১০. পরের দুটো দিন প্রথম দিনের মতই

পরের দুটো দিন প্রথম দিনের মতই একটানা পথ চল ওরা। ঘণ্টার পর ঘণ্টা, মাইলের পর মাইল, চলে চলে সিয়েরা মাদ্রের আরও গভীরে ঢুকে যেতে লাগল। এই পর্বতমালার যেন আর শেষ নেই, চলেছে তো চলেছেই। অনেক কষ্টে ঢাল বেয়ে যখন ওঠে, ভাবে ওপারে আর কিছু নেই। কিন্তু চূড়ায় উঠে দেখে ঠিকই মাথা তুলে রেখেছে আরেকটা পাহাড়।

মাঝে উপত্যকা। কোনটা সরু, কোনটা চওড়া। এখানে কয়েক মাইল ধরে চলল পাইনের বন। তারপর, সেই বন পেরিয়ে, আরেকটা ঢাল বেয়ে উঠে গাছপালার মাথা ছাড়িয়ে এল একসময়, ওপরে রুক্ষ পাথুরে ঢাল প্রায় খাড়া হয়ে উঠে গেছে।

ভাগ্যিস এখন গরমকাল, মুসা বলল। পাথর মাড়িয়ে ওঠার সময় সামনের দিকে ঝুঁকে থাকতে হচ্ছে অনেকখানি, পর্বতের খাড়াইয়ের জন্যে। শীতকাল হলে তুষারেই ডুবে যেতাম।

তাতে মন্দ হত না, রবিন বলল। দরদর করে ঘামছে পরিশ্রমে। কপাল থেকে একফোঁটা গড়িয়ে নামল চোখের পাতায়। এই গরম তো আর লাগত না।

ওদের দিন শুরু হয় এখানে সূর্য ওঠার সঙ্গে সঙ্গে। সকালে নাস্তা সারে বীন আর চাল সেদ্ধ দিয়ে, দুপুরে লাঞ্চে ঠান্ডা বীন আর চাল সেদ্ধ-সকালে খাওয়ার পর যা বেঁচে যায়, রাতে আবার একই খাবার, গরম গরম, নতুন রান্না করে। মহা বিরক্তিকর। ঘেন্না ধরে গেছে কিশোরের। রবিনের তো এখন দেখলেই বমি আসে। মুসারও আর ভাল লাগছে না।

ফিরে যাওয়ার কথা বলল রবিন আর মুসা। কিন্তু গোঁ ধরে আছে কিশোর। এই রহস্যের শেষ না দেখে সে ছাড়বে না। দেখাই যাক না, কোথায় ওদেরকে নিয়ে যায় শারি। তবে, আর দুচারদিন ওই ভয়াবহ খাবার খেতে হলে তারও মনোবল ভেঙে যাবে।

দিনে তিন-চার বার করে খাওয়ার জন্যে থামে শারি। অন্যদেরকেও থামতে হয় বাধ্য হয়ে। এই থামাটাকে স্বাগতই জানায় তিন গোয়েন্দা। বিশ্রামের সুযোগ পাওয়া যায়। ডজ তো এক মুহূর্তের জন্যেও থামতে নারাজ। তবে একটা সুবিধে হয় তাঁর এতে। ঘোড়াটাকে নিয়ে অনেক পেছনে পড়ে যান তো, এগিয়ে আসতে পারেন। প্রচুর জই খাওয়ানো হয় ঘোড়াটাকে, তার পরেও প্রতিদিনই একটু একটু করে দুর্বল হয়ে পড়ছে ওটা। মাঝে মাঝে মাইল খানেক পেছনে পড়ে যায়। রবিন আর মুসার মত পা টেনে টেনে চলে তখন।

এ রকমই একটা বিশ্রামের সময় হাত-পা ছড়িয়ে চিত হয়ে আছে তিন গোয়েন্দা, ঘাস চিবুচ্ছে শারি। রবিন বলল, ওই মহিলাগুলো কেন এর মধ্যে ঢুকেছে, বুঝতে পারছি না। প্রথমে কিশোরকে ডুবিয়ে মারার চেষ্টা চালাল সোনালি চুলওয়ালা এক মহিলা, তারপর কালো বেনি এসে চুরি করার চেষ্টা করল বারোটাকে।

হয়তো মেকসিকান মহিলার বারোর পা ভেঙে গেছে, আন্দাজ করল মুসা। কাজেই বোঝা টানার জন্যে আরেকটা দরকার হতেই পারে।

রবিন এই যুক্তি মানতে পারল না। বারোর চরিত্র ভাল করেই জানা আছে মেকসিকানদের। জোর করে যে পিঠে সওয়ার হওয়া যায় না, জানে।

ভাবছি, কিশোর বলল। বারো-টাকে নিজের জন্যেই চেয়েছে কিনা মহিলা। কিংবা অন্য কোন কারণে ওটাকে সরিয়ে ফেলতে চেয়েছে।

তাই? মুসা আর কোন যুক্তি দেখাতে না পেরে চুপ হয়ে গেল।

কিশোরেরও আর কিছু বলার নেই।

আবার শুরু হলো পথচলা।

প্রতি সন্ধ্যায়ই একটা করে জায়গা খুঁজে বের করে শারি, যেখানে আগুন জ্বালানোর জন্যে প্রচুর লাকড়ি আছে, আর খাওয়ার পানির ব্যবস্থা আছে। ওখানেই রাতের জন্যে ক্যাম্প ফেলে ওরা। এর মাঝে ওই মহিলাকে ছাড়া আর কোন মানুষ চোখে পড়েনি ওদের। মাঝে সাঝে একআধটা কুঁড়ে চোখে পড়ে, মাটির দেয়াল আর পাতার ছাউনি, অ্যাডাব বলে ওগুলোকে। সবই দূরে দূরে। ওগুলোতে কেউ থেকে থাকলেও গোয়েন্দাদের চোখে পড়ল না।

দ্বিতীয় দিনে কিশোরের পায়ের পেশী শক্ত হয়ে থাকা সেরে গেছে। আড়ষ্টতা দূর হয়ে একেবারে ঝরঝরে হয়ে গেছে। হাঁটতে এখন অনেক সহজ লাগে। কোমরের বেল্ট ঢিলে হয়ে গেছে, রওনা দেয়ার সময় যে ছিদ্রটায় ঢুকত বাকলেসের কাটা, এখন তার আগের ছিদ্রটায় ঢোকে।

বাপরে বাপ! বন্ধুদেরকে বলল সে, বারোর পিঠে চাপা-ও কম পরিশ্রম নয়!

সেদিন, একটা শৈলশিরার কাছ দিয়ে চলার সময় সামনে সাদা ধোঁয়া দেখতে পেল ওরা। থেমে গেল। তাকিয়ে রইল সেদিকে।

বিড়বিড় করল রবিন, দাবানল না তো!

হলেও অনেক দূরে, মুসা বলল। আমাদের কাছে আসতে পারবে না।

যদি বাতাস এদিকে না বয়।

এ ব্যাপারে কিশোর কোন মন্তব্য করল না। চিন্তিত ভঙ্গিতে তাকিয়ে রয়েছে ধোঁয়ার দিকে।

সেদিন এত বেশি পেছনে পড়ে গেল ডজের ঘোড়া, সন্ধ্যায় তিন গোয়েন্দার এক ঘণ্টা পরে পৌঁছল ক্যাম্পে। খুবই উদ্বিগ্ন ডজ। রাতের খাওয়ার সময় বললেন, একটা দিন বিশ্রাম দিতে হবে ঘোড়াটাকে। নইলে চলতে পারবে না। খোঁড়াও হয়ে যেতে পারে।

খাওয়া শেষ হলে বললেন, তোমরা আমাকে রেখেই এগিয়ে যাও। যত তাড়াতাড়ি পারি তোমাদের কাছে পৌঁছব।

আমাদের খুঁজে পাবেন তো? মুসার গলায় সন্দেহ।

তা পাব। এসব অঞ্চলে চিহ্ন অনুসরণ করে চলা খুব সহজ। দুজন মানুষের জুতো আর একটা বারোর খুরের ছাপ জ্বলজ্বল করবে মাটিতে।

পরদিন সকালে খাবার ভাগ করে দিলেন ডজ। রওনা হয়ে গেল তিন গোয়েন্দা। স্লীপিং ব্যাগের ওপরে আরও কিছু বোঝা, এই যেমন খাবার আর রান্নার সরঞ্জাম, বহন করতে আপত্তি করল না শারি। এবার আর ওটার পিঠে চাপল না কিশোর। হেঁটে চলল। রবিন আর মুসাও রইল সঙ্গে।

সেরাতে ক্যাম্প ফেলার পর প্রচুর কথা বলল ওরা, হাসি-মশকরা করল। ডজ কানের কাছে না থাকায় কথা বলতে পারছে সহজ ভাবে।

রাতে কি খাওয়া যায়, বলো তো? কিশোরকে রান্নার জোগাড় করতে দেখে ঠাট্টা করে বলল রবিন। রাইস আর বীন?

নাহ! জবাব দিল মুসা, বীন আর রাইস।

আসলে, হেসে বলল কিশোর। তোমরা দুজনেই ভুল করলে। রান্না করব বীনস আ লা রাইস। দয়া করে বাসন নিয়ে তৈরি হয়ে যাও।

ডিনারের পর আগুনের কুন্ড ঘিরে বসল তিনজনে। হঠাৎ উত্তেজিত ডাক ছাড়ল শারি। লাফিয়ে উঠল তিনজনে। কান খাড়া।

মুহূর্ত পরেই আগুনের আলোয় একটা বড় বারোকে বেরিয়ে আসতে দেখা গেল গাছের আড়াল থেকে। এল এদিকেই। শারির চেয়ে বয়েস অনেক বেশি। পিঠে জিন নেই। তবে দড়ি দিয়ে বাঁধা রয়েছে কয়েকটা পোঁটলা।

ওটার পেছন পেছন এল কালো বেণি করা সেই মহিলা।

ডাকাডাকি থামিয়ে দিল শারি। স্বজাতীয়কে দেখে খুশি হয়েছে। দুলকি চালে এগিয়ে গেল। নাক ঘষাঘষি করে স্বাগত জানাল পরস্পরকে।

কাছে এল মেকসিকান মহিলা।

ঘাবড়িও না, হাত নেড়ে স্প্যানিশ ভাষায় বলল সে। এবার বারো চুরি করতে আসিনি। তোমাদের সঙ্গে কথা বলতে চাই। আমার নাম ইসাবেল। তোমরা কে, জানি। তবে, কথা বলার আগে, আমাকে কিছু খেতে দাও। খুব খিদে পেয়েছে।

এক প্লেট রাইস আর বীন দিল ওকে কিশোর। আগুনের ধারে বসল ইসাবেল। ভাল খিদেই পেয়েছে ওর। সমস্ত খাবার শেষ করার আগে মুখই তুলল না।

বাসে বেশ কিছুটা দূর থেকে ওকে দেখেছে কিশোর। এই প্রথম কাছে থেকে ভালমত দেখার সুযোগ পেল। মহিলা খাচ্ছে, আর সে তাকিয়ে রইল তার মুখের দিকে।

বয়েস চল্লিশ মত হবে। মোটামুটি সুন্দরীই বলা চলে। চেহারাই বলে দিচ্ছে আত্মবিশ্বাসে ভরপুর। পকেট ওয়ালা ঢিলাঢালা একটা উলের স্কার্ট পরেছে। পায়ে মেকসিকান বুট। গায়ে খাটো হাতাওয়ালা একটা ব্লাউজ। চামড়ার রঙ গাঢ় বাদামী, চোখ পিরেটোর মতই কালো। সব মিলিয়ে, কিশোরের মনে হলো, ওই মহিলা ভালর ভাল, মন্দের যম।

খালি বাসনটা সরিয়ে হাতঘড়ির দিকে তাকাল ইসাবেল। পুরুষের ঘড়ি পরেছে। বেল্টটা ঢিলে। হাত খাড়া করতেই নিচের দিকে নেমে গেল ওটা। তাড়াতাড়ি আবার ওপরের দিকে কব্জির কাছাকাছি তুলে দিল সে।

সময় বেশি নেই, ইসাবেল বলল। লেকের কাছে ফিরে যেতে হবে আমাকে। যতটা তাড়াতাড়ি পারি সংক্ষেপে সব বলে যাচ্ছি তোমাদেরকে। কিশোরের দিকে তাকাল সে। আমি ইংরেজি বলতে পারি না। তবে তোমরা স্প্যানিশ জানো, জানি আমি।

পুরানো চামড়ার জ্যাকেট পরা লোকটার কথা মনে পড়ল কিশোরের। যে ওদেরকে বাসে উঠতে বাধা দিচ্ছিল। লোকটার সঙ্গে তর্ক করার সময় নিশ্চয় মহিলা শুনেছে। বুঝতে পেরেছে ওরা স্প্যানিশ জানে।

মাথা ঝাঁকাল কিশোর। বলতে ততটা পারি না। তবে বুঝতে পারি। আস্তে আস্তে বলুন, বুঝব।

গুড। হাঁটু ভাঁজ করে আরাম করে বসল ইসাবেল। টেনে দিল স্কার্ট। পরের পনেরো মিনিট নিচু স্বরে প্রায় একটানা কথা বলে গেল। মাঝে সাঝে একআধটা প্রশ্ন করল কিশোর। ইতিমধ্যে একবার উঠে চলে গিয়েছিল রবিন। কয়েক মিনিট পর ফিরে এসেছে।

তারপর উঠে দাঁড়াল ইসাবেল। তিন গোয়েন্দাও উঠল।

এক এক করে ওদের সঙ্গে হাত মেলাল ইসাবেল। তারপর, যেমন হঠাৎ করে উদয় হয়েছিল, রহস্যময় ভাবে, তেমনি করেই আবার বারো-টাকে টেনে নিয়ে অশ্য হয়ে গেল রাতের অন্ধকারে।

আগুনে কাঠ ফেলল মুসা। কি বুঝলে?

একটা সাংঘাতিক গল্প বলে গেল! মাটিতে পা ছড়িয়ে বসে বলল কিশোর। রবিন, পঞ্চো ভিলার ব্যাপারে যা যা জানো বলো তো?

আমাকে কি মেকসিকান পাবলিক লাইব্রেরি বলে মনে হচ্ছে?

বাজে কথা রাখ। রকি বীচ থেকেই মেকসিকোর ইতিহাস পড়া শুরু করেছ তুমি। শেষ করোনি এখনও?

করেছি, হাসল রবিন। যেদিন তুমি লেকের পানিতে ডুবে আরেকটা ইতিহাস সৃষ্টি করতে যাচ্ছিলে, সেদিনই।

আমিও জানি, শেষ করে ফেলেছ। হাসিটা ফিরিয়ে দিল কিশোর। উনিশ শো ষোলো সালের ব্যাপারে আমার আগ্রহ। পঞ্চো ভিলার কথা কি জানো?

ওই বছর একটা বিরাট বিদ্রোহ হয়ে গিয়েছিল মেকসিকোতে। সেই বিদ্রোহেরই এক বড় নায়ক ছিল পঞ্চো ভিলা। অনেকের ধারণা, আউট-ল ছিল সে, জেসি-জেমসের মত। ব্যক্তিগত একটা সেনাবাহিনী গড়ে তুলেছিল। অনেকগুলো লড়াই জিতেছে।

এখানে, সিয়েরা মাদ্রেতেও এসেছিল নাকি?

এসেছিল। তার একটা ঘাঁটি তৈরি করেছিল এখানেই। মরুভূমিতে নেমে গিয়ে ট্রেনের ওপর আক্রমণ চালাত। লুটপাট করে ফিরে এসে আবার লুকিয়ে পড়ত এখানে।

চিন্তিত ভঙ্গিতে মাথা ঝাঁকাল কিশোর। এই কথাটা তাহলে সত্যিই বলেছে ইসাবেল।

তারমানে, তুমি বলতে চাইছ ওর ব্যাপারেই যত আগ্রহ মহিলার? মৃত একজন মানুষের ব্যাপারে?

না, তার ব্যাপারে নয়, কিশোর জবাব দিল। মনে হচ্ছে সিয়েরা মাদ্রের গুপ্তধনের পেছনেই ছুটেছি আমরা, না জেনে, যেটার কথা বহুবার বলেছ তুমি। পঞ্চো ভিলার লুটের মাল। শুনলে না, ইসাবেল বলে গেল, একদিন একটা ট্রেন লুট করে হাজার হাজার ডলার দামের সিলভার পেসো নিয়ে এসেছিল পঞ্চো। এখানে উঠে এসে কোন একটা গুহাটুহায় লুকিয়ে রেখে গিয়েছিল সে সব পেসো। ইসাবেলের বলে যাওয়া গল্প আবার বলতে লাগল কিশোর। নিজেকেই যেন শোনাচ্ছে। খুঁজে বের করার চেষ্টা করছে কি রহস্য লুকিয়ে রয়েছে এর ভেতরে। একটা ভুল করেছিল পঞ্চো, কিংবা তার দুর্ভাগ্যই বলা যায়, পেসোর সঙ্গে একই গুহায় বারুদ রেখেছিল সে। অসাবধানে দেশলাইয়ের কাঠি ফেলেছিল তার এক সহচর, বিস্ফোরণ ঘটল বারুদে। পর্বতের একটা অংশ ধসে গেল। টন টন পাথরের নিচে চাপা পড়ল পঞ্চোর লুটের মাল, সেই সঙ্গে তার সেনাবাহিনীর একটা বড় অংশ। পাথর পরিষ্কার করতে শুরু করল পঞ্চো। কিন্তু এই সময় তার শত্রুরা এসে আক্রমণ চালিয়ে বসল পর্বতের অন্য পাশ থেকে পালাতে বাধ্য হলো সে।

এক মুহূর্ত চুপ করে রইল কিশোর।

তারপর, গল্পটা শেষ করল সে। ইসাবেল বলে গেল, শুনলেই তো, মুদ্রাগুলো এখনও সেখানে আছে।

নীরবে কিশোরের কথা শুনছিল মুসা আর রবিন।

ইসাবেল জানল কি করে এসব? রবিনের প্রশ্ন। উঠে চলে যাওয়ায় অনেক কিছুই শোনেনি সে।

ও বলল, তার দাদা নাকি তার সৈন্য দলে ছিল। ও-ই গল্পটা শুনিয়ে গেছে। ওদের পরিবারকে, জবাবটা দিল মুসা।

ডজের কথা কি বলল? জানতে চাইল রবিন। ওর নাম বলতে শুনলাম। বারোটার কথাও কি যেন বলল?

কিশোর বলল, মাস তিনেক আগে নাকি ইসাবেলের এক বন্ধু, টনি নামের এক আমেরিকান তরুণ, এখানে এসেছে। সে আর তার বাবা সোনা খুঁজে বেড়িয়েছে এখানকার পর্বতে। আসলে ওরা খুঁজতে এসেছিল পঞ্চো ভিলার গুহা। ওদের ধারণা, গুহাঁটা খুঁজেও পেয়েছিল ওরা। ইসাবেলকে টনি সে কথাই বলেছে।

চুপ করল কিশোর।

বলো, তাগাদা দিল রবিন। কথার মাঝখানে থামলে কেন? ডজ আর শারি এর মধ্যে এল কিভাবে শুনতে চাই।

টনি যখন লেকে গেল, বলল কিশোর। তার সঙ্গে ছিল একটা ছোট সাদা বারো। গুহার কাছে পেয়েছিল ওটাকে। বাচ্চাটার সঙ্গে বন্ধুত্ব পাতিয়ে ফেলল। যাওয়ার সময় নিয়ে গিয়েছিল ডজের র‍্যাঞ্চে। তারপর আবার ফিরে গিয়েছিল পর্বতে।

কেন? সাথে করে যখন আনতেই পারল, নিতে পারল না কেন? কেন ফেলে গেল র‍্যাঞ্চে?

কারণ টনির ভয়, শারি আবার পর্বতে গেলে মরে যাবে। বারোটার চিকিৎসার দরকার ছিল, আর এখানে সব চেয়ে কাছের পশুচিকিৎসক থাকেন লারেটোতে। পিরেটো গিয়ে নিয়ে এসেছিল তাঁকে। বারোটাকে চিকিৎসা করে সারিয়ে তোলা হলো।

কি হয়েছিল ওর? এটাই যদি অসুস্থ হবে, ডজের র‍্যাঞ্চ পর্যন্ত গেল কি করে?

চোখে একটা বাজে ধরনের ইনফেকশন হয়েছিল। তাতে প্রায় অন্ধই হয়ে গিয়েছিল বারোটা। ইসাবেলের গল্পের এই জায়গাটায় বিশেষ আগ্রহ কিশোরের। গলা শুনেই যে তাকে চিনেছে বারোটা, তার সঙ্গে ওই চোখের অসুখের কি কোন যোগাযোগ আছে? কেন শারি বুঝতে পারল না, সে টনি নয়, যে তাকে অন্ধত্ব থেকে মুক্তি দিয়ে বাঁচিয়েছে? অন্ধ হয়ে পর্বতে কোনদিন টিকে থাকতে পারে না কোন বারো। পিরেটোর কথা মনে পড়ল কিশোরের শারি ভাবে, তুমি ওর প্রাণ বাঁচিয়েছ।

মোলায়েম শিস দিল মুসা। হুঁ, মিলতে আরম্ভ করেছে। ডজ জেনে গেছে টনি আর তার বাবা পঞ্চো ভিলার গুপ্তধন খুঁজে পেয়েছে…

তখন, মুসার মুখের কথা টেনে নিয়ে কিশোর বলল, ডজ টনিকে গুহাঁটা চিনিয়ে দেয়ার জন্যে চাপাচাপি করেছে। কিন্তু টনি খুব চালাক। পালাল। চলার পথে নিজের চিহ্ন সব মুছে দিয়ে গেল, যাতে ডজ পিছু নিতে না পারে। ডজের কাছে রয়ে গেল শারি। পথ চেনে যে। পথ দেখিয়ে নিয়ে যেতে পারে গুহার কাছে। কিন্তু অনেক চেষ্টা করেও শারিকে বাগ মানাতে পারল না সে, কিছুতেই তাকে নিয়ে গেল না বারোটা। ডজ বুঝতে পারল, যাকে পছন্দ করবে একমাত্র তার কথা ছাড়া আর কারও আদেশ মানবে না শারি। এমন কেউ, যাকে কণ্ঠস্বর শুনেই বন্ধু হিসেবে চিনে নেবে।

তখন ওরকম কাউকে খুঁজে বের করার চেষ্টা করল ডজ, মুসা বলল, যার কণ্ঠস্বরের সঙ্গে টনির স্বরের মিল আছে। এ জন্যেই রহস্যময় ওই ধাঁধা প্রতিযোগিতার আয়োজন করেছিল সে।

এবং কিশোরকে খুঁজে বের করল, যোগ করল রবিন। কিন্তু আমি বুঝতে পারছি না, ইসাবেল কেন এসব কথা ওকে বলে গেল?

ঠিক, মুসা বলল। আমাদেরকে র‍্যাঞ্চেই যেতে দিতে চায়নি যে, সে কেন এখন যেচে পড়ে সব কথা শুনিয়ে যায়?

কথাটা কিশোরের মনেও খচখচ করছে।

আমাকে কোন প্রশ্ন করতে দেয়নি ইসাবেল, কিশোর বলল। কেবল তার কথা যখন বুঝিনি, জিজ্ঞেস করেছি, বুঝিয়ে দিয়েছে। ব্যস, ওই পর্যন্তই। যা বলার সে নিজেই বলেছে, আমাকে কেবল শুনতে হয়েছে। ডজকে একবিন্দু বিশ্বাস করে না। ওর ঘোড়া খোঁড়া হয়ে যাবে, চলতে পারবে না, এটা বিশ্বাস করেনি। ইসাবেলের ধারণা, ঘোড়ার পা ঠিকই ছিল, ইচ্ছে করেই আমাদের পেছনে পড়েছে ডজ। কোন উদ্দেশ্য আছে। মহিলার ভয়, টনি আর তার বাবাকে দেখলেই গুলি করে মারবে ডজ। ইসাবেলকে দেখলে তাকেও মারবে। কাজেই লেকে ফিরে যাচ্ছে সে। আমাদেরকে অনুরোধ করেছে গুহায় গিয়ে টনি আর তার বাবাকে যেন সাবধান করে দিই ডজের ব্যাপারে।

আগুনের দিকে তাকিয়ে বসে রইল তিন গোয়েন্দা। দীর্ঘক্ষণ কারও মুখে কথা নেই।

অবশেষে মুখ খুলল মুসা, কিশোর, ইসাবেলকে বিশ্বাস করো তুমি?

বুঝতে পারছি না করব কিনা। তাকে সন্দেহ এবং অবিশ্বাস করার যথেষ্ট কারণ আছে। টনি আর তার বাবাকে খুঁজে বের করার ব্যাপারে এত আগ্রহ কেন? এমনও তো হতে পারে, সে চাইছে আমরা গিয়ে পেসোগুলো খুঁজে বের করি।

হ্যাঁ, হতেই পারে, রবিন বলল। আমাদের পেছন পেছন যাবে সে। তারপর যেই আমরা ওগুলো বের করব, কেড়ে নেয়ার চেষ্টা করবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *