০৯. মাত্রা বে-র বৈশিষ্ট্য

মাত্রা বে-র বৈশিষ্ট্য হলো ওখানকার পানি শান্ত, রঙটা স্বচ্ছ পান্না সবুজ, চারদিকে ছড়িয়ে আছে কয়েকশো লাইম-স্টোন রক আর আইল্যান্ড। বহু দ্বীপেরই দীর্ঘ সৈকত আছে, সাঁতার কাটতে কোন অসুবিধে নেই। কোন কোন দ্বীপের কিনারায় গুহাও আছে।

রানা এজেন্সির সাহায্য নিয়ে রাবার বাগানের শ্রমিক হিসেবে একজোড়া ওঅৰ্ক পারমিট সংগ্রহ করা রানার জন্যে কোন সমস্যা হলো না, জাকার্তা থেকে সুমাত্রায় এল। ওরা ইন্দোনেশিয়ান এয়ারলাইন্সের নিয়মিত ফ্লাইট ধরে। ইতিমধ্যে বিকেল হয়ে গেছে, তাড়াহুড়ো করে একটা ট্যাক্সি ভাড়া করে লীলাবতী শহরে চলে এল। শহরের অর্ধেক মেইনল্যান্ডে, বাকি অর্ধেক একশো বিশ মাইল দূরে একটা দ্বীপে। মেইনল্যান্ডের তীরে অসংখ্য বোট দেখা গেল, বেশিরভাগই জেলে নৌকা। মাঝিদের সঙ্গে স্থানীয় ভাষায় কথা বলল লীনা। তার চেহারা শুকিয়ে যাচ্ছে দেখে রানা জানতে চাইল, কি ব্যাপার?

লীনা বলল, লীলাবতী ফাউলার লীজ নিয়েছে ঠিকই, কিন্তু ওখানে অদৃশ্য বোটটা আছে কিনা সন্দেহ। কারণ যা ভেবেছিলাম তা নয়, লীলাবতী নির্জন কোন দ্বীপ নয়। ওখানে প্রচুর টুরিস্ট আসা-যাওয়া করে।

তাহলে?

আরও কয়েকজন জেলে ও মাঝির সঙ্গে কথা বলল লীনা। তারপর রানাকে বলল, ওদিকে, ওই দ্বীপটা দেখছ? ওরা বলছে, ওটাকে সবাই এড়িয়ে চলে। যদিও কারণটা বলতে পারছে না। সন্ধ্যার পর ওদিকে কেউ যেতে চায় না। এক মাঝি রাজি হয়েছে, তবে বলছে পাঁচশো মার্কিন ডলার দিতে হবে।

ভুরু কোচকাল রানা। চেক নেবে?

লীলাবতী শহরে আমেরিকান এক্সপ্রেস অফিস খোলা পেল ওরা, ওখান থেকে ক্রেডিট কার্ড ভাঙাতে রানার কোন অসুবিধে হলো না। লীনা বলল, রওনা হবার আগে কিছু খেয়ে নিলে হত না? নিজেকে আমার রাক্ষসী মনে হচ্ছে।

সূর্য ডুবতে এখনও দুঘন্টার মত বাকি। হ্যাঁ, চলো।

সুমাত্রায় প্রচুর প্রবাসী বাঙালী থাকে, আর চীনা বংশোদ্ভূত ইন্দোনেশিয়ানরা তো স্থানীয়; লীনার জন্যে সাপ-ব্যাঙ ও নুডলস। আর রানার জন্যে মাছ-ভাত-ডাল পেতে কোন সমস্যা হলো না। হোটেলটা ছোট, তবে পরিচ্ছন্ন।

সৈকতে ফিরে এসে মাঝিকে টাকা দিল ওরা, উঠে বসল ফিশিং বোটে। নৌকাটায় এঞ্জিন লাগানো আছে।

সূর্য পাটে বসেছে, এই সময় রওনা হলো ওরা। ঢাকায় আবার ফোন করার সুযোগ থাকলেও লাইন নিরাপদ হবে না ভেবে ঝুঁকিটা রানা নিল না। দেশের রাজনৈতিক নেতারা ঢাকাকে রক্ষার জন্যে কি ব্যবস্থা নিয়েছেন জানতে না পারায় টেনশনে ভুগছে। তবে খুব ভাল করেই জানে যে প্রায় এক কোটি লোককে মাত্র কয়েক ঘন্টার নোটিসে অন্য কোথাও সরিয়ে ফেলা সম্ভব হবে না। তাঁরা সম্ভবত চেষ্টা করবেন মিসাইলটাকে মাঝ আকাশে থামানোর। তবে সেটা ঢাকার আকাশে থামানো হোক বা বঙ্গোপসাগরের মাথায়, ক্ষতির পরিমাণ তাতেও খুব একটা কম হবে না। ওঅরহেড যদি ঢাকার আকাশে বিস্ফোরিত হয়, তেজস্ক্রিয়ায় মারা যাবে কয়েক লাখ মানুষ, ঢাকা সহ আশপাশের বিশাল এলাকার ফসল পুড়ে যাবে, কয়েক বছর খেতে-খামারে আর কোন ফসল ফলবে না, মরে যাবে সমস্ত গাছ-পালা আর জলাশয়ের মাছ, ব্যাপক হারে ক্যান্সার দেখা দেবে, সন্তান সম্ভবা মায়েরা বিকলাঙ্গ শিশুর জন্ম দেবে, সমস্ত জলাশয়ের পানি দূষিত হয়ে পড়বে। আর বঙ্গোপসাগরের ওপর বিস্ফোরিত হলে এলাকার সমস্ত সামুদ্রিক প্রাণী মারা যাবে।

রানা অনুভব করল, ওর ঘাড়ে হাজার টন বোঝা চাপানো হয়েছে। বাস্তব পরিস্থিতি এমনই, যা করার ওকেই করতে হবে। চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়ার প্রয়োজন নেই, সমস্যার একমাত্র সমাধান হলো সারফেসে থাকতেই ক্রুজ মিসাইলটাকে ধ্বংস করা। ওটার কাছাকাছি যে রয়েছে তাকেই এই অসম্ভবকে সম্ভব করতে হবে। অাত্মত্যাগে ভীত নয়, রানা সিদ্ধান্ত নিয়েছে নিজের প্রাণের বিনিময়ে হলেও প্রাণপ্রিয় ঢাকাকে রক্ষা করতে চেষ্টা করবে ও। ঢাকাবাসী ওর একান্ত আপন, অাত্মার আত্মীয়, তাদেরকে রক্ষা করার বিনিময়ে নিজেকে যদি মারা যেতে হয়, সেটা হবে ওর ধারণা, মহা এক গৌরবের বিষয়।

রানা আর লীনা বোটের বো-তে বসেছে, হাল ধরে মাঝি। বসেছে পিছন দিকে। দিনটা আজ অস্বাভাবিক দীর্ঘ ছিল, রানার বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে যে শুরুটা করেছিল জাপানে, বড় একটা অংশ জাকার্তায় কাটিয়েছে, আর এখন সুমাত্রার উপকূলে রয়েছে।

কয়েক মিনিট কোন কথা হলো না, প্রাকৃতিক দৃশ্য উপভোগ করল ওরা। তারপর রানা জিজ্ঞেস করল, তোমার মত একটা মেয়ে সিক্রেট সার্ভিসে কেন এল?

এই মুহুর্তটাই কি আদর্শ উত্তর হতে পারে না? হাসছে লীনা। ঘনিয়ে আসা সন্ধ্যায় রহস্যময় এক পুরুষের সঙ্গে বিপজ্জনক একটা অভিযানে বেরিয়েছি। এ-ধরনের রোমাঞ্চের প্রতি কার না লোভ থাকে, বলো?

লীনার কাঁধে একটা হাত রাখল রানা। দেশ আর শুভশক্তির সেবা করছ, এটা কখনও ভুলবে না।

সন্ধ্যার অন্ধকার ঘনিয়ে আসতে প্রস্তুতি নিতে শুরু করল ওরা। ইচ্ছে করেই ওদের দিকে তাকাচ্ছে না মাঝি, তবে হাবভাব দেখে বোঝা যায় নার্ভাস হয়ে পড়েছে। ইতিমধ্যে রানা আর লীনা ওয়েট স্যুট পরে নিয়েছে। জোডিয়াক ভেলাটায় বাতাস ভরল রানা, নামিয়ে দিল পানিতে। রশির একটা মই বেয়ে ওটায় চড়ল লীনা, তার পিছু নিয়ে রানাও। দুজনেই ওরা হাত নেড়ে মাঝির কাছ থেকে বিদায় নিল। ঘুরে মেইনল্যান্ডের দিকে ফিরে যাচ্ছে জেলে নৌকা। রানা আর লীনাকে নিয়ে জোডিয়াক ভেলা চলেছে রহস্যময় দ্বীপটার দিকে।

অন্ধকার গাঢ় হবার অপেক্ষায় আরও আধ ঘটা দ্বীপটার কাছ থেকে দূরে থাকল ওরা। তারপর আকাশে তারার মেলা বসল। আধখানা চাঁদও আলো ছড়াচ্ছে। দ্বীপটাকে কালো একটা ছায়ার মত লাগল দেখতে। ওটার কিনারায় বিন্দু আকারের বেশ কয়েকটা কৃত্রিম আলো ফুটল।

লীনা ধারণা করল, আলোগুলো সম্ভবত কোন গুহার ভেতর জ্বলছে।

জোডিয়াক সামান্য ঘুরিয়ে ওদিকে এগোল রানা।

গুহার সামনে কি যেন একটা নড়াচড়া করছে, বলল লীনা।

রানা দেখল, ফোটা আকৃতির আলোগুলোর সামনে দিয়ে বড়সড় আকৃতির একটা কাঠামো সরে যাচ্ছে, ছায়ার মত লাগছে দেখতে। আরও কাছাকাছি আসতে ওটাকে এক ধরনের জলযান বলে মনে হলো।

সী ঈল গোপন ঘাটি থেকে বেরিয়ে খোলা সাগরে চলে আসছে।

জোডিয়াককে একটু ঘুরিয়ে নিল রানা, অদৃশ্য বোটটার পথের ওপর থাকতে চায়। কয়েক মুহুর্ত পর ওদের সামনে ওটা খুলতে দেখা গেল। কাঠামোটা যেন কোন সায়েন্স ফিকশন সিনেমার ফিউচারিস্টিক মেশিন, ডিজাইনটা পিচ্ছিল, অত্যাধুনিক টেকনলজির ফসল, ভীতিকর। দুজনের কেউই কথা বলছে না, প্ৰকাণ্ড জলযান জোডিয়াক সহ ওদেরকে গ্রাস করে ফেলছে। সরাসরি সী ঈলের প্ল্যাটফর্মে ঢুকে পড়ল জোডিয়াক, দুই পনটুনের মাঝখানে।

স্টারবোর্ড পনটুনের দিকে একটা গ্রাপলিং হুক ছুড়ল রানা। সঙ্গে রশি আছে, পনটুনের সঙ্গে আটকাতেই বোটটা বেঁধে ফেলল লীনা, তাড়াতাড়ি হুকটা খুলে নিল রানা। প্রায় সেই মুহুর্তেই সী ঈলের স্পীড বেড়ে গেল।

সঠিক সময় মত পৌছেছি আমরা, বলল লীনা। সঙ্গে করে নিয়ে আসা লিমপেট মাইনগুলো বের করে দুভাগ করল সে। এই পরিস্থিতিতে অ্যাকুয়ালাঙ দরকার হবে না।

বিশ মিনিটের ফিউজ, তবে পাচ মিনিটের মধ্যে সরে যেতে পারব আমরা। আমি দ্বিতীয় পনটুনে কাজ করব, বলল রানা। মুখ তুলতে দেখল লীনা হাসছে। হাসির কি হলো?

ভাবছি আমি একটা মেয়ে হয়ে এই কাজ করছি দেখে তুমি অবাক হচ্ছ কিনা, বলল লীনা। তোমার জ্ঞাতার্থে জানাচ্ছি, এরচেয়ে বড় বোটও উড়িয়েছি আমি।

মোটেও অবাক হচ্ছি না, জবাব দিল রানা। আমার দেশের মেয়েদেরকে আমি মুক্তিযুদ্ধে লড়তে দেখেছি।

কোমরে মাইন বেঁধে নিয়ে পানিতে লাফ দিল লীনা, তারপর মাথার ওপর একটা পোল দেখতে পেয়ে খপ করে ধরে ফেলল। পোলে হাত বদল করে এগোল সে, পৌছে গেল। একদিকের পনটুনে।

সী ঈলের ব্রিজে ক্যাপটেনের পাশে দাঁড়িয়ে রেডার ডিসপ্লে দেখছে ফাউলার, এতই নার্ভাস যে কপালের একটা শিরা বারবার লাফাচ্ছে। ওদের পিছনে মেনাচিম, মনিবের হুকুম পাবার অপেক্ষায় এক পায়ে খাড়া।

ক্যাপটেন বলল, আগেই বলেছি, সাউথ চায়না সী থেকে নয়, ভারত মহাসাগরের কোথাও থেকে রওনা হয়ে বঙ্গোপসাগরের দিকে চলে আসছে ব্রিটিশ যুদ্ধ জাহাজ এইচএমএস নরফোক। আর বাংলাদেশী গানবোট আরও আগে রওনা হয়েছে শ্রীলংকা থেকে। গান বোটই আগে পৌঁছুবে, স্যার।

মাথার চুলে আঙুল চালাল ফাউলার। তারমানে মাসুদ রানা চীন আর ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষকে রিপোর্ট পাঠাতে পেরেছে। আমাদের কৌশল ফাস হয়ে গেছে, দুই দেশের মধ্যে আর কোন ভুল বোঝাবুঝির ব্যাপার নেই। ক্যাপটেনকে নির্দেশ দিল, দুদেশের জাহাজগুলোর মাঝখানে পৌঁছুবার চেষ্টা করো। ফুল স্পীড।

সী ঈলের চারধারে ফিট করা ভিডিও ক্যামেরা থেকে সিগনাল আসছে মনিটরে, একজন সিকিউরিটি অফিসার সেদিকে নজর রাখছে। একটানা চব্বিশ ঘণ্টা ধরে সবাই তারা কাজে ব্যস্ত। ফলে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। অফিসার হাত দিয়ে চোখ রগড়াল, আর ঠিক ওই সময় মনিটরের একপাশ থেকে আরেক পাশে সরে গেল রানা, অফিসার দেখতে পেল না। ওদের ভাগ্যই বলতে হবে, জোডিয়াকটা ক্যামেরায় ধরা পড়েনি।

পঁয়তাল্লিশ মিনিট পর বাংলাদেশ আর ব্রিটেনের দুটো জাহাজের মাঝখানে পজিশন নিল সী ঈল।

হাতঘড়ির দিকে তাকাল ফাউলার। সিদ্ধান্ত নিল, এখনই সময়। ঠিক আছে, কাজ শুরু করা যাক। দুদেশের বোট লক্ষ্য করে একটা করে মিসাইল ছোঁড়ো। টার্গেটে যেন না লাগে, তবে কাছাকাছি পড়া চাই।

পনটুনে মাইন বসাতে ব্যস্ত রানা, সেই সঙ্গে ভাবছে বিস্ফোরণ শুরু হয়ে গেলে ওরা পালাবে কিভাবে। জোডিয়াকের গতি খুব বেশি নয়। ফাউলারের ক্রুরা ওদের উপস্থিতি টের পেয়ে গেলে, কিংবা লিমপেট মাইন ফাটতে শুরু করার সময় ওদেরকে যদি পালাতে দেখে ফেলে, পাখি শিকারের মত সহজেই গুলি করে ফেলে দেবে।

কি করা যায় ভাবছে, এই সময় কান ফাটানো আওয়াজে চমকে উঠল ও, মাত্র কয়েক ফুট দূর থেকে গরম আঁচ লাগল মুখে। প্রথম মিসাইল ছোড়া হয়েছে, রাতের অন্ধকার আকাশ চিরে ছুটে যাচ্ছে সেটা। ঘাড় ফিরিয়ে লীনার দিকে তাকাল ও। তার দিকের পনটুন থেকে দ্বিতীয় মিসাইল ছোড়া হলো, সঙ্গে সঙ্গে শিউরে উঠল লীনা। পরস্পরের দিকে তাকাল ওরা কে কি ভাবছে ধরতেও পারল। ব্যাপারটা শুরু হয়ে গেছে। তবে একাধিক মিসাইল নিক্ষেপ খানিকটা স্বস্তিকর, সম্ভবত আতঙ্ক সৃষ্টিই উদ্দেশ্য। ওঅরহেড ফিট করা ক্রুজ মিসাইল ফাউলারের কাছে মাত্র একটাই থাকার কথা। তাছাড়া, ওটা যদি ঢাকায় ফেলতে হয়, বোট আর ঢাকার সঙ্গে দূরত্ব আরও কমিয়ে আনতে হবে ফাউলারকে। আরও সময় দরকার তার।

হাতের কাজ তাড়াতাড়ি শেষ করতে  হবে। মাইনগুলো নিয়ে  সী ঈলের বোর দিকে এগোল লীনা।

দ্রুত হাত চালাল রানা, জানে ফাউলারের মিসাইল যে-কোন মুহুর্তে টার্গেটে পৌছে যাবে। গানবোট হালকা হওয়ায় স্পীড খুব বেশি, মিসাইলটাকে আসতে দেখলে এড়িয়ে যেতে পারবে। আর ব্রিটিশ ফ্রিগেটে আছে হিট-সীকার সারফেস-টু-এয়ার মিসাইল, ফাউলারের মিসাইলকে আকাশেই বাধা দেয়া সম্ভব। তবে গানবোট আর ফ্রিগেট যদি এদিকে পাল্টা মিসাইল ছোড়ে, লীনা আর ওর বেঁচে যাওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ। সে দেখা যাবে, ভেবে স্টারবোর্ড পনটুনের একটা অবলম্বন বেয়ে খানিকটা ওপরে উঠল ও। এমন এক জায়গায় মাইন বসাল, ফাউলারের লোকরা একটু খোঁজ করলেই যাতে দেখতে পায়। এরপর অবলম্বনের আরেক পাশে চলে এল ও, এখানে আরও একটা লিমপেট বসাল। সতর্ক একজন গার্ড প্রথম মাইনটা পেয়ে গেলেই সন্তুষ্ট বোধ করবে, উল্টোদিকে মাত্র কয়েক ইঞ্চি দূরে আরেকটা মাইন আছে এই সন্দেহ তার মনে জাগবে না। পনটুনের নানা জায়গায় মাইন বসানোর কাজ চালিয়ে যাচ্ছে ও, আর একটুর জন্যে ঘুরন্ত ভিডিও ক্যামেরার সামনে পড়ে যাচ্ছিল। সময় থাকতে মাথা নিচু করে সরে এল তাড়াতাড়ি। দ্বিতীয় পনটুনের দিকে তাকাল লীনাকে সতর্ক করার জন্যে। কিন্তু তাকে কোথাও দেখতে পেল না।

এখন আর লীনাকে নিয়ে মাথা ঘামানোর সময় নেই। বিপদ আর পরিণতি সম্পর্কে যথেষ্ট সচেতন সে। হাতের কাজ শেষ করায় মন দিল রানা।

যেমন চেয়েছিলাম, আমাদের মিসাইল টার্গেট মিস করেছে, সী ঈলের ক্যাপটেন রিপোর্ট করল ফাউলারকে। তবে দুটোর একটাও পানিতে পড়েনি, বিস্ফোরিত হয়েছে আকাশে থাকতেই।

এটা দুঃসংবাদ, বিড়বিড় করল ফাউলার। এর মানে হলো, গানবোট আর ফ্রিগেট থেকে সারফেস-টু-এয়ার মিসাইল ছুড়ে আমাদের মিসাইল দুটোকে অকেজো করে দিয়েছে ওরা।

এ-ও পরিষ্কার যে গানবোট আর ফ্রিগেট থেকে যে মিসাইল ছোড়া হয়েছে সেগুলো হিট-সীকার, মি. ফাউলার, বলল খায়রুল।

আমাকে জ্ঞানদান করতে হবে না, আমি জানি, কর্কশ সুরে বলল ফাউলার। কবিরের সঙ্গে কথা বলছে, তাই নিজেকে তার নিয়ন্ত্রণে রাখতে হচ্ছে। তবে মনে হচ্ছে আপনি আরও কি যেন বলতে চান।

হ্যাঁ। এখনও সময় আছে, মি. ফাউলার। শান্ত ও নির্লিপ্ত দেখাচ্ছে কবিরকে। ইচ্ছে করলে সী ঈলকে ঘুরিয়ে নিয়ে কেটে পড়তে পারি আমরা। তবে যে স্পীডে গানবোট আর ফ্রিগেট এগিয়ে আসছে, পালানো খুব সহজ হবে না। সেক্ষেত্রে সর্কেল নিয়ে আমরা তিনজন–আমি, আপনি আর মেনাচিম–কেটে পড়তে পারি। কাকতালীয়ই বলতে হবে, সী ঈলে মাত্র তিনটে সর্কেলই।

আমি আপনাকে কাপুরুষ বলে অপমান করব না, ফাউলার বলল। তবে আর কেউ কথাটা শুনলে কাপুরুষ ছাড়া আর কিছু বলবে না আপনাকে।

আমার দায়িত্ব আপনাকে সৎ পরামর্শ দেয়া, ঠাণ্ডা সুরে বলল কবির। প্লীজ, মি. ফাউলার, ব্যবসা করতে নেমে ব্যক্তিগত শত্রুতাকে গুরুত্ব দেবেন না। মাসুদ রানাকে আপনি চেনেন না। বিসিআই সম্পর্কে আপনার কোন ধারণা নেই। জানি, বললে আপনি বিশ্বাস করবেন না, মাসুদ রানা একাই অন্তত বিশবার তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ ঠেকিয়েছে, বাধতে দেয়নি। আপনার কথা জানি না, তবে আমি খোদায় বিশ্বাস করি। আমার ধারণা, খোদার বিশেষ কৃপা আছে ওই ছোকরার ওপর–আমি বলতে চাইছি, খোদা ওকে দিয়ে নিজের বিশেষ বিশেষ কিছু কাজ করিয়ে নেন। কাজেই ওর বিরুদ্ধে লাগা মানে খোদার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা।

আপনি আসলে গুলিয়ে ফেলছেন, হেসে উঠে বলল ফাউলার। ঈশ্বরের প্রতিনিধিত্ব করছি আমি, মাসুদ রানা নয়। বললে আপনিও বিশ্বাস করবেন না যে একটা স্বপ্নের মাধ্যমে দুনিয়ার সবচেয়ে ক্ষমতাবান মানুষ হবার প্রেরণা যোগানো হয়েছে আমাকে। সেই স্বপ্নে উৎসাহদাতা ছিলেন কয়েকজন দেবদূত। আর দেবদূতরা যে ঈশ্বরের প্রতিনিধিত্ব করেন, এ-কথা কে না জানে। ওই স্বপ্নেই আমাকে বলা হয়েছে, শত্রুপক্ষ যত শক্তিশালীই হোক, কেউ তারা আমার সামনে দাঁড়াতে পারবে না। তর্ক-বিতর্ক অনেক হয়েছে, এবার অ্যাকশন শুরু….মর তোরা, জাহান্নামে যা, নরকে পচ…

সবাই স্থির হয়ে গেল, হতভম্ব। কারও কোন ধারণা নেই ফাউলার কেন উত্তেজিত হলো।

তোদেরকে আমি বেতন দিই কেন? সিকিউরিটি কনসোলের দিকে ছুটে গেল ফাউলার। ওখানে বসা একজন অপারেটরের চুল খামচে ধরে মাথাটা একটা মনিটরের দিকে ঘোরাল। যে ক্যামেরা পোর্টসাইড পন্টুন এরিয়া কাভার করছে তার ছবি ফুটে রয়েছে মনিটরে। কিন্তু মনিটরের স্ক্রীনে বিশেষ কিছু নেই, কাজেই কনসোল অপারেটর বিহবল দৃষ্টিতে ফাউলারের দিকে তাকাল।

ক্যামেরা অন্য দিকে ঘুরে গেছে, গাধার বাচ্চা হুঙ্কার ছাড়ল ফাউলার। ম্যানুয়ালে দে, ফিরিয়ে আন আগের জায়গায়!

আড়ষ্ট ভঙ্গিতে, কারণ এখনও ফাউলার তার চুল ধরে আছে, আগের জায়গায় ক্যামেরাটা ফিরিয়ে আনল অপারেটর। এবার স্ক্রীনে লীনাকে দেখা গেল। যদিও লীনা ব্যাপারটা সম্পর্কে সচেতন।

মনিটর থেকে চোখ ফিরিয়ে মেনাচিমের দিকে তাকাল ফাউলার। এই শালা বানচোতকে উচিত শিক্ষা দাও!।অপারেটরের মাথা ছেড়ে দিল সে, হাতে তার চুল রয়ে গেল।

এগিয়ে এসে অপারেটরের ঘাড়ে কারাতে কোপ মারল মেনাচিম। মট করে একটা আওয়াজ হলো।

মেয়েটা এখানে, তারমানে মাসুদ রানাও এখানে, বলল ফাউলার। মেনাচিম, ধরো ওদেরকে। ধরো, তারপর খুন করো।

হুকুম শুনেই ছুটল মেনাচিম। লাশটার দিকে তাকিয়ে একজন গার্ডকে ফাউলার বলল, জঞ্জালটাকে পানিতে ফেলে দাও। ঘুরে নিজের প্রাইভেট কোয়ার্টারে চলে গেল সে।

পোর্টসাইড পনটুনে শেষ মাইনটা বসিয়ে হাতের কাজ শেষ করল লীনা। এখন রানাকে খুঁজে নিয়ে সী ঈল থেকে দূরে সরে যেতে হবে। কুণ্ডলী পাকিয়ে ছিল শরীরটা, সিধে করল, আর ঠিক তখনই ব্যাঙ যত দ্রুত জিভ বের করে পোকা ধরে, সেই একই ক্ষিপ্রতার সঙ্গে তার পিঠে ছোবল মারল মেনাচিম, হ্যাচের ভেতর টেনে নিয়ে তুলে ফেলল সী ঈলে। চার নম্বর লেখা একটা অ্যাকসেস এরিয়ায় রয়েছে ওরা। মই আর হ্যাচ ছাড়া আর কিছু নেই এখানে। লীনার কোমর পেঁচিয়ে ধরেছে মেনাচিম, বুনো বিড়ালের মত ধস্তাধস্তি করছে মেয়েটা। চারজন গার্ডকে নির্দেশ দিল মেনাচিম, তাদের প্রত্যেকের কাছে একটা করে এমপিফাইভকে সাব-মেশিন গান।

হ্যাচ গলে বেরিয়ে যাও, লোকগুলোকে হুকুম করল মেনাচিম। দেখামাত্র গুলি করবে। সাবধান, ব্যাটা খুব ধুরন্ধর। আরও লোক পাঠাচ্ছি, তারা মাইনগুলো খুঁজতে তোমাদেরকে সাহায্য করবে।

মেনাচিমকে স্যালুট করে হ্যাচ গলে বেরিয়ে গেল তারা।

লীনাকে নিয়ে মই বেয়ে ওপরে উঠছে মেনাচিম। তার আশা বস যেহেতু কথা দিয়েছেন, মেয়েটাকে অবশ্যই তার হাতে তুলে দেয়া হবে।

সী ঈলের বাইরে, স্টারবোর্ড পনটুনের একটা অবলম্বন ঘুরে খোলা জায়গায় বেরিয়ে আসছে রানা, একটুর জন্যে একজন গার্ডের সঙ্গে ধাক্কা খেলো না। ওর মত গার্ডও চমকে উঠেছে। হাতের অস্ত্রটা তুলল সে, কিন্তু তার আগেই বিদ্যুৎ খেলে গেছে রানার হাতে। সাইলেন্সার লাগানো পিস্তলটা গার্ডের মাথায় সবেগে নেমে এল, জ্ঞান হারিয়ে পানিতে পড়ল সে, সঙ্গে সঙ্গে তলিয়ে গেল।

পিছিয়ে একটা খোপের ভেতর ঢুকে পড়ল রানা, সাব-মেশিনগান থেকে বিস্ফোরিত এক পশলা বুলেট পাশ কাটাল ওকে। অজ্ঞান গার্ডের পিছনে দ্বিতীয় একজন ছিল। চোখের কোণ দিয়ে আরও দুজনকে দেখতে পেল রানা, দ্বিতীয় পনটুন থেকে ওর দিকে অস্ত্ৰ তাক করছে। হাত লম্বা করে পরপর দুটো গুলি করল ও, কোন শব্দ হলো না। দুজন গার্ডই ঝাকি খেয়ে পড়ে গেল পানিতে, ডুবে গেল অতল গভীরে। বিরতি না নিয়ে ঘুরল রানা, ততীয় গুলিটা করল অপর গার্ডের গলায়। নিজের গলা চেপে ধরে সে-ও তলিয়ে গেল। ডাইভ দিয়ে আরেকটা খোপে ঢুকল।রানা, সেই মুহুর্তে ওর সামনের একটা হ্যাচ খুলে যেতে দেখল। সঙ্গে সঙ্গে লাফ দিল, পুরোপুরি খোলার পর ওটার ঠিক পিছনে থাকতে চায়।

হ্যাচটা থেকে তিনজন গার্ড বেরিয়ে এল। একজন ওখানেই স্থির হয়ে থাকল, বাকি দুজন রানাকে খুঁজতে চলে গেল। নিঃসঙ্গ গার্ড ঘাড়ের পিছনে পিস্তলের মাজল অনুভব করল। অপর হাতে নিজের শোল্ডার প্যাক খুলে লোকটাকে পরিয়ে দিল রানা, তারপর প্রচণ্ড এক ধাক্কা মারল পিঠে। আওয়াজ শুনে লোকটার বাকি দুজন সঙ্গী ঝট করে ঘাড় ফেরাতেই পিঠে প্যাক সহ কালো শার্ট পরা কাঠামোটাকে দেখে রানা বলে মনে করল। মুহুর্ত মাত্র ইস্ততত না করে গুলি করল তারা। গার্ডের শরীর রূপাৎ করে পড়ল পানিতে, সে রানা নয় তা কেউ বুঝতে পারার আগেই ডুবে গেল।

হ্যাচের ভেতর লুকিয়ে পড়ল রানা, এটা টু লেখা অ্যাকসেস এরিয়া। ঢাকনি বন্ধ  করে মই বেয়ে উঠে আসছে ও। প্রায় নিশ্চিতভাবে জানে, লীনাকে ওরা ধরে নিয়ে গেছে।

নিজের প্রাইভেট কোয়ার্টারে, ডেস্কে বসে আছে ম্যাডক ফাউলার। ব্রিজ থেকে একটা প্যাচানো সিড়ি উঠে এসেছে এই কামরায়। সারি সারি ভিডিও মনিটর দিয়ে সাজানো দেয়ালের দিকে মুখ করে  বসেছে সে, ব্রিজের বিভিন্ন স্তরে সাজানো ভিউস্ক্রীনে যা দেখা যাচ্ছে এখানকার মনিটরগুলোতে তারই প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠছে। প্রাইভেট কোয়ার্টারে অতিরিক্ত আরও কয়েকটা মনিটর রয়েছে, সেগুলোয় তার মিডিয়া সাম্রাজ্যের বিভিন্ন মাধ্যম থেকে খবরের শিরোনাম ফুটছে। তার পাশেই বসে রয়েছে টেকনোটেরোরিস্ট খায়রুল কবির, নার্ভাস ভঙ্গিতে ফ্রেঞ্চকাট  দাড়ি ধরে অনবরত মোচড়াচ্ছে। ফাউলারও তার চোয়াল ডলছে। ব্যথাটা বড় বেশি ভোগাচ্ছে তাকে।

ইন্টারকম বেজে উঠল। রিসিভার তুলে কানে ঠেকাল ফাউলার। রানা মারা গেছে, লাশটা তলিয়ে গেছে সাগরে, শুনে কর্কশ স্বরে প্রশ্ন করল, কোনও সন্দেহ নেই তো? গুড। এবার মাইনগুলো খুঁজে বের করো। মেনাচিম কোথায়?

মেনাচিমকে দেখা গেল প্যাচানো সিড়ি বেয়ে ব্রিজ থেকে উঠে আসছে, তার বাহু বন্ধনের ভেতর এখনও হাত-পা ছুড়ছে লীনা।

কেউ শুনতে পেল না, কবির বিড়বিড় করল, ধিক, মেনাচিম! সম্ভবত উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত বলেই নারী নির্যাতনের ঘোর বিরোধী সে।

ইন্টারকম বন্ধ করে দিল ফাউলার। চেহারায় করণ আবেদন.বা আবদারের ভঙ্গি, তার দিকে এগিয়ে এল মেনাচিম। স্যার, আপনি আমার মা-বাপ। আপনি যা বলবেন আমি তাই করব। খুব ভাল করেই জানি, এই ডাইনীটাকে আপনি মেরে ফেলতে বলবেন। কিন্তু আমার একটা আর্জি আছে, স্যার। আপনিই বলেছিলেন, ধরতে পারলে একে আমার হাতে তুলে দেয়া হবে। কথা দিচ্ছি, ও কোন ঝামেলা করার সুযোগই পাবে না…

ঝামেলা কাকে বলে টের পাবি, বেজন্মা কুত্তা…. মেনাচিমের মুখে এক দলা থুথু ফেলল লীনা। ভাজ করা হাঁটু দিয়ে মেনাচিমের উরুসন্ধিতে প্রচণ্ড একটা গুতো মারল সে। ফাউলার ও কবির শিউরে উঠল, কিন্তু মেনাচিমের কোন প্রতিক্রিয়াই হলো না।

বরং হাসতে হাসতে বলল, এরকম সুড়সুড়ি দিলে আমি আরও উত্তেজিত হয়ে পড়ি। তারপর পটকা ফাটার মত আওয়াজ হলো একটা। লীনাকে চড় মেরেছে সে। জ্ঞান হারিয়ে নেতিয়ে পড়ল লীনা। মেনাচিম ছেড়ে দিতে ঢলে পড়ল মেঝেতে। স্যার, বলল মেনাচিম। প্লীজ, পুরো দৃশ্যটা ভিডিওতে ধরে রাখব আমি, কথা দিচ্ছি।

ঠিক আছে, বলল ফাউলার। তুমি ওকে পেলে, ডিক।

ধিক! ধিক! ফিসফিস করল কবির।

একটা বোতামে চাপ দিল ফাউলার, কামরায় তিনজন গার্ড ঢুকল। নির্দেশ দিল, মেয়েটাকে লোহার শিকল দিয়ে বেঁধে ডিকের কামরায় রেখে এসো।

জয় হোক আপনার। আপনার জয় হোক! কৃতজ্ঞতায় মেনাচিমের চোখ জোড়া আধবোজা হয়ে এল।

তবে, প্রথমে মাইনগুলো সরাতে হবে, জেদের সুরে বলল ফাউলার।

ইয়েস, স্যার!

গার্ডদের হাতে লীনাকে তুলে দিয়ে সিঁড়ি বেয়ে দ্রুত নেমে গেল মেনাচিম। মেঝেতে নড়েচড়ে উঠল লীনা, গার্ডরা ঝট করে তার দিকে সাব-মেশিনগান তাক করল।

এ-ধরনের নোংরা আবদার রক্ষা করা ব্যবসায়িক স্বার্থের জন্যে ক্ষতিকর, মন্তব্য করল কবির। বলা উচিত নয়, আবার না বলেও পারছি না, আপনাকে চিনতে খানিকটা ভুল হয়েছে আমার। আপনি পুরোপুরি ব্যবসায়ী নন।

শত্রু নিধনকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিই আমি, গভীর সুরে বলল ফাউলার। ঢাকার অস্তিত্ব বিলীন করে দিয়ে আমি আমার সমস্ত শক্রর সামনে একটা দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে চাই। আমার সঙ্গে লাগতে এলে কি পরিণতি হতে পারে, এ থেকে তারা একটা আভাস পাবে। তারপর দেখবেন কেমন ব্যবসায়ী আমি। আর মেমাচিমের কথা যদি বলেন, কাজের লোককে পুরস্কৃত করতে ভালবাসি আমি। আপনিও কাজের লোক। সময় হক, আপনাকেও আমি সন্তুষ্ট করব।

 

কথা না বলে হাত তুলে কপালটা টিপে ধরল কবির।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *