০৯. ওয়ার গড প্রিং-এর পাহাড়ের উপর

ওয়ার গড প্রিং-এর পাহাড়ের উপর থেকে দক্ষিণ দিকের ভাঙা-ভাঙা জমিটা খুঁটিয়ে দেখছে জেকব। দূরবীন চোখে লাগিয়ে ঈষৎ অন্ধকার ছায়া থেকে শুরু করে ওই এলাকার প্রতিটি ফাটল আর খাজ এক এক করে খুঁটিয়ে দেখল সে। টিউবা সিটির দোকান থেকে বেরিয়ে আজ দশ দিনের মধ্যেও কারও অনুসরণ করার আভাস পায়নি-স্ট্যালিয়নটারও দেখা মেলেনি।

বোঝাই যাচ্ছে কোন কারণে ভয় পেয়েই এই পথে যাতায়াত বন্ধ করেছে-কিন্তু ওরা গেল কোথায়? এদিককার তাজা ঘাস আর চমৎকার টলটলে পানির লোভে ঘোড়াগুলো প্রায়ই এদিকে আসে, জানে জেকব। আজ সকাল থেকেই সে অনুভব করছে কেউ যেন তাদের উপর নজর রাখছে। কেবলই মনে হচ্ছে তার অজান্তে যেন কিছু একটা ঘটছে। কিন্তু তার এই দুশ্চিন্তার যুক্তিসঙ্গত কোন কারণ নেই-ধোয়া বা ধুলো কিছুই তার চোখে পড়েনি। শেষ পর্যন্ত যন্ত্রটা চোখ থেকে নামিয়ে ক্যাম্পে ফিরে গেল সে।

এতক্ষণ যেদিকটা খুঁটিয়ে দেখে ফিরল, সেদিকেই বহুদূরে বাতাসে সামান্য একটু ধুলো উড়ে হালকা হয়ে প্রায় মিলিয়ে গেল। তারপরে আবার ধুলো উড়তে উড়তে সেটা সরলরেখায় উত্তর-পুবে এগিয়ে চলল।

আগুনের পাশ থেকে ডালিয়া মুখ তুলে চাইল। বলল, জে, আমি অনেক ভেবে দেখলাম, অরগ্যান রকে ঘোড়াগুলোকে আমরা শেষ দেখেছি, ওখানেই আমাদের ফিরে যাওয়া দরকার।

ওখানে কেন?

আমার মনে হয় ওই দলের লীডার দলটাকে পথ দেখিয়ে বিশেষ কোন জায়গায় নিয়ে যাচ্ছিল-আমাদের দেখেই সে তখনকার মত ঘুরে অন্যদিকে চলে গেছিল। ওখানে গেলে এখনও হয়তো কিছু পায়ের চিহ্ন পাওয়া যাবে।

চিন্তাধারাটা যুক্তিসঙ্গত, স্বীকার করল জেকব। জন্তুরা একটু একরোখা স্বভাবের হয়। একবার কোথাও যাবার ইচ্ছা জাগলে যতক্ষণ না যেতে পারবে ততক্ষণ চেষ্টা চালিয়েই যাবে।

মুশকিল হলো এখান থেকে অরগ্যান রকে পৌঁছা’নোর একটা সোজা পথ হয়তো থাকতে পারে, কিন্তু জেকবের তা জানা নেই। চেনা পথে যেতে হলে আর দক্ষিণ দিকে ফিরে যেতে হবে, অবাঞ্ছিত লোকের সাথে দেখা হয়ে যেতে পারে। আর উত্তরে পড়বে স্যান জুয়ান নদী-নদীটা বেশ চওড়া আর গভীর।

কফির স্বাদটা খুব ভাল হয়েছে। কাপটাকে দু’হাতে জড়িয়ে ধরে ডালিয়ার দিকে চেয়ে সে বলল, আচ্ছা, তুমি তো এই জীবনযাত্রায় অভ্যস্ত নও। হাঁপ ধরে যায়নি তোমার?

হাসল ডালিয়া। জে, তোমাকে তো বলেছি, যার জন্যে পিছুটান থাকতে পারে এমন কোন মূল্যবান জিনিস আমি পিছনে ফেলে আসিনি। অবশ্য আমার পরিচিত লোকজন কে কী করছে মাঝে মাঝে জানতে ইচ্ছা করে-কিন্তু ফিরে যাবার ইচ্ছা আমার মোটেও জাগে না। বাবা বলতেন আমার মধ্যে নাকি আমাদের ভাইকিঙ পূর্ব পুরুষদের প্রভাবটা বেশি।

একটু এদিক ওদিক চেয়ে আবার জেকবের দিকে চোখ ফেরাল ডালিয়া। বিশ্বাস করো, জীবনে এত আনন্দের স্বাদ আর আমি পাইনি। প্রকৃত সুখের সংসান আমি পেয়েছি এখানে।

পরদিন সকালে সূর্য ওঠার আগেই একটা আবছা ইন্ডিয়ান ট্রেইল ধরে রেইনবো প্ল্যাটুর উপর দিয়ে রওনা হয়ে গেল ওরা। পরে একটা ফিরতি ট্রেইল ধরে পিউটে ক্রীকে নেমে এল।

জেকবকে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত দেখাচ্ছে। তার উদ্বেগের কারণ ডালিয়ার কাছে প্রকাশ করল সে। এই এলাকাটা আমার পরিচিত নয়, লিয়া। এদিক দিয়ে পিউটে মেসায় পৌঁছবার কোন পথ খুঁজে না পেলে আবার আমাদের দক্ষিণে ফিরে যেতে হবে।

পশ্চিমে মহিলাযাত্রী সাথে নিয়ে ঘোড়ার পিঠে চলাফেরা করা মানেই নিজের বিপদ ডেকে আনা। ডালিয়া, ভালর জন্যই জেকবের ভাবনা হচ্ছে, সে একা থাকলে এসব ব্যাপারে মাথা ঘামাবার দরকার পড়ত না। এখানকার যতরকম কষ্ট, ক্ষুধা, পিপাসা, গরম আর ঠাণ্ডা সবকিছুর সাথেই তার পরিচয় আছে–সহ্য করার ক্ষমতাও আছে। কিন্তু ডালিয়া সাথে আছে বলেই তার এই উদ্বেগ।

নাকিয়া ওয়াশের তলায় কিছুটা বৃষ্টির পানি জমেছে। ঘোড়াগুলোকে ওখানে একটু বিশ্রাম দিল জেকব। পথ চলা এখনই বেশ কঠিন হয়ে উঠেছে, হয়তো সামনে আরও কষ্টসাধ্য হবে। এখানে দক্ষিণ দিক থেকে যে ট্রেইলটা এসেছে সেটা বেশ স্পষ্ট। সম্ভবত এটাই মেসার উপর ইন্ডিয়ান বসতির ধ্বংসাবশেষে গিয়ে শেষ হয়েছে।

পানির কাছ থেকে ঘোড়াগুলোকে বেশ কিছুদূর হাঁটিয়ে নিয়ে ঝোঁপ থেকে একটা পাতাসহ ডাল ভেঙে আবার ফিরে গেল জেকব। ডাল দিয়ে ঘষে পায়ের চিহ্নগুলো মুছে তার উপর বালু ছিটিয়ে দিল সে।

প্রায় মিলিয়ে যাওয়া আবছা একটা ট্রেইল ধরে ক্লিফের ধারে পৌঁছল ওরা। উত্তর দিকে তার বিরাট দেহ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে নো ম্যানস মেসা

প্রায় তিরিশ মাইল পথ চলেছে ওরা আজ। নীচে কোথাও বিশ্রাম নেওয়ার একটা জায়গা খুঁজে নিতে হবে। ওদের পশুগুলো বেশ ক্লান্ত, ওগুলোরও বিশ্রাম দরকার।

উপর থেকে ওদের ঠিক উল্টো দিকে ক্যানিয়নটার ওপাশে হাজার ফুট নীচে নাকিয়া মেসার ছাদ দেখা যাচ্ছে। ক্যানিয়নটার অন্যধারে গাছের আড়ালে একটা গর্ত মত খাজ দেখা যাচ্ছে। জায়গাটা ওদের জন্য, বেশ নিরাপদ একটা আশ্রয় হতে পারে।

ওই খাজটার কাছে যখন ওরা পৌঁছল তখন আকাশে তারা উঠেছে। নিজে নেমে তাড়াতাড়ি ডালিয়াকে ঘোড়া থেকে নামাতে গেল জেকব। হাত বাড়াতেই ক্লান্তিতে ডালিয়া প্রায় এলিয়ে পড়ল ওর উপর।

ইশ, একী দশা হয়েছে তোমার! দু’হাতে ওকে বুকে জড়িয়ে ধরল জেকব। আমি সত্যিই দুঃখিত, মৃদু স্বরে বলল সে।

কি সুখে, কি দুঃখে…বিয়ের সময়ে শপথ করেছি আমরা, মনে নেই? জেনেশুনেই স্বেচ্ছায় বরণ করেছি তোমাকে। একটু ক্লান্ত হয়ে পড়েছি-বিশ্রাম পেলেই আবার ঠিক হয়ে যাব।

ডালিয়াকে ঘোড়াগুলোর কাছে রেখে অন্ধকারে অদৃশ্য হলো জেকব। প্রায় সাথে সাথে ফিরে এসে পশুগুলোকে একটু উপরে পাহাড়ের একটা বড় পাথরের আড়ালে থাকার ব্যবস্থা করে দিয়ে এল সে।

পাথরের আড়ালে এক কোণে আগুন জ্বেলে রাতের খাবার তৈরি করে ফেলল ডালিয়া। এতক্ষণ জেকব তার রাইফেল আর পিস্তলে তেল লাগিয়ে পরিষ্কার করে নিল।

খেতে বসে ডালিয়া জিজ্ঞেস করল, তোমার কি মনে হয় ওরা আমাদের খুঁজে পাবে, জে?

হ্যাঁ, পাবে।

তা হলে আমরা কী করব?

সেটা ওরা এলে পরে দেখা যাবে।

ভোরের দিকে হঠাৎ জেকবের ঘুম ভেঙে গেল। জেগেই ঘোড়াগুলোর দিকে চাইল সে। মাথা উঁচিয়ে কান খাড়া করে রয়েছে ওরা।

প্রথমে কিছুই শুনতে পায়নি সে; পরে দূর থেকে একটা শব্দ ওর কানে এল। শব্দটা আস্তে আস্তে বাড়ছে। ঘোড়ার শব্দ। অনেকগুলো ঘোড়া ছুটে চলেছে।

সকালে ডালিয়ার নাস্তা তৈরি করার ফাঁকে ক্যানিয়নের ভিতর গিয়ে তিরিশ চল্লিশটা বুনো ঘোড়র পায়ের ছাপ দেখতে পেল সে। ওদের মধ্যে সোনালী স্ট্যালিয়নটার ছাপও রয়েছে। দেখে মনে হচ্ছে ঘোড়াগুলো উত্তর দিকে নাকিয়া ক্যানিয়নের দিকেই গেছে।

তাড়াতাড়ি নাস্তা সেরে বেরিয়ে পড়ল ওরা।

.

খেপে রয়েছে লী। অগ্নি দৃষ্টিতে ইউজিনের দিকে চেয়ে সে বলল, মাঝে-মাঝে আমার মনে হয় শক্ত-পাল্লাকে খুঁজে পাওয়ার কোন দরকারই অনুভব করো না তোমরা।

গত কয়েক সপ্তাহ জেকবের খোঁজে অনবরত ঘোড়া ছুটিয়ে ইউজিনের মেজাজও বেশ চড়ে আছে। এই কয়েকটা সপ্তাহে ওর মনের বয়স অনেক বেড়ে গেছে। এতদিন সে সবসময়ে লী-র মন বুঝে চলার চেষ্টা করেছে-কিন্তু আর নয়। সারা জীবন অন্যের মত অনুযায়ী চলতে গেলে মানুষের আর নিজস্ব সত্তা বলে কিছু থাকে না।

একটা মানুষকে হত্যা করার উদ্দেশে আমি তোমাদের সাথে আসিনি। লোকটা যদি ডেরিককে কাপুরুষের মত পিছন থেকে গুলি করে মেরে থাকে তবে অবশ্যই তার ফাঁসি হওয়া উচিত। কিন্তু ওর পক্ষটাও আমাদের শুনতে হবে। সে দাবি করেছে অন্যায়ভাবে হত্যা করেনি সে।

দাবি? লী-র গলার স্বরটা কুৎসিত শোনাল। তুমি কি আশা করো? সাধু পুরুষের মত সে তার দোষ স্বীকার করবে?

অনেক সুযোগই সে পেয়েছে, ইচ্ছা করলেই আমাদের কয়েকজনকে সে হত্যা করতে পারত-কিন্তু করেনি। সত্যি কথা বলতে কি আমরা সবাই জানি ডেরিক একটু ঝগড়াটে প্রকৃতির ছিল, গায়ে পড়ে ঝগড়া বাধাতে পছন্দ করত সে। পিস্তলে ভাল হাত ছিল বলে নিজেকে বাহাদুর মনে করত।

ডেরিক সম্পর্কে আমাকে জ্ঞান দিতে চাও তুমি? তোমার আমি

শান্ত হও, লী, দৃঢ়সংযত কণ্ঠে বাধা দিল কীথ। ইউজিনের ওপর তোমার এভাবে চড়াও হবার কোন মানে হয় না।

কীথের দিকে ঘুরে চাইল লী। তুমিও?

ইউজিনের ওজন কম, ওকে পাত্তা না দিয়ে অবজ্ঞা করা চলে, কিন্তু কীপের বেলায় তা করা যায় না। কঠিন লোক কীথ। সে কারও সাতে-পাচে থাকে না বটে, কিন্তু ওর সাথে কেউ লাগতে গেলে একেবারে বারোটা বাজিয়ে ছেড়ে দেবে। সুবুদ্ধির পরিচয় দিয়ে লী নিজের রাগ সামলে নিল। কথও আর কোন কথা বলল না, আশ্বস্ত হয়ে কনুই-এ ভর দিয়ে কাত হয়ে বসল।

রাতের নিস্তব্ধতায় কেবল আগুনে কাঠ পোড়া পটপট শব্দ উঠছে মাঝে মাঝে। আগুনে আরও কয়েকটা কাঠ চাপিয়ে দিয়ে নীরবতা ভাঙল ইউজিন। ন্যায় বিচার হোক, সেটা চাই বলেই আমি এসেছি। ডেরিকের মৃত্যুর ঘটনাগুলো জানি

আমরা-ওই লোকটাকেও চিনি না। দূর থেকে দেখে আমি যেটুকু বুঝেছি তাতে ওকে কাপুরুষ কখনোই মনে হয়নি। ডেরিক শেষ পর্যন্ত যার সাথে পারবে না এমন লোকের সাথেই লাগতে গেছিল

অসম্ভব, ডেরিকের মত পিস্তল চালাতে আর কেউ জানে না। প্রতিবাদ করল লী, কিন্তু তার গলায় এখন আর আগের ঝাঁঝ নেই।

কেউ না? জিম কোর্টরাইট, ক্লে অ্যালিসন কিংবা ওয়াইল্ড বিল, কেউ পারে?

ওই লোকটা আর ওয়াইল্ড বিল এক হলো?

তুমি কী করে জানো? ট্রেইল থেকে যেটুকু বোঝা যায় তাতে তো শক্ত পাল্লাকে শক্ত-পাল্লা বলেই মনে হয়।

এ কথার কোন জবাব দিল না লী। বাতাসে কয়েকটা শুকনো পাতা উড়ল। আগুনের শিখাটাও একপাশে একটু হেলে গেল।

কাজ শেষ করার আগেই টের পাওয়া যাবে কত ধানে কত চাল, মন্তব্য করল কীথ

ভেবে দেখো, লী। নতুন একটা শহর গড়তে যাচ্ছি আমরা। স্বীকার করি এটা সবেমাত্র শুরু-কিন্তু একদিন এখানেই সুন্দর একটা শহর গড়ে উঠবে। আমাদেরই ছেলেমেয়েরা হেসে-খেলে বড় হবে ওই শহরে। একজন নির্দোষ মানুষকে যদি শুরুতেই আমরা বিনা বিচারে হত্যা করি, তার ফল কি শুভ হবে?

এবারেও জবাব দিল না লী। তার চোয়ালের পেশী দু’টো শক্ত হয়ে উঠল। মুখের ভাব দেখে বোঝা যাচ্ছে ওকে হাজারো যুক্তি দেখিয়েও কিছু কাজ হবে না-মনস্থির করে ফেলেছে ও

জ্বালানি কাঠ জোগাড় করে আনতে উঠল ইউজিন। কোমরে দু’হাত রেখে কয়েক মিনিট ভাবুকের মত আকাশের তারার দিকে চেয়ে রইল সে। যাক, মনে যা ছিল বলে ফেলে ভিতরটা অন্তত হালকা হয়েছে। বন্ধু সে নিশ্চয়ই চায়, কিন্তু মোসহেবি করে বন্ধুত্ব রক্ষা করার মানে হয় না। তার মানে হচ্ছে: মুখ বুজে চুপ করে না থেকে যাদের চিন্তা করার ক্ষমতা আছে তারা সবাই মুখ ফুটে তা জানালে সম্ভবত পৃথিবীর অর্ধেক ঝামেলাই মিটে যেত।

সেলুনে যে ঠিক কী ঘটেছিল তা একমাত্র ডেরিক আর শক্ত-পাল্লা ছাড়া কেউ জানে না। সবাই একমত যে শক্ত-পাল্লার পিস্তল নিয়ে ফেরত না এসে উপায় ছিল না। গায়ে পড়ে ঝগড়া বাধাতে যায়নি তোকটা-ডেরিকই ভীমরুলের চাকে খোঁচা দিয়ে নিজের বিপদ ডেকে এনেছে।

কাঠ নিয়ে ফিরে আসার সময়ে দূর থেকে লী-র কথার শেষটুকু ওর কানে গেল। …খুব বাড় বেড়েছে।

মিছেই ওর সাথে খোঁচাখুঁচি করছ তুমি, ওর পক্ষ সমর্থন করে বলছিল কীথ, ছেলেটা নির্ভেজাল। ওর সাথে লাগতে গেলে শেষ পর্যন্ত তোমার ওকে গুলি করতে হবে, নয়তো গুলি খেতে হবে।

ওই পুঁচকে ছোড়া?

লী-র স্বরে তাচ্ছিল্যের স্পষ্ট ইঙ্গিতে রাগে আর লজ্জায় লাল হয়ে উঠল ইউজিনের মুখ। ওখানেই থেমে দাঁড়াল সে।

কীথ জবাব দিল, গাধার মত কথা বোলো না, লী। নতুন নতুন ছেলেটা নরম ছিল-যে যা বলেছে তাই শুনতে হয়েছে ওকে। কিন্তু এখন কঠিন মাটিতে সগ্রাম করে টিকে থেকে কঠিন হয়েছে। এখন থেকে নিজের মত মতই চলবে সে।

রাতে ওরা যখন ঘুমাবার আয়োজন করছে, নিকোলাস তখন তার দুই সঙ্গীকে ক্যাম্প করার নির্দেশ দিল। ওদের মধ্যে দূরত্ব মাত্র এগারো মাইল। তিনটে ক্যাম্প মিলে একটা সমবাহু ত্রিভুজ তৈরি হয়েছে। তৃতীয় ক্যাম্পে আছে ডালিয়া আর জেকব।

.

গভীর ঘুম থেকে জেগে উঠল জেকব। পুবের আকাশটা ভোরের আলোয় ফিকে হয়ে এসেছে। একটা ঘোড়া নাক দিয়ে হাচি দেওয়ার মত শব্দ করে ওকে জাগিয়ে দিয়েছে। ঘুম থেকে জেগে উঠেই অভ্যাস মত নিজের বাকস্কিনটার দিকে চাইল জেকব। ঘোড়াটা মাথা উঁচু করে নাক ফুলিয়ে খাজের মুখটার দিকে চেয়ে আছে।

রও! রও! ঘোড়াটাকে শান্ত থাকার নির্দেশ দিয়ে রাইফেল হাতে ঝোঁপের আড়াল দিয়ে বাইরের দিকে এগোল জেকব। ধারের কাছে পৌঁছে উঁকি দিল-কিছুই চোখে পড়ল না। কোন শব্দও নেই।

শার্ট আর বুট ছাড়াই বেরিয়ে এসেছে ও। একবার ভাবল ফিরে ওগুলো পরে আসা দরকার। বুট ছাড়া এই অঞ্চলে চলাফেরা করা অসম্ভব। ফিরতে যাবে, ঠিক এই সময়ে আবছা ভাবে কিছু একটা নড়ে উঠতে দেখল সে। একটা ছায়া-একটু আগেও ছায়াটা ওখানে ছিল না-নাকি মনের ভুল?

বুট শার্ট আর কার্তুজের বেল্টসহ ডালিয়া উপস্থিত হলো ওর পাশে। ডালিয়াকে ছায়াটা দেখিয়ে ওদিকে নজর রাখতে বলে বুট আর বেল্ট পরে নিল জেকব। তৈরি হয়ে উঠে দাঁড়াতেই রাইফেলটা ওর হাতে ফিরিয়ে দিল ডালিয়া। অস্বাভাবিক কিছুই দেখতে পায়নি সে।

কিন্তু কিছু একটা নিশ্চয়ই ছিল ওখানে। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে ওদিকে কয়েক মুহূর্ত চেয়ে থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে আবার ওদিকেই আরও দূরে চাইল সে। হ্যাঁ, কিছু বা কেউ ছিল ওখানটায়। রাইফেলটা গাছের সাথে ঠেকা দিয়ে রেখে শান্তভাবে শার্টটা পরে নিল সে।

তা হলে লোকগুলো এসে পৌঁছে গেছেওদের মোকাবিলা করার ঝামেলা এড়ানোর অনেক চেষ্টা করেছে, ফল হয়নি। এবার থেকে আর এড়িয়ে চলবে না সে। মানা করার পরেও যখন এসেছে, ওদের যোগ্য মাশুল দিতে হবে।

হঠাৎ একটা লোককে ওদিক থেকে বেরিয়ে আসতে দেখা গেল। কমবয়সী, অপরিচিত।

লোকটার মাথায় একটা ভাজ-পড়া ময়লা টুপি। কোমরের দুপাশে দুটো পিস্তল ঝুলছে। পিস্তলের মাথা ফিতে দিয়ে উরুর সাথে বাধা। হাতে একটা হেনরি রাইফেল। মাটির উপর কিছু একটা খুঁজছে লোকটা! কোন পরিচিত চিহ্ন।

নীরবে দাঁড়িয়ে ওরা লোকটাকে লক্ষ করছে। ধীরে ধীরে কাছে এগিয়ে আসছে। পিছন ফিরে একবার মেসাটা ভাল করে দেখে নিয়ে ঘুরে উপর দিকে মুখ তুলে ওরা যেখানে ঝোঁপের আড়ালে দাঁড়িয়ে আছে সোজা সেদিকেই চাইল। আড়ালে রয়েছে বলে জেকবদের দেখতে পাচ্ছে না লোকটা।

পায়ের ছাপ দেখে এগোচ্ছে না ও, বলল জেকব। উদ্দেশ্য যা-ই হোক, লোকটা আমাদের খুঁজছে না।

তা হলে কী খুঁজছে লোকটা? হারানো ওয়্যাগন খুজছে না তো?

এতদূরে এখানে কী করে থাকবে ওগুলো? বেশ কয়েক মাইল দক্ষিণে ছিল ওয়্যাগন-এখান থেকে অন্তত দশ পনেরো মাইল দূরে। কিন্তু তাই কী? লোকটার আচরণে মনে হয় সে যেন কিছু একটা জানে। এদিক ওদিক খেয়াল খুশিমত খোঁজাখুঁজি না করে বিশেষ কোন চিহ্ন বা জায়গা খুঁজছে সে।

পিছন থেকে একটা অস্পষ্ট শব্দ জেকবের কানে এল। পাথরে মোটা কাপড় ঘষা খাওয়ার আওয়াজ। চট করে বাম হাঁটু গেড়ে বসে ঘুরেই রাইফেল তুলে গুলি করার জন্য প্রস্তুত হলো সে।

মাথার উপর হাত তুলে দাড়িয়ে আছে কেলভিন

রাইফেলটা স্থিরভাবে তাক করে বসে রইল জেকব। কেলভিন এগিয়ে এল। ওর পিছনে ওর ঘোড়া-তার পিছনে মালটানা একটা ঘোড়া। বিশ গজ দূরে। থাকতেই ওকে থামাল জেকব

পথ হারিয়েছ নাকি?

তুমি তো আমাকে চেনো, হাসল কেলভিন। ওয়্যাগনগুলোই হারিয়েছে এখনও খুঁজছি।

যেসব লোক পিছন থেকে আমার দিকে আসে, তাদের পছন্দ করি না আমি

সেজন্যে তোমাকে দোষ দিই না; তবে আমাকে পছন্দ না করেও তোমার উপায় নেই। কারণ দেখা যাচ্ছে একমাত্র আমিই তোমার শুভাকাক্ষী।

অর্থাৎ?

তুমি যাওয়ার পরে লী এসে হাজির। সাথে কীথ আর ইউজিন। বার্ট আর ক্লাইভ তোমাদের কাল ভ্যালিতে যাওয়ার কথা জানালে লী হেসেই উড়িয়ে দিল কথাটা।

যাক, চেষ্টা যা করার করেছি আমি।

নিকোলাসও তার দু’জন সঙ্গীসহ এই এলাকাতেই আছে।

হাতের ইশারায় নীচের দিকে দেখাল জেকব। ওই লোকটা কি ওর সঙ্গীদের একজন?

এগিয়ে এসে ঝুঁকে উঁকি দিল কেলভিন। ওর মুখ দিয়ে আপনাআপনি একটা গালি বেরিয়ে এল। ওই লোকটাই মন্টি, জেকব। হারানো ওয়্যাগনের দলটার সাথে ছিল ও।

কোনদিকেই খেয়াল না করে জেকবদের মেসার পাশ দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে মন্টি। দেখো! ফিসফিস করে বলল কেলভিন। জায়গাটা চিনতে পেরেছে ও! নিশ্চয়ই কোন চিহ্ন খুঁজে পেয়েছে। সেই রকমই মনে হচ্ছে। মন্টির মধ্যে উত্তেজিত ভাব সুস্পষ্ট। বেশ জলদি হাঁটতে শুরু করছে সে।

ঠিক সেই মুহূর্তে ঘোড়ার খুরের শব্দ উঠল। সেই সাথে চিৎকার শোনা গেল, মন্টি! মাথা খারাপ হয়েছে তোমার? ওদিকে কোথায় যাচ্ছ?

স্বাস্থ্যবান আর বেঁটে একটা অপরিচিত লোককে ঘোড়ায় চড়ে আসতে দেখল জেকব। লোকটা নিকোলাসের অপর সঙ্গী।

জলদি ফিরে যাও তুমি। না বলে না কয়ে হাওয়া হয়ে গেছ দেখে বস্ খেপে আগুন হয়ে আছে। এদিকে কী খুঁজছ?

ছাপ খুঁজে বেড়াচ্ছি-মনে হলো যেন কী একটা দেখলাম।

ঠিক আছে, চলো এবার ফেরা যাক।

ঘোড়ার মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে যাবার জন্য তৈরি হলো লোকটা। সে পিছন ফিরতেই ওর পিঠ লক্ষ্য করে রাইফেল তুলল মন্টি। তারপর আবার কী ভেবে সেটা নামিয়ে নিল।

জেকবের দিকে আড়চোখে চেয়ে কেলভিন বলল, লোকটা জানতেও পারল মৃত্যুর কত কাছ থেকে আবার ফিরে এল সে।

হয়তো এই লোকটাই ওর সঙ্গীদের খুন করেছিল, বলল জেকব।

মন্টি? বিস্ময় প্রকাশ পেল কেলভিনের স্বরে। কিন্তু তার মনেও একই সন্দেহ উঁকি দিয়েছে তাই যতটা অবাক হওয়া উচিত ছিল, ততটা অবাক হলো না সে। কিন্তু তখন তো ও একেবারেই ছেলেমানুষ ছিল।

মানুষ খুন কমতে কত বড় হওয়া লাগে? শুকনো গলায় প্রশ্ন করল জেকব। তারপর জবাবের অপেক্ষা না করেই আবার বলল, আমি ইন্ডিয়ানদের সাথে প্রথম যুদ্ধ করেছি বারো বৎসর বয়সে।

ঘোড়ায় চড়ে অদৃশ্য হয়ে গেল ওরা। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল কেলভিন। ওর কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে।

এর মানেটা বুঝতে পারছ তো? এতদিন সবাই মনে করেছিল জায়গাটা আরও অনেক দক্ষিণে, তাই সবাই ওই দিকেই খোঁজ করেছে। আমি বাজি রেখে বলতে পারি মন্টি কিছু একটা চিহ্ন দেখে জায়গাটা চিনেছে।

প্রথমে ডালিয়ার দিকে পরে জেকবের দিকে চাইল কেলভিন। তারপরে উল্লসিত ভাবে সে বলল, বুঝতে পারছ তো, আমি শিগগিরই বড়লোক হতে যাচ্ছি।

আমার মনে হয় সোনা খোঁজার কাজে অনেক প্রতিযোগী পাবে তুমি। ওখানে যারা আমাকে খুঁজে বেড়াচ্ছে, সোনার গন্ধ পেলে তারাও সবাই ছুটে আসবে সোনা খুঁজতে। এখন তুমি ওই সোনা পেলে তাতে তোমার বিপদের সম্ভাবনাই বেশি।

জেকবের কথা কেলভিনের কানে যায়নি। উত্তেজিত ভাবে সে বলে চলল, ভেবে দেখো, মন্টিকে ওরা বেঁধে রেখে সোনা লুকাতে গিয়েছিল। তার মানে যেখানে ওকে বেঁধে রাখা হয়েছিল তারই আশেপাশের কোন চিহ্ন দেখে সে জায়গাটা চিনেছে। আনন্দে বিভোর হয়ে বিহ্বল দৃষ্টিতে চারপাশে চোখ বুলাল সে। আমি নিশ্চিত হয়ে বলতে পারি এখান থেকে এক মাইলের মধ্যেই কোথাও ওই সোনা লুকানো আছে। এমনকী আরও কাছেও থাকতে পারে!

লোক দুটো যেদিকে অদৃশ্য হয়েছে সেদিকে চেয়ে রয়েছে জেকব। এই মন্টিই যদি সেই ছেলেটা হয়ে থাকে তবে সে গুপ্তধনের এত কাছে থেকে কিছুতেই এই এলাকা ছেড়ে কোথাও যেতে চাইবে না। তা হলে কী করবে সে? সঙ্গীদের চোখে ধুলো দিয়ে কেটে পড়বে-নাকি আগের মত আবার খুন করবে? যাই ঘটুক, ফাঁসির দড়িটা তার গলাতেই এঁটে বসছে।

এখান থেকে কোনদিকে যাবার পথ নেই। উত্তর দিকে স্যান জুয়ান ক্যানিয়ন। দুই ধারেই বিশাল উঁচু ক্লিফ। ওর ভিতর দিয়ে নির্দিষ্ট একটা দিকেই কেবল যাওয়া সম্ভব। পুব দিকে গৌতিক স্মৃতিসৌধের উপত্যকা, মাইলের পর মাইল খোলা জায়গা। ওদিকে গেলে সহজেই ধরা পড়ে যাবে ওরা।

একটা মেয়ে সঙ্গে নিয়ে চুপচাপ বসে থাকা ছাড়া এখন ওর আর দ্বিতীয় কোন পথ নেই। কপাল ভাল থাকলে ওরা হয়তো অন্যদিকে চলে যাবে।

আমি নীচে যাচ্ছি, বলে রাইফেল হাতে উঠে দাঁড়াল কেলভিন। কিন্তু সে পা বাড়াবার আগেই জেকব বলে উঠল, তোমাকে এখন আর ঝুঁকি নিয়ে যেতে দিতে পারি না আমি-তোমাকে আমাদের সাথেই থাকতে হবে।

কেলভিনের দিকে তাক করে ধরা রয়েছে জেকবের পিস্তল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *