০৮. পড়ার পরেও অনেকক্ষণ কেউ কথা বলল না

পড়ার পরেও অনেকক্ষণ কেউ কথা বলল না। তাকিয়েই রয়েছে কাগজটার দিকে। তারপর হঠাৎ নড়ে উঠল কিশোর। প্রায় খাবলা দিয়ে তুলে নিয়েছে বাক্সের বাকি দুটো ফরচুন কুকি। দুটোর মোড়কেই একই হুঁশিয়ারি লেখা রয়েছে।

চিংড়ি মেশানো ফ্রাইড রাইসের বাক্সটা টেনে নিয়েছিল রবিন, এই হুঁশিয়ারি পড়ার পর ঠেলে সরিয়ে দিল টেবিলের কোণে। খিদে গেছে! বিষ খেয়ে মরার চেয়ে না খেয়ে থাকা ভাল!

টেলিফোনের দিকে হাত বাড়াল মুসা।

কাকে করবে? জিজ্ঞেস করল কিশোর।

ডেই ডং রেস্টুরেন্ট। কার কাজ জানা দরকার।

করা উচিত, রবিন বলল।

না, নিষেধ করল কিশোর। দরকার নেই।

কেন? মুসার প্রশ্ন।

কারণ আমি জানি কি ঘটেছে।

কী?

চুপ করে আছ কেন? অধৈর্য ভঙ্গিতে হাত নাড়ল রবিন।

রেস্টুরেন্টের কোন একজন ওয়েইটার ওই কাগজ দিয়ে কুকি মুড়ে দিয়েছে। এবং সেটা করেছে, কেউ একজন এসে তাকে পাঁচটা ডলার হাতে গুঁজে দিয়ে করতে বলেছে বলে। ওয়েইটারকে বলেছে, এটা একটা রসিকতা। ওয়েইটারও কিছু বুঝতে পারেনি। করে দিয়েছে কাজটা।

তুমি কি করে জানলে? জিজ্ঞেস করল মুসা।

জানি, ব্যস। বিশ্বাস করতে পারো আমার কথা।

নিশ্চয় করি… রবিন শুরু করল।

মুসা শেষ করল, কারণ তোমার অনুমান সাধারণত ভুল হয় না। আরও একটা ব্যাপার জানি, কথা লুকাতে তুমি ওস্তাদ।

বেশ, দোষই যখন দিলে, বলেই ফেলি, কিশোর বলল। আমি জানলাম, অর্থাৎ বুঝতে পারলাম, তার কারণ এ রকম রসিকতা আমিও করেছি। ফরচুন কুকিতে।

কি লিখেছিলে? রবিন জিজ্ঞেস করল।

ভাল কথাই লিখেছিলাম। লোককে হাসানোর জন্যে। এটার মত হুশিয়ারি নয়। বিষ খাওয়ানোর ভয় দেখাইনি লোককে। একটা মুহূর্ত নীরব হয়ে রইল কিশোর। ভাবছি, এই নিয়ে দ্বিতীয়বার সাবধান করা হলো আমাদেরকে। প্রথমবার করল মুসার গাড়ির ব্রেক নষ্ট করে দিয়ে। আর এবার তো লিখেই হুমকি দিল। প্রথমে মনে করেছিলাম, ব্রেক নষ্ট করার ব্যাপারটার সঙ্গে খাবারে বিষ মেশানোর যোগাযোগ নেই। এখন মনে হচ্ছে, আছে। অদ্ভুত কিছু একটা ঘটছে, বিশ্বাস না করে আর পারা যাচ্ছে না। আরও সতর্ক থাকতে হবে। নজর রাখা হচ্ছে আমাদের ওপর।

যে-লোক এই কাজ করছে, মুসা অনুমান করল। সে আর্মি ক্যামমাফ্লেজ জ্যাকেট পরে, পোরশে কনভারটিবল গাড়ি চালায়। ঠিক?

হলে অবাক হব না। আমাদের ব্যাপারে খোঁজখবর রাখে সে।

কিশোরের কথা শেষ হতে না হতেই ফোন বেজে উঠল। চমকে দিল তিনজনকেই। রিসিভার তুলে নিল কিশোর। কানে ঠেকিয়ে বলল, তিন গোয়েন্দার কিশোর পাশা বলছি।

তোমাকেই খুঁজছি! অন্য প্রান্তে গমগম করে উঠল একটা কণ্ঠ। চিকেন হার্বার্ট লারসেনের সঙ্গে কথা বলছ তুমি, পুত্র।

রিসিভারের মাউথপিসে হাত চাপা দিয়ে দুই সহকারীকে ফিসফিস করে জানাল গোয়েন্দাপ্রধান, চিকেন!

কি জন্যে করেছে জিজ্ঞেস কর, মুসা বলল। কুকির মোড়কের লেখাটার কথাটা জানে কিনা তা-ও জিজ্ঞেস কর।

মাথা নেড়ে মুসাকে চুপ থাকতে বলল কিশোর।

শোননা, লারসেন বললেন। একটা সুখবর আছে তোমাদের জন্যে। কাল ড্রিপিং চিকেনের বিজ্ঞাপন তৈরি হবে। টিভিতে যাবে। চিকেন হিস্টরি নিয়ে আলোচনা হতে পারে। হলে তোমাকে ছাড়া পারব না।

নিজের সৌভাগ্যকে বিশ্বাস করতে পারছে না যেন কিশোর। ঠিক এ রকম সুযোগই চাইছিল সে। চিকেন লারসেনের কাছাকাছি থেকে তাঁর ওপর নজর রাখতে পারে এমন কিছু।

কখন? কোথায়? জিজ্ঞেস করল সে।

আল্টা ভিস্টা ড্রাইভের মালটিন মিক্স স্টুডিওতে। একটায়। সময়মত হাজির হয়ে যাবে আমার টিম।

কেটে দেয়া হলো লাইন।

সেদিন অনেক রাতে, মুসা আর রবিন চলে যাওয়ার পর চিকেন লারসেনের বিজ্ঞাপনগুলো রেকর্ড করে রাখা একটা ভিডিও ক্যাসেট চালিয়ে দেখতে বসল কিশোর। বড় একটা ডেস্কে বসেন তিনি। ওপরে জিনিসপত্র ছড়ানো ছিটানো, খুবই অগোছাল। যেন একাধারে ওটা একটা অফিস, লাইব্রেরি আর গেম রুমের মিশ্রণ। নানা ধরনের বেশ কিছু বিজ্ঞাপন আছে। কিশোরের পছন্দ হেট আ হ্যাঁমবারগার উইক নামের বিজ্ঞাপনটা, যেটাতে একটা গরুর মুখে গলিত মাখন ছিটিয়ে দেন লারসেন। আরেকটা ভাল বিজ্ঞাপন আছে। সেটাতে ক্যামেরার দিকে, সারাক্ষণ পিঠ দিয়ে থাকেন, কারণ তিনি বোঝাতে চান রেগে গেছেন, জন্মদিনের তারিখ ভুল করে ফেলেছেন বলে।

তবে তার সব চেয়ে পছন্দ, যেটাতে লারসেন দুটো নতুন ধরনের খাবার পরিবেশন করেন। একটার নাম ক্র্যাকলিন ক্রাঞ্চি, আরেকটা বার্নিং বারবে। লাস ভেগাস-এর এক মন্ত্রীর বিবাহবার্ষিকীতে ভোজ দেয়া হয়। তাতে আস্ত দুটো মুরগীকে বিশেষ প্রক্রিয়ায় রান্না করে টেবিলে সাজিয়ে দেয়া হয়। একটাকে পরানো থাকে বরের পোশাক, আরেকটাকে কনের। কাপড় দিয়ে নয়। মাখন আর খাবার উপযোগী অন্যান্য মালমশলা দিয়ে। সেখানে উপস্থিত থাকেন চিকেন লারসেন। নানা রকম মজার মজার কথা বলেন।

টেপটা শেষ হয়ে গেলে ভিসিআর বন্ধ করে শুতে গেল কিশোর। কিন্তু অস্থির একটা রাত কাটাতে হলো। ভাবনার মধ্যে কেবলই ঘুরে ফিরে আসতে লাগল জুনের কথা। ঘোরের মাঝে কি বাবার কথাই বলেছিল সে? লারসেনই খাবারে বিষ মেশানোর পরিকল্পনা করেছেন? তিনিই যদি করে থাকেন, লক্ষ লক্ষ মানুষ মারার সিদ্ধান্ত তিনি কেন নিয়েছেন?

পরদিন কাঁটায় কাঁটায় একটায় বেভারলি হিলের কাছে মালটিন মিক্স স্টুডিওতে হাজির হলো রবিন আর কিশোর। দুই মিনিট পরে মায়ের গাড়িটাতে করে এল মুসা আর ফারিহা।

এই দেখ, কিশোরকে বলল রবিন। গাড়ি নেই দেখে তোমার কত অস্থিরতা। মুসারটা যে থেকেও নেই? খালি খালি তো গজগজ করো..

ও তো ওর মায়েরটা নিয়ে এসেছে।

তুমিও ইয়ার্ডেরটা নিয়ে আসতে পারো।

ওই ভাঙা পিকআপ কে চালাতে যায়, এক মুহূর্ত চুপ থাকল কিশোর। বেশ, মুসার গাড়িটা যতদিন ঠিক না হয়, চুপ থাকব। হলেই আবার শুরু করব।

তোমাকে কে কিনে নিতে মানা করেছে?

এই প্রশ্নটা করলেই চুপ হয়ে যায় কিশোর। কারণ সে যেভাবে যে জিনিস চায়, সেটা অল্প পয়সায় জোগাড় করা কঠিন। ও চায়, এমন একটা গাড়ি, যাতে অনেক ধরনের আধুনিক যন্ত্রপাতি সাজানো থাকবে। গোয়েন্দাগিরির অনেক সুবিধে হবে। অর্ডার দিয়ে বানাতে হবে সে সব। অত টাকাও নেই, আপাতত কিনতেও পারছে না। কিন্তু ক্ষোভটা ঠিকই প্রকাশ করতে থাকে। কিংবা হয়তো ক্ষোভের মাধ্যমেই অটো সাজেশন দেয় নিজেকে, আর কিছুদিন ধৈর্য ধর, কিনব, কিনব!

স্টুডিয়োয় ঢোকার মুখে দেখা হয়ে গেল জুনের সঙ্গে। মাথায় একটা রূপার মুকুট পরেছে। আর মুকুটের ওপর অবশ্যই বসে আছে একটা রূপার মুরগী।

এসেছ, কিশোরকে দেখে হেসে বলল জুন। বাবা তোমার কথা জিজ্ঞেস করছিল। নতুন কোন খবর আছে?

না। তবে কাল রাতে কিছু ফরচুন কুকি কিনে নিয়ে গিয়েছিলাম। তাতে বুঝেছি, ঠিক পথেই এগোচ্ছি আমরা।

গুড। আমার ব্রিফকেসটা যত তাড়াতাড়ি পারো বের করে দাও। ভেতরে কি ছিল এখনও মনে করতে পারছি না। তবে ওটা আমার চাই। মনে হচ্ছে ওটাতে জরুরী কিছু আছে।

তারপর তিন গোয়েন্দা আর ফারিহাকে নিয়ে চলল স্টুডিওর কাচে ঘেরা একটা অংশে, প্রোডাকশন বুদে। চিকেন লারসেনের অফিসের অনেকেই আছে ওখানে, ডন বারোজ সহ।

বিজ্ঞাপনের জন্যে সেট সাজানো হয়েছে। টেবিলে চিঠির স্তূপ, শূন্য কফির কাপ, রবারের মুরগী, রোস্ট করা মুরগীর ছবি–তৃতীয় শ্রেণীর আর্টিস্ট দিয়ে। আঁকানো হয়েছে ইচ্ছে করেই, আর হ্যালোউইন চিকেন কস্টিউম পোশাক পরা জুনের শিশুকালের একটা ছবি।

অবশেষে মাইক্রোফোনে পার্সোন্যাল অ্যাসিসটেন্টকে ডাকলেন পরিচালক, আমরা রেডি। চিকেন লারসেনকে ডেকে আনাও। দেখো, মেকআপ হয়েছে কিনা।

মিনিটখানেক পরে ঢুকলেন লারসেন। পরনে লাল জগিং স্যুট, সাদা এবং নীল স্ট্রাইপ দেয়া। ওপরের ঠোঁট আর নাক জুড়ে আটকানো রয়েছে রবারের তৈরি একটা মুরগীর ঠোঁট। হাতে রূপার তৈরি বড় একটা অ্যানটিকের ট্রে, রূপার ঢাকনা দেয়া। তীব্র আলোয় এসে সামান্য কুঁকড়ে গিয়ে বুদের ভেতরটা দেখার চেষ্টা করলেন।

আমার লোক আছে? ডেকে জিজ্ঞেস করলেন তিনি।

আছে, মিস্টার লারসেন, পরিচালক বললেন। সুইভেল চেয়ারে বসেই ঘুরে তাকালেন কিশোরের দিকে। চিকেন লারসেনের অফিশিয়াল টেন ইয়ার অ্যানিভারসারি টি-শার্ট গায়ে দেয়ানো হয়েছে তাকে। শার্টে একটা মুরগীর ছবি আঁকা, মাথার জায়গায় মুরগীর মাথার পরিবর্তে আঁকা হয়েছে লারসেনের মুখ।

ডন বলেছে, কিশোরকে বললেন লারসেন। ড্রিপিং চিকেনের স্যাম্পল খেয়ে খুব খুশি হয়েছে। আজ সবার জন্যেই প্রচুর পরিমাণে নিয়ে আসা হয়েছে।

ফিসফিস করে মুসা বলল কিশোরের কানে, অত ভাল প্যান্টটা পরে আসা উচিত হয়নি আজ।

আরাম করে চেয়ারে বসে টেবিলের ওপর পা তুলে দিলেন লারসেন।

পরিচালক ঘোষণা করলেন, দয়া করে চুপ করুন সবাই। ড্রিপিং চিকেন। টেক ওয়ান!

ক্যামেরার চোখের দিকে তাকিয়ে যেন টিভি দর্শকদের সঙ্গে কথা বলতে আরম্ভ করলেন লারসেন।

বন্ধুরা, বলছেন তিনি। আমি, আপনাদের প্রিয় চিকেন লারসেন বলছি। আপনারা জানেন, অহেতুক আপনাদের সামনে হাজির হই না আমি। হই তখনই, এখন আপনাদের পকেট খালি করে আমার পকেট ভরানোর কোন একটা উপায় বের করে ফেলি। বিশ্বাস করুন, এই বার আগের চেয়ে অনেক বেশি খসাব আমি, কিছুতেই ধরে রাখতে পারবেন না। চাকা আবিষ্কারের সময় আমি সেখানে হাজির ছিলাম না। পেনিসিলিন আবিষ্কারের সময় ছিলাম না। এমনকি পেপার ক্লিপ জাতীয় জিনিসগুলো যখন আবিষ্কার হয়, তখনও সেখানে হাজির ছিলাম না। ইতিহাসের অইসব বিস্ময়কর মুহূর্তগুলোতে আমার কোন প্রয়োজন পড়েনি কিংবা হয়তো প্রয়োজন হয়েছিল, খবরও দেয়া হয়েছিল, কিন্তু সেই খবর আমাকে বলতে ভুলে গেছে আমার সেক্রেটারি। আর এই সন্দেহেই আমি তাকে চাকরি থেকে বিদেয় করে দিয়েছি। হাহ হাহ হা! তবে আজকে আমি আর শুধু ইতিহাস তৈরি করতেই যাচ্ছি না, ইতিহাসকে খেয়ে ফেলতে চলেছি।

রূপার ট্রের ওপর থেকে ঢাকনা সরালেন লারসেন। ধোঁয়া উঠতে লাগল স্তূপ করে রাখা ড্রিপিং চিকেন থেকে। খাবারের চেহারা দেখেই উহ আহ শুরু করে দিন প্রোডাকশন বুদের লোকেরা।

একটা স্যান্ডউইচ তুলে নিয়ে মুখের কাছে নিয়ে গেলেন লারসেন। এগিয়ে গেল ক্যামেরা, কাছে থেকে ছবি তোলার জন্যে। ঢোক গিলল তিন গোয়েন্দা সত্যিই কি তিনি খাবেন?

সেই সভ্যতার গোড়া থেকেই যে কাজ করার চেষ্টা করে এসেছে মানুষ পারেনি, সেটাই সফল করেছি আমি। সৃষ্টি করেছি ড্রিপিং চিকেন। প্রতি কামড় খাবার রসময় করে তুলবে রসনাকে। আরও ব্যাপার আছে। প্রতিটি স্যান্ডউইচে ভেতরে একটা বিশেষ জিনিস ভরে দিতে বলেছি আমার রাঁধুনিকে। এমন কিছু, যা লোকে কল্পনাই করতে পারবে না। দেয়া হয়েছে। আমি আর অপেক্ষা করতে পারছি না, দেখতে চাইছি, এখনই দোকানে ছুটছেন কেনার জন্যে। কিনে গপগপ করে গিলতে থাকুন। এই ভাবে…

বলেই হাঁ করে বিরাট এক কামড় বসালেন লারসেন। বড় একটুকরো স্যান্ডউইচ কেটে নিয়ে চিবাতে লাগলেন। রঙিন রস গড়াতে শুরু করল ঠোঁটের দু কোণ থেকে। ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে দরাজ হাসি হাসলেন।

কাট! চিৎকার করে আদেশ দিলেন পরিচালক। দারুণ হয়েছে!

কয়েকটা আলোর উজ্জ্বলতা কমিয়ে দেয়া হলো। উত্তেজনা কমে গেল বুদের লোকের। ফারিহা বলল গোয়েন্দাদেরকে, ঐতিহাসিক একটা লেকচার দিলে লারসেন!

কিন্তু ওর কথায় কান নেই তিন গোয়েন্দার। স্টুডিওর কাচের দেয়ালের ভেতর দিয়ে তাকিয়ে রয়েছে লারসেনের দিকে। চিবানো ড্রিপিং চিকেন গেলেননি তিনি মুখ থেকে বের করে ফেলে দিলেন ওয়েস্ট বাস্কেটে।

মনে হলো, যেন তিনি জানেন বিষ রয়েছে ওই খাবারে। মানুষের শরীরে জন্যে ক্ষতিকর, মারাত্মক বিষ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *