১০. বেস ক্যাম্প

বেস ক্যাম্প। কাঁটাতারের বেড়ার একপাশে এসে দাঁড়িয়েছে একটা জীপ। জোরে হর্ন বাজাল। তাঁবু থেকে বেরিয়ে এলেন গোল্ডম্যান। জীপটা দেখেই ছুটে গেলেন। সার্চ পার্টির জনাপাঁচেক লোক বসে আছে জীপে। ড্রাইভিং সীটের পাশে বসে মার্লিন বেকি। মুখ শুকনো, চোখে উদ্ভ্রান্ত দৃষ্টি। কিন্তু দেহ অক্ষতই আছে।

মার্লিন! গোল্ডম্যানের কণ্ঠে খুশির আমেজ।

ভোঁতা দৃষ্টিতে গোল্ডম্যানের দিকে তাকাল মার্লিন। কোন অভিব্যক্তি নেই চেহারায়। যেন গোল্ডম্যানকে চিনতেই পারছে না সে।

মার্লিন, চিনতে পারছ না, আমি অসকার। কোন প্রতিক্রিয়া নেই মার্লিনের।

অবাক হলেন গোল্ডম্যান। ওদিকে পাঁচজন লোকই জীপ থেকে নেমে এসেছে। একজনের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলেন তিনি, ওকে কোথায় পেয়েছ?

ব্যাটল মাউনটেনের পশ্চিম দিকের ঢালে। হারিয়ে যাওয়া সেন্সরটাও ওঁর সঙ্গেই ছিল। এগিয়ে গিয়ে জীপের ড্যাশবোর্ড থেকে কালো কাগজের একটা প্যাকেট নিয়ে এল লোকটা। ওঁকে অপ্রকৃতিস্থ দেখে সামলে রেখেছি জিনিসটা। হাত বাড়িয়ে প্যাকেটটা গোল্ডম্যানের হাতে দিতে গেল লোকটা।

নিলেন না গোল্ডম্যান! শুধু জিজ্ঞেস করলেন, ঠিক আছে তো?

তা তো জানি না, স্যার। যেভাবে পেরেছি, রেখে দিয়েছি।

টেকনিশিয়ানরা দেখলেই বুঝতে পারবে, খারাপ হয়ে গেছে কিনা। আবার মার্লিনের দিকে ফিরলেন গোল্ডম্যান, কোথায় ছিলে তুমি, মার্লিন? এগিয়ে গিয়ে আলতোভাবে তার হাত স্পর্শ করলেন। দুচোখ বড় বড় করে তাকাল মার্লিন। যেন গোল্ডম্যানকে ভয় পাচ্ছে সে।

কোথায় ছিলাম? আপন মনেই বিড় বিড় করছে যেন মার্লিন, তা তো জানি না। সেন্সরটা বসিয়ে রিডিং নিচ্ছিলাম আমরা…

হ্যাঁ, তারপর? মনে করার চেষ্টা কর। নরম গলায় বললেন গোল্ডম্যান।

মনে করার চেষ্টা করছে মার্লিন। রিডিং নিচ্ছিলাম…তারপর…তারপর…নাহ্, কিছুই জানি না আমি…ইভান কোথায়?

ওর কাছে যাবে, মার্লিন? ঠিক আছে নিয়ে যাবে ওরা তোমাকে। তা, অস্টিন কোথায় বলতে পার?

কেন, ও তো বেস ক্যাম্পেই ছিল! আমাদের সঙ্গে কথা বলছিল রেডিওতে… থেমে গেল মার্লিন।

ও-কে, জোর করে হতাশা ঢাকার চেষ্টা করলেন গোল্ডম্যান। ওরা তোমাকে ইভানের কাছে নিয়ে যাবে।

গোল্ডম্যানের আদেশ পেয়ে আবার জীপে উঠে বসল পাঁচজন লোকই।

ধুলো উড়িয়ে ছুটে যাচ্ছে জীপটা। সেদিকে তাকিয়ে ভাবছেন গোল্ডম্যান। স্বামীর কাছে ফিরে যাচ্ছে মার্লিন। ওদের দুজনের জন্যে এই অভিযান শেষ। কিন্তু তার জন্যে, টম রেনটির জন্যে সবে শুরু। আরও একজনের কথা কিছুতেই ভুলতে পারছেন না গোল্ডম্যান। সে স্টিভ অস্টিন।

ভূগর্ভকক্ষে ভিনগ্রহবাসীদের সঙ্গে অস্টিনের দীর্ঘ মীটিং চলছে।

কতদিন ধরে আছেন আপনারা পৃথিবীতে? জিজ্ঞেস করল অস্টিন।

দুবছর, জবাব দিল এপ্লয়। এই দুবছরে পরীক্ষার জন্যে অনেক লোককে ধরে এনেছে সাসকোয়াচ। ওদের দেহের ভেতরে বাইরে প্রতিটি মিলিমিটার পরীক্ষা করে দেখেছি আমরা। ওদের সঙ্গে সহজভাবে কথা বলেছি, যেমন আপনার সঙ্গে বলছি এবং তাদের নিরাপদে আবার ফিরিয়ে দিয়ে এসেছে সাসকোয়াচ, যেখান থেকে তুলে এনেছে সেখানে।

মার্লিনের কি অবস্থা?

ওকেও ছেড়ে দেয়া হয়েছে, বলল শ্যালন।

ফিরে যাবার পর ইভান কিন্তু এখানকার কোন কথাই বলতে পারেনি।

মার্লিনও পারবে না। কারণ সাসকোয়াচ তাদের তুলে আনার পর থেকে ছেড়ে দেয়া পর্যন্ত, মাঝখানের এই সময়টুকু মুছে দেয়া হয়েছে তাদের স্মৃতি থেকে, এপ্লয় বলল।

ফিরিয়ে দেবার আগে আমার স্মৃতি থেকেও নিশ্চয়ই আপনাদের কথা মুছে দেয়া হবে?

ঠিকই ধরেছেন।

আচ্ছা, বলল অস্টিন, বললেন, আপনারা মাত্র দুবছর হল পৃথিবীতে এসেছেন। সাসকোয়াচ আপনাদেরই সৃষ্টি। তাহলে এর কিংবদন্তী শত শত বছর আগে ইন্ডিয়ানরা জানত কি করে?

দৃষ্টি বিনিময় হল শ্যালন আর এপ্লয়ের মধ্যে। মুচকে হাসল দুজনেই।

কারণটা সহজ, বলল এপ্লয়। কিন্তু আগে একটা জিনিস দেখুন।

পকেট থেকে ছোট্ট একটা জিনিস বের করল এপ্লয়। আকারে সিগারেটের প্যাকেটের সমান ওটা।

আমাদের বিজ্ঞানীদের সৃষ্টি একটা চমৎকার জিনিস, বাক্সমত জিনিসটা অস্টিনকে দেখিয়ে বলল সে, উন্নতমানের স্পেসক্র্যাফট নিয়ে গবেষণার সময়েই এটা আবিষ্কার করে তারা।

যে স্পেসক্র্যাফট আলোর চেয়ে দ্রুত গতিতে ছুটতে পারে? জিজ্ঞেস করল অস্টিন।

অনেকগুণ দ্রুত গতিতে, হ্যাঁ। এখন এটা দেখুন, এর নাম দিয়েছি আমরা টাইম লাইন কনভার্টার। সংক্ষেপে টি.এল.সি। এটা একধরনের টাইম মেশিন। এর সাহায্যে ইচ্ছে করলে অতীত-ভবিষ্যৎ যে কোন সময়ে চলে যেতে পারবেন আপনি।

বিস্ময়ে ভুরু কুঁচকে উঠেছে অস্টিনের। কপালে ভাঁজ পড়েছে কয়েকটা। তার মানে, এক দিনের আলোক পথ অতিক্রম করতে মাত্র সাত মিনিটখানেক লাগে আপনাদের?

আরও কম। এক সেকেন্ড। হাসছে এপ্লয়। গত আড়াইশো বছর ইন্ডিয়ানরা জানে সাসকোয়াচের কথা। বুঝতেই পারছেন, আড়াইশো বছর পিছিয়ে যাওয়াটা আমাদের জন্যে কঠিন কিছুই না।

টেবিলের চারপাশে বসা সব কজনের দিকে একবার করে তাকাল অস্টিন। সবারই মুখে হাসি। ফলারের মুখের ওপর গিয়ে দৃষ্টি আটকে গেল অস্টিনের।

আড়াইশো বছর আগে ইন্ডিয়ান ভূতগুলো আমাদের দেখে যা চমকে উঠেছিল, কি বলব। এমনভাবে বলল কথাটা, যেন এই মাত্র মজা উপভোগ করে এসেছে ফলার।

ফলারের দিকে তীব্র দৃষ্টিতে তাকাল এপ্লয়। তারপর অস্টিনের উদ্দেশ্যে লেকচার চালিয়ে গেল আবার, শুধু সময়ের মধ্যে বিচরণই না, আরও কিছু করতে পারে টি.এল.সি। যেমন এর সাহায্যে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় চলে যাওয়া যায়…

এপ্লয়ের কথা শেষ হবার আগেই পকেট থেকে তার টি.এল.সি. বের করে একটা সুইচ টিপল ফলার! চোখের পলকে অদৃশ্য হয়ে গেল সে। এদিক ওদিক চেয়ে তাকে দরজার কাছে দাঁড়ান দেখতে পেল অস্টিন। দাঁত বের করে হাসছে ফলার।

অবাক হয়ে গেছ, না? অস্টিনের দিকে চেয়ে বলল ফলার। বলেই আবার সুইচ টিপে অদৃশ্য হয়ে গেল।

কাঁধে হাতের স্পর্শ পেয়ে ফিরে তাকাল অস্টিন। তার পেছনে দাঁড়িয়ে কাঁধে হাত রেখে টিটকারির হাসি হাসছে ফলার। লোকটার ওপর বিষিয়ে গেছে অস্টিনের মন। এক চড়ে ওর সব কটা দাঁত খসিয়ে দেবার ইচ্ছেটা অনেক কষ্টে রোধ করল সে।

নিজের চেয়ারে গিয়ে বস, ফলার। গম্ভীর গলায় আদেশ দিল এপ্লয়।

এপ্লয়ের কর্তৃত্ব সহ্য করতে পারল না ফলার। খনখনে গলায় বলল, দেখ এপ্লয়, তুমি বস..

বসগে! কড়া গলায় হুকুম দিল এপ্লয়। তীব্র চোখে দুজনের দিকে তাকাল দুজনে। শেষ পর্যন্ত হার মানল ফলার। চোখ নামিয়ে নিযে টি.এল.সি-র সুইচ টিপে ফিরে গেল নিজের চেয়ারে। যন্ত্রটা পকেটে রেখে দিয়ে টেবিলে টাটটু বাজাতে শুরু করল। এই দলের দুষ্টু ছেলে সে, আকারে ইঙ্গিতে এটাই যেন জানাচ্ছে।

যাই বলুন, কর্নেল অস্টিন, এপ্লয়ের গলায় ক্ষোভ। ইয়ং জেনারেশনটাই এমন উদ্ধত। পাঁচ বছরের মিশন নিয়ে পৃথিবীতে এসেছি। এমনিতেই কঠিন কাজ। তার ওপর এদের সামলাতে… চোখ আর মুখের ভঙ্গিতে বাকি কথাটা বুঝিয়ে দিল সে।

এসব বলে আর লাভ নেই। আমাদের ইয়ং জেনারেশনটাও এমনি, বলল অস্টিন।

আসলে সব গ্রহের মানুষেরই স্বভাব-চরিত্র কমবেশি একই রকম। মন্তব্য করল শ্যালন।

সবাই দু পেয়ে ত…

দুজনেই দুজনের দিকে চেয়ে হাসল অস্টিন আর এপ্লয়। তিন মাসে ষাট হাজার আলোক-বছর পেরিয়েছেন। অথচ আমাদের সবচেয়ে দ্রতগামী স্পেসক্রাফটেও লক্ষ লক্ষ বছর লেগে যাবে। গতিবেগ কত ছিল আপনাদের যানের?

সাবলাইট টার্মে সুপারলাইট গতিবেগের হিসেব দেয়া যায় না, বলল এপ্লয়। তা ছাড়া পৃথিবীতে এর কোন প্রতিভাষা নেই। আমাদের মাপটা বলতে পারি কিন্তু দুর্বোধ্য লাগবে আপনার কাছে। আরও অন্তত দুহাজার বছর পরে এই মাপ শিখবে পৃথিবীর লোকে।

এক কাজ করুন না, হালকা গলায় বল অস্টিন, আপনাদের ওই টি.এল.সি-র সাহায্যে দয়া করে আমাকে দুহাজার বছর ভবিষ্যতে পাঠিয়ে দিন না। যদি দরকার মনে করেন, আমাকে সাসকোয়াচের মত রোবট বানিয়ে পাঠালেও আপত্তি করব না। শুধু ভবিষ্যতের পৃথিবীতে এবং এর অগ্রগতি দেখতে চাই আমি।

অস্টিনের কথার ধরনে ফলার ছাড়া সবাই হেসে উঠল।

সাসকোয়াচের কথা যখন এসেই পড়ল, বলি, বলল অস্টিন, ওর হাত ছিড়ে ফেলার জন্যে সত্যিই দুঃখিত আমি। আসলে ছিড়তে চাইনি। ওর সঙ্গে কথা বলতে চেয়েছি। ও কেমন জীব জানতে চেয়েছি। কিন্তু ও কোন উত্তরই দেয়নি। আক্রমণের তালেই ছিল শুধু।

তার জন্যে ভেবো না, অভয় দিল শ্যালন। আবার ঠিক করে ফেলা হয়েছে তাকে। দরকার পড়লেই ঘুম থেকে জাগিয়ে দেব। এপ্লয়ের দিকে তাকিয়ে বলল, এখনকার মত ওঠা যাক, নাকি?

মাথা নেড়ে সায় দিল এপ্লয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *