১০. অ্যাশবি ছাড়লেন ওয়ান্ডেমার

সন্ধ্যার আগেই অ্যাশবি ছাড়লেন ওয়ান্ডেমার। ইয়র্কে যাওয়ার আগে আশপাশের এলাকাগুলো থেকে কিছু সৈন্য সংগ্রহের চেষ্টা চালালেন তিনি। কাজটা খুব সহজ হলো না। রাজপুত্র জনকে পছন্দ করে এমন লোকের সংখ্যা নিতান্তই কম। তার পক্ষ হয়ে রাজা রিচার্ডের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর মতো মানুষের সংখ্যা আরো কম।

ভীতি এবং প্রলোভন দুটোই দেখাতে হলো ওয়ার্ল্ডেমারকে। যারা রাজপুত্রের পক্ষে যোগ দেবে তাদেরকে জমি জমা দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেন। প্রতিশ্রুতিতে যারা ভুললো না, তাদের ভয় দেখালেন, রাজপুত্রকে সাহায্য না করলে জমিজমা যা আছে সব নিয়ে নেয়া হবে। যেখানে বুঝলেন জমির লোভ দেখিয়ে লাভ হবে না সেখানে দেখালেন নগদ অর্থের লোভ; রিচার্ড পরাজিত হলে তার পক্ষের লোকদের ধন সম্পদ যা লুঠ করা হবে তার ভাগ দেয়া হবে তাদের। এইভাবে ছোট একটা বাহিনী তিনি গঠন করতে পারলেন, যেটা অবিলম্বে ইয়র্কের পথে রওনা হয়ে যাবে। ওয়াল্ডেমার সিদ্ধান্ত নিলেন বাকি সৈন্য ইয়র্ক ও তার আশপাশের এলাকাগুলো থেকে সংগ্রহের চেষ্টা চালাবেন। আর রিচার্ড দেশে ফিরে আসার আগেই রাজপুত্র জনকে রাজার আসনে অভিষিক্ত করা হবে।

এরপর ওয়াল্ডেমার অ্যাশবির দুর্গে ফিরে এলেন।

তখন গভীর রাত। ভীষণ ক্লান্ত তিনি। দুর্গের বড় হল কামরায় ঢুকতেই দেখা হয়ে গেল দ্য ব্রেসির সঙ্গে। অবাক হয়ে ওয়ান্ডেমার দেখলেন, আইন বিরোধী ডাকাতদের মতো পোশাক পরে আছে দ্য ব্রেসি। হাতে একটা ধনুক, কোমরে তৃণীর ভর্তি তীর। নিজের চোখকেও যেন বিশ্বাস করতে পারছেন না ওয়ার্ল্ডেমার।

নাটুকে পালা করার সময় এটা নয়, দ্য ব্রেসি, কঠোরকণ্ঠে বললেন তিনি। আমাদের সামনে এখন কঠিন সময়। আমার, তোমার, রাজপুত্র জনের–সবার! এর ভেতর তুমি কি খেলা শুরু করেছো? কেন অমন পোশাক পরেছো?

বউ জোগাড় করার জন্যে, শান্ত, শীতল কণ্ঠে জবাব দিলো দ্য ব্রেসি।

কী।

বউ জোগাড় করার জন্যে, আবার বললো দ্য ব্রেসি। সেড্রিক আর তার দলের পেছন পেছন যাবো আমি। ওরা বনে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে হামলা চালিয়ে সুন্দরী রোয়েনাকে উঠিয়ে নিয়ে আসবো।

তুমি পাগল হয়ে গেছ নাকি, দ্য ব্রেসি? চিৎকার করে উঠলেন ওয়াল্ডেমার। সেড্রিক লোকটা স্যাক্সন হলেও অসম্ভব ধনী। এবং ক্ষমতাশালীও। খোদ রাজপুত্রই এ সময়ে ওকে ঘাটানোর সাহস পাবেন না, আর তুমি! রাজপুত্র শুনলে ভয়ানক রেগে যাবেন তোমার ওপর।

না, না, আমার পরিকল্পনাটা আগে শুনুন, তাহলে বুঝতে পারবেন, রাজপুত্র একটুও রাগবেন না। আমরা যখন হামলা চালাবো তখন থাকবো ডাকাতদের পোশাকে। সেড্রিক ভাববে ডাকাতরাই হামলা চালিয়েছে। পরে আমি আমার পোশাক পরে গিয়ে ডাকাতদের আস্তানা থেকে উদ্ধার করবো রোয়েনাকে। তারপর ওকে নিয়ে তুলবো ফ্ৰঁত দ্য বোয়ফের দুর্গে। যদি দেখি পরিস্থিতি ঘোরালো হয়ে উঠছে তাহলে ফ্রান্সেও চলে যেতে পারি। যতদিন না ও মরিস দ্য ব্রেসির বউ হয় ততদিন কেউ আর ওর চেহারা দেখবে না!

চমৎকার পরিকল্পনা! ব্যঙ্গ করে বললেন ওয়ার্ল্ডেমার। কার মাথা থেকে বেরিয়েছে? সেড্রিক এত বোকা মনে করেছো? প্রথমে ডাকাত হিশেবে, পরে উদ্ধারকর্তা হিশেবে যাবে, আর ও চিনতে পারবে না।

ডাকাতির সময় আমি সঙ্গে থাকবো, শুধু। একান্ত প্রয়োজন না হলে সামনে যাবো না।

লোকজন পাচ্ছো কোথায়? তোমার হাতে তো দুটো লোকও নেই।

আঁ, আপনি যদি জানতেই চান তাহলে বলবো…।

হ্যাঁ, বলো, আমি জানতে চাইছি, ফেটে পড়লেন ওয়ান্ডেমার।

টেম্পলার বোয়া-গিলবার্ট দেবেন লোক। ওঁর সাঙ্গপাঙ্গরাই ডাকাতি করবে। আমি আড়ালে থেকে খেয়াল রাখবো শুধু।

ওহ! তারপর বোয়া-গিলবার্টের খপ্পর থেকে ওকে উদ্ধার করবে কিভাবে?

সেটা কোনো সমস্যা হবে না, বোয়া-গিলবার্ট টেম্পলার, সুতরাং বিয়ে করতে পারবে না। যাহোক, আমি এখন যাই, আমার ঘোড় আর লোকজন। অপেক্ষা করছে। বিদায়, স্যার ওয়াল্ডেমার, সত্যিকারের একজন নাইটের মতো আমি আমার মনের মানুষকে জিতে নেবো।

তুমি একটা গর্দভ, দ্য ব্রেসি। রাজপুত্রের যখন সাহায্য দরকার তখন তুমি যাচ্ছে গাধামি করতে। ঠিক আছে যাচ্ছে যখন যাও, কিন্তু যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ইয়র্কে চলে এসো। সঙ্গে যত জন পারো লোক নিয়ে আসবে।

কিছু না বলে দ্রুত পায়ে বেরিয়ে গেল দ্য ব্রেসি। বিরক্ত মুখে ওর চলে যাওয়া দেখলেন ওয়ার্ল্ডেমার। তারপর একটা দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলে বিড়বিড় করলেন, গর্দভ! বোকা গাধা!

রাজপুত্রের সাথে দেখা করার জন্যে রওনা হলেন তিনি।

.

বোয়া-গিলবার্ট আইভানহোর কাছে পরাজিত হবার পর আর এক মুহূর্ত দেরি করলো না ব্ল্যাক নাইট। টুর্নামেন্ট ময়দান ছেড়ে রওনা হয়ে গেল নিজের পথে। উত্তরে ইয়র্ক নগরীর দিকে ঘোড়া ছুটিয়ে দিলো সে। লোক চলাচলের সাধারণ পথে গেল না। মানুষ জনের সামনে যেন না পড়তে হয় সেজন্যে বনের ভেতর দিয়ে এগিয়ে চললো। এবং এক সময় আবিষ্কার করলো সে পথ হারিয়ে ফেলেছে বিশাল শেরউড জঙ্গলে।

সন্ধ্যা হয়ে আসছে। তাছাড়া সারাদিনের পরিশ্রমে ঘোড়াটা ক্লান্ত, ছুটতে তার কষ্ট হচ্ছে। নিজেও পরিশ্রান্ত। রাত কাটানোর মতো একটা আশ্রয়ের একান্ত প্রয়োজন। অথচ কোথায় গেলে আশ্রয় মিলবে জানা নেই। শেষ পর্যন্ত সে ঘোড়াটাকে ইচ্ছে মতো চলতে দেয়ার জন্যে লাগাম আলগা করে দিলো।

কিছুক্ষণ পর দূর থেকে গির্জার ঘণ্টাধ্বনির মতো অস্পষ্ট একটা আওয়াজ ভেসে এলো নাইটের কানে। তাড়াতাড়ি আবার শক্ত হাতে লাগাম ধরলো সে। ঘোড়া ছোটালো শব্দ লক্ষ্য করে। কিছুদূর গিয়ে প্রাচীন একটা গির্জার ভগ্নাবশেষ নজরে পড়লো তার। গির্জাটা ভেঙেচুরে গেলেও চূড়াটা এখনো মাথা উঁচিয়ে আছে। তারই একটা পুরনো মরচেধরা ঘণ্টা মাঝে মাঝে বাতাসের দমকে নড়ে উঠে বাজছে।

গির্জার অদূরে ওক কাঠের বেড়া দেয়া ছোট্ট একটা কুটির। পাশেই ক্ষীণ একটা ঝরনা টলটলে জল বুকে নিয়ে বয়ে চলেছে। আবার শোনা গেল ঘণ্টাধ্বনি। আগের চেয়ে অনেক মৃদু। নাইটের মনে হলো কুটিরের ভেতর থেকেই যেন এলো শব্দটা। বোধহয় কোনো পবিত্র সন্ন্যাসী থাকেন এই কুটিরে, ভাবলো সে। যদি চাই নিশ্চয়ই উনি আমাকে খাদ্য ও রাতের মতো আশ্রয় দেবেন।

কুটিরের সামনে গিয়ে ঘোড়া থেকে নামলো নাইট। বর্শার উঁটি দিয়ে মৃদু আঘাত করলো দরজায়।

কোনো সাড়াশব্দ নেই কুটিরের ভেতরে। কিছুক্ষণ পর আবার আঘাত করলো নাইট।

এগিয়ে যাও, গম্ভীর একটা গলা ভেসে এলো এবার। এখানে গোলমাল করে আমার প্রার্থনায় বিঘ্ন ঘটিও না।

ফাদার, আমি একজন হতভাগ্য পথিক। পথ হারিয়ে ফেলেছি। খাবার এবং রাতের মতো আশ্রয় দরকার আমার। আমাকে দয়া করুন।

যাও, যাও, বললাম না বিরক্ত কোরো না! আমার কাছে যে খাবার আছে তা কুকুরের খাওয়ার মতো নয়। আমার বিছানা কুকুরের শোয়ার উপযোগী নয়। তুমি ভাগো! আমাকে নিরিবিলিতে প্রার্থনা করতে দাও।

ফাদার, আমি মিনতি করছি, দরজা খুলুন, পথহারাকে সঠিক পথ দেখান।

ভাই, আমিও মিনতি করছি, দয়া করে আমাকে আর বিরক্ত কোরো না।

আশ্রয় যদি একান্ত না-ই দিতে চান, কোন পথে গেলে পাবো তা অন্তত বলে দিন।

এখান থেকে সোজা কিছুদূর গেলে একটা জলা পাবে। সেটা পেরিয়ে আরো কিছুদূর গেলে পাবে ছোট একটা নালা। বছরের এই সময় হেঁটেই পার হতে পারবে। নালা পার হয়ে ডান দিকে যাবে। পথ চলার সময় সাবধানে থেকো…।

থাক থাক আর বলতে হবে না, বাধা দিয়ে বললো নাইট। এই রাতে আমি জলা, নালা, খাল, বন্দক পেরিয়ে যেতে পারবো না। হয় আপনি দরজা খুলুন, না হলে আমিই ঢুকলাম দরজা ভেঙে, বলেই সে দমাদ্দম লাথি চালাতে লাগলো দরজার ওপর।

থামো, থামো! চিৎকার করে উঠলেন ফাদার। আসছি! আমি আসছি! খুলছি দরজা! একটু দাঁড়াও।

কপাট দুটো খুলে আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে দরজা জুড়ে দাঁড়ালেন সন্ন্যাসী। মোটাসোটা লোক। বলিষ্ঠ গড়ন। মুখটা ঢাকা হুড দিয়ে। তার এক হাতে মোটা একটা কাঠের লাঠি। দুপাশে এসে দাঁড়িয়েছে দুটো কুকুর। আগন্তকের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্যে তৈরি। গলা দিয়ে গরগর আওয়াজ বেরোচ্ছে তাদের। ব্ল্যাক নাইটের চেহারা ও সাজ পোশাক দেখার সঙ্গে সঙ্গেই অবশ্য সন্ন্যাসীর আক্রমণাত্মক ভঙ্গি অদৃশ্য হয়ে গেল।

ভেতরে এসো, নরম করে বললেন তিনি।

ভেতরে ঢুকে নাইট খেয়াল করলো, চার পাশে ছড়িয়ে আছে সন্ন্যাসীর দারিদ্রের চিহ্ন। একটা মাত্র চৌকি ঘরে। তাতে খড়ের বিছানা পাতা। খটখটে একটা টেবিলের দুপাশে দুটো খটখটে টুল। ব্যস আর কোনো আসবাবপত্র নেই। নাইটকে একটা টুল দেখিয়ে বসতে ইশারা করলেন সন্ন্যাসী। নিজে বসলেন অন্যটায়।

ফাদার, শুরু করলো ব্ল্যাক নাইট, আগে আমার তিনটে প্রশ্নের জবাব দিন, তারপর অন্য কথা। প্রথমত, আমার ঘোড়াটাকে রাখবো কোথায়? দ্বিতীয়ত, আমি শোবো কোথায়? আর সবশেষে, রাতে খাবো কি?

আমি ইশারায় তোমার প্রশ্নের জবাব দেবো, বললেন সন্ন্যাসী। কারণ কথা বলার চেয়ে নীরবতাই আমার বেশি পছন্দ। এর পর তিনি ঘরের এক কোনার দিকে ইশারা করলেন, অর্থাৎ ঘোড়াটা ওখানে থাকতে পারবে। অন্য কোণের দিকে ইশারা করে বোঝালেন, ওখানে শোবে নাইট। সবশেষে উঠে একটা পাত্র থেকে এক মুঠো শুকনো বীন নিয়ে একটা থালায় করে এগিয়ে দিলেন নাইটের দিকে। এই হলো রাতের খাবার।

সন্ন্যাসী নিজের জন্যেও এক মুঠো বীন নিয়ে একটা থালায় রাখলেন। তারপর শুরু করলেন প্রার্থনা। দীর্ঘ প্রার্থনা শেষে দুতিনটে বীন মুখে ছুঁড়ে দিলেন তিনি নাইটের দিকে তাকিয়ে ইশারা করলেন, খাও!

কিন্তু খাওয়ার আগে পোশাক ছাড়তে হবে নাইটকে। উঠে দাঁড়ালো সে। প্রথমে খুললো গায়ের বর্ম। তারপর শিরোস্ত্রাণ। সুন্দর, নিস্পাপ একটা মুখ দেখতে পেলেন সন্ন্যাসী। মাথায় ঘন, সোনালী চুল। উঠে তিনি নিজেও আগন্তুকের দৃষ্টান্ত অনুসরণ করলেন। মাথা থেকে সরিয়ে দিলেন হুডটা। নাইট খেয়াল করলো, সাধারণত সন্ন্যাসীদের যেমন হয় তেমন রোগা, মাংসহীন নয় এ সন্ন্যাসীর মুখ। এঁর মুখটা প্রায় গোল, বেশ মাংসল। একটু লালচে ভাব আছে গালে। চেহারায় ফুর্তিবাজ একটা ভাব। এই মুখের মালিক যে শুকনো বীন নয়, মাংস ও ভালো মদ খেয়ে অভ্যস্ত, বুঝতে এক মুহূর্ত দেরি হলো না তার।

যুদ্ধের পোশাক ছেড়ে আবার সে টুলে গিয়ে বসলো। সন্ন্যাসীর দেখাদেখি মুখে দিলো দুতিনটে শুকনো বীন। এবং সঙ্গে সঙ্গে বুঝতে পারলো কি বোকামিই না করেছে। এমন শক্ত জিনিস মানুষের খাদ্য হতে পারে না। সন্ন্যাসী হয় ঠাট্টা করেছেন নয়তো বোকা বানিয়েছেন ওকে। কোনো মতে চিবিয়ে বীন কটা গিলে ফেলে পানীয় চাইলো নাইট।

এক জগ ঠাণ্ডা পানি রাখলেন সন্ন্যাসী তার সামনে। বললেন, পান করো, বৎস, সেইন্ট ডানস্ট্যানের পবিত্র কূপের পানি।

নাইট ইতস্তত করছে দেখে জগটা ঠোঁটের কাছে তুলে চুমুক দিলেন তিনি।

এবার আর থাকতে পারলো না নাইট। বিদ্রুপের সুরে বললো, শুকনো বীন আর ঠাণ্ডা পানি খেয়ে যে বাহারের চেহারা বানিয়েছেন, আপনাকে দেখে তো যে কারো হিংসে হওয়ার কথা! চেহারা দেখে কে বলবে আপনি সন্ন্যাসী, বনের ভেতর নির্জন কুটিরে বসে উপাসনা আর ঈশ্বরের ধ্যানে দিন কাটান?

স্যার নাইট, তুমি ভুলে যাচ্ছো আমার শাদামাঠা খাবারের ওপর স্বর্গবাসী সন্তদের আশীর্বাদ আছে, গম্ভীর কণ্ঠে জবাব দিলেন সন্ন্যাসী।

আচ্ছা! তাহলে স্বীকার করতেই হয় স্বর্গ অন্তত এই একটা ক্ষেত্রে অসাধ্য সাধন করেছে। দোষ নেবেন না, ফাদার, এই পাপীর মনে একটা কৌতূহল জেগেছে, আপনার নামটা কী জানতে পারি?

তুমি আমাকে কপম্যানহা-এর সন্ন্যাসী বলে ডাকতে পারো। সবাই সাধারণত এ নামেই আমাকে ডাকে। কেউ কেউ অবশ্য সন্ন্যাসীর আগে পবিত্র শব্দটা জুড়ে দেয়। কিন্তু, সত্যিই বলছি, এই উপাধির যোগ্য আমি নই। তোমার নামটা কি এবার জানা যায়?

নিশ্চয়ই, ফাদার। আপনি আমাকে ব্ল্যাক নাইট বলে ডাকতে পারেন। কেউ কেউ অবশ্য অলস শব্দটা জুড়ে দেয়, কিন্তু, সত্যিই বলছি, এই উপাধির যোগ্য আমি নই।

হাসলেন সন্ন্যাসী। কথা শুনে তো মনে হচ্ছে বিদ্যেবুদ্ধি আছে পেটে। ভদ্রলোকদের ভেতর দিন কাটিয়ে অভ্যস্ত তাই না?

হ্যাঁ বা না কিছু বললো না নাইট। সন্ন্যাসী এক মুহূর্ত চুপ করে থেকে বললেন, এই মাত্র একটা কথা মনে পড়ে গেল আমার। কদিন আগে এক বন-রক্ষী কিছু রান্না করা মাংস দিয়ে গেছিলো আমাকে। সারাদিন জপ তপ নিয়ে থাকি তো, তাছাড়া ওসব খাবার আমি খাই না, তাই একদম মনে ছিলো না। একটু চেখে দেখবে নাকি?

আপনার চেহারা দেখেই বুঝতে পেরেছি, ফাদার, আপনার কুটিরে শুকনো বীনের চেয়ে ভালো খাবার আছে। এখন বের করুন দেখি তাড়াতাড়ি। খিদেয় নাড়ীভুড়ি পর্যন্ত হজম হয়ে গেল।

ঘরের অন্ধকার এক কোণে গিয়ে ছোট্ট একটা লুকানো আলমারি থেকে বিরাট এক থালা মাংস বের করে আনলেন সন্ন্যাসী। থালাটা তিনি টেবিলে রাখতে না রাখতেই খেতে শুরু করলো নাইট।

আহ্, খুব ভালো তো খেতে! বললো সে। আপনার সেই বন-রক্ষী, কবে দিয়ে গেছে এ জিনিস?

তা প্রায় দুমাস তো হবেই।

আরেকটা আশ্চর্য ঘটনা, বড় এক টুকরো মাংস মুখে পুরতে পুরতে বললো নাইট।

সতৃষ্ণ নয়নে ফাদার দেখছেন তার খাওয়া। একেকটা টুকরো সে মুখে ফেলছে আর আঁতকে আঁতকে উঠছেন তিনি। অতি দ্রুত খালি হয়ে আসছে থালা।

ফাদারের মনের অবস্থা বুঝতে অসুবিধা হলো না নাইটের।

বুঝলেন, ফাদার, আমি প্যালেস্টাইনে ছিলাম, বললো সে। ওখানে দেখেছি, প্রত্যেক গৃহস্থই সবচেয়ে ভালো খাবার দিয়ে অতিথিকে আপ্যায়ন করে, এবং অতিথির সঙ্গে নিজেও খায়। খাওয়ার ইচ্ছে না থাকলেও খায়। এটা ওদের ভদ্রতা। তাছাড়া প্রমাণ দেয় খাবারে বিষ মেশানো নেই। আপনি সন্ন্যাসী মানুষ এসব উপাদেয় খাবারে রুচি নেই আমি জানি, তবু আমার অনুরোধ প্যালেস্টাইনীদের মতো আপনার অতিথির সাথে আপনিও কিছু মুখে দিন।

চক চক করে উঠলো সন্ন্যাসীর চোখ। খাবো? তুমি বলছো?

ইচ্ছে করছে না? আরেকটা বড় টুকরো মুখে পুরে বললো নাইট।

না, না, করছে, বলে আর এক মুহূর্ত দেরি না করে সন্ন্যাসী ঝাঁপিয়ে পড়লেন মাংসের ওপর। বিরাট একটা টুকরো তুলে চালান করে দিলেন মুখে।

অনেক কষ্টে হাসি সামলালো নাইট। খাওয়া শেষে সে বললো, আপনার সেই বন-রক্ষী মদ টদ কিছু দিয়ে যায়নি?

হেসে লুকানো আলমারিটার দিকে এগিয়ে গেলেন সন্ন্যাসী। বিরাট একটা বোতল আর দুটো গেলাস নিয়ে এলেন। শুরু হলো পান পর্ব।

গেলাসে চুমুক দিয়ে নাইট বললো, আপনাকে যত দেখছি, ততই রহস্যময় মনে হচ্ছে, ফাদার। আশা করি বিদায় নেয়ার আগে আরো অনেক কিছু জানতে পারবো আপনার সম্পর্কে।

সন্দেহ নেই তুমি সাহসী নাইট, বললেন ফাদার, কিন্তু তোমার মাত্রাজ্ঞান একটু কম মনে হচ্ছে। দেখ, আমার ব্যাপারে যদি বেশি কৌতূহল দেখাও, তোমাকে এমন শিক্ষাই দেবো, বাকি জীবনে আর তা ভুলতে পারবে না।

আচ্ছা! ঈশ্বরভক্ত সন্ন্যাসীর মতো কথাই বটে। বেশ, আপনার চ্যালেঞ্জ আমি গ্রহণ করছি। কি নিয়ে লড়বেন বলুন।

তোমার যা খুশি, বলতে বলতে আলমারিটা আবার খুললেন ফাদার। এর ভেতর যা যা আছে তার থেকে যে কোনোটা তুমি বেছে নিতে পারো।

নাইট এগিয়ে গিয়ে দেখলো, ঢাল, তলোয়ার, তীর-ধনুকে প্রায় বোঝাই আলমারির একটা তাক। এক পাশে পড়ে আছে একটা বীণা।

বাহ বাহ! বললো নাইট। ঈশ্বরের উপাসনার জন্যে দারুণ সব উপকরণ মওজুদ করেছেন দেখছি! ঠিক আছে, আপনাকে আর প্রশ্ন করবো না, আমার সব কৌতূহলই মিটে গেছে। অস্ত্রশস্ত্র থাক, তার চেয়ে বরং আসুন এটা নিয়ে কিছু করা যায় কিনা দেখি। বীণাটা বের করে আনলো নাইট।

তোমাকে যে লোকে অলস বলে, বোধ হয় মিথ্যে বলে না। এত সব চমৎকার অস্ত্রশস্ত্র রেখে কিনা বের করলে বীণা! ঠিক আছে, তুমি আমার অতিথি, তোমার ইচ্ছাই আমার ইচ্ছা। এসো গেলাস ভরে নাও, তারপর তুমি বাজাও আমি শুনি।

কিন্তু দুগেলাস পেটে পড়তেই শুধু শুনে আর চললো না সন্ন্যাসীর। বাজনার সাথে সাথে হেঁড়ে গলায় গান ধরলেন তিনি। একটু পরে নাইটও গলা মেলালো। কিছুক্ষণের ভেতর বিভোর হয়ে গেলেন দুই শিল্পী।

কতক্ষণ কেটে গেছে এভাবে কেউ বলতে পারবে না। হঠাৎ মৃদু টোকার শব্দ হলো দরজায়। মুহূর্তে থেমে গেল গান বাজনা। মাংসের থালা আর মদের বোতল গেলাস লুকিয়ে ফেলার জন্যে ব্যস্ত হয়ে উঠলেন সন্ন্যাসী। নাইট দ্রুত হাতে পরে নিলেন শিরোস্ত্রাণ।

আবার টোকার শব্দ হলো।

কে? চিৎকার করে উঠলেন সন্ন্যাসী।

ব্যাটা বিড়ালতপস্বী! শোনা গেল একটা কণ্ঠস্বর। খুলুন! আমি লক্সলি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *