআইনী ভাবে দেহের আড়াল থেকে চোরাগুলি চালিয়ে আমাকে মারতে চেষ্টা করেছিল। বেশি চালাকি করতে গিয়েই পাশে আর পিঠে গুলি খেয়েছে সে।

কক্ষনো না! মিথ্যে কথা! চেঁচিয়ে উঠল লী। তুমি খুন করেছ ওকে। এখন মিথ্যা অপবাদ দিয়ে নিজে বাঁচতে চাইছ। ফাঁসিতে ঝুলবে তুমি। কয়েক কদম এগিয়ে আবার লাগাম টানল সে। পিস্তলে জনিকে হারানোর মুরোদ তোমার থাকতে পারে না!

প্রমাণ চাও, বন্ধু? বিদ্রূপ করল জেকব। এসো তবে, কেবল তুমি আর আমি সামনাসামনি দাঁড়াই-তুমি নিজেই পরখ করে দেখো ডেরিককে হারাবার মত হাত আমার আছে কি না! সবাই দেখুক? আমি মিথ্যা বলছি কিনা তার প্রমাণ হোক?

বেকায়দায় পড়ে গেল লী। সমর্থ লোক সে-লড়াই-এর ভয়ে পিছিয়ে না গিয়ে নিজের লড়াই সে নিজেই লড়ে। কিন্তু দলগত ভাবে একটা কাজ করতে এসে এরকম ফেঁসে যাবে ভাবতেই পারেনি সে। এখন এমন অবস্থা হয়েছে যে তাকেই শক্ত-পাল্লার মুখোমুখি দাঁড়াতে হচ্ছে!

চালাকি করে জেকব পুরো দায়িত্বটা সুন্দর ভাবে লী-র কাঁধে চাপিয়ে দিয়েছে। অন্য সবাই বাদ পড়ে গেছে। এখন যদি লী মারাও যায় তবু ন্যায়সঙ্গতভাবে তার দলের কারও আর জেকবকে কিছু বলার মুখ থাকবে না।

তবে তাই হোক, হতচ্ছাড়া পাজি! চিৎকার করে উঠল লী। বেঈমানীর উচিত শিক্ষাই আমি দেব। আমি…’

জেকবের পিছন থেকে কে যেন চিৎকার করে কিছু বলল। সাথেসাথেই ওর বুকের উপর কেউ একটা প্রচণ্ড ধাক্কা মারল। ঘোড়াটা পিছনের দু’পায়ের উপর লাফিয়ে উঠল। রেকাব থেকে পা ফসকে মাটিতে পড়ল সে।

বাঁচাব তাগিদে হামাগুড়ি দিয়ে, হেঁচড়ে কোনমতে ফাটলটার দিকে এগিয়ে চলল জেকব। পায়ে চোট লেগেছে-বুকটা অবশ-টপটপ করে রক্ত পড়ছে পাথরের উপর।

ফাটলের ভিতর পৌঁছে তাড়াতাড়ি পকেট থেকে রুমাল বের করে ক্ষতের গর্তটার উপর ঠেসে দিল। টাইট শার্টের চাপে রুমালটা জায়গাতেই রইল। আহত হয়েছে-কিন্তু জখমটা মারাত্মক কিনা এখনও বুঝতে পারছে না সে।

পিছন থেকে চিৎকার শোনার পরে কী হয়েছে তা নিমেষের মধ্যেই দেখে নিয়েছিল জেকব। যে লোক দু’টো পাশে সরে দাঁড়িয়েছিল তারাই গুলি করেছে ওকে। তাদের রাইফেল তুলতে দেখেছে সে…কিন্তু তখন আর সময় ছিল না-দেরি হয়ে গেছে।

কে যেন চিৎকার করে বলছিল, এটা কী করলে তুমি?

আমরা ওকে মারতে এসেছিলাম, তা না; লোকটা মরেছে-আর কী চাও? জবাব দিয়েছিল বার্ট।

কঠিন চোখে বার্ট আর ক্লাইভের দিকে চেয়ে ইউজিন বলেছিল, ছিঃ, এমন নোংরা…

কথাটা শেষ করার সুযোগ পায়নি সে। পাহাড়ের উপর থেকে একটা রাইফেল গর্জে উঠল। বুলেট গাঁথার শব্দের সাথে সাথে বার্টকে উল্টে পড়ে যেতে দেখল ইউজিন। দ্বিতীয় গুলিতে ক্লাইভের ঘোড়াটা ছাগলের বাচ্চার মত লাফাতে আরম্ভ করল।

ছত্রভঙ্গ হয়ে পাথরের আড়ালে নিরাপদ আশ্রয় নিল ওরা।

রাইফেল নামিয়ে নিল ডালিয়া। ওর শান্ত নীল চোখ দুটো নীচের দিকে গুলি করার মত আরও লক্ষ্য বস্তু খুঁজছে।

ম্যাডাম, বলল কেলভিন, আমার বান্ধবী হয়ে আমার সাথে পালিয়ে যাওয়াই এখন তোমার সবদিক থেকে ভাল।

যাও। ঠাণ্ডা গলায় বলল ডালিয়া, দূর হও তুমি আমার সামনে থেকে।

ভাল চাও তো আমার কথা শোনো! হাত বাড়িয়ে ডালিয়ার ঘোড়ার লাগাম ধরল কেলভিন।

হাতের রাইফেলটা প্রচণ্ড বেগে ঘুরাল ডালিয়া। ব্যারেলটা গিয়ে লাগল ওর মুখে। ঘোড়া থেকে উল্টে নীচে পড়ে গেল কেলভিন। সামলে নিয়ে উঠে বসল সে। ঠোঁট থেঁতলে রক্ত বেরুচ্ছে। ওর দিকে রাইফেল তাক করে ধরে আছে ডালিয়া। একেবারে স্থির হয়ে গেল কেলভিন। মুখে বলল, শোনো, তুমি ভুল বুঝছ। আমি…’।

সোজা নিজের ঘোড়ায় উঠে বিদেয় হও-আমার আশেপাশে আর তোমাকে দেখতে চাই না আমি।

ওই লোকগুলো তোমাকে খুন করে ফেলবে। তুমি বুঝতে পারছ না, ওদের একজনকে গুলি করেছ তুমি-কিছুতেই ওরা তোমাকে ছাড়বে না।

জেকব রয়েছে ওখানে, বলল ডালিয়া। আমিও নীচে যাব। তুমি বসে বসে তামাশা দেখলে, ওদিকে তোমার বন্ধুকে ওরা গুলি করে মারল। তুমিও তো লোক দুটোকে দেখেছিলে-জানতে ওরা কী করতে যাচ্ছে!

ধীরে ধীরে নিজের ঠোঁটের উপর হাত বোলাল কেলভিন। তারপর বলল, জেকব মরে গেছে। তুমি নিজের চোখেই পড়তে দেখেছ ওকে। যে মরে গেছে তার জন্যে মিছে ভেবে কী লাভ? এদেশে মেয়েদের পক্ষে একা চলা অসম্ভব। বিশেষ করে তোমার মত মেয়ের একজন শক্ত পুরুষের দরকার। আমি…’।

কথার মাঝেই ঘোড়াটাকে ওর পিছন দিকে হটিয়ে নিয়ে হঠাৎ তীর বেগে ঘোড়া ছুটিয়ে ঝোঁপ আর পাথরের আড়ালে অদৃশ্য হয়ে গেল ডালিয়া।

উঠে দাড়িয়ে চারপাশটা একবার ভাল করে দেখে নিল সে। জেকবের বাকস্কিনটা ছুটে কয়েক গজ সামনে চলে গিয়েছিল-এখনও সেটা ওখানেই দাঁড়িয়ে আছে। জেকবের মৃতদেহ বা অন্য কারও দেহ ওর নজরে পড়ল না

জেকবের মাল-বোঝাই গাধাগুলো ছড়িয়ে পড়ে ডালিয়ার পিছু পিছু ছুটল। এই পরিস্থিতিতে গাধাগুলোর জন্য আর মেয়েটা থাকবে না।

পশুগুলোকে একত্র করে নিজের কাজে লাগাতে পারবে কেলভিন। অনেক খাবার আছে ওদের পিঠে-ওই খাবারে একজন লোকের এই মরু এলাকায় অনেকদিন চলবে।

ঘোড়ার পিঠে উঠল কেলভিন। ঠোঁট দুটো ব্যথায় টনটন করছে। হাতের তালুতে একটু পানি নিয়ে মুখটা ধুয়ে ফেলল সে। বজ্জাত মেয়ে। এমন হঠাৎ করে মেরে বসল..মোটেও আশা করতে পারেনি সে। বড্ড দেমাগ! তার সাথে থাকতে অস্বীকার করল-এখন বুঝবে মজা। পাহাড়ের মধ্যে একা একা কয়দিন টিকতে পারবে সে?

আবার নীচের দিকে চাইল কেলভিন। জেকবের ঘোড়াটা এখনও ওখানেই দাঁড়িয়ে আছে। ভাগ্য খারাপ ওর…লোকটা ভাল ছিল…কিন্তু বুলেট তো আর ভাল-খারাপ বোঝে না? বুলেটের কাছে সবাই সমান।

বোকা মেয়েটার মাথায় এটা ঢুকল না যে জেকবের দম ফুরিয়েছে। মরা মানুষ আর মাটির ঢেলায় কোন তফাৎ নেই।

কেলভিন তার ঘটনাবহুল জীবনে আজ পর্যন্ত অনেক মৃত্যুই দেখেছে। মৃতের পিছনে অযথা সময় নষ্ট করার পক্ষপাতী সে নয়। জেকবের সাথে ভাল খাতির ছিল তার-কিন্তু এটা ছিল তার ব্যক্তিগত লড়াই-ওর করার কিছুই ছিল না এতে। কথাগুলো খাঁটি সত্যি, কিন্তু তবু একেবারে হাত-পা গুটিয়ে বসে থেকে সে ওকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছে ভাবতেই এখন লজ্জা করছে তার। কিন্তু লোকটা যখন মরেই গেছে তখন ওই মালগুলোর অপচয় করা বোকামিতা ছাড়া জেকবের মালটাও খাসা!

জিভ দিয়ে একবার ঠোঁট চেটে পাহাড়ের গা ঘেঁষে দক্ষিণ দিকে রওনা হলো সে।

.

ধীরে ধীরে নিজেকে সামলে নিয়ে ইউজিন সতর্কভাবে মাথা তুলে চারদিকে। তাকাল। যেখান থেকে গুলি এসেছে সেদিকটাতেও কেউ নড়ছে না-কোন শব্দ নেই।

কীথ উপস্থিত হলো ওর পাশে। বার্ট আহত হয়েছে…অবস্থা খারাপ ওর, বলল কীথ।

ইউজিন ওর দিকে ঘুরে বসে মাথা থেকে হ্যাট নামিয়ে আঙুল চালিয়ে চুল ঠিক করল। ওর মুখটা গম্ভীর আর কঠিন দেখাচ্ছে। খুব অন্যায় কাজ আমরা করেছি, কীথ। লোকটা কাপুরুষ ছিল না।

না।

পাথরের উপর পায়ের আওয়াজ তুলে লী এসে দাঁড়াল। ওকে আরও বয়স্ক দেখাচ্ছে। ওদের চোখের দিকে তাকাতে পারছে না সে। মাটির দিকে চেয়েই লী প্রশ্ন করল, তোমরা তোমরা ঠিক আছ তো?

বার্ট গুলি খেয়েছে। ক্লাইভ ওর সাথে আছে।

মুখ তুলে চাইল লী। আচ্ছা, ওদের মাথায় কি ভূত চেপেছিল? ওরা হঠাৎ গুলি করতে গেল কেন?

ক্লাইভ বলেছে শক্ত-পাল্লা নাকি ওদের টিউবা সিটিতে হুমকি দিয়েছিল আবার ওরা পিছু নিলে মারা পড়বে। তাই ভয় পেয়ে প্রথম সুযোগেই গুলি করেছে ওরা।

ওকে আমিই সামলাতে পারতাম। ডেরিকের নামে মিথ্যা অপবাদ দেয়ার উপযুক্ত সাজা দিতে পারতাম।

কঠিন দৃষ্টিতে ওর দিকে চাইল কীথ। মিথ্যা বড়াই কোরো না, লী। ওর মুখোমুখি হলে মারা পড়তে তুমি। যাক, ও যে মিথ্যা বলছে কী করে জানো তুমি?

লোকটা যে সত্যি বলছে তারই বা প্রমাণ কী? ও কি মরে গেছে।

দেখিনি আমি। তবে এত কাছে থেকে ওদের মিস করার কথা নয়।

তেজ ছিল লোকটার। হয়তো আমারই ভুল-আমি ওকে কাপুরুষ মনে করেছিলাম। সিধে হয়ে বসল লী। এখন মেয়েটাকে খুঁজে বের করে নিরাপদে এখান থেকে নিয়ে যাওয়াই আমাদের পক্ষে একমাত্র দ্রচিত কাজ হবে।

ইউজিন আড়চোখে চাইল ওর দিকে। যা হবার তা হয়ে গেছে, এখন ভদ্রতা দেখিয়ে আর কী লাভ? তবু লী ঠিকই বলেছে-মেয়েটাকে নিকোলাসের খপ্পরে একা ফেলে চলে যাওয়া ঠিক হবে না।

নেকেড়ে নিকোলাসকে আর আমাদের দরকার নেই। এই কাজ থেকে ওকে সরিয়ে নিতে হবে।

শূন্য দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ চেয়ে থেকে লী একটু ঝাঁঝাল স্বরেই বলল, ঠিক আছে, ওকে বিদায় করা যাবে। যেভাবেই হোক আমাদের কাজ তো শেষই হয়ে গেছে। নিজের ঘোড়ার দিকে রওনা হলো সে। মেয়েটাকে আমাদের খুঁজে বের করতেই হবে-ওর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন আমাদের কর্তব্য।

আমরা ওর খোঁজ পাওয়ার আগে সে-ই হয়তো আমাদের খুঁজে বের করতে চাইবে, বলল কীথ।

তার মানে?

ওই মেয়েটাই বার্টকে গুলি করেছে।

মাথায় দোষ আছে তোমার।

আমি নিজের চোখে দেখেছি। লাফিয়ে নীচে না পড়লে ক্লাইভেরও একই দশা হত।

ঘোড়ায় চড়ে দলের অন্য ঘোড়াগুলোর কাছে এগিয়ে গেল ওরা। দু’বার। পিছন ফিরে চেয়ে লী বলল, হতে পারে শক্ত-পাল্লা আহত হয়ে পড়ে আছে। আমাদের খুঁজে দেখা দরকার।

বাদ দাও, ছোট্ট জবাব দিল কীথ। যদি বেঁচে থাকে গুলি চালাবে সে। আর এর থেকে ও জীবিত ফিরলে নিজেদের জন্যে দুর্গ তৈরি করতে হবে আমাদের।

অন্য দুজনের কাছে এগিয়ে গেল ওরা। মাটিতে শোয়ানো বার্টের পাশে দাঁড়িয়ে আছে ক্লাইভ। হয়তো বাঁচবে বার্ট, বলল ক্লাইভ। গুলিটা আর একটু ডানদিকে লাগলেই আর উপায় ছিল না। নিজের রাইফেলটা হাতে তুলে নিল ক্লাইভ। তোমরা ওর দেখাশোনা করো, আমি শক্ত-পাল্লাকে খুঁজতে যাচ্ছি।

আর কত? বলে উঠল ইউজিন। যথেষ্ট করেছি আমরা, এবার রেহাই দাও ওকে।

ক্লাইভ ঘুরে চাইল ওর দিকে। তোমার যা খুশি তুমি করো গিয়ে, শক্ত-পাল্লা মরেছে নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত আমার শান্তি নেই। নইলে আমার পিছনে লাগবে ও-সবাইকেই শেষ করবে।

কিন্তু আগে মেয়েটাকে নিরাপদে শহরে ফিরিয়ে নিয়ে যাবার ব্যবস্থা করতে হবে, প্রতিবাদ করল লী। ওকে এখানে ফেলে যাওয়া যায় না।

রাগের সাথে বিস্ময়ের ভাব ফুটে উঠল ক্লাইভের মুখে। গোল্লায় যাও তুমি! চিৎকার করে উঠল সে। তুমিই না শক্ত-পাল্লাকে ফাঁসি দেয়ার জন্যে হন্যে হয়ে উঠেছিলে? এখন আবার সুর পাল্টাচ্ছ কেন? ওই মেয়েটাই তো গুলি করে বার্টের এই অবস্থা করেছে-আমাকেও মারতে চেয়েছিল। আমার ঘোড়াটার অবস্থা কি হয়েছে দেখেছ?

ঘোড়াটার কাঁধের কাছে চামড়ায় ঘষা খেয়ে গুলি বেরিয়ে গেছে। দাগটা লাল হয়ে রয়েছে। আমি বার্টের ঘোড়াটা নিয়ে যাচ্ছি, লী। তুমি যদি সত্যিকার পুরুষ হয়ে থাকো তবে তুমিও আমার সাথে এসো। আমরা যেটা শুরু করেছি তার। শেষও আমাদেরই করতে হবে।

বাদ দাও, লী, নিজের মত প্রকাশ করল ইউজিন।

দোটানায় পড়ল লী। কাজটা এখন আর ভাল মনে না হলেও সে-ই এর হোতা। যাবার জন্য পা বাড়িয়েও আবার ইতস্তত করল সে। ভুল করছে কিনা বুঝতে পারছে না লী। এতগুলো লোকের মোকাবিলা করতে শক্ত-পাল্লার একা এগিয়ে আসা-তারপরে লী-কে সম্মুখ যুদ্ধে চ্যালেঞ্জ করা-এতেই মনে সন্দেহ জেগেছে তার-বুঝেছে লোকটা কাপুরুষ তো নয়ই, বরং অত্যন্ত সাহসী। সে যেমন বলেছে ঠিক সেভাবেই ডেরিকের মৃত্যু ঘটেছে কিনা তার প্রমাণ নেই। দেখা যাচ্ছে ওর সাথে একটা নারীর ভাগ্যও জড়িত ছিল। অন্যায়ভাবে যে উপায়ে লোকটাকে মারা হয়েছে তাতে ঘেন্না ধরে গেছে তার। কিন্তু ক্লাইভ যা বলেছে সেটাও সত্যি। এইসব কিছুর মূলেই ছিল লী। তবে ডেরিক ছিল তার বন্ধু-ওপারে দেখা হলে তখন বন্ধুকে সে কী জবাব দেবে?

কিন্তু লোকটা মরে গেছে। কীভাবে পড়েছে তাতে তুমিও নিজের চোখেই দেখেছ। তুমি আর বার্ট-তোমরাই তো খুন করেছ ওকে। লী-র স্বরে তিক্ততা প্রকাশ পেল।

সেজন্যে আমাকে দোষ দিচ্ছ তুমি? ক্লাইভের সুর চড়া শোনাল। টউবা সিটিতে লোকটা আমাদের শাসিয়েছিল আবার ওর পিছু নিলে একেবারে শেষ করে ফেলবে। মিথ্যা-হুমকি দেয়নি সে-কথাটা বিশ্বাস করেছিলাম বলেই ওকে সেই সুযোগ না দিয়ে আগেই গুলি করেছি। এখনও আমার বিশ্বাস সে যদি বেঁচে থাকে তবে আমাদের ঘুম হারাম করে ছাড়বে।

ইতস্তত করছে লী। কীথ পকেট থেকে একখণ্ড চিবানোর তামাক বের করে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে দেখে একটা টুকরো দাঁতে কেটে নিল। কথাটা ক্লাইভ ঠিকই বলেছে, লী, বলল কীথ। শুরু আমরাই করেছি, এখন পছন্দ হোক আর না হোক, শেষও আমাদেরই করতে হবে।

এর মধ্যে, আর আমাকে টেনে না, বলল ইউজিন। প্রথম থেকেই ব্যাপারটা ভাল ঠেকেনি আমার-এখন তো আর প্রশ্নই ওঠে না।

ঠিক আছে, তুমি বাদ, ঝাঁঝের সাথে বলল লী। সবার ছোট হলেও ওর সিদ্ধান্তটাই দেখা যাচ্ছে ঠিক-এটা সহ্য করতে পারছে না ও। তুমি সবকিছু থেকেই বাদ-তুমি দুধ-ভাত

হ্যাঁ, এখন তো তা বলবেই! লাগাম টেনে ঘোড়াটাকে ঘুরিয়ে নিল ইউজিন। আমি যাচ্ছি-মেয়েটাকে খুঁজে বের করে সে যদি আমার সাথে যেতে রাজি হয় তবে ওকে নিয়ে শহরে ফিরে যাব আমি। তোমাদের যা খুশি তাই করো।

একবারও পিছনে না চেয়ে ইউজিন রওনা হলো। চিন্তাযুক্ত মুখে ওর দিকে চেয়ে রইল কীথ।

একসাথেই শক্ত-পাল্লার বাকস্কিনটার দিকে এগিয়ে গেল তিনজন। একটা গুলি জিনের মাথায় লেগে ছিটকে চলে গেছে। সন্দেহ নেই বুলেটের ধাক্কাতেই ঘোড়াটা লাফিয়ে উঠেছিল। চামড়ার একটা জায়গায় রক্ত লেগে রয়েছে। মাটিতেও রক্ত দেখা যাচ্ছে।

মাটির উপর দিয়ে একটা রক্তের রেখা ফাটলটার দিকে এগিয়ে গেছে। ওখানে পৌঁছে নীচের দিকে চেয়ে অনিশ্চয়তা নিয়ে দাঁড়িয়ে রইল ওরা। ফাটলটা একটু নীচে নেমে ঘুরে গেছে-একটা অন্ধকার গহ্বর দেখা যাচ্ছে। শক্ত-পাল্লাকে খুঁজে বের করতে হলে ওখানে নামতে হবে-কিন্তু কেউ ঝুঁকি নিয়ে আগে বেড়ে গুলি খেতে রাজি নয়। কিন্তু কে জানে? হয়তো বা সে আগেই ওদিক দিয়ে নীচের ক্যানিয়নে নেমে সরে পড়েছে?

ধারে গিয়ে উঁকি দিল কীথ। এখানে ক্যানিয়নটা বেশি গভীর নয়। নীচে বালু আর কিছু ছড়ানো পাথরের টুকরো দেখা যাচ্ছে।

ফিরে এসে কীথ বলল, শক্ত পাল্লা যদি ওই গর্তের ভিতর থেকে থাকে তবে আর আমাদের করার কিছু নেই। আমি নীচে নেমে দেখে আসি ব্যাপারটা কী।

দুজনের কেউই কোন জবাব দিল না দেখে সে আবার বলল, ক্লাইভ, তুমি এখানে বসে গর্তটা পাহারা দাও। তারপর লী-র দিকে চেয়ে বলল, লী, তুমি কি আসবে আমার সাথে? নাকি তুমিও শক্ত-পাল্লার জন্যে আজীবন এখানে বসেই অপেক্ষা করতে চাও?

চলো! ঘোঁৎ করে উঠল লী। দু’জনে পাহাড়ের নিচু জায়গাটায় পৌঁছে না, নামতে শুরু করল।

ফাটলের নীচে পৌঁছে পাথরের উপর রক্তের দাগ দেখতে পেল ওর। বালি, উপর রক্তের দাগ নেই বটে কিন্তু ওরা জানে চিহ্ন ঢাকার বিভিন্ন রকম কৌশল শক্ত-পাল্লার জানা আছে। আশেপাশে নরম বালুর উপর ঘোড়ার খুরের অনেক চিহ্নই আছে-কিন্তু নতুন তৈরি বুটের কোন ছাপ ওদের নজরে পড়ল না।

দু’হাত কোমরে রেখে দাঁড়িয়ে কীথ জিজ্ঞেস করল, তোমার কী মনে হয়, লী?

মরেনি। কেটে পড়েছে ব্যাটা, মন্তব্য করল লী। কিন্তু ওর কথা শুনে খুব নিশ্চিত মনে হলো না তাকে। হয়তো এটাকে একটা সম্ভাবনা ধরে নিয়েই কথাটা বলেছে। নইলে এখানে রক্ত এল কীভাবে? এখন কোন্‌দিকে যেতে চাও তুমি? প্রশ্ন করল সে।

কাঁধ ঝাঁকাল কীথ। ক্যানিয়ন ধরে যে-কোন দিকেই গিয়ে থাকতে পারে ও। তারপর একটু ভেবে বলল, পানির দরকার হবে ওর। আমার মনে হয় নাকিয়া ক্যানিয়নের দিকেই যাবে লোকটা।

ক্যানিয়ন ধরে রওনা হলো ওরা। যেতে যেতে কীথ বলল, কথাটা কিন্তু ঠিকই বলেছে ক্লাইভ। আমরা যা শুরু করেছি-তা শেষ করার দায়িত্বও আমাদেরই ওপর।

লোকটা যা বলেছে তা সত্যি হলে সে নির্দোষ! কিন্তু প্রমাণ যখন নেই তখন ডেরিকের মৃত্যুর বদলা আমাকে নিতেই হবে।

সতর্ক চোখ রেখে পথ চলছে ওরা। কিন্তু কোনরকম চিহ্নই ওদের নজরে পড়ল না ওদের সামনে যতদূর দেখা যায় ক্যানিয়নটা একেবারে নির্জন। কোন শব্দ নেই-কিছুই নড়ছে না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *