১০. ঘুরে দাঁড়াতে ঠিক পিছনে

ঘুরে দাঁড়াতে ঠিক পিছনে টিমথি ব্লটকে দেখতে পেল বেন ডেভিস। আনুমানিক ত্রিশ হবে ব্লটের বয়স, রোদপোড়া চেহারা। এরকম বেকুবি জীবনে আর করেছি কি-না সন্দেহ, তীব্র অসন্তোষ ঝড়ে পড়ল ব্লটের কণ্ঠে। ইচ্ছে না থাকলেও থাকতে হচ্ছে! কিন্তু কেন থাকব? চাইলে অন্যরা থাকতে পারে, আমি থাকছি না! ঘোড়া পেলে ঠিকই নিরাপদ জায়গায় চলে যেতে পারব। অন্যরা থাকুক বা না-থাকুক, আমরা চলে যাব।

চাইলেও যেতে পারব না আমরা, মুখে বললেও গলায় জোর থাকল না, বেনের নিজের কানেই ম্লান শোনাল সুরটা। ব্লটের প্রস্তাবের সঙ্গে ওর ভাবনা অক্ষরে অক্ষরে মিলে যাচ্ছে। মরার ইচ্ছে নেই ওর, কিংবা এখানে থেকে উত্তাপে সিদ্ধ হওয়ার ইচ্ছেও নেই। ক্ষৌরিহীন মুখে, এক কাপড়ে কতদিন থাকা যায়? ভদ্রলোকের জীবন নয় এটা। মেলানিকে নিয়ে চলে যেতে হবে…যত দ্রুত সম্ভব।

ব্লট লোকটার সাহায্য কাজে আসবে। কেলারের মত অতটা বিপজ্জনক নয় সে, সাধারণত অন্যের অনুসারী হয় এসব লোক, নিজ থেকে কিছু করার দুঃসাহস করে না। উঁহু, মৃদু স্বরে বলল বেন ডেভিস। ঠিক হবে না কাজটা।

মৃত বীর হওয়ার চেয়ে বরং জীবিত কাপুরুষ হতে রাজি আছি আমি, সোজাসাপ্টা জানিয়ে দিল ব্লট।

কাপুরুষ। শব্দটা বজ্রাহতের মত বিমূঢ় ও আড়ষ্ট করে তুলল বেনকে। সঙ্গে সঙ্গে অজুহাত দাঁড় করিয়ে ফেলল সে। উঁহু, ওকে কাপুরুষ বলতে পারবে না কেউ, কারণ প্রথম থেকে এখানে থাকার ইচ্ছে ছিল না ওর, বরং চলার মধ্যে থাকতে চেয়েছিল। তবে পরিস্থিতি বদলে গেছে এখন, এখানে থাকলে যতটা বিপদ পালাতে গেলে তারচেয়ে বেশি বিপদের আশঙ্কা রয়েছে। কিন্তু এখানে যারা আছে, তাদের সঙ্গে বন্ধন দূরে থাক, কোন আত্মিক সম্পর্কও নেই, সম্পর্ক হোক সেটাও চায় না বেন। যথেষ্ট দেখা হয়েছে, এবার চলে যাওয়ার পালা।

ব্যাপারটা কী? হাল ছাড়েনি ব্লট, আরও এগিয়ে এসে বেনের গা ঘেঁষে দাঁড়াল। বিতৃষ্ণায় পিছিয়ে যাচ্ছিল বেন, শেষ মুহূর্তে সামলে নিল নিজেকে। কেন এখানে পড়ে আছি আমরা? কীসের আশায়, বলতে পারো? আমরা দু’একজন চলে গেলে এমন কিছু যাবে-আসবে না, বরং খাবার বা পানির ঘাটতি মিটে যাবে ওদের।

ঘুরে দাঁড়াল বেন। পরে, মৃদু স্বরে বলল ও। আগে দেখি, পরিস্থিতি কী দাঁড়ায়।

আগুনের কাছ থেকে সরে এল ও। এই কদিনে আগুনটাই প্রাণকেন্দ্র হয়ে উঠেছে সবার কাছে। আগুনের ধারে আসছে ওরা, পাহারায় বা বিশ্রাম নিতে চলে যাচ্ছে আবার, ওদের জীবন বা সত্তার চালিকাশক্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে। তৃপ্তি ভরে কফি গিলে, যদিও নির্জলা কফি নয় ওটা-কফির সঙ্গে অর্ধেকের বেশি থাকে মেস্কিট বীনের গুঁড়ো। প্রায়ই আগুনের পাশে বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়ে দেয়, হাতে কাজ নেই বলে গল্প করে।

আকাশ ধূসর হয়ে এসেছে, প্রকৃতিতে ভোরের আগমনী বার্তা। পাথর বা বোল্ডার কালো দেখাচ্ছে, লাভার লালচে পাথর স্পষ্ট চোখে পড়ছে। শিগগিরই সূর্য উঠবে, সকালের শীতলতা থাকবে না; ঝলমলে দিনের আলোয় উন্মোচিত হয়ে পড়বে সব। আবারও হামলা করবে অ্যাপাচিরা। আজকের সূর্যাস্ত ক’জনের দেখার সৌভাগ্য হবে না, কে জানে!

এখনও পাত্তাও নেই ক্রেবেটের।

ঘুম ভেঙে যেতে কম্বলের নীচে আড়মোড়া ভাঙল মেলানি, উঠে চুল বিন্যস্ত করল। মুগ্ধ বিস্ময়ে ওকে দেখল বেন, এত ধকল বা উদ্বেগের পরও সতেজ এবং আকর্ষণীয় দেখাচ্ছে, ওকে। একটু হয়তো ক্লান্ত, কিন্তু সৌন্দর্য এতটুকু ম্লান হয়নি।

ব্যাটা কেটে পড়েছে, জানাল বেন। ক্রেবেট ভেগে গেছে।

ভেগে গেছে? ফাঁকা স্বরে জানতে চাইল মেলানি, কথাটার-তাৎপর্য যেন বুঝতে পারেনি। ক্ৰেবেট? নাহ, কেন ভাগবে ও?

বলছি তো, ব্যাটা চলে গেছে। বিশ্বাস হচ্ছে না? বেশ, একটু পরেই দেখবে। আচমকা ভিতরে ভিতরে বুনো উল্লাস বোধ করল বেন। এখানে থাকার জন্য এক পায়ে খাড়া ছিল ও, বলছিল জবর লড়াই করবে। কিন্তু নিজের চামড়া বাঁচাতে সুযোগ বুঝে কেটে পড়েছে, একটা শব্দও খরচ করার প্রয়োজন বোধ করেনি।

বিশ্বাস করি না আমি! উঠে দাঁড়াল মেলানি। এ-ধরনের কাজ করবে না ও। এরিক মোটেই কাপুরুষ নয়।

কাপুরুষ। শব্দটা আবার শুনতে হলো। প্রায় বিদ্বেষ নিয়ে মেলানির দিকে তাকাল বেন ডেভিস। হয়তো বোধধাদয় হয়েছিল ওর, কিংবা আমাদের চেয়ে ঢের বুদ্ধিমান ও। আমাদেরও তাই করা উচিত।

না, পালায়নি ও, আত্মবিশ্বাসী কণ্ঠে বলল মেলানি, অদ্ভুত হলেও অনুভব করল কথাটা মনে-প্রাণে বিশ্বাস করে ও, এবং এটাই সত্যি। আমাদের ছেড়ে যাবে না এরিক, ওর মত মানুষের ধাত নয় এটা।

বেডরোল ছেড়ে উঠে দাঁড়াল বিগ জুলিয়া, কৌতূহলী দৃষ্টি চালাল চারপাশে। শরীরটা বিশাল হলেও বেশ স্বতঃস্ফূর্ত ওর চলাফেরা। চুল পরিপাটি বা বেশভূষা ঠিক করার ঝামেলায় গেল না সে। সতর্ক চাহনিতে মেলানি আর বেন ডেভিসকে দেখল, তারপর দৃষ্টি সরে গেল পাথর এবং বোল্ডারসারির দিকে।

অন্যরা ক্যাম্পে আসছে। চুল ঝেড়ে আঁচড়াল মিমি রজার্স, টেনেটুনে ঠিক করল পরনের পোশাক।

ক্রেবেট চলে গেছে, আবার বলল বেন।

নিতান্ত বিতৃষ্ণা নিয়ে তাকে দেখল মিমি, তারপর হেঁটে চলে গেল ওদের কাছ থেকে।

কাহিল চেহারার কফিপটটা তুলে নিল এড মিচেল। হ্যাঁ, চলে গেছিল, সেটা সত্যি, এখন ফিরে আসছে ও

ঝট করে মুখ তুলে তাকাল সবাই। অন্যদের আগ্রহ বা উৎকণ্ঠা টের পেতে অসুবিধা হচ্ছে না মিচেলের। অপেক্ষা করো, বেশিক্ষণ লাগবে না, দেখবে সবার জন্য ভেড়ার মাংস নিয়ে ফিরে আসছে ক্ৰেবেট। ওই মাংসে কয়েকদিন চলে যাবে,যদি একটু হিসাব করে খাই।

ভীড়ের কিনারায় নড়াচড়া দেখা গেল। আলাদা হয়ে গেল ওরা।

রক্তাক্তই বলা যায় এরিকের শরীর। অ্যাপাচিটার রক্ত লেগেছে কাঁধে, ছুরির ঘায়ে কেটে গেছে গলা, ক্ষতটা গভীর নয়, সরু একটা রেখার মত দৃশ্যমান। জখমটা আদৌ টের পায়নি এরিক, কিংবা বলতেও পারবে না ঠিক কখন তৈরি হয়েছে।

মাংস ভরা ভেড়ার চামড়া মাটির উপর ফেলল এরিক। দেখতেই পাচ্ছ, আসলে চলে যাইনি। কেউই যাবে না এখান থেকে। বাঁচার একটাই উপায় আছে আমাদের-এখানে গাঁট হয়ে বসে থাকতে হবে।

হয়তো, আচমকা বিস্ফোরিত হলো বেন। তোমার বদলে আমাদেরই চলে যাওয়া উচিত।

মুখে বিদ্রুপের হাসি, নির্লিপ্ত চাহনিতে তাকে দেখল এরিক। বেশ, যেতে চাইছ যখন, আটকাব না আমি। কাউকেই আটকাব না। যখন ইচ্ছে যেতে পারো, কিন্তু একটা কথা সাফ বলে দিচ্ছি, কেউ কোন ঘোড়া পাবে না।

ঘুরে চলে যেতে উদ্যত হয়েছিল বেন, এরিকের কথাটা শুনে ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াল। তারমানে পায়ে হেঁটে যেতে হবে? রাগে জ্বলছে ওর চোখজোড়া, এক পা এগিয়ে গেল এরিকের দিকে। নিকুচি করি তোমার! কেন হাঁটব? যে-ঘোড়াটায় চড়ে এসেছি, ওটায় চড়েই ফিরে যাব আমি।

যেতে পারবে হয়তো, ঠাণ্ডা সুরে তাকে বলল এরিক। কিন্তু ইয়োমা পর্যন্ত পৌঁছতে পারবে না। সেক্ষেত্রে এখানেই থাকবে ওটা। আবারও বলছি, ঘোড়াগুলো এখন আমাদের সবার সম্পত্তি, কারও একার নয়।

স্থির দাঁড়িয়ে থাকল বেন ডেভিস, দেহের দু’পাশে চলে গেছে হাত দুটো, পিস্তল ছুঁইছুঁই করছে। ব্যাটা জানে না পিস্তলে কতটা ফাস্ট আমি, সরোষে ভাবছে সে, ক্ষিপ্রতায় সম্ভবত সেরাদের একজন। অনায়াসে খুন করতে পারবে এরিক ক্ৰেবেটকে। এটাই মোক্ষম সময়। কর্তব্য ঝুলিয়ে রাখা ঠিক না।

আমার ঘোড়াটা কেড়ে নেবে নাকি? উস্কানির সুরে জানতে চাইল বেন।

আমারটা সহ, সব ঘোড়া এখন যৌথ সম্পত্তি, এরিকের শান্ত জবাব। এই বিপদ থেকে উদ্ধার পাওয়া পর্যন্ত ব্যক্তিগত বলে কারও কিছু থাকবে না-ঘোড়া, খাবার বা ক্যান্টিন-কথাটা পুরুষ এবং মহিলা, সবার জন্য প্রয়োজ্য। ঘোড়া যেহেতু কম, যথাসাধ্য ব্যবহার করব আমরা। একটু শক্তিশালী, যারা, তারা হাঁটবে আর দুর্বলরা রাইড করবে; তা ছাড়া, পানি বহন করার জন্য একটা ঘোড়া বরাদ্দ থাকবে সর্বক্ষণ।

তোমার সঙ্গে একমত হতে পারলাম না, প্রতিবাদ করল মার্ক ডুগান।

দুঃখিত, জবাবে বলল এরিক। কিন্তু পরিস্থিতির খাতিরে এটাই করণীয় এখন। ইশারায় মাংস দেখিয়ে প্রসঙ্গ বদল ও। মাংসটা বরং রান্না করে ফেলাই ভাল, নইলে এই গরমে পচে যাবে।

আচমকা ঘুরে দাঁড়াল এরিক। ক্লান্ত, পর্যুদস্ত বোধ করছে। ছায়া আছে এমন একটা জায়গায় এসে ধপ করে বসে পড়ল। কোনরকমে বুট জোড়া খুলল পা থেকে, তারপর চিৎ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ঘুমিয়ে পড়ল।

কলজে আছে ব্যাটার! সমীহের সুরে বিড়বিড় করল ব্লট।

উত্তর দিল না বেন, অক্ষম রাগে ফুঁসছে ভিতরে ভিতরে। পালানো ছাড়া উপায় নেই, একরকম নিশ্চিত ও, এখনই যদি যাত্রা না করে, তা হলে সময়মত ইয়োমায় পৌঁছতে পারবে না। পায়ে হাঁটবে যারা এবং অন্য মহিলাদের বাদ দিলে, যারা ঘোড়ায় চড়ার সুযোগ পাবে না, অন্যরা ঠিকই পৌঁছতে সক্ষম হবে। বিশ্রাম পেয়ে তরতাজা হয়ে উঠেছে। ঘোড়াগুলো।

এই মৃত্যুফাঁদ থেকে মুক্তির পথ একটাই-এখানে বসে না থেকে বরং বেরিয়ে যেতে হবে। কোনরকমে একবার বেরোতে পারলেই হলো, তুফান বেগে ঘোড়া ছুটিয়ে দেবে। যাওয়ার জন্য এক পায়ে খাড়া হয়ে আছে, টিমথি ব্লট। সেক্ষেত্রে, সেভাবেই পরিকল্পনা করতে হবে, সিদ্ধান্তে পৌঁছল বেন ডেভিস। ক্রেবেট যদি আপত্তি করে, প্রয়োজনে তার লাশ ফেলে দেবে। গত কয়েকদিনে ব্যাটার যথেষ্ট হম্বিতম্বি সহ্য করেছে, হঠাৎ উপলব্ধি করল বেন, আর নয়।

তবে সবার আগে মেলানির সঙ্গে কথা বলতে হবে। বেন একরকম নিশ্চিত প্রস্তাবটা পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে লুফে নেবে ও ধনীর দুলালী, এখানে পড়ে থেকে জান খোয়াবে কেন?

*

ধড়মড় করে ঘুম থেকে জাগল এরিক ক্ৰেবেট। ঘামে ভিজে গেছে সারা দেহ, মুহূর্ত কয়েক বিহ্বল বোধ করল ও, বুঝতে পারছে না ঠিক কোথায় আছে। একটা পাথরের কিনারার সঙ্গে কম্বল ঝুলিয়ে অস্থায়ী আশ্রয় তৈরি করা হয়েছে, একইসঙ্গে ছায়া বিতরণ এবং বায়ু প্রবাহের দায়িত্ব পালন করছে ওটা। উঠে বসে কান পাতল ও…আগুনে কাঠ পোড়ার মৃদু শব্দ, দূরে নিচু স্বরে কথা বলছে কেউ-স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে -আর..কাছাকাছি নড়াচড়া করছে কেউ।

পিস্তল দুটো পরখ করল ও। ঘুম থেকে উঠে বরাবর দুটো কাজ করে-চারপাশের শব্দ শুনে বোঝার চেষ্টা করে কী ঘটছে এবং অস্ত্র পরখ করে। সহজাত প্রবৃত্তিতে রূপ নিয়েছে অভ্যাসটা। পায়ে বুট গলিয়ে কম্বলের পিছনে ওর আশ্রয়স্থল থেকে খোলা জায়গায় বেরিয়ে এল এরিক।

দীর্ঘক্ষণ ঘুমিয়েছে। ঝরঝরে লাগছে শরীরটা

আগুনের কাছে রয়েছে মেলানি। অনেকক্ষণ ঘুমিয়েছ, বলল মেয়েটি। দুপুর এখন।

কোন কিছু ঘটেছে?

মারা গেছে হার্শ।

এই ভাল হয়েছে। অনেক কষ্ট পেয়েছে বেচারা, বেঁচে থাকলে আরও পেত

গতরাতে বেরিয়েছিলে কেন? ইন্ডিয়ানদের হাতে মারা পড়তে পারতে।

মাংস দরকার ছিল।

কী ঘটেছিল ওখানে?

ভাগ্য ফুরিয়ে যাওয়া এক অ্যাপাচির সঙ্গে দেখা হলো।

পাথরসারির কাছে চলে গেছে বিগ জুলিয়া, রাতে ওখানেই ঘুমিয়েছে; ধারে-কাছে কোথাও লুকিয়ে রেখেছে ব্যাগ দুটো। সর্বক্ষণই হাতের নাগালের মধ্যে রাখছে শটগানটা। কফি খাওয়ার ফাঁকে মহিলাকে নিরীখ করল এরিক, স্পষ্ট বুঝতে পারল ঝামেলা আশা করছে জুলিয়া এবং যে-কোন পরিস্থিতি মোকাবিলা করার জন্য তৈরি।

ড্যান কোয়ানের সঙ্গে কথা বলতে হবে। সাহস আছে ছেলেটার, সহজে ভড়কে যাওয়ার নয়, বরং যথেষ্ট দৃঢ়চেতা। নির্ভরযোগ্য। চরম বিপদে ভরসা রাখা যাবে ড্যানের উপর। সার্জেন্টের উপরও বোধহয় ভরসা করা যায়। আর কেউ? মিমি রজার্স। হয়তো মিচেল এবং চিডলও ওর পক্ষে থাকবে। ডাফি একটু ভিন্ন ধাতের হলেও নিরেট চরিত্রের মানুষ। মেলানি রিওস…

আগুনের পাশে বসে মাংস চিবুচ্ছিল উনি। পদশব্দ পেয়ে মুখ তুলে তাকাল সে, এরিকের রক্তাক্ত শার্টের দিকে চলে গেল দৃষ্টি। নির্বিকার সুখ, কিছুই বলল না বা জানতে চাইল না। রক্তাক্ত শার্ট দেখেই বুঝে নিয়েছে, স্পষ্ট বা অপ্রয়োজনীয় প্রসঙ্গে কথা বলতে পছন্দ করে না ইন্ডিয়ানরা। টনি বুঝতে পারছে রাতে এখান থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর কোন অ্যাপাচির সামনে পড়ে গিয়েছিল এরিক, বহাল তবিয়তে ফিরে আসা এবং শার্টের রক্ত এরিকের নয়, লড়াইয়ের ফলাফল জানতে এই যথেষ্ট।

ঘোড়ার কাছে কে আছে? জানতে চাইল এরিক।

ডেভিস, জবাব দিল টনি।

ব্যাপারটা ভেবে দেখল এরিক, কিন্তু বিপজ্জনক কিছু খুঁজে পেল। এটা সত্যি যে বেশিরভাগ সময়ে পাথুরে চাতালে কিংবা অ্যারোয়োর কিনারে ঝোপে অবস্থান নেয় ডেভিস, তবে কারও জন্য নির্দিষ্ট কোন পজিশন নেই। পছন্দসই জায়গায় থাকতে পারে যে কেউ।

ও কি একাই আছে?

এক সৈন্য আছে ওর সঙ্গে।

ছায়ায় বসে মিমি রজার্সের সঙ্গে গল্প করছে ড্যান, কোয়ান। শার্ট গায়ে নেই তার, কোমর পর্যন্ত নগ্ন, শার্টটা সেলাই করে দিচ্ছে মিমি। অ্যারোয়োতে ঘোড়াগুলোর কাছাকাছি টম হার্শের জন্য কবর খুঁড়ছে মিচেল আর কেলার। অধৈর্য ভঙ্গিতে পায়চারি করছে টিমথি ব্লট, নিজের ভাবনা নিয়ে আনমনা হয়ে আছে বেন ডেভিস।

উইনচেস্টার তুলে নিয়ে কার্তুজ পরখ করল, এরিক, তারপর পাহাড়ী চাতালে উঠে এল, মাঝপথে থেমে কূপের পানির উচ্চতা দেখে নিল। প্রথম যখন এসেছিল, সে-তুলনায় পানি বেশ নেমে গেছে; তবে এখনও যা আছে, যথেষ্ট…যদি না অনেক দিনের জন্য আটকা পড়ে ওরা।

পাহাড়ী চাতালে পাহারায় রয়েছে মার্ক ডুগান। কিছু দেখিনি, বিরক্ত স্বরে বলল সে। কিছু নেই। এমন কোন নড়াচড়া চোখে পড়েনি।

মরুভূমিতে তাপতরঙ্গ নাচছে। উপরে, পেতলরঙা আকাশে অলস চক্কর কাটছে শকুনেরা। কোথাও কিছু নড়ছে না। একটা পাথরের উপর বসে মুখমণ্ডল থেকে ঘাম মুছল এরিক। পরনের কাপড়ে ঘাম আর ধুলোর কটু গন্ধ। বালিতে বা পাথরে প্রতিফলিত সূর্যের আলোর ঔজ্জ্বল্যের বিপরীতে তাকিয়ে থাকতে থাকতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে চোখ, জ্বালা করছে। হাঁটুর উপর উইনচেস্টারটা রেখে নিচু স্বরে খিস্তি করল

কী জানো, নিজের মনটাকে আমি নিজেও ঠিক বুঝতে পারি না, ম্লান সুরে বলল টেরিল ডাফি। কেন যে পশ্চিমে এসেছি, ভাবলে নিজেও মাঝে মধ্যে অবাক হয়ে যাই। কেন্টাকিতে বড়সড় একটা খামার আছে আমাদের, সুন্দর জায়গা…প্রতি শনিবার রাতে পার্টি বা নাচের আসর বসত ওখানে। বহু মাইল দূর থেকে আসত লোকজন। আর এখন দেখো, মরুভূমিতে আটকা পড়েছি, চাদির চুল হারানোর সমূহ সম্ভাবনা। এত বিপদ, প্রতিকূলতা বা অনিশ্চয়তা থাকার পরও কেন পশ্চিমে আসে মানুষ?

তামাক আর কাগজ বের করে সিগারেট রোল করছে এরিক। ঘাম এসে পড়ায় জ্বালা করে উঠল, সেখ। আমার কথা বলতে পারি, খারাপ লাগছে না এখানে। তুমিও যদি থাকো কিছুদিন, নেশা ধরে যাবে।

উঁহু, আমার হবে না। এই গঁাড়াকল থেকে যদি বেরিয়ে যেতে পারি, চাকুরিতে ইস্তফা দিয়ে কেন্টাকি চলে যাব। খামারে গিয়ে ফসল ফলাব। গ্লাস ভ্যালিতে চেনা এক লোক আছে আমার…নামটা সুন্দর না, শুনেছ নাকি? এ্যাস ভ্যালি। ভাবলেই শান্ত, ছায়াময় সবুজ এক উপত্যকা আর ঝর্নার ছবি ফুটে ওঠে মনে। আমাদের খামারটা এ্যাস ভ্যালির মত সুন্দর নয়, তবে ফিরে গিয়ে ওরকমই বানানোর চেষ্ট করব।

কাগজের আঠায় জিভ ছুঁয়েছে, তখনই নড়াচড়া চোখে পড়ল এরিকের। সিগারেট ফেলে ঝটিতি উইনচেস্টার তুলে নিল হাতে। আচমকা ক্ষীণ নড়াচড়া এবং টেরিল ডাফির দেহের অকস্মাৎ ঝাঁকি-কেবল এই দেখেছে ও। এরিকের দিকে আধ-পাক ঘুরে গেল তরুণ সৈনিকের শরীর, যেন কিছু বলবে, তারপর মন্থর গতিতে মুখ থুবড়ে পড়ল, কয়েক গড়ান খেয়ে পাথুরে একটা চাতালে গিয়ে স্থির হলো। এর অনেক আগেই গুলি করেছে এরিক, এমনকী ডাফি ভূপতিত হওয়ার আগেই।

মাটিতে ধুলো চটকাল ওর গুলি, দেখতে পেল এরিক। পরপর দুটো গুলি করল, একটা ঝোঁপ বরাবর, অন্যটা এক পাথরে রিকোশেটের গুলি গুপ্ত জায়গায় লক্ষ্যে আঘাত আনবে, এই আশায়।

মুহূর্তের মধ্যে সচকিত ও সতর্ক হয়ে উঠেছে সবাই। ছুটে পাথুরে চাতালে চলে গেছে মিচেল, বাচ্চা ছেলেকে কোলে নিয়েছে যেন, এমনভাবে তুলে নিল টেরিল, ডাফির দেহ। কিন্তু পণ্ডশ্রম। অনেক আগেই মারা গেছে টেরিল ডাফি। কেন্টাকিতে গিয়ে খামার করার স্বপ্ন তার অপূর্ণই থেকে গেছে।

দু’জন মারা গেছে। হার্শ এবং ডাফি। আরও ক’জনকে এই দুর্ভাগ্য বরণ করতে হবে?

মরুভূমিতে ভূতুড়ে নীরবতা।

হাতের চেটো দিয়ে মুখের ঘাম মুছল কেলার, একটা ঝোঁপের ফাঁকে উঁকি দিল। ঝোঁপের ডাল সরাতে যখন হাত বাড়াল সে, এরিক খেয়াল করল হাতটা মৃদু মৃদু কাঁপছে।

টেরিল ডাফির মৃত্যু বিমূঢ় ও শঙ্কিত করে তুলেছে অন্যদের। একটু আগেই বেঁচে ছিল সে-সুদর্শন হাসিখুশি সদ্য যুবক, অথচ আচমকা ঘটে গেল ব্যাপারটা-এক টুকরো সীসা কত অবলীলায় জীবন কেড়ে নিতে পারে!

একটা ব্যাপার স্পষ্ট হয়ে গেছে। ওদের চারপাশে শক্ত কর্ডন তৈরি করেছে অ্যাপাচিরা, অপেক্ষায় আছে, সর্বক্ষণ নজর রাখছে ওদের উপর।

নিরীহ দর্শন বিস্তীর্ণ মরুভূমি বিদ্বেষ, প্রতিহিংসা আর খুনোখুনির ময়দান হয়ে উঠেছে হঠাৎ; এখাকার অটুট নীরবতা আসলে অমঙ্গলের বার্তা, প্রচণ্ড উত্তাপ হচ্ছে নিরন্তর হুমকি। কূপের পানির উচ্চতা নেমে যাচ্ছে, পর্যাপ্ত খাবার নেই, আশপাশে যা ঘাস ছিল, প্রায় শেষের পথে। একেবারে মূল পর্যন্ত খেয়ে ফেলেছে ক্ষুধার্ত ঘোড়াগুলো, এমনকী মেস্কিট ঝোঁপ বা বীনও বাদ পড়েনি।

গম্ভীর, আড়ষ্ট এবং শঙ্কিত হয়ে গেছে মানুষগুলোর মুখ। যার যার জায়গায় অপেক্ষায় রয়েছে ওরা, তাপদগ্ধ মরুভূমির দিকে তাকিয়ে আছে, আশা করছে কোন টার্গেট দেখতে পাবে, আদপে যা চোখে পড়ছে না। এমনকী সার্জেন্ট হ্যালিগানও আত্মরিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছে। ক্লান্ত, বয়স্ক এবং পরাজিত দেখাচ্ছে তাকে, চওড়া কাঁধ নুয়ে পড়েছে কিছুটা। একে একে সবাইকে শেষ করবে ওরা, ক্রেবেট, তীব্র খিস্তি আউড়ে বলল হ্যালিগান। এই ঠেলায় মামলা খতম!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *