০৯. প্রবেশপথের বাইরে দাঁড়িয়ে

প্রবেশপথের বাইরে দাঁড়িয়ে হাঁপাতে লাগলো দলটা। শব্দ শুনে ভয় পেয়ে পালিয়ে এসেছে বলে এখন গাধা মনে হচ্ছে নিজেদের।

বাবারে বাবা! কপালের ঘাম মুছে বললো মুসা। মনে হচ্ছিলো কানের ফুটো দিয়ে একেবারে মগজে ঢুকে যাচ্ছে।

ভয়ানক শব্দ! ফ্যাকাসে হয়ে গেছে জিনার মুখ। ওই গুহায় আর ঢুকছি না আমি! চলো, ক্যাম্পে যাই।

খড়িমাটি বিছানো রাস্তা ধরে তাঁবুতে ফিরে চললো ওরা। বৃষ্টি থেমেছে। মেঘও কাটতে শুরু করেছে।

ক্যাম্পে ফিরে একটা তাবুতে ঢুকে আলোচনায় বসলো ওরা।

ওরকম শব্দ প্রায়ই শোনা যায় কিনা, মুসা বললো, জিজ্ঞেস করতে হবে জনিকে। আশ্চর্য! দর্শকদের এভাবেই স্বাগত জানায় নাকি ওই গুহা!

সে যা-ই হোক, কিশোর বললো, বেশি ছেলেমানুষী করে ফেলেছি আমরা। রীতিমতো লজ্জা পাচ্ছে এখন সে।

এক কাজ করা যাক তাহলে, পরামর্শ দিলো জিনা, আবার ফিরে গিয়ে চিল্কারের জবাবে আমরাও চিৎকার শুরু করি। দেখবো কি হয়?

ওসব করে আর লাভ নেই, আরও বেশি ছেলেমানুষী করতে রাজি নয় কিশোর। চিৎকার-প্রতিযোগিতায় কিছু হবে না। কম্বলের তলা হাতড়ে ফীভগ্নাস বের করে গলায় ঝোলালো সে। এয়ারফীন্ডের অবস্থা দেখতে যাচ্ছি আমি।

বাইরে বেরিয়ে ফীগ্লাস চোখে লাগিয়ে, একবার দেখেই চিৎকার করে উঠলো কিশোর। ওরেব্বাবা, কতো লোক! হচ্ছেটা কি ওখানে? পেনও এসেছে অনেকগুলো। নিশ্চয় আজ সকালে আমরা যখন গুহায় ছিলাম তখন এসেছে।

এক এক করে কীভগ্নাস চোখে লাগিয়ে দেখলো সবাই। ঠিকই বলেছে কিশোর। কিছু একটা ঘটছে এয়ারফীন্ডে। তাড়াহুড়া আর উত্তেজনা দেখা যাচ্ছে মানুষগুলোর মাঝে। এই সময় শোনা গেল ইঞ্জিনের শব্দ।

আরেকটা প্লেন আসছে, মুসা বললো। জ্যাক ভাইয়ের সঙ্গে দেখা করতে পারলে হতো, রবিন বললো। সে বলতে পারবে কি হচ্ছে।

লাঞ্চের পর ফার্মে গিয়ে জনিকে জিজ্ঞেস করতে পারি, মুসা প্রস্তাব দিলো। হয়তো সে কিছু জানে, ভাইয়ের কাছ থেকে শুনে থাকতে পারে।

যাক, বাঁচা গেল, আবার রোদ উঠছে, খুশি খুশি গলায় বললো জিনা। মেঘের ফাঁকে উঁকি দিয়েছে সূর্য, একঝলক সোনালি উষ্ণ বোদ ছড়িয়ে দিয়েছে বৃষ্টিভেজা প্রকৃতির ওপর। ইতিউতি ছুটে চলা হেঁড়া মেঘের ফাঁকে ফাঁকে চোখে পড়ছে এখন নীল আকাশ। এরকম কড়া রোদ থাকলে শীঘ্রি শুকিয়ে যাবে ঝোপঝাড়। চলো, রেডিও শুনি, আবহাওয়া অফিস কি বলে? অযথা অ্যানারাক বয়ে বেড়াতে রাজি না আমি।

রেডিও অন করলো ওরা। কিন্তু অল্পের জন্যে মিস করলো আবহাওয়ার খবর।

দূর! বলে বন্ধ করে দিতে গিয়েও থমকে গেল মুসা। দুটো শব্দ কানে এসেহে, বাটারফ্লাই হিল। বাড়ানো হাতটা মাঝপথেই ঝুলে রইলো তার, কান পেতে আছে আরও কথা শোনার জন্যে। ঘোযক বলছে, বাটারফ্লাই হিল থেকে চুরি যাওয়া প্লেন দুটো খুব দামী, ভেতরে অনেক টাকার যন্ত্রপাতি লাগানো। হয়তো ওগুলোর জন্যেই চুরি হয়েছে প্লেন। দুঃখের সঙ্গে বলতে হচ্ছে, ওগুলো উড়িয়ে নিয়ে গেছে আমাদের দুজন সেরা পাইলট। ওরা হচ্ছে ফ্লাইট-লেফটেন্যান্ট জ্যাক ম্যানর আর ফ্লাইট-লেফটেন্যান্ট রিড বেকার। দুটো প্লেনই একেবারে গায়েব, কোনো খোঁজ নেই। হারিয়েছে কাল রাতে ঝড়ের সময়।

এক মুহূর্ত থেমে আরেক খবরে চলে গেল ঘোষক। রেডিও বন্ধ করে দিয়ে শূন্য দৃষ্টিতে অন্যদের দিকে তাকালো মুসা।

জ্যাকের মতো মানুষ এরকম একটা কাণ্ড করলো! বিড়বিড় করলো কিশোর। আনমনে চিমটি কাটলো একবার নিচের ঠোঁটে। বিশ্বাস হচ্ছে না!

প্লেন উড়ে যেতে কিন্তু শুনেছি আমরা, মুসা বললো। দুটোই। পুলিশকে গিয়ে সব জানানো উচিত। ইস, জ্যাক একাজ করলো! হায়রে, দুনিয়ায় কাকে বিশ্বাস করবো?

ঠিক, মাথা দোলালো রবিন।

রাফিও কিন্তু বিশ্বাস করেছিলো ওকে, জিনা মনে করিয়ে দিলো। আর লোক চিনতে সাধারণত সে ভুল করে না।

জনি খুব দুঃখ পাবে, মুসা বললো। বেচারা ভাই বলতে অজ্ঞান…

হঠাৎ আবার চেঁচাতে শুরু করলো রাফি। এবার আনন্দের ডাক। কে আসছে দেখার জন্যে ফিরে তাকালো কিশোর। জনি।

কাছে এসে ওদের পাশে বসে পড়লে জনি। মুখচোখ শুকনো। হাসার চেষ্টা করলো। খুব খারাপ খবর আছে, কেমন ভাঙা ভাঙা কণ্ঠস্বর।

জানি,মুসা বললো। এইমাত্র শুনলাম রেডিওতে।

সবাইকে অবাক করে দিয়ে কাঁদতে শুরু করলো জনি। গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে পানি। মোছার চেষ্টা করলো না। পানি যে পড়ছে সেটাই যেন টের পাচ্ছে না। কে কিভাবে সান্ত্বনা দেবে বুঝতে পারলো না। শুধু রাফি গিয়ে চেটে দিতে লাগলো তার ভেজা গাল। বিচিত্র কুঁই কুঁই আওয়াজ বেরোচ্ছে গলা দিয়ে। কুকুরটার গলা জড়িয়ে ধরে অবশেষে বললো সে, জ্যাক ভাইয়া হতেই পারে না! সে এরকম কাজ করবে না! আমি বিশ্বাস করি না! তোমরা তো দেখেছো তাকে, তোমাদের কি মনে হয়?

আমিও বিশ্বাস করতে পারছি না, গলায় সহানুভূতি মিশিয়ে বললো কিশোর। মাত্র একবার দেখেছি, তা-ও অল্প সময়ের জন্যে। আমার মনে হয় না তোমার ভাই খারাপ লোক।

সে আমার কাছে হিরো, বলে ভেজা গাল মুছলো জনি। আজ সকালে যখন মিলিটারি পুলিশ প্রশ্ন করতে এসেছিলো বাবাকে, কি যে মনের অবস্থা হয়েছিলো আমার, বলে বোঝাতে পারবো না। জ্যাক ভাইয়াকে চোর বলায় এতো রেগে গিয়েছিলাম, ঘুসি তুলে মারতে গিয়েছিলাম পুলিশকে। শেষে জোর করে ধরে আমাকে ঘর থেকে বের করে দিলো মা।

শুধু ওই দুজন পাইলটই তো? জানতে চাইলো কিশোর। নাকি আরও কেউ নিখোঁজ হয়েছে?

না, ওই দুজনই। আজ সকালে রোলকলের সময় অন্য সবাই হাজির ছিলো। শুধু আমার ভাই আর রিড ভাইয়া বাদে। ওরা দুজন ঘনিষ্ঠ বন্ধু।

কেসটা আরও খারাপ হয়েছে সেজন্যেই, মুসা বললো।

কিন্তু আমি বলছি ওরা চুরি করেনি! জোর দিয়ে বললো জনি। মুসার দিকে তাকালো ভুরু কুঁচকে। তুমিও ওদেরকে চোর ভাবছো নাকি?

প্রশ্নই ওঠে না। ওদেরকে…, রাফিয়ানকে দৌড় দিতে দেখে থেমে গেল মুসা। আবার কে আসছে?

প্রচণ্ড চিৎকার করতে লাগলো রাফি। মোটা, ভারি একটা কণ্ঠ আদেশ দিলো, চুপ! চুপ! এই, তোর বন্ধুরা কোথায়?

উঠে এগিয়ে গেল কিশোর।

ঢাল বেয়ে উঠে আসছে দুজন মোটাসোটা ইউনিফর্ম পরা লোক। মিলিটারি পুলিশ।

এই রাফি, চুপ কর, ডেকে বললো কিশোর। আসতে দে।

দৌড়ে তার কাছে ফিরে এলো রাফি। উঠে এলো লোক দুজন। এখানেই ক্যাম্প করেছে, না? বললো একজন। কয়েকটা প্রশ্ন করতে চাই। কাল রাতে

তো এখানেই ছিলে?।

হ্যাঁ, বললো কিশোর। আসুন। আপনারা কি জিজ্ঞেস করবেন, জানি। ভেরি গুড। বসো সবাই। এখানেই বসি, নাকি?

মাথা ঝাঁকালো কিশোর। গোল হয়ে বসলো সবাই। যা যা জানে, সব জানালো ওরা। বেশি কিছু বলতে পারলো না অবশ্য। শুধু দুটো প্লেন উড়ে যাওয়ার কথা ছাড়া।

সন্দেহজনক আর কিছুই শোনোনি কাল রাতে? জিজ্ঞেস করলো প্রথম লোকটা।

না, জবাব দিলো কিশোর।

কেউ আসেটাসেনি এদিকে? নোটবুক থেকে মুখ তুললো দ্বিতীয়জন।

আঁ…ও হ্যাঁ, একজনকে দেখেছি। মিস্টার ডরি। প্রজাপতি ধরে।

তুমি শিওর, মিস্টার ডরিকেই দেখেছো?

নাম তো তা-ই বললো। হাতে প্রজাপতি ধরার জাল ছিলো। চোখে কালো চশমা, আবছা অন্ধকারেও কাচ চকচক করতে দেখেছি। মিস্টার ডাউসনকে দেখিওনি, তাঁর কথাও শুনিনি। মিস্টার ডরি বললো, দুজনেই বেরিয়েছে, মথ শিকারে।

আর কিছু জানো না, না?

না, মাথা নাড়লো কিশোর।

হুঁ, বলে নোটবুক বন্ধ করলো লোকটা। অনেক ধন্যবাদ তোমাদেরকে। যাই, ওই দুজনের সঙ্গেও কথা বলা দরকার। রাতে বেরিয়েছিলো যখন, কিছু দেখলেও দেখতে পারে। কোথায় থাকে ওরা?

চলুন, দেখিয়ে দিচ্ছি, জনি উঠে দাঁড়ালো। তার সঙ্গে অন্যেরাও উঠলো। হাঁটতে হাঁটতে পুলিশদেরকে বললো, দেখুন, আপনারা হয়তো বিশ্বাস করতে চাইবেন না। তবু আমি বলছি, জ্যাক ম্যানর চোর নয়। হতে পারে না।

ও তোমার কে হয়? জিজ্ঞেস করলো একজন পুলিশ।

ভাই।

ও। দেখা যাক তদন্ত করে, কি বেরোয়।

প্রজাপতির খামারটা দেখা গেল। হাত তুলে ভাঙা কটেজটা দেখিয়ে জনি বললো, ওখানেই থাকেন মিস্টার ডাউসন আর ডরি। আমাদের কি আর আসার দরকার আছে?

না। তোমরা যাও। থ্যাংক ইউ।

একটা কথা, স্যার, অনুরোধ জানালো জনি। জ্যাক ম্যানর চুরি করেনি, একথাটা জানতে পারলে দয়া করে কি একটা খবর দেবেন আমাদেরকে? দেখবেন, যখনি সে জানবে তাকে সন্দেহ করা হচ্ছে, যোগাযোগ করবে আপনাদের সঙ্গে।

তোমার ভাই, না? দ্বিতীয় লোকটা বললো। কোনো আশা নেই, বুঝলে। কাল রাতে একটা প্লেন জ্যাক ম্যানরই উড়িয়ে নিয়ে গেছে। কোনো সন্দেহ নেই তাতে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *