০৮. পূর্ণ হয়ে উঠলো টুর্নামেন্ট মাঠের গ্যালারি

পরদিন সকাল দশটা নাগাদ আবার পূর্ণ হয়ে উঠলো টুর্নামেন্ট মাঠের গ্যালারিগুলো। কালকের মতো আজও প্রতিযোগিতা দেখার জন্যে সমবেত হয়েছে হাজার হাজার লোক। অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে তারা, কখন রাজকুমার জন আসবেন। তিনি না আসা পর্যন্ত শুরু হবে না প্রতিযোগিতা।

অবশেষে শোনা গেল ট্রাম্পেটের তীক্ষ্ণ আওয়াজ। এসে গেছেন জন। সঙ্গে তাঁর সহচররা। কিছুক্ষণ পরেই এলেন সেড্রিক মেয়ে রোয়েনাকে নিয়ে। আজ অ্যাথেলস্টেন নেই ওঁদের সঙ্গে। টুর্নামেন্টে যোগ দেবে বলে আগেই এসে গেছে সে। যুদ্ধের সাজে তৈরি।

আসন গ্রহণ করেই সেড্রিক খুঁজতে লাগলেন অ্যাথেলস্টেনকে। এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই সবিস্ময়ে আবিষ্কার করলেন, নরম্যান নাইট বোয়াগিলবার্টের দলে যোগ দিয়ে লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছে সে।

অ্যাথেলস্টেন বহুদিন ধরেই আশা করে আছে রোয়েনাকে সে বিয়ে করবে। সেড্রিকও তাকে এ ধরনের আভাসই দিয়েছেন। সে আরও আশা করেছিলো, আজকের টুর্নামেন্টে বিজয়ী হয়ে সে-ই রোয়েনাকে সৌন্দর্য ও প্রেমের রানী নির্বাচিত করবে। মাঝখান থেকে কাল সেই তরুণ নাইট বিজয়ী হয়ে তার সব আশা আকাক্ষা মাটি করে দিয়েছে। অদ্ভুত এক ঈর্ষায় জ্বলছে তাঁর হৃদয়। নাম না জানা সেই নাইট রোয়েনাকেই নির্বাচিত করলো কেন? সে কি তবে ভালোবাসে রোয়েনাকে? আর রোয়েনা? সে-ও কি ভালোবাসে ঐ নাম গোত্রহীন নাইটকে? এই চিন্তাটাই বিশেষভাবে খেপিয়ে তুলেছে অ্যাথেলস্টেনকে। তাই মনের ঝাল মেটানোর জন্যে সে যোগ দিয়েছে শত্রুপক্ষে। আশা, উত্তরাধিকার বঞ্চিত নাইটকে আজ সে পরাজিত করবে।

রাজপুত্র জনের ইচ্ছায় দ্য ব্রেসি এবং তার সহযোগী যোদ্ধারাও দলবেঁধে যোগ দিয়েছে টেম্পলার ব্রায়ানের পক্ষে। জনের ইচ্ছা ব্রায়ানের দলই বিজয়ী হোক।

অন্যদিকে বেশ কয়েকজন স্যাক্সন, নরম্যান, এবং বিদেশী নাইট গতকালের বিজয়ীর পক্ষ নিয়েছে। তরুণ নাইট কাল যে বীরত্ব দেখিয়েছে তাতে এই নাইটদের ধারণা হয়েছে ওর পক্ষে যোগ দিলেই জয়ী হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।

রোয়েনাকে দেখেই রাজপুত্র জন এগিয়ে গেলেন অভ্যর্থনা জানানোর জন্যে। নিজে সাথে করে নিয়ে গেলেন সৌন্দর্য ও প্রেমের রানীর জন্যে সাজিয়ে রাখা সিংহাসনের কাছে।

আপনাদের রানীকে সঙ্গ দিন, উপস্থিত সম্রান্ত ও অভিজাত মহিলাদের নির্দেশ দিলেন জন।

কিছুক্ষণের ভেতর দেখা গেল অনেক কজন সুন্দরী রমণী ঘিরে দাঁড়িয়েছে রোয়েনাকে। চাঁদের জ্যোৎস্নার কাছে যেমন তারারা সব ম্লান হয়ে যায় তেমনি রোয়েনার সৌন্দর্যের কাছে ম্লান হয়ে গেল সব রূপসীর রূপ। রোয়েনা আসন গ্রহণ করতেই দর্শকরা করতালি দিয়ে অভিনন্দিত করলো তাকে। সেই সাথে হর্ষোৎফুল্ল চিৎকার।

ঘোষকরা এগিয়ে এলো এবার। দর্শকদের দিকে তাকিয়ে নিস্তব্ধতা প্রার্থনা করলো তারা। তারপর উচ্চকণ্ঠে ঘোষণা করলো আজকের দিনের নিয়মাবলী।

আজ লড়াইয়ে তরবারি এবং বর্শা দুই-ই ব্যবহার করা যাবে। তাই কয়েকটা ব্যাপারে সতর্ক হতে হবে প্রতিযোগীদের। তলোয়ার দিয়ে শুধু আঘাত করা চলবে, কোনো সময়ই তা প্রতিদ্বন্দ্বীর শরীরে বিদ্ধ করা যাবে না। নাইটরা ইচেছ করলে কুঠার ব্যবহার করতে পারবে, কিন্তু ছোরার ব্যবহার নিষিদ্ধ। কোনো যোদ্ধা ঘোড়া থেকে পড়ে গেলে মাটিতে দাঁড়িয়েও সে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারবে, তবে সেক্ষেত্রে প্রতিপক্ষকেও ঘোড়া থেকে নামতে হবে। ঘোড়ায় চড়ে কোনো নাইটই মাটিতে দাঁড়ানো প্রতিদ্বন্দ্বীকে কোনো রকম আঘাত করতে পারবে না। যদি কোনো নাইট পিছু হটতে হটতে নিজের তাঁবুর দিকে যেতে বাধ্য হয় এবং সেখানকার বেষ্টনী স্পর্শ করে তাহলে সে পরাজিত বলে গণ্য হবে। কোনো নাইট যদি ঘোড়া থেকে পড়ে আহত হয় বা কোনো কারণে নিজে নিজে উঠে দাঁড়াতে না পারে তাহলে তার অনুচর বা পার্শ্বচররা এসে তাকে তুলে নিয়ে যেতে পারবে। তবে এক্ষেত্রে সেই নাইট পরাজিত বলে গণ্য হবে। পরাজিত নাইটদের ঘোড়া, বর্ম ও অস্ত্রশস্ত্র বিজয়ী নাইটদের প্রাপ্য হবে। রাজপুত্র জন যে মুহূর্তে প্রতিযোগিতা বন্ধের ইঙ্গিত করবেন সে মুহূর্তে লড়াই থামিয়ে দিতে হবে দুপক্ষকেই। কোনো নাইট যদি এ সব নিয়ম লঙ্ন করে তবে তাকে অযোগ্য ঘোষণা করা হবে এবং প্রতিযোগিতা থেকে বের করে দেয়া হবে।

ঘোষণা শেষ করে যার যার জায়গায় গিয়ে দাঁড়ালো ঘোষকরা। তীরে এক সাথে বেজে উঠলো অনেকগুলো ট্রাম্পেট। ক্ষেত্ব এখন তৈরি প্রতিযোগিতার জন্যে।

দীর্ঘ সারি বেঁধে মাঠে প্রবেশ করলে স্যার ব্রায়ান দ্য বোয়া-গিলবার্ট ও তার চব্বিশজন সহযোগী। দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে দুই সারিতে দাঁড়িয়ে পড়লো তারা। এক সারির পেছনে আরেকটা। দলপতি দাঁড়িয়েছে সামনের সারির ঠিক মাঝখানে।

এরপর প্রবেশ করলো গৃহহীন নাইট, মাঠের অন্যপ্রান্ত দিয়ে। সঙ্গে তার চব্বিশ সহযোগী। তারাও একইভাবে দুই সারিতে ভাগ হয়ে দাঁড়িয়ে গেল।

অভূতপূর্ব একটা দৃশ্য! পঞ্চাশ জন সাহসী নাইট অপেক্ষা করছে ঘোড়ার পিঠে বসে। প্রত্যেকের হাতে বর্শা। বর্শার মাথায় বাঁধা রঙচঙে পতাকাগুলো উড়ছে বাতাসে। বর্শার ফলাগুলো রোদ পড়ে ঝিক করে উঠছে। রোদ প্রতিফলিত হচ্ছে তাদের শিরোম্রাণে, বর্মে। ঘোড়াগুলো অস্থির। পা দিয়ে মাটিতে আঘাত করছে একটু পরপরই। যেন ছুটবার জন্যে ছটফট করছে।

ল্যাইসে অ্যালের! অবশেষে রাজপুত্রের নির্দেশে ঘোষণা করলেন প্রধান বিচারক।

শুরু হয়ে গেল প্রতিযোগিতা।

দুই দলেরই সামনের সারির নাইটরা ছুটলো প্রতিপক্ষের দিকে। প্রত্যেকেই আক্রমণের ভঙ্গিতে বাগিয়ে ধরেছে বর্শা। মাঠের ঠিক মাঝখানে এমন ভয়ঙ্কর শব্দ তুলে তারা মিলিত হলো, এক মাইল দূর থেকেও শোনা গেল সে শব্দ। প্রথম কয়েক মিনিট ধুলায় প্রায় কিছুই দেখতে পেলো না দর্শকরা। ধুলার মেঘ যখন কেটে গেল, তারা দেখলো, দু পক্ষেরই অন্তত অর্ধেক নাইট পড়ে গেছে ঘোড়া থেকে। কয়েকজনের অবস্থা শোচনীয়। মৃতের মতো পড়ে আছে মাটিতে। বাকিদের বেশির ভাগই মারাত্মক আহত। তারা ঔড়ি মেরে দূরে সরে যাওয়ার চেষ্টা করছে। যারা এখনো ঘোড়ার পিঠে অক্ষত অবস্থায় আছে তারা লড়ছে প্রতিপক্ষের সাথে। সবার হাতে এখন তলোয়ার, কারণ সবারই বর্শা ভেঙে গেছে প্রথম সংঘর্ষের সময়। দুপক্ষ থেকেই বয়ে যাচ্ছে চিৎকার আর মুখখিস্তির ঝড়।

এবার দ্বিতীয় সারির যোদ্ধারা এগোলো। ফলে লড়াইয়ের তীব্রতা বেড়ে গেল বহুগুণ। দুপক্ষেরই সমর্থকরা চিৎকার করে উৎসাহ দিচ্ছে যার যার, পছন্দের যোদ্ধাকে।

দেসদিচাদো! দেসদিচাদো! তরুণ নাইটের সমর্থকরা চিৎকার করছে।

বোয়া-গিলবার্ট! বোয়া-গিলবার্ট! চিৎকার করছে প্রতিপক্ষ।

কিছুক্ষণের মধ্যেই ভয়ঙ্কর রূপ নিলো যুদ্ধ। নাইটরা মাঠের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াতে লাগলো প্রতিদ্বন্দ্বীদের। চিৎকার, গালাগালি, অস্ত্রের ঝনঝনানি আর ঘোড়ার খুরের শব্দে কান পাতা দায়। এর ভেতর থেকে থেকে বেজে উঠছে ট্রাম্পেট। মাঝে মাঝে শোনা যাচ্ছে আহতদের আর্তনাদ। সব মিলিয়ে বীভৎস দৃশ্য।

কিন্তু কারো মধ্যেই দুঃখবোধ বা বিরূপ প্রতিক্রিয়া নেই। পুরুষদের মতো মহিলা দর্শকরাও অবিচল উৎসাহে দেখছে লড়াই। পুরুষদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চিৎকারও করছে অনেকে। মাঝে মাঝে অবশ্য কারো স্বামী বা ভাই আহত হয়ে পড়ে গেলে কোনো মহিলা দর্শক বিচলিত হচ্ছে। কিন্তু তা মুহূর্তের জন্যে মাত্র। একটু পরেই আবার লড়াইয়ের উন্মাদনা সংক্রামিত হচেছ তার বা তাদের ভেতর। আবার শুরু হচ্ছে চিৎকার, হাততা লি। মেয়েরাও পুরুষদের সঙ্গেই গলা মিলিয়ে উৎসাহ যোগাচ্ছে যোদ্ধাদের। মাঝে মাঝেই শোনা যাচ্ছে:

সাবাস, দেসদিচাদো! দেখেছো, কি দারুণ চালালো তলোয়ারটা! বা, সাবাস, স্যার ব্রায়ান! আরো জোরে মারুন! এই দিক দিয়ে এসে, এই পাশ দিয়ে!

ঘোষকদের কণ্ঠও শোনা যাচ্ছে: লড়ে যান, বীর নাইটরা! পরাজয়ের চেয়ে মৃত্যু শ্রেয়! মনে রাখবেন, শত শত চোখ আপনাদের সাহস ও কৌশল দেখে মুগ্ধ হচ্ছে!

অবশেষে গৃহহীন নাইট মুখখামুখি হলো বোয়াগিলবার্টের। দুজনেরই বর্শা ভেঙে গেছে। দুজনেরই হাতে এখন তলোয়ার। আগুন ঝরা চোখে একে অন্যের দিকে তাকালো তারা। দুজনেরই দৃষ্টিতে ঘৃণা। শুরু হলো দুই দলপতির লড়াই। একজনের মরণ না হওয়া পর্যন্ত এ লড়াই থামবে না।

দর্শকরা দেখছে। শ্বাসরুদ্ধকর উত্তেজনায় কাঁপছে সবাই থরথর করে।

বোয়া-গিলবার্টের দল এখন জয়ের পথে। অ্যাথেলস্টেন এবং বিশালদেহী ফ্ৰঁত দ্য বোয়েফ যার যার প্রতিপক্ষকে ভূপাতিত করে এগিয়ে এলো দলনেতার সাহায্যে। দুদিক থেকে তারা আক্রমণ করলো তরুণ নাইটকে।

সাবধান, দেসদিচাদো! সাবধান! দুপাশে খেয়াল করো! চিৎকার উঠলো দর্শকদের ভেতর।

বেকায়দা অবস্থায় পড়ে গেল নাইট। এক সাথে তিনজনকে একা ঠেকিয়ে রাখা প্রায় অসম্ভব। কিন্তু ঘাবড়ালো না সে। ব্রায়ানকে প্রবল একটা আঘাত হেনেই পিছিয়ে এলো দ্রুত। এত দ্রুত যে, আরেকটু হলেই মুখোমুখি সংঘর্ষ হতে অ্যাথেলস্টেন আর রেজিনান্ডের ভেতর। অতি কষ্টে দুই অশ্বারোহী পাশ কাটালো একে অপরকে। তারপর ছুটলো গৃহহীন নাইটের পেছন পেছন। ইতোমধ্যে বোয়া-গিলবার্টও যোগ দিয়েছে তাদের সাথে।

ভাগ্য ভালো, খুবই ভালো একটা ঘোড়ায় বসে আছে তরুণ নাইট। আগের দিন যেটা সে পুরস্কার পেয়েছে এটা সেই ঘোড়া। পাখির মতো উড়ে বেড়াতে লাগলো সে একবার মাঠের এমাথায় একবার ওমাথায়। এভাবে কিছুক্ষণের ভেতর তিন প্রতিপক্ষকে আলাদা করে ফেলতে পারলো নাইট। তারপর একে একে হামলা চালাতে লাগলো তিন জনের ওপর। একজনকে আঘাত করেই পিছিয়ে আসছে নয়তো পাশে সরে যাচ্ছে, তারপর আবার অন্য একজনকে আক্রমণ করছে। তিনজন হওয়া সত্ত্বেও তার কোনো ক্ষতি করতে পারছে না প্রতিপক্ষ।

দর্শকরা পাগল হয়ে উঠেছে। মুহূর্তের জন্যেও চিৎকার বন্ধ করছে না কেউ। তবে, তিনজনের সাথে একা লড়ে গৃহহীন নাইট যে শেষ রক্ষা করতে পারবে না তা বুঝতে পারছে অনেকে। সে এখন যা করছে তাতে সময় কাটানো সম্ভব জয়লাভ সম্ভব নয়। একটু পরে যখন ক্লান্ত হয়ে পড়বে তখন হার স্বীকার করা ছাড়া কোনো গতি থাকবে না তার। রাজপুত্র জনের কাছাকাছি যেসব সম্রান্তজনেরা বসেছিলেন তারা বললেন: এবার খামার আদেশ করুন, রাজপুত্র! এমন একজন বীর নাইটকে অপমানের হাত থেকে বাঁচান!

জন কান দিলেন না তাদের কথায়।

এই অহঙ্কারী নাইট কাল বিজয়ী হয়েছে, বললেন তিনি। আজ অন্যেরা সুযোগ পেয়েছে, আমি বাধা দেবো কেন?

.

পরাজয় বোধহয় এড়াতে পারলো না তরুণ নাইট। স্পষ্ট বুঝতে পারছে দর্শকরা, সে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। আগের ক্ষিপ্রতা আর নেই তার তরবারিতে। ঘোড়াটাকেও ঠিক মতো যেন পরিচালনা করতে পারছে না। আর কিছুক্ষণ যদি চেষ্টা চালিয়ে যায় বোয়া-গিলবার্ট, অ্যাথেলস্টেন আর রেজিনাল্ড, কোনো সন্দেহ নেই বিজয় তাদের হাতের মুঠোয় আসবে।

এই সময় অপ্রত্যাশিত এক ঘটনায় বেঁচে গেল সে। শুধু বেঁচেই গেল টুর্নামেন্টের ফলাফলও হয়ে গেল অন্য রকম।

তরুণ নাইটের দলে কালো পোশাক পরা এক যোদ্ধা ছিলো। তার ঘোড়াও তার পোশাকের মতোই কালো। সেজন্যে দর্শকরা তার নাম দিয়েছে ব্ল্যাক নাইট। অদ্ভুত তেজোদীপ্ত তার ভঙ্গি–যেমন তার তেমন তার ঘোড়ার। এতক্ষণ সে লড়েছে, তবে খুব একটা মন দিয়ে নয়। আক্রমণ সে বলতে গেলে করেইনি। কেউ আক্রমণ কর কেবল ঠেকিয়ে গেছেঅনায়াসে, ঠেকিয়ে গেছে। দেখে অনেকের মনে হয়েছে সে-ও যেন নিরাসক্ত একজন দর্শকমাত্র। সে কারণেই ব্ল্যাক নাইট-এর পাশাপাশি অনেকে তার নাম দিয়েছে অলস নাইট।

দলপতির বিপদ দেখে হঠাৎ করে যেন এই নিরাসক্ত যোদ্ধার বীরত্ব জেগে উঠলো। আলসেমি ঝেড়ে ফেলে দিয়ে এগিয়ে এলো তরুণ নাইটকে সাহায্য করতে।

দেসদিচাদো! ঘাবড়িও না! আমি এসে গেছি! চিৎকার করে উঠলো সে।

সময় মতোই এসেছিলো ব্ল্যাক নাইট, নইলে কি হতো বলা মুশকিল। তরুণ নাইট তখন তলোয়ার তুলেছে বোয়া-গিলবার্টকে আঘাত করার জন্যে। একই সঙ্গে রেজিনাও তলোয়ার তুলেছে তরুণ নাইটকে আঘাত করতে। কিন্তু তলোয়ার নামিয়ে আনার সুযোগ পেলো না রেজিনাল্ড। তার আগেই ব্ল্যাক নাইট তার কাছে পৌঁছে ভয়ঙ্কর এক আঘাত হেনেছে তার মাথায়। ঘোড়াসুদ্ধ মাটিতে পড়ে গেল নরম্যান নাইট রেজিনাল্ড। এরপর অ্যাথেলস্টেনের দিকে ছুটে গেল ব্ল্যাক নাইট। তারই কুঠার ছিনিয়ে নিয়ে তার মাথায় মারলো প্রচণ্ড শক্তিতে। অজ্ঞান হয়ে মাটিতে পড়ে গেল স্যাক্সন রাজকুমার। এরপর আবার আগের মতো আলসেমি ভর করলো ব্ল্যাক নাইটের শরীরে। ধীর গতিতে ঘোড়া চালিয়ে মাঠের এক কোণে চলে গেল সে। অবখানা, এবার তোমার ব্যাপার তুমিই সামলাও, দেসদিচাদো।

আবার পুর্ণোদ্যমে টেম্পলারের মুখোমুখি হলো তরুণ নাইট। দুই সঙ্গীকে পরাভূত হতে দেখে হতাশ হয়েছে ব্রায়ান, তবে ভেঙে পড়েনি। সেও সমান উদ্যমে সামনাসামনি হলো গৃহহীন নাইটের। শুরু হলো লড়াইয়ের আরেক পর্যায়।

কিন্তু বেশিক্ষণ চললো না এ যুদ্ধ। বোয়া-গিলবার্টের ঘোড়া আহত হয়েছে অনেকক্ষণ আগে। আঘাত মারাত্মক নয় বলে এতক্ষণ টিকে ছিলো। এবার আর পারলো না। প্রচুর রক্তপাতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে সে। তরুণ নাইটের আচমকা এক আঘাতে মুখ থুবড়ে পড়ে গেল মাটিতে। টেম্পলার ব্রায়ানও গড়িয়ে পড়লো। তক্ষুণি অবশ্য উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করলো, কিন্তু পারলো না। তার পা জড়িয়ে গেছে ঘোড়ার রেকাবে। বেশ কয়েকবার টানাটানি করেও পা-টা ছাড়াতে পারলো না সে। ইতোমধ্যে তরুণ নাইট লাফ দিয়ে নেমে পড়েছে তার ঘোড়া থেকে। শত্রুর বুকের ওপর পা দিয়ে দাঁড়ালো সে।

পরাজয় স্বীকার করো, নয়তো মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত হও? মাথার ওপর তলোয়ার তুলে চিৎকার করে উঠলো গৃহহীন নাইট।

রাজপুত্র জন দেখলেন, মহা বিপদ টেম্পলার ব্রায়ানের সামনে। তক্ষুণি যুদ্ধ বন্ধের ইঙ্গিত করলেন তিনি।

.

টুর্নামেন্ট শেষ। আহত নাইটদের একে একে তাঁবুতে নিয়ে যাওয়া হলো। আহত নিহতের হিশেব নিতে গিয়ে দেখা গেল, চারজন মারা পড়েছে, মারাত্মক আহত হয়েছে ত্রিশজনের মতো। মাঠ ভিজে গেছে রক্তে।

এবার বিজয়ীর নাম ঘোষণার পালা। রাজপুত্র জনের ইচ্ছা ব্ল্যাক নাইটকেই আজকের বিজয়ী বলে ঘোষণা করবেন, আর যা-ই করুন কালকের সেই অহঙ্কারী ছোকরাকে আরো অহঙ্কারী হয়ে ওঠার সুযোগ দেবেন না। কিন্তু বিচারকরা তাতে আপত্তি জানালেন। তাঁদের যুক্তি, উত্তরাধিকার বঞ্চিত নাইট একাই ছজন প্রতিদ্বন্দ্বীকে পরাভূত করেছে, বিপক্ষের দলনেতা বোয়া-গিলবার্টও তার কাছেই পরাজিত হয়েছে; সুতরাং, বিজয়ীর সম্মান তারই প্রাপ্য।

কিন্তু জন তার গোঁ ছাড়তে রাজি নন। অবশেষে বিচারকরা মেনে নিলেন তাঁর কথা। কিন্তু বারবার ডেকেও ব্ল্যাক নাইটের খোঁজ পাওয়া গেল না। লড়াই শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সে মাঠ ছেড়ে চলে গেছে। কোন দিকে গেছে কেউ দেখেনি, কাউকে কিছু বলেও যায়নি সে। শেষ পর্যন্ত আর কোনো উপায় না দেখে জন, ঘোষণা করতে বাধ্য হলেন: কালকের বিজয়ী নাম না জানা নাইট বিজয়ী হয়েছে আজও।

তুমিও তো তোমার নাম বললে না, তরুণ নাইটের দিকে তাকিয়ে বললেন জন, তাই তোমাকে দেসদিচাদো (উত্তরাধিকার বঞ্চিত) বলেই সম্বোধন করছি। সমবেত সুধী ও দর্শকমণ্ডলীর সামনে তোমাকে দ্বিতীয়বারের মতো বিজয়ী ঘোষণা করা হচ্ছে। এবার তুমি পুরস্কার নেবে তোমারই নির্বাচন করা সৌন্দর্য ও প্রেমের রানীর কাছ থেকে।

কুর্নিশ করলো তরুণ নাইট, কিন্তু কোন কথা বললো না।

বাজনা বেজে উঠলো। সবাই উৎফুল্ল কণ্ঠে অভিনন্দন জানাচ্ছে বিজয়ীকে। রমণীরা রুমাল নাড়ছে। বিচারকমণ্ডলী বিজয়ীকে সাথে করে এগিয়ে গেলেন সৌন্দর্য ও প্রেমের রানীর সিংহাসনের দিকে। হাঁটু গেড়ে বসলো নাইট রানীর সামনে।

রোয়েনা তার আসন থেকে উঠে এলো। সামান্য ঝুঁকলো বিজয়ীর মাথায় মুকুট পরিয়ে দেয়ার জন্যে।

না! চিৎকার করে উঠলেন প্রধান বিচারক। বিজয়ী নাইটকে তার শিরোস্ত্রাণ খুলতে হবে। মুকুট পরানোর সময় মাথায় কিছু থাকা চলবে না।

প্রতিবাদ করলো নাইট। কিন্তু তার প্রতিবাদে কেউ কান দিলো না। অনেকটা জোর করেই তার শিরোস্ত্রাণ খুলে নিলো মার্শালরা। বছর পঁচিশেক বয়েসের সুন্দর একখানি তরুণ মুখ দেখা গেল। মৃত্যুর মতো ফ্যাকাসে সে মুখ। দুএক জায়গায় রক্তের দাগ।

মুখটা দেখামাত্র অস্ফুটস্বরে চিৎকার করে উঠলো রোয়েনা। কাঁপা কাঁপা হাতে মুকুটটা পরিয়ে দিলো নাইটের মাথায়।

তরুণ নাইট মাথা নুইয়ে অভিবাদন জানালো রোয়েনাকে। ওর হাত টেনে নিয়ে আলতো করে ছোঁয়ালো ঠোঁটে। তারপর হঠাৎ মুখটা ঝুলে পড়লো তার। টলমল করে উঠলো পা। কেউ এসে ধরার আগেই মাটিতে পড়ে গেল বিজয়ী নাইটের অচেতন দেহ।

সবাই উদ্বিগ্ন মুখে ছুটে এলো তার দিকে। সেড্রিকও এলেন। তরুণ নাইটকে এক পলক দেখেই দাঁড়িয়ে পড়লেন তিনি। সে তারই নির্বাসিত পুত্র উইলফ্রিড অভ আইভানহো।

মার্শালরা ধরাধরি করে তাঁবুতে নিয়ে গেল আইভানহোকে। একে একে তার গা থেকে যুদ্ধের পোশাকগুলো খুলে আনতেই দেখা গেল, বুকের এক পাশে গভীর একটা ক্ষত। চুইয়ে চুইয়ে রক্ত গড়াচ্ছে সেই ক্ষত থেকে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *