০৯. পথের শেষ মাথায় পৌঁছে

পথের শেষ মাথায় পৌঁছে ডানে মোড় নিল মেয়েটা। চোখের আড়াল হয়ে গেল। দ্রুত পা চালাল কিশোর। মোড় ঘুরতেই আবার দেখল ওকে, পুরানো একটা অ্যাপার্টমেন্ট হাউসে ঢুকছে।

ধীরে এগোল কিশোর। একটা সুইমিং পুলকে তিনদিক থেকে ঘিরে রেখেছে বাড়িটা। চতুর্থ দিকে সাদা রঙ করা লোহার বেড়া। মেয়েটাকে দেখা যাচ্ছে না। তবে একটা দরজা খোলা দেখতে পেল। বেড়ার বাইরে দাঁড়িয়ে দ্বিধা করছে। কিশোর, এই সময় দরজা দিয়ে ছুটে বেরোল সেইন্ট বার্নার্ড।

টিমি, জলদি আয়! টিমি, এই টিমি!

ছুটে গিয়ে পুলের এক প্রান্তে একটা ফুলের বেডের ওপর বসল কুকুরটা।

আরে এই শয়তান, জলদি আয়! বাড়িওলি দেখলে আমাকে সুদ্ধ বের করবে।

গেট খুলে চত্বরে ঢুকল কিশোর। গেটের পাশের মেইলবক্সের দিকে তাকিয়ে রইল চিন্তিত ভঙ্গিতে।

কাউকে খুঁজছ? মেয়েটা জিজ্ঞেস করল।

না, মানে…না, যেন বলতে ভয় পাচ্ছে। ইয়ে…।

কি?

সান্তা মনিকা ইভনিং আউটলুক। গ্রাহক হবেন?

সরি। কাগজ পড়ার সময় নেই আমার।

পকেট থেকে ছোট প্যাড আর পেন্সিল বের করল কিশোর। রাখুন না? না হয় খালি রোববারেরটাই রাখুন?

থ্যাংকস। লাগবে না।

ও, খুব হতাশ মনে হল কিশোরকে। আজকাল কাগজই রাখতে চায় না লোকে। পড়ে না।

দিনকাল খুব খারাপ তো। বাঁচার তাগিদেই হিমশিম খেতে হয়, পড়ার সময় কোথায়, হাসল মেয়েটা। কুকুরটা এসে বসল তার পায়ের কাছে। তো, কি পাবে? একশোজনকে গ্রাহক করতে পারলে একটা সাইকেল পুরস্কার?

একজনই পারি না, একশো পাব কোথায়? আপনার কি মনে হয়? এবাড়িতে আর কেউ হবে?

বাড়িতে তো এখন কেউ নেই। সবাই কাজে গেছে। বিষ্যুৎবার তো।

ও, ঠোঁটের এক কোণ ঝুলে পড়ল কিশোরের। হতাশ ভঙ্গিতে বসে পড়ল পুলের কিনারে রাখা একটা চেয়ারে। লোকের কাছে জিনিস বিক্রি যে কত কঠিন…আপনি…আপনি…।

কি ব্যাপার? কি হয়েছে তোমার?

না না, কিছু হয়নি। আমাকে…এক গেলাস পানি খাওয়াতে পারেন?

হেসে উঠল মেয়েটা। পারব না কেন? বস। নিয়ে আসছি।

খোলা দরজা দিয়ে ঘরে ঢুকল ও, কুকুরটা গেল পেছনে। খানিক পরেই একটা জগ আর গেলাস নিয়ে বেরোল মেয়েটা, দরজা বন্ধ করে কুকুরটাকে আটকে রাখল ভেতরে।

কাছে এসে বলল, পাজি কুকুর। কিছুতেই সামলাতে পারি না।

মেয়েটাকে ধন্যবাদ জানিয়ে গেলাসে চুমুক দিল কিশোর। ওর পাশে আরেকটা চেয়ারে বসল মেয়েটা, রোদ লাগে, তাই মুখ ফিরিয়ে রাখল।

রাতে চেষ্টা করা উচিত তোমার। তখন বাসায় থাকে লোকে।

তাই তো মনে হচ্ছে, চেহারাটাকে বোকা বোকা করে তুলল কিশোর। আচ্ছা, এখন কি কেউ নেই? আপনি তো আছেন। দিনে আর কেউ থাকে না?

থাকে, মাঝেসাঝে।

ও। আপনি কাজ করেন না?

করি। এখন করছি না।

ও। কেন, চাকরি চলে গেছে?

না, তা যায়নি। সিনেমায় কাজ করি তো, নির্দিষ্ট কোন টাইম নেই। মেকাপের কাজ। যখন শুটিং চলে, যাই, যখন চলে না, যাই না।

মাথা ঝাঁকাল কিশোর। আমার একজন বন্ধু আছে। তার বাবাও ছবিতে কাজ করেন। স্পেশাল ইফেক্ট বিশেষজ্ঞ।

কি নাম? হয়ত চিনব।

আমান। মিস্টার রাফাত আমান।

মাথা নাড়ল মেয়েটা। না, ওই নামে কাউকে চিনি না। উনি হয়ত অন্য স্টুডিওতে কাজ করেন। স্পেশাল ইফেক্টের লোকদের দাম আছে। একেকবার ভাবি, মেকাপ ছেড়ে ওই লাইনে চলে যাব কিনা। আবার ভাবি, না, মেকাপ মন্দ কি? তবে ইচ্ছে করলে মেকাপ করার পরেও স্পেশাল ইফেক্ট শেখার সময় পাব।

ইস্কুল-টিস্কুলে যান?

না, লেখাপড়ার ইস্কুলে যাই না। তবে অভিনয় শিখতে যাই। মিখাইল পালোসকির ওখানে। একদিন না একদিন সিনেমায় অভিনয়ের চান্স পাবই।

মাথা ঝোকাল কিশোর। ঘুম ঘুম চোখ। অনেকেই অভিনয় শিখতে চায়। তবে মেকাপ শেখা আরও সাংঘাতিক। গত হপ্তায় একটা ছবি দেখলাম। ওই যে, মন্দির থেকে মূর্তি চুরি করে লোকটা। দেবতার অভিশাপ লাগে তার ওপর।

ওরকম ছবি অনেক আছে। তা অভিশাপে কি হয়? সে-ও পাথর হয়ে যায়?

না না, তাহলে তো ভালই হত। সাপ হয়ে যায়। মুখটা মানুষেরই থাকে।

অ, স্নেকম্যান ছবির কথা বলছ। ভালই। ওটার মেকাপম্যানকে চিনি, নিরো বেকারো। গুণী লোক। অ্যাকাডেমি পুরস্কারই পেয়ে যাবে কোনদিন।

আপনি কোন স্পেশাল মেকাপ করেছেন? মানে রক্তচোষা মানুষ-বাদুড়, মায়ানেকড়ে…

নাহ, আমি জোয়ান লোককে বয়স্ক বানাই বেশি। কঠিন না কাজটা। দৈত্যদানব বা মায়ানেকড়ে বানাইনি কখনও।

তাই? আচ্ছা, কাটাকুটির দাগ বানাতে পারেন? ওই যে, অনেক ভিলেন আছে না, মুখে কাটা দাগ থাকে?

শ্রাগ করল মেয়েটা। সময় লাগে অনেক সময় দিলে অনেক কিছুই করা যায়। শুধু, মেকাপ করে বুড়োকে জোয়ান বানানো যায় না। চিহ্ন থাকবেই। পুরোপুরি লুকানো সম্ভব না। এই কিছুটা তাজা করা যায় আরকি। দেখ না, যত নামকরা অভিনেতাই হোক, বুড়ো হয়ে গেলে তাকে দিয়ে আর রোমান্টিক নায়কের অভিনয় করানো যায় না।

কথার ফাঁকে ফাঁকে গেলাসে চুমুক দিয়েছে কিশোর। পানি প্রায় শেষ। আরেক গেলাস চাইতে পারে। কিন্তু দরকার কি? আর তেমন কিছু জানার নেই। এক ঢোকে বাকি পানিটুকু শেষ করে গেলাসটা পাশের টেবিলে রেখে দিল।

অনেক ধন্যবাদ আপনাকে।

আর দেব?

না, লাগবে না। মিস্টার আমানকে আপনার কথা বুলব। বলা যায় না, কোন ছবিতে একসঙ্গে কাজ করতেও পারেন দুজনে।

ভালই হবে।

ও, এতক্ষণ কথা বললাম, আপনার নামটাই জানা হল না।

সিনথিয়া ব্যানালিস। ডাক নাম সিনথি।

ও-কে। পানি খাইয়েছেন, থ্যাংক ইউ ভেরি মাচ।

গেট দিয়ে বেরিয়ে নার্সারি স্কুলের দিকে রওনা হল কিশোর। মনে মনে খুশি। বোকার অভিনয় করে অনেক কথাই জেনে এসেছে। কিন্তু মোড় নিয়ে ডেলটন অ্যাভেন্যুতে পড়েই গুঙিয়ে উঠল।

ট্রাকটা নেই। চলে গেছে মুসা আর বোরিস, বোধহয় তার দেরি দেখেই।

দূর! দেরি করতে বলা উচিত ছিল, জোরে জোরে বলল সে। বাস ছাড়া আর উপায় নেই।

উইলশায়ারের দিকে রওনা হল সে। হাঁটতে হাঁটতেই একটা সন্দেহ মাথা চাড়া দিল তার মনে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *