০৯. হোটেলে ফিরে কাপড় ছেড়ে

হোটেলে ফিরে কাপড় ছেড়েও সারতে পারলো না কিশোর। টেলিফোন বাজলো। পুলিশ চীফ মারকাস ফোন করেছেন। বললেন, এক ঘণ্টা যাবৎ তোমাদেরকে ধরার চেষ্টা করছি। কোথায় গিয়েছিলে?

টিওটিহুয়াকানে। কেন?

একটু আগে খবর পেলাম, একটা গুজব নাকি ছড়িয়ে পড়েছে; মনটি অ্যালবানে একজন আরকিওলজিস্ট একটা বিরাট আবিষ্কার করেছেন। তিনিই তোমাদের লোক নন তো?

সিনর স্টেফানো?

বুঝতে পারছি না। রিপোর্ট পেয়েছি, একজন লোক নাকি শহরে এসে ঢুকেছে। বলে বেড়াচ্ছে খবরটা। তাকে ধরে জিজ্ঞেস করা হয়েছে। বললো, আরকিওলজিস্ট নাকি তার পরিচয় ছড়াতে নারাজ। সেজন্যেই মনে হচ্ছে আমার, তিনি সিনর স্টেফানো।

তাহলে আর দেরি করবো না, কিশোর বললো। এখুনি বেরিয়ে পড়বো। দেখি তাঁকে ধরতে পারি কিনা। তা আবিষ্কারটা কি করেছেন?

লোকটা বলতে চাইলো না। অনেক চেষ্টা করলাম, একটু থামলেন মারকাস। তারপর বললেন, এখুনি যাবে? মনটি অ্যালবানের রাস্তা কিন্তু ভালো না। আমি অবশ্য কখনও যাইনি। পাহাড়ের ভেতর দিয়ে ঘুরে ঘুরে যেতে হয়। অনেক দূর। আজকে না গিয়ে কাল সকালেই যাও।

আচ্ছা। লাইন কেটে গেল।

রবিন আর মুসাকে খবরটা জানালো কিশোর। তারপর ম্যাপ খুলে বসলো। মেকসিকোর উত্তরপুবে প্রায় সাড়ে তিনশো মাইল দূরে ছোট একটা শহর আছে। নাম অকজাকা। যেতে হবে ওই শহরের ভেতর দিয়ে।

রবিন বললো, একদিনে মনটি অ্যালবানে যাওয়া সম্ভব না। এক কাজ করবো। অকজাকায় গিয়ে হোটেলে উঠবো। ওখান থেকে আবার রওনা হওয়া যাবে।

পরদিন খুব সকালে রওনা হয়ে গেল তিন গোয়েন্দা। প্যান-আমেরিকান হাইওয়ে ধরে যেতে হয়। প্রচন্ড ভিড়। দুই ঘণ্টা লেগে গেল পর্বতের কাছাকাছি আসতেই। ভিড় না থাকলে আরও অনেক আগেই চলে আসতে পারতো। সরু একটা শাখা পথ ঢুকে গেছে পর্বতের ভেতরে। সেই পথ ধরে চললো ওরা। একটু পর পরই তীক্ষ্ণ মোড়। ওপাশ থেকে সাড়া না দিয়ে গাড়ি এলে মারাত্মক দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে। মোড় ঘোরার সময় তাই বার বার হর্ন দিতে লাগলো কিশোর। তার পরেও আরেকটু হলেই অ্যাক্সিডেন্ট হয়ে যাচ্ছিলো একবার। ওপাশ থেকে তীব্র গতিতে ধেয়ে এলো একটা গাড়ি। এরকম মোড়েও গতি কমায়নি। শাই শাই করে স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে পর্বতের দেয়ালের সঙ্গে প্রায় সেঁটে গেল কিশোর। অন্য গাড়িটা পড়ে যাচ্ছিলো পাশের গভীর খাদে, নিতান্ত কপাল জোর আর ড্রাইভারের দক্ষতার কারণে বেঁচে গেল।

অপূর্ব দৃশ্য পর্বতের। দেয়াল কোথাও খাড়া, কোথাও ঢালু। বেরিয়ে রয়েছে গ্রানাইটের বিচিত্র স্তর। ছোটবড় চূড়ার কোনো কোনোটাতে রোদ পড়ে জ্বলছে। যেন কড়া লাল রঙে রাঙিয়ে দেয়া হয়েছে। ছবির মতন।

ঢালে জন্মে রয়েছে নানা জাতের ক্যাকটাস। চিউলিপ ফুলের মতো দেখতে খাটো ম্যাগুই ক্যাকটাস থেকে শুরু করে দৈত্যাকার ক্যানডেল ক্যাকটাস, সবই আছে। যেমন বিচিত্র চেহারা, তেমনি রঙ।

ছড়ানো, সমতল একটা জায়গায় পৌঁছলো ওরা। জায়গাটা পর্বতের ওপরেই। ক্যাকটাসের এক ঘন ঝাড় হয়ে আছে ওখানে।

এই, দাঁড়াও তো! কিশোরের কাঁধে হাত রাখলো মুসা।

গাড়ি থামালো কিশোর। গরুর গাড়ির চাকার মতো সমব্রেরো হ্যাঁট পরা একজন মানুষ মাটিতে ঝুঁকে বসে কি যেন করছে একটা ম্যাগুই কাকটাসের গোঁড়ায়। তার কাছে এগিয়ে গেল মুসা। বুঝতে পারলো কি করছে লোকটা। ক্যাকটাসের ভেতরে এক ধরনের রস হয়। পানির বিকল্প হিসেবে সেটাকে খাওয়া যায়। তা-ই বের করছে লোকটা।

এদিকে অনেক টুরিস্ট আসে। এখানকার লোকেরা তাই ইংরেজি বোঝে, বলতেও পারে কিছু কিছু। এই লোকটাও পারে। সহজেই তার সঙ্গে আলাপ জমিয়ে ফেললো মুসা।

রবিন আর কিশোরও নেমে এলো। খিদে পেয়েছে তিনজনেরই। গাড়িতে লাঞ্চ প্যাকেট আর পানির বোতল রয়েছে। নামিয়ে আনা হলো। ক্যাকটাসের ছায়ায় খেতে বসলো তিনজনে। লোকটাকে আমন্ত্রণ জানাতেই রাজি হয়ে গেল সে।

লেখাপড়া মোটামুটি জানে লোকটা। তার নাম ডিউগো। মেকসিকো সম্পর্কে অনেক কিছু বলতে পারলো সে। অনেক মজার মজার গল্প, ইতিহাস।

ইনডিয়ানদের সামাজিকতা, দেবতার উদ্দেশ্যে নরবলির কাহিনী, এসব অনেক কিছুই জানে সে। বলে গেল গড়গড় করে। আর বলতেও পারে বেশ গুছিয়ে, সুন্দর করে। শুনতে ভালোই লাগে।

একসময় পিন্টো আলভারোর কথা জিজ্ঞেস করে বসলো কিশোর।

না, চিনি না, মাথা নাড়লো ডিউগো।

অজাকায় থাকে?

জানি না, পকেট থেকে ছবি বের করে দেখালো কিশোর। এই আরেকজন লোক, সিনর স্টেফানো। আরকিওলজিস্ট। নাম শুনেছেন?

সি, সি. দ্রুত জবাব দিলো লোকটা। দেখিনি কখনও। তবে শুনেছি, সিনর স্টেফানো নামে একজন লোক এখানকার ধ্বংসস্তূপগুলোতে খুঁড়তে আসে। বহুবার এসেছে।

মনটি অ্যালবানে যায়?

তা বলতে পারবো না।

লোকটাকে আরও কিছু প্রশ্ন করে, ধন্যবাদ এবং গুডবাই জানিয়ে উঠে এলো তিন গোয়েন্দা। গাড়িতে উঠলো। এবার ড্রাইভিং সীটে বসলো মুসা।

নাহ, একবিন্দু এগোতে পারছি না, নিরাশ ভঙ্গিতে মাথা নাড়লো কিশোর। লাভের মধ্যে শুধু বেড়িয়ে বেড়াচ্ছি, রহস্যের কিছুই করা যাচ্ছে না!

অকজাকাতে একটা হোটেলে উঠলো ওরা। ম্যানেজারের সঙ্গেও আলাপ করে দেখলো কিশোর। কিছুই জানতে পারলো না। মনটি অ্যালবানে যে একটা বড় আবিষ্কার হয়েছে, এই খবরটা জানে না পর্যন্ত ওই লোক।

রবিন জিজ্ঞেস করলো, আজই যাবে?

ঘড়ি দেখলো কিশোর। ছটা বাজে। এখুনি খেয়ে নিলে যাওয়া যায়।

তাহলে দেরি করছি কেন? ভুরু নাচালো মুসা। বসে গেলেই হয়।

খেয়েদেয়ে আবার বেরিয়ে পড়লো তিন গোয়েন্দা। এবারের গন্তব্য মনটি অ্যালবানের ধ্বংসস্তূপ, যেখানে সিনর স্টেফানো যুগান্তকর এক প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কার করেছেন বলে গুজব ছড়িয়েছে।

যেতে নিশ্চয় রাত হবে না, কি বলো? দুই সহকারীর উদ্দেশ্যে বললো কিশোর।

হলেই বা কি? রবিন বললো। শুনেছি, রাতে ওসব প্রাচীন ধ্বংসস্তূপ দেখার আলাদা মজা। আর চাঁদ থাকলে তো কথাই নেই।

ওরা যখন বেরোলো তখন সাতটা বাজে। অচেনা পথঘাট। শুরুতেই পথ হারালো। ব্যাপারটা ধরতে পারলো প্রথমে রবিন। ম্যাপ দেখে। ঠিক পথে এসে ওঠার জন্যে এবড়োখেবড়ো একটা কাঁচা রাস্তা ধরতে হলো।

প্যান প্যান শুরু করলো মুসা, এভাবে চললে ঘণ্টাখানেক পরেই আবার খিদে পাবে। নাহ, ঘোড়ার ডিমের অ্যাজটেক যোদ্ধাকে খুঁজে আর বের করা হলো না এযাত্রা!

গতি খুব ধীর। কিশোরও অধৈর্য হয়ে উঠেছে। নিজেকেই যেন সান্ত্বনা দিলো, আসল রাস্তায় উঠতে বেশিক্ষণ লাগবে না।

এঞ্জিনটা এখন বন্ধ না হলেই হয়, মুসা বললো।

কিংবা টায়ার পাংচার, পেছনের সীট থেকে বললো রবিন।

তবে এঞ্জিন বন্ধ কিংবা টায়ার পাংচার কোনোটাই হলো না। খোয়া বিছানো একটা পথে এসে উঠলো গাড়ি। গতি বাড়ালো মুসা। পাহাড়ী পথ ধরে দ্রুত ধ্বংসস্তুপের দিকে উঠে চললো। পথ ভুল করায় বেশ কিছুটা সময় নষ্ট হয়েছে। সেটা পুষিয়ে নিতে চেষ্টা করছে মুসা। কিন্তু তার পরেও দিনের আলো থাকতে থাকতে পর্বতের ওপরের চ্যাপ্টা সমতল জায়গাটায় পৌঁছতে পারলো না, যেখানে রয়েছে মনটি অ্যালবানের ধ্বংসস্তূপ। সূর্য ডুবে গেছে। চাঁদ উঠেছে।

টর্চ না নিয়ে নেমো না, সতর্ক করলো কিশোর, যতোই চাঁদ উঠুক। মুসা, ভূতের ভয় লাগছে না তো?

লাগলেই আর কি করবো?

হাসলো কিশোর। রবিন কিছু বললো না।

চাঁদের আলোয় কেমন যেন ভূতুড়ে লাগছে মনুটি অ্যালবানের পিরামিড আকৃতির মন্দির, সমাধিস্তম্ভ, আর বাড়িঘরগুলোকে। গা ছমছমে পরিবেশ। বিশাল এক চত্বর দেখতে পেলো ওরা। চারপাশ ঘিরে তৈরি হয়েছে পাথরের বাড়ি। দুটো বাড়ির মাঝের ফাঁকে গাড়ি রাখলো মুসা। টর্চ হাতে নেমে পড়লো তিনজনে। জায়গাটার বিশালত্বের কাছে অনেক ক্ষুদ্র মনে হলো নিজেদেরকে। স্তব্ধ, নীরব। অথচ এককালে নিশ্চয় গমগম করতো লোকজনে।

ডানে বাঁয়ে তাকালো মুসা। রবিনকে জিজ্ঞেস করলো, মিস্টার বুক অভ নলেজ, এর ইতিহাস কিছু জানো নাকি?

কিছু কিছু। পনেরোশো শতকের গোড়ার দিকে গড়ে উঠেছিলো এই শহর। তারপর হাত বদল হলো। স্প্যানিশরা এসে দখল করে ফেললো। নতুন মনিবেরা অনেক কিছু রদবদল করে তৈরি করলো নতুন শহর। মূল জায়গা থেকে কিছুটা সরে গিয়ে। আর পুরানো শহরটাকে ব্যবহার করতে লাগলো, ধর্মীয় অনুষ্ঠানের কাজে। তাদের বড় বড় নেতাকেও কবর দিলো এখানে।

তার মানে পুরোপুরিই ভূতুড়ে শহর!

একটা পাথরের দেয়ালের পাশে চলে এলো ওরা। নাচের দৃশ্য আঁকা হয়েছে খোদাই করে। খাইছে! প্রায় চিৎকার করে উঠলো মুসা। দেখ দেখ!

ঝট করে ঘুরে গেল অন্য দুটো টর্চের আলো। কিশোর জিজ্ঞেস করলো, কি?

জ্যান্ত! ওগুলো জ্যান্ত!

হাসতে শুরু করলো কিশোর আর রবিন। এই ভূতই তোমার সর্বনাশ করবে। মাথাটা একেবারেই খারাপ করে দিয়েছে! একটা মূর্তির গায়ে হাত বোলালো কিশোর। এই দেখ, একেবারে মরা! পাথর!

যতো যা-ই বলো, হাসিতে যোগ দিতে পারলো না মুসা। আমি কিছু নড়তে দেখেছি। মনে হচ্ছে চারপাশের কবর থেকে বেরিয়ে এসেছে সমস্ত প্রেতাত্মা! আমাদের দিকে তাকিয়ে মুখ টিপে হাসছে!

বাদ দাও তো ওসব ফালতু কথা! অধৈর্য হয়ে হাত নাড়লো কিশোর। কি কাজে এসেছি ভুলে গেছ? সিনর স্টেফানোকে খুঁজতে।

কিন্তু তাকে পাওয়া যাবে না। অন্তত এই বেলা। ধ্বংসস্তুপে যদি কাজ করেনও রাতের বেলা এখন কি করতে আসবেন?

কোথায় ঘুমান, সেটা খুঁজে বের করবো, বললো বটে, কিন্তু জোর নেই কিশোরের গলায়। জায়গাটায় এসেই তার মনে হয়েছে, কিছু একটা ভুল হয়ে গেছে। স্টেফানো এখানে সত্যি আছেন কিনা, এ-ব্যাপারেও সন্দেহ জাগতে আরম্ভ করেছে। হয়তো ইচ্ছে করেই গুজব ছড়িয়ে ওদেরকে টেনে আনা হয়েছে এখানে, কে জানে!

অ্যাই, দেখ! বলে উঠলো রবিন। হাত তুলে দেখালো।

সামনে পিরামিডের মাথায় একটা আলো মিটমিট করছে। লণ্ঠনের আলোর মতো।

পেয়েছি! উত্তেজিত কণ্ঠে আবার বললো ররিন। নিশ্চয় সিনর স্টেফানো! কাজ করছেন ওখানে!

সন্দেহ গেল না কিশোরের। কেন যেন মনে হতে লাগলো, পুরো ব্যাপারটাই একটা ফাঁকিবাজি। ধোকা! মনটি অ্যালবানেতে এসে ডা স্টেফানোর প্রত্নতাত্ত্বিক খোড়াখুঁড়ির গল্পটা ভুয়া। ওরকম কিছু হলে, আর এতো বড় একটা আবিষ্কার ঘটলে, হোটেলের ম্যানেজারের অন্তত না জানার কথা নয়। তার সন্দেহের কথাটা বললো দুই সহকারীকে।

কিন্তু কেন এই গল্প বানিয়ে বলতে যাবে? রবিনের প্রশ্ন।

শুধু আন্দাজ করতে পারি, জবাব দিলো কিশোর। নিশ্চিত হয়ে এখনও কিছু বলতে পারবো না। আমার বিশ্বাস, টোপ দেখিয়ে আমাদেরকে এখানে পাঠানোর উদ্দেশ্যেই একাজ করা হয়েছে। আমাদের শত্রুরা জানে, শুনলে তদন্ত করতে আসবোই আমরা। হয়তো কোনো কারণে সরিয়ে দিতে চেয়েছে। কিংবা ভুল পথে ঠেলে দিয়ে সময় নষ্ট করাতে চেয়েছে। যা-ই হোক, আলোটার দিকে দেখালো সে। ওটা দেখতে যাবো। কিসের আলো জানা দরকার। খুব সাবধানে থাকবে।

ওই আলো দেখতে যাওয়ার ব্যাপারটা ভালো লাগছে না মুসার। দশজন ষন্ডামার্কা লোকের সঙ্গে লাগতেও ভয় পায় না সে। কিন্তু রোগাটে একটামাত্র ভূত হলেও তার ধারেকাছে যেতে রাজি নয় সে। তবে কিছু করার নেই। কিশোর যখন যেতে বলেছে, যেতেই হবে।

সিড়ি বেয়ে উঠতে শুরু করলো কিশোর। তার পেছনে রইলো রবিন। আরেকবার দ্বিধা করে যা থাকে কপালে ভেবে মুসাও পা রাখলো সিঁড়িতে। চিৎকার করে উঠলো হঠাৎ। কিশোর, সাবধান, ব্যাটারা…

কথা শেষ করতে পারলো না সে। প্রচন্ড বাড়ি লাগলো মাথায়। বেহুশ হয়ে গেল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *