১০. ধোঁয়া, মানে আগুন

ধোঁয়া! মানে আগুন!

চোখ কপালে তুলে বলল পেনক্র্যাফট, সেরেছে! যাদু জানেন নাকি ক্যাপ্টেন? যাদুকর?

স্তম্ভিত হয়ে গেছে পেনক্র্যাফট। প্রশান্ত মহাসাগরের এই অজানা দ্বীপে, আগুন জ্বালাবার কোন ব্যবস্থাই যেখানে নেই, সেখানে আগুন জ্বালালেন ক্যাপ্টেন সাইরাস হার্ডিং। লোকটা প্রেতসিদ্ধ নয়তো? ভাবতে ভাবতে পথ চলছে নাবিক পেনক্র্যাফট।

গুহায় ঢুকে ওর সন্দেহের কথাটা ক্যাপ্টেনকে জিজ্ঞেসই করে ফেলল পেনক্র্যাফট। কথা শুনে হো হো করে হেসে উঠে বললেন ক্যাপ্টেন, না, পেনক্র্যাফট, না। ম্যাজিকের ম-ও জানি না আমি। তবে কিছু বিজ্ঞানের কৌশল জানা আছে আমার। ঠেকায় পড়লে তাই দিয়েই কাজ চালিয়ে নিই।

আগুনটা এল কোত্থেকে তাহলে? মাটি ফুঁড়ে?

মাটি ফুঁড়ে না এলেও আকাশ ফুঁড়ে তো বটেই।

মানে?

বার্নিং গ্লাস আছে আপনার, তাই না ক্যাপ্টেন? কথার মাঝখানে জিজ্ঞেস করে বসল হার্বার্ট ।

ওসব কিছু নেই। উত্তর দিলেন ক্যাপ্টেন, আমার ঘড়ি আছে, মি. স্পিলেটেরও আছে। ঘড়ির কাঁচ দুটো খুলে নিয়ে কিনারায় কিনারায় মিলিয়ে একটু ফাঁক রেখে বাকিটা কাদা দিয়ে জুড়ে দিলাম সেই ফাঁক দিয়ে ভেতরটায় পানি ভরে ফাঁকটাও বন্ধ করে দিলাম। কি দাঁড়াল জিনিসটা?

বোকার মত ক্যাপ্টেনের দিকে চেয়ে রইল পেনক্র্যাফট।

কনভেক্স লেন্স। উত্তরটা বলে দিলেন ক্যাপ্টেনই, এ লেন্সের মাঝখান দিয়ে প্রবেশ করা কেন্দ্রীভূত সূর্যরশ্মির তাপমাত্রা বেড়ে যায় বহুগুণে। এই কেন্দ্রীভূত রশ্মি শুকনো ঘাস পাতার ওপর ফেললে তা দপ করে জ্বলে ওঠে।

ব্যস। এর বেশি আর বোঝার দরকার নেই পেনক্র্যাফটের। কাবাব করার আগুন পেয়েছে এতেই সন্তুষ্ট  সময় নষ্ট না করে কাজে লেগে গেল সে।

আগুনের আঁচ থাকাতে আর শীত লাগছে না চিমনি-গুহার ভেতর। পাথর সরে যাওয়া ফোকরগুলোও কাঠ আর কাদা দিয়ে বন্ধ করে দিয়েছেন স্পিলেট আর হার্ডিং।

পাহাড়ের গা বেয়ে উঠে গেলেন ক্যাপ্টেন। চূড়ায় উঠে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলেন দূরের বড় পাহাড়টার দিকে  ওই পাহাড়েই উঠতে হবে আগামীকাল। এখান থেকে উত্তর পশ্চিমের ওই পাহাড়টার দূরত্ব মাইল ছয়েক। উচ্চতা সাড়ে তিন হাজার ফুটের মত হবে আন্দাজ করলেন তিনি। তাহলে, ওটার চুড়া থেকে চারদিকের পঞ্চাশ মাইল পর্যন্ত দেখা যাবেই। ওইটুকু দেখা গেলেই কাজ চলে যাবে তার।

চমৎকার হলো রাতের খাওয়াটা। শুয়োরের মাংসের কাবাব, পাখির আস্ত রোস্ট আর বাদামের চাটনী। খাওয়ার পর আয়েশ করে ঢেকুর তুলে আগুনের পাশে গোল হয়ে বসল সবাই। গল্প করতে করতেই একসময় হাই তুলতে শুরু করল ওরা। শেষে আগুনের ওপর আরও কিছু কাঠ ছড়িয়ে দিয়ে শুয়ে পড়ল গুল্ম আর ঘাস-পাতার বিছানায়।

পরদিন ঝরঝরে শরীর নিয়ে ঘুম থেকে উঠল অভিযাত্রীরা। বেলা দশটায় গুহা থেকে বেরিয়ে পড়ল সবাই। জঙ্গলের কাছে গিয়ে পাহাড়ের চেহারাটা আর একবার ভাল করে দেখে নিল। মোট দুটো চূড়া পাহাড়টার। একটা চূড়া আড়াই হাজার ফুটের মত উঁচুতে। যেন ছুরি দিয়ে আগাটা খ্যাচ করে কেটে ফেলা হয়েছে। ঘন জঙ্গলে ছাওয়া মাঝখানের উপত্যকা। মাঝে মাঝে ঝর্নাও দেখা যাচ্ছে। উত্তরে পুব দিকটায় গাছপালা একটু কম। প্রথম চূড়াটাকে ছাড়িয়ে খাড়া উঠে গেছে দ্বিতীয় চূড়া! মাথাটা ন্যাড়া। অতদূর থেকেও দেখা যাচ্ছে লাল লাল পাথর।

আগ্নেয় শিলার ওপর এসে পড়েছি আমরা, বলেন ক্যাপ্টেন।

পায়ের তলায় জমাট বাঁধা লাভার ঢেউখেলানো স্তর।  চারদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে ব্যাসল্ট আর পিউমিস পাথরের বড় বড় চাঁই।

জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে যেতে যেতে চতুস্পদ জানোয়ারের পায়ের দাগ দেখা গেল। দাগের নমুনা দেখে আন্দাজ করা যায় বড় জানোয়ার। কিন্তু ভয় পেলেন না ক্যাপ্টেন। ইন্ডিয়ান বাঘ আর আফ্রিকান সিংহ মেরে অভ্যাস আছে তার।

বড় পাহাড়টার পাদদেশে পৌঁছতে পৌঁছতে অগ্নুৎপাতের আরও চিহ্ন দেখা গেল। ছটা পাহাড়ী ছাগলের সাক্ষাৎ পাওয়া গেল এখানে। তিন লাফে পাহাড়ের ওপারে উধাও হয়ে গেল পাহাড়ী ছাগলের দল।

প্রথমে ছোট পাহাড়টায় উঠলেন অভিযাত্রীরা। দ্বীপের উত্তর দিকটায় শুধু পানি আর পানি; দক্ষিণের বড় চূড়াটা দৃষ্টিপথে বাধার সৃষ্টি করায় ওদিকে কি আছে বোঝা গেল না।

দ্বিতীয় চূড়াটায় ওঠা আরম্ভ হলো এবার। জমে যাওয়া লাভার আনাচে কানাচে জমে আছে গন্ধক। আগ্নেয়গিরির প্রলয়কান্ডের চিহ্ন দেখে নিজের অজান্তেই শিউরে উঠল অভিযাত্রীরা। তবে এখন আর হয়তো ভয় নেই। চেহারা দেখে মনে হচ্ছে বহু বছর আগেই মরে গেছে আগ্নেয়গিরি।

বড় চূড়াটায় পৌঁছতে বেলা গড়িয়ে গেল। সুতরাং এখানেই রাত কাটানো স্থির করলেন ক্যাপ্টেন। আশেপাশে বিস্তর চকমকি পাথর পড়ে রয়েছে। কাজেই আগুন জ্বালাতে কোন অসুবিধে হলো না। ধীরে ধীরে সাঁঝ গড়িয়ে রাত হলো। মশালের আলোয় ডায়েরী লিখতে বসলেন স্পিলেট।

হার্বার্টকে সাথে নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন ক্যাপ্টেন উদ্দেশ্য ঘুমাবার আগে মশালের আলোয়ই আশপাশটা ঘুরে দেখবেন। খুঁজতে খুঁজতে বিশাল এক গহ্বরের সন্ধান পেলেন ক্যাপ্টেন। এখান দিয়েই বহু বছর আগে উঠেছিল তরল লাভার স্রোত। প্রকৃতির তৈরি সিঁড়ির ধাপ ঘুরে ঘুরে উঠে গেছে উপরের অন্ধকারে। একমুহূর্ত দ্বিধা করে উঠতে শুরু করলেন ক্যাপ্টেন। আরও হাজার খানেক ফুট উপরে উঠে পাহাড়ের চূড়ায় এসে পৌঁছলেন শেষ পর্যন্ত।

চূড়ায় দাঁড়িয়ে দিগন্তের দিকে তাকালেন ক্যাপ্টেন। কিন্তু অন্ধকারে দেখা গেল না কিছু। একসময় ঘড়িতে আটটা বাজল। হঠাৎ অন্ধকারের বুক চিরে ছোট্ট একটু রূপালি আলোর রেখা ঝিলিক দিয়ে উঠল। চাঁদ উঠছে। এই সময়ই দেখা গেল নিচের সমতলে প্রতিবিম্বিত হয়ে কাঁপছে চাঁদের আলো।  এর একটা অর্থই আছে। পানিতে প্রতিবিম্বিত হচ্ছে চাঁদ। ওদিকটায়ও তাহলে সাগর।

এটা মহাদেশ না, হার্বার্ট, দ্বীপ। গম্ভীর গলায় বললেন ক্যাপ্টেন সাইরাস হার্ডিং।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *