০৯. প্রলাপ বকছে টম হার্শ

প্রলাপ বকছে টম হার্শ, জীবন সায়াহ্নে পৌঁছে গেছে সে। সবাই জানে কী ঘটতে যাচ্ছে, এমনকী অ্যাপাচিরাও জেনে গেছে। মাঝে মধ্যে যন্ত্রণায় চিৎকার করছে হার্শ, তপ্ত নিস্তরঙ্গ বাতাসে বড় করুণ আর তীক্ষ্ণ শোনাচ্ছে চিৎকারটা। হার্শের শিয়রে বসে আছে মিমি, কপালে জলপট্টি লাগিয়েছে, কিছুক্ষণ পর পর জ্বরে পুড়তে থাকা মুখ মুছে দিচ্ছে

অস্থিরভাবে পায়চারি করছে বেন ডেভিস। কোটের কিনারা সরে গেছে একপাশে, জামার আস্তিন গুটিয়ে ফেলেছে। হোলস্টারে রাখা পিস্তলটা চোখে পড়ছে এখন, চিন্তিত দৃষ্টিতে তাকে দেখল এরিক ক্ৰেবেট। পিস্তলের চকচকে বাঁট দেখে বোঝা যাচ্ছে বহুল ব্যবহৃত। উদ্ৰান্ত দেখাচ্ছে ডেভিসের ক্ষৌরিহীন মুখ, আচরণে অস্থিরতা প্রকাশ পাচ্ছে যা আগে কখনও দেখা যায়নি।

প্রচণ্ড উত্তাপ, উদ্বিগ্ন অপেক্ষা, হামলার আশঙ্কা এবং মুমূর্ষ টম হার্শের চিৎকার…সবই চাপ সৃষ্টি করছে ওদের মনে। মাথার উপর আগেরটার সঙ্গে যোগ দিয়েছে আরেকটা শকুন…নিতান্ত আলসেমি কিন্তু অসীম ধৈর্য নিয়ে বড়সড় চক্কর কাটছে। এদিকে কিছুই ঘটছে না।

হঠাৎ এরিকের মুখোমুখি হলো ডেভিস। বেরিয়ে যাওয়া ছাড়া উপায় নেই! চেঁচিয়ে বলল সে। এখানে আর একটা মুহূর্তও থাকা যাবে না!

দুঃখিত, একমত হতে পারলাম না।

জ্বলন্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকল সে, তারপর ঘুরে দাঁড়াল, রাগে আড়ষ্ট হয়ে গেছে পিঠ-পিছন থেকে দেখতে পেল এরিক

আগুনের ধারে ওর পাশে এসে দাঁড়াল মেলানি। এরিক, খাবার কিন্তু প্রায় শেষ হয়ে গেছে, জানাল মেয়েটি।

সম্বোধনটা শুনে রীতিমত বিমূঢ় বোধ করল এরিক। চমক সামলে নিয়ে জানতে চাইল: কতটুকু আছে, বলো তো?

আজকের জন্য যথেষ্ট, কিন্তু কালকে সবার হবে না।

এ-নিয়ে আগেই ভাবা উচিত ছিল। কারও সঙ্গেই যথেষ্ট খাবার ছিল না, এবং খাচ্ছে কম করে, যাতে যত বেশিদিন সম্ভব চলে। ইতোমধ্যে যে ফুরিয়ে যায়নি, সেটাই বিস্ময়ের ব্যাপার; এর কারণ: অন্য সব বিষয়ে এতটা ব্যস্ততার মধ্যে কাটছে যে খাওয়ার ব্যাপারে মনোযোগ দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছে না কেউ। সামান্য কিছু মুখে দিয়েই। সন্তুষ্ট সবাই।

সারাক্ষণ পাহারা না দিয়ে উপায় নেই, খাবার যোগাড় করার চেয়েও ঢের জরুরি কাজ এটা। অ্যারোয়োতে ওঁদের অবস্থান যত সুদৃঢ়ই হোক, মুখ্য ব্যাপার হচ্ছে সচেতনতা; অ্যারোয়ের কিনারে মাত্র একজন অ্যাপাচি পৌঁছতে সক্ষম হলে উল্টে যাবে পরিস্থিতি।

তখন হয়তো…এখান থেকে চলে যাওয়ার চেষ্টা করতে পারে।

তবে এই জায়গা ছেড়ে চলে গেলে, খোলা মরুভূমিতে টিকে থাকার সম্ভাবনা যে কত কম, ভাল করেই জানে এরিক। মিচেল, চিডল বা সার্জেন্ট হ্যালিগানও জানে। অন্যরা কতটা উপলব্ধি করেছে সঠিক জানা নেই ওর, কেবল অনুমানই করতে পারে, তবে ডেভিস, ডুগান আর কেলার চলে যাওয়ার পক্ষপাতী। কিন্তু ভোলা মরুভূমিতে, যেখানে সবার জন্য একটা করে ঘোড়া থাকবে না, অ্যাপাচিদের জন্য স্রেফ সহজ শিকারে পরিণত হবে ওরা। সেক্ষেত্রে, স্রেফ লেগে থাকলেই হবে, দূর থেকে গুলি করে ওদের ঘায়েল করে ফেলতে পারবে ইন্ডিয়ানরা।

উঁহু, তারচেয়ে এখানে থাকা ঢের নিরাপদ।

চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিলেও মনে মনে বিকল্প ভাবছে এরিক, আশায় আছে হয়তো একটা সুযোগ আসবে, নিরাপদে এখান থেকে বেরিয়ে যেতে সক্ষম হবে ওরা।

দক্ষিণে যাবে? কতদূর যাবে? বহু মাইলের মধ্যে কোন বসতি নেই, দুস্তর মরুভূমি আর রুক্ষ প্রান্তর, সবশেষে রয়েছে পরিত্যক্ত বালিময় উত্তপ্ত সাগরতীর, পানির উৎস আছে কি-না জানা নেই ওদের, ক্ষীণ আশা নিয়ে থাকতে হবে যে, দক্ষিণ থেকে আসা জেলে-বোট বা কলোরাডোর উদ্দেশে যাত্রা করা কোন স্টীমারের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারবে।

তো, কী করব আমরা এখন? ত্যক্ত স্বরে জানতে চাইল জেফ কেলার। এখানে থেকে অনাহারে কাটাব, নাকি শেষ চেষ্টা হিসাবে প্রাণপণে ছুটব?

আগুনের ধারে বসে ছিল বেন ডেভিস, প্রশ্নটা শুনে চোখ তুলে এরিকের দিকে তাকাল, মুখ নির্বিকার। হ্যাঁ, বলো, নেতা হিসাবে তোমারই কর্তব্য বাতলে দেওয়া উচিত, ক্ষীণ উপহাস ঝরে পড়ল তার কণ্ঠে। আমরা জানতে চাই আসলে কী করতে চাইছ তুমি।

গাঁট হয়ে বসে থাকব এখানে।

নিকুচি করি! ঝট করে উঠে দাঁড়াল ডুগান। মাথা খারাপ হয়ে গেছে নাকি তোমার? এখানে থাকলে স্রেফ ভুখায় মারা যাব, নইলে একেকবারে একজন করে শেষ হয়ে যাব। হার্শের মত হবে আমাদের দশা! উঁহু, এখানে থাকার খায়েশ নেই আমার। মরুভূমিতে নেমে ঝড়ের বেগে ঘোড়া ছোটানোর পক্ষে আমি!

মেয়েরাও কি তোমার মত ছুটবে? মৃদু স্বরে জানতে চাইল এরিক।

দৃষ্টি সরে গেল ডুগানের, রাগে জ্বলছে চোখজোড়া, নিজের ধারণা থেকে সরে আসতে নারাজ। আবারও বলছি, হাতে জান নিয়ে ছোটা উচিত আমাদের।

খোলা জায়গায় টিকে থাকার কতটা সম্ভাবনা আছে আমাদের? এরিকের প্রশ্ন। আমার মতে সামান্য সম্ভাবনাও নেই। তা ছাড়া, সঙ্গে ঠিক কতটুকু পানি নিয়ে যেতে পারবে?

যে-কোন সময়ে ছোটার জন্য তৈরি আছি আমি, বলল টিমথি ব্লট। আমার তো মনে হয় দশ-বারোজনের বেশি হবে না অ্যাপাচিরা।

যতজনই থাকুক, দৃঢ় স্বরে বলল এরিক। এখানেই থাকছি আমরা।

এত খায়েশ যখন তুমি থাকো! কুৎসিত শোনাল কেলারের কণ্ঠ। আমি চলে যাচ্ছি, এবং এখনই!

আমিও যাব! ঘোষণা করল ব্লট।

বেশ, যেতে চাইলে যাবে, কিন্তু কোন ঘোড়া পাবে না। পায়ে হাঁটতে হবে তোমাদের, সোজাসাপ্টা জানিয়ে দিল এরিক।

ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াল জেফ কেলার। ঠাণ্ডা হিসাবী চাহনিতে মাপল এরিককে। শুনে নাও ভাল করে, এখান থেকে চলে যাব আমি, মৃদু স্বরে বলল সে। এবং জেব্রা ডানটায় চড়ব।

কনুই পিছনে ঠেলে দিয়ে শরীরের ভার চাপাল ডেভিস, আধশোয়া হয়ে বসেছে, পা মেলে দেওয়া। মৃদু হাসি খেলা করছে ঠোঁটের কোণে, ব্যঙ্গাত্মক; চাহনিতে আগ্রহ। দারুণ মজা পাচ্ছে সে, আশা করছে বিশালদেহী সৈনিকের হাতে নাকাল হবে এরিক।

হ্যালিগান, মিচেল বা চিডল, কেউই ধারে-কাছে নেই। হয় পাহারায় আছে, নয়তো ঘুমাচ্ছে। পাথুরে চাতালের উপরে আছে ড্যান কোয়ান। যারা আছে, মেয়েদের বাদ দিলে, এরিকের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে সবাই।

শোডাউন চাইছে কেলার…দিব্যি টের পাচ্ছে এরিক। কেলার কেন, কাউকেই খুন করতে চায় না, কিন্তু নাচার ও। এগিয়ে আসছে নরকে

বিশালদেহী সৈনিক, খানিক পাশে সরে গেল টিমথি ব্লট।

চট করে এক পা পিছিয়ে গেল এরিক, সিক্সশূটারের বাঁটে চলে গেছে হাত। সময় থাকতে পিছিয়ে যাও, শীতল সুরে বলল ও। তোমাদের কাউকেই খুন করতে চাই না আমি। সত্যি কথা হচ্ছে, দু’জনকেই দরকার হবে আমাদের।

কিন্তু তোমাকে দরকার নেই আমাদের! খরখরে স্বরে হাসল কেলার { খুন করবে কি, ড্র করার সুযোগই পাবে না।

ঠিকই বলেছ, সায় জানাল ডেভিস। মরতে চাইলে পিস্তল ড্র করতে পারে:ও।

নাজুক, অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতি ডেভিসের হাতে পিস্তল দেখে, জমে গেল এরিক। ওর বুক বরাবর নিশানা করেছে সাবেক কর্নেল।

বেন! চিৎকার করল মেলানি। না!

ওরা তো বেঠিক কিছু বলেনি, মেলানি, সাফাই গাইল ডেভিস। এখান থেকে চলে যেতে হবে আমাদের। শুধু তা হলেই যদি প্রাণ রক্ষা হয়। ওর পিস্তলটা তুলে নাও, কেলার।

ওই কাজটা করতে যেয়ো না, বিগম্যান, মেয়েলি একটা কণ্ঠ শুনে জায়গায় জমে গেল সবাই।

বিগ জুলিয়ার শটগানটা দেখা যাচ্ছে মিমি রজার্সের হাতে, অস্ত্র ধরার ভঙ্গি অনায়াস, অভ্যস্ত লোকের যাত। নলটা স্থির হয়ে আছে বেন ডেভিসের পেট বরাবর, দূরত্বটা মাত্র ত্রিশ ফুট।

পিস্তল ফেলে দাও, মি. ডেভিস, এখনই। সামান্য নড়েছ কি তোমাকে দুই টুকরো করে ফেলব; তীক্ষ্ণ স্বরে জানিয়ে দিল মিমি। দ্বিতীয় ব্যারেলটা খালি করব ওর উপর। মাথা ঝাঁকিয়ে জেফ কেলারের দিকে ইঙ্গিত করল ও। গুলি করব কি-না, যদি সামান্য সন্দেহও থাকে তোমার মনে, আমি দুই গোনা পর্যন্ত হাতে ধরে রাখো পিস্তলটা। এক, দু…

পিছিয়ে গেল ডেভিস, মুখ গম্ভীর হয়ে গেছে। পিস্তল ফেলে দিয়ে এরিকের দিকে ফিরল, চোখে বিদ্বেষ। ভুলেও ঘুমিয়ো না, ক্ৰেবেট, পস্তাবে তা হলে। ঘুমিয়েছ কি তোমাকে খুন করে ফেলব আমি!

ও যখন ঘুমাবে, মৃদু স্বরে বলল মিমি। আমি তখন জেগে থাকব, মিস্টার।

*

তিন বিদ্রোহী চলে যাওয়ার পর মিমি রজার্সের দিকে ফিরল এরিক। ‘ধন্যবাদ,’ সংক্ষেপে কৃতজ্ঞতা জানাল ও

ওর দিকে ফিরল মেয়েটি। কেউ যদি এখান থেকে আমাদের বের করে নিয়ে যেতে পারে, সেই লোকটি হচ্ছে তুমি।

পুরো ঘটনাই দেখেছে মেলানি। আগুনের কাছে ফিরে যাচ্ছে মিমি, সাগ্রহে দেখল মেয়েটিকে। শেষে এরিকের দিকে ফিরল। তোমার কথার অর্থ বুঝতে পেরেছি এখন, আন্তরিক স্বরে বলল ও। হ্যাঁ, যোগ্য ও, অদৃশ্য একটা শক্তি আছে ওর মধ্যে। সামান্য দ্বিধার পর জানতে চাইল, কী মনে হয় তোমার, সত্যি কি বেনকে গুলি করত ও?

গম্ভীর মুখে নড় করল এরিক। যা বলেছে, ঠিক তাই করত ও। আসল কথা হচ্ছে, ডেভিসও সেটা বুঝতে পেরেছিল। ট্রিগারে চেপে বসেছিল মিমির আঙুল, দেখেই ঝুঁকি নেয়নি সে।

বুঝতে পারছি না, ভুরু কুঁচকে বলল মেলানি। হয়েছেটা কী বেনের?

অ্যারোয়োর কিনারা বরাবর দৃষ্টি চালাল এরিক। হয়তো ক্লান্ত হয়ে পড়েছে, শুকনো সুরে সম্ভাবনা বাতলাল ও। এমন দুঃসময়ে বহু লোকই নিজেকে চিনতে শেখে।

সাদা ইস্পাতের মত তপ্ত আকাশে ঝলসাচ্ছে সূর্য। চারপাশে লাভা এত উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে যে ছুঁলেই হাতে ফোস্কা পড়ে যাবে। সব ঘোড়াকে পানি খাওয়াল ওরা, তারপর নীচের অ্যারোয়োর অপ্রশস্ত ছায়ায় নিয়ে এল। পুরো সময়টায়, মরুভূমিতে কোন নড়াচড়া চোখে পড়ল না, অ্যাপাচিদের উপস্থিতির কোন নমুনাই নেই-এক ফোঁটা বাতাস নেই, কোয়েলের ডাক নেই, নিঃসীম নীরবতার মধ্যে নুড়িপাথর গড়ানোর সামান্য শব্দও হলো না। তৃষ্ণার্ত আকাশ তেষ্টা মিটাচ্ছে কূপের পানি থেকে, নীচে সন্ত্রস্ত মানুষগুলোও তৃষ্ণা নিবারণ করছে। একটু একটু করে কমে যাচ্ছে বহু মূল্যবান পানি।

*

পড়ন্ত বিকাল। এক জায়গায় বসে শূন্য মরুভূমিতে চোখ রাখতে রাখতে ক্লান্ত ও অধৈর্য হয়ে পড়েছে টিমথি ব্লট। এখন পর্যন্ত কিছুই ঘটেনি! তূপীকৃত পাথর আর ঝোঁপের আড়াল থেকে মাথা বের করে উঁকি দিল সে। সঙ্গে সঙ্গে গর্জে উঠল একটা রাইফেল। অখণ্ড নীরবতার মধ্যে তীক্ষ্ণ শোনাল শব্দটা, তারপর প্রতিধ্বনি তুলে অসীম শূন্যতায় হারিয়ে গেল। সামনের দিকে হুমড়ি খেল তরুণ সৈনিক, পাথরে কয়েক গড়ান খেল তার দে, আট ফুট নীচে চ্যাপ্টা একটা পাথরের উপর পড়ল। স্থির পড়ে থাকল।

ছুটে তার কাছে চলে গেল ওরা। প্রথমে মেলানি, তারপর বিগ জুলিয়া আর এরিক। মুখ তুলে তাকাল জুলিয়া। মারাত্মক নয় জখমটা, স্রেফ ছুঁয়ে গেছে বুলেট। সুস্থ হয়ে যাবে ও।

অ্যারোয়োয় নেমে এল এরিক। ছায়ায় বিশ্রাম নিচ্ছে মিচেল। চ্যাপ্টা একটা পাথরের উপর উপুড় হয়ে পড়ে আছে চিডল, একচুলও নড়ছে না। তার পাশে এসে গোড়ালির উপর ভর দিয়ে বসল এরিক। কী মনে হয় তোমার? ক’জন আছে ওরা?

শ্রাগ করল টনি চিডল। সম্ভবত বিশজন…তবে বেশিও হতে পারে। যদূর জানি লোকবল যথেষ্ট না হলে হামলা করে না চুরুতি।

খাবার দরকার আমাদের। ভাবছি রাতে চেষ্টা চালাব।

খুন হয়ে যাবে।

উঁহু, আঙুল তুলে একটা স্মোক-ট্রির গোড়ার কাছাকাছি আলগা ঝোঁপ দেখাল এরিক। অ্যারোয়ের তলা দিয়ে যাব আমি, তুমি ছাড়া আর কেউ জানবে না। ইন্ডিয়ানদের মত নিঃশব্দে চলতে জানি। ফিল্ডগ্লাস দিয়ে দক্ষিণের পাহাড়ে কয়েকটা ভেড়া দেখলাম। তেষ্টা মেটাতে এসেছিল ওরা, আমাদের দেখে নিরাশ হয়েছে, আমাদের চলে যাওয়ার অপেক্ষায় ছিল অনেকক্ষণ চেষ্টা করলে হয়তো দু’একটাকে খুঁজে বের করতে পারব।

গুলির শব্দ শুনতে পাবে অ্যাপাচিরা।

তীর-ধনুক ব্যবহার করব। চেয়ানিদের সঙ্গে থাকার সময় বহুবার তীর-ধনুক ব্যবহার করেছি।

আমিই যাই। তোমার চেয়ে আমার সফল হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।

পারবে তুমি, কিন্তু আমিই যাব। আমাকে না দেখে হয়তো আলাপ-আলোচনা শুরু কররে ওরা। কোথায় গেছি, সেটা যেন জানতে পারে, কেউ, বুঝেছ?

খাবার সংগ্রহ করা জরুরি হয়ে পড়েছে। কয়েকটা দিন যদি টিকে থাকতে পারে, হয়তো এটাই নিয়ামক হয়ে দাঁড়াবে। এতক্ষণে নিশ্চই সন্দেহ করতে শুরু করেছে ইয়োমার লোকজন বা সৈন্যরা। শেরিফের পাসি ফিরে যায়নি, আরেক দলকে প্রথম দলের খোঁজে পাঠানোর কথাবার্তা চলছে নিশ্চই। সেটাই স্বাভাবিক।

একই সময়ে সৈন্যদের উধাও হয়ে যাওয়ার ঘটনা সতর্ক করে তুলবে ইয়োমার লোকদের, ধরে নেবে এর জন্য ইন্ডিয়ান হামলাই দায়ী। পুব দিক থেকে কেউ আসছে না, এ-থেকে আসল ঘটনা অনুমান করে নেবে তারা। আরেকটা দল পাঠানোর মত যথেষ্ট সৈন্য নেই ফোর্টে, কিন্তু সাধারণ নাগরিকদের দলে অন্তর্ভুক্ত করলে সম্ভব হতে পারে।

ইন্ডিয়ানদের যদি আটকে রাখতে পারে, বাঁচার সম্ভাবনা বেড়ে যাবে ওদের। এখন পর্যন্ত, লড়াইয়ের ফলাফল ওদের পক্ষেই আছে। হার্শ মারা যাচ্ছে–একেবারে চুপ হয়ে গেছে এখন–এছাড়া, সন্তোষজনক বলা চলে পরিস্থিতি। যারা আছে, সবাই একাট্টা থাকলে হয়তো ঠেকিয়ে রাখতে পারবে অ্যাপাচিদের। অবস্থানটা দারুণ ওদের। পানি কমে গেলেও, যা আছে তাতে এমনকী প্রচণ্ড গরম থাকলেও আরও কয়েকদিন চলে যাবে। তাপমাত্রা একশো ডিগ্রিরও বেশি, কিন্তু খাবার থাকলে টিকে থাকতে সমস্যা হওয়ার কথা নয়।

পাহাড়ী ভেড়াগুলো মানুষের ব্যাপারে অসচেতন হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। ওগুলোর মাংসও খুব সুস্বাদু। বিগহর্ন জাতের, উত্তরাঞ্চলের স্বজাতি থেকে একটু ভিন্ন। বেশ কয়েকবারই রীজের কিনারা থেকে নীচের কূপে নজর রেখেছিল পশুগুলো, দেখেছে এরিক, হয়তো এখনও ওখানেই আছে ওরা

প্রমাণ সাইজের একটা ভেড়া যদি শিকার করতে পারে, দিব্যি এক সপ্তাহ চলে যাবে। ইন্ডিয়ানদের যদি ঠেকিয়ে রাখতে পারে, ততদিনে হয়তো ইয়োমা থেকে পৌঁছে যাবে রিলিফ পার্টি। এ-ধরনের অভিযানে উত্তরের ট্রেইল ধরে চলে যাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি, কিন্তু বেটস ওয়েলে গিয়ে যদি দেখে ওটার পানি শূন্য, দুয়ে দুয়ে চার মেলাতে সমস্যা হওয়ার কথা নয়। পাপাগো ওয়েল্‌স সম্পর্কে জানে ইয়োমার লোকজন, দক্ষিণে এলে ওদের খুঁজে পাবে তারা।

সবকিছু নির্ভর করছে ওদের একাট্টা থাকার উপর। পানি আছে, এখন দরকার খাবার।

জেফ কেলারকে নিজের অনুপস্থিতি জানাতে চায় না এরিক, আশঙ্কা করছে তা হলে গণ্ডগোল বাধিয়ে বসবে সে। হ্যালিগান হয়তো সামলে রাখার চেষ্টা করবে তাকে, কিন্তু সার্জেন্টের চেয়ে ঢের বেপরোয়া সে। দু’জনে মুখোমুখি হলে টিকতে পারবে না সার্জেন্ট।

*

সন্ধ্যার বেশ কিছুক্ষণ পরে যাত্রা করল এরিক ক্ৰেবেট। পাথুরে চাতালে পাহারায় রয়েছে বেন ডেভিস, ড্যান ঘুমাচ্ছে। কেলারও শুয়ে পড়েছে, কাছাকাছি বিগ জুলিয়া-তবে অতটা কাছে নয় যে সন্দিহান হয়ে উঠবে মহিলা। অন্যরা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে নির্দিষ্ট জায়গায় অবস্থান নিয়েছে অথবা ঘুমাচ্ছে। চিডল ছাড়া কাউকে নিজের উদ্দেশ্য জানায়নি এরিক।

পিস্তল রেখে শুধু ধনুক আর আধ-ডজন তীর এবং বাউই ছুরি সঙ্গে নিয়েছে ও

উপুড় হয়ে শুয়ে, সন্তর্পণে শরীর মুচড়ে স্মোক-ট্রির নিচু শাখা এড়িয়ে পাথুরে জমিতে চলে এল এরিক। মিনিট কয়েক স্থির পড়ে থাকল, কান খাড়া। চারপাশে অসংখ্য পাথর-নানা আকার, বিচিত্র রঙ আর বিভিন্ন সাইজের। অসীম সতর্কতার সঙ্গে ক্রল করে এগোল ও, পাথুরে জমি ছাড়িয়ে বালির কিনারে পৌঁছল। এখানেও থেমে কান পাতল। মনোযোগ দিয়ে শুনল শব্দ। বেরোনোর পর আধ-ঘণ্টা পেরিয়েছে, ততক্ষণে ব্যারিকেড থেকে মাত্র পঞ্চাশ গজ এগিয়েছে। এ পর্যন্ত কাউকে চোখে পড়েনি। এগোতে যাবে, তখনই নুড়িপাথর গড়ানোর চাপা শব্দ কানে এল।

ঝোঁপের ছায়া থেকে বেরিয়ে ওঅশ ধরে ব্যারিকেড়ের দিকে এগোল গাঢ় একটা কাঠামো, দেখতে পেল এরিক, বড়জোর দশ ফুট দূরে আছে লোকটা। নিঃশব্দে এগোল ইন্ডিয়ান, তাকে চলে যেতে দিল এরিক, তারপর উঠে দাঁড়িয়ে এগোল নিজের পথে।

আরও এক ঘণ্টা পর প্রথম বিগহনটাকে দেখতে পেল ও। দেখার আগেই শব্দ শুনে উপস্থিতি টের পেয়েছে, বাক খাওয়া ব্লাফে ঘাস চিবুচ্ছে ওটা, ওর দৃষ্টিসীমার আড়ালে। তুণ থেকে একটা তীর তুলে নিয়ে অপেক্ষায় থাকল এরিক। যথেষ্ট কাছে চলে এসেছে, সামান্য শব্দ পেলে পগার পার হয়ে যাবে ভেড়াটা। ওটা ছুটে পালালে হয়তো অন্যগুলোও তল্লাট ছেড়ে চলে যাবে, অন্য একটাকে তখন এত কাছে পাওয়ার সম্ভাবনা থাকবেই না। সেক্ষেত্রে, সামান্যও নড়া যাবে না, মনে মনে নিজেকে শুধাল এরিক; এবং তাই করল।

ধীরে ধীরে সময় পেরিয়ে যাচ্ছে। কয়েকবারই পাথরের সঙ্গে ভেড়াটার খুরের সংঘর্ষের হালকা শব্দ কানে এসেছে। কিন্তু কিছু দেখতে পাচ্ছে না। বাম দিকে ক্রমশ ঢালু হয়ে গেছে ব্লাফটা, ঘাস খেতে খেতে ভেড়াটা যদি ওদিকে সরে যায়, আকাশের বিপরীতে ওটার কাঠামো পরিষ্কার হয়ে উঠবে।

অপেক্ষায় থাকল এরিক। ব্লাফের উপর, দূরে অন্ধকার আকাশে ঝুলে আছে নিঃসঙ্গ একটা তারা। বিগহর্ন ভেড়ার হালকা পায়ের শব্দ কানে এল, তারপর আবারও হলো শব্দটা। সম্ভবত আরেকটা ভেড়া, আরও দূরে। নাকি অন্য কিছু?

স্থির পড়ে থেকে মনোযোগ দিয়ে শুনল ও। খুব কাছে, দশ ফুট দূরে ওর মতই পড়ে থাকা এক লোকের অস্পষ্ট নিঃশ্বাসের শব্দ কানে এল! দ্বিধা করল এরিক। হঠাৎ নড়ে উঠল ভেড়াটা, পরমুহূর্তে ধনুক থেকে তীর নিক্ষিপ্ত হওয়ার টোয়াড় শব্দ কানে এল, লক্ষ্যে তীর বিদ্ধ হওয়ার ভেঁতা, আওয়াজ হলো এবার, এবং পরপরই ভেড়াটার বিস্ময়সূচক অস্ফুট কাতরানি শুনতে পেল। লাফিয়ে সামনে এগোল ওটা, হাঁটু ভেঙে পড়ে গেল, গড়ান খেয়ে চিৎ হলো, বিশাল শিংয়ের সঙ্গে পাথরের সংঘর্ষে ধাতব শব্দ হলো। প্রায় সঙ্গে সঙ্গে, পাথরের আড়াল থেকে বেরিয়ে সেদিকে এগোল এক ইন্ডিয়ান।

শ্বাসরুদ্ধকর একটা মুহূর্তে নিজের কাঠামোকে পরিষ্কার করে তুলল ইন্ডিয়ান, ধনুক ঘুরিয়ে তীর ছুঁড়ল, এরিক। লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়েছে। সামান্য শব্দ, কিন্তু তাতেই সতর্ক হয়ে গেছে অ্যাপাচিটা, ঝট করে ঘুরে দাঁড়াল সে, পরমুহূর্তে ঝাঁপ দিল এরিকের উপর। সংঘর্ষে ভূপতিত হলো দু’জনেই, তবে ধাক্কাটা এরিকের উপর দিয়ে গেল বেশি। অবস্থা বেগতিক দেখে শেষ মুহূর্তে পা ভাঁজ করে ফেলেছে ও, জোড়া হাঁটুর উপর এসে পড়ল অ্যাপাচি। তীব্র ঝুঁকি মেরে তাকে ফেলে দিল এরিক, গড়ান খেয়ে সরে এল, ইতোমধ্যে ছুরি বের করে ফেলেছে।

আক্রমণ চালাল অ্যাপাচি। তীক্ষ্ণধার ছুরির বাতাস কাটার শব্দ শুনতে পেল এরিক, ওর কানের পাশ দিয়ে গিয়ে শার্ট কেটে ফেলল। একই মুহূর্তে বাম হাতে ব্যাটার পেটে জবর ঘুসি বসিয়ে দিয়েছে ও। মারে যথেষ্ট জোর ছিল, টলমল পায়ে পিছিয়ে গেল সে, তারপর একই সময়ে ঝটিতি খাড়া হলো ওরা।

বুনো উন্মত্ততায় ছুরি চালাল এরিক, টের পেল লক্ষ্যে আঘাত হেনেছে। পরমুহূর্তে আষ্টেপৃষ্ঠে যুঝতে শুরু করল দু’জন। উষ্ণ, ভেজা ও পিচ্ছিল শরীর জাপটে ধরল এরিক, কিন্তু সুবিধা করতে পারল না। ঝাড়া মেরে নিজেকে ছাড়িয়ে নিল ইন্ডিয়ান, এক পা পিছিয়ে গেল। এরিকও এগোল। নিচু করে ধরা ছুরি ওর হাতে, ধারাল দিকটা উপরমুখী, ইন্ডিয়ানের পেটে আঘাত হানতে প্রস্তুত।

ঝুঁকে পড়েছে দুজনেই, পরস্পরকে ঘিরে চক্কর কাটছে। আচমকা আগ বাড়িয়ে আক্রমণ করল ইন্ডিয়ান। নিচু হয়ে ছুটে এল সে, তারার আলোয় ঝিকিয়ে উঠল ছুরিটা, নিজের ভারী ব্লেড দিয়ে সেটা ঠেকাল এরিক, মুখোমুখি সংঘর্ষ হলো দুটো দেহের, তারপর, এমনকী দুই ব্লেডের সংঘর্ষও হলো। এক পা আগে বাড়ল এরিক, সমস্ত শক্তি প্রয়োগে ঝাঁকি দিয়ে উপরের দিকে চালাল ছুরিটা। পিছলে সরে গেল ইন্ডিয়ানের ছুরি, এরিকেরটা তার শরীরে আমূল ঢুকে গেল।

অস্ফুট কর্কশ স্বরে খাবি খেল অ্যাপাচি, নিচু কণ্ঠে বলল কী যেন। কণ্ঠটা এত স্নান যে কিছুই বুঝতে পারল না এরিক। ভোঁতা শব্দে বালির উপর পড়ল রেডস্কিনের দেহ। গলার গড়গড় শব্দ শুনে বুঝল মারা যাচ্ছে লোকটা। পিছিয়ে এসে চারপাশে তাকাল নিজেকে সুস্থির করার ফুরসতে। ধারে-কাছে কোথাও পড়ে আছে মৃত ভেড়াটা, ওটার মাংস নিয়ে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ফিরে যেতে হবে।

ভেড়াটার পেটের সাদা ছোপে তারার আলোর প্রতিফলনে দূর থেকে ওটাকে শনাক্ত করতে সক্ষম হলো এরিক। কাছে গিয়ে দ্রুত হাতে কাজ শুরু করল ও, অন্ধকারে সমস্যা হচ্ছে না-হাতড়ে কাজ সারছে। চামড়া ছাড়িয়ে যতটা সম্ভব মাংস কেটে চামড়ায় মুড়ে ঘাড়ের উপর চাপাল, হাতে তীর-ধনুক নিয়ে ফিরতি পথ ধরল।

মিনিট কয়েক দ্রুত এগোল ও, সচেতন যাতে হোঁচট খেয়ে না পড়ে। উত্তেজনা আর টানা চলার মধ্যে থাকায় হাঁপাচেছ। দূর থেকে অ্যারোয়োটা চোখে পড়তে থামল ও। মিনিট কয়েক বিশ্রাম নিল, কান পেতে শুনল আশপাশের শব্দ। অ্যারোয়োয় উঠে এসেছিল এক ইন্ডিয়ান, মনে পড়ল ওর, লোকটা হয়তো রয়ে গেছে এখনও। পিঠের ভারী বোঝা স্থান বদল করল ও, ডান কাঁধ থেকে বাম কাঁধে সরিয়ে নিল, বাম হাতে রয়েছে তীর-ধনুক। ছুরি বের করে ডান হাতে নিল ও, তারপর লম্বা একটা নিঃশ্বাস নিয়ে ওঅশের মাটিতে পা রাখল। প্রতি মুহূর্তে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা করছে।  

ওঅশের তলার খাটো জঙ্গল আর ঝোঁপঝাড়ের ফাঁকফোকর গলে ধীর গতিতে এগোল এরিক, চারপাশে সুনসান নীরবতা। মাঝে মধ্যে থেমে কান পাতল; তারপর এগোল আবার। একবার গাছের একটা শাখা আটকে গেল ভেড়ার চামড়ার সঙ্গে, নিক্ষিপ্ত তীরের মত টোয়াশব্দে মুক্ত হলো শাখাটা

ঝটিতি কয়েক পা এগিয়ে নিচু হয়ে গেল এরিক, কান খাড়া করে অপেক্ষায় থাকল। হাতের বামে কিছুটা দূরে ক্ষীণ ফিসফিস শব্দ কানে এল, যেন বাকস্কিন-বাকস্কিনে কিংবা বালির সঙ্গে মোকাসিনের হালকা সংঘর্ষ হয়েছে। বিপদ হলো না দেখে দ্রুত পা চালাল ও, কয়েক কদম, এগিয়ে থামল আবার

এরিক মোটামুটি নিশ্চিত যে-পথে রক্ষিত সীমানা থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল, ঠিক সেখানে এসে উপস্থিত হয়েছে। ঘাড়ের উপর থেকে মাংসের বোঝা মাটির উপর নামিয়ে রাখল ও। দীর্ঘক্ষণ বুক ভরে নিঃশ্বাস নেওয়ার ফাঁকে চারপাশের সমস্ত শব্দ মনোযোগ দিয়ে শুনল। রাতের শীতলতা সত্ত্বেও ঘামছে দরদর করে। ছুরিটা বাম হাতে চালান করে দিয়ে শার্টের উপর মুছল ডান হাত। এক হাঁটু গেড়ে বসল ও, বিশ্রাম নিচ্ছে।

*

ঘণ্টা খানেক আগে, পাহাড়ী চাতাল থেকে নেমে আগুনের কাছে চলে এসেছে বেন ডেভিস। এ-মুহূর্তে মিচেল রয়েছে পাহারায়, আশপাশে আর কেউ নেই। আগুন-গরম কফি পান করার ফাঁকে যার যার বেডরোলে বিশ্রামরত সঙ্গীদের দেখল সে। এই গ্যাড়াকুল থেকে কেউ যদি জীবিত বেরোতে পারে, পৃথিবীর সবচেয়ে সৌভাগ্যবান মানুষ। বলতে হবে তাকে।

এই ফাঁদে নিজেকে জড়াল কীভাবে? আনমনে ভাবছে বেন ডেভিস। থামাই উচিত হয়নি ওদের, বরং ছোটার মধ্যে থাকা উচিত ছিল। তা হলে বহু আগেই ইয়োমায় পৌঁছে যেত, ওখান থেকে সান ফ্রান্সিসকো বা বাটারফিল্ডের স্টেজে চড়তে পারত।

সান ফ্রান্সিসকো! আলো ঝলমলে শহরটাকে দূর অস্ত মনে হচ্ছে এখন। সত্যিকার জীবন তো ওখানেই, আর এটা হচ্ছে নরক। বুড়ো জিম রিওস ঠিকই সন্ধি করতে বাধ্য হত। মেলানি ছাড়া আর কেউ নেই তার, মেয়ের জন্যই তো এতকিছু গড়েছে। এখন যা করা উচিত, যত দ্রুত সম্ভব কেটে পড়তে হবে। মেলানিকে জাগিয়ে দুটো ঘোড়ায় স্যাডল পরিয়ে ছুটতে হবে।

চিন্তাটা হঠাৎ করেই এসেছে, বাতিল করে দেওয়ার চেষ্টা করল ডেভিস, কিন্তু মাথায় রয়ে গেল ঠিকই। অসুবিধে কী? সফল হওয়ার জন্য এটাই মোক্ষম সময়। বড়জোর দুই কি তিনজন অ্যাপাচি পাহারায় রয়েছে, সম্ভবত ধরেই নিয়েছে যে পালানোর সাহস করবে না সাদারা।

কিন্তু ঘোড়া বের করবে কীভাবে?

সমস্যাটা নিয়ে ভাবল সে। কয়েকটা আইডিয়াই এল মাথায়, কিন্তু একটা ছাড়া বাকিগুলো বাতিল করে দিল। নীচের ড্রতে নামতে হবে, তারপর ঝোঁপের দেয়ালে ফোকর তৈরি করতে হবে। সম্ভব। ইয়োমায় গিয়ে এদের জন্য সাহায্য পাঠাতে পারবে ওরা। সাহায্য যখন পাপাগো ওয়েলসে পৌঁছবে, ততক্ষণে সান ফ্রান্সিসকোর পথে থাকবে ওরা।

গাঢ় বাদামি কফির দিকে তাকাল ডেভিস, কাপ নেড়ে ঘূর্ণন তৈরি করল পানীয়তে। মাত্র সত্তর ডলার আছে পকেটে, যথেষ্ট নয়। তবে ইয়োমায় গিয়ে যদি কয়েক ঘণ্টার জন্য একটা গেম-হলে বসতে পারে, কিছু ডলার কামাই করা কঠিন হবে না। তা ছাড়া, ঘোড়া দুটো বিক্রি করলেও টাকা পাওয়া যাবে।

মেলানি যেখানে শুয়েছে, সেদিকে তাকাল ডেভিস। ও কি যাবে? যাওয়া উচিত, কীসের আশায় থাকবে এখানে? নিশ্চিত মৃত্যু অপেক্ষা করছে সবার জন্য। তারচেয়ে দুটো ঘোড়া নিয়ে ইয়োমায় যাওয়া কম ঝুঁকিপূর্ণ। সঙ্গে যদি আরও একজন লোক থাকে…জেফ কেলারের চিন্তা এল মাথায়। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে বাতিল করে দিল সে। উঁহু, কেলারকে নেওয়া যাবে না। ব্যাটা খুব বেশি বিপজ্জনক।

ব্লটের ব্যাপারটা ভিন্ন…কিংবা ডাফিকেও নেওয়া যাবে না। এরিক ক্রেবেটের প্রতি ঝুঁকে পড়েছে ডাফি, নাও যেতে পারে সে।

ক্ৰেবেট কোন চুলোয় আছে হারামজাদা?

আচমকা উঠে দাঁড়াল বেন। ক্রেবেট নিশ্চই চলে গেছে। গত কয়েক ঘণ্টায় দেখেনি তাকে। দ্রুত একে একে সবার কাছে গেল ও, নিশ্চিত হলো। উঁহু, ক্ৰেবেট ছাড়া সবাই আছে।

সুযোগ বুঝে কেটে পড়েছে ব্যাটা। চিন্তাটা মাথায় আসা মাত্র রাগে ব্রহ্মতালু জ্বলে উঠল বেনের। ওদেরকে নিশ্চিত মৃত্যুর মুখে রেখে চলে গেছে ক্রেবেট! কী ধরনের মানুষ সে?

নুড়িপাথরের সঙ্গে বুটের সংঘর্ষের হালকা শব্দ শুনে ঝটিতি ঘুরে দাঁড়াল বেন, সার্জেন্ট হ্যালিগানকে দেখতে পেল সামনে।

ক্রেবেট কেটে পড়েছে, সার্জেন্ট, দ্রুত বলল ও। দারুণ দেখিয়েছে, তাই না? একেবারে সময়মত!

ঝট করে মাথা উঁচু করল সার্জেন্ট। বিশ্বাস করি না!

করো আর নাই করো, খুঁজে পাবে না ওকে। থাকলে তো পাবে। সন্দেহ থাকলে তুমি নিজেই খুঁজে দেখো।

কী যা-তা বলছ! ও কেন…

খরখরে স্বরে হাসল বেন, হাসিতে সামান্য আমোদও নেই। ঠিকই করেছে ও, আসলে আমাদেরও কেটে পড়া উচিত। বেকুব না হলে এখানে কে পড়ে থাকবে? ইয়োমায় পৌঁছতে পারব আমরা, যথেষ্ট সম্ভাবনা আছে। আমার তো মনে হয় ক্রেরেট যা বলেছে, অত ইন্ডিয়ান নেই এখানে। মনে সাহস নিয়ে, ভড়কে না গিয়ে যদি ঘোড়া ছোটাই

ঠাণ্ডা নির্লিপ্ত চাহনিতে ওকে নিরীখ করল সার্জেন্ট। মিস্টার, একটা কথা বেমালুম ভুলে গেছ। আমরা তোক চোদ্দজন, কিন্তু ঘোড়া আছে মোটে আটটা।

কিছু বলতে গিয়েও নিবৃত্ত হলো বেন ডেভিস। ধীরে ধীরে, সমস্ত উৎসাহ উবে গেল। চোদ্দজন মানুষ এবং আটটা ঘোড়া। ওই আটটার একটা আমার নিজস্ব ঘোড়া, শেষে বলল ও।

ছোট্ট নড করল সার্জেন্ট। তা হলে তো হলোই, বলে হঠাৎ ঘুরে দাঁড়াল সে, হেঁটে চলে গেল নিজের বেডরোলের দিকে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *