১০. ঝট করে ঘুরে তাকালো কিশোর

ঝট করে ঘুরে তাকালো কিশোর আর রবিন। চোখে পড়লো দুটো ছায়ামূর্তি। ওদেরই দিকে আসছে। দুজনের হাতেই হকিস্টিক।

পালানোর চেষ্টা করে লাভ নেই। রুখে দাঁড়ালো দুই গোয়েন্দা। লোকদুটোকে আরও কাছে আসার সময় দিলো। তারপর ওরা আঘাত হানার আগেই নড়ে উঠলো কিশোর আর রবিন। একজন ব্যবহার করলো জুডোর কৌশল, আরেকজন চালালো কারাত। ফেলে দিলো লোক দুটোকে। তারপর উঠতে শুরু করলো সিড়ি বেয়ে। চূড়ায় কি আছে দেখতেই হবে।

কথাটা রবিনের মনে পড়লো প্রথমে। ফাঁদ নয়তো? হয়তো আলোর টোপ জ্বেলে আমাদের টেনে নিয়ে চলেছে ব্যাটারা!

তা-ও দেখবো, কি আছে! বলে পেছন ফিরে তাকালো কিশোর, লোকদুটো আসছে কিনা দেখার জন্যে। তাকিয়েই থমকে দাড়ালো। লোকগুলো নেই। মুসাও নেই। তার মাথায় যে বাড়ি মারা হয়েছে, একথা জানে না কিশোর কিংবা রবিন। ভেবেছে, সে-ও আসছে পেছনে। উত্তেজনায় খেয়ালই করেনি, লোকগুলোর সঙ্গে মারপিট করার সময় মুসা সেখানে ছিলো না। মুসা কই?

রবিনও ফিরে তাকালো। বেশ উজ্জ্বল হয়েছে জ্যোৎস্না। ভালোমতোই চোখে পড়ছে নিচের সিড়িগুলো। কোথাও দেখা গেল না মুসার্কে। হয়তো কোথাও লুকিয়েছে। লোকগুলোকে দেখেই আমাদেরকে হুঁশিয়ার করে দিয়ে লুকিয়ে পড়েছে।

তা হতেই পারে না! জোর দিয়ে বললো কিশোর। তুমিও মুসাকে চেন। মানুষের ভয়ে লেজ গুটিয়ে পালানোর বান্দা ও নয়।

তাহলে গেল কোথায়?

চাঁদের আলোয় যতদূর চোখ যায় তাকিয়ে দেখলো দুজনে। কোথাও মুসাকে দেখা গেল না। কোনো নড়াচড়া নেই। কোনো মানুষ নেই। যে দুজন লোক বাড়ি মারতে এসেছিলো, তাদেরও চোখে পড়লো না। আশ্চর্য!

উদ্বিগ্ন হয়ে পড়লো দুই গোয়েন্দা। মেরে বেহুঁশ করে ধরে নিয়ে যায়নি তো! রবিন বললো।

দুজন বাদেও আরও লোক থাকতে পারে, কিশোর বললো। নিয়ে যাওয়াটা অস্বাভাবিক নয়।

চূড়ায় উঠে কিসের আলো জ্বলছে দেখার আগ্রহটা আপাতত চেপে রাখতে বাধ্য হলো কিশোর। মুসার কি হয়েছে দেখা দরকার আগে। তাড়াতাড়ি নেমে চললো সিড়ি বেয়ে। শুধু চাঁদের আলোর ওপর ভরসা না করে টর্চও জ্বাললো। ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে আলো ফেলে খুঁজতে লাগলো মুসাকে। চিহ্নই নেই। তবে কি সত্যিই কিডন্যাপ করে নিয়ে গেল?

ব্যাপারটা কি… বলতে গিয়ে থেমে গেল রবিন।

পাথরের একটা বাড়ির দরজায় দুজন লোককে দেখা গেল। সোজা সেদিকে দৌড় দিলো দুই গোয়েন্দা। কিন্তু হারিয়ে গেল লোকগুলো। এই এলাকা ওদের পরিচিত। যখন খুশি বেরোচ্ছে, যখন খুশি লুকিয়ে পড়ছে। বাড়িটার কাছে এসে অনেক খোঁজাখুজি করলো দুজনে, লোকগুলোকে পেলো না। কয়েক মিনিট পরে একটা গাড়ির এঞ্জিনের শব্দ হলো।

চলে যাচ্ছে, হাঁপাতে হাঁপাতে বললো কিশোর। তবে একটা ব্যাপার শিওর। মুসা ওদের সঙ্গে নেই।

মাথা ঝাঁকালো রবিন। যে বাড়িটা থেকে বেরোলো, তাতে ঢুকিয়ে রেখে যায়নি তো?

চলো, দেখি।

দরজায় দাঁড়িয়ে টর্চের আলো ফেললো দুজনে। শূন্য ঘর। মুসার নাম ধরে চেঁচিয়ে ডাকলো রবিন। পাথরের দেয়ালে দেয়ালে প্রতিধ্বনি তুললো সে চিৎকার। কিন্তু মুসার সাড়া নেই।

দুজনকে যেতে দেখেছি, কিশোর অনুমান করলো। আরও লোক থাকতে পারে। ওরা হয়তো টেনেহিঁচড়ে নিয়ে গিয়ে গাড়িতে তুলেছে মুসাকে। তাহলে, এখানে চেঁচামেচি করে লাভ হবে না।

তবু চুপ করলো না রবিন। চেঁচিয়েই চললো মুসার নাম ধরে। কিশোর খুঁজে চলেছে। ভালো মতো না খুঁজে বেরোবে না এখান থেকে।

পায়ের ওপর শরীরের ভার বদল করলো সে। কি যেন শুনলাম! কান পাতলো দুজনেই। চাপা একটা গোঙানির মতো শব্দ শোনা গেল। বাড়ির আরও ভেতরে! ফিসফিসিয়ে বললো কিশোর।

পাথরের দেয়াল। দরজা খুঁজতে লাগলো ওরা। ঢোকার পথ। একজায়গায় বুক সমান উঁচু চারকোণা একটা ফোকর দেখতে পেলো। কয়েকটা পাথর পড়ে রয়েছে আশেপাশে। এককালে দরজাই ছিলো, এখন আর সেটা বোঝার উপায় নেই। পাল্লা-টাল্লা কিছু নেই। আর কোনো পথ না দেখে সেটা দিয়েই ঢুকে পড়লো দুজনে। আরও স্পষ্ট হলো গোঙানিটা।

আরেকটা ফোকর চোখে পড়লো। সেটা দিয়ে ছোট আরেকটা ঘরে চলে এলো ওরা। মুসাকে দেখতে পেলো। হাত-পা বাঁধা অবস্থায় পড়ে রয়েছে। জ্ঞান পুরোপুরি ফেরেনি।

হাঁটু গেড়ে তার দুপাশে বসে পড়লো দুজনে। মাথায় বাড়ি মেরে বেহুঁশ করা হয়েছে। একপাশ ফুলে উঠেছে গোল আলুর মতো। এছাড়া শরীরের আর কোনো জায়গায় জখম নেই।

পানি দরকার ছিলো, কিশোর বললো। তাহলে তাড়াতাড়ি হুঁশ ফেরানো যেতো।

যেন তার কথা কানে যেতেই চোখ মিটমিট করলো মুসা। শূন্য দৃষ্টি।

মুসাআ! একই সঙ্গে প্রায় চিৎকার করে উঠলো রবিন আর কিশোর কিশোর যোগ করলো, ভালো আছো তো, মুসা?

কথা বলার শক্তি পাচ্ছে না যেন মুসা। তবু কনুইয়ে ভর দিয়ে কোনোমতে উঠে বসলো।

চলো, বাইরে চলো, কিশোর বললো। তাজা বাতাস পেলে ভালো লাগবে। চলো, ধরে ধরে নিয়ে যাচ্ছি আমরা।

দুদিক থেকে ধরে মুসাকে দাঁড়াতে সাহায্য করলো কিশোর আর রবিন। ওদের কাঁধে ভর দিয়ে টলতে টলতে বাইরে বেরোলো মুসা। কয়েকবার জোরে জোরে শ্বাস টানলো। অনেকটা সুস্থ বোধ করলে ভার সরিয়ে আনলো বন্ধুদের কাঁধ থেকে।

বাড়ি মেরেছিলো, না? জিজ্ঞেস করলো কিশোর।

ম-মনে হয়, দুর্বল কণ্ঠে জবাব দিলো মুসা। ঝাড়া দিয়ে যেন ঘোলাটে মগজ পরিষ্কার করতে চাইলো। তোমরা ভালোই আছো মনে হয়। ভালো। লোকদুটোকে দেখলাম, হকিস্টিক হাতে তোমাদেরকে হুঁশিয়ার করেও সারতে পারলাম না। ধা করে মেরে বসলো আমাকে। তারপর সব কালো। আমার চিৎকার শুনতে পেয়েছিলে, না?

হ্যাঁ, রবিন বললো। অনেক ধন্যবাদ তোমাকে। নিজে মার খেয়ে আমাদের বাঁচিয়েছো।

আরে না, হাত নাড়লো মুসা। অতোটা হীরো নই আমি। চিৎকার না করলেও আমাকে মারতো ওরা। কারণ আমিই ছিলাম সবার পেছনে, আবার টলে উঠলো সে।

তাড়াতাড়ি তাকে ধরে ফেললো কিশোর আর রবিন। একটা পাথরের ওপর বসিয়ে দিলো জিরিয়ে নেয়ার জন্যে। আপাতত হোটেলে ফেরারই সিদ্ধান্ত নিলো। মুসাকে ধরে ধরে নিয়ে এগোলো গাড়ির দিকে। কিশোর আশঙ্কা করছে, লোকগুলো কোথাও লুকিয়ে থেকে ওদের ওপর চোখ রাখছে। সুযোগ পেলেই হয়তো বেরিয়ে এসে আবার হামলা চালাবে।

কিন্তু না, কেউ বেরোলো না। নিরাপদেই গাড়িতে উঠতে পারলো ওরা। ড্রাইভিং সীটে বসলো কিশোর। গাড়ি চালাতে চালাতে ভাবতে লাগলো, কে লোকগুলো? কোথা থেকে এলো? কেন পিছু লেগেছে ওদের? অ্যাজটেক যোদ্ধাকে যারা খুঁজছে, তাদেরই কেউ? তদন্ত করা থেকে বিরত করতে চাইছে ওদেরকে?

একই ভাবনা চলেছে মুসা আর রবিনের মনেও। মুসা বললো, আমি সব ভজঘট করে দিলাম। কিশোর, পিরামিডের ওপরে কে আলো জ্বেলেছিলো, জেনেছো? শয়তান লোকগুলোই গিয়ে উঠেছিলো ওখানে?

মনে হয় না, কিশোরের দৃষ্টি রাস্তার ওপরে নিবদ্ধ। ওরা নিজেদেরকে লুকিয়ে রাখতে চায়। অতো খোলা জায়গায় যাবে না। কাল দিনের বেলা আবার যাবো মনটি অ্যালবানে। দেখি, কোনো জবাব মেলে কিনা।

আর কিছু বললো না মুসা। আহত জায়গাটা ব্যথা করছে। মাথা ঘুরছে অল্প অল্প। আগামী দিন রবিন আর কিশোরের সঙ্গে বেরোতে পারার শক্তি পাবে বলে মনে হলো না তার। তবে রাতের বেলা ভালো একটা ঘুম দিতে পারলে বলা যায়, সুস্থও হয়ে যেতে পারে সকালে।

হোটেলে ঘরে পৌঁছেই বিছানায় গড়িয়ে পড়লো মুসা। কাপড় খোলারও শক্তি নেই!

দাঁড়াও, খুলে দিচ্ছি, কিশোর বললো।

সে আর রবিন মিলে প্রথমে মুসার জ্যাকেট খুলে ঝুলিয়ে রাখলো। তারপর খুললো জুতো আর মোজা। সবশেষে প্যান্ট। চোখ বন্ধ করে পড়ে রইলো মুসা। মাঝে মাঝে নিদ্রাজড়িত কণ্ঠে শুধু বললো, কি করো, কি করো!

শাট খুলতে গিয়ে বুক পকেটে একটা কাগজ পেলো রবিন। জিজ্ঞেস করলো, আই মুসা, এটা কি? এই কাগজটা?

আমি কোনো কাগজ রাখিনি…

ভাঁজ খুলে ফেললো রবিন। পড়ে বিস্ময় ফুটলো চোখে। তাকিয়েই রয়েছে কিশোর। ব্যাপারটা নজর এড়ালো না তার। জিজ্ঞেস করলো, কি?

নীরবে কাগজটা বাড়িয়ে ধরলো রবিন। কিশোরও পড়লোঃ বাড়ি যাও। আমাদের গুপ্তধন ছিনিয়ে নেয়ার কোনো অধিকার তোমাদের নেই। কথা না শুনলে মরবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *