১০. ডেস্কের ওপাশ থেকে দুই বন্ধু

ডেস্কের ওপাশ থেকে দুই বন্ধুর দিকে তাকাল কিশোর। লাঞ্চের পর হেডকোয়ার্টারে আলোচনায় বসেছে। সিনথিয়ার সঙ্গে কি কি কথা হয়েছে, জানিয়েছে দুজনকে।

ধর, কিশোর বলল। অন্ধ ভিক্ষুকটা যদি পুরুষ না হয়ে মেয়েমানুষ হয়?

এক মুহূর্ত ভাবল রবিন। মাথা নাড়ল। আমার মনে হয় না।

কিন্তু হতে তো পারে? সিনথি মেকাপ আর্টিস্ট। রোজারের সাথে পরিচয় আছে। মুসা, তোমার কথাই হয়ত ঠিক। সিনথির সঙ্গে ওই ডাকাতি, অন্ধ ভিখিরি আর মীটিঙের সঙ্গে কোন যোগাযোগ আছে।

ওই লোকটা সিনথি নয়, জোর দিয়ে বলল রবিন। খুব কাছে থেকে দেখেছি অন্ধকে। খোঁচা খোঁচা দাড়ি ছিল। দু-দিন শেভ করেনি। মেকাপ করে ওরকম দাড়ি বানানো সম্ভব?

হুঁম্‌ম্‌! হতাশ হল কিশোর। যা-ই হোক, রোজারের কাছ থেকে ব্যাংকের খবর জানাটা তো কঠিন না, চেনা যখন। তারপর অন্ধ গালকাটাকে…।

কাটাটা নকল, রবিন বলল।

ভুরু কোঁচকাল কিশোর। লাইব্রেরিতে জেনে এসেছ নাকি?

হ্যাঁ, কোলের ওপর ফেলে রাখা বড় খামটা হাতে নিল। কয়েকটা ম্যাগাজিন বের করল ওটা থেকে। মেসা ডিওরো একটা দেশ বটে। ছোট, মাত্র পনেরো হাজার বর্গমাইল, লোক সংখ্যা চল্লিশ লাখের কম, কিন্তু গণ্ডগোল কম নয়। একটা ম্যাগাজিন খুলল সে। ওয়ার্ল্ড অ্যাফেয়ার্স পত্রিকায় কয়েক বছর আগে একটা আর্টিকেল বেরিয়েছিল। সেটারই সারমর্ম তুলে দেয়া হয়েছে এই ম্যাগাজিনে। দেশটার ইতিহাস অনেকখানি জানা যায় শুধু এটুকু পড়লেই। একসময় স্প্যানিশ কলোনি ছিল ওখানে। তারপর আঠারশো পনেরো সালে ওদেশী জমিদারেরা একজোট হয়ে উৎখাত করল ওখানকার বিদেশী সরকারকে। নতুন প্রেসিডেন্ট নিযুক্ত করে নর্জুন সংবিধান চালু করল।

ভাল করেছে, মুসা বলল। কিন্তু এর সঙ্গে অন্ধ আর ডাকাতের কি সম্পর্ক?

হয়ত কিছুই না। আমি ব্যাকগ্রাউণ্ড বলছি। তারপর আঠারশো বাহাত্তর সালে একটা বিদ্রোহ হয়। অনেক লোক মারা যায়। মরছে এখনও।

রবিনের মুখের দিকে তাকিয়ে আছে কিশোর।

খাইছে! চেঁচিয়ে উঠল মুসা। আঠারশো বাহাত্তরে শুরু হয়ে এখনও চলছে? তুমি বানিয়ে বলছ।

আমাকে বলতে দাও, হাত তুলল রবিন। অনেকটা ফরাসী বিপ্লবের মত। ঊনিশশো সতেরো সালে রাশিয়ায়ও হয়েছিল এরকম। মেসা ডিওরোর জমিদারেরা ভয়ানক দুর্নীতি শুরু করল। দিনকে দিন বড়লোক হতে লাগল ওরা, গরিব হল আরও গরিব। তাদেরকে কিছুই দিত না ধনীরা। অথচ এসব জমির মালিক একসময় ওই গরিবেরাই ছিল। ওরা জাতে ইনডিয়ান।

অবশেষে হুয়ান করুসসা নামে এক ইনডিয়ান একটা দল গঠন করল। বক্তৃতা দিয়ে বেড়াতে লাগল দেশের এখানে সেখানে। গরিবের অধিকার আদায়ের কথা বলল। তাকে ধরে জেলে পাঠিয়ে দিল কর্তৃপক্ষ।

বিপ্লবের কথা বলছিলে তুমি, মনে করিয়ে দিল কিশোর।

সেকথাই তো বলছি। সাংঘাতিক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে ততদিনে কসো। তাকে জেলে ভরায় লোকে গেল আরও খেপে। দলে দলে রাজধানীতে এসে চড়াও হল ওরা, জেল থেকে বের করে আনল করসোকে। প্রেসিডেন্ট অ্যারতোরো রডরিগেজকে ধরে ফাঁসি দিয়ে দিল। প্রেসিডেন্টের ছেলে অ্যানাসত্যাসিও রডরিগেজ পাল্টা আক্রমণ চালাল। অনেক রক্তক্ষয় হল, কয়েকবার সরকার বদল হল। অবেশেষে কসোই হল প্রেসিডেন্ট। অ্যানাসত্যাসিও পালিয়ে গেল মেকসিকো সিটিতে।

ওখানে ব্যাপারটা শেষ হয়ে গেলেই ভাল হত, বলে যাচ্ছে রবিন। কিন্তু অ্যানাসত্যাসিও পরাজয় মেনে নিতে পারল না, রাজ্যহারা রাজার মত গুমড়াতে লাগল। কিন্তু কিছু করার ছিল না তার। জমিদাররা যারা বেঁচে রইল, তারাও পালিয়ে আসতে লাগল মেকসিকোয়, কারণ মেসা ডিওরোতে তাদের টেকা মুশকিল হয়ে উঠেছিল। শ্রমিকেরা সংখ্যা গরিষ্ঠ। ভোট দিয়ে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছে। ধনীদেরকে বাধ্য করেছে বেশি ট্যাক্স দিতে।

হুঁ, বুঝতে পারছি শোচনীয় হয়ে পড়েছিল জমিদারদের অবস্থা,মুসা বলল।

খুবই শোচনীয়। একজোট হল আবার জমিদারেরা। পুরানো দিনের কথা মনে করে আফসোস করত তারা। বলত, আহা, কি সব দিনই না ছিল। প্রেসিডেন্ট অ্যারতোররার সময়। ওরা গঠন করল আরেকটা দল, দেশের মধ্যে থেকেই, নাম দিল সোলজার্স অভ দ্য রিপাবলিক। প্রতিজ্ঞা করল, তারা জিততে পারলে অ্যানাসত্যাসিওকে এনে প্রেসিডেন্ট করবে। পুরানো পতাকাই ব্যবহার করল ওরা, নীলের মাঝে সোনালি ওকপাতা। হুয়ান করুসসা নতুন পতাকা চালু করেছে, সবুজের মাঝে নীল।

ভ্রূকুটি করল কিশোর। কিন্তু এসব তো ঘটেছে একশো বছরেরও বেশি আগে। আমাদের মক্কেলের সঙ্গে মেসা ডিওরোর রাজনীতির কি সম্পর্ক? নাকি এখনও সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে জমিদারেরা? আগের প্রেসিডেন্টের ছেলের তো। এতদিনে মরে ভূত হয়ে যাওয়ার কথা।

তাই তো গেছে। এখন সংগ্রাম চালাচ্ছে অ্যানাসত্যাসিওর নাতি, ফেলিপ রডরিগেজ। মেকসিকো সিটিতেই বাস করে। সুযোগের অপেক্ষায় রয়েছে ফেলিপ, কবে দেশে ফিরে গিয়ে সিংহাসনে বসবে, যে দেশকে সে চোখেই দেখেনি কখনও। অনেক গুপ্তচর আছে তার, দেশের খবরাখবর এনে দেয়।

আশ্চর্য তো! মুসা বলল। তিন পুরুষ পরে এখনও প্রসিডেন্ট হওয়ার শখ?

শখ হলে আর কি করা। তবে কথাটা সত্যি। ওয়ার্ল্ড অ্যাফেয়ার্স বলছে সোলজার্স, অভ দ্য রিপাবলিক দলটা বেআইনী নয় মেসা ডিওরোতে। দলের সদস্যরা রিপাবলিকান বলে পরিচয় দেয় নিজেদের। রোববারে জমায়েত হয়ে বিবৃতি-টিবৃতি দেয়।

বিরোধীরা কেয়ারও করে না। রিপাবলিকানদের কেউ কেউ চায় বর্তমান প্রেসিডেন্টকে উৎখাত করতে। ওরা আবার আরেকটা বিশেষ নাম নিয়েছে, ফ্রিডম ব্রিগেড। ওদেরকে স্বীকৃতি দেয়ার প্রশ্নই ওঠে না, রাষ্ট্র, ওদেরকে আউট ল ঘোষণা করেছে। দাঙ্গা-হাঙ্গামা করে ওরা, কিডন্যাপ করে, বোমাবাজি করে। বেশি বাড়াবাড়ি শুরু করলে পুলিশ বাধা দেয়। পুলিশের তাড়া খেয়ে দেশ ছাড়তে বাধ্য হয় অনেকে, পালিয়ে আসে মেকসিকো কিংবা আমেরিকায়।

তারমানে, ঢোক গিলল মুসা। কাল রাতে টেরোরিস্টদের সভায় যোগ দিয়েছিলাম? সন্ত্রাসবাদী? সব্বোনাশ!

হতে পারে, না-ও হতে পারে। মেসা ডিওরোর লোক অনেক আছে আমেরিকায়। সোলজার্স অভ দ্য রিপাবলিকের একদল সন্ত্রাস পছন্দ করে, আরেক  দল করে না। তবে দুই দলই চায় ফেলিপ প্রেসিডেন্ট হোক। টাকা সংগ্রহ করে, দলের জন্যে।

চমৎকার!

সে যা হোক, এই তো গেল মেসা ডিওরোর রক্তক্ষয়ী ইতিহাসের কাহিনী। এখন আসা যাক অন্ধের কথায় পুলিশের নাম শুনেই সে-রাতে ভয়ে পালাল অন্ধ। মিসেস নিকারোর স্বপ্নের কথা শুনে চমকে উঠল বিল। তুমি কাল রাতে দেখে এলে তার ছবি। বোঝাই যায়, ছবির ওই লোককে নেতা বানিয়েই মীটিং করছিল ওরা।

ম্যাগাজিনের পাতা ওল্টালো রবিন। এই দেখ, তুলে দেখাল সে, বেশ বড় একটা ছবি। কালো চশমা, গালে কাটা দাগ। মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়িয়ে আছে, বক্তৃতার ভঙ্গিতে হাত তোলা। মুখ দেখেই বোঝা যায়, ছবিটা তোলার সময় চেঁচিয়ে কথা বলছিল। মুসা, এই ছবিটাই দেখেছিলে?

হ্যাঁ, এটাই। অবিকল এক চেহারা।

আমিও এই চেহারাই দেখেছি, তবে একেই কিনা জানি না। এর নাম লুই প্যাসক্যাল ডোমিনিগেজ ডি অ্যাট্রানটো। একসময় ফেলিপ রডরিগেজের সহযোগী ছিল। এ-ব্যাটা টেরোরিস্ট। মেসা ডিওরোতে বোমা মেরে চোদ্দটা বাচ্চাকে খুন করেছে একবার, স্কুলের ছাত্র-ছাত্রী। দোষ চাপিয়েছে সরকারের ঘাড়ে। তার যুক্তি, শয়তান সরকার চেয়ার দখল করে আছে বলেই তাকে টেরোরিস্ট হতে হয়েছে, আর সে টেরোরিস্ট হয়েছে বলেই বাচ্চাগুলো মরেছে।

আস্ত ফ্যানাটিক, অনেকক্ষণ পর কথা বলল কিশোর। কিন্তু তুমি যাকে দেখেছ, সে আর এই ছবির লোক এক ময় বলে সন্দেহ করছ কেন?

কারণ অ্যাট্রানটো মৃত। মারা গেছে কয়েক বছর হল। কিছুক্ষণ নীরবতার পর জোরে নিঃশ্বাস ফেলল মুসা। যদি সে মৃতই হয়।

তাকে কথা শেষ করতে দিল না কিশোর। কিন্তু চেহারা তো অবিকল এক। রবিন, অ্যাট্রানটো কি অন্ধ ছিল?

হ্যাঁ। এক ওয়্যারহাউসে আগুন লাগাতে গিয়ে হয়েছিল। নিজের আগুনে নিজেই। এতেই হিরো হয়ে যায় সে।

তাহলে অন্ধ ভিক্ষুক আর অ্যাট্রানটোর চেহারা এক, চিন্তিত ভঙ্গিতে বলল কিশোর। শুধু মেকাপ আর একটা কালো চশমা দরকার, কাউকে অ্যাট্রানটো বানানোর জন্যে। আমি ভাবছি, এসবের পেছনে সিনথিয়ার হাত নেই তো? কিন্তু কেন কেউ ওই ছদ্মবেশ নেবে? কি লাভ তার? কেউ…।

ফোন বাজল। বাধা পেয়ে বিরক্ত চোখে তাকাল কিশোর। তারপর তুলে নিল রিসিভার। হ্যালো…ও, মিস্টার রোজার!

এক মিনিট চুপচাপ শুনল সে। তারপর বলল, হুঁ, কিছু বোঝা যাচ্ছে না। তবে এড়িয়ে যাওয়ার মত নয়। যদি বলেন, আসতে পারি। এমনিতেও আপনার সঙ্গে কথা আছে।

আরেক মিনিট শুনল। বলল, হ্যাঁ। আসতে আধ ঘন্টা লাগবে।

রিসিভার রেখে দিল কিশোর। আবার রোজারকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। খুব মুষড়ে পড়েছে। দেখি, যাই, কি বলে? সিনথিয়ার কথাও জিজ্ঞেস করতে হবে। দুই সহকারীর দিকে তাকাল সে। মেয়েটার ওপর নজরও রাখতে হবে আমাদের। বিলের দলের সঙ্গে যোগাযোগ আছে কিনা জানা দরকার।

আমার দিকে চেয়ে লাভ নেই, মাথা নাড়ল মুসা। মা-র কড়া আদেশ, বিকেলের মধ্যে লনের ঘাস কেটে সাফ করতে হবে। আর আমাদের বাগানে যা ঘাসরে, ভাই, জানই তো। এক হপ্তায় ছইঞ্চি হয়ে যায়, আরও পেয়েছে বৃষ্টি। থামল এক মুহূর্ত। তাছাড়া, মেয়েটা আমাকে চিনে ফেলার ভয় আছে।

রবিন? সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে তাকাল কিশোর।

আমি পারব। বিকেলে কাজ নেই।

হুঁশিয়ার, সাবধান করে দিল মুসা। বোমা মেরে যারা শিশু খুন করতে পারে, তাদেরকে বিশ্বাস নেই। জানোয়ারেরও অধম।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *